রবিবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০১৩

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নিয়ে কিছু প্রশ্ন


গত ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে রেডিও-টেলিভিশনে ভাষণ দিয়েছেন। গত ৬ জানুয়ারি এ সরকারের চার বছর পূর্তি হয়। জাতি আশা করেছিল তার এ ভাষণে জাতীয় জীবনে বিদ্যমান সঙ্কট-সমস্যা উত্তরণের দিকনির্দেশনা থাকবে। কিন্তু সেই দিকনির্দেশনা থাকা তো দূরের কথা, তার ভাষণে এসব সঙ্কট-সমস্যার কথা উল্লেখ পর্যন্ত হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষকে তার এ ভাষণ চরমভাবে হতাশ করেছে। তার এ ভাষণ একটি গতানুগতিক ভাষণ ছ্ড়াা আর কিছুই নয়।

এ কথা সবারই জানা, দেশে এ সময়ে বিদ্যমান সঙ্ঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গোটা দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। আগামী সাধারণ নির্বাচন কখন হবে, কোন পদ্ধতিতে হবে, শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে, না নির্বাচন নিয়ে আরেকটি এক-এগারো সৃষ্টি হবে, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন করে শুরু হবে কি নাÑ এসব প্রশ্নের নিশ্চিত কোনো উত্তর দেশের মানুষের জানা নেই। সরকার বলছে, আগামী সাধারণ নির্বাচন হবে বর্তমান মহাজোট সরকারের অধীনেই। অপর দিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট বলছে, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। অন্যান্য বিরোধী দলও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। এমনকি মহাজোট সরকারের কোনো কোনো শরিক দল চায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হোক। সুশীলসমাজও বলতে গেলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কায়েমের পক্ষে একাট্টা। তার পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল এর বিপক্ষে অনড় অবস্থা নিয়েছেন। এমনি অবস্থায় দেশবাসীর আশঙ্কা, আমরা কি ওয়ান-ইলেভেনের মতো আরো একটি সঙ্ঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? স্বভাবতই দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে দেয়া এ ভাষণে এই সমস্যার একটা যৌক্তিক সমাধানসূত্র জাতিকে জানাবেন। কিন্তু তিনি পুরো বিষয়টিই তার ভাষণে এড়িয়ে গেছেন। জানি না, এটি কি তার ইচ্ছাকৃত এড়িয়ে যাওয়া, না ভিন্ন কিছু। নিহিতার্থ যাই হোক, বিষয়টি জাতিকে চরম হতাশ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনামূলক বা ইতিবাচক কিছু উচ্চারণ না করে বরং উল্টো তিনি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান রেখেছেন, সঙ্ঘাতের পথ ছেড়ে সরকারের প্রতি নিঃশর্তভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে বিষয়টি সুরাহা হওয়া এ মুহূর্তে জাতির সামনে সবচেয়ে জরুরি করণীয়। কারণ এরই মধ্যে এটি একটি জনদাবিতে রূপ নিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে তার উল্লেখ পর্যন্ত নেই। বিষয়টি নিশ্চিতভাবে গোটা জাতিকে হতাশ করবে বৈকি। বিষয়টি যে দেশে বড় ধরনের সাংবিধানিক সঙ্কটের জন্ম দিতে পারে, সে আশঙ্কাও থেকে গেছে। এই সাংবিধানিক সঙ্কটের সম্ভাব্য বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি হয়তো বলবেন, এ নিয়ে কোনো সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি হবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে বাধ্য হবে। কারণ আন্দোলন করার মতো শক্তি বা কৌশল এই বিরোধী দল বা জোটের নেই। সরকারের আন্দোলনবিরোধী কৌশলের অবস্থান বরং এর চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী। তাই এ সরকার দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে। জানি না, এমন আশাবাদ নিয়েই বর্তমান মহাজোট সরকার এ সময়ে এগিয়ে চলছে কি না? এখানে সরকারকে একটি কথা মনে রাখা দরকার, চলমান বছরটি নির্বাচনের বছর। তাই বিরোধী দল তার কাক্সিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি আদায়ে এবার কোমর বেঁধে নামবে। সেখানে আগের মতো ঢিলেঢালা আন্দোলন করার কোনো সুযোগ নেই। তখন সে আন্দোলনের তোড় কী মাত্রা পাবে, কী আকার ধারণ করবে, তা বলা মুশকিল। তবে সেই সূত্রে আরেকটি ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টি হবে না, এমনটি বলা যাবে না। তবে বিশিষ্টজনদের অভিমতÑ দুই দলের অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে বাধ্য। জন্ম দিতে পারে ভয়াবহ রাজনৈতিক সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির। দেখা দেবে বড় ধরনের সাংবিধানিক সঙ্কট।
কেউ কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ আত্মপ্রশংসার বয়ান। আবার কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ অসত্য ও তথ্যবহির্ভূত। কেউ বলছেন, এ ভাষণে নতুন কিছু নেই, বিয়োজন আছে। কথাগুলো যে অসত্য নয়, তা ধরা পড়ে তার ভাষণের পূর্ণ বিবরণ মনোযোগ দিয়ে পড়লে। তবে যদি বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে মুদ্রার এক পিঠ তুলে ধরার প্রয়াস ছিল। তিনি এর অপর পিঠ তুলে ধরেননি, বরং বলা ভালো কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। তার সরকারের সাফল্যের কথা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সরকার যখন ক্ষমতায় বসে তখন দেশের চরম দুরবস্থা বিরাজ করছিল। সর্বত্র এক ভীতিকর অবস্থা, থমথমে ভাব। জনগণ চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছিল। মানবাধিকার ছিল বিপন্ন। স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ ছিল না।’ এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তো বোঝাতে চাইছেন, এই দুরবস্থা এখন আর নেই, নেই কোনো ভীতির অবস্থা। মানুষ এখন নিরাপদ জীবনযাপন করছে। দেশে মানবাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। মানুষ স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে মত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে আমরা কী দেখছি?
গত ৪ জানুয়ারির দৈনিক যুগান্তরের শীর্ষ সংবাদ অনুযায়ী, বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে চার বছরে ১১ হাজার মানুষ খুন হয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে সাড়ে ৬০০। হত্যা, গুম আর রাজনৈতিক সহিংসতাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বিপর্যস্ত ছিল এ সরকারের গত চার বছর। দেশের মানুষ দেখেছে এই চার বছরজুড়ে সরকার বিরোধী দলের ওপর কী মাত্রায় মামলা-হামলাসহ নানাধর্মী দমন-পীড়নের প্রক্রিয়া অব্যাহতভাবে চালিয়ে আসছে। বিরোধী দলের অফিস অবরুদ্ধ ও তালাবদ্ধ রাখা, শিবির সন্দেহে যাকে তাকে, যেখানে-সেখানে আটক করে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। পর্দানশিন নারীরা পর্যন্ত এ ধরনের নির্যাতন-নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পাননি। জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ সংগঠন না হলেও তাদের সাথে এমন আচরণ করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সাথে বেমানান। বিরোধী দল দমনে আজ ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও আওয়ামী ক্যাডারদের রাস্তায় নামানো হচ্ছে। মন্ত্রীরা ও দলের নেতারা প্রকাশ্যে হুকুম দিয়ে তাদের রাস্তায় নামাচ্ছেন। বলা হচ্ছে, বিরোধী দল নির্মূল করা হবে। নিরীহ মানুষও তাদের হাত থেকে আজ রেহাই পাচ্ছে না। নিরীহ পথচারী দর্জি বিশ্বজিৎকে কিভাবে পুলিশের সামনে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে, তা দেশবাসী বারবার টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছে। কিন্তু এসব খুনিকে বাঁচানোর প্রয়াসে অবাক করা বক্তব্য দিতে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। এরপরও কী করে প্রধানমন্ত্রী দাবি করবেন, তার এই চার বছরের আমলে মানুষ নিরুদ্বেগ ও নিরাপদ জীবনযাপন করছে? কী করে অভিযোগের আঙুল তুলবেন পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে? এ সরকারের আমলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু আছে, তা দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সাথে সরকারের আচরণ, বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোর ওপর সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপসহ রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতি বৈরী আচরণ প্রদর্শন থেকে।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। দুদক এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তদন্তের স্বার্থে দুদক মন্ত্রী, উপদেষ্টা, এমপি, সচিবকে তলব করছে। বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারছে। বিএনপি-জামায়াত জোটের সময় কি এমনটা কল্পনা করা যেত? তিনি এ প্রশ্ন বিচার করে দেখার জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান।
এখানেও প্রধানমন্ত্রী বিষয়টির একপিঠ বর্ণনা করেছেন। অন্য পিঠ থেকে গেছে অবর্ণিত। অর্ধেক বলছেন। অর্ধেক বলছেন না। দেশবাসী যখন এ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখে, তখন তাদের মধ্যে যে ধারণা জন্ম নেয় তা হলো আজ যে মন্ত্রী, এমপি, সচিবেরা দুদকে গিয়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য হচ্ছেন, তারা পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি ও রেলওয়ের ঘুষবাণিজ্যের অপরাধে তাদের পদ হারিয়েছেন অনেকটা হাতেনাতে ধরা পড়ে। ফলে সরকার ও দুদক বারবার তাদের নির্দোষ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে তাদের সম্পর্কে জনধারণা পাল্টাতে পারেনি। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে তাদেরকে পদচ্যুত করতে হয়েছে। আর তাদের বিরুদ্ধে দুদক যে তদন্ত করছে, তা তো সরকারের সদিচ্ছা সূত্রে হচ্ছে না, হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের চাপের মুখে। এক সময় দুদক সরকারের চাপে বলেছে, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়নি। এখন আবার সেই দুদক দুর্নীতি হয়েছে বলে দেশবাসীকে জানিয়ে কারো কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে মামলাও করেছে। আবার সরকারের চাপেই দুই আবুলকে মামলার বাইরে রাখা হয়েছে এখন পর্যন্ত। শোনা যায়, বিশ্বব্যাংক নাকি বলছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে, নইলে পদ্মা সেতুর টাকা ছাড় হবে না। এই হচ্ছে বাস্তবে দুদকের স্বাধীনতার মাপ-পরিমাপ।
বর্তমান সরকারের দাবি শিক্ষাক্ষেত্রে এ সরকার সবচেয়ে বেশি সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেছেন, তার সরকার শিক্ষাকে সবসময় গুরুত্ব দেয়। ২৭ কোটি বই বিনামূল্যে দেয়া হয়েছে। ৭৮ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়া হয়েছে। ২৬ হাজার ২০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে এবং এক লাখ চার হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারীকরণ করা হচ্ছে। ভালো কথা। কিন্তু এই ২৬ হাজার ২০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক লাখ চার হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারীকরণে ঘোষণা দেয়ার জন্য সারা দেশ থেকে ঢাকায় এনে জমায়েত করে এই ঘোষণা দেয়ার প্রয়োজনটা কী ছিল? প্রধানমন্ত্রীর দফতর কিংবা শিক্ষামন্ত্রীর দফতর থেকে একটি প্রেস রিলিজ গণমাধ্যমে পাঠালেই তো এ ঘোষণার কথা সবার জানা হয়ে যেত। তাদের বাস ভরে ঢাকায় এনে যানজটের তীব্রতা ও সেই সাথে এসব শিক্ষককে অহেতুক কষ্ট না দিলে কী ক্ষতি হতো? আসলে সরকারের যা কিছু তৎপরতা সবই সঙ্কীর্ণ দলীয় চিন্তাপ্রসূত। এ কারণেই সদ্যসমাপ্ত ২০১২ সালজুড়ে শিক্ষাঙ্গনে চলছে সরকারসমর্থক ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নৈরাজ্য-নৃশংসতা ও মূর্তিমান গ্রাস থেকে শুরু করে দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাচারিতা আর লুটপাট। দলীয়করণ আর অযোগ্যদের পদায়ন চলেছে সদর্প পদচারণায়। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা খাতে দুর্নীতিনাশের নানা মুখরোচক বক্তব্য-বিবৃতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনিও যে দুর্নীতির সাথে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন, সে অভিযোগের কথা দেশবাসী জানছে গণমাধ্যম সূত্রে। এ ছাড়া আমরা দেখেছি গত বছরজুড়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলেছে অস্থিরতা। ছাত্র সংগঠনগুলোর ক্ষমতার লড়াই ও ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাঝে মধ্যেই রূপ নিয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসে। ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছে রণক্ষেত্রে। সেখানে হয় পুলিশ নীরব থেকেছে, নতুবা সহায়তা দিয়েছে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের ছাত্রদের। এতে করে ঝরে গেছে তাজা প্রাণ। নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন শিক্ষকেরা। একের পর এক কাস ও পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। অনিশ্চয়তায় কেটেছে সাধারণ ছাত্রদের সময়। উচ্চশিক্ষাঙ্গনে অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে চলেছে চরম দলীয়করণ। শিক্ষামন্ত্রী এসব দায় কিভাবে এড়াবেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেছেন, ‘সরকারের প্রথম দিনই মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক ডেকে তাৎক্ষণিক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় নির্ধারণ করি। শুরু হয় সরকারের এক মহাকর্মযজ্ঞ।’ এই ‘মহাকর্মযজ্ঞ’ কী তার উল্লেখ তার ভাষণে নেই। তবে এ সরকারের চার বছরে কোনো না কোনো ধরনের ‘মহাকর্মযজ্ঞ’ তো অবশ্যই প্রত্যক্ষ করেছে জনগণ। এসব মহাকর্মযজ্ঞের অভিঘাতও জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। আর কিছু হোক না হোক এই চার বছর সর্বত্র উলঙ্গ দলীয়করণ, কঠোর হস্তে বিরোধী দল দমন, দলীয় লোকদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, টেন্ডার বক্স ছিনতাই, টেন্ডারের লটারির বাক্স পানিতে ফেলে দেয়া, শিক্ষাঙ্গনে সশস্ত্র সন্ত্রাস, শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা ও এসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনা, মহিলা হোস্টেলে হামলা ও শ্লীলতাহানিÑ কর্মযজ্ঞ তো অবশ্যই চলেছে। তা ছাড়া দলীয় লোকদের সরকারি ব্যাংকগুলোতে পরিচালক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকগুলোকে দুর্নীতি ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করে গোটা ব্যাংক খাতকে ফোকলা করে ফেলা হয়েছে। সর্বত্র দুর্নীতির পথঘাট খুলে দিয়ে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক, ডেসটিনি ও পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারিসহ এ ধরনের বড় বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়া হয়েছে। যেখানে সরকারি দলের লোকদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আজ পরিণত হয়েছে এক ওপেন সিক্রেটে। দৈনিক ইত্তেফাক বলছে, আর্থিক খাতে অনিয়ম আর দুর্নীতির ঘটনাবহুল একটি বছর ছিল ২০১২ সাল। সোনালী ব্যাংকে দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে এই বছরটিতে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যান্য ব্যাংক ও কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকেও বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। শেয়ারবাজার, ডেসটিনি, হলমার্ক ও পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ছিল বছরজুড়ে আলোচনায়। বীমা খাতেও ধরা পড়েছে বড় অঙ্কের দুর্নীতি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর ব্যাংক ও বীমা খাতের বড় বড় দুর্নীতি গোটা আর্থিক খাত নিয়েই শঙ্কা জেগে ওঠে। ফলে ব্যাংকের আমানত আস্থা ও সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সরকারদলীয় লোকেরা আর্থিক খাতের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেয়ে এমন সব দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়, যা শুনে বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষের। এখন দেশবাসী জানছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োজিত পরিচালকেরা পরিচালনা পর্ষদকে ‘ম্যানেজ’ করার জন্য ঘুষ নিতেন। হলমার্কের তানভীর মাহমুদ আদালতে দাঁড়িয়ে জবানবন্দী দিয়ে বলেছেন, পর্ষদকে ম্যানেজ করতে তিন কোটি টাকা দিতে হয়েছে পরিচালক সাইমুম সরওয়ার কমলকে। সোনালী ব্যাংকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি নিজ হাতে এই ঘুষ দেন সাইমুম সরওয়ারকে। সাইমুম আরো অর্থ দেয়ার জন্য তাকে ফোন করেছিলেন বলে জানালেন তানভীর মাহমুদ।
উল্লেখ্য ছাত্রলীগের এই সাবেক নেতা এখন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে হেরে যান। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত সেপ্টেম্বর থেকে তিনি আর পরিচালক নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনভিজ্ঞ ও পেশাবহির্ভূতদের ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগের বিষয়টি ব্যাপক সমালোচিত হয়। তার পরও গত ২০ ডিসেম্বর রাজনৈতিক বিবেচনায় সাতটি সরকারি খাতে ব্যাংকে আরো ৩১ পরিচালক নিয়োগ দেয় এ সরকার। টিআইবি বলেছে, সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা উদ্বেগজনক। ঘুষও চলছে উদ্বেগজনক মাত্রায়। তার পরও সরকারের বড় মুখে দাবি তারা দেশে সুশাসন ফিরিয়ে এনেছে। উন্নয়ন ফিরিয়ে এনেছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের দাবি, বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল। এসব যদি হয় উন্নয়নের মডেল, তবে দেশকে রসাতলে নিয়ে পৌঁছানোর মডেল কোনটা তা আমাদের জানা নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ৩৮৪৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৫৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছি। সর্বোচ্চ ৬৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে ৮৫২৫ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে। ৫২৮৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরো ২৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন।’ কিন্তু ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ নিয়ে যে বাদ-প্রতিবাদ সে সম্পর্কে কিন্তু কিছুই বলেননি প্রধানমন্ত্রী। শুধু বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে, এ বিষয়টি জনগণকে জানিয়ে এবং পূর্ববর্তী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে একবিন্দুও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ায়নি, এ ধরনের মিথ্যা তথ্য দেয়ার কৌশল অবলম্বন করে সরকার একের পর এক ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ আরো বাড়িয়েই চলেছে। এখন পর্যন্ত সাতটি কেন্দ্রের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এ সাতটি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পেতে সরকারের ব্যয় হবে ১২০০ কোটি টাকা। এতে ভর্তুকির ওপর সরকারের চাপ আরো বাড়বে। আর সরকার নিয়মিতভাবে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কেটে সে ভর্তুকির দায় মেটাচ্ছে। একই ঘটনা ঘটছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বেলায়ও। এক বছরের ব্যবধানে পঞ্চমবারের মতো জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বাড়ানোর জন্য জনগণকে গচ্চা দিতে হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা, মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে যাবে সরকারের আয়ের কমপক্ষে পাঁচ গুণ। সে জন্য এ সরকারকে কেউ কেউ বলছেন জনগণের পকেট কাটা সরকার। তা ছাড়া টেন্ডারহীন দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রথা চালু করে সেখানে লুটপাটের হাট বসানো হয়েছে বলেও আছে জোরালো সমালোচনা। তাতে সরকারের কিছু আসে-যায় না। সরকার শুধু বলতে চায়Ñ এ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে। তাতে ভোট পেতে সহজ হবে।
বর্তমান সরকারপ্রধান একটা কথা বারবার বলে থাকেন, এ সরকার দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, ভোট চুরি বন্ধ করেছে, জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এ দেশের মানুষ বাস্তবতার আলোকে এ সরকারকে জানে ভিন্নভাবে। আমরা জানি, এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় কমিটি করে। এ কমিটির উদ্দেশ্য তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার প্রশ্নে সুপারিশ করা। সবাই জানি, এ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সবচেয়ে বেশি বৈরী আচরণ করেছে বিএনপির সাথে। এ দলের নেতাকর্মীদের ওপর হাজার হাজার মামলা দেয়া হয়েছে। তখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপরও মামলা হয়। উল্লিখিত কমিটির সুপারিশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর দায়ের করা মামলা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক হাজার হাজার মামলা খারিজ করা হয়। কিন্তু বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি মামলাও প্রত্যাহার হয়নি। বিষয়টি প্রবল সমালোচনার মুখে পড়লে, আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলা তুলে নেয়ার জন্য আমরা ক্ষমতায় বসি নাই’। এরপর জাতি দেখেছে কিভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনিরাও দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমার সুবাদে খালাস পায়। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত খবরে দেশবাসী জানল ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ বিবেচনায় খুন-ধর্ষণের আরো ১০টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করছে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারসংক্রান্ত জাতীয় কমিটি। এই ১০টিসহ আজ পর্যন্ত সাত হাজার ১০১টি মামলা সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ জাতীয় কমিটি। ফলে খুনি, সন্ত্রাসী, ধর্ষকসহ প্রায় এক লাখ আসামি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছে বা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। এই হচ্ছে বর্তমান সরকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নমুনা। এভাবেই যেখানে হাত দেয়া যাবে, সেখান থেকে আওয়ামী আইনের শাসনের গন্ধ বের হবে।
প্রসঙ্গত প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্য ভাষণের আরেকটি বিষয় উল্লেখের তাগিদ অনুভব করছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে কবর দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনকে জায়েজ করে তোলার জন্য আজ প্রধানমন্ত্রী সমালোচনা করছেন মঈনউদ্দিন- ফখরুদ্দীনের তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। আপনার আলোচ্য ভাষণেও সে সমালোচনার উপস্থিতি আমরা দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেছেন, ‘তখন যারা মাইনাস টু ফর্মুলা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন, তারা এখন সক্রিয়। মাঝে মধ্যে তারা মাথাচাড়া দিতে চাচ্ছে।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। কিন্তু আপনিই তো ঘোষণা দিয়েছিলেন তাদের বৈধতা দেয়ার। কার্যত দিয়েছেনও, নইলে কেন ওয়ান-ইলেভেনের নায়কদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও করেননি? বিএনপিসহ সব বিরোধী দলও বলছে, তারা ছিল অবৈধ সরকার। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আপনার সরকার আজ ক্ষমতায়। আপনি চাইলেই তা পারতেন। কিন্তু তা না করে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে গিলে খাওয়ার জন্য আজ ওয়ান-ইলেভেনের নায়কদের বিরুদ্ধে সমালোচনায় নেমেছেন। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। এ সমালোচনার কী জবাব আছে?
আসলে আমরা যে যা-ই বলি, আমজনতাকে যত হাবা-গোবাই ভাবি, আসলে তারা অতটা বোকা নয়। তাদের বোধশক্তি অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের চেয়েও প্রখর। তারা তাদের বোধজ্ঞান দিয়েই সঠিক সিদ্ধান্তটি নেয় নির্বাচনের সময়। তাদের কাছে বিএনপি-আওয়ামী লীগ নয় বরং তাদের দলীয় আমলনামা জাতির জন্য কতটুকু ইতিবাচক, নেতিবাচক সেটাই বিবেচ্য। তারা বোঝে কোন দল, কোন নেতা, কোন দলীয় ঘরানার, কোন গণমাধ্যম, কোনটি অর্ধসত্য বা কোনটি মিথ্যা প্রচার, কী মাত্রায় করেছে বা করছে। তাই সে উপলব্ধি নিয়ে প্রতিটা দলেরই (সরকারি কিংবা বিরোধী) উচিত তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া। প্রয়োজন নেই কোনো মহাকর্মযজ্ঞের। কারণ সাধারণ মানুষ অল্পেই তুষ্ট। তবে তারা চায় না তাদের অধিকার যেন কেউ কেড়ে না নেয়। তাই সাবধান হতে হবে আমাদের সবাইকে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads