মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারী, ২০১৩

বাংলাদেশকে এ কোন বিপদে ফেলছেন শেখ হাসিনা


ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়ায় গিয়েছিলেন আট হাজার কোটি টাকার সমরাস্ত্র কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করতে। রাশিয়া বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কোনো অংশীদার নয়। বাংলাদেশের সমরাস্ত্র সরবরাহের প্রধান অংশীদার চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি প্রভৃতি দেশ। বলা নেই কওয়া নেই, মন্ত্রিপরিষদে আলোচনা নেই, হুট করেই সরকার ঘোষণা করে বসল যে, রাশিয়ার সঙ্গে তারা আট হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয় চুক্তি সম্পাদন করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কিংবা সশস্ত্রবাহিনী রাশিয়ান অস্ত্রের সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নয়। কালাসনিকভ রাইফেলের সঙ্গে আমরা পরিচিত সন্ত্রাসীদের কারণে। সেটি চমৎকার মরণাস্ত্র। এই অস্ত্র চুক্তিতে এর বাইরে আর কি কি আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই। যদি ধরেও নেই যে, সেগুলো অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্রশস্ত্র, তাহলে জনগণকে তা জানানো হলো না কেন।
রাশিয়ার সঙ্গে এই অস্ত্র আমদানি চুক্তির পর থেকেই দেশের সচেতন নাগরিকরা, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা এবং সমর বিশারদগণ বলতে শুরু করেছেন যে, এই চুক্তি অবিবেচনাপ্রসূত। এবং সরকার এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের উপর নতুন করে আট হাজার কোটি টাকা ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিল। এর আগে কোনো সাড়াশব্দ শুনিনি। এই ঋণচুক্তি সেরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলেই মনে হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তার সফরসঙ্গী হিসেবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। শুধুমাত্র ছিলেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জে. আবু হেনা মোহাম্মদ শফিউল হক। আরও কেউ কেউ ছিলেন যাদের নাম প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের অফিসিয়াল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তারা হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, শেখ রেহানার মেয়ে, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং আরও একজন অচেনা যুবতী। এ কথাটি জানা যেত না। কিন্তু রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শেখ হাসিনা পরিবারের ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর আমরা জানতে পারলাম যে, রেহানা, জয়, রেহানা কন্যা এবং একজন অজ্ঞাত যুবতী এই সফরে তার সঙ্গী হয়েছিলেন।
অস্ত্রচুক্তির সঙ্গে এদের কী সম্পর্ক তা বুঝে উঠা ভারী দুষ্কর। এবং এরা যদি তার সফরসঙ্গী হয়েই থাকেন, তাহলে তার আনুষ্ঠানিক সফরসঙ্গীর তালিকায় এদের নাম কেনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সেটিও এক কৌতুহলোদ্দীপক ঘটনা। যতদূর জানি, সরকারে বা আওয়ামী লীগে শেখ রেহানার কোনো অবস্থান নেই। এমনকি তার মেয়েরও না। জয় যদি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হয়ে থাকেন বা শেখ হাসিনার পুত্র ছাড়া তার যদি অন্য কোনো পরিচয় থাকে, তাহলে সে পরিচয়েও তাকে শেখ হাসিনা মস্কোতে সফরসঙ্গী করতে পারতেন। সেক্ষেত্রে তার সফরসঙ্গীর তালিকায় জয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত হতে কোনো বাধা তো ছিল না। তাহলে এই লুকোচুরি কেন করা হলো? আর জয় যদি গুরুত্বপূর্ণই না হবেন, তাহলে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতকালে শেখ হাসিনা কেন তাকে উপস্থাপিত করবেন?
কিন্তু সফরসঙ্গীর তালিকায় এদের অন্তর্ভুক্ত করা হলো না কেন? গোপনীয়তা কেন? বাংলাদেশের রাজনীতিতে সজীব ওয়াজেদ জয়কে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শেখ হাসিনা কম কোশেশ করেননি। এখন বোঝা যাচ্ছে যে, সে প্রয়াস সম্ভবত সফল হবে না। ফলে তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। জ্যোতি বসুর ছেলে যেমন রাজনীতিতে আসতে চাননি। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এখনও তাই আছেন। জয়ও সম্ভবত রাজনীতির চাইতে ব্যবসা-বাণিজ্যে অধিক আগ্রহী। সেটা কোনো দোষের কথা নয়। সরকার দেশে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে, জামায়াত মানেই ঘৃণিত রাজনীতি। কিন্তু আশ্চর্য হলো এই যে, তারা জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। অথচ জামায়াতেই শুধু উত্তরাধিকারের কোনো রাজনীতি নেই। এবং তার বিরোধীরাও বলেন জামায়াতেই গণতন্ত্র আছে।
এই উপমহাদেশের ইতিহাসে পারিবারিক রাজনীতি একটি ঐতিহ্যগত বিষয়। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা- অন্তত এই চারটি দেশ এর প্রভাবমুক্ত নয়। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিক পুত্র তারেক রহমানকে যখন দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হলো, তখন আওয়ামী লীগের তরফ থেকে অন্তহীন সমালোচনা আমরা শুনেছি। তার আগে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অফিস হাওয়া ভবনের দায়িত্বে ছিলেন তারেক রহমান। আওয়ামী লীগ এমন হাস্যকর ঘটনাও ঘটিয়েছে যে, তারা বঙ্গভবন নয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নয়, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অফিস হাওয়া ভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়েছিল।
এখন দৃশ্যপট পাল্টে গেল। পৃথিবীতে আওয়ামী লীগের একমাত্র আপনজন ভারতের দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জওহরলাল নেহেরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর নাতি রাজীব গান্ধীর পুত্র রাহুল গান্ধীকে। এবং ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেস নেতারা একে স্বাগত জানিয়েছে। আর এখন পর্যন্ত কোনো বিরোধী দলই এর বিরোধিতা করেনি। তাহলে তারেক রহমানের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হওয়ায় আওয়ামী লীগের গা এত জ্বালা করে কেন, সেটি প্রণিধানযোগ্য।
গোটা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ এখন প্রায় বিচ্ছিন্ন। ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে এই সরকার চীনের বিরাগভাজন হয়েছে। ফলে মিত্র অনুসন্ধান সরকারের জন্য খুব স্বাভাবিক। কিন্তু মিত্র অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াটি শুরুতেই একেবারে জটিল করে ফেলল শেখ হাসিনা সরকার। এই ঋণচুক্তিতে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টিও আছে। তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশ পরমাণু নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করুক, এটি বিশ্বের পারমাণবিক শক্তির মালিক কোনো দেশই চায় না। যেমন ঘটেছে ইরানের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো ইরানকে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে অনেক আগেই। ইরানী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনীর তত্ত্বাবধানে ইরানের সরকার গঠিত হয়। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের যে টানাপোড়ন, তার অবসান তো হয়ইনি বরং প্রতিনিয়ত বেড়েই গেছে।
ইরান রাশিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। তারপর থেকেই শুরু হয়েছে স্নায়ুর লড়াই। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ঐ পারমাণবিক কেন্দ্রে ইরান পরমাণু অস্ত্র বানাচ্ছে। ইরান এ অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞরা ইরান সফর করেছেন। তারা সেখানে তেমন কোনো আলামত দেখতে পাননি। তা সত্ত্বেও ঐ অভিযোগ থেকে মুক্তি পায়নি ইরান। প্রতিদিন খবর প্রকাশিত হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল যে কোনো সময় ইরানে হামলা চালাতে পারে। এই উত্তেজনা সেখানে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। ইরানকে নানাভাবে একঘরে করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ সেখানে এক ধরনের দুঃসহ অবস্থা।
বাংলাদেশে মৌলবাদ নিয়ে হল্লাচিল্লা পশ্চিমা দুনিয়ায় জারি রাখা হয়েছে। যদিও মাঝে মধ্যে বলা হচ্ছে যে, এই জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। এর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ যাতে ইসলামপন্থীদের দমনে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। সরকার তাতেও কসুর করেনি। প্রচার-প্রপাগান্ডার মাধ্যমে তারা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে, টুপি-দাঁড়ি মানেই জঙ্গিবাদ। এই সরকারের এক বামপন্থী নেতা তো বলেই ফেলেছেন যে, যারা মসজিদে যায়, নামাজ পড়ে, তাদের তালিকা করতে হবে। তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে। মসজিদে নামাজীর সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে। সেটাই খুব স্বাভাবিক। ইসলাম ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান বলেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এখন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ হয়েছে। এই জনপদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি মুসলমানই না হতো, তাহলে স্বাধীনতার প্রশ্ন আসতো না। পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া অবান্তর ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তা ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকতো। ভারত ৫৪টিরও বেশি জাতিগোষ্ঠীর দেশ। তাদের স্বতন্ত্র ভাষা। স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। কিন্তু তারা একই রাষ্ট্রের অধীন এই কারণে যে তাদের ধর্ম অভিন্ন। হিন্দুত্ববাদ।
এরকম একটা প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে আট হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কেনার চুক্তি করলো বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকার। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সরকারের এ ধরনের একটি অস্ত্র চুক্তির কথা আগে থেকেই জানতো। আর জানতো বলেই তারা ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে কোণঠাসা করে ফেলার কাজ শুরু করেছে।
রাশিয়ার অস্ত্র এবং বর্তমান সরকারের কেনাকাটা সম্পর্কে এদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা ভাল নয়। এর আগে শেখ হাসিনা সরকার রাশিয়া থেকে মিগ-২৯ জঙ্গি বিমান কিনেছিল। সেগুলো আকাশে ওড়েনি। মাটিতে মিশে গেছে। মিগ-২৯ কেনাও অপ্রয়োজনীয় ছিল। এবং জনগণের অর্থের বিরাট অপচয় ও দুর্নীতি তাতে ঘটেছে। সে তো মাত্র হাজার কোটি টাকার ব্যাপার ছিল। এবার আট হাজার কোটি টাকার মামলা। তাতে যে কত বড় দুর্নীতি হয়ে গেল, সেটি এখনও পরিষ্কার হয়নি।
অপরদিকে ইরান রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করে যে বিপদে পড়েছে, বাংলাদেশও দ্রুত তেমনই বিপদের দিকে ধাবিত হলো। বাংলাদেশকেও খুব সহজেই জঙ্গীবাদী দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা সম্ভব। আর বাংলাদেশের পারমাণবিক চুল্লিতে পরমাণু অস্ত্র বানানো হচ্ছে, এ অভিযোগ তোলাও অত্যন্ত সহজ হবে। ইরানের তেল আছে বলে সে শক্তিতে তারা এখনও লড়াই করে যাচ্ছে। রাশিয়া ও চীন তাদের পক্ষ অবলম্বন করছে। কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্যে কোনো দুর্দিন নেমে এলে এসব পরাশক্তিকে পাশে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ইরানের মতো বাংলাদেশের তেল শক্তিও নেই। ফলে বহুমুখী চাপে পড়ে দেশ যে এক ভয়াবহ কূটনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রধান আমদানিকারক। উভয়ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির ব্যাপারে নেতিবাচক সিগন্যাল আসতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিপিএস সুবিধা বাতিল করে দেবে বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশসমূহের যেসব সুবিধা বাংলাদেশ পেয়ে আসছিল সেগুলো বাতিল করারও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর ক্ষতি কোনো অবস্থাতেই রাশিয়াকে দিয়ে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। ভয়াবহ সংকটে পড়বে এদেশের ষোল কোটি মানুষ। সে অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য এই সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকেই গড়ে তুলতে হবে দুর্ভেদ্য ব্যুহ। এই মুহূর্তে সম্ভবত এর আর কোনো বিকল্প নেই।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads