শুক্রবার, ৭ মার্চ, ২০১৪

প্রধানমন্ত্রীর মুখে আবারও ভারতের স্তুতি


ভারতের প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের মনোভাব সম্পর্কে নিশ্চয়ই নতুন করে জানানোর কিছু থাকতে পারে না। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে ভারতের কাছে বিপুল ঋণ রয়েছে সে কথাটা এতদিনে কিশোর-কিশোরীরাও জেনে গেছে। সুযোগ বা উপলক্ষ পেলে প্রধানমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে জানান দিয়ে থাকেন। সর্বশেষ একটি উদাহরণ দিলে পাঠকদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সম্প্রতি বিমস্টেক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে এক ফাঁকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ পেয়েছিলেন। এই সুযোগেও বিভিন্ন বিষয় বা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা দেয়ার জন্য ড. মনমোহন সিংকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ধন্যবাদ জানানোর খবরটুকু সরকারিভাবে প্রচার করা হয়েছে। কথা শুধু আন্তরিক ধন্যবাদ জানানোর কারণে ওঠেনি। কথা ওঠার আসল কারণ হলো, ৪ মার্চের ওই বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে তার সরকারের পক্ষে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করা ‘খুব কঠিন’Ñ আসলে সম্ভব নয়। অর্থাৎ বহুদিন ধরে অঙ্গীকারের ঘোষণা দিয়ে আসা সত্ত্বেও তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ড. মনমোহন সিং সরাসরি অস্বীকৃতিই জানিয়েছেন। এমন এক অবস্থায় যে কোনো দেশপ্রেমিক প্রধানমন্ত্রীর যেখানে প্রতিবাদ জানানো উচিত আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেখানে উল্টো ভারতকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেনÑ তাও বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য! সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, তিস্তা চুক্তির মতো একটি প্রকাশ্য বিষয়ে যে দেশ ঘোষিত অঙ্গীকার থেকে সরে যায়, সে দেশকে ধন্যবাদ জানানোর মতো আর কি এমন বিষয় থাকতে পারে, যার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন? কি সেই বিভিন্ন বিষয়? বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত ২০০৮ সালের অক্টোবরে সংঘটিত লগি-বৈঠার হত্যা-সন্ত্রাস এবং ডিজিটাল নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়ার ঋণ পরিশোধ করতে চেয়েছেন। ৫ জানুয়ারির একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া এবং নতুন আওয়ামী সরকারের পক্ষে সমর্থন যোগাড়ের চেষ্টা চালানো পর্যন্ত অন্য এমন কিছু বিষয়ের কথাও প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন যেগুলোর ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের তেমন জানা নেই।
প্রধানমন্ত্রীর এই ধন্যবাদ জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরকেন্দ্রিক নাটকীয়তা এবং ভারতের প্রতারণাপূর্ণ কৌশল নিয়ে শুধু নয়, সামগ্রিকভাবে ভারতের বাংলাদেশ নীতি সম্পর্কেও নতুন করে কথা উঠেছে। বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর ‘ঐতিহাসিক’ বাংলাদেশ সফরও। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় এসেছিলেন। ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে প্রধান একটি বিষয় ছিল তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে এ ব্যাপারে নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং আমাদের কারো কারো ‘দিদিমণি’ মমতা ব্যানার্জি। তিনি শুধু ঘাড়ই বাঁকিয়ে বসেননি, তার এই ঘাড় বাঁকানোকে অজুহাত বানিয়ে ভারতীয়রাও নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ‘ইউ টার্ন’। সফরের প্রাক্কালে ৩-৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্তও জনগণকে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে লম্বা অনেক কথা শুনিয়েছিলেন আমাদের মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা। বলেছিলেন, তিস্তা চুক্তি এবার ‘হবেই’! দৃশ্যতও সবই ঠিকঠাক মতোই চলছিল। কিন্তু সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছিলেন ‘দিদিমণি’। তিনি খসড়া চুক্তিরই শুধু বিরোধিতা করেননি, একই সঙ্গে ঢাকায় আসতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে বসেছিলেন। কারণ জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশকে পানি দেয়ার পরিমাণ নিয়ে তার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন মনমোহন সিং। ২৫ হাজার কিউসেক দেয়ার কথা থাকলেও ৩৩ হাজার কিউসেক দিতে যাচ্ছিলেন মনমোহন সিং। এতেই বেঁকে বসেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। কারণ তিস্তা তার কাছে ছিল তাদের উত্তরবঙ্গের কৃষির জন্য ‘লাইফ লাইন’। মমতা ব্যানার্জি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি শেখ হাসিনার মতো আত্মকেন্দ্রিক বা স্বার্থপর নেত্রী নন। এজন্যই জামদানি শাড়ি ও ইলিশ মাছের প্রলোভন তাকে নাড়া দেয়নি, তার রাজ্যের স্বার্থের প্রশ্নে এক ইঞ্চিও ছাড় দেননি মমতা ব্যানার্জি।
এত বড় একটি প্রত্যাখ্যানেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নিÑ যেমনটি এবারও দেখা যায়নি মিয়ানমারের রাজধানীতে মনমোহন সিং সরাসরি অস্বীকৃতি জাানানোর পর। এর কারণ জানতে হলে মনমোহন সিং-এর ওই সফরকেন্দ্রিক কিছু তথ্য ও ঘটনার উল্লেখ করা দরকার। সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহে অন্য কিছু বিষয়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের ভারতপন্থী কর্মকা- ছিল চোখে পড়ার মতো। কারণ ব্যাপক তৎপরতা চালানো হলেও সরকার ঠিক সংহত একটি একক সরকার হিসেবে সামনে আসতে পারেনি। ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর দেয়া থেকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, ছিটমহলসহ সীমান্ত সমস্যা এবং তিস্তাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টন চুক্তি পর্যন্ত কোনো একটি বিষয়ে আয়োজনের সঙ্গেই সংশ্লি¬ষ্ট মন্ত্রীদের কারো তৎপরতা সে সময় চোখে পড়েনি। সব আয়োজনের জন্য দুজন মাত্র উপদেষ্টাকেই দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা গিয়েছিল। সবই করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। তারা ‘সুপার উপদেষ্টা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তাদের ইচ্ছানুসারেই প্রতিটি বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সবকিছু দেখেছিলেন দর্শকের গ্যালারি থেকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি থেকে শুরু করে পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন পর্যন্ত সবাইকে অন্ধকারে রেখে কাজ গুছিয়েছিলেন দুই ‘সুপার উপদেষ্টা’। মন্ত্রীরা তাই বলে অভিমান করেননি, বরং সাফাই গেয়েছিলেন। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, সরকারে সবার ভূমিকা ‘দৃশ্যমান’ থাকে না। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে উপদেষ্টাদের নয়, মন্ত্রীদের ভূমিকাই ‘দৃশ্যমান’ থাকার কথা।
কথা শুধু এটুকুই নয়। দেখা গেছে, বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরের ব্যাপারে মন্ত্রীদের পাশাপাশি জাতীয় সংসদকেও কিছুই জানানো হয়নি। এমনকি মনমোহন সিং আসার ঠিক আগেরদিন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকের খসড়া উপস্থাপন করা হয়নি। অর্থাৎ মন্ত্রীদের পর্যন্ত এসব বিষয়ে আস্থায় নেয়া এবং জানতে দেয়া হয়নি। অথচ সংবিধানের নির্দেশনা হলো, জাতীয় স্বার্থসংশ্লি¬ষ্ট যে কোনো বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে চুক্তির খসড়া সংসদে পেশ করতে হবে, পাস করিয়ে নিতে হবে। ভৌগোলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত থাকলে বিষয়টি সম্পর্কে জনমত যাচাই ও গণভোট আয়োজন করারও নির্দেশনা রয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সংসদে যেমন যায়নি, তেমনি ধারে-কাছে ঘেঁষতে দেয়নি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদেরও। সবমিলিয়েই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল, বিরোধী দলের প্রচারণা অসত্য নয়Ñ আসলেও ভারতের স্বার্থ হাসিল করে দেয়ার শর্তেই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়েছিল। আর সমঝোতা প্রতিষ্ঠার সে প্রক্রিয়ায় এইচটি ইমাম প্রমুখের সঙ্গে ‘সুপার উপদেষ্টা’ দুজনও ফলপ্রসূ ‘অবদান’ রেখেছিলেন বলেই তাদের এত দাপট ছিল। মনমোহন সিং-এর সফরকালেও ‘সুপার উপদেষ্টা’রা জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে ভারতের সেবাদাস হিসেবেই বেশি ভূমিকা পালন করেছিলেন। এখানে বিশেষ করে গওহর রিজভীর কথা স্মরণ করতেই হবে। মনমোহন সিং আসার আগেরদিন বিকালেও তিনি তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। সবশেষে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ভারতীয়দের স্টাইলে হাত জোড় করে ‘নমস্কার’ জানিয়েও তিনি ‘পাড়ামাত’ করেছিলেন!
মন্ত্রীদের গ্যালারিতে বসিয়ে রাখার কর্মকা-ে জনগণের সচেতন অংশ কিন্তু মোটেই অবাক হননি। কারণ অন্তরালে যেহেতু পূর্বশর্ত রয়েছে, সেহেতু শেখ হাসিনার সামনে কোনো বিকল্পও ছিল না। একই কারণে নিজের দিল্লী সফরকালেও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মন্ত্রীদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পাঠকদের মনে পড়তে পারে, আগের বছর ২০১০ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা যখন দিল্লী গিয়েছিলেন তখনও তার সঙ্গে বিষয়সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা যাওয়ার সুযোগ পাননি। যেমন ওই সফরকালে সন্ত্রাস দমনসহ দু’দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তিনটি পৃথক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এবং বৈঠকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম উপস্থিত থাকলেও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সঙ্গে নেননি প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশের বিপুল ঘাটতিসহ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য একটি প্রধান বিষয় ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যাননি। অন্যদিকে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মা কিন্তু ঠিকই ছিলেন। সমুদ্র বন্দর এবং রেল ও সড়কপথে করিডোর দেয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় করার কথা শুনিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এবং তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে দেখা গেলেও বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রীর কাউকেই সঙ্গে নেননি প্রধানমন্ত্রী। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি নিয়ে শোরগোল তোলা হয়েছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি দলে বাংলাদেশের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টাকে দেখা যায়নি। এসবের মধ্যদিয়েও প্রমাণিত হয়েছিল, শেখ হাসিনার সরকার সর্বতোভাবে ভারতের স্বার্থেই ভূমিকা পালন করে চলেছে। সরকার একের পর এক এমন সব পদক্ষেপই নিয়েছে, যেগুলো এমনকি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের জন্যও বিপজ্জনক।
এভাবে কেবলই ভারতের স্বার্থে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের মানসম্মানকে কতটা ধুলায় মিশিয়ে চলেছে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা কেমন দাঁড়িয়েছে, সে সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির দিল্লী সফরের কথা স্মরণ করা যায়। ওই সফর শেষে ১১ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লীতে যে যুক্ত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল তার কপি গভীর রাত পর্যন্তও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পৌঁছেনি। ফ্যাক্সযোগে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমকে বিবৃতির কপি পাঠিয়েছিল ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও অনুসৃত নিয়ম হলোÑ এ ধরনের যুক্ত বিবৃতি সংশ্লিষ্ট দু’দেশের রাজধানী থেকে দেশ দুটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একযোগে প্রকাশ করবে। অন্যদিকে দীপু মনির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে যুক্ত বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়েছিল নয়াদিল্লী¬¬ থেকে। এর মধ্যদিয়ে একই সঙ্গে এ কথাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন বাংলাদেশকে ভারত কতটা ‘গণনায়’ আনে। সাধারণ অশিক্ষিত মানুষ পর্যন্ত অপমানিত বোধ করলেও ক্ষমতাসীনদের মধ্যে কিন্তু লজ্জার লেশমাত্র দেখা যায়নি। মনমোহন সিং-এর সফরের ক্ষেত্রেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকে হাসির পাত্রী বানানো হয়েছিল। আগেরদিন সন্ধ্যায় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব দিল্লীতে যখন তিস্তা চুক্তি স্থগিত করার কথা জানিয়েছেন, তখনও আমাদের দীপু মনি দিব্যি বলে বসেছিলন, চুক্তি হবেই!
এদিকে সর্বতোভাবে অসম্মানিত হওয়ার পরও ভারতকে ট্রানজিট-করিডোরের দেয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রী-উপদেষ্টারা এমনভাবেই অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন, যেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাড়া খাটার মতো কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান! এ ব্যাপারে এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী লজ্জার ঘোমটা পর্যন্ত খুলে ফেলেছিলেন। করিডোর ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে তিনি ‘জুজুর ভয়ের’ তুলনা করেছিলেন। জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, তিনি নাকি ওই ‘জুজুর ভয়’ পান না! এখানেও অনুসরণকারীর অভাব হয়নি প্রধানমন্ত্রীর। যেমন মনমোহন সিং-এর সফরের প্রাক্কালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ঘোষণা করেছিলেন, তারা নাকি ‘জুজুর ভয়’ পান না! ভারতকে কথিত ট্রানজিট দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, এই ‘জুজুর ভয়’ দেখিয়েই বহু বছর ধরে ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হয়নি। কিন্তু আর নয়, শেখ হাসিনার সরকার ‘জুজুর ভয়’ পায় না। ভারতকে এবার ট্রানজিট দেবেনই তারা! দীপু মনির কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশের নয়, তিনি ভারতের মন্ত্রী হিসেবে কথা বলেছেন! অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও মন্দ শোনাননি। বিরোধীদের উদ্দেশে খোঁচা মেরে তিনি বলেছিলেন, ট্রানজিটে আমাদের কোনো লাভ হবে নাÑ এ ধরনের বক্তব্য নাকি ‘কা-জ্ঞানহীন’! ওদিকে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীওÑ যাকে বাংলাদেশের শিক্ষিত লোকজনও চেনেন না। সফরের প্রাক্কালে ২৭ আগস্ট ডিপ্লে¬াম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিকাব)-এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার জন্য নতুন কোনো চুক্তি বা প্রটোকলের প্রয়োজন নেই। কারণ ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতেই নাকি ট্রানজিট দেয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে! অর্থাৎ ওই চুক্তির মাধ্যমেই বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে রেখেছে! শেখ হাসিনা এবং দীপু মনির সুরে ড. রিজভী আরো বলেছিলেন, ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার জন্য ৪০ বছর অপেক্ষা করেছেন, আর অপেক্ষা করতে রাজি নন তারা। অর্থাৎ গওহর রিজভীও ‘জুজুর ভয়’ না পাওয়ার কথাই শুনিয়েছিলেন।
ভারতীয়দের সুদূরপ্রসারী কৌশলের কারণে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রী-উপদেষ্টারা অবশ্য সাময়িককালের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন, ট্রানজিটের আড়ালে করিডোর দেয়ার চুক্তি তাদের প্রকাশ্যে করতে হয়নিÑ যদিও নানান নামের সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ভারতীয়রা যা যা নেয়ার সবই নিয়ে গেছেন। এসব বিষয়ে ধীরে ধীরে ‘টের’ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান পর্যায়ে বলা দরকার, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের স্বার্থে যা কিছু করে চলেছে সেগুলোর কোনোটিতেই বাংলাদেশের ক্ষতি ছাড়া লাভ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ চাণক্য কৌশল নিয়ে পা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারতীয়দের তুলনা নেই। প্রসঙ্গক্রমে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর ঢাকা সফরের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ১৯৯৯ সালে ঢাকা-কলকাতা সরাসরি বাস সার্ভিস উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকায় এসে তিনি ২৫ ক্যাটাগরির বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর, একটি পুরো যুগ কেটে গেলেও এখনও সে ঘোষণার বাস্তবায়ন হয়নি। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর সফরকালে ৪৬টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার কথা শুনে তাই নেচে ওঠেননি কেউ। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয়দের নীতি ও কৌশল সম্পর্কে ধারণা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষিত অঙ্গীকার থেকে মনমোহন সিং-এর সরে যাওয়ার খবরে সচেতন মহলগুলোতে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়নি। যারা লগি-বৈঠার হত্যা-সন্ত্রাস থেকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনার পেছনে ভারতের ভূমিকা এবং ভারতের কাছে শেখ হাসিনার বিপুল ঋণ সম্পর্কে জানেন না তারা অবশ্য অবাক হয়েছেন একটি কারণে। সে কারণটি হলো, মনমোহন সিং চুক্তি স্বাক্ষরে অস্বীকৃতি জানানোর পরও আমাদের প্রধানমন্ত্রী কেন বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার জন্য ভারতকে ধন্যবাদ শুধু নয়, আন্তরিক ধন্যবাদও জানিয়েছেন। পাঠকরা প্রধানমন্ত্রীর বর্ণিত ‘বিভিন্ন বিষয়’ নিয়ে চিন্তা করতে পারেন। দেখবেন, এই সহযোগিতা ভারত বাংলাদেশের জনগণকে করেছে নাকি সহযোগিতার সবটুকু শুধু প্রধানমন্ত্রী ও তার দলই পেয়েছে। এখনো সে সহযোগিতা পাচ্ছেন বলেই প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের রাজাধানীতে বসেও ঋণ পরিশোধের চেষ্টা চালিয়েছেন। প্রতিবাদ জানানোর পরিবর্তে ভারতকে উল্টো আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
 আহমদ আশিকুল হামিদ 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads