শুক্রবার, ৫ এপ্রিল, ২০১৩

গৌরব যেভাবে কলঙ্কিত


স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য কলঙ্কিত স্মরণীয় দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। অত্যন্ত মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক এবং শোকবিহ্বল এই দিন। পৃথিবীর কোনো দেশে নিজ বাহিনীকে ধ্বংস করার নজির ইতিহাসের পাতায় নেই। আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর নিজের ৫৭ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে বিশ্বের ইতিহাসে সে নজির স্থাপন করে। আমি ব্যক্তিগত কাজে সেদিন আনুমানিক সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একজন অফিসারের সাথে দেখা করতে যাই। আলাপচারিতার প্রায় পাঁচ মিনিটের মাথায় ওই অফিসার একটি ফোনকল রিসিভ করে তৎক্ষণাত চেয়ার থেকে উঠে গেলেন। অন্য একজন অফিসারকে ডেকে আমাকে আপ্যায়ন করতে বললেন। ‘জেনারেল শাকিলকে বিডিআর সদর দফতরে আটকিয়ে ফেলেছে’-  কথাটি বলেই দ্রুত তিনি ফোনকারীর দফতরে ছুটে যান। আমি হতভম্ভ হয়ে শুধু এটুকু মন্তব্যই করলাম, ‘নিশ্চয়ই বিডিআরে  এডি/ডিএডিদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয়েছে।’ এ ধরনের মন্তব্য আমার মুখ থেকে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ার কারণ হলো আমিও বিডিআরে তিন বছর চাকরিকালে এডি/ডিএডিদের মনোভাব অতি কাছে থেকেই অনুভব করেছি। যেটুকু দেখেছি তাতে নগণ্যসংখ্যক বাদে বাকিদের অত্যন্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ দেখেছি। কেন জানি বিডিআরে সামরিক অফিসার তাদের অসহ্য। বিভিন্ন সময়ে আমার কথাবার্তা এবং নির্দেশাবলি বিকৃত করে সৈনিকদের উসকানি দিতেও দেখেছি। সামরিক অফিসারদের প্রতি অনুগত সৈনিকদের তারা সবসময় হুমকি-ধমকি আর নানা চাপের মধ্যে রাখতেন বলে সৈনিকদের মুখে অনেক অভিযোগ শোনা যেত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ০৮ জানুয়ারি হোয়াইক্যং বিওপির বিপরীতে নাফ নদীর স্রোতধারার একাংশে মিয়ানমারের একটি ক্রসবাঁধ নির্মাণ প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে সেখানে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। আমার অনুরোধে বিডিআর সদর থেকে অপারেশনের জন্য সামরিক অফিসারের পাশাপাশি বিভাগীয় অফিসারও (এডি/ডিএডি) পাঠানো হয়েছিল। জনৈক এডি মোবারককে রসদভাণ্ডার, যানবাহন, গোলাবারুদ নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ করার জন্য পাহাড়ের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দময় স্থানে লজিস্টিকস কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই লজিস্টিকস কেন্দ্রে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যে ঘেরা ফরেস্টের একটি রেস্টহাউজ ছিল; সেখানে তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। অপর দিকে আমি অন্যান্য সামরিক অফিসারসহ অপারেশন কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্মুখলাইনে দিবারাত্রি এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে, প্রায় মাসখানেক আমরা কখনোই নিয়মিত নাওয়া-খাওয়া করতে পারিনি। স্বাভাবিক বিশ্রাম কিংবা নিদ্রা বলতে কোনোটাই আমাদের ছিল না। এরই মধ্যে এক দিন এডি মোবারক ওয়্যারলেসে কথোপকথনে খুব ুব্ধভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি আমি কেমন আছি না আছি একবারও খোঁজখবর নিয়েছেন?’ তার স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়ে তিনি আরো কিছু ঔদ্ধত্যপূর্ণ উক্তি করে বসেন। প্রতিউত্তরে আমি শুধু এটুকুই বললাম, ‘আপনি কি রণাঙ্গনে এসেছেন নাকি অন্য কোথাও এসেছেন? তদপুরি আপনি যে বেশ ভালোই আছেন তা আমি জানি।’ ওয়্যারলেসে এডি মোবারকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ শুনে অপারেশনে নিয়োজিত সামরিক অফিসাররা খুব ক্ষুব্ধ হন। কিছুক্ষণ পর আমার একজন  মেজর পদবির অফিসার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের দায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কি না জানতে চান। উত্তরে আমি তাকে বলি, বিডিআরের প্রচলিত আইনে ডিএডি/এডিদের বিষয়ে শৃঙ্খলামূলক যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার মতো কার্যকর তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই।’

গৌরবের পথে বিডিআর : ০৮ জানুয়ারি ২০০১ তারিখে ক্রসবাঁধ নির্মাণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে আমি জনৈক কোম্পানি কমান্ডারকে (যিনি একজন সুবেদার) তার কোম্পানি নিয়ে আমার সাথে নাফ নদীর দিকে সম্মুখলাইনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়া মাত্র তিনি পেটে কামড়ের কথা বলে মাটিতে বসে পড়েন। অপর দিকে সম্মুখলাইনে অবস্থান নেয়ার পর নাসাকা বাহিনীর ওপর জনৈক ল্যান্স নায়েককে এলএমজির গুলিবর্ষণের নির্দেশ দিলে তিনি কাঁপতে কাঁপতে এলএমজি ছেড়ে দেন। এমতাবস্থায় একজন হাবিলদারকে (আলাউদ্দিন) এলএমজির কাছে যেতে বলে আমি নিজেই আমার এলএমজি দিয়ে নাসাকা বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করে বাঁধ নির্মাণ প্রতিহত সূচনা করি। এরই ধারাবাহিকতায় আমার পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক অন্যান্য সৈনিক দিয়ে গুলিবর্ষণ করে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করে দেই। ওই রাতেই নাসাকা বাহিনীর পাশাপাশি তাদের নিয়মিত সেনা ইউনিট মোতায়েন শুরু হলে আমি আমার অধীনস্থ বিডিআর কোম্পানিগুলোকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সামরিক অফিসার চেয়ে বিডিআর সদরে অতি জরুরি বেতার বার্তা পাঠাই। সে অনুসারেই তার পর দিন (০৯ জানুয়ারি ২০০১) সকাল নাগাদ কয়েকজন সামরিক অফিসার আমার কাছে পৌঁছলে বিডিআরের সুবেদার পদবির কোম্পানি কমান্ডারদের মেজর ও ক্যাপটেন পদবির অফিসার দিয়ে প্রতিস্থাপন করে রণকৌশল মোতাবেক পুনর্গঠন (regroup) করে টেকনাফের প্রায় ৫৯ কি.মি. সীমান্তে প্রতিরক্ষা অবস্থানে মোতায়েন করি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ০৪ জানুয়ারি ২০০১ থেকেই মিয়ানমার সীমান্ত চুক্তি লঙ্ঘন করে ক্রসবাঁধ নির্মাণ শুরু করলে নাসাকা বাহিনীকে চিঠি দিয়ে আলোচ্য বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করার অনুরোধের পাশাপাশি আমি সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি নাফ নদীর পাড়ে রাতের আঁধারে সৈনিক এবং ভারী অস্ত্র মোতায়েন করতে থাকি। প্রতিরক্ষা অবস্থানের শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়োজনে  দিনের বেলায় চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করি। নাসাকা বাহিনী পত্রালাপের প্রতি তোয়াক্কা না করে ক্রসবাঁধ নির্মাণ অব্যাহত রাখায় অবশেষে শক্তি প্রয়োগের কোনো বিকল্প ছিল না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, Time lost by own is time gained by enemy-কথাটি মাথায় রেখেই সময়োচিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমার নিজ উদ্যোগে সৈনিক ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন সম্পন্ন করি। আমি প্রতিপক্ষের বাঁধ নির্মাণ স্থানে হামলা করার অনুমতি চাইলে তদানীন্তন ডিজি মহোদয় (জেনারেল আ.ল.ম ফজলুর রহমান) প্রথমে কিছুটা ইতঃস্তত করলেও আমার দৃঢ়তা এবং আমার প্রতি ডিডিজি মহোদয়ের (ব্রি. জে. রফিকুর রহমান) অবিচল আস্থার কারণে অবশেষে তিনি সবুজ সঙ্কেত দেন। আমার প্রতি ডিডিজি মহোদয়ের আস্থার কারণ হলো আমার নেতৃত্বে ০৬ অক্টোবর ৯৯ কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদ এলাকায় বিএসএফের সাথে দিনভর সীমান্ত সংঘর্ষের জের ধরে বিএসএফের ক্ষয়ক্ষতির (বিএসএফের বোট আক্রমণ করায় নদীতে ১১ বিএসএফ সদস্যের সলিল সমাধি ঘটে) পাশাপাশি ভারতের দখলে থাকা বোয়ালমারী নদীর বাংলাদেশের অংশ দখলমুক্ত করা। ফ্যাগ মিটিংয়ের যৌথ কার্যবিবরণীতে বিষয়টি তখন লিপিবদ্ধ করা হয়। যা হোক, বাঁধ নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়া হলেও প্রতিপক্ষ তাদের সেনা মোতায়েন অব্যাহত রাখায় আমাদের প্রান্তেও মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে অতিরিক্ত বিডিআর এবং আরো ভারী অস্ত্র মোতায়েন করা হয়। Ground situation মূল্যায়ন করে ডিজি মহোদয়কে আমার দেয়া পরামর্শ মোতাবেক সেন্টমার্টিন দ্বীপের পূর্ব প্রান্তে আমাদের নৌবাহিনীকে ও সতর্ক অবস্থানে নেয়া হয়। এ দিকে নাসাকা বাহিনীর সহিত মংডুতে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জাতীয় পর্যায়ে ক্রসবাঁধ নির্মাণ স্থানের অদূরে মিয়ানমারের লাইচাদং ক্যাম্পে সীমান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, উভয় দেশের কারিগরি নৌ-বিশেষজ্ঞের দিকনির্দেশনা ছাড়া মিয়ানমার ক্রসবাঁধ নির্মাণকাজ আর এগোবে না। ইতোমধ্যে আমাদের গুলিবর্ষণের আগে যেটুকু (প্রায় ৬০ শতাংশ) বাঁধ নির্মিত হয়েছিল তা-ও জোয়ার-ভাটায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এরপর নাসাকার নাফ নদীতে বাংলাদেশী নাগরিক, বোট, মাছ ধরার জাল ইত্যাদি লুট করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত দাঁতভাঙা জবাবের মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়। একাধিকবার তাদের অপতৎপরতা বন্ধে গুলিবর্ষণ করে আমরা নাসাকা ক্যাম্প ঝাঁঝড়া করে দিই এবং অবৈধভাবে সীমান্ত লঙ্ঘনের দায়ে নদী থেকে সশস্ত্র নাসাকা সৈনিক গ্রেফতার করে এনে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সীমান্ত সহিংসতা পরিহারে লিখিত অঙ্গীকার আদায়ের মাধ্যমে তাদের ফেরত দিই । নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশে  নাসাকা বাহিনীর অবাধ অনুপ্রবেশের ফলে যে নদীতে বাংলাদেশীরা নামতে আতঙ্কগ্রস্ত থাকতেন সে নদীতে নাসাকার অপতৎপরতা এতটাই স্তব্ধ হয়েছিল যে, আমার মেয়াদের অবশিষ্ট সময়ে নাসাকাকে নদীর মধ্যস্রোতে কিংবা তার আশপাশে চলাচল করতে তেমন একটা দেখিনি। আগে এতে করে স্বাধীনতা-উত্তরকালে অনিরাপদ নাফ নদী বাংলাদেশীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে ওঠে। সীমান্তে বাংলাদেশীদের মনে স্বস্তি ফিরে আসে। মানুষ বিডিআরের প্রতি আস্থাশীল হয়ে ওঠে এবং তাদের ভূয়সী প্রশংসা করে। আমাদের অনেক অফিসারই তখন সীমান্ত সুরক্ষায় আমার দৃঢ় পদক্ষেপকে অভিনন্দন জানাতে থাকেন। পাশাপাশি বিডিআরের সব পদবিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সেই অনুপ্রেরণা পরে পদুয়া এবং রৌমারীতে অনন্য সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
এক দিন রামুতে একটি সেনা ইউনিটে বেড়াতে গেলে ইউনিট অধিনায়ক প্রসঙ্গক্রমে মিয়ানমারের সাথে আমাদের সীমান্ত রক্ষায় বিডিআরের সক্ষমতার বিষয়ে মন্তব্য করতে বলেন। আমি ‘বিডিআরের দক্ষতা ইনশাআল্লাহ সীমান্ত রক্ষার জন্য যথেষ্ট’ বলে মন্তব্য করি। এমনকি নাফ সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত সেনা ইউনিট প্রত্যাহারের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করি। তবে এটাও বলি, ‘বিডিআরের কোম্পানি কমান্ডার পদে বিদ্যমান সুবেদারের পরিবর্তে সাংগঠনিক কাঠামোতে সেনাকর্মকর্তা হলে প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই ভালো হয়।’ কুড়িগ্রাম সীমান্তে বিএসএফ এবং নাফ সীমান্তে নাসাকা বাহিনীর সাথে সীমান্ত সংঘর্ষে অত্যন্ত সফলতার সাথে নেতৃত্ব দেয়া ছাড়াও ২০০২ সালের শুরুতেই নেত্রকোনার ভবানীপুর বিওপি এলাকায় শূন্যরেখায় বিএসএফ ক্যাম্প নির্মাণ প্রচেষ্টা প্রতিহত করি। বিডিআরে চাকরিরত অবস্থায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তে এসব সফলতায় বিডিআরের প্রশংসায় আমি ছিলাম পঞ্চমুখ। এমনকি বিডিআরে কর্মরত থাকার  সময় একটি দুঃখজনক ঘটনার শিকার হয়ে আমার সামরিক জীবনের মর্মান্তিক পরিসমাপ্তি ঘটা সত্ত্বেও বিডিআরের প্রতি আমার আন্তরিকতা ও আস্থার কমতি দেখা দেয়নি। বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা আজো আমার কাছে এক অবিশ্বাসযোগ্য ঘটনা বলেই মনে হয়।
করণীয় : বিদ্রোহের ফলে আমাদের দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে হলে রাজনৈতিক সহিংসতা পরিহার, আভিধানিক অর্থেই সর্বদলীয় কিংবা নির্দলীয় গণতন্ত্রের চর্চা, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, নির্দলীয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমরবিদ সমন্বয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা চূড়ান্তকরণ একান্ত অপরিহার্য। সবাইকে অনুধাবন করতে হবে সুরক্ষিত সীমান্ত আর অখণ্ডিত দেশ রক্ষার প্রয়োজনে দরকার আমাদের ঐক্যবদ্ধ জাতি। ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনে পৃথিবীর বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশ (যেমন   : ভারত, আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, জাপান ইত্যাদি) আমাদের অনুকরণীয় মডেল হতে পারে। এসব দেশে সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দল একত্রে মিলেমিশে জনমত জরিপ করে পথ চলে। কার্গিল যুদ্ধে নামার আগে স্বার্থ বিবেচনায় ভারত সে দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একত্রিত হয়ে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাতে দেশের আপামর সব জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করে।
* আমাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর শৃঙ্খলার মান অুণœ রাখতে এবং তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালনে বিডিআর আইন সংশোধনের পাশাপাশি নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে :
ক. পুলিশের এএসপিকে তিন বছরের জন্য প্রেষণে কিংবা বিসিএস কর্মকর্তাকে বিএমএ-তে ছয় মাস প্রশিক্ষণ দিয়ে ডিএডি পদে নিয়োগদান। খ. বিজিবির কোম্পানি কমান্ডার পদটি প্রেষণে সামরিক কর্মকর্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন। গ. বিজিবিতে সর্বস্তরে পদোন্নতির বিষয়ে  সততা ও সুনামের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বসহকারে মূল্যায়ন করা। ঘ. বিজিবিতে নিয়োগের ক্ষেত্র প্রতিভাবান/পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া।
* সব গণমাধ্যমে প্রতিবেশী দেশের জনগণকে সে দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সীমান্ত অপরাধগুলোকে অবহিতকরণ।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যে ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নকে নেতৃত্ব দিয়ে আমি নাসাকাকে আতঙ্কিত করে তুলেছিলাম সে ইউনিট তাদের অধিনায়ককে বিদ্রোহে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। হত্যা করেছে আমারই অধীনস্থ সহকর্মী মেজর আশরাফ (আর্টিলারি) নামে এক অত্যন্ত সৎ, দৃঢ়চেতা, সাহসী ও ইস্পাত কঠিন দেশপ্রেমিক অফিসারকে। হত্যার শিকার হয়েছেন আমার অতি পরিচিত লে. কর্নেল কায়সার (ইঞ্জিনিয়ার) এবং মেজর আজিজ (ইঞ্জিনিয়ার)। এরা প্রত্যেকেই সৎ ও সাহসী।
আমি স্তম্ভিত হয়ে পড়ি। আজো আমার বুঝতে কষ্ট হয় যে, বিদ্রোহের নামে বিডিআর নিজের অফিসারকে নারকীয়ভাবে এভাবে হত্যা করতে পারে, অফিসারদের পরিবারকে হায়েনার মতো নির্যাতন করতে পারে। তাই আজ আমার চরম ঘৃণা তাদের প্রতি যাদের একদা পরম দেশপ্রেমিক বলে স্মৃতিচারণ করতে আনন্দে আমার বুক ফুলে উঠত অথচ বিদ্রোহ করে তারাই দেশের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। বিডিআর বিদ্রোহের পর আমাদের এই সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর শৌর্য-বীর্য ধুলোয় মিশে একাকার হয়ে যাওয়ায় নাসাকা বাহিনী সীমান্তে আগের মতো হিংসাত্মক অন্যায় আচরণ, বাংলাদেশ জলসীমায় অবাধ বিচরণ, সীমান্তবাসী এবং তাদের বোট-জাল লুণ্ঠন ও অপহরণ পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। অপর দিকে ভারত সীমান্তেও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে বিএসএফ যখন যা খেয়াল খুশি যাচ্ছেতাই নির্বিচারে পাখি শিকারের মতো মানুষ হত্যা করে চলেছে। কুড়িগ্রাম ও নাফ সীমান্তে বিডিআরের প্রশংসনীয় তৎপরতার পর সিলেটের পদুয়া এবং জামালপুরের রৌমারী সীমান্তে বিডিআর সীমান্ত রক্ষায় দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসা অর্জন করেছিল। আর এসবই সম্ভব হয়েছিল দেশপ্রেমিক বীর সেনাকর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বিডিআর পরিচালিত হওয়ার কারণে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads