শনিবার, ৪ মে, ২০১৩

সংলাপের ফাঁদ


বিগত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দুর্বৃত্তায়িত শাসনই আমরা কেবল দেখতে পেয়েছি। তার দুর্বৃত্তরা গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরেÑ দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের ওপর যে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে, তাকে জোরগলায় সমর্থন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সাংবাদিকদের নসিহত করেছেন, বিএনপি আমলে তাদের দলীয় নেতাদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, সে তুলনায় তার দলের লোকেরা যা করছে তা তেমন কিছুই নয়। আশকারা এমন যে, যে যেখানে যা করছ, চালিয়ে যাও। এতে সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। শেখ হাসিনা কথা রেখেছেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত আমরা দেখেছি, বিরোধী দল দমনে পুলিশের সহযোগীর অবস্থানে সশস্ত্র অবস্থায় হাজির থেকেছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। আবার প্রতিপক্ষের ওপর ছাত্রলীগের হামলার সময় পুলিশ থেকেছে তাদের সহযোগী বাহিনী হিসেবে।

ফলে বিগত সাড়ে চার বছরে দেশে এক অন্ধকার যুগের সূচনা হয়েছে। খুন, গুম, রাহাজানিÑ রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞে প্রাধান্য পেয়েছে। আর খুন, গুম করে তাকে নিয়ে পরিহাস করেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও। এই সরকার ক্ষমতায় এসেই দেশব্যাপী এক সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন ও পুলিশবাহিনীকে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। শত শত যোগ্য অফিসারকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ওএসডি করে রাখা হয়েছে। তার বদলে এমন সব লোককে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে, যাদের ভাষাজ্ঞান পর্যন্ত সীমিত। কিন্তু তাতে প্রধানমন্ত্রীর কিছুই আসে-যায়নি। তার দলীয় আনুগত্য কতটুকু, সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু এ রকম একদল লোক নিয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা যে করা সম্ভব নয়, সেটি বোঝার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নিজেরও আছে কি না এ ব্যাপারে অনেকেই গভীরভাবে সন্দিহান। ফলে সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ক্রমশ: বিপন্ন হয়ে পড়েছে। তিরোহিত হয়েছে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের প্রশ্ন। আর আমরা যা দেখেছি তা হলোÑ রাষ্ট্র গোল্লায় গেলে যাক, ভারতের স্বার্থ কিভাবে সমুন্নত রাখা যায় সেটাই একমাত্র বিবেচ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতীয় পত্রপত্রিকাগুলো বাংলাদেশের সরকারকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে। তারা লিখেছেÑ বাংলাদেশ ভারতকে সব কিছু একেবারে উজাড় করে দিয়েছে। এমনকি অনেক কিছু ভারত না চাইতেই সরকার তাদের দিয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যে একটি ভূরাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে, সেটি বর্তমান সরকার ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কোনোভাবেই আমলে নেয়নি। ফলে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে। সেসব দেশই বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজার। সরকারের ভুলনীতির কারণে সে বাজারগুলো এখন দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছে। তারা আর বাংলাদেশী শ্রমিক নিচ্ছে না। অর্থনীতির ওপরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সরকার নেহাতই উদাসীন। শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভাও এমনভাবে সাজিয়েছেন যে, সেখানেও কেউ যেন যুক্তির কথা তুলে ধরতে না পারে। কেবল ঘাড় নেড়ে বলতে পারেÑ ‘জোহুকুম মহারানী’।
২০০৮ সালে এক বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। সে নির্বাচনে তারই ডেকে আনা সেনাশাসকদের রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি মইন উদ্দিন আহমেদ শেখ হাসিনাকেও কারাবন্দী করেছিলেন তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য। তা নিয়ে আমরা কত যে গালগল্প শুনেছি! কিন্তু সেসব গালগল্প যে শুধু জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য, পরে সেগুলো ধর্মের ঢাকের মতো আপনাআপনি বেরিয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যখন জেনারেল মইনের সরকার ক্ষমতায় আসে, আর এসেই যখন বিএনপির সর্বপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ওপর হামলে পড়ে, তখন শেখ হাসিনা তাদের কথা দিয়েছিলেনÑ চালিয়ে যাও, বিএনপিকে ধ্বংস করে দাও। আর তা যদি অন্যায়ও হয়, তাহলে সংবিধান সংশোধন করে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ওই সব অপকর্মের জন্য সেনাশাসকদের দায়মুক্তি দেবে।
কিন্তু জেনারেল মইনের সরকার ক্ষমতা স্থায়ী করার নানা কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। রাজনীতি থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য তাদের বন্দী করে। শেখ হাসিনার গালগল্পের শুরু সেই বন্দী জীবনেই। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি এক অদ্ভুত গল্প ফাঁদেন। তাতে বলেন, সেনাশাসকেরা বন্দী অবস্থায় তার দেহে আর্সেনিক বিষ দিয়ে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পৃথিবীর কোনো পরীক্ষাগারেই সেটি প্রমাণিত হয়নি। আর তাকে যারা হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, তাদের প্রতি শেখ হাসিনার মমতা অপরিসীম। মইন উদ্দিন ও ফখরুদ্দীন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এখন সেখানেই বসবাস করছেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাপতি মীরজাফর শেষ পর্যন্ত অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী থেকে কুষ্ঠরোগে মারা গিয়েছিলেন। জেনারেল মইন যুক্তরাষ্ট্রে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের অপেক্ষায় হুইল চেয়ারে বসে দিনাতিপাত করছেন। অন্য নিপীড়ক সহযোগীরা দেশের ভেতরেই আছেন। আর এক-এগারো ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান নায়ক মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত পদে বহাল আছেন। কী প্রেম! অথচ এরাই নাকি শেখ হাসিনাকে আর্সেনিক বিষ প্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল।
২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে শেখ হাসিনাকে জিতিয়ে দেয়া হয়। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী দল নির্মূলে এবং ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকার সংবিধানের খোলনলচে একেবারে পাল্টে ফেলেছে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক ধারা সংবলিত সব ধারা বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বাতিল করে দিয়েছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। তার ভয়, যদি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল থাকে তবে যে কুকীর্তি ও নিপীড়ন তার সরকার করেছে, জনগণ তার সমুচিত জবাব দিয়ে দেবে।
গোল বেঁধেছে সেখান থেকেই। বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য আন্দোলন শুরু করে। সরকারের হিংস্র রূপ সেখান থেকেই আরো প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। ওই ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য বিরোধী দল সভা-সমাবেশ, মিছিলের ডাক দিলেই সরকারের দলীয়করণকৃত র‌্যাব-পুলিশবাহিনী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিরোধী দলের ওপর পাশবিক হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে।
বর্তমান সরকারের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী দল নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়ায় সারা বিশ্ব ছি ছি দিতে শুরু করে। এতে সরকারের খুব যে একটা কিছু আসে-যায়, তেমন মনে হয়নি। তার ওপর পর্বতপ্রমাণ সর্বগ্রাসী দুর্নীতিতে দেশকে ছেয়ে ফেলে শেখ হাসিনা সরকার। এই দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় রাঘব বোয়াল থেকে চুনোপুঁটি কেউই বাদ যায় না। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, খুন, গুম, নারী নির্যাতনÑ কী করেনি এই সরকারের চাঁইরা। এখানে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টাকার বস্তাসহ ধরা পড়া লোকও মন্ত্রিসভায় বহাল আছে। পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে এক মন্ত্রীসহ বেশ কিছু ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। সেই মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে বিশ্বব্যাংককে নানা ধরনের কটূক্তি করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। এ নিয়ে বাহাদুরিও কম দেখানো হয়নি। যেন বিশ্বব্যাংক শেখ হাসিনা সরকারের হাতের মুঠোর কোনো প্রতিষ্ঠান। এবং তাদের ঋণ ছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণ করা নিতান্ত তুড়ি মারার ব্যাপার।
বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য সরকার শাহবাগে কিছু ব্লগার দিয়ে এক নতুন সার্কাস শুরু করে। সে সার্কাসঅলাদের বক্তব্য হলোÑ যুদ্ধাপরাধের জন্য যাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, তাদের সবাইকে ফাঁসি দিতে হবে। তারা ন্যায়বিচার দাবি করেনি। তারা ফাঁসির দাবি করেছে। অপরাধ করুক বা না করুক, অপরাধ প্রমাণিত হোক বা না হোক, দশ বছর, বারো বছর নয়, যাবজ্জীবন নয়, তাদের ফাঁসিই দিতে হবে। এই জজবায় সরকারের মন্ত্রী-নেতারাও শরিক হলেন। এবং আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলেন ট্রাইব্যুনাল। সাঈদীর আইনজীবীরা যতই বললেন, দেলোয়ার হোসেন শিকদার বা দেলু রাজাকার আর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এক ব্যক্তি নন; সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিতও হলো না, তার পরও মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো। তার আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে বসলেনÑ বিচারকেরা রায় দেয়ার সময় যেন জনমতের দিকটি খেয়াল রাখেন।
কিন্তু দেখা গেল নাচ, গান, আমোদ, ফুর্তির মাধ্যমে শাহবাগের সরকারেরা যে সার্কাসের আয়োজন করল; তাদের অনেকেই ধর্মদ্রোহী নাস্তিক। তারা আল্লাহ, রাসূল ও কুরআন সম্পর্কে তাদের ব্লগে এমন সব কটূক্তি প্রচার করল যে এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে তার ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। সরকার সেখানে প্রচুর অর্থ ঢালল। শাহবাগে দিবারাত্র তরুণ-তরুণীদের লীলা চলল। জারিগান, সারিগান, মেয়েদের লাঠিখেলা, কুস্তিÑ এসব দেখতে মানুষ কিছু দিন ভিড়ও জমাল। কিন্তু যখন তারা দেখল এরা ইসলামবিরোধী, আল্লাহ-রাসূল সম্পর্কে কটূক্তিকারী; তখন আস্তে আস্তে শাহবাগের ফুলানো বেলুন নিস্তেজ হয়ে আসা শুরু করল। শাহবাগীদের দিয়ে উঠানো দাবির মুখে সরকার এমনকি আইন পর্যন্ত  সংশোধন করল। যেন তারা সরকারের ওপর সরকার।
কিন্তু এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। তাদের সবচেয়ে বড় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। এরা গ্রামের সাধারণ মানুষ। ধর্ম-কর্ম নিয়ে থাকেন। রাজনীতি কখনো তাদের মাথাব্যথা ছিল না। এ সংগঠন দীর্ঘ দিন ধরেই কাজ করে আসছিল। প্রধানত তারা আলেম-ওলামাদের ওয়াজ-নসিহত শোনার জন্য সমবেত হতেন। তারপর যে যার গ্রামে, কর্মক্ষেত্রে ফেরত যেতেন। কিন্তু আল্লাহ-রাসূল ও কুরআনের বিরুদ্ধে অশ্লীল ও কুৎসিত কটূক্তিকারীদের সাজার দাবিতে তারা ঢাকায় এক মহাসমাবেশের ঘোষণা দিলেন। সরকার বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ঠুনকো অজুহাতে কারাগারে পুরেছে। সে প্রক্রিয়া রাজনৈতিক। কিন্তু এই সরকার সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস মুছে ফেলেছে। পাঠ্যপুস্তকে মহান আল্লাহ তায়ালাকে দেবদেবীর সমতুল্য করা হয়েছে। এমনিভাবে ইসলামবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। মুসল্লিদের যেখানে পেয়েছে, সেখানে পিটিয়ে তুলোধুনো করেছে। তার পরও হেফাজতে ইসলাম গত মাসে ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয়। এই মহাসমাবেশের দুই দিন আগে থেকেই সরকার বাস-ট্রেন-লঞ্চসহ সব যানবাহন বন্ধ করে দিয়ে রাজধানী ঢাকাকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাতেও কোনো ফল হয়নি। হেফাজতের কর্মীরা শত মাইল হেঁটে এসে মহাসমাবেশে যোগ দিয়েছেন। আর পথে পথে তাদের জন্য খাবার, পানি, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন এ দেশের সাধারণ মানুষ। সরকারের এত বাধা সত্ত্বেও লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান সে দিন ঢাকায় সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন।
সেই মহাসমাবেশ থেকে হেফাজত ১৩ দফা দাবি পেশ করেন। সে দাবি মানা না হলে তারা আজকের অর্থাৎ ৫ মে ঢাকা অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বিপরীতে হেফাজতে ইসলাম কার্যত দ্বিতীয় শক্তিতে আবির্ভূত হয়েছেন। যদিও রাজনীতি তাদের উদ্দেশ্য নয়; এবং রাজনীতির কোনো অভিলাষের কথাও তাদের মুখে শোনা যায়নি। তারা যে এক বিশাল শক্তি, সেটি তাদেরকে অশিক্ষিত বলে গালি দিয়ে অস্বীকার করা যাবে না। এরা এ দেশের নাগরিক এবং সুনির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস লালন করেন। যে বিশ্বাসের জন্যই বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ মানচিত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
আর ঠিক সেই সময়ে গত সাড়ে চার বছরের মধ্যে এই প্রথম শেখ হাসিনার কণ্ঠে বিএনপির সাথে আলোচনার উদার সুললিত বাণী শোনা গেল। তিনি যেকোনো দিন, যেকোনো সময় খালেদা জিয়ার সাথে বসে মুক্তমনে আলোচনার আহ্বান জানান। এটিও যে কার্যত একটি লোক দেখানো আহ্বান, সেটি বোঝার জন্য বিশাল পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়ার প্রয়োজন নেই। সমগ্র পৃথিবী বলছে, আপনারা আলোচনায় বসে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলার ব্যবস্থা করুন। ২০০৭ সালের মতোই দেশের কূটনীতিকেরা আবারো দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তাদেরকে বোঝানো যে, আমি তো মুক্তমনে আলোচনা করতেই চাইলাম। বিরোধী দল রাজি না হলে আমার আর কী করার আছে। কিন্তু ঠুনকো মামলায় বিরোধী দলের সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকে কারাবন্দী করার সময় এমন সুললিত চিন্তা শেখ হাসিনার মাথায় আসেনি। বিরোধী দলের অফিসে ঢুকে এর মহাসচিবসহ দলের শীর্ষস্থানীয় ১৪৮ নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের সময় এমন মনে হয়নি। তাহলে এখন মনে হলো কেন? এর দু’টি কারণ। এক হলো বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেয়া। অপরটি হলো হেফাজতে ইসলামের মোকাবেলায় উভয় দলের মধ্যে আপাতত একটি সন্ধি স্থাপন করা, যাতে কায়েমি স্বার্থ বহাল রাখা যায়।
বিএনপি বরাবরই বলে এসেছে, আগে তত্ত্বাবধায়ক ফিরিয়ে আনুন; তারপর আলোচনা। তার আগে নয়। কেননা এ ধরনের আলোচনার ভবিষ্যৎ কী হয়, সেটা আমরা ২০০৭ সালে মান্নান ভূঁইয়া আর আবদুল জলিলের আলোচনার মধ্যেই দেখেছি। সরকারের মুখে শেখ ফরিদ, বগলে আসলে ইট। এ অবস্থায় এ ধরনের আলোচনার ফাঁদে বিএনপি পা দেবে বলে মনে হয় না।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads