শনিবার, ১৫ মার্চ, ২০১৪

শেখ সেলিমের রোমহর্ষক হুঙ্কার


 প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম ঢাকার একটি জনসভায় সেই দিন ভয়ঙ্কর কথা বলেছেন। এমন ভয়ানক সেই কথা যে শুনলে রক্ত হিম হয়ে যায়। তিনি হুংকার দিয়ে বলেছেন যে, সরকার বিরোধী আন্দোলনের নামে দেশে কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায় তাহলে তার হাত পা এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা হবে। তার এই ভয়াবহ উক্তির প্রতিক্রিয়া শুধুমাত্র ঢাকা মহানগর কিংবা বাংলাদেশেই নয়, বিদেশেও হয়েছে। আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডে সভা সমাবেশ করে সেই কথার প্রতিবাদ করা হয়েছে। আমেরিকার টেনিসি অঙ্গরাজ্য থেকে একজন বাংলাদেশী শিক্ষক এর চুল চেরা বিশ্লেষণ করেছেন। এই অধ্যাপকের নাম তাজ হাশমি। তিনি আমেরিকার টেনিসি অঙ্গরাজ্যের ক্লার্কসভাইলের অষ্টিনপিয়া ষ্টেট ইউনিভার্সিটিতে নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। এই অধ্যাপক সুদূর আমেরিকাতে বসে বাংলাদেশের পত্র পত্রিকায় বিশেষ করে ডেইলি স্টারে লেখালেখি করেন। অতীতে তার লেখায় বিএনপির বিরুদ্ধে প্রচন্ড সমালেচনা থাকতো এবং পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি দুর্বলতা দেখা যেত। কিন্তু এই বারের লেখাটি সম্পূর্র্ণ ইউটার্ন। তার লেখাটি আমাদের আজকের লেখার উপজীব্য। তার আগে শেখ সেলিম সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগ নেতা এবং যুবলীগের সভাপতি। শেখ ফজলুল হক মনির আপন ছোট ভাই। শেখ ফজলুল হক মনির সন্তান শেখ ফজলে নূর তাপস। জাতীয় সংসদে ধানমন্ডি থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক ভাগে থাকে মুজিববাদ নামক নব আবিষ্কৃত একটি রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা, যাদের অধিকাংশই ভেটার্ন পলিটিশিয়ান। অন্যভাগ মুজিববাদ মেনে নিতে না পেরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং  বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শের কথা বলে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। মুজিববাদের পক্ষে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, শেখ মনি, শেখ সেলিম প্রমূখ। পক্ষান্তরে  বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের উদগাতা হয়েও নেপথ্যে থাকেন সিরাজ উল আলম খান। সামনে থাকেন আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, মেজর জলিল, শ্রমিক নেতা মোঃ শাহজাহান প্রমূখ। মুজিববাদের অন্যতম প্রধান উদগাতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভাই শেখ ফজলুল হক মনি সেদিন সদম্ভে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মুজিববাদের বিরুদ্ধে কথা বললে তার পরিনতি হবে ভয়ঙ্কর। মুজিববাদের বিরুদ্ধে যদি কোন শিশুও কথা বলে তাহলে সেই শিশুকেও মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে এনে জবাই করা হবে। সেই ভয়াবহ দিনগুলির কথা মনে হলে আজো ভয়ে গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে।
শেখ ফজলুল হক মনি আজ আর এই দুনিয়ায় নাই। কিন্তু রয়ে গেছেন তার কনিষ্ঠ সহোদর ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম। তিনি তার এলাকা গোপালগঞ্জ থেকে অনেকদিন ধরে জাতীয় সংসদ সদস্য রয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম মেয়াদে তিনি তার সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তিতে অবশ্য তিনি আর মন্ত্রী নিযুক্ত হন নাই। তবে সংসদ সদস্য রয়েছেন। শেখ পরিবারের সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর ফার্ষ্ট কাজিন হিসাবে তিনি স্বভাবতই একজন ক্ষমতাশালী লোক। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগের  প্রেসিডিয়াম সদস্য। এহেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম যখন বলেন যে, সরকার বিরোধিতার নামে অরাজকতা করলে আন্দোলনকারীদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে নেয়া হবে, তখন তার বক্তব্যকে গুরত্বের সাথে না নিয়ে পারা যায় না। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো এই যে, আওয়ামী এবং বাম ঘরানার তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং টেলিভিশন টক শোর আলোচকবৃন্দ শেখ সেলিমের কথার পর ঠোঁট সেলাই করে রেখেছেন। অথচ এরাই সন্ত্রাস, গণতন্ত্র,  স্বৈরাচার , ফ্যাসিবাদ ইত্যাদি নিয়ে কতই না কথা বলেন। এদের কাছে সন্ত্রাস গুন্ডামি রংবাজী ইত্যাদি খুব খারাপ জিনিস। গলার সুর সপ্তমে ছড়িয়ে তারা এইসবের প্রতিবাদ এবং সমোলচনা করেন। কিন্তু শেখ হাসিনা বা শেখ পরিবারের মূখ দিয়ে এইসব কথা বের হলে তারা চুপসে যান। কারণ এদের কাছে আওয়ামী লীগের সাত খুনও মাফ।
দুই
                                                রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বন্দে¦ শেখ সেলিম হয়তো ভূলে গেছেন যে, যে মূখ দিয়ে তিনি সন্ত্রাস এবং অরাজকতার বিরুদ্ধে কথা বলছেন, সেই একই মূখ দিয়ে তিনি নিজে সন্ত্রাস এবং অরাজকতা ছড়াচ্ছেন। এটিই বুঝি আওয়ামী লীগ। এই স্ববিরোধিতার নামই বুঝি আওয়ামী লীগ। এর আগে যখন দেশে সরকারবিরোধী তুমুল আন্দোলন চলছিলো তখন সরকারের আরেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি হুমকি দিয়েছিলেন যে, প্রয়োজন হলে ঘরে ঢুকে আন্দোলনকারীদেরকে হত্যা করা হবে। সেইদিনও আওয়ামী এবং বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবী এবং আঁতেলরা ছিলেন স্পিকটি  নট। আওয়ামী লীগের এই স্ববিরোধী চরিত্র দেখেই কবি লিখেছেন নিমোক্ত কবিতা:
‘দেবতার বেলা লীলা খেলা
পাপ হয়েছে মোদের বেলা।’
বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে হরতাল বা অবরোধ উপলক্ষে পিকেটিং করলে বা ঢিল ছুড়লে সেটি সন্ত্রাস সহিংসতা তথা অরাজকতা হয়ে যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ যুবলীগ এবং ছাত্রলীগ যখন প্রকাশ্য দিবালোকে পিস্তল উঁিচয়ে বিরোধী দলের কর্মীদেরকে হত্যা করে  তখন সেটি সন্ত্রাস সহিংসতা তথা অরাজকতা হয় না। শেখ সেলিম ভুলে গেছেন যে, রাজপথের আন্দোলন আওয়ামী লীগের একচেটিয়া নয়। তারা যখন রাজপথে নামেন তখন সেটি হয় জনতার আন্দোলন। কিন্তু যখন বিএনপি জামায়াতসহ বিরোধী দল রাজপথে নামে তখন সেটি হয় সন্ত্রাস সহিংসতা, অরাজকতা বা নাশকতা। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আর কত দিন চালাবে? তাদের শঠতা এবং প্রবঞ্চনা সচেতন মানুষ ইতমধ্যে ধরে ফেলেছেন।
টেনিসি অঙ্গরাজ্যের বাংলাদেশী প্রফেসার শেখ সেলিমের হুমকিকে পরিষ্কার উস্কানি বলে আখ্যায়িত করেছেন। সহিংসতার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে শেখ সেলিম নিজেই সহিংসতাকে উস্কে দিচ্ছেন। তিনি লিখেছেন, শংকার বিষয় হলো এই যে, শেখ সেলিমের এই উস্কানিকে তার দলের নেতাকর্মীরা সিরিয়াসলি নিয়েছেন কিনা। জনাব তাজ হাশমি বলেন, যদি শেখ সেলিমের বক্তব্যকে সিরিয়াসলি নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ, অরাজকতাকে উস্কে দেওয়ার অপরাধে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হারানোর হুমকির সম্মুখীন। এখন বাংলাদেশের মানুষ সহিংসতার ব্যাপারে আর সংবেদনশীল নন। এই ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ নির্বিকার। তারা ভাবেন যে, আইন রক্ষাকারী বাহিনী যদি ক্রসফায়ার বা বন্দুক যুদ্ধের নামে মানুষ খুন করেও পার পেয়ে যেতে পারে তাহলে পুলিশ প্রধানের চেয়েও বেশী ক্ষমতাধর একজন রাজনীতিবিদ, বিশেষকরে সরকারি দলের হোমরা চোমরা পলিটিশিয়ান, রাজনৈতিক বুলি কপচিয়ে পার পাবেন না কেন? তাকে যদি পাকড়াও করা হয় তখনতো তিনি বলবেন যে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে নেয়ার কথাটাতো ছিলো বাত কি বাত। ওটা ছিলো মাঠ গরম করার স্টান্টবাজি।
তবে যারা আওয়ামী লীগকে ভালো করে চেনেন তারা কিন্তু শেখ সেলিমের হুমকিকে হালকাভাবে নিতে পারেননি। তারা জানেন যে, আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলকে হুমকি দেয় তখন তারা ফাঁকা বুলি ছাড়ে না। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়ার হুমকিটাই তো রক্তপাত এবং অরাজকতার আলামত। কিন্তু যদি সেটা বাস্তবায়িত করা হয় তাহলে শুরু হবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং  নৈরাজ্য সৃষ্টি। যেভাবে পুলিশ এবং র‌্যাব প্রতিদিন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে সেইগুলো দেখে শুনে মনে হয় যে, বাংলাদেশ ইতমধ্যেই অরাজকতার রাজ্যে প্রবেশ করেছে। যেভাবে মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রধান জন সমাবেশে বক্তৃতা করেন এবং অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দকে হুমকি দেন, সেগুলো দেখে সন্দেহ জাগে যে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগের  প্রেসিডিয়ামের সদস্য কিনা।
তিন
তাজ হাশমি প্রশ্ন তুলেছেন, কোনটা বেশি বর্বর আচরণ? পলিটিক্যাল ক্যাডারদেরকে দিয়ে বিরোধী দলের হাত পা কেটে ফেলা? অথবা আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে রাজনৈতিক কর্মীদেরকে ক্রসফায়ার বা বন্দুক যুদ্ধের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মেরে ফেলা? কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি ভিন্ন কথা বলে। সরকার সমর্থক দলের রংবাজ এবং মাস্তানরা এবং পুলিশ ও রক্ষাবাহিনীর সদস্যরা এইসব হত্যাকান্ড ঘটিয়েও দিব্যি পার পেয়ে যাচ্ছেন। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা বিরোধী দলকে নির্মূল করছে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। সরকার বিরোধী নেতা কর্মীদের অনেকেই প্রতিনিয়ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এবং দৃষ্টি শক্তি হারাচ্ছেন। তারা গুম হয়ে যাচ্ছেন এবং সরকার সমর্থক ক্যাডার বাহিনীর হাতে নিয়মিত মারা পড়ছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেকুলার রংবাজ এবং ধর্মীয় মিলিট্যান্টদের অধিকাংশই আসছে যুবসমাজের মধ্য থেকে। তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই হলো যুবক, অর্থাৎ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী, তারা হলো যুব সমাজ। সেখানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৩০ ও তার কম বয়সী যুবকরা মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি। তাদের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ৪৭ শতাংশই হলো বেকার অথবা অর্ধবেকার। সেই দেশে সন্ত্রাস এবং সহিংসতার পয়দা হচ্ছে ওই বিশাল যুব সমাজের মধ্য থেকে। এইসব বেকার ও অর্ধবেকার শিক্ষিত যুবকরা মধ্য প্রাচ্য এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কলকারখানা এবং কৃষিখামারে কাজ করে। অনেকে গ্যাংস্টারের খাতায় নাম লেখায়। বিপুল সংখ্যক যুবক মাদকের কারবার করে। এইভাবে জনগোষ্ঠির একটি বিশাল অংশ ধীরে ধীরে পেশাদার অপরাধীতে রুপান্তরিত হয়। এইসব হতাশ এবং ক্ষুব্ধ যুবকদের হাতে তখন কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে হত্যা কান্ডসহ যে কোন ভয়ঙ্কর অপরাধ করানো যায়।
এখন যদি সরাকারপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের একটি অংশ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলার হুমকিকে সিরিয়াসলি গ্রহণ করে তাহলে বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে সন্ত্রাসের অভয়ারন্যে পরিনত হবে। সেই চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বের ফলাফলের ভিত্তিতে এই কথা বলা যায় যে, দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এখন যেভাবে বিরোধী দলের টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে তার ফলে তাদের মধ্য থেকে যদি পাল্টা কোন অ্যাকশান বাউন্স ব্যাক করে তাহলে তার জন্য দায়ী থাকবে সরকার।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads