সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৩

কথা ও কাজে কত গরমিল!


সবুজ শ্যামল বাংলাদেশে এখন গোলাবারুদের গন্ধ। কখনও পুলিশের গুলী, কখনও আন্দোলনকারীদের ককটেল  এমন অনাকাক্সিক্ষত এক পরিবেশে আতঙ্কের মধ্যে জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে জনগণ। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে দেশের এ কেমন পরিবেশ? দেশের এমন সহিংস পরিবেশের জন্য সরকার দায়ী করছে বিরোধী জোটকে। এভাবে অভিযুক্ত করার আগে গত ৫টি বছর সরকার বিরোধী দলসমূহের নেতা-কর্মীদের সাথে কেমন আচরণ করেছে তা একবার ভেবে দেখলে ভাল হতো। গণতান্ত্রিক সমাজের প্রথম শর্তই হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা। বিগত বছরগুলোতে সরকার বিরোধী পক্ষকে তেমন সুযোগ দেয়নি। বরং দমন-অবদমন, জুলুম-নিপীড়নের চূড়ান্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেছে সরকার। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে অবরুদ্ধ করে জেলখানায় পরিণত করা হয়েছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিস বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি, নেতা-কর্মীদের একের পর এক গ্রেফতার করে দলকে নেতা ও কর্মীশূন্য করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। বিরোধী জোটের মানববন্ধনের মত নিরীহ কর্মসূচিতেও হামলা চালিয়েছে এই সরকারের পুলিশ বাহিনী। ৫ বছর শাসন করার পরেও ক্ষমতা ছাড়তে চাইছে না বর্তমান সরকার। নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জাতীয় দাবিকে উপেক্ষা করে সরকার একদলীয় ও একতরফা নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের এমন অগণতান্ত্রিক ও স্বৈর আচরণের বিরুদ্ধে নির্বাচনের এই সময়টায় বিরোধী জোটও বাধ্য হয়েছে হরতাল ও অবরোধের মত কঠোর কর্মসূচি দিতে। এমন অবস্থায় দেশে যে সাংঘর্ষিক চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতেও হুঁশ ফিরছে না রাষ্ট্রের অভিভাবকের আসনে আসীন সরকারের। যে কোনোভাবে আবারো ক্ষমতায় আসাটাই যেন এই সরকারের শীর্ষ নেতাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক চেতনার বদলে ফ্যাসিবাদী আচরণের মাধ্যমে দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে বর্তমান সরকার। সরকার টের পেয়েছে যে জনসমর্থন তাদের পক্ষে নেই। ফলে এখন দেশে সংঘটিত সব সহিংস ঘটনার জন্য বিরোধী পক্ষকে দায়ী করে তাদের ইমেজ বিনষ্টের কৌশল অবলম্বন করছে সরকার। এর জবাবে বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, চারদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান থাকার পরেও এভাবে বোমাবাজি করে, বাস জ্বালিয়ে অপরাধীরা ভেগে যাচ্ছে কেমন করে? তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন? এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাকে তিনি রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন। বিরোধী পক্ষ ওইসব সহিংস ঘটনায় সরকারের এজেন্ট ও সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছেন। জনগণও মনে করছে, পুলিশ-র‌্যাব ও বিজিবি ঘেরা বাংলাদেশে একের পর এক সহিংস ঘটনা চালিয়ে যাওয়া বিরোধী জোটের জন্য কোনো সহজ বিষয় নয়। বিরোধী পক্ষের ইমেজ বিনষ্ট করার জন্য সরকারি মহল থেকেও সহিংস ঘটনা চালানো হতে পারে। এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের উপরেই বর্তায়। এমন দায়িত্ব পালনে সরকার ব্যর্থ হলে তাদের উপর জনগণের আস্থা থাকবে কেমন করে? সরকার কেন এভাবে দেশ চালাবে, যাতে দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী সংক্ষুব্ধ হয়ে পড়বে?
সরকারি মহলের লোকজনও যে, ট্রেনের ফিশপ্লেট উপড়ে ফেলে ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর উপর ককটেল ছোঁড়ে, তেমন খবর ইতোমধ্যেই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাদের এমন কর্মকা-ের লক্ষ্য হলো, বিরোধী দলের আন্দোলনকে জনগণের কাছে একটি সহিংস ও সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে পরিচিত করা। যুবলীগের ক্যাডাররা যে পেট্রোলবোমা তৈরি করে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ফেনীতে। ৮ ডিসেম্বর পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ফেনী সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে একটি পরিত্যক্ত মুরগির খামারে পেট্রোল বোমা তৈরিকালে ঝলসে গেছে ৪ যুবলীগ ক্যাডার। পেট্রোল বোমা তৈরিকালে হঠাৎ বিস্ফোরণে বোমার কারিগরদের মুুখম-লসহ পুরো দেহ ঝলসে যায়। তাই একথা বলা যৌক্তিক নয় যে, বর্তমান সময়ে সংঘটিত সহিংস ঘটনার জন্য শুধু বিরোধী দলই দায়ী। বর্তমান সরকারি দলের ভুল চিন্তাধারা যেমন দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তেমনি তাদের চাতুর্য ও সহিংস আচরণ জনগণের দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। জনগণ মনে করে, চাতুর্য ও কৌশল নয়, দেশকে শান্তি ও প্রগতির পথে নিতে হলে প্রয়োজন সত্য ও ন্যায়ের চর্চা।
সরকারি ও বিরোধী দল নির্বিশেষে সবাই এখন নেলসন ম্যান্ডেলার গুণকীর্তনে পঞ্চমুখ। ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে আমাদের সরকার তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে, ম্যান্ডেলার প্রতি এত সম্মান প্রদর্শন করা হলেও তাঁর নীতি ও আদর্শের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সরকার এতটা ব্যর্থ হচ্ছে কেন? যে শ্বেতাঙ্গরা ম্যান্ডেলা ও তাঁর সাথীদের উপর এত জুলুম ও নির্যাতন চালিয়েছে, ২৭ বছর জেল খাটিয়েছে বিজয় লাভের পর তো সেই শত্রুদের বিরুদ্ধে ম্যান্ডেলা কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেননি বরং তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিয়ে একসাথে দেশ চালিয়ে এক নতুন আফ্রিকা নির্মাণ করেছেন। ম্যান্ডেলার পথ ছিল  reconciliation বা সমঝোতার পথ। এই পথে তিনি ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও উদারতার নীতি অবলম্বন করে বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছে যে, ম্যান্ডেলাভক্ত আমাদের সরকার তাঁর সমঝোতার নীতি অনুসরণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কথা ও কাজে গরমিলের এমন উদাহরণ সৃষ্টি করে আমাদের সরকার আবারও জনসমর্থন লাভের আশা করেন কোন বিবেচনায়? বিষয়টি তাঁরা উপলব্ধি করলে দেশ ও জনগণের মঙ্গল।
Reactions:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads