মঙ্গলবার, ৮ জানুয়ারী, ২০১৩

গুম-খুন এবং পদদলিত মানবাধিকার



বিরোধী দলের আরো একজন নেতা লাশ হয়ে ফিরেছেন। রাজধানীর ৫৬ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের লাশ পাওয়া গেছে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলাধীন আদাবাড়িয়া গ্রামের মাঠে। শুধু লাশ হয়ে পড়ে থাকেননি তিনি, তার হাতে ‘পুলিশ' খোদাই করা হাতকড়াও ছিল। বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। প্রতিবাদ উঠেছে এজন্য যে, ৫ জানুয়ারি ঝিনাইদহের শৈলকুপাধীন আনন্দনগর গ্রাম থেকে র‌্যাবের পরিচয় দিয়ে একদল সাদা পোশাকধারী বিএনপির এই নেতাকে একটি গাড়িতে উঠিয়ে নিয়েছিল। সে কারণে বিএনপির অভিযোগ, সরকারই তাকে গুম ও হত্যা করেছে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হলেও জনগণের সংশয় কাটেনি, তারা বরং অভিযোগকেই সত্য মনে করছে। এর কারণ, বর্তমান সরকারের আমলে গুম ও খুনসহ মানবাধিকার লংঘন করা হচ্ছে ন্যক্কারজনকভাবে। অনেক সময় এমনকি রাখঢাক করারও প্রয়োজন মনে করছেন না কর্তাব্যক্তিরা। অন্য সব ক্ষেত্রের মতো মানবাধিকার হরণ ও লংঘনের ক্ষেত্রেও অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে মহাজোট সরকার। চার বছরে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও ঢাকার ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমসহ বিরোধী দলের শতাধিক নেতা-কর্মীকে গুম করা হয়েছে। বলা চলে, এই সরকারের চার বছরে গুম আর গুপ্তহত্যার ধুম পড়ে গেছে। ক'দিন পরপরই মৃত্যু ঘটছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের। অবস্থা এমন হয়েছে যে, নিরীহ মানুষের মধ্যেও প্রবলভাবে ভীতি-আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, একবার গুম হলে তাকে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে নদী বা নালা-ডোবায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকতে হবে- যেমনটি থাকতে হয়েছে রফিকুল ইসলামকে। তার অবশ্য ভাগ্য ভালো। কারণ, তাকে শনাক্ত করা গেছে। অনেককে শনাক্ত করাও সম্ভব হচ্ছে না। গুম ও হত্যার পাশাপাশি র‌্যাব ও পুলিশকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করছে সরকার। গত চার বছরে বিরোধী দল বাধাহীনভাবে কোনো সভা-সমাবেশ বা মিছিল করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের কর্মী ও ক্যাডারের মতো পুলিশ ও র‌্যাব ঝাঁপিয়ে পড়েছে। লাঠিপেটা করেছে নির্বিচারে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অফিস মাঝে-মধ্যেই অবরোধ করেছে পুলিশ। নেতারা অফিসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। আরেক বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে সরকার যেন যুদ্ধই চালিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক উল্লেখযোগ্য সব জামায়াত নেতাকেই সরকার জেলের ভেতরে ঢুকিয়েছে। যে কয়েকজন এখনো বাইরে আছেন তাদের প্রত্যেককেও ধাওয়ার মুখে রেখেছে র‌্যাব ও পুলিশ। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরেও সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে সরকার। অনেককে আগে গ্রেফতার করে পরে মামলায় জড়িয়েছে পুলিশ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা আলমগীরের মতো অনেকে শ্যোন অ্যারেস্টেরও শিকার হচ্ছেন। সেই সাথে রিম্যান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো তো হচ্ছেই। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরোধী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করার ব্যাপারে সরকার এগোচ্ছেও চরম ফ্যাসিস্ট কায়দায়। এ সম্পর্কে সর্বশেষ ধারণা পাওয়া গেছে গত ৫ জানুয়ারি। ডিসেম্বরে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ২১ জন নেত্রীকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করার এবং জেলখানায় আটক রাখার প্রতিবাদে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য সেদিন বিশিষ্ট যে মুসলিম নারীরা জাতীয় প্রেসক্লাবে গিয়েছিলেন তাদের প্রায় সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নারী ভাষাসৈনিক অধ্যাপিকা চেমন আরা বেগম তাদের অন্যতম। পর্দানশীন এই মুসলিম নারীদের মধ্যে কলেজ ছাত্রী শুধু নয়, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও অধ্যাপিকাও ছিলেন। র‌্যাব ও পুলিশের নারী সদস্য উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও গায়ে হাত দিয়ে গ্রেফতারের কাজটি করেছে পুরুষ সদস্যরা। ভিডিও ফুটেজে এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিতে তাদের ধস্তাধস্তিও করতে দেখা গেছে। রীতিমতো যুদ্ধংদেহী মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছে র‌্যাব ও পুলিশের সদস্যরা। গ্রেফতারের পর নারী নেত্রীদের শাহবাগ থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। কিন্তু কারো বিরুদ্ধেই সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। পরে প্রতিবাদের মুখে অধ্যাপিকা চেমন আরা বেগমসহ কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়া হলেও পাঁচ ছাত্রীকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। একই ধরনের কর্মকান্ড দেখা গেছে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ২১ জন নেত্রীর ক্ষেত্রেও। তাদের শুধু অভিযোগ ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়নি, রিম্যান্ডে নিয়ে শারীরিক নির্যাতনও করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সন্তানসম্ভবা একজনকে লিফট থাকতেও পাঁচতলায় হাঁটিয়ে ওঠানো হয়েছে, একজন ছাত্রীকে পরীক্ষা দিতে দেয়া হয়নি। জাতীয় প্রেসক্লাবের অভিযানেও ভীতি-আতংক ছড়িয়েছে র‌্যাব ও পুলিশ। গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিতে আসা অনেক নারীকেই গভীর রাত পর্যন্ত ক্লাব ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে তারা।
বলা দরকার, সংবিধান নাগরিকদের রাজনীতি ও সভা-সমাবেশ করার এবং ধর্মের বিধান অনুযায়ী পোশাক পরাসহ জীবন যাপন করার অধিকার দিয়েছে বলেই বাংলাদেশে পর্দানশীন মুসলিম নারীদের ওপর এতটা ন্যক্কারজনক নির্যাতন চলতে পারে না। সংবিধানের দেয়া অধিকারের ভিত্তিতে মুসলিম নারীরা যে কোনো স্থানে সভায় মিলিত হতে বা গোলটেবিল বৈঠক করতে পারেন। আলোচ্য দু'টি উপলক্ষে তেমন কর্মসূচিতেই অংশ নিয়েছিলেন নারীরা। অন্যদিকে পুলিশ আবিষ্কার করেছে ‘ষড়যন্ত্র'। বলেছে, তারা নাকি ‘গোপন' বৈঠকে বসেছিলেন! পুরো বিষয়টিকে সরকার এমনভাবে প্রচার করিয়েছে, যা দেখে ও শুনে মনে হতে পারে যেন ছাত্রী সংস্থার ওই নেত্রীরা একটা ঘরের মধ্যে বসে জেহাদ ও জঙ্গি কর্মকান্ডের ট্রেনিং নিচ্ছিলেন! যেন সত্যি তারা কোনো ‘ষড়যন্ত্র' করছিলেন! জাতীয় প্রেসক্লাবের ঘটনায়ও ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। সেখানে আবার মহান ভাষা আন্দোলনের সৈনিক অধ্যাপিকা চেমন আরা বেগমের সঙ্গে অত্যন্ত অভদ্র ব্যবহার করেছে র‌্যাব ও পুলিশ। অন্যদিকে কল্পিত ষড়যন্ত্রের দোহাই দেয়া হলেও বেছে বেছে শুধু পর্দানশীন মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ফলে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য কিন্তু প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। বলা দরকার, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে মুসলিম নারীদের এই অসম্মান মেনে নেয়া যায় না। আমরা এই গ্রেফতার এবং গুম-খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। ভাবতে অবাক লাগে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের আগে ‘প্রিয় দেশবাসী'কে অনেক আশ্বাসের কথাই শুনিয়েছিল আওয়ামী লীগ। নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি উচ্ছেদ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা থেকে বিচার বহির্ভূত হত্যা বন্ধ করা, পুলিশকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার না করা পর্যন্ত হেন কোনো বিষয় নেই যে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার না ছিল। অন্যদিকে শুরু থেকে দেখা গেছে সম্পূর্ণ উল্টো কর্মকান্ড। অথচ কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন অবস্থা কল্পনা করা  যায় না। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকা এবং রাজনৈতিক দমন-নির্যাতন বন্ধ করার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট নীতি থেকে সরে আসা।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads