মঙ্গলবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

তরুণ প্রজন্মকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার


তরুণ প্রজন্মকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার
তরুণ প্রজন্ম যে কোনো জাতির জন্যই বড় সম্পদ। এই প্রজন্মের মূল দায়িত্ব নিজকে গড়ে তোলার মাধ্যমে আগামীতে দেশ ও জাতির সেবক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন। তবে এমন যোগ্যতা অর্জনের জন্য যেমন পরিবেশ প্রয়োজন, তা প্রদানের দায়িত্ব অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রের। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে কিংবা সমাজে অন্যায়-অবিচার ও অসঙ্গতির চিত্র অব্যাহত থাকলে তরুণ প্রজন্মে দেখা দেয় দ্রোহ। তখন অনেক সময় তারা লেখাপড়া ও নিজেকে গঠনের কাজে বিরতি দিয়ে নেমে পড়ে বিক্ষোভে, আন্দোলনে। কিন্তু এদের যথার্থ কর্মসূচি ও সঠিক নেতৃত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতিহাসের পাতায় লক্ষ্য করা গেছে, অনেক সময় জীবনযুদ্ধে অনভিজ্ঞ ও আবেগপ্রবণ তরুণ প্রজন্মকে ভুলপথে পরিচালিত করে কায়েমী স্বার্থবাদীদের নিজস্ব মতলব হাসিলের অপচেষ্টা। শাহবাগ আন্দোলনেও তেমন উদাহরণ লক্ষ্য করা গেছে, যা দেশ ও জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
বর্তমান সময়ে দেশে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যু বর্তমান থাকলে সরকারের প্ররোচণায় একটি মহল যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুটিকে প্রধান করে তুলেছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক মুক্তি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, মানবাধিকার রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছিল। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিগত চার বছরে সরকার প্রতিশ্রুত ঐসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তেমন সফল হতে পারেনি; বরং সুশাসন, দুর্নীতিমুক্তি ও মানবাধিকার রক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সরকারের ব্যর্থতা খুবই প্রকট। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের শেষ বছর অর্থাৎ নির্বাচনের বছরটিতে যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে যে মাত্রায় ও যে প্রক্রিয়ায় উত্তপ্ত করে তোলা হচ্ছে, তাতে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার সঠিক পদক্ষেপই নিয়েছে। সরকার যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য আদালত গঠন করেছে, বিচারক নিয়োগ করেছে এবং বিচারকরা রায় প্রদানও শুরু করেছেন। প্রথম বিচারে ফাঁসি এবং দ্বিতীয় বিচারে যাবজ্জীবনের রায় দেয়া হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যাবজ্জীবনের রায়ের পরেই হঠাৎ করে শাহবাগের চৌরাস্তায় ব্লগার অ্যাক্টিভিস্টের নামে একটি মঞ্চ গঠন করে রায়ের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান করা শুরু হলো। তারা আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবনের রায় প্রত্যাখ্যান করে ফাঁসির দাবি করলো। এই দাবিকে তারা খুবই উত্তপ্ত করে তুললো এবং তরুণ প্রজন্মের নামে তাদের মঞ্চে একে একে উঠে আসলো বর্তমান মহাজোট সরকারের ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাসহ সরকারি ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতাকর্মীরা। এমনকি সরকারের মন্ত্রীরা এসে সেখানে একাত্মতা ঘোষণা করলেন। আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো, কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে এ মঞ্চ গঠিত হলেও একে একে সেখানে সংযুক্ত হতে থাকলো বহু দাবি-দাওয়া। এমনকি সেখান থেকে ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার উস্কানিও দেয়া হলো। ভিন্নমতের নাগরিকদের নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেয়ার দাবিও উত্থাপিত হলো। এভাবে ব্লগার অ্যাক্টিভিস্টদের নামে শুরু করা আন্দোলনটি ক্ষমতাসীনদের বিশেষ রাজনৈতিক তৎপরতায় পরিণত হলো এবং আগামী নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার কৌশলও লক্ষ্য করা গেল।
এভাবে তরুণ প্রজন্মের একটি উদ্যোগ ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের আবর্তে লক্ষ্যচ্যুত হয়ে গেল। এ কারণেই পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, সরকারের চার বছরের স্তূপিকৃত ব্যর্থতা আড়াল করতে প্রজন্ম চত্বরের জন্ম হয়নি। তারা আরও বলছেন, যুদ্ধাপরাধের ফাঁসির দাবির সাথে সাথে শাহবাগ চত্বর থেকে যদি শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক দুর্নীতি, পদ্মাসেতু কলঙ্ক, স্বচ্ছ নির্বাচন পদ্ধতি ও সুশাসনসহ বিভিন্ন গণদাবিগুলো তুলে ধরা হতো তাহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতো। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, জাতীয় স্বার্থের বদলে দলীয় স্বার্থের চেতনায় শাহবাগ মঞ্চের আন্দোলন পরিচালিত হওয়ায় তা সংহতির বদলে জাতিকে বিভক্তির পথেই ধাবিত করছে। ব্লগারদের আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, উদ্যোক্তাদের অনেকের ধর্মবিরোধী বক্তব্য ও আচরণ। এরা কৌশলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে যেভাবে ইসলামী চেতনার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে তা জনগণকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। আসলে শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলীয় রাজনীতি ও আগামী নির্বাচনের স্বার্থ আন্দোলনটিকে শুধু লক্ষ্যচ্যুতই করেনি বরং জাতিকে নিয়ে গেছে অনৈক্য ও সংঘাতের এক ক্ষতিকর পথে। এজন্যই বলা হয়, শুধু চাতুর্য ও কৌশলের মাধ্যমে কোনো কাজে সাফল্য অর্জন করা যায় না। সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন হয় লক্ষ্যের সততা এবং কর্মসূচির গ্রহণযোগ্যতা। শাহবাগ মঞ্চের তরুণ-প্রজন্ম বিষয়টি উপলব্ধি করলেই মঙ্গল। আর বর্তমান মুহূর্তে সরকারের উচিত সাংবিধানিক দায়দায়িত্বের আলোকে নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ এবং মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হওয়া। এ পথে তারা অগ্রসর হয় কিনা- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads