মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৩

শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়ার মধ্যে দূরত্বের কারণ


১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশের বেশির ভাগ মানুষের বিশ্বাস ছিল, সম্মিলিত বিরোধী দলের সাত দফার আলোকে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের ঐকতানের এক নজির সৃষ্টি হবে। জনগণের এ প্রত্যাশার ওপর প্রথম আঘাত আসে, যখন ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠিত হলো।

কারণ বাস্তবে দেখা গেল, সে সরকার সংসদীয় গণতন্ত্রের নীতিমালা মেনে বিরোধী দলকে আস্থায় নিতে তেমন প্রস্তুত নয়। বরং বিভিন্ন কলাকৌশলে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে পদক্ষেপ নেয়া হলো। পরিণামে হাসিনার নেতৃত্বে বিরোধী দল শুধু যে আন্দোলনে মেতে উঠল তা-ই নয় বরং নেতিবাচক অবস্থানে চলে গেল। এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, আওয়ামী লীগ কখনোই সঠিক অর্থে সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেনি। এ কারণে দেখা যায়, সংসদে বিরোধী দলের গঠনমূলক আলোচনা, সমালোচনা এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কর্মসূচির বিপরীতে বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন থেকে হয় স্বেচ্ছায় বিরত ছিল অথবা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যা হোক, ১৯৯৪ সালের সংসদ থেকে একযোগে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে।
সে সময়ের প্রধান দাবি ছিল, পরবর্তী নির্বাচনগুলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত হতে হবে। প্রথমে যদিও খালেদা সরকার এর বিপরীতে অবস্থান নেয়, পরে বাস্তবতার ওপর নির্ভর করেই ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলটি সংসদে পাস করা হয়। অথচ শেখ হাসিনা নবম সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটে ২০১১ সালে সংবিধান ও গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ (প্রয়োজনে আরো দুই মেয়াদের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার রাখা যেতে পারে) উপেক্ষা করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থাকে বাতিল করে দিলেন।
একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটে যখন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয় এবং বিএনপি বিরোধী দলের অবস্থানে চলে যায়। বিএনপি ক্ষমতা থাকা অবস্থায় যা যা করেছে সে রকম, অথবা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়ে বেশি নেতিবাচক অবস্থানে চলে যায় আওয়ামী লীগ। আবারো বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রে অপাঙ্ক্তেয় বলে বিবেচিত হলো। একই ধারাবাহিকতায় তৃতীয়বারের মতো যখন বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়, তখন এমনভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রের গোড়ায় হাত দিলো যাতে গণতন্ত্রের বিকাশ ও ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রতিযোগিতামূলক সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় অথবা বিরোধীদলীয় অবস্থানে থাকা অবস্থায় ুণœ করছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলিক রাজনৈতিক বিষয়ের চেয়ে নেতানেত্রীদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো অধিক গুরুত্ব পেয়ে যায়। এর কারণ, দল ও সরকার পরিচালনায় নেতানেত্রীর একক কর্তৃত্ব ও প্রাধান্যের বিস্তৃতি। বর্তমানে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার অবস্থানটি হলো এমন যে, একে অপরের চেহারা পর্যন্ত দেখতে প্রস্তুত নন। এ যেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি অভূতপূর্ব সংযোজন, যা একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব। এখানে নেতানেত্রীদের গুণগান করা ও চর্বিত চর্বণ রাজনীতিতে একটি মৌলিক উপাদান বলে বিবেচিত। দলীয়পর্যায়ে ধরে নেয়া হয় যে, নেতানেত্রীরা সব ধরনের লোভ-লালসা ও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। তারা যা কিছু করেন নিঃস্বার্থভাবে এবং জনগণ ও দেশের কল্যাণের জন্য করেন, যদিও বাস্তব চিত্রটি অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীত। নেতানেত্রীকে দুধে ধোয়া তুলসীপাতা বলে পরিগণিত ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাদের ভুলত্রুটি অন্য কোনো না কোনো ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। ভাবখানা এমন যে, নেতানেত্রীরা ওই সব অপকর্ম নিজেদের ইচ্ছায় করেননি, করেছেন মন্দ লোকের কুবুদ্ধিতে। তাই বিচার যদি হয়, তবে হবে ‘মন্দ’ লোকদের; নেতাদের নয়।
এরূপ একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে বাংলাদেশের রাজনীতি, যার মূল অবস্থানে রয়েছে দুই নেত্রী। দলগতভাবে এবং জনসমর্থন প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত দু’টি রাজনৈতিক দল। দুই দলের আদর্শ ও কর্মসূচির মধ্যে স্বাভাবিক কারণে ব্যবধান ও পার্থক্য থাকবে। তবে সব কিছুকেই ছাড়িয়ে আজ যে সত্য জাতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা হলো দু’টি দলই নিজ নিজ নেত্রীর ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে রাজনীতির অংশ বলে বিবেচনা করছে। আর এ কারণে দুই নেত্রীর মধ্যে দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। কোথায় এর শেষ তা কেউ বলতে পারে না। জাতি আজ এক মহারাজনৈতিক প্রলয়ের মুখোমুখি।
ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার বিশ্বাস, অন্তত তিনটি কারণে তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে কোনো ছাড় দেবেন না। কারণগুলো হলোÑ ক. তিনি (খালেদা জিয়া) কী কারণে হঠাৎ নিজের পূর্বঘোষিত জন্মতারিখকে অস্বীকার করে নতুনভাবে ১৫ আগস্টকে তার জন্মদিন বলে ঘোষণা দিলেন? কারণ তিনি ভালো করেই জানেন, এই দিনে শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার-পরিজনসহ সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সে দৃষ্টিকোণ থেকে এ দিনটি বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক বলে ধরে নেয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিষয়টি শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের জন্য মেনে নেয়া সহজ নয়। খ. ১৯৯৬ সালে হাসিনা সরকারের আমলে তার ছোট বোন এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানাকে ধানমন্ডির ৬ নম্বর সড়কে একটি বাড়ি লিজ দেয়া হয়। খালেদা জিয়া ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর লিজ বাতিল করে দেন এবং সেখানে তিনি ধানমন্ডি থানার ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন। বিষয়টি হাসিনা ও রেহানাকে ব্যক্তিগতভাবে মর্মাহত ও বিব্রত করে। গ. শেখ হাসিনার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে কোনো-না-কোনোভাবে তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের যোগসাজশ ছিল। সে কারণেই পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের অন্যতম বেনিফিশিয়ারি হিসেবে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান ও তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি। হাসিনা আরো বিশ্বাস করেন যে, বিএনপি ক্ষমতা থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালে তাকে হত্যা করার জন্য গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ছিল। তাই হাসিনাকে হত্যা করা এবং রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়া সে দলের রাজনীতির একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ।
অপর দিকে যে কয়টি বিষয়ে খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে নাড়া দিয়েছে তা হলোÑ
ক. দীর্ঘ দিন ধরে যেখানে তার বসবাস, সেই ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করে দেয়া। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে, তবুও খালেদা জিয়ার বিশ্বাসÑ এর পেছনে হাসিনার ভূমিকাই ছিল মুখ্য। এটি তাকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করেছে। তিনি মনে করেন, এ ধরনের জঘন্য ও হীন কার্যকলাপকে কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। খ. খালেদা জিয়া এবং তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, যাতে তিনি রাজনীতিতে অচল হয়ে পড়েন এবং তার সন্তানদ্বয় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে না পারে। তারেক রহমান শুধু তার সন্তানই নন, তিনি বিএনপির ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি এবং যদি বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় যেতে পারে তবে তিনিই হবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাই সন্তানদের ব্যাপারে হাসিনা সরকারের নীতিমালা খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত করেছে এবং তিনি বেদনার জ্বালায় দগ্ধীভূত হচ্ছেন।
উপরি উক্ত বিষয়গুলো শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগকে নিয়ে এসেছে একেবারেই শূন্যের কোঠায়। শীর্ষ নেত্রীদের এ বিরোধ প্রকারান্তরে দলীয় বিরোধে রূপান্তরিত হয়েছে। যদি হাসিনা ও খালেদা তাদের দূরত্বের ব্যক্তিগত কারণগুলোকে দূর করে অথবা পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসেন, তবে বলা যায় বাংলাদেশের রাজনীতি দুই নেত্রীর ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার গণ্ডিতে ঘুরপাক খাবে না। এটা বাংলাদেশের মতো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।
সময় দ্রুত এগিয়ে চলছে। কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় দুই নেত্রীকে সংলাপের টেবিলে বসানো যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা একটি দুরূহ বিষয়ই বটে। যদিও ব্যাপারটি পুরোপুরি রাজনৈতিক, তার পরও অরাজনৈতিক মধ্যস্থতায় যে তা সম্ভব হতে পারে সে বিষয়ে একটি সুন্দর প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক সিনহা আবুল মনসুর। হুমায়ূন আহমেদের ওপর তার রচিত তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণাধর্মী এবং ব্যাপকভাবে আলোচিত গ্রন্থ হুমায়ূন : একজন হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালায় তিনি উল্লেখ করেছেন, মরহুম হুমায়ূনকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনাকে যদি দুই নেত্রীর মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নিতে বলা হয় তাহলে কী করবেন?’ উত্তরে হুমায়ূন বলেছিলেন : ‘আমি দুই নেত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে বলব, আপনারা এক ঘণ্টার জন্য আমাকে সময় দেন। আমার নূহাশ পল্লীতে আপনারা একবার এসে এক কাপ চা খান। তারপর জায়গা একটু ঘুরে ফিরে দেখেন। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। আমি নিশ্চিত, এই অল্প সময়ের মধ্যে দুই নেত্রীর মধ্যে ভাব হয়ে যাবে। কারণ তারা দু’জনেই খুব ভালো মানুষ। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাদের দুই পরিবারেরই অবদান আছে। দু’জনই দেশকে ভালোবাসেন। কিছু সময়ের জন্য তারা একসাথে হলেই তাদের মধ্যে মিলমিশ হয়ে যাবে। দু’জন মিলে তখন দেশ গড়ার উদ্যোগ নেবেন। তখন আর আমাদের দেশকে ঠেকায় কে? দেখবে ধেই ধেই করে বাংলাদেশ কোথায় চলে যাবে।’ হুমায়ূনের এই অনুভূতির ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে লেখক আবুল মনসুর পরক্ষণেই লিখেছেন, ‘পাঠক, সাহিত্যের সমীকরণের মতো রাজনীতির সমীকরণ অত সহজ নয়! তার পরও হুমায়ূন নৈরাশ্যবাদী ছিলেন না। প্রচণ্ড অন্ধকারের মধ্যেও দেখতেন দীপশিখা। বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশের অসীম সম্ভাবনায়।’ (পাতা ৪১-৪২)।
বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুদৃঢ় ও সুসংহত করা। এর মধ্য দিয়েই রচিত হবে বিরোধী দলের মূল্যায়ন এবং যুগোপযোগী কর্মকাণ্ডের ধারা। রচিত হবে সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন দলের গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ধারা। রচিত হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপর জাতীয় ঐকমত্যের ধারা। রচিত হবে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশের ধারা। এর মধ্য দিয়েই সূচিত হবে নতুন প্রজন্মের জন্য বাস্তবভিত্তিক আশার আলো, যার লক্ষ্য হলোÑ ধীরে ধীরে সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তবে সব কিছুর মূল কথা হলো, দুই নেত্রীকে অবশ্যই যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রনায়কসুলভ চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজেদের দূরত্ব কমিয়ে আনার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads