গত বৃহস্পতিবার সকালে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে সংসদ অথবা সংসদের বাইরে যেকোনো স্থানে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যায় অফিসার্স কাবের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, দুই-এক দিনের মধ্যেই সংলাপের জন্য বিএনপিকে লিখিত প্রস্তাব দেয়া হবে। কিন্তু এরপর চার দিন অতিবাহিত হতে চলল, আওয়ামী লীগ কিংবা সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সে ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রস্তাব বিএনপিকে দেয়া হয়েছে এমনটি শোনা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী যখন বিএনপিকে আলোচনায় বসার মৌখিক প্রস্তাব দেন, ঠিক একই সময় আগামী নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতায় পৌঁছার জন্য দুই নেত্রীকে তাগিদ দিয়ে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুন চিঠি দিয়েছেন। বাংলাদেশে জাতিসঙ্ঘের আবাসিক প্রতিনিধির মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে বান কি মুন বলেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সঙ্কট চলছে। এই সঙ্কট নিরসনে একটা গ্রহণযোগ্য উপায় বের করা দরকার। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার জন্য শিগগিরই জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূতসহ একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা আসবে। কূটনৈতিক সূত্র মতে, ৭ মে জাতিসঙ্ঘ প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে।
এমনই প্রেক্ষাপটে দেশের সাধারণ মানুষ আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রশ্নে বিদ্যমান রাজনৈতিক সঙ্কট অবসানের ব্যাপারে অনেকটা আশাবাদী হয়ে ওঠে। অনেকেই ভাবতে শুরু করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করেই যেন বরফ গলতে শুরু হয়েছে। দুই নেত্রী এবার এক টেবিলে বসবেন। তারা সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতির বাইরে নিয়ে আসবেন দেশের চলমান রাজনীতিকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় বসার পরবর্তী কয়েক দিনের রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া দেখে সাধারণ মানুষের মনে আবারো যেন নানা আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করেছে। তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে তারা প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সমাধানে আসলেই পৌঁছতে পারবেন কি না? না সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতিই অব্যাহতভাবে চলবে?
এসব প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে ওঠা স্বাভাবিক। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে দুই-এক দিনের মধ্যে লিখিতভাবে চিঠির মাধ্যমে যে সংলাপপ্রস্তাব বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার কাছে পাঠানোর কথা, চার দিন পেরিয়ে গেলেও তা পাঠানো হয়নি। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী যেভাবে যেকোনো স্থানে কোনা শর্ত উল্লেখ না করেই আলোচনায় বসার কথা বলেছিলেন; মনে হচ্ছে তিনি সে অবস্থানে নেই। সংলাপে বসার প্রস্তাব দেয়ার পরদিন শুক্রবার বিকেলে গণভবনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন সময়ের সরকারে অসাংবিধানিক ও অনির্বাচিতদের থাকার সম্ভাবনা আবারো নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে পূর্বশর্ত দিয়ে কোনো সংলাপ হয় না। কিন্তু বিএনপি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। বিএনপির অবস্থা হয়েছেÑ বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার।’
উল্লেখ্য, বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ প্রস্তাবের পরপরই স্পষ্ট করে বলেছে, সরকারের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে হবে। তাতে উল্লেখ থাকতে হবে আলোচ্য বিষয়ের। আর সেই আলোচ্য বিষয় হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অর্থাৎ বিএনপি চায় সংলাপের আগেই আওয়ামী লীগ নির্দলীয় সরকারের ধারণা মেনে নিয়েই আলোচনায় বসুক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিলে আলোচনার আর দরকার কী? এ ছাড়া এই ক’দিন সরকারদলীয় নেতানেত্রীরা যেসব কথাবার্তা বলেছেন, তাতে মনে হয় সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি কিছুতেই মেনে নেবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পরদিন শনিবার ঢাকার শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় ১৮ দলের মহাসমাবেশ। এই সমাবেশ ১৮ দলীয় জোটের এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশগুলোর মধ্যে ছিল সবচেয়ে বড়। কার্যত এই মহাসমাবেশ পরিণত হয় এক জনসমুদ্রে। এ সমাবেশে বেগম খালেদা জিয়া নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মেনে নেয়ার আলটিমেটাম দেন। সেই সাথে উল্লেখ করেন, দলীয় নেতাকর্মীদের কারাগারে রেখে বিরোধী দল সংলাপে বসবে না। পরদিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। জানি না, এটি বেগম জিয়ার বক্তব্যের ফল কি না।
এখন প্রশ্নÑ খালেদা জিয়ার এই আলটিমেটাম কতটুকু যুক্তিযুক্ত? যেখানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ কোনো ছাড় দেবে, এমন কোনো আলামতই দেখা যাচ্ছে না; সেখানে বিরোধী দলের হাতে এখন দাবি আদায়ের চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আর কয়েক মাস আছে জাতীয় নির্বাচনের। তাই বিরোধী দল যদি সরকারের অনড় অবস্থার বিপরীতে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে না পারে, তবে বিএনপিকে চরম রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। দাবি আদায়ের প্রশ্নে বিএনপি এবং এর নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট মরিয়া হয়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। এ প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়ার দেয়া ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামে কারো অবাক হওয়ার কিছু নেই। তা ছাড়া ভুললে চলবে না, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এখন জনদাবিতে পরিণত হয়েছে। এমনই পরিস্থিতিতে সরকারপক্ষকে বাস্তবতা অনুধাবন করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে দেশে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন