বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১২

নির্যাতন ও গ্রেফতার বন্ধ করে গণতন্ত্রসম্মত অবস্থানে ফিরে আসুন



৯ ডিসেম্বর দেশব্যাপী সর্বাত্মক অবরোধের পর পর ১১ ডিসেম্বর হরতাল পালনের মধ্য দিয়ে জনগণ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে ১৮ দলীয় জোটের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। আশা করা হয়েছিল, সরকার জনগণের ভাষা বুঝবে ও তাদের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দমন-নির্যাতন ও গ্রেফতারের অভিযান চালানোর পরিবর্তে গণতন্ত্রসম্মত অবস্থানে ফিরে আসবে। পাশাপাশি সংকট কাটিয়ে ওঠার এবং সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনরত বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার টেবিলেও বসবে। অন্যদিকে ১৩ ডিসেম্বরের সর্বশেষ কর্মকান্ডেও পরিষ্কার হয়েছে, সরকার হার্ডলাইনেই এগোতে থাকবে। এজন্যই ক্ষমতাসীনরা হরতাল প্রতিহত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। পুলিশকে দিয়ে সারাদেশে নিষ্ঠুর দমন ও গ্রেফতারের অভিযান চালিয়েছেন তারা। এরই অংশ হিসেবে প্রথমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এবং তারপর জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে বিএনপি ও জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোটের আটক নেতা-কর্মীদের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অভিযোগের নমুনা থেকেও সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। যেমন মির্জা আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, তার মতো একজন সিনিয়র নেতা নাকি সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি ভাংচুর করেছেন! মির্জা আলমগীরের বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে ৩৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অন্য নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রেও কোনো নিয়ম বা আইন মানছে না সরকার। তাদের সহজ কথা হলো, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের কারাগারের বাইরে থাকতে দেয়া হবে না। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফসহ ক্ষমতাসীন নেতারাও প্রকাশ্যে জানান দিয়ে চলেছেন। তারা এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও গ্রেফতারের হুমকি দিয়েছেন। কারণ তার নির্দেশেই নাকি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যতো বড় নেতাই হোন না কেন সবাইকেই আইনের আওতায় আনা হবে।
এভাবে ক্ষমতাসীনদের হুমকি ও উস্কানিমূলক বক্তব্য থেকে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, আওয়ামী লীগ সরকার দেশে বিরোধী দলকে তৎপরতা চালাতে দিতে সম্মত নয়। আপত্তির কারণ হলো, ক্ষমতাসীনরা বহুদিন ধরেই হার্ডলাইনে এগিয়ে চলেছেন। পুলিশকে দিয়ে লাঠিপেটা ও গ্রেফতার করানোর পাশাপাশি দলীয় গুন্ডা-সন্ত্রাসীদেরও মাঠে নামিয়েছে সরকার। বিগত কিছুদিন জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দল এমনকি মিছিল-সমাবেশ করার সুযোগটুকুও পাচ্ছে না। পুলিশ শুধু মিছিল-সমাবেশই ভন্ডুল করছে না, নেতা-কর্মীদেরও যথেচ্ছভাবে লাঠিপেটা করছে। মুড়ি-মুড়কির মতো টিয়ার গ্যাসের শেলও ছুঁড়ছে। ‘অজ্ঞাতনামা' হাজার-হাজার জনকে আসামী করে মামলা ঠুকছে পুলিশ। তারপর রিম্যান্ডে নিচ্ছে। পুলিশের লোকজন নেতা-কর্মীদের এমনভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যা দেখে মনে হচ্ছে যেন তারা খুনি-সন্ত্রাসী ধরনের ভয়ংকর অপরাধী! অথচ যাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে তাদের প্রত্যেকেই আইন ও সংবিধানসম্মত রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মী। প্রসঙ্গক্রমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের একটি হুকুমের কথা স্মরণ করতেই হয়। বেশ ক'টি উপলক্ষে তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে আন্দোলন প্রতিহত করার এবং আন্দোলনকারীদের পাকড়াও করার হুকুম জারি করেছেন। নিঃসন্দেহে এটা একটি ভয়ংকর হুকুম। একে কোনোভাবেই গণতন্ত্রসম্মত বলা যায় না। আশংকার কারণ হলো, মূলত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিহত করার এ হুকুমের পরিণতিতে একদিকে আওয়ামী গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে হামলা চালাতে শুরু করেছে অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরাও আত্মরক্ষার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ ধরনের হুকুম এবং পুলিশের পাশাপাশি সরকারি দলের গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের হামলার ফলে সংঘাতই শুধু ছড়িয়ে পড়ছে না, রাজনৈতিক সংকটও মারাত্মক হয়ে উঠছে। বলা হচ্ছে, সরকারের উদ্দেশ্যের মধ্যে গণতন্ত্রের জন্য সামান্য সদিচ্ছারও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আর ক্ষমতাসীনরা যদি সত্যি ফ্যাসিবাদী মনোভাব নিয়েই এগোতে থাকেন তাহলে সংকট বরং এমন ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে যাবে- যেখান থেকে দেশকে আর গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক পর্যবক্ষেকরা কিন্তু সতর্কও করে দিচ্ছেন। কারণ, সত্যিই সংকট কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে উঠলে এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে থাকলে সেটা কারো জন্যই ভালো হবে না। বিষয়টি বুঝতে হলে পুরনো ঢাকায় বিশ্বজিৎ দাসের হত্যাকান্ডের কথা স্মরণ করা দরকার। এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে ২০০৬ সালের অক্টোবরে পরিচালিত লগি-বৈঠার নৃশংসতার খুবই মিল রয়েছে। লগি-বৈঠা দিয়ে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের যারা খুন করেছিল পুরনো ঢাকার হত্যাকান্ডেও তাদের মতো লোকজনকেই দেখা গেছে। আমরা দমন-নির্যাতন এবং পুলিশকে দিয়ে গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলা দায়েরের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা মনে করি, কোনো রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রসম্মত কর্মসূচি ভন্ডুল করা এবং নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-নির্যাতন চালানো জনগণের ট্যাক্সের অর্থে লালিত পুলিশের কাজ হতে পারে না। তাছাড়া মিছিল-সমাবেশ, মানব বন্ধন, হরতাল প্রভৃতি মানুষের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু পুলিশকে দিয়ে এসব কর্মসূচীকেই পন্ড করানো হচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের প্রত্যেকেই একই সুরে উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখছেন, হুমকি দিচ্ছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্ষমতাসীনরা নিজেদের মনোভাবে পরিবর্তন না আনলে রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যাবে। তেমন অবস্থায় আবারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে গণতন্ত্র। আমরা তাই দমন-নির্যাতন ও গ্রেফতার থামিয়ে অবিলম্বে গণতন্ত্রসম্মত অবস্থানে ফিরে আসার এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা দেখানোর জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানাই। সরকারের উচিত অবিলম্বে মির্জা আলমগীর ও ডা. শফিকুর রহমানসহ সকল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে মুক্তি দেয়া এবং সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা। সরকারকে একই সঙ্গে নির্দলীয় সরকারের দাবিটিও মেনে নিতে হবে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads