শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৩

সিটি নির্বাচন : যেকোনো বিচারেই গুরুত্বপূর্ণ


মতাসীন মহাজোটের সংসদ সদস্যরা পর্লামেন্টে বিল এনে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দ্বিখণ্ডিত করেছেন। মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে পদচ্যুত করে দুইজন অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে সরকার সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম চালাচ্ছে। দ্বিখণ্ডিতকরণের প্রতিবাদে বিএনপি ঢাকায় হরতাল পালন করেছিল। পুলিশের উপস্থিতিতে সরকারের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা সেদিন খোকাকে ছুরিকাঘাতে আহত করেছিল। আহত খোকাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ একটি বর্বর দল খোকার ওপর সে হামলা নতুুন কিছু নয়। এর আগেও তাদের হামলায় তার মাথা ফেটে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, ওসব গরুর রক্ত। বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা বিএনপি মহানগরী সভাপতি। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তিনটি আসনে নির্বাচন করে ঢাকার দুটি আসনেই পরাজিত হয়েছিলেন চারদলীয় জোট প্রার্থী সাদেক হোসেন খোকা ও মেজর মান্নানের কাছে। পরে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘ দিন খোকা ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। অধিক জনপ্রিয়তাই হয়তো তার রাজনৈতিক প্রতিপকে হিংসাশ্রয়ী করে তুলেছে। বড়াই গ্রামের মেয়র বাবু, নরসিংদীর মেয়র লোকমান হত্যার পেছনেও তাদের আকাশচুম্বী ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করেন। বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ওপর থেকে আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হওয়ায় এখন ডিসিসি নির্বাচন অনুষ্ঠানে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকল না। ঢাকা ছাড়া দেশের বড় চারটি নির্বাচনী তফসিল ২৯ এপ্রিল ২০১৩ ঘোষণা করা হয়। মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ছিল ১২ মে ২০১৩। ১৫ ও ১৬ মে চলছে যাচাই-বাছাই। ২৬ মে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং ১৫ জুন ২০১৩ ভোট গ্রহণ।
চার সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীরা : জমাদানের শেষ দিনে মেয়র পদে সিটি করপোরেশন রাজশাহীতে ছয়, খুলনায় ছয়, বরিশালে পাঁচ এবং সিলেটে সাতজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
রাজশাহীতে মেয়র প্রার্থীরা হচ্ছেন : আওয়ামী লীগের এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, বিএনপির মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও শফিকুল হক মিলন, জামায়াতের ডা: মো: জাহাঙ্গীর, স্বতন্ত্র মীর মোজাম্মেল হোসেন এবং হাবিবুর রহমান।
খুলনায় মেয়র প্রার্থীরা হচ্ছেন : আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক, বিএনপির মনিরুজ্জামান মনি, এস এম শফিকুল আলম মনা ও সেকান্দার জাফরউল্লাহ খান সাচ্চু, জাতীয় পার্টির শফিকুল ইসলাম মধু এবং মুসলিম লীগের শেখ সিরাজুল ইসলাম।
বরিশালের প্রার্থীরা হলেন : আওয়ামী লীগের শওকত হোসেন হিরণ, যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন, বিএনপির আহসান হাবিব কামাল, অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহিন ও এবাদুল হক চাঁন।
সিলেটের প্রার্থীরা হলেন : আওয়ামী লীগের বদরুদ্দিন কামরান, বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী, নাসিম হোসাইন ও আব্দুল কাইয়ূম জালালী পঙ্কী। জামায়াতে ইসলামীর এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নির্দলীয় সালাহউদ্দিন রিমন। ১৫ ও ১৬ মে যাচাই-বাছাই এবং ২৬ মে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরেই চূড়ান্তভাবে জানা যাবে মেয়র পদে নির্বাচনী দৌড়ে কারা শরিক হচ্ছেন। যুবলীগের একজন প্রার্থী ছাড়া, আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সবাই সদ্যবিদায়ী মেয়র এবং মতাসীন ১৪ দলের একক প্রার্থী। বিরোধী ১৮ দলীয় জোটের প থেকে একক প্রার্থী চূড়ান্ত হলে নির্বাচন তীব্র প্রতিযোগিতা পূর্ণ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিরোধীদলীয় জোট নিজেদের অস্তিত্ব রায় এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনকে সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে আন্দোলনের কৌশল হিসেবে এ নির্বাচনকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে একক প্রার্থী নির্ধারণ করে জোর প্রচারণা চালালে নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত সাফল্য আসতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। এ নির্বাচনে বিরোধী দলের যেকোনো ধরনের শৈথল্য শুধু হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলার মতোই হবে না, ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচনে এর অকল্পনীয় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। এ কথা সত্য, হেফাজতে ইসলামের ওপর সরকারের নিষ্ঠুর বর্বরতা, রানা ভবন ধসে বিপুল প্রাণহানি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার লুট, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, রেলের কালো বিড়ালের দৌরাত্ম্য, বিদেশের শ্রমবাজার হারানোসহ বিরোধী দলের ওপর অগণতান্ত্রিক নির্মম অত্যাচার নিপীড়নÑ নানা কারণে সরকারের ওপর বিদেশীদের অব্যাহত চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তির আশায় তড়িঘড়ি করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে বিরোধী দলকে আন্দোলন থেকে সরিয়ে নির্বাচনমুখী করতে সরকার এক রাজনৈতিক কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমদের মতে, ডিসিসিসহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকারের একটি কৌশল। রাজনৈতিক ফাঁদও বটে; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত আন্দোলনের অংশ হিসেবেই এই নির্বাচনে অংশ নেয়া। সরকার রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায়। এটির মাধ্যমে যে রাজনৈতিক টেনশন আছে তা কমিয়ে আনতে চাচ্ছে। অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষকে আন্দোলন থেকে সরিয়ে নির্বাচনমুখী রাখতেই কাকতালীয়ভাবে এ চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ শুনতে পাচ্ছি।
সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত
জাতীয় সংসদ আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন এক নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল রাষ্ট্রীয় মতা পেয়ে থাকে। সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে। অন্য দিকে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় মন্ত্রণালয়ের অধীনে। স্থানীয় সরকার আইনানুযায়ী এসব নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার বিধান নেই। তবে কোনো দল কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দিলে আইনের ব্যত্যয় ঘটে এমন কথাও নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়নি। বিরোধী জোটের এসব স্থানীয় নির্র্বাচনে প্রার্থী প্রত্যাহার করা বা হাইকমান্ড থেকে সরে দাঁড়ানোর চাপ প্রয়োগ বর্তমান প্রোপটে কোনোভাবেই রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত বলে মনে হয় না। নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন শামীম ওসমান, লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আইভি সেখানে জয়ী হয়েছিলেন। অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার ছিলেন চারদলীয় জোট প্রার্থী। দীর্ঘ দিন পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর পর হঠাৎ করে নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে মধ্য রাতে তাকে বিএনপি হাই কমান্ড নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়। এটি ছিল নিঃসন্দেহে একটি বিতর্কিত ও বিএনপির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। শতভাগ ইভিএমের মাধ্যমে নেয়া কুসিক নির্বাচনে দল থেকে অব্যাহতি নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কু। তাকেও নির্বাচন থেকে সরে যেতে বলা হয়েছিল বিএনপির কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে। বেসরকারি ফলাফলে মনিরুল হক ৬৫ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগসমর্থিত প্রার্থী আফজাল খান পেয়েছিলেন ৩৬ হাজার ৪৭১ ভোট। ভোটাভুটির প্রশ্নে বিরোধী জোটের একমাত্র পণ হওয়া উচিত, বিনা রণে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকার ও বিরোধী দলের জন্য এক ধরনের অ্যাসিড টেস্ট। নানা অগণতান্ত্রিক আচরণ, কুশাসন, দুঃশাসন ও লুটপাটে সরকার ইতোমধ্যেই জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে বলে বিরোধী দল যে দাবি করে আসছে সে দাবিকে মিথ্যা বলে প্রতীয়মান করার জন্য এ নির্বাচনে তারা বৈধ-অবৈধ সব ধরনের শক্তি প্রয়োগ করে জিততে চাইবে। নির্বাচনে বিরোধী দলের সামান্যতম অমনোযোগিতাও সরকারসমর্থকদের জয় লাভে নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। বিরোধী দলের জন্য এ নির্বাচন তাদের উপরোল্লিখিত দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার এক মোম সুযোগ হিসেবে সামনে চলে এসেছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্টিং মিডিয়ার সব কটি জরিপে সরকারের কার্যক্রমে বেশিসংখ্যক জনগণ অসন্তুষ্ট বলে ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার পতনের সম্ভাব্য এক দফা আন্দোলনে এ নির্বাচনের ফলাফল দারুণভাবে প্রভাব ফেলবে। বিরোধী দলের বিজয় সে আন্দোলনকে শতভাগ বেগবান করে তুলবে। জাতীয় নির্বাচন যে পদ্ধতিতেই হোক না কেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় নির্বাচনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
বিরোধী দলের উচিত হবে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারের প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন পপাতমূলক আচরণ যাতে করতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা, দলীয় মাস্তানেরা যাতে ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটদানে বিরত রাখা, পুলিং এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে জোর করে বের করে দেয়া, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোট গণনায় জালিয়াতি, কারচুপি, প্রার্থীদের ওপর হামলা, সরকারের তল্পিবাহক মিডিয়ায় ফলাফল প্রচারে পপাতিত্ব এসব ব্যাপারে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করা।
জনগণের প্রত্যাশা, দেখিনা কী হয় ব্যামোতে আক্রান্ত বিরোধী জোট আর একবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে সাহসের সাথে চিৎকার করে যেন বলে, মরতে যখন শিখেছি, জনগণের ন্যায্য দাবি আদায় করেই ছাড়ব ইনশা আল্লাহ

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads