বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

পয়েন্ট অব নো রিটার্নে রাজনীতি


জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যাচ্ছে রাজনীতি। তাতে সামনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভয়ানকপর্যায়ের দিকে মোড় নিতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা। নির্বাচন নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করতে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। একবার বলা হচ্ছে, নির্বাচন অক্টোবরে হবে, আবার বলা হচ্ছে জানুয়ারিতে হবে। একবার বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হবে; আবার বলা হচ্ছে, দলীয় সরকারের অধীনে হবে। একবার বলা হচ্ছে সংসদ ভেঙে দিয়ে হবে, আবার বলা হচ্ছে পৃথিবীর যেসব দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র আছে, সেসব দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় বাংলাদেশেও আগামী নির্বাচন সেভাবেই হবে। নির্বাচন নিয়ে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক বক্তব্যে জাতি বিভ্রান্ত। এসব বক্তব্যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অপরিহার্যতার বিষয়টি অনিবার্যভাবে জাতির সামনে পরিস্ফুটিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সরকার চূড়ান্তভাবে ফেঁসে গেছে। এই ফেঁসে যাওয়ার কারণেই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য ব্যক্তি সাম্প্রতিককালে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন এবং অহেতুক রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন; যাতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলা হয়, যাতে নির্বাচন অনিশ্চিতের একটা প্রোপট সৃষ্টি হয়। কেননা নির্বাচন না হলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে স্বপদে বহাল থাকার এখতিয়ার পঞ্চদশ সংশোধনীতে রাখা হয়েছে। এই সংশোধনী একটি দুরভিসন্ধিকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। যাতে দেশে নির্বাচন না হলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনন্তকাল পদে বহাল থাকতে পারেন। এমন সুবিধা সংবিধান যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছে, সেখানে পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে কেন তিনি নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী যখন মনে করবেন তার দল নির্বাচনে জেতার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন তিনি নির্বাচনের কথা চিন্তা করতে পারেনÑ ‘প্রধানমন্ত্রী সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারেনকথার তাৎপর্য এখানেই। এখন প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী কি দেশে নির্বাচন না দিয়ে পারবেন? তখন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কি তার হাতে থাকবে? সব দল নির্বাচনের পে অবস্থান নিলে তিনি একা কী করবেন? জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের প্রচেষ্টায় রাজনীতিতে যে ইতিবাচক ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছিল নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই আশা নিরাশায় পর্যবসিত হবে; রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে। এমনিতেই দেশ চরম সঙ্কটে নিপতিত। সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। অনেকে বলছেন, দেশে একটি গৃহযৃদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠছে। এমনটি হলে ধ্বংস হবে মানুষের সব স্বপ্ন, ধ্বংস হবে সম্ভাবনা। কাজেই সরকারকে অপরিণামদর্শী রাজনীতি ত্যাগ করতে হবে, সহনশীল রাজনীতির আবহ সৃষ্টি করতে হবে। সমঝোতার পথ রুদ্ধ করা সরকারের জন্য মোটেও সমীচীন হবে না। এতে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তাতে নিঃসন্দেহে তিগ্রস্ত হবে মতাসীন দল। কারণ জনগণের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে অতীতে কোনো শাসক লাভবান হয়নি। জনগণ চায় নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা দূর হোক। শান্তিতে নেই ব্যবসায়ী ও বিনিয়োকারীরা। দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ছে, উৎপাদন কমে যাচ্ছে; রফতানি বাণিজ্য নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এই অবস্থায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হলে আমদানি-রফতানি খাতে দেখা দেবে অবধারিত বিপর্যয়। বন্ধ হবে কলকারখানা। কর্ম হারিয়ে বেকার হবে হাজার হাজার শ্রমিক। দেখা দেবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ হবে রুদ্ধ। কাজেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়ার আগে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, পপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেবল নির্দলীয়-নিরপে সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত করা সম্ভব। দলীয় সরকারের অধীনে এটি আশা করা অবান্তর। ওই নির্বাচনে বিরোধী দল কোনোভাবেই অংশ নেবে না। বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া সরকারকে পরিষ্কার জানিয়ে রেখেছেন, বিএনপিকে বাইরে রেখে দলীয় সরকারের অধীনে যেকোনো নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। এর প্রস্তুতি নেয়ার জন্য তিনি তার দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে নির্দেশও দিয়ে রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঘোষণা বেগম জিয়াকে নিঃসন্দেহে পয়েন্ট অব নো রিটার্নে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা তার পে আর কোনোভাইে সম্ভব হবে না। কঠোর আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া সরকার বিরোধী দলের সামনে আর কোনো পথ খোলা রাখল না। লণীয়, নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার ত্যাগ আওয়ামী লীগ ভুলে গেলেও এ দেশের আপামর জনগণ ভুলে যায়নি, এ পদ্ধতি বাতিলের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে; মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে সৃষ্টি হয় সন্দেহ-সংশয়। এর প্রভাব পড়ে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। অপ্রত্যাশাতিভাবে মতাসীন দলের জনপ্রিয় প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন প্রতিপরে কাছে। এতে প্রতীয়মান হয়, এ দেশের মানুষের মধ্যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার খুব ভালোভাবেই জায়গা করে নিয়েছে; এটির প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় মানুষের মুখের ভাষা উপলব্ধিতে আনাই দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচায়ক। এটিই গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। গণতন্ত্রকে পরিপক্ব করতে হলে, মানুষের এ ভাষার প্রতি শাসকদের অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে এবং সহানুভূতিশীল হতে হবে; সর্বোপরি দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখতে হবে। রাজনীতিতে পরাজয়কে সহজভাবে মেনে নিতে হবে, জয়কে সহিষ্ণুতার সাথে গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই জনগণের কাছে শাসকদলের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে, মানুষ শাসকদলকে নতুন চোখে দেখবে। শুধু শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন দিয়ে পপাতহীন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আশা করাও অবান্তর। ইচ্ছা থাকলেও নির্বাচন কমিশনের পে সেটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কেননা সারা দেশে প্রায় ৬০ হাজার ভোট কেন্দ্রের ৯ কোটির ওপর ভোটারের ভোট নিশ্চিত করার মতা নির্বাচন কমিশনের নেই। সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভর করে তাদের নির্বাচনের আয়োজন করতে হয় আর দলীয় সরকারের অধীনে এসব প্রশাসনযন্ত্র কোনোভাবেই নিরপে থাকতে পারে না। সুতরাং বিশ্বে বাংলাদেশের সৃষ্টি হওয়া উজ্জ্বল ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এই নির্মোহ সত্যটি শাসকদল যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে, ততই তাদের জন্য এবং দেশের জন্য মঙ্গল হবে। রাজনৈতিক সহিংসতায় গত কয়েক মাসে অনেক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একই জাতি ও ধর্মের মানুষের মধ্যে একটি নির্বাচন নিয়ে এমন আত্মঘাতী ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, মতার পালাবদলকে কেন্দ্র করে জেনেশুনে কৌশলে জাতিকে ভয়ানক বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে; যাতে এ জাতি বিপন্ন জাতিকে পরিণত হয়, একটা বাইরের অপশক্তির হস্তপে যাতে অনিবার্য হয়। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রকে বিপন্ন করে কোনো রাজনীতি হতে পারে না। রাজনীতি করতে গিয়ে রাষ্ট্রই যদি বিপন্ন হলো, তাহলে রাজনীতি কার স্বার্থে? জনগণের স্বার্থে? কাজেই রাজনৈতিক সহিংসতায় আর যাতে কোনো প্রাণ ঝরে না যায়, আর যাতে কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads