শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৩

তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহাল সরকারের নৈতিক দায়িত্ব


বর্তমান সংসদের মেয়াদ মাত্র কয়েক দিন বাকি। অথচ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জাতির সামনে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। পুরো জাতি চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভুগছে। সাধারণ জনগণ তো বটেই, এমনকি যারা রাজনৈতিক মাঠের খেলোয়াড় তারাও এ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও বুঝতে পারছেন না, সংসদ নির্বাচন কখন কিভাবে হবে। পুরো জাতিই আজ দিকনির্দেশনাহীন। আমাদের বর্তমান রাজনীতি তথা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির গন্তব্য কোথায় কোন দিকে, ১৬ কোটি মানুষের কেউ তা জানি না। এক দিকে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, তিনি সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বেন না, সংবিধান অনুযায়ী সংসদ এবং মন্ত্রিসভা বহাল রেখেই নির্বাচন হবে। অন্য দিকে ১৮ দলীয় জোটনেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দলীয় সরকারের অধীনে ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে যাবে না। (বাংলাদেশ প্রতিদিন-১৯ আগস্ট ২০১৩)। সরকারের মন্ত্রী এবং মহাজোট নেতারাও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয়ে আছেন। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ গত ১ সেপ্টেম্বর বলেন, ‘নির্বাচন ৯০ দিনের আগে না পরে তা পরিস্থিতিই বলে দেবে’ (্বাংলাদেশ প্রতিদিনÑ ২ সেপ্টেম্বর ২০১৩)। মহাজোট সরকারের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ গত ৪ সেপ্টেম্বর রংপুরে পার্টির এক সম্মেলনে বলেন, ‘আগামী দিনে কী হবে আমরা জানি না, নির্বাচন হবে কি না তা-ও বলতে পারছি না। জানেন না দুই নেত্রীও। নির্বাচন নিয়ে আমরা অন্ধকারে আছি। এ অবস্থার সমাধান না হলে গণতন্ত্র নিশ্চিতভাবেই হুমকির মুখে পড়বে।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন- ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ইং)। খোদ নির্বাচন কমিশনও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। ৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ বলেন, ‘কিভাবে দশম সংসদ নির্বাচন হবে তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো পরিষ্কার নয়। নবম সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে কি না সে নিয়ে সংশয় রয়েছে’ (বাংলাদেশ প্রতিদিনÑ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩)। কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচিত সরকারের পক্ষে পুরো জাতিকে এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়া কাম্য হতে পারে না; বরং কোনো অনিশ্চয়তা বা সমস্যা দেখা দিলে তা নিরসন করা সরকারেরই দায়িত্ব। নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো দল সরকার গঠন করলেই রাষ্ট্রের এবং জনগণের ওপর সে সরকারের সব কর্তৃত্ব ও অধিকার অর্জিত হয়ে যায় না। সরকারকে জনগণের প্রদত্ত ম্যান্ডেট অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করতে হয়। ম্যান্ডেটের বাইরে যাওয়ার কোনো অধিকার সরকারের নেই। নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের অর্থ হচ্ছে জনগণের সাথে সরকারের চুক্তি সম্পাদন। কেবলমাত্র সে চুক্তির অধীনেই সরকার দেশ ও জনগণকে পরিচালিত করার অধিকার রাখে। জনগণের সাথে সম্পাদিত চুক্তির শর্তাবলীর বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার এখতিয়ার সরকারের থাকে না। এরূপ কোনো পদক্ষেপ নেয়া হলে তা চুক্তি ভঙ্গের শামিল বলেই গণ্য হবে। কোনো প্রয়োজনে চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করতে চাইলে জনগণের মতামত নিয়েই তা করতে হবে। যেকোনো চুক্তির সাধারণ নিয়ম এই যে, চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলোর কোনো এক পক্ষকে বাদ দিয়ে বা তাদের সম্মতি না নিয়ে অন্যপক্ষ চুক্তির একটি ধারাও পরিবর্তনের এখতিয়ার রাখে না। বর্তমান সরকার যখন ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় তখন জাতির সামনে রাজনৈতিক পথপরিক্রমার একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা ছিল। ১৯৯০ সাল থেকে অবিতর্কিতভাবে চলে আসা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানের আওতায় সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে। সংবিধানের অংশ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সে বিধানকে সংরক্ষণের জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেয়। সে বিধানের আওতায় সরকার জনগণের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় যে তারা পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজেরা ক্ষমতা থেকে সরে যাবে। এ শর্তের অধীনেই জনগণ সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণের অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকার ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সাথে করা তাদের সে চুক্তি রক্ষা করার পথে অগ্রসর হয়নি। বরং তারা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, এমনকি জনগণের প্রবল প্রতিবাদ উপেক্ষা করে নিজেদের স্বার্থে আদালতের রায়ের এক খণ্ডিত অংশকে গ্রহণ করে একতরফাভাবে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এর মাধ্যমে সরকার দেশবাসীর চলার পথের একটি মীমাংসিত বিষয়, জাতির পথ চলার একটি নির্ধারিত নিশানা বিলুপ্ত করে দিয়েছে। জনগণ পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিতে দেশ পরিচালনার জন্য সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছিল, কিন্তু সরকার ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের দেয়া সে শর্ত জনগণের মতামত ছাড়াই পরিবর্তন করে ফেলেছে। পাঁচ বছর মেয়াদ শেষে ক্ষমতা ছাড়ার শর্ত লঙ্ঘন করে সরকার এখন ক্ষমতায় থেকেই তাদেরই অধীনে নিজেদের খুশি মতো নির্বাচন করে আরেক মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে, যা জনগণের সাথে করা চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল। জনগণের মতামতকে অগ্রাহ্য করে সরকার বলে চলেছেন, তারা নিজেরাই ঠিক করবে নির্বাচন কখন হবে এবং কিভাবে হবে। সরকার আরো বলছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে তারা চালকের আসন ছাড়বেন না। তাতে বিরোধী দল ও জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক বা না করুক। চরম রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তার মধ্যে দেশের মানুষ আজ শঙ্কিত। কোনো সচেতন মানুষই অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতে পারে না। অনিশ্চয়তা মানুষকে হতাশ, প্রতিবাদী ও সহিংস করে তোলে। গত কয়েক বছর ধরে দেশে যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত, হানাহানি, মারামারি, তার প্রধান কারণ, সংবিধান থেকে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিধান তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে দুই জোটের মধ্যে যদি সমঝোতা না হয় তাহলে আগামীতে রাজনীতিতে আরো সঙ্ঘাত-সহিংসতার আশঙ্কায় মানুষ শঙ্কিত। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে যখন সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্যে সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, তখন থেকেই দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বহাল রাখার পক্ষে মতামত জানিয়ে এসেছে। সংসদীয় কমিটি দেশে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিশিষ্টজনদের ডেকে মতামত গ্রহণ করলে তারা প্রায় সবাই তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মতামত দেন। আদালতের রায় অনুসারে আরো দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বহাল রাখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সরকার সব জনমত অগ্রাহ্য করে, সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে একতরফা সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তে দেশের সচেতন মানুষ বিস্মিত হয়। এরপর থেকেই দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থায় পুনর্বহালের পক্ষে দাবি-দাওয়া ও আন্দোলন করে আসছে। প্রধান বিরোধী দলসহ সরকারের বাইরের সব রাজনৈতিক দল, তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য আন্দোলন করে আসছে। সারা দেশব্যাপী বিরোধী দলের রোড মার্চ, লংমার্চে এবং মহাসমাবেশে লাখ লাখ মানুষ উপস্থিত হয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য সোচ্চার কণ্ঠে দাবি তুলেছে। সব প্রিণ্ট মিডিয়াতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে অসংখ্য-প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখা হচ্ছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অংসখ্য টকশো ও আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে বেশিরভাগ মানুষের মতামত প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় যে অন-লাইন পাঠক জরিপ করা হয়, তাতেও উঠে আসছে দেশের বেশিরভাগ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চায়। গত মে মাসের প্রথম দিকে একটি গবেষণা সংস্থার সাথে দৈনিক প্রথম আলোর যৌথ জনমত জরিপে ৯০ শতাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। গত ১৫ জুন ২০১৩ তারিখে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট দেশের এই চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণ বিপুল ভোটে ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী করেছেন। ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ও ১৮ দলসমর্থিত প্রার্থী সরকার সমর্থিত প্রার্থীকে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে, গাজীপুরকে বলা হয় গোপালগঞ্জের পরে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় দুর্গ। এ দুর্গ ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটভুক্ত দলগুলো সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। সরকারি দলের অনেক এমপি ও নেতা নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে গাজীপুর চষে বেড়ান। দ্বারে দ্বারে গিয়ে জনগণের কাছে ভোট চান। কিন্তু জনগণ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করে ১৮ দলসমর্থিত প্রার্থীকেই সমর্থন জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ, পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সারা দেশের জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে। এমনকি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, ‘বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিরোধী দলের সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে জনমতের এই প্রতিফলন বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে আরো জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু সরকার জনমতের প্রতি কোনো তোয়াক্কাই করছে না। জনগণের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অনিশ্চয়তা নিরসনের প্রতি সরকারের যেন কোনোই ভ্রƒক্ষেপ নেই; বরং জনমতকে দমন করতে বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ করতে গেলে টিয়ার শেল, গুলিবর্ষণ করে ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। ক্যাডার বাহিনী দিয়ে হামলা করা হয়েছে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে অসংখ্য মামলা দায়ের করে দেশের জেলখানাগুলো বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা ঠাসাঠাসি করে পূর্ণ করা হয়েছে। সরকার বিরোধী মত দমন করতে গিয়ে বিভিন্ন স্বাধীন প্রচারমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ করেছে। জনগণের নির্ভীক কণ্ঠস্বর দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রেসে তালা মেরে এবং সরঞ্জাম জব্দ করে পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে। আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক, সত্য প্রকাশের অকুতোভয় সৈনিক মাহমুদুর রহমানকে মিথ্যা মামলায় বন্দী করে রেখেছে। বেসরকারি প্রচার মাধ্যমে দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভি নামের দুটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের প্রচার সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু জনমতকে দমন করা যায়নি। সরকারের দমননীতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তাকে আরো অপরিহার্য করে তুলেছে। সরকার ২০০৯ সালে যে সংবিধানের আওতায় ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল, সে সংবিধান একতরফাভাবে নিজেরাই পবিরর্তন করে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল করার পর সরকার বলছে, সংবিধান থেকে তারা একচুলও নড়বেন না এবং ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনেই তারা নির্বাচন করবেন। অথচ তারা তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল না করলে তো এখন দলীয় সরকারের প্রশ্ন আসত না এবং সংবিধান থেকে নড়ার কোনো প্রশ্নই উঠত না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া সব দল ও প্রার্থীর জন্য নির্বাচন প্রচারণার সমান সুযোগ দেয়া সম্ভব নয়। যেমন, এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি, নির্বাচন কখন হবে নির্ধারিত হয়নি, বিরোধী জোটের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য লেভেল প্লেয়িং সৃষ্টি করা হয়নি, অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে সরকারি কাজ উপলক্ষে বিভিন্ন জেলায় গিয়ে আগাম নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে এরূপ বৈষম্যমূলক আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিকে শুধু বিরোধী দলের একটি দাবি বা একটি রাজনৈতিক ভিন্ন মত হিসেবে ছোট করে দেখানোর একটি প্রচেষ্টা সরকারের এবং সরকারি ঘরানার বিভিন্ন ব্যক্তির তরফ থেকে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এটি শুধু বিএনপি বা বিরোধী জোটের দাবি নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি দেশের জনগণের, সমগ্র দেশবাসীর। বিভিন্ন সংস্থা ও পত্রপত্রিকার জনমত জরিপে এ সত্য বারেবারেই প্রকাশ পেয়েছে। দেশের সমগ্র জনগণের অভিপ্রায় অনুসারেই ১৯৯০ সালে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৯৬ সালে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সংবিধান নিজেই ঘোষণা করেছে : জনগণের অভিপ্রায়ই হচ্ছে সংবিধান। সব ধরনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন পরিবেশে ভোট দেয়ার অধিকার জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমে জনগণের নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট দেয়ার সে সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। কাজেই এখন নিরপেক্ষ একটি তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহালের মাধ্যমেই কেবল জনগণের সে অধিকার ফিরিয়ে দেয়া যায়। জনগণের অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম, অনেক রক্ত ক্ষয়ের বিনিময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের অর্জন। যেহেতু বর্তমান আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকার একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল করেছে; কাজেই যে নামেই হোক একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহাল করে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া বর্তমান সরকারেরই নৈতিক দায়িত্ব। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুরো দেশের জনগণের দাবি। কাজেই এটি একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দাবি। সংসদ নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা, অবর্তমানে পুরো দেশের জনগণ যেহেতু চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে, কাজেই জনগণের এ অনিশ্চয়তা নিরসন এবং রাজনৈতিক অস্পষ্টতা দূর করার জন্য একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করা সরকারের গণতান্ত্রিক দায়িত্বও বটে। বিষয়টি সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার উপলব্ধিতে আসুক, জনগণের মতামত, অধিকার ও আকাক্সাকে সম্মান জানিয়ে, প্রয়োজনে বিরোধী দলসহ সব দলের সাথে সংলাপ ও সমঝোতাক্রমে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহাল করে সরকার তার নৈতিক, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করুকÑ পুরো দেশবাসী এ কামনাই করে।


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads