রোববার রাত আড়াইটায় মতিঝিল শাপলা চত্বরে চালানো হলো ‘অপারেশন মিডনাইট’। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি আর সরকারদলীয় ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলার মুখে মতিঝিল ছেড়েছে হেফাজতে ইসলামের নিরস্ত্র হাজার হাজার নেতা-কর্মী। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, যৌথ বাহিনীর গুলী, টিয়ারশেল, সাউন্ডগ্রেনেড ও রাবারবুলেট হামলায় হেফাজতের তিন হাজার নেতা-কর্মী শাহাদাত বরণ করেছেন। এ সময় দশ সহ¯্রাধিক ব্যক্তি আহত ও অসংখ্য নিখোঁজের ঘটনাও ঘটে। এই অপারেশন মিডনাইটকে বিরোধীদল, পর্যবেক্ষক মহল, সুধী সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠন গণহত্যা অভিযান বলে অভিহিত করে। এই অভিযানে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারিভাবেও কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে যৌথ অভিযানের ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ।
মিডনাইট অপারেশনের মতো এমন অভিযান বাংলাদেশে আর কখনো পরিচালিত হয়নি। ইতিমধ্যেই যা প্রকাশ পেয়েছে, তাতে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। এই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। গণতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন দল-মত থাকে। সবাই তাদের মতামতের পক্ষে সভা-সংগঠন করার অধিকার রাখে। অবশ্য এই অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে সহিষ্ণুতা ও আইনশৃঙ্খলার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হয়। আর আইনশৃঙ্খলার প্রতি বিরোধীদলের সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশ বিধিসম্মত আচরণের বদলে বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করায় এই বাহিনীর সুনাম ক্ষুণœ হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী দলকে দমন-অবদমন করতে গিয়ে পুলিশ যে নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করেছে। অপারেশন মিডনাইট সেই ক্ষোভের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের মতো একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের নিরস্ত্র নেতা-কর্মীদের ওপর রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীর এমন সশস্ত্র যৌথ আক্রমণের আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল কি না সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। শাপলা চত্বরে ৫ মে’র সমাবেশই হেফাজতের প্রথম সমাবেশ নয়, এর আগেও সেখানে হেফাজতের লাখ লাখ নেতা-কর্মীর সমাবেশ হয়েছে। শান্তিপূর্ণ সেই সমাবেশের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এবারও আমরা শাপলা চত্বরে হেফাজতের লাখ লাখ নেতা-কর্মীর শান্তিপূর্ণ সমাবেশের চিত্র লক্ষ্য করেছি। তবে এবার অন্যচিত্রও লক্ষ্য করা গেছে। হেফাজতের বিশাল সমাবেশের প্রান্তসীমা পল্টনে, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সংলগ্ন এলাকাসহ আরো কিছু জায়গায় শাপলা চত্বরগামী হেফাজত কর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। হেফাজতের মঞ্চ থেকে বারবার ওইসব হামলার ঘটনায় কর্মীদের ধৈর্য ধরার ও পুলিশের সহযোগিতা কামনা করা হয়। কিন্তু কাক্সিক্ষত সেই সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। বরং একপর্যায়ে সরকারি দলের সশস্ত্র ক্যাডার ও পুলিশের যৌথ আক্রমণের মোকাবিলা করতে দেখা গেল হেফাজতের নেতা-কর্মীদের। কিছু লাঠি আর পাথর দিয়ে তো আগ্নেয়াস্ত্রের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ফলে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। এমন দৃশ্যে বিক্ষুব্ধ কিছু কর্মী ভাংচুর ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। অগ্নিসংযোগের কিছু ঘটনাও লক্ষ্য করা যায়। তবে এসব ঘটনায় কারা কিভাবে জড়িত হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। পত্র-পত্রিকায় নেতিবাচক ঘটনাগুলোতে সরকারি দলের ক্যাডারদের জড়িয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঐদিন যেসব ধ্বংসাত্মক কর্মকা- সংঘটিত হয় তাতে নানা রহস্যের আভাস পাওয়া যায়। জানি না সেই রহস্যের আবরণ কখন উন্মুক্ত হবে।
হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে শাপলা চত্বরে যে ট্র্যাজেডি ঘটে গেল তা কখনও জাতির কাম্য হতে পারে না। না চাইলেও জাতীয় জীবনে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে যায়। জাতীয় স্বার্থেই অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি থেকে জনগণকে উদ্ধারের কাজে এগিয়ে আসতে হয় দেশপ্রেমিক, রাজনীতিবিদ ও মিডিয়াকে। আর এই কাজটি করতে হলে দলকানা না হয়ে বরং ন্যায়ের চেতনায় বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের অনেক রাজনীতিবিদ ও মিডিয়া কাক্সিক্ষত দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসছে না। বরং প্রকৃত অবস্থাকে অস্বীকার করে দলকানা দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা এখন যে ভূমিকা পালন করছেন, তাতে জাতীয় জীবনে অন্ধকারের মাত্রা আরো বেড়ে যেতে পারে। প্রসঙ্গত সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফের বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, মতিঝিল থেকে হেফাজত কর্মীদের সরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তার এই বক্তব্যের সাথে দেশীয় মিডিয়া, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার বক্তব্য মিলছে না এবং শাপলা চত্বরসহ আশপাশ এলাকার পরিবেশ ও শাপলা চত্বর তড়িঘড়ি ধুয়ে দেয়ার ঘটনা মিলছে না। অপারেশন মিডনাইটের ঘটনায় দেশে এক শ্রেণীর মিডিয়া দলকানা চেতনায় যেভাবে উৎফুল্ল হয়েছে এবং বস্তুনিষ্ঠ চেতনার বদলে যেভাবে হেফাজতের নেতাকর্মীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে চরিত্র হননের প্রয়াস পেয়েছে সেই কথাও প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে হয়। দলকানা মানুষদের ব্যাপারে জনগণ খুবই হতাশ। এখন সেই তালিকায় যদি মিডিয়ার লোকজনও নাম লেখায় তাহলে জনগণ আশাবাদী হবে কেমন করে? আমরা মনে করি, জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। যার যা ভুল হয়েছে তা স্বীকার করে সংশোধনের পথে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে সরকারি দলের দায়িত্বটাই বেশি। প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, হিংসা হিংসাকেই ডেকে আনে। তাই হিংসা যে কোনো সমাধানের পথ নয় সে বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন