প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ২ মে ডাকা হরতাল স্থগিত করেছেন জোটপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া। এতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের প্রতি তিনি যে উদারতা দেখিয়েছেন তা অভিনন্দনযোগ্য। এটি আমাদের সবার জন্য আজ অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। শুধু তা-ই নয়, এর মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকে যথাযথ সম্মানও দেখিয়েছেন। তার এই মহানুভবতার জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিরোধী দলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন তার অনুরোধে সাড়া দেয়ায় এবং হরতাল প্রত্যাহার করায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ গত মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন। এতে আমরা সাধারণ জনগণ বেশ খুশি। জাতি আজ দেশের এই ক্রান্তিকালে তা-ই আশা করে উভয় দল থেকে।
রাজনৈতিক এত উত্তাপ ও অস্থিরতার মধ্যে উভয় দলের এই মনোভাব আমাদের আশার সঞ্চার করে। তবে এবার আমরাও প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাবো বিরোধী দলের আহ্বানে আন্তরিক সাড়া দিতে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াও সেটা চেয়েছেন উদার মনে। তিনি বলেছেন আমরা যেভাবে জাতীয় স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছি, আশা করি জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীও সেভাবে সাড়া দেবেন, সংলাপ ও আলোচনায় উদ্যোগী হবেন। কী সুন্দর আহ্বান বিরোধীদলীয় নেত্রীর! তাই তাকে জানাই আবারো সশ্রদ্ধ অভিবাদন ও সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ।
এখন যদি প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বানে সাড়া দেন তাহলে দেখা যাবে সংলাপে বসার একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। এখন আমাদের প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী এতে সাড়া দেবেন কি? সংলাপ তো সবাই চায়। আলোচনার মাধ্যমেই তো সব সঙ্কটের সমাধান হয়। সরকারদলীয় লোকেরাও বোঝেন, সংলাপ ও ঐকমত্য ছাড়া এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। সেটা আজ হোক কাল হোক, সংলাপ বা আলোচনার একটি পথ খুঁজে বের করতেই হবে। এটাই উত্তম সময় সংলাপে বসার উভয় দলের জন্য। উভয় প থেকে কিছুটা হলেও মৃদু সাড়া পাওয়া গেছে। দীর্ঘ দিনের উষ্ণতা, দীর্ঘ দিনের নীরবতা ও সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে এটি শুভলণ ও ইতিবাচক দিক বলে মনে হয়।
তবে উভয় দলকে বেশ কিছু ছাড় দিতে হবে; নইলে ল্েয পৌঁছানো কষ্টকর হবে। তবে সরকারি দলকে এ েেত্র অনেক উদার হতে হবে, অনেক নমনীয় হতে হবে। অনেক ছাড়ও দিতে হবে। কারণ এরা মতায় আছেন এবং তাদের কাছে সংলাপে বসার উপযুক্ততাও আছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে এটাই হয়। জেদ বা অনমনীয়তা কোনো দলের জন্য মঙ্গল আনবে না। জনগণ এতে তিগ্রস্ত হবে অনেক বেশি; এর মধ্যে অনেক হয়েছেও। আর তি নয়। এতে সঙ্ঘাত ও নৈরাজ্য আরো বেড়ে যাবে। এমনকি সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। তাই বলা দরকার শুধু উভয় দল নয়, জাতীয় পার্টিসহ ছোট-বড় অন্যান্য দলকেও সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে। এতে সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এটিই হচ্ছে গণতান্ত্রিক নিয়ম বা প্রক্রিয়া, যা আগামী দিনে নির্দলীয় নিরপে নির্বাচনের জন্য এটিই হবে উত্তম রোডম্যাপ। তাই তো বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ড মিল মহামতি বুদ্ধের মতো কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য অধিক জনগণের অংশগ্রহণ ও অধিক মানুষের সুখের কথা বলেছিলেন। তার ভাষায় তিনি বলেছিলেনÑ Greatest happiness for the greatest number of the people| আমাদের দেশের এই মুমূর্ষু অবস্থায় তার
বুঝি না, সংলাপে যেতে সরকারি দলের অসুবিধা কোথায়? অযথা কেন কালপেণ করা হচ্ছে? সংলাপ, সমঝোতা, ঐকমত্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা এই গুণগুলো তো গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। এগুলোকে বাদ দিয়ে কিছুই করা যাবে না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারও হবে না। শুধু মুখে মুখে আমরা গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালে চলবে না। এটাকে কার্যকর ও ক্রিয়াশীলও করতে হবে। যদি করতেই হয় তাহলে ওই গুণগুলোর প্রয়োজন রয়েছে অনিবার্যতায়। নেবে কে এ দায়িত্ব? নিতে হবে এ দায়িত্ব আমাকে, আপনাকে, সরকার ও বিরোধী দলকে।
অতীতের ঘটনা কি আমাদের মনে নেই? জোর করে কোনো কিছু করলে এর পরিণাম হয় ভয়াবহ। সরকারি দল শক্তি প্রয়োগে অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু এগুলো টেকে না বেশি দিন। অতীতের অভিজ্ঞতা তো আমাদের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে এর খেসারত দিতে হয় এ দেশের নিরীহ জনগণকে। এটা আমরা কখনো চাই না। দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোও বারবার সংলাপে বসার আহ্বান জানাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন এবং ইউরোপীয় কমিশন। জাতিসঙ্ঘের পাঠানো দূত এবং জাতিসঙ্ঘের দণি এশীয় প্রতিনিধি, এমনকি মহাসচিব বান কি মুন নিজেই এ প্রস্তাব দিয়েছেন। আমাদের বিরোধ আমাদেরই মেটাতে হবে। দেশকে সঙ্ঘাত ও সঙ্কটের দিকে ঠেলে না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি দাবি মেনে নিলেই শান্তিপূর্ণ একটি সহাবস্থান নিশ্চিত হয়। এ নিয়ে সরকারি দলের কোনো ধরনের অনীহা থাকা উচিত নয়। তাদের কাছে এত সংশয়ও বা থাকবে কেন? মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী একটু উদারতা দেখালে এবং মতাত্যাগের আর একটু সদিচ্ছা দেখাতে পারলে জাতি তার রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবে। নতুবা দেশের অবস্থা বড়ই ভয়াবহ হতে পারে বলে আমরা মনে করছি।
আমরা জানি মতায় থাকলে উদারতা দেখাতে হয়। ত্যাগী হতে হয়। এ কথাও চিন্তা করতে হবে, বিএনপি একটি প্রধান বিরোধী দল। এর শিকড় অনেক শক্ত এবং এ দেশের মাটিতে সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে। এর প্রতি সম্মান দেখানো সরকারি দলের অবশ্যই উচিত। বর্তমান বিরোধী দল একাধিকবার মতায় ছিল। তাই বিরোধী দলকে কোনোমতেই খাটো করে দেখা যাবে না। এদের আহ্বানকে অবজ্ঞা করাও যাবে না। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ চাই, পারস্পরিক নৈকট্য চাই। চাই পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতিও।
দেশ আজ নীরবে কাঁদছে। মতার জন্য অন্ধ হয়ে গেছি বলেই জাতির এই ক্রন্দন আমরা আজ শুনতে পাচ্ছি না। বর্তমানে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বড়ই করুণ। দেশের প্রধান অর্থ জোগানের খাত তৈরী পোশাক কারখানা আজ বন্ধ হওয়ার পথে। দেশে সব জায়গায় যেন একটা অস্থিরতার মহাবাষ্প ছড়িয়ে আছে। সম্প্রতি সংঘটিত ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে আমরা কি ভয়াবহ করুণ অবস্থা দেখতে পাই না? দুর্নীতি, হত্যা, গুম, জনগণের অধিকারহরণ, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং তাদের ধর্মীয় মন্দির-উপাসনালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোনো সভ্য দেশের সুস্থ রাজনৈতিক ধারা বলে দাবি করা যায় না। দেশে সুশাসন থাকলে তাহলে এগুলো হবে কেন? কেনই বা মানবতা ও মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে? কেন নিরীহ শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধদের ওপর আঘাত এসেছিল? এগুলো কারা সংঘটিত করেছিল? কাদের নেতৃত্বে এগুলো হয়েছিল? প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব ছিল কেন? বুদ্ধ তো কারো প্রতিপ ছিলেন না। কোনো ধর্মও তো কারো প-প্রতিপ নয়। রামু, উখিয়া ও পটিয়ার ঘটনা কী প্রমাণ করে? এতগুলো বৌদ্ধস্থাপনা, ঐতিহ্য ও বসতবাড়ি ধ্বংস হলো, জ্বলে গেল, পুড়ে গেল কিন্তু কোনো বিচার হলো না। প্রশাসনকে কোনো আইন বা বিচারের আওতায় আনা গেল না। এটা কেমন কথা? এতে বৌদ্ধরা সাংঘাতিক ক্রুুদ্ধ। সেখানকার জনগণ এখনো ভীতসন্ত্রস্ত। সে রকম দেশের নানা জায়গায় এখনো সংখ্যালঘুদের ওপর অনেক অনাকাক্সিত ঘটনা নিত্য ঘটে যাচ্ছে। প্রশাসন নীরব থাকবে কেন? সরকার এগুলো বন্ধ করতে পারছে না কেন? দেশ তো বিরোধী দলের নেত্রী চালান না। প্রশাসন তো বিরোধী দলের নেত্রীর নয়। চালায় বর্তমান সরকার। প্রশাসন তো সরকারের আদেশ-নির্দেশ মানতে বাধ্য। এমনকি তাদের জবাবদিহিতাও আছে সরকারের কাছে। তার পরও প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করবে এটা বুঝতে আমাদের বেশ কষ্ট হয়।
পদ্মা সেতু দুর্নীতি, হলমার্ক দুর্নীতি, সোনালী ব্যাংক দুর্নীতি এগুলোকে কি দুর্নীতি বলা যাবে না? বিশ্বজিৎ হত্যা কত নৃশংস ও নির্মম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যদি প্রশ্ন করি এগুলোকে কি সুনীতি বা সুশাসন বলা যায়? এ রকম আরো অনেক জানা-অজানা কত ঘটনা দেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাচ্ছে এর হিসাব কে দেবে? এ ঘটনা দেশ ও জাতিকে কলঙ্কিত করেছে। তবে হ্যাঁ, এটাও বলতে চাই বিএনপি সরকারের সময়ও যে দুর্নীতি-সন্ত্রাস হয়নি তা বলা যাবে না। আমি অবশ্য স্বীকার করি; হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন বিএনপি সরকার করেছে বলে আওয়ামী লীগ সরকারও করবে এটা তো হয় না। অনেকে বলে আওয়ামী লীগ অনেক আদর্শসম্পন্ন, অনেক ভালো। তাদের কথাকে যদি আমি মেনেই নিই তাহলে আমি বলব, তারা ভালো আদর্শ অনুসরণ না করে খারাপ আদর্শ অনুসরণ করবে কেন? তাহলে তাদের নিজেদের নিজস্ব আদর্শ রইল কোথায়?
পরিশেষে বলতে চাই আমি একজন মানবতাবাদী, শান্তি ও অহিংসনীতি-বিশ্বাসী মানুষ। তাই বলি, চলুন আমরা আজ সংলাপের এক জায়গায় আসি। জোটপ্রধান বিরোধীদলীয় নেতার আহ্বানকে স্বাগত জানাই। সব দলকে নিয়ে একটি ফর্মুলা তৈরি করি আগামীতে যেন একটি নির্দলীয়-নিরপে সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারি। দেশ, জাতি ও সম্প্রদায় যেন একটি অনিবার্য সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি থেকে রা পায়। সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তুÑ জগতের সকল জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। আমাদের সব ধরনের বৈরিতা ও হিংসা-প্রতিহিংসা দূরীভূত হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন