সাভারের যুবলীগ নেতার রানা প্লাজার ধ্বংসের শোক এখনও মুছে যায়নি। ছয় শতাধিক গার্মেন্ট কর্মীর লাশ ইতিমধ্যেই উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রের সাহায্যে এক একটি লাশ সরাচ্ছেন, আর বেরিয়ে আসছে ডজন ডজন মানুষের কঙ্কাল। তাদের আর শনাক্ত করা সম্ভব নয়। এখনও স্বজনদের আহাজারিতে সাভারের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। প্রিয়জনের ছবি হাতে আর্তনাদ করছে মানুষ। জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই। কঙ্কাল চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। মানুষের এই আর্তনাদ সারা দেশে বিস্তৃত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রানা প্লাজার গার্মেন্ট কারখানায় ভাগ্যান্বেষণে এসেছিলেন এই পাঁচ হাজার লোক। সেসব গ্রাম-জনপদে কান্নার রোল উঠেছে। স্বজনেরা কাঁদছেন। পাড়াপ্রতিবেশী, গ্রামকে গ্রাম অশ্রু মুছে দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। সরকার এর হোতাদের রক্ষার জন্য ব্যতিব্যস্ত। ভবনের তিন তলার পিলার ধসে খানিক নিচে বসে গিয়েছিল। শিল্পাঞ্চল পুলিশ ও পরিদর্শকরা এসে বলেছিলেন, এ ভবন ব্যবহারের অনুপযুক্ত। অবিলম্বে মানুষ সরিয়ে নিন। কাল থেকে আর যেন কেউ যেন না ঢোকেন। সেটি গত মাসের ২৩ তারিখের ঘটনা। কিন্তু রানা প্লাজার মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা কতগুলো ভুয়া লোককে ইঞ্জিনিয়ার সাজিয়ে এনে গার্মেন্ট মালিক ও শ্রমিকদের এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, এ ভবন আগামী ১৫/২০ বছরেও কিছু হবে না। নিজেও সাংবাদিকদের জানালেন যে, সামান্য প্লাস্টার খসে গেছে। আর কিছু হয়নি।
কিছু হয়নি বটে। তবে দরিদ্র সাধারণ মানুষের লাশের ভার ধ্বংসস্তূপ যেন আর বইতে পারছে না। এর মধ্যেও সরকার অবিরাম বলে যাচ্ছে যে, বিরোধী দল লাশের রাজনীতি করে। মানুষ হত্যাই তাদের কাজ। এতো রক্তাক্ত মুখ নিয়ে বিরোধী দলকে হত্যাকারী বলতে দ্বিধা করছে না সরকারের লোকেরা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার অত্যন্ত নির্বিকারভাবে নিজেরা খুন বা গুম করে বিরোধী দলের উপর দায় চাপাতে ভারী ওস্তাদ। কিন্তু তার মহাজোটের বড় শরীক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কৌশলগত কারণে সরকারের বহুনীতির সমালোচনা করছেন। এটা ঠিক না, ওটা ঠিক নাÑ এসব কথা বলছেন। তার মনে এখনও সম্ভবত ক্ষীণ আশা আছে, বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচন হবে। আর যদি তা হয় তাহলে তিনিই হবেন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিরোধী দলের নেতা। অর্থাৎ শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ সরকারকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেবার পরিকল্পনার অংশ। যেভাবে ১৯৮৬ সালে শেখ হাসিনা এরশাদকে বৈধতা দেয়ার জন্য “জাতীয় বেঈমান” হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং এরশাদ সরকারের বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে গাড়িতে পতাকা তুলে দৌড়ঝাঁপ করেছেন।
তা সত্ত্বেও বলতে হয় যে, এরশাদকেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতেই হচ্ছে। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই। তার এই ফটকাবাজি জনগণ যে বোঝে না, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। তিনি সাভারের হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করেছেন। দোষীদের শাস্তি দাবি করেছেন। কোনো কারণেই এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে, এরশাদ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখেন। ফলে রাজনীতিতে তিনি যে ক্লাউন তেমন ক্লাউনই থেকে যাবেন। তারপরও যেন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে, এরশাদ বোধ হয় শেখ হাসিনার বিপরীতে জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
সে যাই হোক। বলছিলাম সাভার ট্রাজেডি নিয়ে। এত মানুষের মৃত্যুতেও বাংলাদেশের সরকারের বুক কাঁপেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা সাভারের রানা প্লাজার ভবনের কলাপসিবল গেট ও পিলার ধরে নাড়াচাড়া করার জন্যই ভবনটি ধসে পড়েছে। এ মন্তব্য নিয়ে সাধারণ মানুষ ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা কত কথা যে বলেছেন, কত ছবি যে এঁকেছেন, তার কোনো সীমানা নেই। এর মধ্যে আবার আউলা-ঝাউলা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আরও দারুণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, সাভারের গার্মেন্ট হত্যাকা- এমন কোনো বড় ঘটনা নয়। যেভাবে তিনি বলেছিলেন যে, হলমার্কের চার হাজার কোটি টাকার অর্থ জালিয়াতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কোনো ব্যাপারই না। এই প্রায়-উন্মাদ লোক সম্পর্কে বেশি কিছু বলার নেই। আমাদের গ্রামাঞ্চলে একটি প্রচলিত কথা চালু আছে, লোকটাকে বাহাত্তরে পেয়েছে। তার অর্থ বাহাত্তর বছর বয়স হলে একটি লোকের চিন্তাশক্তি ও বিবেচনা ক্ষমতা সম্ভবত মরে যায়। আমি তার বিজ্ঞানসম্মত হিসাব আবিষ্কার করার চেষ্টা করিনি। কিন্তু এটাই প্রচলিত প্রবাদ মুহিতের এসব হাবিজাবি বিবেচনার দাবি রাখে না।
সাভারের শোক এখনও চলছে। মানুষের কাতর আর্তনাদ এখনও বাতাসে ভাসছে। আমরা নাগরিকরা কেবলই ব্যথিত হচ্ছিলাম। সম্ভবত এর বাইরে আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। যারা পেরেছি জামা কাপড় দিয়েছি। পানি কিংবা খাদ্য দিয়েছি। তারা আমরা সাধারণ মানুষ। এর বাইরে সম্ভবত সাধারণ মানুষের আর বেশি কিছু করার ছিল না। এমনকি সাভারের উদ্ধার কাজে যারা দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেছেন, তার বেশিভাগই সাধারণ মানুষ। যেখানে সেনাবাহিনী যেতে পারেনি, সেখানে গিয়েছে সাধারণ মানুষ। হাতটা কেটে ফেললে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়। সেটা দেখে এসে চিকিৎসকের কাছ থেকে অ্যানেসথেসিয়া দেয়া ও হাতকাটার তৎক্ষণাৎ শিক্ষা নিয়ে তারা গিয়ে জীবিত উদ্ধার করেছে অনেক মানুষকে। বাংলাদেশের সহস্র বছরের ইতিহাস এমনই। তারা পরস্পরের বিপদে এভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মৃত্যুকেও পরোয়া করেনি। এটাই বাংলাদেশের জনপদের বৈশিষ্ট্য।
সাভারের উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি। সেখান থেকে প্রতিদিন বেরিয়ে আসছে ডজন ডজন কঙ্কাল তাদের শনাক্ত করার কোনো পথ নেই। এর মধ্যেই ঘটে গেছে এদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম আর এক হত্যাকা-। অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম সংবিধানে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের দাবিসহ ১৩ দফা দাবিতে সংগঠনটি এক মাস সময় দিয়ে ঢাকা অবরোধের ডাক দেয়। এই ডাকে সাড়া দিয়ে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এসে জমা হয়। তারা ঘোষণা করেছিল, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শাপলা চত্বরে অবস্থান করবে। সরকার সতর্ক করে দিয়েছিল যাতে তারা সন্ধ্যার আগেই এলাকা ত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু শাপলা চত্বরে অবস্থানকারী নেতারা বলছিলেন যে, তাদের নেতা আল্লামা শাহ আহমদ শফী এসে যে ঘোষণা দেন সে ঘোষণা অনুযায়ী তারা কাজ করবেন। লালবাগের মাদরাসায় প্রায় অবরুদ্ধ হয়েছিলেন আল্লামা আহমদ শফী। বিকাল থেকে কার্জন হল, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, পুরানা পল্টন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। টিয়ারশেল-গুলী-বোমায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল গোটা এলাকা। লালবাগ থেকে তাই ৯৩ বছর বয়সের আল্লামা শফীর পক্ষে সমাবেশস্থলে নিরাপদে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে সমাবেশস্থলে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পলাশীর মোড় থেকে তাকে আবারো লালবাগ মাদরাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
কিন্তু লাখ লাখ মানুষ শাপলা চত্বরে অবস্থান করতে থাকেন। তাদের অন্য নেতারা অবিরাম বক্তৃতা করতে থাকেন। অনেকে আবার ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। ঠিক এরকম সময়ে হাজার হাজার র্যাব-পুলিশ-বিজিবি অবিরাম টিয়ার শেল ও গুলীবর্ষণ করতে করতে ওই সমাবেশের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। রক্তে ভেসে যায় শাপলা চত্বর। মানুষের আর্তনাদ মুহুর্মুহু মেশিনগানের গুলীতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এই ধর্মপ্রাণ নিরস্ত্র নিরীহ মানুষেরা। সেভাবেই তাদের উৎখাত অভিযান চলে ভোর পর্যন্ত। পুলিশের তরফ থেকে বলা হয় এই অভিযানে মাত্র সাত ব্যক্তি নিহত হয়েছে। হেফাজত ইসলামের পক্ষে দাবি করা হয় যে, নিহত হয়েছেন তিন সহস্্রাধিক নিরীহ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি গণহত্যা। এই গণহত্যা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে পাক বাহিনী গণহত্যার চেয়েও ভয়াবহ। একে গণহত্যা বলে অভিহিত করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন মহাজোটের শরীক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী নিহত হয়েছেন কমপক্ষে আড়াই হাজার মানুষ।
সরকার সম্ভবত এর গভীরতা অনুমান করতে পারেননি কিংবা এই হত্যাযজ্ঞের পরিণাম কী হতে পরে সে বিষয়ে সজাগ নয়। কিন্তু প্রমাণ মিলল পরদিনই। পরদিন কাঁচপুর, হাটহাজারী ও বাগেরহাটে র্যাব-পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা গেছেন কমপক্ষে আরো ২৯ জন। তার মধ্যে পুলিশও আছে। এ আলেমদের সঙ্গে প্রতিবাদে জড়িয়ে পড়েন সাধারণ মানুষও। সংঘর্ষ সংঘাতের এখানেই শেষ এটা ভাববার কোনো কারণ নেই। এ আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে। সে আগুনের আঁচ থেকে সরকারও রেহাই পাবে বলে মনে হয় না।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন