রবিবার, ৫ মে, ২০১৩

সাধারণ মানুষই এখন বড় হয়ে উঠছে



অনেক সময় ছোটখাটো ঘটনা কিংবা অতি সাধারণ মানুষের আচরণ থেকেও বড় বড় সমস্যা সমাধানের দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়। সম্প্রতি এমন উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন আসমা আক্তার লিজা। শুধু এক লিজা নন, সাভার-ট্রাজেডিকে কেন্দ্র করে উদ্ধার অভিযানে এবং আর্তমানবতার সেবায় বহু সাধারণ মানুষ এমন সাহসী ও উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন, বহুল পরিচিত অনেক সমাজসেবক ও জনদরদী রাজনীতিবিদরাও তেমন ভূমিকা রাখতে সক্ষম হননি। ২৮ এপ্রিল সাভারের অধরচন্দ্র বিদ্যালয় মাঠে লাশ দেখতে গিয়েছিলেন লিজা। সেখানে মা হারা ক্রন্দনরত শিশু সাকিবকে দেখতে পান। শিশুটি মা মা বলে তাকে জড়িয়ে ধরে। সেই থেকে লিজা মা হয়ে যান সাকিবের। এরপর আহত অনেক শিশু শ্রমিক মা হিসাবে পেয়েছে লিজাকে। মমতাময়ী এ নারী নিরলসভাবে সেবা করে যাচ্ছেন আহত অন্য পোশাক শ্রমিকদেরও। গহনা বিক্রির টাকায় হাসপাতালের পাশে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে আহত শ্রমিকদের ৪০ আত্মীয়ের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি।
সাধারণ এই নারীর গহনা বিক্রির ঘটনায় উপলব্ধি করা যায় যে, তার আর্থিক সামর্থ্য ফুরিয়ে এসেছে। কারণ নগদ অর্থ থাকলে কেউ গহনা বিক্রি করতে যায় না। লিজার মানসিক দৃঢ়তা থেকে উপলদ্ধি করা যায় যে, আর্থিক সামর্থ্য ফুরিয়ে এলেও তার সেবার মানসিকতা ফুরিয়ে যায়নি। মানুষের মানসিক গঠন আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের শিক্ষা-দীক্ষার মূল বিষয়টাও কিন্তু সুস্থ মানসিকতা গঠনে মানুষকে সাহায্য করা। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, পরিবার সমাজও সুস্থ মানসিকতা গঠনে মানুষকে সাহায্য করার কথা। আমাদের পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানুষের মধ্যে সুস্থ মানসিকতা বিকাশে কতোটা দায়িত্ব পালন করছে সেই প্রশ্ন আজ বড় হয়ে উঠেছে। আমরা জানি যে, সুস্থ মানসিকতার মানুষের আচরণ কখনো অমানবিক হতে পারে না। অথচ প্রতিদিন আমাদের সমাজে লক্ষ্য করা যায় অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজের ছড়াছড়ি। তাহলে আমাদের সমাজ কি অসুস্থ মানসিকতার মানুষে ভরে গেছে? সাভারে রানা প্লাজার ঘটনায়ও আমরা লক্ষ্য করেছি মানুষ আজ কতোটা নীতিহীন, ভ্রষ্ট, অমানবিক হয়ে উঠেছে। সাভার ট্রাজেডির ঘটনাতো পেশাদার চোর-ডাকাতরা ঘটায়নি। ক্ষমতাধর রাজনীতিক, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রশ্রয়েই ক্ষমতাবান কেউ ঐ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটিয়েছেন। ক্ষমতা অসুস্থ মানসিকতার লোকদের হাতে গেলে তার পরিণতি কেমন হয় তার বড় প্রমাণ সাভার ট্রাজেডি।
দেশের অতি সাধারণ নাগরিক লিজার আচরণের সাথে আমাদের সমাজের অসাধারণ ক্ষমতাধর রাজনীতিক, শিল্প মালিক, ভবন মালিক ও তথাকথিত প্রগতিশীল সুবিধাভোগীদের আচরণ মিলছে না। সাভারের মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা সাধারণ নাগরিকদের কথা ও কাজে মিল পাই; কিন্তু যারা আমাদের দেশ ও সমাজ পরিচালনা করছেন তাদের কথা ও কাজে মিল লক্ষ্য করা যায় না। এসব দেখেই একজন সাধারণ উদ্ধারকর্মী মন্তব্য করেছেন, মানুষকে উদ্ধার করতে ট্রেনিং লাগে না, মন লাগে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে আজ যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, দেশ ও সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব যারা নিয়েছেন তারা সে দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারছেন না। দায়িত্ব পালনের জন্য যে আন্তরিকতা ও মন-মানসিকতা প্রয়োজন, তেমন জনশক্তি তৈরিতেও আমাদের নেতৃবৃন্দ ব্যর্থ হয়েছেন। রানা প্লাজার ঘটনা তার বড় উদাহরণ। বড় বড় কথা ও ব্লেমগেমের পরিবর্তে আজ প্রয়োজন কথা ও কাজে মিল রাখার মতো মানসিকতা গড়ে তোলার পরিশ্রমী আন্দোলন। এ কাজটি হয়নি বলেই আজ স্বাধীনতার এতোগুলো বছর পরেও আমরা দেশ গড়ার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। এ বিষয়টি দলীয় কিংবা গোষ্ঠী স্বার্থে বিবেচনার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে বিবেচনা করা উচিত। এমন বিবেচনায় স্বার্থ ত্যাগ প্রয়োজন, প্রয়োজন আত্মত্যাগ ও সমন্বয় চেতনার। এ কাজে কে কতোটা এগিয়ে আসেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads