রবিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৩

সাফল্যের বিপরীতে পর্বতসম ব্যর্থতা

সরকারের চার বছর

গতকাল পূর্ণ হলো বর্তমান সরকারের চার বছর। এই সময় সরকারি দলের নেতানেত্রীরা ব্যস্তসমস্ত সরকারের সাফল্যগাথা প্রচারে। কিন্তু তাদের ব্যর্থতার কথা বিন্দুমাত্র তারা উল্লেখ করতে নারাজ। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যদিও কখনো কোনো ব্যর্থতার কথা উচ্চরণ করতেই হয়, তবে এ জন্য দায় চাপানোর প্রয়াস চলে বিরোধী দলের ওপর। ‘যত দোষ নন্দঘোষ’ প্রবাদের মতোই এ দেশেকে এগিয়ে নেয়ার পথে সব বাধাই যেন আমাদের বিরোধী দল। আর যা কিছু ভালো তার পেছনেই যেন আওয়ামী লীগ। আর যা কিছু মন্দ তার জন্য দায়ী যেন বিরোধী দল। সে জন্য বিরোধী দল খতম করো মনোভাব নিয়ে এই চার বছর সরকার যেন মরণপণ করে বসেছে। ফলে এই চার বছরে সরকার বিরোধী দলের ওপর যে ধরনের হামলা-মামলা আর দমন-পীড়ন অব্যাহতভাবে চালিয়েছে, তার কোনো উদাহরণ বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

একটি সরকার কোনো একটা মেয়াদে থাকলে তার সাফল্য যেমনি থাকবে, তেমনি থাকবে কিছু ব্যর্থতাও। বর্তমান সরকার এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু যখন একটি সরকারের ব্যর্থতার মাত্রা সফলতার মাত্রাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন এ সরকারের প্রতি জনমনে নানা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বর্তমান মহাজোট সরকারের ক্ষেত্রে কার্যত ঘটেছে তা-ই। এ সরকারের সাফল্যের বিপরীতে রয়েছে পর্বতসম ব্যর্থতা।
সরকার এ দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে যেমনি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি গণতন্ত্রের হন্তারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যেমনি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে তেমনি দুর্নীতি, দুঃশাসন এক পরিব্যাপক রূপ ধারণ করেছে। দুর্নীতির শিকড় আরো গভীরে প্রোথিত হয়েছে। এ সরকারের এই চার বছরে এমন সব কেলেঙ্কারি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে, যা এর আগে কখনো এ দেশবাসী দেখেনি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি গোটা জাতির কপালেই যেন কলঙ্ক লেপন করেছে স্থায়ীভাবে। ব্যাংক খাতে দলীয় বিবেচনায় অনভিজ্ঞ ও অপেশাদার লোকদের ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ দিয়ে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোকে লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করেছে। লক্ষ করা গেছে, এসব পরিচালক ব্যাংক কর্মকাণ্ডে যেমন রাজনৈতিক চাপ কার্যকর রেখেছে। অনেক পরিচালক নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে ঋণও নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। এর ওপর দলীয় লোকদের দেয়া হচ্ছে নতুন নতুন ব্যাংক খোলার লাইসেন্স। অথচ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা সেচুরেটেড পর্যায়ে রয়েছে। এই সময়ে নতুন নতুন ব্যাংক খোলার কোনো প্রয়োজন ছিল না বলেও  মনে করছেন তারা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, তেল ও পানি সরবরাহে সরকারের ব্যর্থতা আছে বড় মাপের। সরকার শুধু বলছে এই চার বছরে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন আরো বাড়িয়েছে। এই সাফল্যের কথা বারবার উল্লেখ করছে। কিন্তু কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার আওতায় যে দুর্নীতির সমারোহ চলছে এবং এই চার বছরে ছয়বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি দুর্ভোগের বোঝা চাপিয়েছে, সে কথা সরকারপক্ষ ভুলেও উল্লেখ করছে না। জ্বালানি তেলের দামও দফায় দফায় বাড়িয়ে জনদুর্ভোগ বাড়ানো হয়েছে এই চার বছরে। আছে শিল্পকারখানা ও আবাসিক এলাকায় গ্যাস-বিদ্যুৎ চাহিদামতো সরবরাহ করতে না পারার ব্যর্থতা। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে না পারায় অনেকে ফ্যাট বিক্রি করতে পারছে না।
একটি সরকারের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও সফলতা নানা কারণে কম-বেশি থাকতে পারে। তবে একটি সরকার তার শাসন মেয়াদে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশ শাসন করবে, তা কখনো মেনে নেয়া যায় না। তেমনি সরকারপক্ষের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে মেনে নেয়া যায় না। কিন্তু এ সরকার পদে পদে সে কাজগুলোই করে যাচ্ছে। সরকার অব্যাহতভাবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বীকৃত রীতিনীতি লঙ্ঘন করে চলেছে এবং সরকারের মধ্যে এই প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। সরকার চার বছরে বিরোধী দলের ওপর মামলা-হামলা দমন-পীড়ন অব্যাহতভাবে চালিয়ে এসেছে। বিরোধী দলের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরকার বারবার আঘাত হেনেছে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ-মিছিলে সরকারপক্ষ বাধা সৃষ্টি করেছে অগণতান্ত্রিক কায়দায়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের আটক করে রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। তাদের গুম করা হচ্ছে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। কখনো কখনো তালাবদ্ধ করা হয়েছে। ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রশাসনে চলেছে অবাধ দলীয়করণ। রাজনৈতিক বিবেচনায় ওএসডি করার প্রক্রিয়া চলেছে জোরেশোরে। সর্বত্র দলীয় নিয়োগ প্রাধান্য পেয়েছে। নিয়োগবাণিজ্য, ভর্তিবাণিজ্যসহ ও টেন্ডারবাজি চলেছে সীমাহীন। দলীয় বিবেচনায় ভিওআইপি লাইসেন্স বিতরণ ও ব্যাংক খোলার অনুমোদন চলেছে ব্যাপক। এ ছাড়াও সরকারের ব্যর্থতার তালিকা সীমাহীন। উচ্চতায় পাহাড়সম।
সরকার এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনদাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি মেনে না নিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করে যেনতেনভাবে ক্ষমতায় ঠিকে থাকতে চাইছে। যথাযথ কূটনৈতিক তৎপরতার অভাবে বাংলাদেশ বিশ্বে বন্ধুহীন রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।
আমরা মনে  করি, সরকার এসব ব্যর্থতা অন্তত ভেতরে ভেতরে উপলব্ধি করবে। এবং আগামী সময়ে এসব ব্যর্থতা কাটিয়ে সরকারের সাফল্যের পাল্লা ভারী করার প্রয়াস যেমন চালাবে, তেমনি নিজেকে গণতন্ত্রের সহায়কশক্তি বলে প্রমাণ করবে। সরকারের চার বছরের এই পূর্তি সময়ে এটুকুই আমাদের প্রত্যাশা।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads