রবিবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১৩

ভূ-রাজনৈতিক বলয়ে ঢাকা-মস্কো অস্ত্রচুক্তির শিহরণ


সাদেক খান

১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নির্বাচনপূর্ব নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিসহ বর্তমান সরকারের দমননীতির আওতায় গুম-হত্যা-অপহরণের প্রতিবাদে পালিত প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী হরতালের বিকল্প কর্মসূচিÑ নতুন ঢাকার মহাখালী থেকে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার পথের দুই পাশে স্লোগানে মুখরিত মানবপ্রাচীরের মধ্য দিয়ে নিম্ন আদালতে হাজিরা দিতে যান মামলা-হামলাকাতর বিরোধী জোটপ্রধান ও সংসদীয় বিরোধী দলনেতা বেগম খালেদা জিয়া। একই দিনে রুশ রিপাবলিকের রাজধানী মস্কোয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক শেষে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ঘোষণা দেনÑ সমরাস্ত্র কেনা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ল্েয রাশিয়ার কাছ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা (১৫০ কোটি মার্কিন ডলার) ঋণ পেতে দু’টি চুক্তিতে সই করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সমরাস্ত্র কেনার জন্য প্রায় আট হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দিয়েছে রাশিয়া। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আরো চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে দেশটি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাশিয়া আমাদের দুঃসময়ের বন্ধু। এ সফরের ফলে আমাদের বন্ধুত্ব নতুন মাত্রা লাভ করেছে। এ সফরের মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার এক নতুন দরজা খুলে গেছে।’
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পুতিন অস্ত্র বিক্রি ও পরবর্তী সেবা প্রদান বিষয়ে বলেন, ‘আমরা দুই দেশই অস্ত্রপ্রযুক্তি সহায়তা বাড়াতে আগ্রহী। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের রূপপুরে দেশটির প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে রাশিয়া। আমরা কেবল সর্বাধুনিক প্রযুক্তিই সরবরাহ করছি না… পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায়ে আর্থিকভাবে সহযোগিতাও দিচ্ছি।’
অস্ত্র ক্রয়ের চুক্তির তালিকায় রয়েছে সেনাবাহিনীর জন্য সাত ধরনের এবং বিমানবাহিনীর জন্য চার ধরনের সমরাস্ত্র। সেনাবাহিনীর সমরাস্ত্রের তালিকায় রয়েছে ট্যাংকবিধ্বংসী মিসাইল মেতিস-এম-১ ও করনেট-ই; সাঁজোয়া যান বিটিআর-৮০ ও বিটিআর-৮০-কে; স্বয়ংক্রিয় গ্রেনেড লঞ্চার এজিএস-৩০, নৌপথে সাঁজোয়া যান ও ট্যাংক পারাপারের উপযোগী পিপি-৯১ পন্টুন ও ট্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত এমটিইউ-৯০ সেতু। বিমানবাহিনীর কেনাকাটার তালিকায় রয়েছে ইয়াক-১৩০ প্রশিণ জঙ্গিবিমান, সামরিক পণ্য পরিবহন উপযোগী এমআই১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার, গামা-ডিই/গামা-সি১ই রাডার ও কাস্তা-২ই২ রাডার।
শুরুতে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকায় মিগের নতুন সংস্করণ ‘সুখয়’ জঙ্গিবিমান কেনার কথা ছিল। কিন্তু জঙ্গিবিমান কেনার পরিকল্পনা বাদ দেয়া হয়। এর পরিবর্তে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য সমরাস্ত্র কেনার সিদ্ধান্ত হয়।
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে মতাসীন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ বিমান কেনা হয়েছিল। মোট ১২৪ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ওই জঙ্গিবিমানগুলো কেনা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়, মামলাও হয়। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার মতায় আসার পর ওই মিগগুলো বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মামলার কারণে শেষ পর্যন্ত মিগগুলো বিক্রির প্রক্রিয়া থেমে যায়। তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের কেনা আটটি মিগের মধ্যে বর্তমানে চারটি উড্ডয়নের উপযোগী আছে। নয়া চুক্তি অনুযায়ী, সমরাস্ত্রের তালিকা চূড়ান্ত হলেও কোন সমরাস্ত্র কত সংখ্যায় কেনা হবে, তা দুই প পরে চূড়ান্ত করবে। দুই পরে আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনে তালিকা পরিবর্তনও করা যাবে। প্রকাশ, আট হাজার কোটি টাকার এই কেনাকাটার জন্য অগ্রিম হিসেবে রাশিয়াকে ঋণের ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৮০০ কোটি টাকা দিতে হবে। পারমাণবিক কিংবা সামরিক এই প্রকারভেদে সুদের হার বদলাবে। গড়পড়তা সুদ হবে ৪.৫০ শতাংশ। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কেনাকাটার প্রক্রিয়া শেষ করার সময়সীমা ধরা হয়েছে।
স্পষ্টত এটা একটি ধামাচুক্তি বা আমব্রেলা এগ্রিমেন্ট। অর্থাৎ এর আওতায় ক্রয়পণ্য, পরিমাণ এমনকি ঋণসুদের শর্ত বিক্রেতা ও ব্যবহারকারী তথা সামরিক যোগাযোগের দ্বিপীয় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পুনর্নির্ধারিত হতে পারে; এমনকি তালিকাভুক্ত কিছু শ্রেণীর সমরাস্ত্র বাদ দিয়ে অন্য সমরাস্ত্রও তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, এই দশকের প্রথম ভাগে তথা বিগত বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র সংগ্রহ শুরু করে। তার ধারাবাহিকতায় বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাবমেরিন ধাওয়া করার মিসাইল প্রযুক্তি অর্জন করেছে, এক-এগারোর জরুরি সরকারের আমলে তার সফল পরীা হয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও মতায় এসে সেই চীন-বাংলাদেশ সামরিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। আরো সম্প্রসারিত সহযোগিতা চুক্তি নতুনভাবে স্বার করে বেশ কিছু অত্যাধুনিক ট্যাংকের একটি বহর এবং গোলন্দাজ বাহিনীর জন্য কম্পিউটার-চু নিয়ন্ত্রিত সুনির্দিষ্ট ল্য ভেদম কামানও সংগ্রহ করেছে বর্তমান সরকার। বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজে সেসব সামরিক সমতার প্রদর্শনীও ঘটেছে। এ ছাড়া চীনের একাধিক ডকইয়ার্ডে নির্মীয়মাণ রয়েছে বাংলাদেশের জন্য কিছু রণতরী। এভাবে বঙ্গোপসাগরে এবং উপকূলীয় মহীসোপানে বাংলাদেশের সম্পদাহরণ ও স্বার্থরার জন্য নৌশক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।
অন্য দিকে সামরিক প্রশিণের জন্য এবং আন্তর্জাতিক শান্তি মিশনের উপযোগী সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরে দীর্ঘ দিন ধরেই বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীকে প্রশিণ দিয়ে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। উপকূলীয় নিরাপত্তা ও জলদস্যু দমনের জন্য বেশ কিছু সশস্ত্র পেট্রল বোটও সরকারের হাল আমলে বিনামূল্যে সরবরাহ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারপর মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইনের আওতায় মীমাংসা এবং মার্কিন কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়া সমুদ্রগর্ভের কিছু সম্ভাব্য তেল-গ্যাসের েেত্র বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পর উপসাগরীয় নিরাপত্তা রায় বাংলাদেশের নৌশক্তি বৃদ্ধির তাগিদে গত বছর এপ্রিল মাসে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের একটা চুক্তি নিষ্পন্ন হয়। সেটা ওই বছরই মে মাসের শুরুতে হিলারি কিনটনের ঝটিকা সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী-পর্যায়ে আমেরিকা-বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ ডায়ালগ বা ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের সংলাপÑ এই নামে চুক্তি হিসেবে স্বারিত হয়েছিল। তারপর এরই মধ্যে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের অধিনায়কের একাধিক সফরের মাধ্যমে ভাসমান প্রতিরাবিষয়ক ও অন্যান্য নৌপ্রশিণ লাভ করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। একটি অ্যাম্বুলেন্স জাহাজ বা চিকিৎসা-নৌযানসহ আরো কিছু উপকূলীয় প্রতিরা যান ও যুদ্ধাস্ত্র পেয়েছে। মার্কিন সপ্তম নৌবহরের অধিনায়ক সাংবাদিকদের আরো ব্যাখ্যা দিয়েছেন : বাংলাদেশ চীন থেকে নৌযান ও নৌযুদ্ধাস্ত্র কেনে। এটা বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটাকে সহযোগিতামূলক বিষয় বলেই মনে করে। কোনো কৌশলগত সঙ্ঘাতের অবকাশ আছে বলে মনে করে না। তারপর প্রধানমন্ত্রী যখন রাশিয়ায় তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল হেনি প্রথম বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, কোস্টগার্ড, বিভিন্ন সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তার সাথে সাাৎ করেন। তিনি বাংলাদেশের নৌপ্রতিরা আরো মজবুত করার ল্েয একটি কর্তনম বা ‘কাটার’ জাহাজসহ ১৬টি অত্যুচ্চমতাসম্পন্ন নৌযান বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ডকে এ বছর দান করার প্রতিশ্র“তি দিয়ে গেছেন। এভাবেই বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য, সামুদ্রিক তৎপরতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কলেবর বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিরার সমতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাময়িকী জেনস ডিফেন্স উইকলি ২০০৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর আধুনিকায়ন নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল। তাতে তৎকালীন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানের সাাৎকারের ভিত্তিতে বলা হয়েছিল, ২০২০ সালকে ল্য নির্ধারণ করে সশস্ত্রবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর নির্দেশনা দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। সেই ল্য মোতাবেকই অস্ত্র সংগ্রহের এসব বহুমুখী তৎপরতা। কিন্তু রাশিয়া থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে অস্ত্র ক্রয়ের বিষয়টি নিয়ে প্রথম থেকেই সুশীলসমাজে গুঞ্জন উঠতে শুরু করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যে সমরাস্ত্র কেনা হয়েছে তার বেশির ভাগই চীন থেকে। এখন রাশিয়া থেকে যা কেনা হচ্ছে, তা আমাদের প্রতিরানীতির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সেটা ভেবে দেখা দরকার। সরবরাহ লাইন চীন থেকে প্রাপ্ত রণাবেণের বিষয়টি আমাদের দেশেই গড়ে উঠেছে। এখন রাশিয়া থেকে সমরাস্ত্র আনা হলে রাশিয়াতেই তার রণাবেণ হতে পারে ব্যয়বহুল। কী কারণে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার কাছ থেকে এত বেশি সমরাস্ত্র কেনা হচ্ছে, তা-ও স্বচ্ছ নয়। স্বচ্ছ নয় অস্ত্রের জন্য এত সুদ দিয়ে ঋণ নেয়ার বিষয়টিও। আবার কেউ কেউ বলছেন, বিষয়টা ভূ-রাজনৈতিক।
দেশের প্রতিরার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থের জোগানদাতা চীন। অতি সম্প্রতি ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে প্রতিরা সহযোগিতার চুক্তি হয়েছে। ভারত ও চীন শত্র“ না হলেও মিত্র নয়। ভারত চায় বাংলাদেশকে চীনের বলয় থেকে রাশিয়ার বলয়ে নিতে। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে রাশিয়ার নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা রয়েছে। রাশিয়া এখন তাদের আগের প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে আগ্রহী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক এখন শীতল। তাই বিকল্প ভারত ও রাশিয়ার সাথে উষ্ণ সম্পর্ক করতে চাচ্ছে সরকার।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, বর্তমান সরকারের আমলে সামরিক বাহিনী আধুনিকায়নে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। চীন থেকে বেশ কিছু নতুন সমরাস্ত্র আনা হয়েছে, যা আমাদের প্রয়োজন ছিল। রাশিয়া থেকে যেসব সামগ্রী আনা হচ্ছে সেগুলোর কতটা প্রয়োজন আছে সেটা দেখা দরকার। আগের বিএনপি সরকারের আমলে বিমানবাহিনীর জন্য এমআই-১৭ বিমান কেনা হয়। এখন রাশিয়ার সমরাস্ত্র বাজার সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। ভারত, মিসর, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়ায় এখন রাশিয়ার অস্ত্র বিক্রি কমে গেছে। ভারত অনেক আগে থেকেই কমিয়ে দিয়েছে। মিসর, লিবিয়া ও ইরাক এখন আর রাশিয়া থেকে অস্ত্র কিনছে না। আর সিরিয়াও কিনছে না। রাশিয়া অস্ত্রের বড় বড় বাজার হারিয়েছে। ফলে তাদের বাজার ছোট হয়ে গেছে। রাশিয়া এখন তাদের অস্ত্র বিক্রির জন্য আমাদেরকে ঋণ দিচ্ছে। আমাদের অনেক সমরাস্ত্রের প্রয়োজন। কিন্তু রাশিয়া থেকে যেসব অস্ত্র কেনা হচ্ছে তা অনেক আগেই উৎপাদিত। সমরাস্ত্র উৎপাদনের তারিখ থেকেই মেয়াদ শুরু হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) এ এন এম মুনিরুজ্জামান বলেন, এত বিপুল অস্ত্র কেনা হচ্ছে, এত দিনের সরবরাহকারীদের থেকে সরকারের সরে যাওয়ার কারণ বুঝতে পারছি না। ঋণচুক্তিটা কিভাবে হয়েছে তা-ও সরকার পরিষ্কার করছে না। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এ ঋণের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি ছিল। এ ধরনের ক্রয়ে উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করা হয়। তখন সব কিছু জানা যায়। কিন্তু সরকারে-সরকারে হলে স্বচ্ছতা আর থাকে না। (তবে) সরকার বস্তুত সশস্ত্রবাহিনীকে আধুনিকীকরণের জন্যই এই সমরাস্ত্র কিনছে।
সাবেক সেনাপ্রধান ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. জেনারেল (অব:) মাহবুবুর রহমানের মতে, আমাদের সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক চীনমুখী। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীও ২০১০ সালে চীন সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে চুক্তিও হয়েছে। রাশিয়া থেকে হাসিনার সরকার আগেও মিগ-২৯ কিনেছিল। আমাদের সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার রাশিয়া থেকেই আনা। এখন যদি রাশিয়া থেকে অস্ত্র আনা হয় তাহলে ওরিয়েন্টেশন রাশিয়ার দিকে যাবে। সরকার চীন থেকেও অস্ত্র আনতে পারত। আর্মড পারসোনাল ক্যারিয়ার আগেও রাশিয়া থেকে আনা হয়েছে। সরকার হয়তো ডাইভারসিফাই করতে চাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের চীনমুখী ডিফেন্সকে রাশিয়ামুখী করা হচ্ছে। হয়তো বলয় পরিবর্তন করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রাজনৈতিক বলে মনে হচ্ছে। এখানে আমি কোনো অর্থনৈতিক দিক দেখছি না। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়াকে একভাবে দেখলে হবে না।
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানে বিশ্বায়নপ্রক্রিয়ায় শামিল বহুমাত্রিক শক্তিকেন্দ্র-প্রয়াসী রুশ প্রজাতন্ত্র ভারতের সাথে দ্বিপীয় সম্পর্ক অবশ্যই গাঢ় রাখতে চায়, তবে স্নায়ুযুদ্ধকালীন শক্তিবলয়ের আঁতাতের মডেলে নয়, একুশ শতকের ‘সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন’-এর দায়বদ্ধতার পরিসরে। তা ছাড়া বাংলাদেশের মস্কোপন্থীদের পৃষ্ঠপোষক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিও এখন মতা হারিয়েছে রুশ রিপাবলিকে। আলোচ্য ঢাকা-মস্কো সামরিক সহযোগিতা চুক্তির বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ইংরেজি হলিডে পত্রিকায় আরো একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক সংবাদভাষ্যকার এম শহিদুল ইসলাম।
সামরিক প্রতিরা কৌশলে বর্তমান সরকারের সম্ভাব্য বলয় পরিবর্তন প্রসঙ্গে ড. ইমতিয়াজ আহমদের মন্তব্য : আমেরিকার সাথে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক শীতল হওয়ার কারণে এখন বন্ধুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। মস্কোপন্থীদের প্রভাব রয়েছে বর্তমান সরকারের মধ্যে। সরকারে তাদের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। তারা চায় রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব বাড়াতে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আগের ওই ভারত আর নেই। তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে। চীনের সাথে এই লেনদেন করলে যতটা ঝামেলা হবে মস্কোর সাথে করলে হয়তো ততটা হবে না।
মস্কোতে চুক্তি স্বারের পরদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমসাময়িক বাংলাদেশ-রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের প্রোপট শীর্ষক এক বক্তৃতায় বলেন, ‘সম্পর্ক গড়ার েেত্র বাংলাদেশ ও মস্কোর রয়েছে এক ঐতিহাসিক ও আবেগপূর্ণ ভিত্তি। আমি এখানে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে আমাদের অভিন্ন বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বীজ বপন করতে এসেছি। আমরা আমাদের অভিযাত্রা, আকাক্সা ও উদ্দেশ্য সংযুক্ত করতে পারলে দুই দেশের এবং জনগণের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি অর্জনে এই বন্ধুত্ব অবিরত জোরদার হবে।’
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণে রাশিয়ার অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। কেবল আমাদের রক্তয়ী যুদ্ধেই নয়, বাংলাদেশের পুনর্বাসনকাজেও সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।’
১৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পে প্রাক-সফর সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি আরো স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘১৯৭৫ সালের পরে যে সামরিক সরকার মতায় এসেছিল, তারা স্বাধীনতার সময় যে দেশগুলো আমাদের সহায়তা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষ করে ভারত ও রাশিয়ার বিপে অবস্থান নেয়া হয় সে সময়। যারা রাশিয়া থেকে পড়াশোনা করে এসেছেন, তাদের সাথেও সে সময় বৈরী আচরণ করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার মতালাভের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত দ্বিপীয় কূটনৈতিক সম্পর্কগুলো জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফরের এই ‘রাজনৈতিক’ ল্েযর প্রতি দৃষ্টিপাত করেও তার বাস্তব তাৎপর্য সম্পর্কে সংশয় ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ। বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল বিষয় হলো বিনিয়োগ ও অর্থনীতি। যদি রাশিয়ার বিনিয়োগ বাড়ে তাহলে বলতে পারব নতুন সম্পর্ক তৈরি হবে।’ এই প্রসঙ্গে ইংরেজি হলিডে পত্রিকার আরেক ভাষ্যকার (সাবেক সংসদ সদস্য) আবু হেনা বলেছেন, কূটনীতিতে অপরিপক্ব বাংলাদেশের পর্যটনবিলাসী পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ভূরাজনৈতিক হালচাল সম্পর্কে আনাড়ি যে প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফরপূর্ব প্রস্তুতির জন্য রাশিয়ায় গিয়ে তিনি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব করে বসেছিলেন, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে একটা পারস্পরিক প্রতিরা চুক্তি সম্পাদন করা হোক। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাথা নাড়িয়ে তাকে বলেন, সেটা বিপদ ডেকে আনার সঙ্কেত হয়ে দাঁড়াতে পারে; তবে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে প্রতিরা সহযোগিতা অবশ্যই বৃদ্ধি পেতে পারে।
প্রবাসী নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম শহীদুল ইসলাম হলিডে পত্রিকায় আরো লিখেছেন : নতুন ৪৪টি চীনা এমবিটি ২০০০ ট্যাংক সামরিক বাহিনীতে বাংলাদেশ তার প্রতিরা সামর্থ্যরে ধার লণীয়ভাবে বাড়াতে পেরেছে। তার দুই মাসের মধ্যেই রাশিয়ার সাথে স্বারিত প্রতিরা সহযোগিতা চুক্তিতে আর্মার্ড গাড়ি, যুদ্ধেেত্রর অস্ত্রাদি, বিমান হামলা প্রতিরোধব্যবস্থা ও ভারী হেলিকপ্টারসহ সমরাস্ত্রের যে প্যাকেজ প্রাপ্তির ব্যবস্থা হয়েছে, তা অবশ্যই বাংলাদেশের প্রতিরা চিন্তাবিদদের মনোবল বৃদ্ধি করবে। আটটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আয়োজন ব্যয়সাধ্য হওয়ায় তার বদলে অবিলম্বে দুই স্কোয়াড্রন চীনেরই তৈরী এফসি-১/জেএফ-১৭ এবং এফসি-২০/জে-১০ জঙ্গিবিমান এবং নৌবাহিনীর জন্য একটি সাবমেরিন কেনার তোড়জোড় হচ্ছে। তবে এসবই মতাসীন দলের নির্বাচনপূর্ব চমক বলেও মনে করেছেন অনেক সংশয়বাদী।
পূর্বধারণা কিংবা সন্দেহবাতিক যুক্তির দাবিদার কিছু পর্যবেকের কথাÑ বাংলাদেশের প্রতিরাশক্তি বৃদ্ধিতে এক রকম সমভাবে মহাচীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ রিপাবলিকের উৎসাহ সাদামাটাভাবে এটাই প্রমাণ করে যে, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ সম্ভাবনা, বাণিজ্য বৃদ্ধিও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বিধানের েেত্র একটা উঠতি অর্থনৈতিক-সামরিক শক্তি ও যথাযথ ভূমিকা পালনকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে তারা দেখতে চায়।
লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads