মঙ্গলবার, ৮ জানুয়ারী, ২০১৩

প্রধানমন্ত্রীর কাব্যচর্চা এবং বিরূপ বাস্তবতা


সি রা জু র র হ মা ন

কলকাতায় আমার স্কুলজীবনে যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ বইটা বলতে গেলে অবশ্য পাঠ্য ছিল। বুদ্ধিদীপ্ত চটকদার কিছু কথা অবলীলায় আউড়ে দিতে পারলে নিজেদের আমরা স্মার্ট, হয়তো বা কালচার্ড ভাবতাম। কতগুলো যুগ পার হয়ে এসেছি তার পর। এখন অবশ্যি জানি, চটকদার কথা বলে স্মার্ট হওয়া যায় না, মার্জিত রুচি আরও অনেক সাধনার ব্যাপার।
প্রয়াত আবিদ হোসেন বিবিসিতে আমার সহকর্মী ছিলেন। ব্যারিস্টারও হয়েছিলেন। সুন্দর কোনো একটা শব্দ কানে এলে সেটা তিনি মনে মনে আওড়াতেন, সম্ভব হলে ব্যবহারও করে ফেলতেন। সেদিন টেনিস জগতে বড় রকমের একটা তোলপাড় হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার ওয়াইল্ড কার্ড খেলোয়াড় আদিবাসী ইভন গুলোগং সব হিসেব-নিকেশ মিথ্যা প্রমাণ করে উইম্বলডন লেডিস সিঙ্গলস চ্যাম্পিয়ন হলেন। বিবিসি ওয়ার্লড সার্ভিসে সেদিন সেটা ছিল একটা বড় আলোচ্য। বিকালে অনুষ্ঠান তৈরির কাজ শুরু করেছি। ঝড়ের মতো এলেন আবিদ হোসেন। বললেন, ‘সিরাজ ভাই, আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে আজ একবার গুলোগং কথাটা ব্যবহার করতে দিতে হবে। অনুষ্ঠানে কেউ একজনের কিছু সমস্যার কথা বলতে গিয়ে আবিদ বলেই দিলেন, ‘তিনি গুলোগং হয়ে গেছেন।’
বাংলা কবিতা ও ছড়া লেখার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ভাষা। আশির দশকে বিবিসির কাজে প্রায় বছরই আমাকে কলকাতা যেতে হতো। জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সিপিএম সরকার গঠন করেছে ১৯৭৭ সালে। সেটাকে সঙ্কেত ধরে নিয়ে বিরোধী কংগ্রেসের কর্মীদের রাজনৈতিক ছড়া লেখার সে কী তীব্র প্রতিযোগিতা। সড়কের দু’পাশের দেয়ালগুলোতে বলতে গেলে তিল ধারণের স্থান ছিল না। সিপিএম সরকার, বিশেষ করে জ্যোতি বাবুকে তাক করে প্রায় দিনই নতুন নতুন ছড়ার গ্র্যাফিটি লেখা হতো দেয়ালে। একদিন দেখি নতুন গ্র্যাফিটি : জ্যোতি বাবুর দুই মেয়ে—আকাল আর বন্যা। নোটবুকে অনেকগুলো ছড়া লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। বিবিসি থেকে সেসবের একটা অনুষ্ঠানও করেছিলাম।
শুনেছি, জ্যোতি বাবু নিজেও এসব ছড়া উপভোগ করতেন, ঘনিষ্ঠ মহলে সেগুলো নিয়ে হাসাহাসি করতেন। তিনি জানতেন এবং অন্য সবাই জানতেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হৃদয়ে জ্যোতি বসু আর সিপিএমের আসন অত্যন্ত সুদৃঢ়। অন্তত জ্যোতি বসু যদ্দিন বেঁচে আছেন তদ্দিন কংগ্রেস কিছুতেই তার সরকারকে গদিচ্যুত করতে পারবে না, এমনকি ছড়া দিয়েও না। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় জেলাতেই গেছি আমি। রাজ্যের জন্য জ্যোতি বাবুর সরকার কী করেছে আমি স্বচক্ষে দেখেছি। তার ভূমি সংস্কার, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং গ্রাম পঞ্চায়েত্ পদ্ধতির সাফল্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুত্ গেছে, বড় গ্রামগুলোতে ছোট-খাটো শিল্প গড়ে উঠেছে, ফার্টিলাইজারের দোকানও আছে। অধিকাংশ গ্রামে কমিউনিটি সেন্টার হয়েছে, সেখানে টেলিভিশন চলে, গ্রাম পঞ্চায়েতের বৈঠক হয়, ছোট ছোট মাটির ভাঁড়ে গরম গরম চা বিক্রি হচ্ছে। বস্তুত গ্রামীণ অর্থনীতির এতই উন্নতি হয়েছিল যে কলকাতায় বাঙালি কুলি কিম্বা ভিখিরি আর চোখে পড়ে না। সবাই ভালো কর্মসংস্থানের লোভে গ্রামে চলে গেছে। একটানা তিন দশকেরও বেশিদিন সিপিএম সে রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে আবিদ হোসেনের কিছু মিল আমি আগেও লক্ষ করেছি। বিশেষ বিশেষ কিছু কথা তার জিহ্বায় লেগে থাকে, সুযোগ পেলেই সেগুলো তিনি হাওয়ায় ছেড়ে দেন। অনেক সময় উপস্থিত পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হয় না, বাস্তবের সঙ্গে কোনো মিল থাকে না। কিন্তু তাতে কী? ছোটবেলায় শুনতাম, ‘খাটুক না খাটুক, ভার আছে।’

ছড়া কাটা ব্যুমেরাং হয়ে গেছে
শেখ হাসিনার সর্বশেষ ছড়া : দুর্নীতি ও মানুষ খুন, বিএনপির বড় গুণ। প্রধানমন্ত্রী গোড়াতেই গলদ করে বসেছেন। তিনি ভুলে গেছেন যে তিনি এখন বিরোধী দলের নেতা কিংবা কর্মী নন। বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা উল্টো তার গলাতেই ফাঁস হয়ে দাঁড়াতে পারে। আশির দশকের কলকাতার যে গ্র্যাফিটিগুলোর কথা বলছিলাম সেগুলো মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু অথবা তার কর্মীদের কীর্তি ছিল না, ছিল বিরোধী কংগ্রেসের। হয়তো পরাজিত, বিধ্বস্ত কংগ্রেসের কর্মীরা এসব চটুল কথা বলে নিজেদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু তারা জ্যোতি বাবু কিংবা তার সরকারকে ঘায়েল করতে পারেনি, কেননা তাদের কথাগুলো বাস্তববিমুখ এবং অসত্য ছিল। তাদের ছড়ায় লোকে হয়তো সাময়িক হেসেছে, কিন্তু তাদের মনে কোনো দাগ কাটেনি।
শেখ হাসিনা জ্যোতি বসুর কাছাকাছি মানের নেতাও নন। গদি নিয়ে জ্যোতি বাবুর কোনো আশঙ্কা, কিংবা আতঙ্ক ছিল না। সে দাবি হাসিনা করতে পারবেন না। তার নিজের এবং দলের লোকেদের বিভ্রান্ত এবং আতঙ্কগ্রস্ত কথাবার্তাতেই তার প্রমাণ মেলে। ইন্টারনেটে বহু খবর ছোটাছুটি করে আজকাল। তা থেকে ধারণা হয়, ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের কেউ কেউ স্ত্রী-পুত্র-পরিবার বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার পথ খুঁজছেন। একটা খবর এই যে, আওয়ামী লীগের আগ্রাসী যুগ্ম সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফের পরিবারকে (এবং দুই ছাত্রলীগ কর্মী) স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিভক্ত বার্লিনের মতো ‘ক্লোক অ্যান্ড ড্যাগার’ কায়দায় টার্কিশ এয়ারলাইন্সের বিমানে কানাডার টরোন্টোয় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রাতের বেলা বিমানটির ফ্লাইট ‘ক্লোজড’ হয়ে গিয়েছিল, বিমানের দরজাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় দরজা খুলিয়ে সে যাত্রীদের বিমানে তুলে দেয়া হয়।
কিন্তু বলছিলাম, শেখ হাসিনার ‘কাব্যচর্চার’ কথা। প্রধানমন্ত্রীর এটুকু মনে হয়নি যে, প্রতিপক্ষ তার ছড়াটি ঈষত্ ঘুরিয়ে প্রচার করলে তার এবং তাার দলের জন্যই বেশি প্রযোজ্য হবে। যেমন প্রতিপক্ষ বলতে পারত, আওয়ামীদের (অথবা হাসিনার) দুই গুণ/দুর্নীতি আর গুম-খুন। আসলেও মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারিত ছড়াটি যারা দেখেছেন আর শুনেছেন, তাদের ভাবনা চট করেই চলে যাবে বাস্তব পরিস্থিতির দিকে। বিগত চার বছরে বাংলাদেশের মানুষ সর্বক্ষণ দেখেছে আর শুনেছে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক পর্বত-প্রমাণ দুর্নীতির কথা।
শেয়ারবাজারে ৩৫ লাখ মধ্যবিত্তের লগ্নির টাকা উধাও হয়ে গেছে। প্রায় সবাই বিশ্বাস করে, সরকারের এক পাকা-দাড়ি পৃষ্ঠপোষকের নেতৃত্বে একটা ছোট গোষ্ঠী শেয়ারবাজারকে লুটে নিয়েছে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের নামে বিনা টেন্ডারে ২০ হাজার কোটি টাকা মেরে দিল গুটিকয় ‘গ্রুপ’ যেগুলো সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর অতি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বলে মনে করা হয়। ডেসটিনি আর হলমার্ক কেলেঙ্কারির নতুন নতুন বিবরণ তো এখনও ফাঁস হচ্ছে। একটা গুজব এই যে, হলমার্কের বড় কর্তার সঙ্গে লন্ডনের অধিবাসী প্রধানমন্ত্রীর এক অতি নিকট আত্মীয়ার বেশ সখ্য ছিল।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও পদ্মা সেতু
আর সরকারের দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের মানুষ একটা সেতু হারালো, যে সেতুটি হওয়ার কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের টাকায় প্রমত্তা নদী পদ্মার ওপরে। সরকার আর দুর্নীতি দমন কমিশন অবশেষে বিশ্বব্যাংকের তালিকা অনুযায়ী কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করতে রাজি হয়েছে। কিন্তু প্রধান দুই অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করতে সরকার কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। তারা হচ্ছেন দুই আবুল—শেখ হাসিনার ভাষায় ‘দেশপ্রেমিক’ আবুল হোসেন এবং অন্য একজন সাবেক মন্ত্রী আবুল হাসান। এদের বিরুদ্ধে মামলা হলে সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের কি বেকায়দায় পড়ার ভয় আছে?
অথচ তাদের বিচার না হলে বিশ্বব্যাংক কিছুতেই সেতুর জন্য টাকা দেবে না।
শেখ হাসিনার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর কথা মনে আছে আপনাদের? এখানে আমি দশ টাকা কেজির চালের কথা বলছি না, কিন্তু সেই যে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্পদ ও সম্পত্তির তালিকা প্রকাশ করা হবে। সে তালিকা কি কখনও প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে? মোটেই না। প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা অন্যসব প্রতিশ্রুতির মতো এ প্রতিশ্রুতিটাও গিলে খেয়েছেন। কারণ এই যে দুর্নীতি বাদ দিলে এ সরকারের অস্তিত্বের খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।
‘যারা কাচের ঘরে বাস করে, তাদের ঢিল ছুড়তে নেই।’ প্রধানমন্ত্রী হয়তো ভেবেছিলেন চটকদার ছড়া কেটে তিনি মানুষের বাহবা পাবেন, হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত। চট করে সবার মনে পড়ে গেছে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের হত্যা শেখ হাসিনার রাজনীতির স্টাইল। সেটা আগের সরকারের আমলেও ছিল, বর্তমানে তো বটেই। ‘একটির বদলে দশটি লাশ ফেলতে পারেন না?’—শেখ হাসিনার সে অমর উক্তি বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যেতে পারে না। যারা ভুলতে বসেছিল, তাদের স্মৃতি নতুন করে চাগিয়ে উঠেছে।
সঙ্গে সঙ্গে তাদের আরও মনে পড়েছে, ‘ক্রস ফায়ারের’ নামে শত শত কর্মী হত্যা, আর ইলিয়াস আলী প্রমুখ দুই শতাধিক নেতা ও কর্মীর গুম হওয়ার কথা। ১৯৭১ সালে আমার বেশ কিছু বন্ধু, আত্মীয় ও শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবী এভাবেই গুম হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরে দেশে গিয়ে বিভিন্ন জলাভূমিতে স্তূপ স্তূপ নরকঙ্কাল আমি দেখেছি। বর্তমান সরকারের আমলে গুম ও খুন হওয়া কিছু লাশ ও কঙ্কাল পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরো পাওয়া যাবে। ইলিয়াস আলী কোথায় কী অবস্থায় আছেন কে জানে? এদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের স্বার্থে ভিন্নধর্মী কোনো সরকারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
লন্ডন : ৬.১.১৩
serajurrahman34@gmail.com

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads