বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

তাহরিরের কত দূরে শাহবাগ


আরব বসন্তের সূচনা করেছিলেন উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ার তরুণ এক ফল বিক্রেতা। সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেননি। এমনকি তিনি জোগাড় করতে পারেননি একটি সম্মানজনক সরকারি চাকরিও। প্রতিবাদ হিসেবে ফুটপাথে ফল বিক্রির পেশা বেছে নিয়েছিলেন। সেখানেও তিনি সরকারের লেলিয়ে দেয়া বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাননি। প্রতিবাদের সব পথ যখন রুদ্ধ হয়ে গেল, শরীরে আগুন ধরিয়ে তিনি আত্মাহুতি দিলেন। এই আত্মাহুতি সূচনা করল এক মহান আন্দোলনের। সেই আন্দোলনে তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক বেন আলী পালিয়ে বাঁচেন। দেশটির জনগণেরও মুক্তি মেলে।

আত্মবলিদানকারী ওই তরুণ ম্লান হয়ে গেলেন মিসরের তাহরির বিপ্লবীদের কাছে। উন্নত নৈতিকতা ও দৃঢ়সঙ্কল্প এমন নজির সৃষ্টি করল, যাতে তাহরির স্কোয়ার এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বব্যাপী জালিম স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একটি প্রতীকে। প্রবল পরাক্রান্ত হোসনি মোবারকের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নির্ভীক তরুণেরা বুক পেতে নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন। তাদের নিঃস্বার্থ মানসিকতা এ আন্দোলনকে উন্নত মর্যাদা দিয়েছে।
হোসনি মোবারকের শাসনের কৌশল ছিল কঠোর দমনপীড়ন। হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়েছে বিশাল সেনাবাহিনী। মিসরের নিয়মিত সেনাসদস্য সাড়ে চার লাখ। অনিয়মিত রয়েছে আরো সোয়া চার লাখ। ইসরাইলের বিরুদ্ধে পরপর পাঁচবার যুদ্ধ করেছিল এ সেনাবাহিনী। হোসনি মোবারক বা তারও আগের স্বৈরশাসক বসানো হয়েছিল সেনাবাহিনীকে পেছনে রেখে। জনগণকে দমন করে ভয় দেখিয়ে শাসন করার পদ্ধতিটি সফলভাবে প্রয়োগের বুদ্ধি ও সহযোগিতা এসেছিল মার্কিন-ইসরাইল অক্ষের কাছ থেকে। বিশাল সেনাবাহিনীর বন্দুকের নলটি ইসরাইলের দিক থেকে সরিয়ে জনগণের দিকে তাক করা হয়েছিল। সব ধরনের রাজনীতি নির্মূল করেছিল সেনাসমর্থিত স্বৈরশাসকেরা। একটানা সবচেয়ে বেশি দিন জরুরি অবস্থা জারি ছিল সম্ভবত মিসরে। ১৯৬৭ সালে জরুরি অবস্থা বলবৎ করা হয়। ২০১২ সালে ড. মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে জরুরি আইন তুলে নেয়া হয়। জরুরি আইনে পুলিশের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়া হয়। অন্য দিকে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার একেবারে সঙ্কুচিত করা হয়। বেসরকারি রাজনৈতিক কার্যক্রমকে একেবারে সীমিত করা হয়। মিছিল বিক্ষোভ করার অধিকার খর্ব করা হয়। সন্ত্রাসী হুমকির কল্পিত অভিযোগ এনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
বর্তমানে ক্ষমতাসীন ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির মূল সংগঠন সামাজিক আন্দোলন মুসলিম ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতাদের একাংশকে বিচার বিভাগীয় হত্যাকাণ্ডের (জুডিশিয়াল কিলিং) মাধ্যমে নিঃশেষ করে দেয়া হয়। হত্যা, খুন, গুমের শিকার হন আরো হাজার হাজার নেতাকর্মী। নিখোঁজের তালিকায় স্থান হয় অসংখ্য সাধারণ মানুষের। জরুরি আইনের ছত্রছায়ায় নাগরিকদের গণহারে গ্রেফতার করার ফলে জানমালের নিরাপত্তা বলতে কিছু ছিল না। ক্রমেই অন্যায় অবিচার বাড়তে থাকে সাধারণ নাগরিকদের ওপর। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে গিয়ে সামরিক স্বৈরাচারের লেলিয়ে দেয়া বাহিনীর অত্যাচার থেকে শাসকশ্রেণীর তল্পিবাহক ছাড়া শেষ পর্যন্ত আর কেউ রক্ষা পায়নি। ক্ষোভের আগুনে দগ্ধ হয়েছে মিসরের আট কোটি মানুষের হৃদয়। তাদের অব্যক্ত বিক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে কোনো এক বিকেলে। বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে তারা বসে যায় ঐতিহাসিক তাহরির স্কোয়ারে। মিসরীয় তরণেরা যে প্রেক্ষাপটে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল বাংলাদেশেও প্রায় একই ধরনের প্রেক্ষাপট বিরাজ করছে।
২৫ জানুয়ারি দিনটি ছিল মিসরীয় ‘পুলিশ ডে’। আর জায়গাটি ছিল ক্ষমতাসীন দলের ঠিক সদর দফতরের সামনে। এটি কায়রো শহরের প্রাণকেন্দ্র। উত্তর-পূর্ব দিকে জাতীয় বীর ওমর মাকরামের স্ট্যাচু। ফরাসি বীর নেপোলিয়নকে রুখে দিয়েছিলেন ওমর। তার পাশেই ওমর মাকরাম মসজিদ। চারটি প্রধান সড়ক স্কোয়ার থেকে বেরিয়ে কায়রো শহরকে প্রদণি করেছে। বিপ্লবের উদ্যোক্তারা জানত এই স্কোয়ারে অবস্থান নেয়া মানে শহরটি স্থবির হয়ে যাওয়া। এটি সচল রাখার জন্য শত শত লাশ ফেলতে পুলিশ ও মোবারকের নানা গুপ্তবাহিনী মোটেই দ্বিধা করবে না জানত বিপ্লবীরা। লাশ পড়েছিল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় এর সংখ্যা বেড়েছিল। ওই তরুণেরা লাশ আঁকড়ে পড়েছিল স্কোয়ারে। কেউ প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যায়নি। তারা জানত পালানোর মধ্য দিয়ে সাময়িক মুক্তি মিলবে কিন্তু স্বাধীনতা আসবে না। বাংলাদেশের একদল তরুণ ব্লগার রাজধানীর ব্যস্ত মোড় শাহবাগে এক বিকেলে জড়ো হয়। ঢাকার বিধস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার মধ্যে শাহবাগ মোড় স্থবির হয়ে যায়। তরুণেরা এটিকে তাহরির স্কোয়ারের সাথে তুলনা করতে চাইলে পুলিশ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে এগিয়ে আসে। চত্বরে জড়ো হওয়া তরুণদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার প্রচেষ্টার বদলে তাদের চার পাশে রাস্তা ব্লক করে নিরাপত্তা দেয়।
হাজার হাজার তরুণকে সরাতে ব্যর্থ হয়ে তাহরির স্কোয়ারসহ সংলগ্ন এলাকার বেতার যোগাযোগ বিকল করে দিয়েছিল মিসরের সরকার। বাইরে সব রকমের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বিপ্লবীদের। বাইরে থেকে তাদের সাথে কেউ যোগাযোগ করবে সে সুযোগও ছিল না। পাশের বন্ধুটি হারিয়ে গেলে জান বাঁচানোর জন্য অন্য বন্ধুরা পালিয়ে যায়নি। স্বৈরাচারের রক্তচু উপেক্ষা করে তাদের জন্য খাদ্য পানীয় নিয়ে এগিয়ে আসেনি কোনো কোম্পানি। কোনো মতলববাজ সাহস পায়নি বিপ্লবীদের মাঝে সুস্বাদু বিরিয়ানি বিলিয়ে দিতে। তাহরির বিপ্লবীদের জন্য কেউ চাঁদাবাজি করবে তা ছিল অকল্পনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে দ্রুত তাদের নৈতিক পরাজয় হতো। দলেবলে বিপ্লবী স্কোয়ারে যোগ দিতে যাচ্ছিল বলে কেউ বাস-ট্রেনের টিকিট মুফতে পায়নি। অথবা জোর করে ভাড়া না দিয়ে যায়নি বিপ্লবীর নাম করে কোনো গ্রুপ। এ ধরনের পতিত আচরণ থেকে বিপ্লবীরা শুরু থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল। শাহবাগ চত্বরে দেখা গেল এর বিপরীত অবস্থা। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ পানি টয়লেটের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। অনেক কোম্পানি খাদ্যসাহায্য নিয়ে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে শাহবাগের ব্লগারদের নাম করে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজির। প্রধান উদ্যোক্তা ও মঞ্চের সভাপতি ডা: এইচ ইমরানের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার এ ব্যাপারে সতর্কতাও ব্যক্ত করা হয়। তিনি ব্যবসায়ীদের এ ধরনের চাঁদাবাজদের পুলিশে ধরিয়ে দিতে বলেছেন। শাহবাগের নাম করে দলেবলে গাড়িতে উঠে অনেকে ভাড়া দিচ্ছেন না, এমন অভিযোগও উঠেছে।
সাত দিনের মাথায় তাহরির স্কোয়ারে বিপ্লবীদের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। তাদের জন্য ছিল না সুসজ্জিত কোনো মঞ্চ। খাদ্য, পানীয় ও পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে তাদের কাছে আশাজাগানিয়া মধুর কণ্ঠে গান নিয়ে আসেনি কোনো নারী। প্রতিদিন নতুন নতুন সেলিব্রেটিরা স্কোয়ারে যোগ দিয়ে তাদের উজ্জীবিত করেনি। সাধারণত সেলিব্রেটি সুবিধাবাজেরা থাকে কায়েমি শাসকদের পক্ষে। কেউ তৈরি করে দেয়নি স্লোগান। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দলে দলে এসে প্রতিদিন যোগ দিতে পারেনি বিপ্লবীদের দল ভারী করার জন্য। শক্তিশালী কায়েমি গোষ্ঠীর কেউ তাহরিরে সাহায্যকারী হিসেবে ছিল না। শাহবাগে প্রতিদিন নতুন নতুন সেলিব্রেটিরা এসেছেন। স্কুল-কলেজ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষক-ছাত্ররা এসে সংহতি প্রকাশ করেছে।
মিসরে বিপ্লবের শুরুতে কারাগার থেকে হাজার হাজার দাগি আসামিকে ছেড়ে দেয় মোবারকের সরকার। এটা এমন এক ফ্যাসিবাদী কায়দা, স্বৈরশাসকেরা জনপ্রিয় আন্দোলনকে ঠেকানোর জন্য যা ব্যবহার করে থাকে। বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে খুন, গুম চালায় দাগি অপরাধীরা। তারা ১৮ দিন ধরে ভেতরে নানা গোলযোগ সৃষ্টি করে বিপ্লব ভণ্ডুল করার অপচেষ্টা করেছে। তারা বিপ্লীদের টলাতে পারেনি। পুলিশও প্রথম কয়দিনেই নৈতিকভাবে পরাজিত হয়। মোবারক এবার নামিয়ে দেন বিশাল সেনাবাহিনীকে। সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র পুরো স্কোয়ার এবং ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের কেন্দ্রগুলোতে মোতায়েন করা হয়। বেসামরিক পোশাকে নানা গুপ্তবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল তার চেয়েও বেশি। তারা বিপ্লবীদের ভেতর ঢুকে নানা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড ঘটায়। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দুই একজন আন্দোলনকারীকে আলাদা করে প্রতিনিয়ত পিটিয়ে হত্যা করতে থাকে তারা। নারীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি ছিল আরো বেশি চোখে পড়ার মতো। বর্তমান সেনাপ্রধান আল সিসি এ ধরনের ঘটনার সমালোচনা করতে গিয়ে মোবারক নিয়ন্ত্রিত সামরিক পরিষদের তোপের মুখে পড়েন তখন। শাহবাগের আন্দোলনকারীরা শাসক শ্রেণীর বেআইনি কর্মকাণ্ড নিয়ে একেবারে চুপ। শেয়ারবাজার, হলমার্ক, পদ্মা সেতু, বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো দাবি পেশ করেনি তারা। সে জন্য সরকারের বিভিন্ন বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কোনো প্রশ্নই আর আসেনি।
সাপ্তাহিক-মাসিকসহ মিসরে জাতীয় পত্রিকার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। টেলিভিশন চ্যানেল ১০০-এর কাছাকাছি। মিসরে মিডিয়ার বিস্তৃতি বাংলাদেশের চেয়ে বহু গুণে বেশি। এ মিডিয়ার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রবল। সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী মিডিয়া আল আহরাম ছিল সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বেতার যোগাযোগ বিকল করার পাশাপাশি মিডিয়ার কণ্ঠ রোধ করে ২৫ জানুয়ারি স্কোয়ারে জমায়েত হওয়া বিপ্লবীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল শাসকগোষ্ঠী। স্কোয়ারে সরকারি বাহিনীর হত্যা, খুন, গুমের খবর স্বাভাবিকভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। মিসরীয় জনগণকে সরকার ও মিডিয়া বিভ্রান্ত করতে পারেনি। আত্মোৎসর্গকারী তাহরির বিপ্লবীদের চেহারা জনগণ ঠিকই চিনে নিয়েছিল। সে চেহারায় ছিল শপথের দৃপ্ত আভা। মুষ্টিবদ্ধ হাত আর উচ্চকিত স্লোগান। এ স্লোগান আর মুষ্টিবদ্ধ হাত ও চেহারার দৃঢ়তার মধ্যে কোনো প্রকার কৃত্রিমতা ছিল না। এ যৌবন তেজ মিডিয়ায় শুধু দেখানোর জন্য করা অভিনয় ছিল না। হিরো বনে যাওয়ার বিলাসিতা থাকলে এই উচ্চ মনোবল প্রদর্শন সম্ভব হতো না। এই বিপ্লবে তাই কোনো হিরো দেখা যায় না। পঞ্চম দিনে আলজাজিরা ও বিবিসি এ বিপ্লবের চরিত্র বুঝতে সমর্থ হয়। তারা শুরু করে এর অব্যাহত কাভারেজ। পরে বিশ্বমিডিয়া তাদের সাথে যোগ দেয়।
১৮ দিনের মাথায় মোবারকের পতনের আগে কোনো দেশীয় পত্রিকা বিপ্লবীদের খবরটি ব্যানার হেডিং করেছিল কি না, সন্দেহ। জাতীয় পত্রিকাগুলো সাংবাদিকতার একটি সাধারণ গ্রামার অনুসরণ করে। কোনো বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়, সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের মতো পর্যায়ের ব্যক্তিদের হত্যা, বিশ্বকাপ জয়ের মতো কৃতিত্বের আলাদা মাহাত্ম্য বোঝানোর জন্য এ ধরনের শিরোনাম ব্যবহার করে। বছরে দু-একবার এ ধরনের শিরোনাম ব্যবহার হয়। ঘটনা না ঘটলে বছর গড়িয়ে গেলেও ব্যানার হেডিং ব্যবহার হয় না; এটাই নিয়ম। পত্রিকার প্রথম পাতার ওপর আট কলাম শিরোনাম দেয়াকে ব্যানার হেডিং বলে। প্রথম পাতার পুরোটা পোস্টার করে ফেলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন। ব্যানার হেডিং পত্রিকার একটি শক্তিশালী অস্ত্র যেনতেনভাবে ঘন ঘন এবং মতলবি ব্যবহার এর কার্যকারিতাকে দুর্বল করে দেবে নিঃসন্দেহে। এর মাত্রাজ্ঞানহীন ব্যবহার জনগণের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায়। শাহবাগের খবর প্রচারে প্রথম দিনই দেশের প্রায় সব পত্রিকা ব্যানার হেডিং ব্যবহার করেছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে টানা প্রধান প্রধান সব পত্রিকা ব্যানার হেডিংয়ে শাহবাগের খবর প্রকাশ করেছে। অনেক পত্রিকা প্রথম পাতা পুরোটাই এ জন্য ব্যবহার করেছে। টেলিভিশন চ্যানেলও বড় ধরনের কাভারেজ দিয়েছে শাহবাগ চত্বরের।
মিসরে খবর প্রচার করতে গিয়ে সাংবাদিকেরাও পরিণত হয়েছিলেন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে। অনেকে মোবারকের বাহিনীর হাতে হয়েছেন নিগৃহীত। সাংবাদিকদের ওপর একটি সাধারণ অত্যাচার ছিল তাদের ধরে নিয়ে নীল নদের পানিতে চুবানো। আন্দোলনের খবর দিতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক খুন হয়েছেন। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন অনেকে।  বিপ্লবীদের পক্ষে সংবাদ প্রচার করছে বা বিপ্লবকে উসকে দিচ্ছে, এ ধরনের অভিযোগ এনে অনেক সংবাদমাধ্যম অফিস জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। অনেক সংবাদমাধ্যমের ওপর কায়রোতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। অন্যদিকে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে শাহবাগে সাংবাদিকেরা নিরাপদ। যত বেশি কাভারেজ দেয়া হচ্ছে, সরকার নিজের জন্য এটিকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করছে।
তাহরির স্কোয়ারে বিপ্লবের চূড়ান্ত দিনগুলোতে তিন লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল। কোনো সংবাদমাধ্যম এ সংখ্যাকে ১০ লাখ বলেও উল্লেখ করেছে। এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল মিসরের সব উল্লেখযোগ্য শহরে। একপর্যায়ে দেশটির আট কোটি মানুষের প্রায় সবাই একাত্ম হয়েছিল তাহরির বিপ্লবীদের সাথে। শাহবাগ চত্বরের উদ্যোক্তাদের অনেকের বিতর্কিত মত-পথ প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় এখন এর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা। ছড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে এটি
বিতর্কিত হয়ে আরো সঙ্কুচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
মিসরে দরিদ্র মানুষ যখন তিন বেলা রুটি জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে, মোবারক ও তার পরিবার এবং শাসক দলের সাথে সংশ্লিষ্টরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিল। এ খবর সচেতন সবার কাছে অজানা ছিল না। ২০১১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানায়, হোসনি মোবারকের সম্পত্তির পরিমাণ ৭০ বিলিয়ন ডলার। জনগণের এসব সম্পত্তি দেশের বাইরে ব্রিটিশ এবং সুইস ব্যাংক, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস ও লোহিত সাগরের তীরে গড়ে ওঠা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করা ছিল। বিপ্লবীরা এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর অনুগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। শাহবাগ চত্বর এ ব্যাপারে নিশ্চুপ।
অবশ্যই কিছু ব্লগার মহান তাহরির বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল। তাদের রাজনৈতিক পরিচয় একেবারে গৌণ ছিল। যদিও মিসরে নাস্তিক্য ধারা, চরম বাম ধারা, উদার বাম ধারা, ডান ধারা এবং খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক দল আছে। এ ব্লগারদের সবাই নিশ্চয়ই এসব রাজনৈতিক ধারার কোনো-না-কোনোটির সমর্থক বা অ্যাক্টিভিস্ট হতে পারেন। আন্দোলনের সময় কপটিক খ্রিষ্টানদের কেউ বাম উগ্র প্রতিক্রিয়াশীলদের গালি দেয়নি। ইসলামপন্থী উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল কেউ গালি দেয়নি খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসী রাজনৈতিক নেতাদের। কোনো গোষ্ঠীর সম্পদ লুটপাট, কোনো ব্যক্তির ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান দখলÑ এসব সঙ্কীর্ণ চিন্তা তাহরির বিপ্লবীদের মনের ধারেকাছেও আসেনি। আন্দোলনকারীদের কারো বিরুদ্ধে খোদাদ্রোহী, কারো বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহী উগ্রপ্রতিক্রিয়াশীলতার অভিযোগ আনা যায়নি। অথচ শাহবাগ চত্বরের আয়োজকদের সবাই এরই মধ্যে বাম ও আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক বলে চিহ্নিত হয়েছেন।
তাহরির বিপ্লবীরা মোবারকের প্রতি ব্যক্তি আক্রোশের প্রতিফলন ঘটানোর পরিবর্তে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের দিকে ধাবিত হয়েছে। এখন মোবারকের বিচার চলছে। কয়েকটি মামলায় তার শাস্তিও হয়েছে। শাস্তি লাঘবে আত্মীয়স্বজন বিক্ষোভ মিছিল করেছে, এমন ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিপ্লবীরা মোবারকের আত্মীয়দের কণ্ঠ রোধ করতে যায়নি। এরা মোবারক আমলের নিয়োগ পাওয়া বিচারক। কাউকে নির্মূল করা, খতম করা, চামড়া তুলে নেয়ার হুমকি স্কোয়ার থেকে আসেনি; বরং তাহরির বিপ্লবীরা প্রতি মুহূর্তে নিজ জীবন হারানোর ঝুঁকির মধ্যে থেকেছেন। মোবারক সরকারের লেলিয়ে দেয়া অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হয়েছে সম্পূর্ণ খালি হাতে। অগ্নিগর্ভ তাহরির স্কোয়ারে হাসিঠাট্টা, হালকা রসিকতা বা গানবাজনা করে আনন্দ লাভ করার কোনো সুযোগ ছিল না।
তাহরির বিপ্লবের দুটো পক্ষ ছিল স্পষ্ট। একটি মোবারক এবং তার অনুগত সুবিধাবাদী শ্রেণী। তাদের হাতে ছিল পুলিশ, সেনাবাহিনী। এর বাইরে নানা গুপ্তঘাতক দল। সংবাদমাধ্যম এবং প্রশাসনও ছিল তাদের কব্জায়। অপর পক্ষে ছিলেন নির্যাতিত-নিপীড়িত, শোষিত-বঞ্চিত জনগণের প্রতিনিধি তরুণ বিপ্লবীরা। উচ্চ নৈতিক ভিত্তি ও সঙ্কল্প দ্রুত জনগণকে বিপ্লীদের দিকে ধাবিত করেছে। অন্য দিকে শাহবাগ জাগরণে সরকার ও সরকারের বিভিন্ন বাহিনী চত্বরের আয়োজকদের সাথে রয়েছে। মিডিয়া তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ বিপ্লবীদের জন্য যে ধরনের প্রতিকূল পরিবেশ প্রয়োজন হয় সেটার বৈশিষ্ট্য শাহবাগ চত্বরে  দেখা যায় না।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads