রবিবার, ৫ মে, ২০১৩

সংলাপ-সংলাপ খেলা কালক্ষেপণের বাহানামাত্র


বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা মহাখরার দেশের চাতকের মতো। ‘ফটিক জল, ফটিক জল’ করে চাতক আকাশের দিকে তাকিয়ে উড়েই চলেছে। বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই গণতন্ত্র চেয়ে এসেছে। গণতন্ত্রের দাবিতেই এরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। দুর্ভাগ্যবশত গণতন্ত্র দূরে দূরেই থেকে যাচ্ছে। দেশের মানুষ আঙুল উঁচিয়ে আছে। কিন্তু সে গণতন্ত্র ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। কারণগুলো সবারই জানা। কিন্তু সেসব কারণ দূর করতে সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসছেন না। অবস্থা অনেকটা গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো। পথম কারণ, রাজনীতিকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব। গণতন্ত্র বাস্তবায়ন হতে পারে আলোচনার ভিত্তিতে। কিন্তু শ্রদ্ধাবোধই যদি না থাকল, তাহলে আলোচনা হবে কী করে? বাঘে-সিংহে যদি লড়াই চলতেই থাকে, তাহলে শিকারের প্রাণীটাকে অবশ্যই খেয়ে যাবে শেয়ালে-শকুনে। বাংলাদেশেও তাই হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারের আমলে নির্বাচন করার যুক্তি হিসেবে বলে থাকেন, অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিদায়ী সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়। তার বক্তব্যের পাল্টা যুক্তি খুবই সহজ। বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখনো শিকড়ই গেড়ে বসতে পারেনি। গণতন্ত্রের প্রসূতি সদন বলে পরিচিত ব্রিটেনেও গণতন্ত্র এক দিনে আসেনি। রাজা প্রথম চার্লস পার্লামেন্ট সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য সৈন্যসামন্ত নিয়ে পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকেছিলেন। তার জের ধরে অলিভার ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে পার্লামেন্ট রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পরিণতিতে প্রথম চার্লসের শিরñেদ হয়েছিল। যে বিতর্কিত রায়কে সম্বল করে সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনী ও তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাতিল করেছে, তাতে আরো দু’টি সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে অনুষ্ঠানের সুপারিশ করা হয়েছিল। কেন? সে বিতর্কিত প্রধান বিচারপতিও আশা করেছিলেন যে, আরো দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হলে সে অবকাশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শিকড় গেড়ে বসতে পারবে। তার রায়ের এক অংশকে অগ্রাহ্য করে সরকার অন্য অংশ নিয়ে মাতামাতি করছে।
বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র শিকড় গেড়ে উঠতে পারেনি এবং পারছে না, সে জন্য শেখ হাসিনার দায়িত্ব অনেকখানি। ১৯৭৫ সালে আগস্টে একটা সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। তার জের ধরে কয়েকটি অভ্যুত্থান এবং আরো বেশি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। বাকশাল পদ্ধতি চালু করতে গিয়ে শেখ মুজিব সবগুলো বেসরকারি পত্রপত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন।
প্রথম সুযোগেই জিয়াউর রহমান পত্রপত্রিকা প্রকাশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে বৈধ করে দেন। ভারতে প্রায় ছয় বছর রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর রাষ্ট্রপতি জিয়া আওয়ামী লীগের দু’জন সিনিয়র নেতা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাককে দিল্লি পাঠিয়ে হাসিনা ও তার ছোট বোন রেহানাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু তার ১৩ দিনের মাথায় এক সামরিক ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অত্যন্ত নৃশংসভাবে নিহত হন। সে ষড়যন্ত্রে কারা কারা জড়িত ছিল সে সম্বন্ধে কোনো তদন্ত হয়নি, বহু মানুষের মনে এখনো নানা সন্দেহ উঁকিঝুঁকি দেয়।
জিয়া হত্যার পরও কিছুকাল সাংবিধানিক পদ্ধতি ও গণতন্ত্র কার্যকর ছিল। সংবিধান অনুযায়ী উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যেই নভেম্বর মাসে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. কামাল হোসেন। তাকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সেনাপ্রধান লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই বিজয়ের জন্য তাকে অভিনন্দন জানালেও কয়েক দিনের মধ্যেই একটি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মারফত ক্ষমতা ভাগাভাগির দাবি তোলেন। ১৯৮২ সালের ১৫ জানুয়ারি এরশাদ তার ভগ্নিপতির মারফত আমাকে জানান, তার দাবি মেনে নেয়া না হলে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবেন।
এরশাদ এর ঠিক ৬৮ দিন পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রিভলবারের ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করেন এবং ক্ষমতা দখল করেন। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এই সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি অখুশি নন। আওয়ামী লীগের মুখপত্র বাংলার বাণী এই অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানায় এবং সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সাফল্যের জন্য মুনাজাত করে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গোড়া থেকেই সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সাথে সহযোগিতা করেছেন বলে এরশাদের শাসন ৯ বছর স্থায়ী হতে পেরেছিল।
গণ-আন্দোলনে এরশাদের সামরিক সরকারের পতনের পর দেশবাসী আশা করেছিল, এর পর থেকে গণতন্ত্রের যাত্রা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সেটা হয়নি শেখ হাসিনার কারণে। তার ধারণায় তিনি গদি পেলে দেশে গণতন্ত্র থাকে, অন্য সময়ে নয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বিপুল গরিষ্ঠতায় জয়ী হয়। সারা বিশ্বের পর্যবেক্ষকেরা সে নির্বাচনকে নিখুঁত এবং আদর্শ বলে ঘোষণা করেছিলেন। তাদের সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে হাসিনা ঘোষণা করেন তার কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ প্রায় সময়ই সংসদ বর্জন করেছে, মোট ১৭৩ দিন হরতাল করেছে। লাগাতার হরতাল কথাটা শেখ হাসিনাই চালু করেছিলেন।
এটা গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নয়
সে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে শেখ হাসিনা সিস্টেমের ত্রুটি পরিষ্কার করলেন। জামায়াতের সাথে হাত মিলিয়ে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালু করার জন্য আন্দোলন, হরতাল ও খুনখারাবির লাগাম খুলে দেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ২০ মে সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমকে দিয়ে একটা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত কয়েকজন দেশপ্রেমী কর্মকর্তার সতর্কতায় সে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। দেশজুড়ে হানাহানি ও রক্তপাত বন্ধ করার লক্ষ্যে খালেদা জিয়া ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচিত সংসদে জরুরিভাবে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন) পাস করেন। জুন মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অল্প কয়েকটি আসনের ব্যবধানে একক গরিষ্ঠ দল হয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু নিরঙ্কুৃশ গরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয় বলে জামায়াতের সদস্যদের সমর্থনে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন।
আওয়ামী লীগ নেত্রীর দৃষ্টিতে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি তখন খুবই উত্তম ছিল। কিন্তু ২০০১ সালের অক্টোবরে সে পদ্ধতির অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরাজয়ের পর সে পদ্ধতির ওপর শেখ হাসিনার আস্থা চলে যায়। শেখ হাসিনা নিজেই স্বীকার করেছেন ২০০৭ সালের বর্ণচোরা সামরিক সরকার ছিল তারই আন্দোলনের ফসল। সে সরকার শেখ হাসিনাকে বিশ্ব ভ্রমণের অনুমতি দিলেও বেগম জিয়াকে কারারুদ্ধ করে রাখে। বিএনপিকে ধ্বংস করার এবং সে দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব চেষ্টা করেছে ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকার। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে একটা মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচনে জয়ী হয়েই শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বিলুপ্ত করার চেষ্টা শুরু করেন।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিবর্তন ইংল্যান্ডে রাজা চার্লসের আমলের  চেয়ে বেশি অগ্রসর হতে পারেনি। শিশুকে বড় করতে অনেক যতœ ও সতর্কতার প্রয়োজন হয়। ফলের চারাগাছ লাগালে সেদিক বেড়া দিয়ে রক্ষা করতে হয়, নইলে ছাগলে মুড়িয়ে খাওয়ার ভয় থাকে। গণতন্ত্রের ব্যাপারেও সে উপমা সম্পূর্ণ প্রযোজ্য। ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্র নিজের গতিতে চলে, গণতন্ত্রকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অধিকার কারো নেই।’ দুর্ভাগ্যবশত তার সে অভিমত শেখ মুজিব নিজেই মেনে চলেননি, সে জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। শেখ হাসিনা ১৯৯১ সালের পর থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষাই করে চলেছেন গণতন্ত্র নিয়ে। সে নিরীক্ষার মূল লক্ষ্য হলো তার গদি পাওয়ার নামই হচ্ছে গণতন্ত্র, তিনি গদি না পেলে সেটা গণতন্ত্র নয়।
শেখ হাসিনা কখনো গালাগাল না করে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার নামোল্লেখ করতে পারেন না। ১৯৯১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি টেলিভিশনে তিনি ঝাড়া ৪৫ মিনিট শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম জিয়া এবং তাদের পরিবারকে অশ্রাব্য গালাগাল করেছিলেন। বর্তমান সংসদের উদ্বোধন দিনেও তাই করেছেন তিনি। সামাজিকভাবেও তিনি সে আচরণ বজায় রেখেছিলেন। খালেদা জিয়ার মাহাত্ম্য, তিনি শেখ হাসিনার কন্যা পুতুলের বিয়ের মামুলি আমন্ত্রণেও বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, কিন্তু তার সাথে দু’টি কথা বলার মতো সৌজন্যও কনের মাতা শেখ হাসিনা দেখাতে পারেননি। গত শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনেও বারবার তিনি বেগম জিয়াকে খুনের চেষ্টার অপবাদ দিয়েছেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার আমন্ত্রণ : ‘আসুন, আমরা বসি, আলাপ করি’, আকস্মিক বজ্রপাতের মতোই নাটকীয় ঠেকেছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। শেখ হাসিনার কি অভাবনীয় চরিত্রগত পরিবর্তন হয়েছে রাতারাতি? কিন্তু সমকালীন ঘটনাবলির সাথে যাদের সামান্যতম পরিচয় আছে তারা জানেন যে, প্রায় ছয় বছরে দিল্লিতে যে শিক্ষা তার ধমনীতে ইনজেকশন করে দেয়া হয়েছিল সেটা ভোলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বরং ব্যাপারটা হচ্ছে ‘বেকায়দায় পড়লে বাঘেও ঘাস খায়।’
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক টেলিভিশন সংস্থা সিএনএন থেকে প্রচারিত সাক্ষাৎকারে ক্রিশ্চিয়ান আমানপোর প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে যেরকম ‘হামানদিস্তা’ করে ছেড়েছেন তার থেকেই প্রমাণ পাওয়া যাবে বহির্বিশ্ব শেখ হাসিনা ও তার সরকার সম্বন্ধে কেমন ধারণা পোষণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বহু দিন ধরে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন। হাসিনা ড. ইউনূসের ব্যাপারেও মার্কিন সরকারকে যেমন হেনস্তা ও অপমান করেছেন, কোনো না কোনো দিন তার প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য।
বাঘ যে কারণে ঘাস খাওয়ার কথা বলছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ২৭টি ইউরোপীয় দেশের সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রায় দু’বছর ধরে আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কটের অবসান এবং সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। কিন্তু তার স্বভাবসুলভ একগুঁয়েমির কারণে হাসিনা তাদের পরামর্শে কর্ণপাত করেননি। কিন্তু সাভারের রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির কারণে প্রেক্ষিত স¤পূর্ণ পাল্টে গেছে। সরকার হঠাৎ করে চোখে অন্ধকার দেখছে। ওয়ালমার্ট গত নভেম্বরে তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১১২টি প্রাণের শোচনীয় মৃত্যুর পরই বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির (যেটাকে অর্থমন্ত্রী মুহিত দিল্লিতে ‘তেমন গুরুতর কিছু নয়’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন) পরে ব্রিটিশ জনমতের চাপে প্রাইমার্কসহ বিভিন্ন ব্রিটিশ কোম্পানি হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দানের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে। বিদেশে উৎপাদকের অবহেলার কারণে এমন মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির জন্য ক্ষতিপূরণ দান ব্যবসায়ীদের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি নয়। কারখানাগুলোর পরিবেশ যথেষ্ট পরিমাণে উন্নত না হলে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি তাদের জন্য লাভজনক হবে না। মার্কিন ডিজনি করপোরেশনও ঘোষণা করেছে যে, তারা বাংলাদেশ থেকে আর পোশাক আমদানি করবে না। আভাস পাওয়া যাচ্ছে, অবিলম্বে বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নতি না হলে ইইউ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপের কথা বিবেচনা করবে। অর্থাৎ বিদেশ থেকে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশী শ্রমিক বহিষ্কারের ফলে বিদেশী রেমিট্যান্স মারাত্মক রকম পড়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে পোশাক রফতানি বাবদ বিদেশী মুদ্রা অর্জনের বৃহত্তম উৎসও শুকিয়ে যাওয়ার ভয় দেখা দিয়েছে। এ দিকে দেশের ভেতর সরকার বলে কিছু নেই। দেশ চলছে না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ধর্মঘট-হরতাল এবং খুনখারাবি চলছে। বিএনপি ও ১৮ দলের সমাবেশ-হরতালগুলো সেই কবেই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এমনকি জনমতকে ধাপ্পা দেয়ার জন্য শাহবাগে যে দানবটাকে সরকার বোতল থেকে বের করেছিল সে দানব এখন আর বোতলে ফিরে যেতে রাজি নয়। শেয়াল এখন নিজেকে বাঘ ভাবতে শুরু করেছে।
শেখ হাসিনা ও তার উপদেষ্টারা বরাবরই যে ভুলটা করে থাকেন এবারো ঠিক সেটাই করছেন। তারা আশা করছেন, খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে সংলাপে বসানো গেলে বিদেশীদের ধাপ্পা দেয়ার একটা বাহানা পাওয়া যাবে। অন্য দিকে দেশজুড়ে আন্দোলন যদি কয়েক দিনও স্থগিত থাকে তাহলে সে আন্দোলনের গতিশীলতা স্তিমিত হয়ে আসবে এবং সরকার দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। কিন্তু তারা হিসাবে মারাত্মক ভুল করেছেন। আন্দোলন এখন খালেদা জিয়া, বিএনপি, জামায়াত, এমনকি হেফাজতে ইসলামেরও নিয়ন্ত্রণে নেই। আন্দোলন এখন সাধারণ মানুষের হাতে চলে গেছে। খালেদা জিয়া এবং বিএনপির সাথে সত্যিকারের এবং অর্থবহ একটা রফা হলে তারা আন্দোলনকে বিশেষ একটা খাতে পরিচালিত করার চেষ্টা করতে পারেন।
খালেদা জিয়া সরকারের সাথে বসে কী নিয়ে কথা বলবেন? বিলেতে হলে না হয় আবহাওয়া একটা আলোচ্য বিষয় হতে পারত। তা ছাড়া বিএনপি শীর্ষনেতাদের সবাইকে সরকার ধরে ধরে জেলে বন্দী করে রেখেছে। খালেদা জিয়া কাকে সাথে নিয়ে বৈঠকে যাবেন, কে তাকে পরামর্শ দেবেন? বিষয় এখন একটাইÑ সরকার যদি অবিলম্বে কারারুদ্ধ বিরোধীদলীয় নেতাদের মুক্তি দেয় এবং ঘোষণা দেয় যে, তারা একটা নির্দলীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন করতে রাজি আছে তাহলে সে কর্তৃপক্ষের গঠন নিয়ে আলোচনা সম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক কথাটাকে যদি তাদের এতই আপত্তি তাহলে আলোচনার মাধ্যমে সে কর্তৃপক্ষকে অন্য কোনো নাম দেয়া যেতে পারে। শেক্সপিয়র লিখে গেছেন গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক সে সমানেই সুগন্ধ বিতরণ করে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads