ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
সর্বজন শ্রদ্ধেয়
সাংবাদিক সাপ্তাহিক হলিডের সম্পাদক মরহুম এনায়েতউল্লাহ খান শেখ মুজিবুর রহমানের
করুণ মৃত্যুর পর তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘শেখ
মুজিবের উত্থান ও পতন’ শীর্ষক এক শক্তিশালী
নিবন্ধ লিখেছেন। তাতে শেখ মুজিবের উত্থান পর্বও ছিল, তেমনি তার পতন পর্বও অত্যন্ত সুচারুরূপে তুলে ধরেছিলেন। তিনি
লিখেছিলেন ‘শেখ মুুজিবের রাজনৈতিক
কর্মকাণ্ড এক দিকে নাটকীয়তায় চমকপ্রদ, অন্য
দিকে দ্বৈততায় খণ্ডিত।’ তার ক্ষমতারোহণের বিগত
এক দশক অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলেছিল। অগণিত আত্মদান এবং এক ঝুড়ি রূপকথা মিলিয়ে
তৈরি হয়েছিল তার স্বর্গের সিঁড়ি। ব্যক্তিত্বের অপরিমিত শৌর্য ও অনুকূল ইতিহাসের
সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল তার রাজকাহিনী। তিনি ছিলেন রূপকের রাজা। সত্যিকারের মুকুটের
ভার তাই তিনি বইতে পারেননি। বরং মুকুটের ভারে তিনি ন্যুব্জ হয়েছেন। রক্তকরবীর
আত্মবিমোহিত রাজার মতো দুঃশাসনের অচলায়তন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। যারা প্রাণ দিলো, ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে পদাঘাত করে
নির্দ্বিধায় অস্ত্র তুলে নিলো, যারা দেশপ্রেমের
সুমহান অঙ্গীকারে রক্ত দিয়ে মাতৃভূমির ঋণ শোধ করল, তাদেরই রক্ত-মাংস-হাড়ের বিনিময়ে তিনি গড়তে চেয়েছিলেন এক অলৌকিক
ক্ষমতার দেউল। সেখানে দেবতা একক, কিন্তু পূজারী নেই।
পরদেশী পটুয়ার হাতে সৃষ্টি হলো পুতুলের রাজা শেখ মুজিবুর রহমান। আমার এ কথা
নিষ্করুণ জানি, কিন্তু ইতিহাস আরো বেশি
নির্মম। এবং তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ১৫ আগস্ট। হঠাৎ দ্রিম দ্রিম শব্দে বিদীর্ণ হলো
নিস্তব্ধ প্রভাত। একঝাঁক আগ্নেয় শিষে লাখো কোটি মানুষের সীমাহীন রোষের আকস্মিক
বিস্ফোরণের মতো নিপাত করল পুতুলের রাজত্ব।’
এনায়েতউল্লাহ
খান আরো লিখেছেন, ‘পরলোকগত দুর্গাপ্রসাদ ধরের (ডিপি
ধর) অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত মুজিবনগরে সরকারের বশংবদ নেতৃত্ব ও প্রশাসন এবং
সম্প্রসারণবাদের সৃষ্ট মুজিববাহিনীর প্রতিবিপ্লবী কার্যক্রম একাত্তরের সংগ্রামের
সবচেয়ে মসি লিপ্ত অধ্যায়। ইতিহাস এর সাক্ষ্য দেবে, সাক্ষ্য দেবে জাতীয় মুক্তির প্রত্যাশী ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদবিরোধী লাখো
কোটি দেশপ্রেমিক জনগণ। এরই ফলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ৩০ লাখ প্রাণ ও আকাক্সিত জাতীয় মুক্তির পরিবর্তে দেশবাসী পেল
এক পুতুল সরকার। এবং সংক্ষেপে এটিই পুতুলনাচের ইতিকথা। শেখ মুজিবুর রহমান এই
ইতিকথার নেপথ্য নায়ক। আগরতলার কুখ্যাত ষড়যন্ত্র মামলা এবং একাত্তর সালে
মুজিববাহিনীর অভ্যুদয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং
বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনের পর্যায়ক্রমিক ঘটনাপঞ্জি। সাড়ে সাত কোটি
বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, জাতিগত নিপীড়নের
বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ এবং সম্প্রসারণবাদবিরোধী
সংগ্রামের সাথে এর মৌলিক তফাত রয়েছে। প্রথমটি বাঙালি বুর্জুয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য ও
মেরুদণ্ডবিহীন অংশের ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত এবং দ্বিতীয়টি বাঙালি জাতীয় বুর্জুয়ার
অংশসহ সব শ্রেণীর মানুষের জাতীয় ও অর্থনৈতিক মুক্তির চূড়ান্ত সংগ্রাম। আমার বেদনা
বোধহয় এ জন্য যে, শেখ মুজিবের প্রতি পুরো
দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও তার সঙ্কীর্ণ শ্রেণী চেতনার বিদেশী প্রভুর
দায়বদ্ধ রাজনীতির শৃঙ্খল মোচন করতে পারেননি। বরং পুতুলের মতো হয়তো বা অনিচ্ছুক
পুতুলের মতো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার দ্বৈত ভূমিকা পালন করে গেছেন।
‘তিনি
ছিলেন দক্ষ নট। অভিনয়ের চাতুর্যে প্রতিটি নাটকীয় মুহূর্তে দর্শকবৃন্দের তুমুল
করতালি কুড়িয়েছেন, বাগ্মিতার সম্মোহন ও বিঘ্রমের
মায়াজাল রচনা করেছেন। জাতীয় স্বাধীনতার মহানায়কের শিরোপা পরিধান করেছেন। কিন্তু
বারবার ষড়যন্ত্রের ঋণ শুধতে গিয়ে বাংলার মুক্তিকামী মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা
করেছেন। সেখানেই তার ট্র্যাজেডি।’
এ
কথা খুব স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনা এখন
আধিপত্যবাদের হাতের তৈরি এক পুতুল মাত্র। তার মাথায় মুকুটের ভার। বইবার ক্ষমতা তার
নেই। কিন্তু তিনিও পরদেশী পটুয়ার হাতে তৈরি পুতুল মাত্র। এ পুতুল ভারতীয়
আধিপত্যবাদীরা সৃষ্টি করেছে দীর্ঘকাল ধরে। শেখ হাসিনা ও তার বোন যখন ছয় বছর ভারতীয়
আশ্রয়ে ছিলেন, তখন তাদের যাবতীয় খাওয়া-দাওয়া, ভরণ-পোষণ সব কিছুই করেছিল ইন্দিরা গান্ধীর
সরকার। শেখ হাসিনার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে চাকরি দিয়েছিল। তিনিও কিছুটা উপার্জনের
সুযোগ পেয়েছিলেন। ফলে শেখ হাসিনাও ভারতের পুতুল মাত্র হয়ে আছেন। ২০০৮ সালের
নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় এনেছিল ভারত ‘বস্তা
বস্তা টাকা ও পরামর্শের’ মাধ্যমে। এ কথা এখন আর
কারো কাছে অপ্রকাশিত নেই।
মানতে
হবে শেখ হাসিনার চেয়ে শেখ মুজিবুর রহমান অনেক বড় নেতা ছিলেন। তার পরও তিনিও ছিলেন
পরদেশী পটুয়ার হাতের পুতুল। শেখ হাসিনা তো কোন ছাড়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত মিলে যে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় এনেছে, সে কথা কেউ গোপন রাখেনি। মার্কিন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটন তো ড. ইউনূস ইস্যুতে কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে
স্পষ্টই বলেছেন, কিভাবে আপনাকে ক্ষমতায় বসানো
হয়েছে, আশা করি সেটি আপনি স্মরণ
করতে পারবেন। আর তার সাক্ষী হিসেবে সেই নির্বাচনের দুই খলনায়ক এখন যুক্তরাষ্ট্রেই
আছে। ভারত এ রকম কোনো হুমকি শেখ হাসিনাকে দেয়নি। বরং বাংলাদেশকে ভারতীয়
সম্প্রসারণবাদের গ্রাসে নেয়ার জন্য যা কিছু করা দরকার, শেখ হাসিনাকে দিয়ে তার সব কিছুই প্রায়
করিয়ে নিয়েছে বা নিচ্ছে। চাণক্য কূটনীতির অংশ হিসেবে এরা এ কাজ নিভৃতেই করে যাচ্ছে।
শেখ
হাসিনার বিগত পাঁচ বছরের অপশাসন, দুঃশাসন মানবাধিকার
লঙ্ঘন, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন
এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, সারা পৃথিবী এর
বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন পার্লামেন্টে এ দুঃশাসনের
বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। সরকারের লেলিয়ে দেয়া মাস্তানেরা এসব জায়গায় কোনো
প্রতিবাদই করতে পারেনি। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান
কি মুন দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সরকারকে এই ফাঁসি কার্যকর না করার
জন্য অনুরোধ করেছে। সেসব জায়গায় শেখ হাসিনার আশ্রিত শাহবাগীরা কোনো তুলকালাম করতে
পারেনি কিংবা তা কল্পনাও করেনি। কিন্তু পাকিস্তান পার্লামেন্টে এ নিয়ে শোকপ্রস্তাব
গৃহীত হলে পুলিশ আর শাহবাগী মিলে দুই দিন ধরে ভালোই নাটক করেছে।
আওয়ামী
লীগের মন্ত্রীরা বলেছেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের
অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে। এ জন্য তাদের ক্ষমা চাইতে হবে। এর আগে বলেছিলেন, বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য তাদের ক্ষমা চাইতে
হবে। পাকিস্তান বলেছিল, সিমলা চুক্তি আর ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের
মধ্যে চুক্তির সময় সে ক্ষমা চাওয়া হয়ে গেছে। আর কতবার ক্ষমা চাইতে হবে? কিন্তু যান তো দেখি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অফিস বা মার্কিন দূতাবাস
ঘেরাও করুন। ঘেরাও করুন জাতিসঙ্ঘ অফিসও।
কোন
মুখে যাবেন? এক আবুলের দুর্নীতির জন্য
পদ্মা সেতু ভণ্ডুল হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, জাইকা
ওই দুর্নীতির জন্য তাদের ঋণ প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অথচ শেখ হাসিনা
সেই আবুলকেই বাংলাদেশের সেরা দেশপ্রেমিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। অর্থাৎ যে যত
বেশি দুর্নীতিবাজ, সে তত বড় দেশপ্রেমিক। শেখ
হাসিনার এই তত্ত্ব কেউই মেনে নেয়নি। ফলে পদ্মা সেতু গেছে।
আজ
নির্বাচন নিয়ে খেলা চলছে। সারা পৃথিবী বলেছিল, এ
নির্বাচন হোক সব দলের অংশগ্রহণমূলক। তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক।
অনেকে এ কথা স্পষ্ট করে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার
ফিরিয়ে আনা হোক। কিন্তু শেখ হাসিনা সে কথায় মোটেও কর্ণপাত করেননি। মাঝখানে ভারতের
পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এসে শেখ হাসিনা ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কানে কানে কী
যেন বলে গেলেন। এর পর আরো জেদি হয়ে উঠলেন শেখ হাসিনা। এরশাদও প্রকাশ্য ঘোষণা করলেন, কোনো অবস্থায়ই তিনি নির্বাচনে যাবেন না।
কিন্তু সুজাতা সিং জানিয়ে গেলেন, হোক একদলীয় নির্বাচন
তবু শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় থাকতেই হবে। এ নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের কেউ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে ১৫৫ জন এমপি বিনা
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলেন। বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম নির্বাচন আর কোথায়ও
অনুষ্ঠিত হয়নি।
আর
নির্বাচন কমিশন? এমন অথর্ব নির্বাচন কমিশন
পৃথিবীতে বুঝি আর দ্বিতীয়টিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যারা নির্ধারিত দিনের মধ্যে
জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের পা চেটে মনোনয়ন প্রত্যাহারপত্র গ্রহণ
না করে তাদের নির্বাচিত ঘোষণা করে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দুই দিন, তিন দিন পর পর্যন্ত জাতীয় পার্টিকে জেতাতে
শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সুযোগ দেয়া হয়।
শুধু ধিক্কার দিলেই যথেষ্ট নয়। শুধু ছি: ছি: বললেই যথেষ্ট নয়। মানুষ সুযোগ পেলে এ
নির্বাচন কমিশন সদস্যদের মুখে থুতুতে ভরিয়ে দেবে।
দেশব্যাপী
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে মাসাধিককাল ধরে অবরোধ
চলছে। সরকার ভেবেছিল, ক’দিন আর। অত্যাচার, নিপীড়ন, মারধর
চালাতে থাকলে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিলে আন্দোলন কোথায় যাবে। কিন্তু সে
আশা সফল হয়নি। রাজপথ-রেলপথ-নৌপথ মাসাধিককাল ধরে জনগণ অবরোধ করেই রেখেছেন। সরকার এক
বিচ্ছিন্ন দ্বীপ রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কিন্তু এ যে পুতুল সরকার।
পরদেশী পটুয়ার হাতে তৈরি এক পুতুল। এরা যেমনি তাকে নাচাচ্ছে, তেমনি তিনি নাচতে বাধ্য হচ্ছে। বাধ্য হচ্ছে
বলা বোধকরি সঙ্গত হচ্ছে না। কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করতে তেমনি তিনি নেচে যাচ্ছেন।
ইতিহাস সাক্ষী, এ নৃত্য অপরের হাতে। তারা
যখন চাইবে এ নৃত্যও থেমে যাবে। পুতুলনাচ অনন্তকাল ধরে চলতে পারে না। চলবেও না।
জনগণের যে আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সারা দেশে চলছে, তাতে সুতোওয়ালারাও একসময় থামতে বাধ্য হবে। তার পর খেল খতম।
পয়সা হজম।
0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন