রবিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

জাতি কলঙ্কমুক্ত হবে কি


পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম উপজেলা লংগদু, তার চেয়ে আরো দুর্গম বাঘাইছড়ি উপজেলা। এখানে বসবাসরত বেশির ভাগ বাঙালিই শ্রমিক, পেশা গাছ-বাঁশ কাটা। হতভাগা এসব কাঠুরিয়ার বড় অংশ থাকে লংগদুর মাইনীমুখ, গুলশাখালী তেমাথা, কালা পাকুজ্জাসহ বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে। ১৯৯৬ সালের প্রথম দিক থেকেই স্থানীয় গাছ ব্যবসায়ীদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের। দীর্ঘ দিন তারা দালালের মাধ্যমে নির্ধারিত হারে চাঁদা নিত; কিন্তু হঠাৎ তৎকালীন শান্তিবাহিনী (জেএসএস) চাঁদার পরিমাণ তিন-চার গুণ বাড়িয়ে দেয়। নতুবা গাছ-বাঁশ-কাঠের ব্যবসায় বন্ধ করে দেবে বলেও হুমকি দেয়। ফলে, নিরীহ দরিদ্র বাঙালি কাঠুরিয়াদের পেটে লাথি পড়ে। অনাহারে অর্ধাহারে জর্জরিত জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের ঘনছায়া। তদুপরি, জীবন বাজি রেখে মাঝে মধ্যে গহিন জঙ্গলে গিয়ে তারা কাঠ কাটত, দুর্গম পাহাড় বেয়ে অনেক সময় হাতির সাহায্যেও বড় বড় গাছের গুঁড়ি টেনে এনে লেকের পানিতে ভাসিয়ে নৌকায় করে শহরের বড় বড় কাঠগুদামে আনা হতো। সেই হতভাগা কাঠুরিয়াদের ওপরই ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নেমে আসে ভয়াবহ দুর্যোগ। উপজাতীয় শান্তিবাহিনী কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা বৃদ্ধির আবদার মেটাতে ব্যর্থ হয়ে নিরীহ গরীব কাঠুরিয়াদের ওপর চরম প্রতিশোধের চক্রান্ত আঁটে। বাঙালি কাঠুরিয়াদের আলোচনার ফাঁদে ফেলে দালালের মাধ্যমে জড়ো করা হয় বাঘাইছড়ি থানার পাকুয়াখালীর গহিন অরণ্যে। সে দিন সরল বিশ্বাসে এবং পেটের তাগিদে নানারূপ সন্দেহ ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে শতাধিক কাঠুরিয়া জড়ো হয় পাকুয়াখালীতে। বাড়িতে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও ছোট শিশুটিও হা করে আছে, অন্নের আশায়। বাবা কাঠ কেটে আসবে, রোজগারের টাকা পেলে তবেই বাজার থেকে চাহিদামতো কিছু কেনাকাটা হবে; কিন্তু ২, , , , , , ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাঠুরিয়াদের চাঁদা নির্ধারণের অজুহাতে নেয়া হলেও কেউ-ই ফেরত আসছে না। অজানা আশঙ্কায় কাঠুরিয়াদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেল। স্বজনেরা আপনজন হারানোর ব্যথায় কেঁদে উঠল। বাঘাইছড়ির লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক এ হত্যাকাণ্ড প্রথমে ধামাচাপা দেয়া হয়েছিল। স্থানীয় এমপি দীপংকর তালুকদার ও তার দলীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এই হত্যাকাণ্ডকে গুজব এবং সরকারবিরোধীদের ষড়যন্ত্র বলেও প্রচার করেছিল। এমনকি রাঙামাটির ডিসি, এসপি, সেনাবাহিনীসহ সবাইকে গুজবে কান না দিয়ে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন ওই এমপি; কিন্তু মানবতার ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারেনি দেশপ্রেমিক প্রশাসন। তাদেরই একটি অংশ এগিয়ে আসে স্বজনহারা বাঙালিদের ডাকে। দুই-তিন দিন ধরে নিখোঁজ আপনজনের কোনো সন্ধান না পেয়ে থানার ওসি এবং সেনা জোনের কাছে ছুটে যার তারা। এ দিকে খুনি শান্তিবাহিনীর মৃত্যুকূপ থেকে পালিয়ে আসা একজনকে সন্দেহজনকভাবে আটক করা হয়; কিন্তু ৯ সেপ্টেম্বর সকালবেলা যখনই লংগদু জোনের সেনাবাহিনী গভীর জঙ্গল থেকে দুই-চারটা করে লাশ আনতে শুরু করল, তখনই বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ডের রহস্য বেরিয়ে গেল। কাটা, ছেঁড়া, গলিত লাশগুলো দুই-তিন দিনে পচে দুর্গন্ধে ভরে গেছে, তাদের চেহারাও চেনা মুশকিল। দা, কুড়াল, বেয়নেট, ছোরা ইত্যাদি ব্যবহার করে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে অমানুষিক অত্যাচার করে তাদের হত্যা করেছিল হানাদার শান্তিবাহিনী। বর্বর হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও ১৯৭১ সালে এভাবে পশুর মতো নির্যাতনের মাধ্যমে বাঙালি হত্যা করেনি। সন্তু লারমার বাহিনী তার চেয়েও জঘন্য পাশবিক আচরণে বাঙালি হত্যা করেছে। তার পরও রাঙ্গামাটির ডিসিকে এমপি দীপংকর তালুকদার বলেছিলেনÑ ‘আমি চাই না, এ ঘটনার জন্য পাহাড়ে কোনো উপজাতির একটি পশমও কেউ যাতে ছিঁড়তে পারে। প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়, যাতে উত্তেজিত বাঙালিদের কঠোরভাবে দমন করা হয়। অন্য দিকে, প্রতিদিনই ঢাকা থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা লংগদু আসতে থাকেন। আমু-তোফায়েল-রাজ্জাক-হাসনাত-মহীউদ্দীনসহ ডজনখানেক মন্ত্রী পাহাড়ে ছুটে আসেন। স্তম্ভিত হতবিহ্বল হয়ে যান এই বীভৎস হত্যাকাণ্ড দেখে। মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে, এত জঘন্য হতে পারে, তা সে দিনের সরেজমিন প্রত্যক্ষ করে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিশদ বিবরণও তুলে ধরেছিলেন। চীনযাত্রার প্রাক্কালে অশ্রুসজল কণ্ঠে সে দিন সাংবাদিকদের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে খুনিদের বিচার করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছরেও বাঘাইছড়ি কাঠুরিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। বরং ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তথাকথিত শান্তিচুক্তির মাধ্যমে খুনি শান্তিবাহিনীকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমন না করে বিদেশী চাপের মুখে সন্ত্রাসপূজার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। দীর্ঘ ২১ বছর পর যদি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হতে পারে, তবে ১৭ বছর পরও কেন বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না? সন্ত্রাসী শান্তিবাহিনীর এটা হলো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ, যার বিচার যেকোনো সময় করা যেতে পারে। এই বিচারে কোনো বাধা নেই। হিটলার-মুসোলিনির বিচার যদি হতে পারে, তবে ঘাতক শান্তিবাহিনীর নেতা সন্তু লারমার বিচার হবে না কেন? আজ তাকে আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান পদে রেখে জনগণের খাজনা-ট্যাক্সের টাকায় প্রতিমন্ত্রীর মতো বেতনভাতা ও সুবিধাদি দেয়া হচ্ছে। জনগণ কেন এই বেতন দেবে, কেন খুনিকে লালন করা হবে? বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ড আমাদের জাতীয় জীবনে এক বিষফোড়া হয়ে আছে। জাতি এই কলঙ্কের বোঝা কতকাল বহন করবে? নিরীহ মানুষ হত্যাযজ্ঞ এই জাতি কিভাবে সহ্য করছে? দেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ে, অরণ্যে, খালে-বিলে, নদী-নালায়, হাট-বাজারে বহু বাঙালিকে জীবন দিতে হয়েছে। এটা স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড নয়, এটা রাষ্ট্রদ্রোহী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ঠাণ্ডামাথায় বাঙালি হত্যাকাণ্ড। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতাÑ যার ন্যূনতম শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। প্রচলিত আইনেই বাঘাইছড়ির খুনিদের বিচার করতে হবে। নিরীহ সেসব কাঠুরিয়ার আত্মা কখনো এই জাতিকে ক্ষমা করবে না। সভ্য সমাজ, সুধী সমাজ, আধুনিক রাষ্ট্রের দাবিদার বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ যে দিন এই খুনিদের বিচারে জেগে উঠবে, সে দিনই শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। জাতি কলঙ্কমুক্ত হবে, পরিশুদ্ধ হবে দেশের জনগোষ্ঠী।


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads