সোমবার, ৬ মে, ২০১৩

আলেম-ওলামারাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন


৬ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে কিভাবে চিহ্নিত হবে তা বলা কঠিন। তবে এই দিনটি মূল্যায়নের সময় বাংলাদেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের বেঘোরে রক্ত দেয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেয়া হবে। একই সাথে বিবেচনায় নেয়া হবে নির্বাচিত সরকার কর্তৃক একটি ধর্মীয় ইস্যুকে সামরিক কায়দায় রক্তাক্ত পথে দমনের বিষয়টিও। হেফাজতে ইসলামকে সরকার ও সরকারি জোট যেভাবেই চিত্রিত করার চেষ্টা করুক ইতিহাস অনেক উচ্চ স্থানে রেখে মূল্যায়ন করবে। এই জাগৃতি কিংবা উত্থান গতানুগতিকভাবে দেখা হবে না। এর নেপথ্যে যে প্রেক্ষাপট রয়েছে, সরকার যেভাবে প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছে, জনগণ যেভাবে স্বাগত জানিয়েছেÑ সেই সব আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। হতাহতের বেশুমার অবস্থাকেও সহজেই কেউ মেনে নেবে না।

৬ মে ঐতিহাসিক ‘বালাকোট দিবস’। সৈয়দ আহমদ শহীদের অমর স্মৃতিবিজড়িত এই দিনটির সাথে বাংলার আলেমসমাজ পরিচিত। যেমনি পরিচিত দিল্লির বিখ্যাত আলেম শাহ ওয়ালীউল্লাহ ও তার সুযোগ্য সন্তান শাহ আবদুল আজিজের কর্ম ও জীবনের সাথে।
৬ মে ঢাকায় যা ঘটেছে, মধ্য রাতের পর যে ক্র্যাকডাউন হয়েছে, তার সাথে আলেমসমাজ রক্ত ঢেলে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়ে গেছেন, যেমনি জড়িত ছিলেন শহীদ তিতুমীরের শাহাদতের সাথে বাঁশের কেল্লার রক্তাক্ত ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষীরা। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের সময় ঢাকায় ইংরেজ বাহিনী ও তাদের দালালদের হাতে শত শত প্রাণ বিসর্জনের স্মৃতিও আলেমসমাজ ভুলে যাওয়ার কথা নয়। আজো সিপাহি বিপ্লবের অমর স্মৃতি ধারণ করে বাহাদুর শাহ পার্কের স্মৃতির মিনার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সময়ের দিল্লি ট্র্যাজেডির সাথে ঢাকা ট্র্যাজেডি যেন মিলে গেল!
বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস রক্তস্নাত ইতিহাস। ৬ এপ্রিল থেকে ৬ মে পর্যন্ত আলেমসমাজের ভূমিকা ইতিহাসের মেলবন্ধন মাত্র। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে এমন রক্তঝরা ইতিহাসই খুনরাঙা রাজপথ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিই সাফল্যের পথ রচনা করেছে। এমন শোকাবহ ও বেদনাবিধুর স্মৃতিই পরিবর্তনের বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। এ জন্যই বলা হয় হোসাইন শহীদ হলেও আসলে মরে যায় ইয়াজিদরা। তা ছাড়া এ দেশের আলেমসমাজ জানেন, যাদের কাছে প্রতিদিন আশুরা প্রতিটি জমিন কারবালা তারা সাময়িক নেতৃত্বশূন্য হয়, পথ হারায়, হতাশায় নিমজ্জিত হয়Ñ কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে তারাই জয়লাভ করেন।
৬ মে শোকাবহ স্মৃতি ইতিহাসের বৃন্তচ্যুত কোনো ঘটনা নয়। তবে নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাব অস্বীকার করা যাবে না। সরকার ও সরকারি দল তাদের অবস্থান থেকে যে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছে তাতে স্পষ্ট তারা পথ হারিয়েছে। তাদের ক্ষমতার মেয়াদ ছোট হয়ে আসছে। কোনো রক্তাক্ত বাড়াবাড়ির ফলই সুখকর হয় না। শুভ হয় না। শেষ পর্যন্ত গ্লানিমুক্ত থাকে না।
চূড়ান্ত বিচারে আলেমসমাজ কিছুই হারায়নি। ভুল-ত্রুটির পথ ধরে অচেনা পথে হেঁটে তারা একটা মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। আলেম-ওলামারাও ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। তার পরও তারা হারানো ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছেন। এখন আরো দূরদর্শী হয়ে পথ চলার তাগিদ বাড়ল। বাড়ল সমন্বিত হয়ে কৌশল নির্ধারণই যে সময়ের দাবি এই সত্য অনুভব করা। সরকার তাদের প্রতি সমীহ ভাব প্রদর্শন করবে না। তাদের দাবি মানবে না। তাদেরকে আরো বেশি অসহ্য বিবেচনা করবে। এ বাধা অতিক্রম করেই তাদের চলার পথ রচনা করতে হবে।
ভুলে গেলে চলবে না, পাপ পঙ্কিলতার পথ আলেমদের নয়। ভালো কাজ খারাপ পদ্ধতিতে করা তাদের প্রকৃতি নয়। রাজনীতির জটিল পন্থাও তাদের চেনা রাস্তা নয়। তারা জনগণের রাহবার। আধ্যাত্মিক নেতা। সঠিক পথের পথপ্রদর্শক। কোনো গতানুগতিক পথের রাজনীতিবিদ তাদের পথ দেখাবে না। সুন্নাহ অনুসরণ করে তাদের পথ তাদেরই রচনা করতে হবে। এ জন্য সরকার যেমন তাদের শুভকামনা করবে না, তেমনি রাজনীতির ধান্ধাবাজরাও তাদের সঠিক পথ চেনাবে না। তার পরও মন্দের ভালো বিবেচনায় নিয়ে রাজনীতিবিদ সেজে নয়, রাজনৈতিক সচেতন হয়েই বাঁক ঘুরে দাঁড়াতে হবে। যারা ভাবেন মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী তারা কোনো দিন জ্ঞানপাপী হয় না। সাময়িক পথ হারায়, আবার ভুল-ভ্রান্তির পথ মাড়িয়ে সঠিক পথ খুঁজে পায়। সেই কঠিন পথ চলায় ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে অজ্ঞতার পথে হেঁটে অদূরদর্শী হয়ে লোক ক্ষয় মনজিলের পথে যেতে বাধা সৃষ্টি করে। সামনের পথ আরো বিপদসঙ্কুল। তাই প্রেরণার উৎস হতে হবে ঈমান। পথ চলার প্রক্রিয়া হতে হবে সুন্নাহ বিধৌত। সাফল্য-ব্যর্থতা মাপার মাপকাঠিও হতে হবে তাই। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দিলে আরশের প্রভুও ক্ষমা করবেন না। জুলুম পীড়নে ক্ষতবিক্ষত মজলুম অধ্যুষিত জনপদ থেকে মুক্তির পথও খুলবে না। সরকার যত কঠোর হবে ততই অগণতান্ত্রিক হিসেবে চিহ্নিত হবে। যত নিষ্ঠুর হবে ততটাই আত্মঘাতী হবে। জনগণের সরকার আত্মঘাতী হলে বিপর্যয় অনিবার্য।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads