বুধবার, ৯ জানুয়ারী, ২০১৩

বিমানবন্দরে নৈরাজ্য : রোগ চিনে দাওয়াই দিন




দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানকর্মীদের ধর্মঘটে লঙ্কাকাণ্ডের সৃষ্টি হয় গত ৮ জানুয়ারি। বিমান শ্রমিক লীগের ডাকা ধর্মঘটের জের হিসেবে সাত ঘণ্টা ধরে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টির একপর্যায়ে চলে যাত্রীদের বিক্ষোভ, ভাংচুর। বস্তুত ধর্মঘটীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে বিদেশগামী ও বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার বিমানযাত্রী। বিমান চলাচল বন্ধ থাকা ছাড়াও বিমানবন্দর পরিচালনার সব কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এতে শুধু যাত্রীরাই অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হননি, ব্যাপক আর্থিক ক্ষতিসহ দেশের ভাবমূর্তিও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবশেষে বিমানমন্ত্রীর লিখিত আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলেও এই নৈরাজ্যকর অবস্থায় যাত্রীসাধারণের যে ক্ষতি হয়েছে তা যে কোনো বিবেচনায় অপূরণীয়। ধর্মঘট চলাকালে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করতে পারেনি ২০টি ফ্লাইট। নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকা ত্যাগ করতে না পারা ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ছিল কুয়েত, সিঙ্গাপুর, পেরু, বাহরাইন, কুয়ালালামপুর, মাসকট, দুবাই, কলকাতা, দোহাসহ বেশ কয়েকটি গন্তব্যের ফ্লাইট। এদিকে বিভিন্ন দেশ থেকে অবতরণ করা ১০টি ফ্লাইটের যাত্রী বিমান থেকে বের হতে পারেননি। কারণ ধর্মঘটের কারণে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। এছাড়া সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিমানবন্দরের টারমার্কে বিমানজট দেখা দেয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা টার্মিনাল ভবনের অভ্যন্তরে ভাংচুর, বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং কর্তব্যরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাজেহাল করেন। সকাল দশটার দিকে বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী বিমানবন্দরে যান। অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের ভিআইপি লাউঞ্জে দুই ঘণ্টা বাহাস শেষে দাবি-দাওয়া নিষ্পত্তির আশ্বাস পেয়ে শ্রমিক লীগ নেতারা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন। প্রায় একই ঘটনা ঘটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে লাগাতার ধর্মঘটের ঘোষণায় সাত ঘণ্টা সব ধরনের বিমানের ওঠানামা বন্ধ ছিল। দুপুরের দিকে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হয়। উল্লেখ্য, সাত দফা দাবিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সিবিএ অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দেয়। তাদের দাবিগুলো হচ্ছে—বিমান শ্রমিক লীগের সভাপতির বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহার, বিমানের প্রস্তাবিত পরিচালনা কাঠামো বাস্তবায়ন, কর্তব্যরত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মধ্যাহ্নভোজের ভাতা ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায় উন্নীত করা, পার্সোনাল পে সমন্বয়, ইউনিফরম প্রদান, চিকিত্সার পূর্ণ সুবিধা বলবত্ এবং পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে কর্মরত সব অস্থায়ী কর্মচারীর চাকরি স্থায়ীকরণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব দাবি-দাওয়া সম্পর্কে বিমান প্রশাসন পূর্বাপর অবগত ছিল। গত ৭ জানুয়ারি বিক্ষুব্ধ শ্রমিক লীগ বিমানের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও এবং ৬ জানুয়ারি বিমান এমডিকে ১৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। এরপরও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। উপরন্তু ৭ জানুয়ারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শ্রমিকদের এ আন্দোলনে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমর্থন নেই। ফলে শ্রমিক লীগের ডাকা অযৌক্তিক ধর্মঘটে বিমান চলাচলে কোনো ক্ষতি হবে না। শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হলো, কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অবজ্ঞা এবং অদক্ষতা এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এই অযাচিত মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতি এড়ানোর স্বার্থে এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে কর্তৃপক্ষ তথা বিমানমন্ত্রী আলোচনায় বসতে পারতেন। সেই পানি খেতে হলো তো ঘোলা করে। এও সত্য যে, কোনো উস্কানি ছাড়া বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় এ ধরনের বিপর্যয়কর ধর্মঘট হয়নি। এ বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের আগাম বিবেচনা করা উচিত ছিল। এ ব্যাপারে নাক গলানো দরকার ছিল স্বয়ং বিমানমন্ত্রীকেও। অবশেষে যা ঘটল তা এক অর্থে নাকে খত দেয়ার শামিল। শ্রমিক লীগ নেতারা মন্ত্রীর মৌখিক আশ্বাসে বিশ্বাস করেননি, তারা লিখিত আশ্বাস চেয়েছেন এবং তিনি তাই করতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রসঙ্গত, এসব দাবিতে গত বছর মার্চ মাসে ‘বিমান বাঁচাও ঐক্য পরিষদ’র ব্যানারে বিমান শ্রমিক লীগ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এ সংস্থার কর্মকর্তাদের কয়েকটি সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করে। তখনও তারা বিমানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়। এতসব ঘটনার পর বিমান কর্তৃপক্ষ, বিমানমন্ত্রী তথা সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি কেন তা ভাবার বিষয় বটে। এদিকে বিমান শ্রমিক লীগের দাবি-দাওয়া কতটা ন্যায্য, তা বিমান তথা বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে কিনা তাও খতিয়ে দেখেননি কর্তৃপক্ষ। ফলে একটি অবাঞ্ছিত মানহানিকর নাটক মঞ্চস্থ হলো দেশের দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বলা দরকার, বিমানবন্দরের অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই শোচনীয়। ব্যবস্থাপনা এতটাই শিথিল যে স্বয়ং নিরাপত্তাকর্মীরাই অবৈধ পণ্য পাচারে সহায়তা করছেন। সম্প্রতি শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বর্ণ ও মুদ্রাসহ অন্যান্য অবৈধ পণ্য পাচারের অভিযোগে সিভিল এভিয়েশনের সুপারভাইজার, নিরাপত্তাকর্মীসহ ১১ জন গ্রেফতার হয়েছেন। অভিযোগ আছে, এসব দুরাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বড় বড় রাঘব বোয়াল। এ অবস্থায় শ্রমিক লীগের দাবি-দাওয়ার ন্যায্যতা খতিয়ে দেখা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি বিমান পরিচালন কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির শিকড় কতটা প্রসারিত তা অনুসন্ধান করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। নইলে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে। কাজেই সাধু সাবধান।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads