শুক্রবার, ৩ মে, ২০১৩

সরকারের দ্বিতীয় গণহত্যা : সাভার ট্রাজেডি



সাভারের রানা প্লাজা এখন এক ধ্বংসস্তূপ। মানুষের লাশ এবং কংক্রিটের মিলিত এক ধ্বংসস্তূপের নাম রানা প্লাজা, জীবনের তাগিদে প্রতিদিন আর সেখানে শ্রমিকের পদচারণা নেই। প্রতিটি গার্মেন্টস মেশিনারিজের শব্দ, বিদ্যুতের পাখার ঘূর্ণন, সারি সারি কাপড়ের রোল, কাপড় কাটা, সেলাই করা, শিপমেন্টের জন্য প্রস্তুতকৃত মালামাল প্যাকেটজাত করা- সব ব্যস্ততা বন্ধ হয়ে গিয়ে এখন সেখানে চলছে প্রিয়জন হারানো মানুষের আর্তনাদ। একদিকে বিল্ডিংয়ের ধ্বংসস্তূ অন্য দিকে পচা, গলিত লাশের গন্ধ, শোকার্ত মানুষের আহাজারি আর কান্নার রোনাজারি। বিভীষিকাময় পরিবেশে এখনো চলছে স্বজনদের খুঁজে ফেরা। এখনো ছবি হাতে ভাইয়ের জন্য, পিতার জন্য, স্বামীর জন্য, স্ত্রীর জন্য, মায়ের জন্য, বোনের জন্য অসংখ্য মানুষের সকাল-সন্ধ্যা অপেক্ষা। এ অপেক্ষার পালাও এক সময় শেষ হবে। মানুষের কান্না এক সময় থেমে যাবে। নিহত পরিবারগুলোর পরিচয় আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। মাতা-পিতা হারানো সন্তানদের হৃদয়ে গুমরে মরা কান্নায় তার অন্তর ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকবে। স্বামী হারা নারী ‘বিধবা’ পরিচয় নিয়ে অন্তর্দহনে ক্ষত-বিক্ষত হবে। সন্তানহারা পিতা সন্তানের শোকে নিজের দুঃখগুলো নিজের কাছেই জমা করে হা-পিত্যেশ করবে। প্রিয়জনহারানোর বেদনা নিয়ে মানুষগুলো আবার ফিরে যাবে যার যার ব্যস্ততায়। স্ত্রীকে হারিয়ে অনেক স্বামী সন্তান নিয়ে জীবনের নতুন যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। দুঃখী মানুষগুলোকে নিয়ে পত্রিকায় এই লেখা এক সময় থেমে যাবে। টিভির টক শো বন্ধ হয়ে যাবে। আলোচনা-সমালোচনা, তদন্ত, দোষীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন সবই এক সময় থেমে যাবে। আমরা হয়তো এক সময় ভুলেই যাবো সাভারে রানা প্লাজা নামে একটি প্লাজা ছিল। নিহত মানুষগুলোর পরিবারে তাদের হারানো মানুষগুলো আর ফিরে আসবে না। আহত মানুষগুলো যাদের কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো চোখ নেই যারা দুর্ঘটনার এক ঘণ্টা আগেও সুস্থ ছিল পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে তারা দুঃখের জীবন পাড়ি দেবে। যারা কখনো কারো কাছে হাত পাতেনি, ভিক্ষা চায়নি এদের অনেকেই হয়তো জীবনের তাগিদে দু’মুঠো অন্নের জন্য রাস্তার পাশে কাতর কণ্ঠে মিনতি জানাবে। হয়তো তাদের ভাষা এমন হবে আমার হাত ছিলো, পা ছিলো, চোখ ছিলো, আজ আমি এক অসহায় ব্যক্তি আপনাদের সাহায্য চাচ্ছি। এভাবেই অসহায় জীবনগুলো দুনিয়ার মানুষের সামনে নিজেদের অসহায় জীবনের উপাখ্যানগুলো তুলে ধরবে। কিন্তু অবাক পৃথিবী তাদের জীবন কখনোই ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু কেন? এভাবে বার বার খেটে খাওয়া দুঃখী মানুষগুলোর জীবনের ওপর দিয়েই সব ঝড়-ঝঞ্ঝা বয়ে যাবে। কেন সকল বিপদ, দুর্ঘটনার নীরব শিকার হবে? এর কি কোন প্রতিকার নেই। অতি দরিদ্র পরিবারের অসহায় মানুষগুলো যারা দু’মুঠো অন্নের জন্য, একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার জন্য, সন্তানের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দেয়ার জন্য, কেউবা অসহায় পিতার ওষুধ কিনে দেয়ার জন্য নিজের সমস্ত শ্রমকে ঢেলে দিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে করছে মজবুত শুধু তারাই সকল দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে? যে মানুষগুলোর ঘামের বিনিময়ে শহরের উচ্চবিত্তদের সম্পদের পাহাড় রচিত হচ্ছে তারাই সব সময় দুর্ঘটনার নির্মম শিকার হচ্ছে। দেখে মনে হয় যেন ওদের জীবনের কোন মূল্য নেই। ওরা মানুষ নয়। ওদের প্রাণ নেই। ওরা কোন নির্জীব পদার্থ অথবা ধনীদের আরাম-আয়েশ এবং সম্পদের পাহাড় রচনার জন্য ওদের সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা অসহায় জীবনগুলোর ঘামের ওপর দিয়ে অট্টালিকার আর সম্পদের মালিক হন প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ঘটনা-দুর্ঘটনার নির্মম শিকার মানুষগুলোর এ বোবা কান্না আকাশ-বাতাস ভারী করলেও আমাদের সমাজপতিদের এবং সরকারের বোধোদয় ঘটছে না। সাভারের রানা প্লাজার দুর্ঘটনার সামান্য পর্যালোচনা করলেই আমাদের কাছে এ বিষয়গুলো ধরা পড়বে।
ভয়াবহ দুর্ঘটনার পূর্বেই সংকেত দেয়া হয়েছিল : ৯ তলা এই ভবনটিতে আগের দিনই ফাটল দেখা দেয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সংবাদ সংস্থা খবর প্রকাশ করে যে ঘটনার আগের দিন দেখা যায় ভবনটির পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ওই দিন ভবনের সব গার্মেন্ট ও ব্যাংক ছুটি দেয়া হয়। দোকানগুলোও বন্ধ ঘোষণা দেয়া হয়। স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন গিয়ে ভভনটি খালি করারও নির্দেশ দেয়। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে সবাইকে ফোনে জানানো হয় ভবনটিতে কোনো অসুবিধা নেই। সকালে সব গার্মেন্ট শ্রমিককে কাজে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এ কারণে সকালে গার্মেন্ট শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ ভবনটি কেঁপে ওঠে। এ সময় ভেতরে তারা তীব্র আর্তচিৎকার শুনতে পান। ভবনের সামনেই তখন যুবলীগের সভা চলছিল। ভবন মালিক সাভার থানা যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রানা ওই সভার নেতৃত্বে ছিলেন। আওয়ামী ও যুবলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী ভবনের আন্ডার গ্রাউন্ডে রানার অফিসে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে রানা নিজেও ভবনের নিচতলায় গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনিও আহত হন। ৩-৪ মিনিটের মধ্যেই ভবনটি গুঁড়ো হয়ে মাটিতে পড়তে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরাও এ সময় কিছু লোককে দৌড়ে ভবন থেকে বের হয়ে যেতে দেখেন। বেশির ভাগ লোকই ভবনের মধ্যে আটকা পড়েন বলে সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়। ভবনটি যখন মাটিতে পড়ে যায় তখন পাশের ভবনগুলোর ওপর খ-িত অংশ ছিটকে পড়ে। এতে ওই সব ভবনও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার আগের দিন ভবনে ফাটল দেখা দেয়ার পর যখন সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি শিল্প পুলিশ যেখানে ভবন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় এরপর কার নির্দেশে এবং কার অনুমতিতে ভবনে আবার শ্রমিকদের ডেকে এনে কাজ শুরু করা হলো? এটা কি এ জন্য যে ভবনের মালিক রানা প্রভাবশালী এবং সরকার দলীয় এমপি মুরাদ জংয়ের ক্যাডার হওয়ায় তার দাপটের কাছে প্রশাসনসহ সবাই অসহায়। এই প্রভাবশালীদের দাপটে এবং ক্ষমতার অপব্যহারে আর কত মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া হবে? এ প্রশ্নের জবাব দেবেন কে?
সংখ্যালঘুর দখল করা অবৈধ জমিতে অবৈধ ভবন : কলুর ছেলে সোহেল রানা সাভারের যুবলীগ নেতা। ক্ষমতার দাপটে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। তার দখলবাজির হাত থেকে রেহাই পাননি সংখ্যালঘুরাও। যে ভবনটি ধসে পড়ে, তার মধ্যেও এক সংখ্যালঘুর সম্পত্তি রয়েছে। এক সময়ে এই সোহেল রানা তার বাবার তেলের ঘানিতে কাজ করতেন। বোতলে ভরে সরিষার তেল বিক্রি করতেন হেঁটে হেঁটে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সোহেল রানার বাবার নাম আবদুল খালেক। সবাই তাকে খালেক কলু বলেই চিনতেন। বাড়ি সাভারের বাজার রোডে। বাড়িতে গরুর ঘানিতে তেল বানাতেন আবদুল খালেক। স্থানীয় অধরচন্দ্র হাইস্কুল থেকে নবম শ্রেণী পাস করেছেন রানা। এরপর অভাবের তাড়নায় তার আর লেখাপড়া হয়নি। তাদের বাড়িটিকে এখনো কলুর বাড়ি হিসেবেই জানেন স্থানীয়রা। এই সোহেল রানাই রাজনীতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। প্রথমে একটি তেল তৈরির মেশিন বসান। গরুর ঘানি থেকে উন্নতি হয় মেশিনে। নাম দেন রানা অয়েল মিল। গোলাপ ফুল মার্কা নামের সেই সরিষার তেল সরবরাহ করা হয় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায়। সেই রানা আজ পেঁৗঁছেছেন সমাজের উচ্চপর্যায়ে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় তিনি থোড়াই কেয়ার করতেন স্থানীয় প্রশাসনকে। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলীয় মাস্তান বাহিনী নিয়ে স্থানীয় রবীন্দ্রনাথ সাহার জমি দখল করে রানা। সেখানে ডোবার ওপরে রানা প্লাজা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ওই বছরই। রবীন্দ্রনাথ সাহা আদালতে মামলা করলেও সে মামলা বেশি দূর এগোয়নি। এক পর্যায়ে পাগল হয়ে যান রবীন্দ্রনাথ সাহা। ২০০৬ সালে পৌরসভা থেকে ছয় তলা ভবনের অনুমোদন নেয়া হয়। অনুমোদন নিলেও কোন নকশা অনুমোদন করানো হয়নি। আর সেই ছয়তলা ভবনের উপরেই গড়ে উঠেছে নয় তলা ভবন। সোহেল রানা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। সাভারের অসংখ্য মানুষের জমি তিনি দখল করেছেন বলে জানা যায়। স্থানীয় প্রশাসন ছিল তার কাছে জিম্মি। তার ইশারায় সাভারে অনেক কিছুই ঘটতো। রানার ক্ষমতা এবং অর্থের লোভের বলি হলো অসহায় মানুষগুলো।
ইউএনও বললেন সমস্যা নেই : দুর্ঘটনার পূর্বের দিন ফাটল দেখা দেয়ার পর যখন স্থানীয় শিল্প পুলিশ এবং সাভার পৌরসভার মেয়রের পক্ষ থেকে ভবন খালি করার নির্দেশ দেয়া হলো তখন ইউএনও বললেন, সমস্যা নেই। যেখানে স্থানীয় একজন প্রকৌশলী মোঃ মিজানুর রহমান ভবনটি দেখে বললেন বুয়েটের প্রকৌশলী এনে পরীক্ষা করে রিপোর্ট পাওয়ার পর বোঝা যাবে এ ভবন ব্যবহার করা যাবে কি না সেখানে তিনি কিভাবে বললেন যে কোন সমস্যা নেই? আজ বড় প্রশ্ন তিনি কেন এমন কথা বললেন? রানার অবৈধ ভবন এবং ব্যবসার সাথে তার ভাগ এবং কত পার্সেন্ট? সরকার এই- টিএনও কে এখনো গ্রেফতার করেনি। বরং প্রকাশিত খবর অনুযায়ী তিনি এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এতবড় দুর্ঘটনার পর এই ধরনের অযোগ্য, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকেন কিভাবে?
পিটিয়ে বাধ্য করা হয় কাজে যোগ দিতে : রানা প্লাজায় অবস্থিত গার্মেন্টগুলোতে ফাটল দেখা দেয়ার পর কাজে যোগ দিতে চাননি। শ্রমিকদের পিটিয়ে বাধ্য করা হয়েছে কাজে যোগ দিতে। এমনই অভিযোগ করেছেন বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা। আহতাবস্থায় হাসপাতালে তারা এ অভিযোগ করেন। মঙ্গলবার ওই ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিলে শ্রমিকরা ভবন থেকে নেমে পড়েন। তাদের আশঙ্কা ছিল ভবনটিতে যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ওই দিন তাদের গার্মেন্ট মালিকও গার্মেন্ট ছুটি দিয়ে দেন। কিন্তু রাতে শ্রমিকদের মোবাইলে ফোন করে জানানো হয় কাজে যোগ দিতে। সকালে তারা ওই ভবনের সামনে আসেন। কিন্তু অনেকেই কাজে যোগ দিতে নারাজ ছিলেন। তাদের পিটিয়ে বাধ্য করা হয়। শ্রমিকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ভবন মালিক রানা নিজেই তাদের বলেন কাজে যোগ না দিলে পিটিয়ে হাড় গুঁড়ো করে দেয়া হবে। রানা এ সময় শ্রমিকদের হুমকি দেন, ‘যারা কাজে যোগ না দেবে মনে করব তারা বিএনপি-জামায়াতের লোক।’ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও হুমকি দেয়া হয়। ভয়ে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে ওই ভবনে ঢোকেন। রানা এ কথাও বলেন, ‘হায়াত কমে আসলে কেউ কি বাঁচাতে পারবে’ এক নারী শ্রমিক জানান, তাদের ভয় দেখিয়ে ভবনে তোলা হয়েছে। ফাটল দেখে তাদের ইচ্ছে ছিল না কাজ করার। তিনি বলেন, শ্রমিকদের পিটিয়ে বাধ্য করা না হলে এ ভয়াবহ পরিস্থিতি হতো না। জীবন দিতে হতো না অসহায় শ্রমিকদের।
মাদক, নারী ব্যবসা এবং টর্চার সেল : রানা প্লাজার মালিক সাভার পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানার অপকর্মের আস্তানা ছিল ধসে পড়া ভবনটি। একাধিক হত্যা মামলার আসামী এই যুবলীগ ক্যাডার ছিল স্থানীয়দের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। এই ভবনের নিচতলায় সে গড়ে তুলেছিল টর্চার সেল। এখানে বিরোধী জোটের কর্মী এবং প্রতিপক্ষ লোকজনকে ধরে এনে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হতো। এছাড়াও এখানে গড়ে তোলা হয় মাদক ও নারী ব্যবসার আখড়া। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকায় রয়েছে যুবলীগ ক্যাডার রানার বিশাল বাহিনী। এই বাহিনী দিয়ে সে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। তার দাপটে ওই এলাকার সাধারণ মানুষ ও নিরীহ ব্যবসায়ীরা ছিলেন আতঙ্কে। প্রকাশ্যে অপকর্ম করলেও এর প্রতিবাদ করার সাহস পেত না কেউ। যুবলীগ নেতা সোহেল রানার প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন তার আপন বোনের স্বামীও। জমিজমা নিয়ে বিরোধের কারণে রানা বোনের স্বামী জাকির হোসেনকে ধামরাইয়ের ধুলিভিটা এলাকায় বাসস্ট্যান্ডের কাছে নিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। এছাড়াও ২০০৪ সালে এক বন্ধুকে গুলী করে হত্যা করে রানা। খুন, হত্যা, গুম, নির্যাতন মাদক ব্যবসার অভয়ারণ্য হওয়ার পরেও কোন এক অজানা কারণে এ ভবনের সাথে প্রশাসনের অনেক কর্তাব্যক্তির ছিল দহরম মহরম সম্পর্ক। আজ স্বাভাবিকভাবেই দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে : এই লেখাটি যখন লিখছি তখন একটি অনলাইন নিউজে দেখানো হচ্ছে এখন পর্যন্ত ৩১৮ লাশ উদ্ধার, জীবিত উদ্ধার হয়েছে ২৩৯৭ জন। নিখোঁজ কয়েক হাজার। সাভারের বাতাসে শুধুই লাশের গন্ধ। এত লাশ সাভারের বাতাসও সহ্য করতে পারছে না। রানা ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারকৃত ও ভেতরে এখনো পড়ে থাকা শত শত লাশের গন্ধে এবং স্বজনদের আহাজারিতে ক্রমশ ভারি হচ্ছে সাভারের বাতাস। স্মরণকালের ভয়াবহ ভবন ধসে দেয়াল ও ছাদের কংক্রিটের সাথে মিশে আছে চাপা পড়া মানুষের লাশ। উদ্ধার কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা ও সমন্বয় না থাকায় লাশের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকেপড়া মানুষগুলো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তারা জানে না তাদের জীবনের ভবিষ্যৎ কি। কিন্তু এই সংখ্যাও দীর্ঘ হচ্ছে। স্বজনদের খোঁজে ধ্বংসস্তূপ থেকে এনাম মেডিকেল। আবার এনাম মেডিকেল থেকে অধরচদ্র উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। কিন্তু কোথাও জীবনের খোঁজ পাচ্ছে না অনেক স্বজনেরা। স্বজনদের খুঁজতে তারা পাগলপ্রায়। তারা শুধুই তাদের স্বজনকে ফিরে পেতে চাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ উদ্ধার কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না। উদ্ধার কাজের ঢিলেমির কারণে অনেককেই লাশ হয়ে বের হতে হচ্ছে।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : এতবড় দুর্ঘটনার পর দোষীদের খুঁজে বের করার পরিবর্তে গণহত্যার নায়ক হিসেবে পরিচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাজির করলেন নাড়াচাড়া তত্ত্ব। তিনি বি.বি.সিতে এক সাক্ষাৎকারে বললেন মৌলবাদী এবং হরতালকারীদের নাড়াচাড়ার কারণে বিল্ডিংটি ধসে পড়তে পারে। এমনকি পরের দিন সাংবাদিকরা তাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এর ওপর আরও বেশি জোর দেন। তার এ কথার সমালোচনা হয় তার দলের মধ্য থেকেই। আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রণি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন ‘আওয়ামী লীগকে রক্ষা করতে হলে তাকে এখনই ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে.. উনি যদি মন্ত্রী হন তবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কে?’ মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, ‘উল্টাপাল্টা কথা বন্ধ করে দোষীদের গ্রেফতার করুন’ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম একই ভাষায় কথা বলেছেন, রাশেদ খান মেনন বলেছেন, দুর্ভাগ্যজনক ও কা-জ্ঞানহীন, ড. কামাল বলেছেন, কা-জ্ঞানহীন। দলের মধ্য থেকে সমালোচনার পর তিনি এখন বলেছেন, আমার কথা মিডিয়ায় ঠিকভাবে আসেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিল্ডিং ধসের মাধ্যমে এত মানুষের জীবনহানি এবং এত বেশি পরিমাণ মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা কখনো ঘটেনি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেন মানুষের জীবন নিয়ে উপহাস করতেই বেশি ভালোবাসেন। ইতঃপূর্বে গত ২৭ ও২৮ মার্চ সরকারি বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা চালানোর পর তিনি বলেছিলেন পুলিশ কি আঙ্গুল চুষবে? মানুষের জীবন নিয়ে যিনি এভাবে তামাশা করেন তিনি আর যাই হোক কোন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর পদে বেমানান।
মানুষ মানুষের জন্য : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা করলেও মানবিকতায় যাদের জীবন গড়া সেই মানুষগুলো ছুটে এসেছে প্রকৃত মানব সেবার ব্রত নিয়ে। যে যা পেরেছে তাই নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার সাথে সাথেই এনাম মেডিকেল কলেজ, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ এবং ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল আহতদের জন্য ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ছাত্রশিবির ফ্রি রক্তদান, মেডিকেল টিম গঠনসহ নানাবিধ কার্যক্রম হাতে নেয়। নাম না জানা অসংখ্য মানুষ রক্তদানসহ আহতদের চিকিৎসা এবং উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবটুকু সামর্থ্য  নিয়ে। কেউ লাশ সরাচ্ছেন, কেউ আহতদের কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ পানি পান করাচ্ছেন, কেউ টিস্যু পেপার বিতরণ করছেন, কেউ বাতাস দিচ্ছেন। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় ভুপেন হাজারিকার আবেদনময়ী সেই গান ‘মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি পেতে পারে না ও বন্ধু’...।
ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে শ্রমিকরা : সাভারের রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার ফাঁসি, সব কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কারখানা বন্ধের দাবিতে রাজধানী জুড়ে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক। তাদের বিক্ষোভে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাস্তা অবরোধ করে দুই শতাধিক যানবাহান ভাঙচুর করা হয়। প্রতিটি গার্মেন্টসে ইট নিক্ষেপ করে ভাংচুর চালায় শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশ মিছিলে গুলী ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করলে শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ। পুলিশের সাথে শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরাও শ্রমিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দু’জন পুলিশসহ কমপক্ষে অর্ধশত শ্রমিক ও পথচারী আহত হয়েছে। রামপুরা, বাড্ডা, মালিবাগ এলাকার সব গার্মেন্টস  থেকে শ্রমিকেরা মিছিল বের করে রাস্তায় নেমে পড়ে। শ্রমিকদের এ বিক্ষোভে এখন উত্তাল রাজপথ। শ্রমিক বিক্ষোভ দমাতে সরকার পুলিশ এবং সরকার দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে নামিয়েছে। যা আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়ার শামিল। তাদের দাবি শ্রমিকদের জীবন নিয়ে এমন মরণ খেলা বন্ধ করতে হবে। যাদের ঘামের বিনিময়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হয় তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। তাদের জীবনের যেন কোন মূল্য নেই। তারা এই নির্মমতার বিচার চায়। অসহায় শ্রমিকদের জীবন নিয়ে নির্মমতা এবং নিষ্ঠুরতা তারা আর দেখতে চায় না। কিন্তু সরকার সম্ভবত তাদের দাবি মানার পরিবর্তে বাঁকা পথ অনুসরণ শুরু করেছে। যা কারো জন্যই মঙ্গল হবে না।
মানবতার সাথে চরম উপহাস : যে দিন সাভারে দুর্ঘটনা ঘটলো সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, ফাটল দেখা দেয়ার পর সব লোক সরিয়ে নেয়া হয়েছে, এখন যারা আছে তারা হয় মালামাল সরাতে গেছে অথবা চুরি করতে গেছে। যে মানুষগুলো দুুু’মুঠো অন্যের জন্য প্রতিদিন হাড়ভাঙ্গা  খাটুনি খেটে দেশের অর্থনীতি সচল রাখে এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিল তাদেরকে প্রধানমন্ত্রী চোর আখ্যা দিয়ে জাতির কাছে কি ম্যাসেজ দিলেন? যদি সব লোক সরিয়ে নেয়া হয়ে থাকে তবে আহত-নিহত লোকগুলো আসলো কোত্থেকে? তিনি আর কি একটি কথা বলেছেন, দায় এড়ানোর জন্য রানা যুবলীগের কেউ নয়। জনগণের প্রশ্ন হচ্ছে... রানা যুবলীগের কেউ যদি না-ই হয়ে থাকে তবে তিনি পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক হিসেবে পোস্টার-ফেস্টুন লাগান কিভাবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য তাকে সেল্টার দেন কেন? ঘটনার দিন সংসদ সদস্য মুরাদ জং তাকে উদ্ধার করে কোথায় নিয়ে গেছেন? স্বাভাবিকভাবেই জনগণ এ প্রশ্নের জবাব চাইবে।
সরকারের চেয়ে সাধারণ জনগণের ভূমিকা বেশি : রড কাটা, মানুষ উদ্ধার করা, পানি পান করানো, আহতদের চিকিৎসা দেয়া, রক্ত দেয়া লাশ উদ্ধার করা সব কাজেই সাধারণ মানুষ সবটুকু সামর্থ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যে যার মতো উদ্ধার কাজ পরিচালনা করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষ ভবনের বড় বড় ভগ্নাংশ অপসারণের চেষ্টা করেছেন। সাধারণ রশি দিয়ে টেনে নামানোর চেষ্টা করেছেন বড় বড় অংশ। প্রয়োজনীয় মেশিন ও যন্ত্রের অভাবে উদ্ধার কাজে কোনো গতি নেই। হাতুড়ি বাঁটাল দিয়ে তারা নয় তলা ভবন ভাঙার চেষ্টা করছেন। উদ্ধারকারীদের অনেককে দেখা যায় হ্যাকসো ব্লেডের ওপর ভর করে কাজ চালিয়ে যেতে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে উদ্ধার কাজ পরিচালিত হলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষকে দেখা যায় সুড়ঙ্গ খুঁড়ে খুঁড়ে ভেঙে পড়া ভবনের একতলা থেকে অন্য তলায় যেতে এ কাজে সরকারের সমন্বয়হীনতা আহত-নিহত মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সরকার কাছে বিল্ডিং কাটার এবং আহতদের উদ্ধারের জন্য আধুনিক এবং উন্নত কোন যন্ত্রপাতি-ই ব্যবহার করেনি। বরং বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর উল্টো পুলিশী হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি সহায়তা অপ্রতুল : আহতদের চিকিৎসা, কাটার যন্ত্র, গ্যাস সিলিন্ডার, ওষুধ, স্যালাইন ইত্যাদির জন্য উদ্ধাকারীদের পক্ষ থেকে বার বার আকুতি জানালেও সরকারের তরফে তার সহায়তা ছিল নামমাত্র, অপরদিকে সাধারণ জনগণ এ বিষয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা রড কাটার যন্ত্র এবং গ্যাস সিলিন্ডারের অভাব। যা সাধারণ জনগণের অনেকেরই নাগালের বাইরে কিন্তু সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রচুর পরিমাণ থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী তা পাওয়া যায়নি।
শেষ মুহূর্তের বাঁচার আকুতি : শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অক্সিজেন নাই খাবার নাই, চোখে অন্ধকার এর মধ্যেও বার বার বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে আটকেপড়া মানুষগুলো। ফোনে ভাই, বাবা, মা আত্মীয়-স্বজনকে আকুতি জানিয়ে একসময়ে কণ্ঠটি নিথর হয়ে যাচ্ছে। এরপর আর ও প্রান্ত থেকে কথা আসছে না। এমন অসংখ্য মানুষের বোবা কান্নায় ভারি হয়ে আছে সাভারের আকাশ-বাতাস। শেষ মুহূর্তের বাঁচার আকুতি জানিয়ে পিলারের নিচে আটকেপড়া এক নারী আর্তনাদ করে বলেছেন ভাই আমার পা আটকে আছে আমার পা দরকার নেই। আমাকে উদ্ধার করেন। অন্য এক নারী আর্তনাদ এবং চিৎকার করে বলেছেন ভাই আমার দু’বছরের সন্তানটির জন্য আমাকে বাঁচান। এ ধরনের হাজারো আর্তনাদে সাভার আজ ভারাক্রান্ত। দুঃখের ভার বইতে পারছে না সাধারণ মানুষ।
হৃদয় গহীনের অব্যক্ত বেদনা : ফেসবুকে এক তরুণের স্ট্যাটাসে এক নিহত তরুণীর  শেষ মুহূর্তের না বলা বেদনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছে ‘সাভার ট্রাজেডির দ্বিতীয় দিন এক হতভাগ্য তরুণীর একটি লাশ বের করে আনা হলো লাশের মুঠোর মধ্যে একটি চিরকুট তাতে লেখা-মা, বাবা তোমরা আমাকে ক্ষমা করো, আমি আর তোমাদের ওষুধ কিনে দিতে পারবো না, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো, ভাইয়েরা আপনারা আমার লাশটা দয়া করে আমার বাড়িতে পৌঁছে দিবেন।’
সুস্পষ্ট গণহত্যা : ফাটল ধরা ভবনে শ্রমিকদের ডেকে এনে কাজে বাধ্য করে সুস্পষ্ট গণহত্যা চালিয়েছে। দেশের বিশিষ্ট জনেরাসহ প্রতিটি সাধারণ মানুষ এ প্রতিক্রিয়াটিই ব্যক্ত করেছেন। কারণ প্রথমে শ্রমিকরা কাজ করতে চায়নি। কিন্তু তাদের ডেকে এনে জোর করে কাজ করানো হয়েছে। চাকরি হারানোর ভয়ে অসহায় শ্রমিকরা ভবনে ঢোকার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। এতেই বোঝা যায় এটি সুস্পষ্ট গণহত্যা।
বিদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের বাজারে ধস : গার্মেন্টস ভবনে ফাটল, শ্রমিক গণহত্যা, শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা, হঠাৎ করে সব গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তৈরি পোশাক শিল্পের বাজারে ব্যাপক ধস নামবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
১০০ দিনের হরতালের চেয়ে বেশি ক্ষতি : বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং হরতালের কারণে অর্থনীতির ক্ষতি নিয়ে অনেক সেমিনার হয়। বিজেএমএ, বিকেএমইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রায় এ বিষয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানান যে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং হরতালের কারণে ব্যবসায় বাণিজ্য এবং শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু সাভার ট্রাজেডির কারণে যে ক্ষতি হলো তা একশ দিনের হরতালের ক্ষতির চেয়েও মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে। এ ঘটনায় দেশী-বিদেশী বায়াররা মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং তারা অন্য কোথাও তাদের পণ্যের বাজার খুঁজবে। বায়ারদের একটি অন্যতম শর্ত থাকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে গার্মেন্টস শিল্প স্থাপন করা নিয়ে বিজেএমইএ, বিকেএমইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কোনো নজরদারি নেই। তাদের যত ক্ষোভ রাজনীতিবিদদের ওপর কিন্তু তাদের উদাসীনতা, শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা না দেয়া ইত্যাদি নিয়ে বিজেএমইএ, বিকেএমইসহ ব্যবয়াসী সংগঠনগুলোর কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। আজ তাদের অতি লোভের কারণে ১০০ দিনের হরতালের চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে অভিজ্ঞজনেরা বলছেন।
অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে : আমাদের প্রধান রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে গার্মেন্টস পণ্য থেকে। সাভার ট্রাজেডির কারণে এ শিল্প এখন হুমকির মুখে। এ শিল্পে ধস মানে গোটা অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়া। দুর্ঘটনা ঘটার পরের দিনই কোরিয়ান এক কোম্পানি তাদের বাংলাদেশে অফিসের মাধ্যমে উৎপাদনকারীদের বলে দিয়েছেন, তারা আর বাংলাদেশে ব্যবসা করবেন না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থা হতে পারে শ্রীলংকার মতো। শ্রীলংকায় এক সময় প্রধান রফতানি আয় ছিল তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে তারা তাদের বাজার হারায়। আজ বাংলাদেশও সে পথে হাঁটছে।
প্রথম আলোর নর্তন কুর্দন : সাভারের ভয়াবহ নির্মম ট্রাজেডির ২ দিন পর গোটা জাতি যখন শোকে স্তব্ধ তখন প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় নতুন শিল্পীদের নর্তন কুর্দনের। এ অনুষ্ঠান আয়োজনের পূর্বে এর সম্পাদক সাহেব কমিউনিস্ট নেতা মতিউর রহমান যারা সব সময় শ্রমিক অধিকারের কথা বলেন সেই নেতাই জাতির শোকের দিনে, শ্রমিকদের দুঃখ-বেদনার দিনে তাদের আর্তনাদ-আর্তচিৎকারকে তুচ্ছ করে আয়োজন করলেন নট-নটীদের নর্তন কুর্দনের। যার স্লোগান বদলে যাও বদলে দাওÑ ধিক এই বদলে যাওয়াকে। তার আর একটি স্লোগান মাদককে না বলুন। কিন্তু সকালে দেখলাম এক তরুণ তার ফেইস বুক স্ট্যাটাসে লিখেছে প্রথম আলোকে না বলুন।
ধরণী তুমি দ্বিধা হও : পৃথিবীর মানুষের নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা দেখে কবি বলেছিলেন, ‘ধরণী তুমি দ্বিধা হও’ নারী অধিকার নিয়ে নিয়মিত আন্দোলন হয় এবং হচ্ছে। আজ যখন এই লেখাটি লিখছি আজো গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকদের জড়ো করে মতিঝিলে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে নারী সমাবেশ করার কথা ছিল। কিন্তু সাভার ট্রাজেডির পর সরকারের সে সাহস উবে গেছে, তারা জানেন এখন এই মুহূর্তে সরকারের পক্ষে গার্মেন্টস শ্রমিকদের রাস্তায় নামানো সম্ভব নয়। কিন্তু যেই নারীদের নারী অধিকারের জন্য ব্যবহার করা হয় তাদের অধিকার কতোটুকু? তাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। এমনকি কোনো কোনো সময় ইজ্জতের নিরাপত্তা নেই। ঠিকমত বেতন-ভাতা দেয়া হয় না। এরপরও অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়। যে আমানবিক বিষয়টি আজ সবার নজরে এসেছে তা হচ্ছে সাভারে ধসে যাওয়া ভবনের মধ্যে দুইজন মা সন্তান প্রসব করেছেন। যেখানে সরকারিভাবে ঘোষিত নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস, সেখানে সন্তান প্রসবের আগের দিনও একজন নারীকে গার্মেন্টস-এ কাজ করতে হয়েছে। এর চেয়ে নির্মমতা এর চেয়ে পৈশাচিকতা আর কি হতে পারে? আজ তাই বলতে হচ্ছে ‘ধরণী তুমি দ্বিধা হও’।
দরিদ্রের রক্তে ধনীদের কোমল পানীয় পান : অসহায় দরিদ্র মানুষগুলোর রক্ত আর ঘামের বিনিময়ে ধনীরা কোমল পাণীয় পান করেন আর তাদের শোষণ করেন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এ দেশের মানুষের দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে। এখানে খেটে খাওয়া মানুষেরা প্রতারিত হচ্ছেন। শুধু রক্ত আর ঘাম শুষে নিয়ে মালিকেরা টাকার পাহাড় গড়ছেন আর এখন তারা প্রাণটাও কেড়ে নিচ্ছেন। শিল্প মালিকদের লোভের অগ্নিশিখায় সব জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস মালিকদের সম্মিলিত ফোরাম থাকলেও দুর্ঘটনা ঘটলে সম্মিলিত উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা তাদের হাতে নেই। তারা সংগঠন গড়ে তুলেছে শুধু দরিদ্রের রক্ত শোষণ করে ধনী হওয়ার জন্য। নয় তলা ভবনটির বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বাঁচার আকুতি ভেসে আসছে; কিন্তু উদ্ধারকর্মীরা তাদের লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতে পারছে না। উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবের কথাও বারবার উচ্চারিত হয়েছে। পর্যাপ্ত সার্চলাইট পাওয়া যায়নি, যদিও অনেক সাধারণ মানুষ নিজেদের তরফ থেকে এ ধরনের লাইট সরবরাহ করেছেন। আটকে পড়া শ্রমিকেরা অক্সিজেন সঙ্কটে পড়েছেন। তাৎক্ষণিক উদ্ধার করতে না পারলেও অক্সিজেন সরবরাহ করার মাধ্যমে জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়।
দেখা গেল পর্যাপ্তসংখ্যক অক্সিজেন মাস্ক পাওয়া যায়নি। সরবরাহকৃত যন্ত্রগুলো ছিল ত্রুটিযুক্ত। একটি দক্ষ অভিজ্ঞ উদ্ধার বাহিনীর সাথে সাথে প্রয়োজনীয় পরিমাণ উদ্ধার-সরঞ্জাম সরবরাহ করা গেলে প্রাণহানি কমানো যেত, উদ্ধার তৎপরতাও আরো গতি পেত। পোশাক শিল্প মালিকরা নিজেদের স্বার্থের বেলায় কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের মানসিকতা সব সময় নেতিবাচক মনোভাব আমরা দেখেছি। এখন দেখা যাচ্ছে, এ খাতটিকে সম্ভাব্য দুর্যোগ থেকে বাঁচানোর জন্য তাদের কোনো প্রস্তুতিও নেই। অথচ এ খাতের ব্যবসায়ীরা সম্মিলিতভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য একটি ফোর্স গড়ে তুলতে পারতো। কিন্তু তারা তা করেননি।
সরকার দায় এড়াতে পারে না : সরকারের পক্ষ থেকে গার্মেন্টস সেক্টরের অন্যায়, দুর্নীতি, অসাধুতা প্রতিরোধে যে ধরনের তদারকি দরকার ছিল তার কিছুই ছিল না এখানে। উল্টো ভবন মালিক সরকারদলীয় ক্যাডার হওয়ায় তিনি প্রশাসনের লোকজনকে থোরাই কেয়ার করতেন। শিল্প পুলিশের নিষেধ উপেক্ষা করে গার্মেন্টস চালু করাই তারা প্রমাণ। সরকারের ছত্রছায়ায় এভাবেই প্রতিটি জায়গায় অন্যায় হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটার পরেও সরকারি উদ্ধার তৎপরতায় আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জোগান সবকিছুতে ছিল প্রচ- রকম অভাব। সব মিলিয়ে এ দুর্ঘটনায় সরকার কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না।
সরকারের পদত্যাগই সমাধান : অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সকল সেক্টরে সরকারের অন্যায় অগণতান্ত্রিক আচরণ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর দলীয় করণের কারণে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। ব্যর্থ দুর্নীতিবাজ সরকারের দেশ পরিচালনার চেয়ে দলবাজি এবং ক্ষমতাবাজিই এখন প্রধান লক্ষ্য। তাদের অবৈধ বাসনার বলি হচ্ছে অসহায় বনি আদম। আজ সর্বত্র দুঃখক্লিষ্ট, নির্যাতিত অসহায় মানবতার আহাজারি। তাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে আছে। সরকারের অন্যায় এবং দুর্নীতির বলি হচ্ছে অসহায় মানুষগুলো... দিনে দিনে বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইব ঋণ... এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের পদত্যাগই একমাত্র সমাধান। ঢাকা, ২৭ এপ্রিল, ২০১৩। মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, সারুলিয়া, ডেমরা, ঢাকা।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads