শুক্রবার, ১১ জানুয়ারী, ২০১৩

বাকশাল প্রণেতা কম্যুনিস্টরা আবার আ'লীগের ঘাড়ে সওয়ার



আহমদ আশিকুল হামিদ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ জানুয়ারি রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন। বহুদিন পর বিদেশে যাচ্ছেন বলে বটেই, বাকশাল প্রণেতা মস্কোপন্থী কম্যুনিস্ট প্রভাবিত দলের সর্বোচ্চ কমিটি গঠনের পরপরই রাশিয়া যাচ্ছেন বলেও প্রধানমন্ত্রীর এ সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ, রাশিয়া কোনো সাধারণ রাষ্ট্র নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ১৯৮০-র দশক পর্যন্তও রাশিয়া ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। তখন অবশ্য বিশাল কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল, যা গঠিত হয়েছিল রাশিয়াকে কেন্দ্র করে। ১৯৯০ দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও রাশিয়া এখনো বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রসহ সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বনদ্বীর অবস্থানে অধিষ্ঠিত রয়েছে। সে কারণে রাশিয়ার সঙ্গে কোনো রাষ্ট্র বন্ধুত্বের সম্পর্ক গভীর করতে গেলেই ধরে নেয়া হয়, ওই রাষ্ট্রটির সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক হয় খারাপ হয়ে গেছে, নয়তো সম্পর্ক আগের মতো অন্তত বন্ধুত্বপূর্ণ নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরকে কেন্দ্র করেও একই ধরনের প্রচারণা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এর পেছনে অবশ্য যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তব কিছু কারণ রয়েছে। বলা হচ্ছে, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছিল তা এখনো চলছেই। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন স্বয়ং এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বহুবার কথা বলেছেন। ইশারা-ইঙ্গিতে হুমকিও দিয়েছেন। কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে মার্কিন সরকারের বিরোধিতাও এখন আর নতুন খবর নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, যেভাবে বিচার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে তাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করতে পারে না। বাংলাদেশকে অবশ্যই সমগ্র প্রক্রিয়ার সংস্কার করতে হবে, যাতে এই বিচার বিরোধী দলকে শাস্তি দেয়ার মাধ্যম বা হাতিয়ার না হয়ে ওঠে। এটা ২০১১ সালের জানুয়ারির ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন জে র‌্যাপের কাছ থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পর এক টেলিফোন সংলাপে হিলারি ক্লিনটন প্রধানমন্ত্রীকে আরো বলেছিলেন, বিচার বিভাগের ওপর আপনার সরকারের প্রভাব সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত আমাকে জানিয়েছেন, কিভাবে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী আদালত একের পর এক তার রায় দিয়ে চলেছে। বিচার বিভাগের ওপর সরকারের এ ধরনের প্রভাব ও কর্তৃত্বের ফল শেষ পর্যন্ত শুভ হয় না। টেলিফোনের ওই সংলাপে নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের অভিযান সম্পর্কেও হিলারি ক্লিনটন কঠোর কিছু কথা শুনিয়েছিলেন। স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, কিভাবে ভারতের উদ্যোগে পূর্ব নির্ধারিত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা হয়েছে এবং ভারতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে ওই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বলে সমর্থন জানিয়েছিল। হিলারি ক্লিনটনের কথার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে ধমক দেয়ার এবং সতর্ক করার উদ্দেশ্য গোপন থাকেনি।
এভাবেই ওবামা সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে শুরু করেছিল। সম্পর্কে আর উন্নতি ঘটেনি। এজন্যই মনে করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভবত ওয়াশিংটনকে একহাত দেখিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কৌশল নিয়েছেন। এমন কিছুই যে ঘটবে অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়বেন এ ব্যাপারে অবশ্য অন্য একটি বিশেষ কারণে ধারণা জোরদার হচ্ছিল। আমি নিজেও সম্ভাবনার বিষয়টি নিয়ে লিখেছি। পাঠকদের মনে থাকার কথা, রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে সরকারের ভেতরে সাবেক কমিউনিস্ট ও ‘মস্কোপন্থী'সহ বামপন্থীদের শক্তিশালী অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছিলাম। এর কারণ, পর্যালোচনায় পরিষ্কার হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে ‘মস্কোপন্থী'সহ বামপন্থীরা ঘিরে ফেলেছেন। উদাহরণ দেয়ার জন্য প্রভাবশালী চার মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, নূরুল ইসলাম নাহিদ ও ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের নাম উল্লেখ করা যায়। এদের সবাই এক সময় সরাসরি ‘মস্কোপন্থী' রাজনীতি করেছেন। ছাত্র ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপের নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীও ‘মস্কোপন্থী' ঘরানা থেকেই এসেছেন। তাদের সঙ্গে জুটেছেন দিলীপ বড়ুয়া ও হাসানুল হক ইনুর মতো কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা। এককালের পিকিংপন্থী রাশেদ খান মেননও সাবেক মস্কোপন্থীদের সঙ্গেই যোগ দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের আরেক সাবেক নেতা নূহ-উল আলম লেনিনও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে ঢুকে পড়েছেন। তোফায়েল আহমেদের মতো সমাজতন্ত্র ও কউিনিস্ট বিরোধী নেতারা সুযোগ না পেলেও নূহ-উল আলম লেনিন একা নন, এবারের কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এসেছেন আরো অনেক বামপন্থী। বলা হচ্ছে, সিপিবি ও ন্যাপসহ সাবেক মস্কোপন্থীরা মন্ত্রিসভায় ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থান দখল করে নিয়েছেন। মস্কোপন্থীরা অবশ্য পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন অনেক আগে থেকে। যেমন ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সেনা সমর্থিত অসাংবিধানিক সরকারের সময় শেখ হাসিনার পক্ষে মামলা চালিয়ে তার আস্থা অর্জন করেছেন। অন্য মস্কোপন্থীরাও নানা কৌশলে শেখ হাসিনার কাছে ‘ভালো' সেজেছেন। এভাবেই সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীকে তো বটেই, সরকারকেও ঘিরে ফেলেছেন সাবেক মস্কোপন্থীরা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা শুধু নন, আওয়ামী লীগ নেতাদেরও অনেকে মনে করেন, সাবেক কমিউনিস্ট ও ‘মস্কোপন্থী'সহ বামপন্থীরাই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন রাশিয়া সফরের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।
মস্কোপন্থীদের ব্যাপারে কেন আপত্তি উঠেছে এখানে তার কারণও জানিয়ে রাখা দরকার। পাকিস্তান যুগে মস্কোপন্থীরা সমাজতন্ত্র তথা কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টি নামে দুটি দল থাকলেও মস্কোপন্থীরা সব সময় আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করেছেন। আওয়ামী লীগের ভেতরে লোকজনও তারা তখন থেকেই অনুপ্রবেশ করিয়েছেন। তারা তাই বলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কল্যাণের জন্য কোনো ভূমিকা রাখেননি। তাদের লক্ষ্য ছিল মস্কোর তথা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এজন্যই মস্কোতে বৃষ্টি হলে ঢাকায় তারা ছাতা মাথায় দিতেন বলে প্রচারণা রয়েছে। একই কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তাদের ভূমিকা প্রশ্নাতীত হতে পারেনি। যুদ্ধের প্রায় সম্পূর্ণ সময়- ১৯৭১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্তও তারা মস্কোর দিকেই তাকিয়ে থেকেছেন। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থক ও গণচীনের বন্ধুরাষ্ট্র হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন পাকিস্তানের ধ্বংস ও ক্ষয়ক্ষতি চেয়েছিল সত্য, কিন্তু প্রথমেই বাংলাদেশের পক্ষ নেয়নি। ভারতকে একটি সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ করার কৌশল হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বরং ভারতের সঙ্গে দর কষাকষি শুরু করেছিল। ১৯৬৯ সালে সংঘটিত চীন-সোভিয়েত যুদ্ধের পর থেকেই এ জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ভারত সম্মত হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত জড়িয়ে পড়ার পর ওই সামরিক চুক্তিকে সমর্থনের পূর্বশর্ত বানিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারতেরও তখন পাশ কাটানোর সুযোগ ছিল না। ফলে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২৫ বছর মেয়াদী ভারত-সোভিয়েত ‘মৈত্রী চুক্তি'। এই চুক্তি ছিল ভারতের ওপর সোভিয়েত কূটনীতির বিরাট বিজয়। এটা স্বাক্ষর করায় ভারত অনেকাংশে নির্ভরশীল রাষ্ট্রেও পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধই ছিল অন্তরালের প্রধান নির্ধারক। উল্লেখ্য, ‘মৈত্রী চুক্তি'র আগে পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে ‘পূর্ব পাকিস্তান' বলেছে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধকে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দৃশ্যত ভারতের পক্ষে দাঁড়ালেও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম থেকে ‘শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের' জন্য তাগিদ দিয়েছে। সোভিয়েত মনোভোবে পরিবর্তন ঘটেছিল ‘মৈত্রী চুক্তি'র পর। বাংলাদেশের পক্ষে দেশটি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল জাতিসংঘে। ডিসেম্বরে চূড়ান্ত যুদ্ধের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ‘ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ' হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন নিরাপত্তা পরিষদে ভেটোর পর ভেটো প্রয়োগ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ হয়েছিল। সে সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন নেই। ৬টি মুসলিম রিপাবলিকসহ ১৫টি অঞ্চল খসে যাওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন নিছক রাশিয়া। কিন্তু তার ক্ষমতার কেন্দ্র ঠিক আছে।
এদিকে মস্কোপন্থীদের ভূমিকাও ছিল প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় প্রাদেশিক তথা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ একক সিদ্ধান্তে সরকার গঠন করেছিলেন। সেটা ছিল এমন এক সময় যখন আওয়ামী লীগের প্রায় প্রত্যেক নেতাই ছিলেন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এবং পলায়নরত। পরবর্তীকালে তাজউদ্দিন আহমদের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন অনেকেই। শেখ ফজলুল হক মনি, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান ও মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ কয়েকজন নেতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দাবি তুলেছিলেন। অন্য নেতারাও নানাভাবে তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে থেকেছেন উঠেপড়ে। তাদের সঙ্গেই উস্কানিদাতার ভূমিকায় নেমেছিলেন সেকালের ‘মস্কোপন্থী'রা- ‘কমরেড' মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রমুখ। কিন্তু একদিকে তাজউদ্দিন আহমদের নিজের নিষ্ঠা, সততা ও নিখাদ দেশপ্রেম এবং অন্যদিকে জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীর সমর্থন তাকে রক্ষা করেছিল। উল্লেখ্য, কলকাতায় গঠিত মুজিবনগর সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো এবং ওই সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের একটি অংশের ও তৎকালীন মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়া ছিল মওলানা ভাসানীর বিশেষ অবদান। মুজিবনগর সরকার তাঁকে উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি বানিয়েছিল এবং সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত পরিষদের একমাত্র সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন। ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের ইঙ্গিতে এই উপদেষ্টা পরিষদে মস্কোপন্থীদের দুই প্রধান নেতা মণি সিংহ ও মোজাফফর আহমদকে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী চেয়েছিলেন এর মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নকে খুশি করতে, যাতে ভারতের প্রতি সোভিয়েতের মনোভাবে পরিবর্তন ঘটে। সেটা ঘটেছিল, কিন্তু ভারত ২৫ বছর মেয়াদী ‘মৈত্রী চুক্তি' স্বাক্ষর করার পর।
এভাবে পর্যালোচনায় দেখা যাবে, বাংলাদেশের মানুষ হলেও মস্কোপন্থীরা সব সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। সিদ্ধান্তও নিয়েছে মস্কো থেকে নির্দেশ আসার পর। স্বাধীন বাংলাদেশেও তাদের সে ভূমিকায় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। স্বাধীনতার পরপর এই মস্কোপন্থীরাই প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে ফেলেছিলেন। এর প্রমাণ, আজীবন সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য জেল-জুলুম খেটে আসা নেতা শেখ মুজিবের পক্ষে সমাজতন্ত্রকে আদর্শ হিসেবে মেনে নেয়াটা মোটেই স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু ‘কমরেড' মণি সিংহ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদসহ মস্কোপন্থীরা সুকৌশলে শেখ মুজিবকে সমাজতন্ত্রের সে ‘ট্যাবলেট'ই গিলিয়েছিলেন। ফলে ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশের সংবিধানেও সমাজতন্ত্র  ঢুকে পড়েছিল। বড় বড় তত্ত্বকথা শুনিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকেও মস্কোপন্থীরাই এগিয়ে নিয়েছিলেন- যা সর্বতোভাবে ছিল কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা। অথচ শেখ মুজিব মনে-প্রাণে বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। পর্যবেক্ষরা বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে মস্কাপন্থীরা আসলে একটি ‘মধুর' প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। কারণ, ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পল্টন ময়দানের এক জনসভার ভাষণে মস্কোপন্থীদের প্রতি ‘সাইনবোর্ড' পাল্টানোর আহবান জানিয়েছিলেন। এর অর্থ ছিল, মণি সিং-এর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মস্কোপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) যাতে তাদের অত্মিত্ব বিলুপ্ত করে এবং দল দুটির নেতা-কর্মিরা যাতে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে মণি-মোজাফফররা সত্যিই তাদের ‘সাইনবোর্ড' পাল্টে ফেলেছিলেন। কিন্তু তাই বলে তারা আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। মণি সিং ও মোজাফফররা বরং অপমানের বদলা নিয়েছিলেন এবং শেখ মুজিবকে দিয়েই আওয়ামী লীগের ‘সাইনবোর্ড' পরিবর্তন করিয়ে ছেড়েছিলেন। মণি সিংদের পরামর্শেই আজীবন বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে আসা শেখ মুজিব এক দলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এভাবেই বন্ধুত্বের ছদ্মাবরণে সে কালের মস্কোপন্থীরা শেখ মুজিবুর রহমানকে ধীরে ধীরে গণতন্ত্র বিরোধী অবস্থানে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফলে মাত্র কিছুদিন আগেও যার ছিল আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা, সে নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকেও প্রচন্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বর্তমানেও মস্কোপন্থীরা ‘বিপদের বন্ধ'ু ও ‘ভালো মানুষ' সাজার একই কৌশল নিয়ে এগোচ্ছেন। মরহুম পিতার মতো কন্যা শেখ হাসিনাকেও তারা যে প্রভাবিত ও বিভ্রান্ত করতে পেরেছেন তার প্রমাণ প্রথমে পাওয়া গেছে মন্ত্রিসভা ও সরকারে তাদের শক্ত অবস্থান থেকে। এবার পাওয়া যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া সফর থেকে। বোঝাই যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারকে তো বটেই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও তারা যথেষ্ট কষেই ইচ্ছাধীন বানিয়ে ফেলেছেন।
আপত্তি ও আশংকার সৃষ্টি হয়েছে কিছু বিশেষ কারণে। যেমন প্রধানমন্ত্রী রাশিয়া সফরে যাওয়ার প্রাক্কালেও সরকারীভাবে জানানো হয়নি, বাণিজ্যসহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ও সহযোগিতার জন্য কিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করার বাইরে আর কোন কোন বিষয়ে রুশ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা হবে। বাংলাদেশে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে আগেই সমঝোতা হয়েছে বলে বিষয়টি বর্তমান পর্যায়ে গুরুত্ব অর্জন করতে পারেনি। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে অবশ্য রাশিয়া থেকে সমরাস্ত্র কেনার খবর জানা গেছে। এক বিলিয়ন তথা একশ কোটি মার্কিন ডলারের সমরাস্ত্র কেনার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেন। এ খবরটিই প্রবল আশংকার সৃষ্টি করেছে। এর একটি প্রধান কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়ার সাহায্যে নয়, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠেছে গণচীনের আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতা নিয়ে। গাজীপুরস্থ সমরাস্ত্র কারখানায় অস্ত্র তৈরির মাধ্যমে তো বটেই, রফতানির পথেও গণচীনই বাংলাদেশকে অস্ত্রশস্ত্রের যোগান দিয়ে চলেছে। ট্যাংক থেকে যুদ্ধ বিমান পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ সমরাস্ত্র এসেছে গণচীন থেকে। এখনো গণচীনই বাংলাদেশের সমরাস্ত্রের প্রধান যোগানদাতা। বড়কথা, গণচীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক মোটেও মধুর নয়। ফলে প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই রাশিয়ার কাছ থেকে একশ কোটি ডলারের সমরাস্ত্র কেনেন তাহলে পদক্ষেপটিকে চীন সহজভাবে নাও নিতে পারে। নিজের সমরাস্ত্রের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে চীনের সতর্কতাও একটি বড় কারণ হয়ে উঠবে। চীন ভাবতেই পারে, এত যেখানে ঘনিষ্ঠতা সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমে রাশিয়া চীনের সামরিক প্রযুক্তি চালান করে নিয়ে যাবে- যা চীনের মতো পারমাণবিক শক্তিধর একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে পারে, চীন এমনকি সামরিক সহযোগিতা বন্ধও করতে পারে।
তেমন অবস্থায় বাংলাদেশকে একদিকে ভারতের এবং অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাব সম্পর্কে নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। ওদিকে রাশিয়াও যে নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য পাঠকরা ১৯৭১ সালের মৈত্রী চুক্তির কথা স্মরণ করতে পারেন। ভারতের মতো বিরাট একটি রাষ্ট্রকেও যে রাশিয়া রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে সে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ যে কোনোভাবেই পেরে উঠবে না সে কথা নিশ্চয়ই না বললেও চলে। কিন্তু সব জেনে-বুঝেও প্রধানমন্ত্রী অমন একটি রাষ্ট্রের কাছ থেকেই সমরাস্ত্র কিনতে যাচ্ছেন- শুধু একশ কোটি ডলারের নয়, গণচীনের বন্ধুত্ব হারানোর প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়েও। ওদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি তো ঘটছেই। বলা বাহুল্য, সব কিছুর পেছনেই সরাসরিভাবে ভূমিকা পালন করে চলেছেন সেই মস্কোপন্থীরা। বিষয়টিকে মস্কোপন্থীদের বিরাট সাফল্য না বলে উপায় নেই। মস্কোপন্থীসহ বামপন্থীরা অনেক হিসাব কষেই পা বাড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে ইতোমধ্যেই তারা নিজেদের ইচ্ছার পুতুল বানিয়ে ফেলেছেন। পার্থক্য হচ্ছে, স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল। বুদ্ধি-পরামর্শের সঙ্গে অর্থও আসতো সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কো থেকে। এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই, মস্কোও আর আগের মতো টাকা-পয়সা দেয় না। কিন্তু এতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না মস্কোপন্থীসহ বামপন্থীদের। কারণ, প্রকাশ্যে নানা তত্ত্বকথা শোনালেও প্রধান উদ্দেশ্য তাদের মস্কোর আড়াল নিয়ে ভারতের স্বার্থ হাসিল করে দেয়া, ভারতের স্বার্থে ভূমিকা পালন করা। শেখ মুজিবের সময়ও এটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, কিন্তু অভিনয় করতেন অন্য রকম। তখন তারা দিল্লী হয়ে মস্কো যেতেন। এখন আর কষ্ট করে মস্কো পর্যন্ত এতদূর যেতে হয় না, শুধু পাশের বাড়ি দিল্লীর কথা শুনলেই চলে। সে কারণে প্রধানমন্ত্রীর বিপদও পিতা শেখ মুজিবের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। ধারণা করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী হয়তো নিজেই বুঝতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেবেন। অন্যদিকে তেমন কোনো শুভ লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। মনেই হচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছেন বা নেবেন। অর্থাৎ পিতার মতো কন্যাকেও মস্কোপন্থীরা সাফল্যের সঙ্গেই বিভ্রান্ত ও প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, রাশিয়া সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঠিক কোন কোন বিষয়ে কিভাবে সম্পর্ক উন্নত করার পদক্ষেপ নেন, সে সবের মধ্যে সমরাস্ত্র তথা সামরিক সম্পর্ক কতটা গভীর হয় এবং এর ফলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads