শনিবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে পদ্মা সেতুর বিসর্জন



অবশেষে দুর্নীতিকে প্রাধান্য এবং দুর্নীতিবাজদের রক্ষার মরিয়া প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে বলে জানা গেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবরানুযায়ী বাংলাদেশ সরকার গত ৩১ জানুয়ারি বিশ্ব ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থ গ্রহণ করবেন না এবং বাতিলকৃত ঋণ চুক্তি পুনর্বিবেচনার জন্য সংস্থাটিকে যে অনুরোধপত্র দিয়েছিলেন তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বলা বাহুল্য এর আগে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বিশ্ব ব্যাংকের কাছে সেতু প্রকল্প নির্মাণে অর্থায়নের গ্যারান্টি চাওয়া হয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে ৩০ জানুয়ারি বিশ্ব ব্যাংক প্রধান ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে এই মর্মে ঘোষণা করেন যে দুর্নীতির স্বচ্ছ ও পুর্ণাঙ্গ তদন্তের আগে তারা পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবেন না। বিশ্ব ব্যাংকের এই ঘোষণার পরই বাংলাদেশ সরকার এই প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন। ফলে পদ্মা সেতু নির্মাণ যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তেমনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে সংস্থাটির সাথে সরকারের যে টানাপোড়ন চলছিল তারও অবসান ঘটেছে বলে মনে হয়। বিশ্ব ব্যাংকের ঘোষণার পর সেতু প্রকল্পের সহযোগী অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে অর্থায়নকারী অন্য দুটি সংস্থা জাইকা এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকও বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবির পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের অনীহা এবং দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করার সরকারি প্রচেষ্টার ফলে সৃষ্ট এই ঘটনাকে আমরা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অপমানকর বলে মনে করি। দুর্নীতির পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণ করার এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিশ্বে অত্যন্ত বিরল এবং বাংলাদেশ সরকার এই কাজটি করে ১৬ কোটি মানুষের মুখকে কালিমালিপ্ত করেছেন বলে আমাদের বিশ্বাস। এর ফলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সাড়ে চার কোটি লোক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলো। সরকার তাদের স্বার্থকে মাথায় তুলে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ ও দুর্নীতি রক্ষার জন্য একটি আছাড় মেরে তাদের স্বপ্নকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছেন বলে মনে হয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থে ২০০৭ সালের আগস্ট মাসের ২০ তারিখে ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা ব্যয় ধরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে পদ্মা সেতু প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু হয় এবং প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দও দ্বিগুণ থেকেও বৃদ্ধি করে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার তথা প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে সরকার বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও আইডিবির সাথে ঋণ সহায়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ব ব্যাংক উপদেষ্টা সংস্থা ও ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে অর্থ বরাদ্দ স্থগিত করে এবং সরকারকে এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ করে। এডিবিসহ অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলোও বিশ্ব ব্যাংকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। বাংলাদেশ সরকার প্রথমতঃ দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা অশালীন ভাষায় সংস্থাটির সমালোচনা করেন। বিশ্ব ব্যাংক পরবর্তীকালে এক পত্রে দুর্নীতির বিস্তারিত তথ্য ও তার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্যও সরকারকে অবহিত করেন। এতে সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব, সংসদ সদস্য এবং একজন শীর্ষ নেতার নাম ধামও প্রকাশিত হয়ে পড়ে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে সরকার বিশ্ব ব্যাংকের এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ তো করেনইনি বরং অভিযুক্তদের কাউকে কাউকে সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত দেশপ্রেমিক বলেও ঘোষণা দেন, দুদকও এর সাথে জড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব ব্যাংকের এসব তথ্য-প্রমাণ সরকার সাধারণ্যে প্রকাশ করেননি। তবে লোক দেখানোর লক্ষ্যে একজন মন্ত্রীর দফতর বদল ও সচিবকে ছুটিতে পাঠিয়ে দেন। সংস্থাটি সরকারের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে ২০১২ সালের ৫ জুন প্রথমতঃ অর্থায়নের ক্ষেত্রে চারটি শর্ত আরোপের পরে ২৯ জুন শর্ত না মানায় ঋণ চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। জুলাই মাসের ২৩ তারিখে সৈয়দ আবুল হোসেন মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর সরকারের টনক নড়ে। তারা বিশ্ব ব্যাংকের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার শরণাপন্ন হন। বিশ্ব ব্যাংক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আগের শর্তগুলোই পুনর্ব্যক্ত করে। বাংলাদেশ সরকারও শর্ত মেনে নেন। এই অবস্থায় অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য গত অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে বিশ্ব ব্যাংক নিযুক্ত একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল দু'দফায় ঢাকা আসে এবং সরকার ও দুদকের অগ্রগতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যায়। সরকারের গড়িমসিতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাত কারণে সরকার ব্যবস্থা নিতে চান না এবং তদন্তের লোক দেখানো নাটকের ভিত্তিতেই সংস্থাটির কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে চান। সংস্থাটি যখন দুর্নীতির বিচারের উপর গুরুত্বারোপ করে অর্থায়নে অপারগতা প্রকাশ করে তখনি সরকার তাদের কাছ থেকে অর্থ নেয়া হবে না মর্মে পত্র দেন। এ থেকে সরকারের দায়িত্বহীনতাই প্রমাণিত হয়েছে এবং বৃহৎ প্রকল্পের নামে তারা যে অর্থ কামাতে লিপ্ত হয়ে পড়েছেন দেশ-বিদেশে তা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং পাশ্চাত্যের দেশগুলোর কাছেও আমাদের মাথা হেট হয়ে পড়েছে। এর  জের ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে অনেক খেসারতও দিতে হতে পারে। হিসাব কষে এই ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা যাবে না। সরকার সেতু নির্মাণে এখন যে বিকল্প অর্থায়নের উৎসগুলো সম্পর্কে বাগাড়ম্বর করছেন তা দেশের স্বার্থকে আরো বিপন্ন করে তুলবে বলে আমরা মনে করি। নিজস্ব অর্থায়নের নামে চাঁদাবাজির অর্থ ভাগ করতে গিয়ে রাজশাহীতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ও একজন নিহত হবার ঘটনা দেশবাসীর মধ্যে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads