বৃহস্পতিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

সংবাদপত্রে আগুন!



গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সংবাদপত্র দাউদাউ করে জ্বলছে হিংসার আগুনে। এ আগুন দগ্ধ করল গণতান্ত্রিক চেতনা ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের ইমেজকে। বিভিন্ন বাহিনী কর্তৃক সংবাদপত্রে হানা দেয়া ও খানা-তল্লাশী করার অপধারার সঙ্গে এবার যুক্ত হল হামলা ও আগুনের ঘটনা।
সংবাদপত্রে হামলার অন্য অর্থ গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হামলা। বহুমত ও বহুদলের যে গণতন্ত্র, সেখানে শত ফুল ফুটতে হবে; শত মত বিকশিত হতে হবে। একদলীয়, ফ্যাসিস্ট বা নাৎসি কায়দায় গণতন্ত্র চলে না। বিশ্বের ইতিহাসে তথাকথিত জনপ্রিয়দের হাতে বার বার গণতন্ত্র ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। নাৎসি হিটলার জনপ্রিয় ভোটেই নির্বাচিত হয়ে জার্মানির ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু তার কাজ গণতান্ত্রিক ও মানবতার পক্ষে ছিল না। ইতিহাস হিটলারের তথাকথিত গণতান্ত্রিক চেহারার ওপর লেপ্টে দিয়েছে স্বৈরতন্ত্রের বীভৎস চিহ্ন। অতএব ভোটে জেতা বা জনপ্রিয়তাই  গণতান্ত্রিক পরিচিতি নয়; আচরণ ও কাজই প্রমাণ করে কে গণতান্ত্রিক আর কে অগণতান্ত্রিক।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সংবাদপত্র দলনের ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। সম্পাদককে আটক করা, ধরে নেয়া, ভয়-ভীতি দেখানো, পত্রিকার অফিস ও গাড়িতে হামলা করা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা উপেক্ষা করার মত নয়। সরকারের ভূমিকা ও দায়িত্বও প্রাসঙ্গিকভাবে লক্ষণীয়। খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে বিশেষ দল বা মতের পক্ষে বিশেষ শ্লোগান দিয়ে সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে হামলা ও অগ্নিকান্ড ঘটানো নিঃসন্দেহে খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। হিংসার আগুন এভাবেই প্রলম্বিত হচ্ছে। এটা কখনওই কাম্য নয়।
বাংলাদেশের সংবাদপত্র জুলুম-নির্যাতন মোকাবিলা করেই এগিয়েছে। সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সংবাদপত্রের প্রতি হামলা, মামলা হয়েছে। দলন-নিপীড়ন হয়েছে। এদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে কালো দিবস আছে, এমন কৃষ্ণ অধ্যায় সম্ভবত বিশ্বের অন্য কোনও দেশের সংবাদপত্রের নেই। তারপরেও সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীন মত-প্রকাশের পথে এগিয়ে গেছেন। এদেশে সাগর-রুনীর মতো ঘটনারও কূল-কিনারা হয়নি। আজও সাংবাদিকসহ সমাজের মানুষদের ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় সহযোগী পত্রিকায় আগুনের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। অগণতান্ত্রিক, মত-প্রকাশের স্বাধীনতায় অবিশ্বাসীদের দাপট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইমেজকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই আগুন ও হামলা প্রশ্নবিদ্ধ করল গণতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতিকে।
বাংলাদেশে হামলা ও আগুনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের একটি জঘন্য অপধারা। হুঙ্কার, শক্তি প্রয়োগে বাধ্য করা, চাপ প্রদানের সহিংস তৎপরতা প্রদর্শন করা আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের রীতি-নীতি নয়। মুক্তবুদ্ধি, উদার বিবেক, শুদ্ধতা ও প্রগতি কখনও শক্তি ও হামলার মন্ত্র উচ্চারণ করায় না। কিন্তু বাংলাদেশে প্রগতি ও গণতন্ত্রের নাম করেই ঘৃণ্য অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড করা হচ্ছে। আদর্শের নামে অনাদর্শিক কাজ বা প্রতিপক্ষ নিধনের নারকীয় পন্থা বাংলাদেশে ক্রমে ক্রমেই প্রাধান্য পাচ্ছে। এই হটকারী, বলদর্পী ও আক্রমণাত্মক কার্যক্রম গণতন্ত্রের সহযোগী হতে পারে না।
বাংলাদেশকে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পথে রাখা কেবল সরকার নয়, জনগণেরও দায়িত্ব। এদেশের সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, আলেম সমাজ, নারী সমাজ কখনওই চাইবে না হিংসার আগুনে সমাজ পুড়ে যাক। সবাই সুন্দর জীবন ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়। কেউ নিজে এবং অপরকে আগুনে ও হিংসায় দগ্ধ করতে চায় না। যারা আগুন নিয়ে খেলছে, তাই তারা জনপ্রিয় হতে পারে না। হিংসা নিয়ে যারা কাজ করছে, তারাও মানুষের পছন্দের লোক হতে পারে না। এই সত্যটি উপলব্ধি করার সময় এসেছে। মানুষকে এখন ঐক্যবদ্ধ ও সরব হতে হবে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। সমাজকে বাঁচানোর জন্য। বোকা হয়ে অনাচার সহ্য করাও এক ধরনের অপরাধ। এ কথাটিই সবাইকে এখন উপলব্ধি করতে হবে।
আমরা অবশ্যই আশা করবো যে, এই হিংসা ও আগুনের অবসান ঘটুক। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও উস্কানির হাত থেকে বিভ্রান্তদের রক্ষা করা হোক। হিংসার জমায়েতের অগ্নিকুন্ডে ঘি ঢালা বন্ধ করা হোক। মানুষকে ন্যায্য অধিকার দেয়া হোক। নিরাপত্তার মধ্যে আনা হোক। সুশাসনের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া হোক। গুম, খুন, হত্যার রাজনীতির কবর রচনা করে এবং দুনী©র্ত ও অন্যায়ের অবসান করে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারার বিকাশ ঘটানো হোক। ঘোলা জলে যারা অপকর্ম আড়াল করতে চায়, তাদেরকেও উন্মোচিত করা হোক। 
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ন্যায়পন্থী মানুষের বিরাট উত্থানের মাধ্যমে ক্ষুদ্রতা, হীনতা, হিংসার বিষবৃক্ষ নির্মূল হবে এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। ইতিহাসের স্বর্ণালী শিক্ষায় বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। আত্মকলহে জর্জরিত হলে চলবে না। বাংলাদেশকে শান্তি ও সমঝোতার ক্ষেত্রে পরিণত করতে হবে। যারা অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের হিংসার জয়ধ্বনি দিচ্ছে, তারা বৃহত্তরের শান্তিবাদী পদক্ষেপে মাটিতে মিশে যাবে। অসৎ হুঙ্কার কখনওই সৎ উচ্চারণের সামনে মাথা উঁচু করতে পারে না। এটাই অমোঘ সত্য।
কাপুরুষের মতো হামলা ও আগুন জ্বালানোকে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এখন দেখার বিষয় এই অপরাধ ও অপকর্মের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কি করে। সাংবাদিক সমাজ ইতিমধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দিতে হবে। স্বাধীনভাবে কাজ করার ও মত প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। আইন ও ন্যায়বিচারের চেতনা অনুযায়ী অপরাধীদের শাস্তি বিধানের দাবি আজ সকলেরই। জনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সবাই একাত্ম হবে, এটাই আজকের কর্তব্য। জাতির চলমান সঙ্কটে কাম্য কাজটি যারা করবেন না, তারা একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় আসামীর মতো উপস্থিত হবেন। মানুষকে বিপদে ফেলে, ভয়ে রেখে, আগুনের শিখা দেখিয়ে সম্মান ও ভালোবাসা পাওয়া যাবে না। মুসলমানের বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ আগুনের পূজা করে না, আগুনকে ভয়ও পায় না। যারা আগুনকে মান্য করে, আগুনকে অস্ত্র করে, তারা এদেশে টিকতে পারবে না। অচিরেই তাদের আগুনে তারাই ছারখার হয়ে যাবে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads