শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

হাঁটতে হবে সমঝোতার পথেই


আওয়ামী লীগ বিনা কারণে নিজেদের শাসনপ্রণালীর চার দিকে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল সৃষ্টি করেছে। সে দেয়াল এমনই যে, বের হওয়ার কোনো পথ খোলা নেই। আমরা নাগরিকেরাও তাদের এই ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে পড়েছি। সামনে কী, সে কথা কেউ বলতে পারে না। আমরা বলি, টানেলের শেষ প্রান্তে ওই যে আলোর বিন্দু দেখা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ টানেলের শেষ প্রান্তও সিলগালা করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একেবারেই একরোখা জেদি ষাঁড়ের মতো সেই যে অন্ধকার পথে এক দৌড় দিয়েছেন, কিছুতেই আর ফিরতে চাইছেন না। ষাঁড়ের সাথে উপমা দেয়ার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু গরু যখন দৌড় দেয়, তখন সে যেকোনো এক চোখে দেখতে পায়। যে চোখে দেখতে পায়, সে দিকেই রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকে। সে জন্য গরু কিংবা ষাঁড় সোজা দৌড় দেয় না। দৌড়াতে দৌড়াতে এক দিকে বেঁকে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে রকম একটি দৌড়ের ওপরে আছেন। আর আশ্চর্য ঘটনা এই যে, তিনি সম্পূর্ণ সরকারি খরচে দারুণ এক নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সামনে-পেছনে বিশাল লটবহর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের হুঁইসেল। দীর্ঘক্ষণ ধরে নাগরিকদের রাস্তার ওপর আটকে রাখা। এর মধ্যে সামনের গাড়ি বন্ধ। গ্যাসে দীর্ঘ লাইন। স্টেশনে প্রেসার নেই। সারা দিনের মধ্যে দীর্ঘ লাইনে কমপক্ষে তিনবার গ্যাস নিতে হয়। প্রধানমন্ত্রীরÑ দাবি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ গ্যাসের ওপর ভাসতে থাকে। এই শহরে যে মধ্যবিত্ত গাড়ি চালান তিনি গ্যাসের যন্ত্রণা বোঝেন। এখানে যে নব্য পুঁজিপতি সৎভাবে শিল্প স্থাপন করতে চেয়েছিলেন, তিনি বোঝেন। যিনি গ্যাস পাওয়া যাবে এই আশায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে শিল্প স্থাপন করেছেন, তিনি এখন ফতুর। অথবা ফতুর সেই ব্যাংক, যে ব্যাংক তাকে ঋণ দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যখন কোনো সড়ক অতিক্রম করে, আহা, তখন সিলিন্ডার সিলিন্ডার গ্যাস অকারণেই পুড়ে যায়। আমার গাড়িও। আমি কেমন যেন এখন এসবকে নিয়তি হিসেবে মানি। সুইস অফ করে বসে থাকব? এরপর প্রধানমন্ত্রী চলে গেলে আধা ঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে যখন গাড়ি থামবে, তখন আমার গাড়ি স্টার্ট নেবে তো, বড় ভয়ে ভয়ে থাকি। হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রী কেন যে এতটা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়লেন, সেটা বুঝতে পারি না। তার বাসভবনের সামনে নতুন ধরনের পোশাক পরা পুলিশবাহিনী দেখি। কোনো দিন শুধু তাদেরই দেখি। কোনো কোনো দিন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের গার্ডপোস্টের কোনোটায় তাদের দেখি, কোনোটায় পুলিশ দেখি। কোনোটায় মিলিটারি দেখি। হয়তো বিজিবিও আছে কোনো কোনো পোস্টে, আমি দেখিনি। প্রধানমন্ত্রী বলে কথা। নাগরিকদের জন্য তিনি দিনরাত কত কষ্ট করছেন! দেশ গ্যাসে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। বিদ্যুতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। কর্মসংস্থানে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। উৎপাদনে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। সেখানে আমাকেও তো কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। অতএব প্রধানমন্ত্রীর যাত্রাপথে লেনে লেনে দাঁড়িয়ে আমার মতো অসহায় নাগরিকেরা অকটেন পোড়ায়। গ্যাস পোড়ায়। টানেলের শেষ প্রান্ত তেমনি ঘোর অন্ধকার হয়ে থাকে। কোনো আলোর রেখা নেই। বাংলাদেশে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। আমরা যারা যৎ সামান্য লেখাপড়া করেছি, তারা কখনো কখনো স্তম্ভিত হয়ে যাই। এ আবার কেমন কথা! গণতন্ত্র কেন গণতন্ত্রের পথে চলবে না? এক সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। আর এক সরকার ক্ষমতায় আসবে। কিংবা ওই সরকারকেই দ্বিতীয়-তৃতীয় বারের জন্য জনগণকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে হবে। সন্দেহ নেই, ক্ষমতা অতি মধুর। সুতরাং ক্ষমতা পেলে কেউ আর তা ছাড়তে চায় না। কিভাবে আরো বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা যায়, তার জন্য নানা কোশেশ করে। বেগম খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান করার জন্য পার্লামেন্টে আইন করে বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা এই যে, আওয়ামী ঘরানার বিচারপতি বলে পরিচিত প্রধান বিচারপতি এর উদ্যোক্তা ছিলেন। এই দাবি উত্থাপন করেছিলেন তারাই। সেটি বাস্তবায়ন করে বিএনপি সরকার। এ নিয়ে তাদের দুর্নামের অন্ত নেই। কে এম হাসান বিচারপতি খায়রুল ইসলামের মতো চশমখোর ছিলেন না। তিনি কোনো তাঁবেদারও ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি নাকি একসময় বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এর চেয়ে বড় অপরাধ আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে একজন বিচারপতির আর কিছুই হতে পারে না। আর সেটিকে তালি দিলো প্রশ্নবিদ্ধ টাকায় প্রকাশিত দুটি সংবাদপত্র। আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এই দুটি সংবাদপত্রই বাংলাদেশে সবচেয়ে সুসম্পাদিত। এখানে সম্পাদকেরা অনেক শ্রম দেন। কিংবা এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যে, তারা শ্রম না দিলেও তাদের অধস্তনেরা যথাযথভাবে কাগজ বের করতে পারবেন। তবুও সুসম্পাদিত। এরা দালাল। আমার দৃষ্টিতে দালাল। আওয়ামী লীগ যারা করেন তাদের দৃষ্টি মহাবীর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে টানেলের শেষ প্রান্তও সিলগালা করে আটকে দিয়েছেন, সেটি কি এই মিডিয়া উপলব্ধি করে না? নিশ্চয়ই করে। হয়তো তাদের হাত বন্দী। তারা সহযোগী। তাদের কোনো গালি দিতে চাই না। কিন্তু আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান আর অধিকারসম্পাদক অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমার ইস্যু তাদের কাছে কোনো বড় ঘটনাই নয়। যদি এ রকম বিপদ কোনো দিন তাদের ঘাড়েও নেমে আসে, তখন তাদের পাশে দাঁড়াবে কে? নেমে আসা অসম্ভব নয়। তারা কাগজে সার্কুলেশন বহাল রাখার জন্য মাঝে মধ্যে যে টুকটাক নিউজ করে ফেলেন সেটাও তো বিরাট ঘটনা। শেখ হাসিনার আন্দোলনের ফসল তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি এখন আর তিনি নিজেই মানেন না। তত্ত্বাবধায়ককে তিনি দানব বলেন। আর বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে বারবার হুমকি দেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে তার নাকি খবর আছে। তাকে সপুত্রক দেশান্তরী হতে হবে। মহররমের সময় তাজিয়া নিয়ে যারা মিছিল করে, তারা গায়ে ছুরি মেরে বলে, হায় হাসান, হায় হোসেন। তাদের রক্ত রাজপথে গড়িয়ে পড়ে। এখন আমরা কি শেখ হাসিনার জন্য বুকে ছুরি মেরে হায় হাসিনা, হায় হাসিনা বলে রক্ত দেবো? শুরু করেছিলাম, সরকার নিজেকে ঘেরাটোপে বন্দী করেছে এই বলে। বের হওয়ার পথ তাদের নেই। যে লুণ্ঠন, অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ তারা করেছে, তাদের বের হওয়ার পথ কোথায় থাকবে? এখন এই যে, হাসিনার জেল্লা : হাত তুলে ওয়াদা করুন, আমাকে ভোট দেবেন। সেগুলো কোনো ক্রমেই কার্যকর হবে না। পয়সা দিয়ে ডেকে আনা লোক কিংবা সাধারণ লোকই ভিড়ের মধ্যে কি হাত না তুলে থাকতে পারবে? তাহলে তো আওয়ামী ষণ্ডারা ওখানেই পিষে মারবে। আমি ঘোর হাসিনা-শাসনবিরোধী লোক। কিন্তু এ রকম জনসভায় তার বক্তব্য শোনার জন্য যদি উপস্থিত থাকি, তাহলে আমিও আশপাশের লোকদের ভয়ে হাত তো তুলবই, ওয়াদা করলাম। আমি কি এই ওয়াদা করতে পারব? শেখ হাসিনাকে ভোট দেয়ার অর্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তোলা। আমি আয়োজিত জনসভায় হাত না তুলে মার খাওয়ার ঝুঁকি কিছুতেই নেবো না। আমি শেখ হাসিনার দলের একটি লোককেও ভোট দেবো না। এরপর শেখ হাসিনা বলবেন, বাংলাদেশের জনগণের মতো বদমাশ প্রকৃতির লোক পৃথিবীর ইতিহাসে কমই আছে। কারণ তারা ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা রক্ষা করে না। যদি ভোট হয়, শেখ হাসিনা জনগণের নব্বই ভাগের ভোট পাবেন না। এই জরিপ করে তাদের বড় সহযোগী ভারি বিপদে পড়েছে। সহযোগী হয়তো উপকারই করতে চেয়েছিল। সাধু সাবধান। কিন্তু শেখ হাসিনা ও তার তস্য-তস্যরা ওই পত্রিকাকে এমন গালিগালাজ করতে শুরু করলেন যে, তারা বোধ করি ভয়েই তটস্থ। ওই যে আমি বলছিলাম, টানেলের শেষ মাথাও শেখ হাসিনা সিলগালা করে দিয়েছেন। বস্তুতপক্ষে এখন সেটাই ঘটেছে। কিন্তু তিনি কি বের হবেন না? যদি সমগ্র জনগণ ঝাঁপিয়ে পড়ে? যদি পুরো দেশের জনগণ না, নাধ্বনি দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসে, তাহলে কী করবেন শেখ হাসিনা? তার অস্ত্র-কামান নানা যন্ত্র আছে। এসব ধ্বনিদারকে তিনি ডাণ্ডা মেরে একেবারে ঠাণ্ডা করে দেবেন। তবু কি আন্দোলন সেখানেই থেমে থাকবে? এখন যা মনে হচ্ছে, তা হলোÑ শেখ হাসিনা ওই টানেলের নিজস্ব রুদ্ধদ্বার খুলে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বের হবেন কিভাবে? সে কারণেই তাকে জাতিসঙ্ঘকে ডাকতে হচ্ছে। এখন জাতিসঙ্ঘ একটি নিমুরোদে প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র যা বলে জাতিসঙ্ঘ তা-ই করে। শুধু নিরাপত্তা পরিষদে তাদের সমস্যা। সেটি ম্যানেজ করার কৌশল যুক্তরাষ্ট্র জানে। ফলে জাতিসঙ্ঘ এবং যুক্তরাষ্ট্র, এর মধ্যে তফাৎ খুব নগণ্য। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটনের সাথে শেখ হাসিনার টেলিফোন আলাপ আমরা সাধারণেরাও পড়েছি। সে আলাপ সাধারণ ছিল না। ড. ইউনূস থেকে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনÑ সবই সে আলোচনার বিষয় ছিল। হিলারি শেখ হাসিনাকে এ কথাও মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি যে, মইনউদ্দিন ও ফখরুদ্দীন এখন যুক্তরাষ্ট্রে আছে। মইনউদ্দিন হুইল চেয়ারে। ফখরুদ্দীন মার্কিন নাগরিক হিসেবে বহাল তবিয়তে। প্রান্ত রেখায় যদি আলোই না দেখা যায়, তাহলে শেখ হাসিনাকে কোথাও-না-কোথাও আত্মসমর্পণ করতেই হবে। সে আত্মসমর্পণের আগে তিনি বাংলাদেশে একটি জঙ্গি কানেকশন তৈরি করার চেষ্টা করছেন। কোথাকার কোন মইনউদ্দিন-জসিমউদ্দিন, সে-ও হঠাৎ এক বিরাট সন্ত্রাসী হয়ে গেছেন। তিনি এক মাদরাসার শিক্ষক। তার কোনো সংগঠনও নেই। তার সহযোগীরা বিত্তবান মানুষ। তারা ধর্মশিক্ষা চেয়েছিল। সে জন্য তারা জসিমউদ্দিনের সাথে আলোচনায় বসতেন। আর যায় কোথায়! আলকায়েদা এসেছে। জয় বাংলা। শেখ হাসিনা জানেনও না, জয় বাংলা বললেই লোকে বলে, কাঁথা-বালিশ সামলা। তাকে এখন পরদেশী ক্রীড়নকদের হাতে এই কাঁথা-বালিশ সামলাতে হবে। 


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads