শুক্রবার, ৩ মে, ২০১৩

সাভারের রানা থেকে সংসদের স্পীকার



সর্বশেষ এক উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের প্রতি আলোচনায় বসার আহ্বান জানালেও নানা কারণে তার সে আহ্বান জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারেনি। ভবন ধসের আড়ালে সাভারের হত্যাকা- তো বটেই, প্রধান একটি কারণ হিসেবে এসেছে সংসদের নতুন স্পীকার নির্বাচনের বিষয়টিও। বিরোধীদলের মতামত নেয়া দূরে থাকুক, ক্ষমতাসীনরা এ ব্যাপারে আগে থেকে তাদের অবহিত পর্যন্ত করেননি। আরো কিছু কারণেও প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এসব অবশ্য পৃথকভাবে আলোচিত হওয়ার মতো বিষয়। আজকের নিবন্ধে আমরা বরং সাভারের ভবন ধস ও হত্যাকা-কেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি স্পীকার নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবো। 
প্রথম ক্ষেত্রে বেশি আলোড়ন উঠেছে সাভার হত্যাকা-ের প্রধান অপরাধী সোহেল রানার গ্রেফতার নিয়ে। এই রানা আওয়ামী যুবলীগের প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত নেতা বলেই তাকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে রীতিমতো নাটক সাজিয়েছে সরকার। গত ২৮ এপ্রিল বেনাপোল থেকে গ্রেফতারের পর তাকে রাজকীয় ঢঙে হেলিকপ্টারে চড়িয়ে ঢাকায় আনা হয়েছে। সে খবর আবার ঘড়ি দেখে এবং ঘণ্টা ও মিনিট ধরে ধরে ঘোষণার আকারে জনগণকে জানিয়েছেন স্থানীয সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। ‘বেচারা’ রানাকে যে গ্রেফতার করা হবে সে বিষয়ে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্দেশ জারি করার পর থেকেই ধারণা করা যাচ্ছিল। প্রথম দু’-তিন দিন পর্যন্ত রানা আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের ‘কেউ নয়’ বলে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা কম করা হয়নি। এমনকি এ খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে, রানাকে ভারতে পাচার করে দেয়ার জন্য নাকি ৭০ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। দায়িত্বও নাকি কোনো এক আলোচিত প্রতিমন্ত্রী এবং একজন সংসদ সদস্য নিয়েছিলেন। কিন্তু ‘সদিচ্ছা’ যথেষ্ট থাকলেও জনগণের দাবির মুখে সরকারকে নতি স্বীকার করতে হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেই ঘোষণা দিয়ে গ্রেফতারের নির্দেশ জারি করতে হয়েছে। ‘বেচারা’ রানা তাই সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েও রেহাই পায়নি।
গ্রেফতারের ঘটনাপ্রবাহে অনেক বিষয় নিয়েই জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদও উঠেছে। প্রধান জিজ্ঞাসা হলো, এত নিষ্ঠুর এক হত্যাকা-ের পরও ঘাতক রানা সাভার থেকে বেনাপোল পর্যন্ত বাধাহীনভাবে যেতে পেরেছিল কিভাবে? ভবন ধসের সূচনাকালে অওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপির সঙ্গে তাকে দেখা গিয়েছিল বলে সঙ্গত কারণেই ধরে নেয়া হয়েছিল, রানা আসলে ওই এমপির আশ্রয়েই রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ২৯ এপ্রিলের সংবাদপত্রেও খবরের শিরোনাম হয়েছে, ‘অভিযোগের তীর এক প্রতিমন্ত্রী ও এক এমপির দিকে উঠেছে’। এর পাশাপাশি ‘কেউ নয়’ বলে শোরগোল তোলার বিষয়টিকেও স্বাভাবিকভাবে নেয়া যায়নি। সব মিলিয়েই পরিষ্কার হয়েছে, ‘কেউ’ তো বটেই, রানাকে এমনকি শেষ পর্যন্তও বাঁচানোর ‘সদিচ্ছা’ ছিল ক্ষমতাসীনদের। কিন্তু বিধি বাম হয়েছে। রানার গ্রেফতারে জনগণ তাই বলে নৃত্য করে উঠতে পারেনি। এর কারণ, বিরোধীদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, ঘাতক রানা ‘জামাই আদর’ পেয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে মাত্র ক’দিন আগের তথ্য স্মরণ করিয়ে বলা হয়েছে, দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপির জাতীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে যেখানে বেআইনীভাবে ডা-াবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছিল সেখানে রানাকে শুধু হেলিকপ্টারে চড়িয়েই আনা হয়নি, তার গায়ে টোকাটি পর্যন্ত দেয়ার সাহস পাননি কোনো কর্মকর্তা। এর কারণ নিশ্চয়ই ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। ঘাতক হলেও রানা যে ক্ষমতাসীনদের খুবই কাছের এবং খাতিরের একজন!
নাটকীয়তার অভিযোগও অকারণে ওঠেনি। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রানার হদিস পাওয়ার পর র‌্যাবের টিম তৈরি করা ও হেলিকপ্টারে যাত্রার প্রস্তুতি নেয়া থেকে বেনাপোলে গিয়ে তাকে গ্রেফতার এবং হেলিকপ্টারে চড়িয়ে ঢাকায় আনা পর্যন্ত কার্যক্রমে যে সময় লেগেছে তার চাইতে অনেক কম সময়ে তাকে গ্রেফতার করে গাড়িতে ঢাকায় আনা সম্ভব ছিল। এজন্য খরচ, সময় এবং লোকবলও অনেক কমই লাগতো। কিন্তু সেটা করা হয়নি এজন্য যে, তাহলে আর নাটক সাজিয়ে জনগণকে মুগ্ধ ও চমৎকৃত করা এবং শোরগোল তোলা সম্ভব হতো না। সরকারের যোগ্যতা এবং পারঙ্গমতা সম্পর্কেও ধারণা দেয়া যেতো না জনগণকে। আসলেও জবরই দেখিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা! তা সত্ত্বেও বলা দরকার,  আরো কয়েক কদম এগিয়ে সেই প্রতিমন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া উচিত, যাদের বিরুদ্ধে ৭০ লাখ টাকার চুক্তি করার দায়ে ‘অভিযোগের তীর’ উঠেছে বলে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অমন আশার গুড়ে অবশ্য বালি পড়াটাই স্বাভাবিক।
এবার ™ি^তীয় প্রসঙ্গ। এটা আর নতুন খবর নয় যে, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর জাতীয় সংসদের স্পীকার হিসেবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া আবদুল হামিদ এডভোকেটকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করেছে। নতুন বা সর্বশেষ খবর হলো, স্পীকার পদে নির্বাচিত হয়েছেন ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। এ শুধু একটি খবর নয়, রীতিমতো চমকে দেয়ার মতো খবরও। কারণ, এতদিন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি, পূর্ণ মন্ত্রী হওয়ারও যোগ্যতা ছিল না তার। কথা ও আপত্তি উঠেছে অনেক কারণেই। একটি বড় কারণ হলো, সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি সংরক্ষিত মহিলা কোটা থেকে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসার গৌরব ও অর্জন ছিল না তার। তেমন জনসমর্থন বা জনপ্রিয়তা থাকলে তিনি নিশ্চয়ই নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। আর একথা তো বলাই বাহুল্য যে, ২০০৮ সালের ‘ডিজিটাল’ নির্বাচনে নৌকা মার্কার এমন জয়জয়কারই ছিল যখন এমনকি ‘কলাগাছ’কে দাঁড় করিয়ে দিলেও জিতিয়ে আনা যেতো। হাসানুল হক ইনু থেকে রাশেদ খান মেনন পর্যন্ত ‘কমরেড’ নামের অনেক ‘কলাগাছ’কেই তো জিতিয়ে এনেছিলেন শেখ হাসিনা। সেদিক থেকে ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর মতো একজন অতি যোগ্য ও উচ্চ শিক্ষিত ‘নারী’ প্রার্থীকে সহজেই জিতিয়ে আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি বলেই রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় বলা হচ্ছে, তার সম্ভবত ‘কলাগাছ’ হওয়ার মতো যোগ্যতাটুকুও ছিল না। নাহলে সংরক্ষিত মহিলা কোটা থেকেই তাকে সংসদ সদস্য বানাতে হবে কেন?
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এই বলে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে যে, আওয়ামী লীগে কি যোগ্য ব্যক্তির এতটাই ‘আকাল’ পড়েছে যখন একজন অনির্বাচিত প্রতিমন্ত্রীকে স্পীকার বানাতে হলো? এমন জিজ্ঞাসার কারণ সম্পর্কে নিশ্চয়ই কথা বাড়ানোর দরকার পড়ে না। তোফায়েল আহমদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত থেকে সাবেক আইনমন্ত্রী এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু পর্যন্ত এমন ডজন ডজন নেতা ও এমপি রয়েছেন, যাদের মধ্য থেকে কোনো একজনকে স্পীকার বানানো যেতো, সেটাই সঙ্গত হতো। তাদের যোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠতো না তেমনি তাদের গ্রহণযোগ্যতাও হতো প্রশ্নাতীত। প্রাসঙ্গিক তৃতীয় কারণ হিসেবে স্পীকারদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে। স্বাধীনতার পর গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের প্রথম স্পীকার শাহ আবদুল হামিদ থেকে জাতীয় সংসদের সর্বশেষ স্পীকার আবদুল হামিদ এডভোকেট পর্যন্ত প্রত্যেকেই জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। তাছাড়া স্পীকারের মৃত্যুর পর সব ক্ষেত্রে ডেপুটি স্পীকারকেই স্পীকার পদে নির্বাচিত করা হয়েছে। যেমন শাহ আবদুল হামিদ মারা যাওয়ার পর স্পীকার হয়েছিলেন ডেপুটি স্পীকার মুহম্মদ উল্লাহ। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম বিএনপি সরকারের সময় (১৯৯১-১৯৯৬) অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ সরে যাওয়ার পর স্পীকার আবদুর রহমান বিশ্বাস যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন স্পীকার হয়েছিলেন ডেপুটি স্পীকার শেখ রাজ্জাক আলী। একইভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী মারা যাওয়ার পর ডেপুটি স্পীকার আবদুল হামিদ এডভোকেটকে স্পীকার করা হয়েছিল।
আপত্তির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে এসেছে অভিজ্ঞতার বিষয়টি। ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওপরে উল্লেখিতদের আগে-পরে মির্জা গোলাম হাফিজ, শামসুল হুদা চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মতো যারা স্পীকার হয়েছেন তাদের প্রত্যেকেরই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অতীত ছিল। প্রত্যেকে কয়েকবার পর্যন্ত জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছিলেনÑ যেমন সর্বশেষ স্পীকার আবদুল হামিদ এডভোকেট নির্বাচিত হয়েছেন সাত-সাতবার। অন্যদিকে নবনির্বাচিত স্পীকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী কিভাবে সংসদে এসেছেন সে তথ্যের নিশ্চয়ই পুনরাবৃত্তি করার দরকার পড়ে না। অভিজ্ঞতার বিষয়টি অকারণে আলোচিত হচ্ছে না। স্পীকার শুধু একটি পদ নয়, একটি প্রতিষ্ঠানও। স্পীকারের সঙ্গে জাতীয় সংসদের তো বটেই, রাষ্ট্রেরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্ধারণী বিষয় জড়িত রয়েছে। যেমন মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতির বিদায়ের ক্ষেত্রে স্পীকারই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। সেদিক থেকে স্পীকারকে রাষ্ট্রপতির বিকল্প বা ছায়া রাষ্ট্রপতি হিসেবে ধরে নেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদের অভ্যন্তরে অন্য যে কারো চাইতে, এমনকি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর চাইতেও বেশি ক্ষমতা ও মর্যাদা স্পীকারের। প্রধানমন্ত্রীকেও স্পীকারকে ‘মাননীয় স্পীকার’ বলে সম্বোধন করতে হয়। স্পীকারের অনুমতি ছাড়া কোনো এমপি বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীই সংসদে কথা বলার সুযোগ পান না। স্পীকার যে কোনো সময় যে কোনো এমপিকে এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতাকেও থামিয়ে দিতে পারেন। পারেন তাদের মাইক বন্ধ করে দিতে। অর্থাৎ সংবিধানের সংশোধনী থেকে কোনো আইন পাস করা পর্যন্ত সংসদের সকল কার্যক্রমে স্পীকারই সর্বেসর্বাÑ সার্বভৌম ক্ষমতা ও মর্যাদার অধিকারী। স্পীকারের ওপর আর কেউ নেই সংসদীয় গণতন্ত্রে। সেজন্য স্পীকারকে শুধু প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হলেই চলে না, যথেষ্ট অভিজ্ঞতাসম্পন্নও হতে হয়। তাছাড়া রীতি ও রেওয়াজ তো  রয়েছেই, পাশাপাশি রয়েছে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিÑ সংসদ পরিচালনার নিয়ম ও আইন-কানুন। এই কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে শুধু জানা থাকাটা যথেষ্ট নয়, প্রতিটি বিধি স্পীকারের নখদর্পণেও থাকতে হবে। কোন এমপিকে কখন বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া যায়, কখন কোন এমপি কোন পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখার জন্য দাঁড়াতে পারেন, কখন কার অনুরোধ উপেক্ষা করা যায়, কার মাইক বন্ধ পর্যন্ত করা যায়Ñ এ ধরনের অনেক বিষয়ে স্পীকারকে জ্ঞান রাখতে ও সচেতন থাকতে হয়। অন্যদিকে ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী সম্পর্কে বলা হচ্ছে, সম্ভাব্য প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তাকে কার্যপ্রণালী বিধিসংবলিত বই ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জানা না থাকার কারণে তিনি এমনকি চলমান সংসদ অধিবেশনই মুলতবি করে দিতে পারেন। অর্থাৎ সব মিলিয়েই নতুন স্পীকার জাতীয় সংসদের জন্য ক্ষতিকর এবং বিপদজনক হয়ে উঠতে পারেন।
প্রশ্ন উঠেছে, ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর মতো অনির্বাচিত ও অনভিজ্ঞ একজনকেই কেন নির্বাচিত করার আড়ালে স্পীকার পদে বসিয়ে দেয়া হয়েছে? এর কিছুটা উত্তর জানান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারীর ক্ষমতায়নের মতো যুক্তির পাশাপাশি উদাহরণও তিনি যথেষ্টই টেনেছেন। বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের স্পীকার এখন নারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পীকারও একজন নারীই। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া তথ্যগুলো ভুল নয়। কিন্তু একটি তথ্য তিনি পাশ কাটিয়ে গেছেন। সে তথ্যটি হলো, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের স্পীকার দু’জন কিন্তু সংরক্ষিত মহিলা কোটা থেকে ‘নির্বাচিত’ হয়ে আসেননি। ভারতের লোকসভার স্পীকার মীরা কুমার পাঁচবার সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপি। স্পীকার হওয়ার আগে দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেনÑ আমাদের স্পীকারের মতো প্রতিমন্ত্রী নন। মীরা কুমারের পিতা এবং দলিত বা অচ্ছ্যুত জনগোষ্ঠীর নেতা জগজীবন রাম ভারতের প্রায় সব সরকারের আমলেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বড় কথা, মীরা কুমার স্পীকার হয়েছেন সর্বসম্মতিক্রমে। তার বিরুদ্ধে বিরোধী দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। ওদিকে পাকিস্তানের স্পীকার ডাক্তার ফাহমিদা মির্জা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন তিনবার। তাকে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে স্পীকার পদে নির্বাচিত হতে হয়েছে। ৩৪২ আসনের পার্লামেন্টে তিনি পেয়েছেন ২৪৯ ভোট। মাত্র ৯৩ জন তার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। এসব কারণে আর যাকেই হোক ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর মতো সংরক্ষিত মহিলা কোটা থেকে আগত একজনকে অন্তত ভারতের মীরা কুমার এবং পাকিস্তানের ফাহমিদা মির্জার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তাছাড়া অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতার সব দিক থেকেও ওই দু’জন আওয়ামী স্পীকারের চাইতে বহুদূর এগিয়ে রয়েছেন। কথাটা পাঠকরাও মনে রাখতে পারেন। কারণ, এ ব্যাপারে আমরা অদূর ভবিষ্যতেই প্রমাণ পেতে শুরু করবো বলেই আমার নিশ্চিত ধারণা। নারীর ক্ষমতায়নের মতো যুক্তিকেও সমর্থন করা যায় না। সেটাই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে থাকলে বর্তমান সংসদেই এমন বেশ ক’জন নারী এমপি রয়েছেন, যাদের মধ্য থেকে একজনকে স্পীকার বানানো যেতো। এককালের তুখোড় ‘কমরেড’ মতিয়া চৌধুরী বা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মতো কারো নাম না হয় উল্লেখ না-ই করলাম। তথ্যটি জানানোর কারণ হলো, প্রধানমন্ত্রী যা-ই বোঝাতে চান না কেন, নারীর ক্ষমতায়ন একটা অজুহাত মাত্র। তিনি আসলে নিজের বিশ্বস্ত একজন অনুসারীকেই স্পীকার বানিয়েছেন।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে অন্য একটি কথা জানিয়ে রাখা দরকার। ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর ব্যাপারে আপত্তি উঠলেও এমন ভাবনাও আবার সঠিক নয় যে, তার স্থলে অন্য কাউকে স্পীকার বানানো হলেই বিরাট কোনো ব্যতিক্রম ঘটতো। এই না ঘটার কারণ, যিনিই হতেন তিনিও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবেই হতেন। আর চলতেনও তিনি তার দলের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছানুসারেই। উদাহরণ দেয়ার জন্য স্পীকার পদ থেকে সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি হয়ে যাওয়া আবদুল হামিদ এডভোকেটের দু-একটি কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার সময় বিরোধী দলের জন্য আসন বণ্টন থেকেই আবদুল হামিদ বুঝিয়ে ছেড়েছিলেন, তিনি সর্বতোভাবেই আওয়ামী লীগের স্পীকার ছিলেন। আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অসহায় শিকার হওয়ায় প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন থেকেই বিরোধী দলকে অধিবেশন বর্জন করতে হয়েছিল। ক্ষমতাসীনরা তো বটেই, স্পীকার আবদুল হামিদও বিরোধী দলের এমপিদের অধিবেশনে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্বাসযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেননি। অর্থাৎ বিরোধীদলের দাবির ব্যাপারে স্পীকার আবদুল হামিদ আসলে আওয়ামী লীগের নেতার ভূমিকাই পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালেও বিভিন্ন বিষয়ে তাকে একই ধরনের দলবাজি করতে দেখা গেছে। বিরোধীদলকে বাইরে রেখে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করার মতো এমন অনেক তথ্যেরই উলে¬খ করা সম্ভবÑ যেগুলো প্রমাণ করে, স্পীকার হলেও আবদুল হামিদ এডভোকেট কখনো দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে এবং জাতীয় সংসদের দলনিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেননি। মাত্র সেদিনের এ ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায়, ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর স্থলে আওয়ামী লীগের অন্য কেউ স্পীকার হলেও কোনো এদিক-সেদিক হতে পারতো না। দলের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা ও নির্দেশের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে তথা সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী কারো পক্ষেই ভূমিকা পালন করা সম্ভব হতো না। তা সত্ত্বেও জনগণ কিছুটা ভরসা পেতে পারতো যদি অভিজ্ঞ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কোনো এমপি বা পার্লামেন্টারিয়ানকে স্পীকার পদে বসানো হতো। কিন্তু জনগণের সে আশা পূরণের ধারে-কাছেও যাননি ক্ষমতাসীনরা। তারা আসলে জাতীয় সংসদের ভাবমর্যাদা নিয়েই নতুন পর্যায়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছেন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads