সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০১৪

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কয়েকটি দল যা করেছে


গত রোববার ৯১ উপজেলায় নির্বাচন হয়ে গেল। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের এই চতুর্থ ধাপ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছিল তাতে জনমনে দেখা দেয় উৎকণ্ঠা। সেই উৎকণ্ঠার বাস্তব রূপ লক্ষ্য করা গেল ভোটের দিনে। ফলে পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে ‘কেন্দ্র দখলের নির্বিঘœ উৎসব’, ‘রক্তাক্ত ভোট’, ‘বেড়েছে লাশ  —এগিয়ে আওয়ামী লীগ।’ এইসব শিরোনামের খবরে বলা হয় ৪০ উপজেলায় সহিংসতা নিহত ৫, মধ্যরাতেই ব্যালট পেপারে সিল, আগৈলঝাড়ায় ৩ ঘণ্টায় ভোট শেষ, ফেনীতে বাক্স ভরেছে দুপুরেই, কালিয়াকৈর উপজেলার নির্বাচনে যুবলীগ নেতা একাই দিয়েছে ২৪০ ভোট, মঠবাড়িয়ায় ভোট ডাকাতি, বরিশালের এক কেন্দ্রে ৩০ মিনিটে ১৮০০ ভোট। এইসব চিত্র থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় চতুর্থ ধাপের উপজেলা নির্বাচন কতটা সহিংস ও প্রশ্নবোধক হয়েছে। নির্বাচন কমিশন নিজেই ৩২ কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করেছে। ১৫ উপজেলায় নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপি। এরপরও আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেন, আগের তিনটির চেয়ে চতুর্থ পর্বে উপজেলা নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হয়েছে। এদিকে বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, চতুর্থ পর্বের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে নেকড়ের মতো হামলা করে ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিয়ে রাজকীয়ভাবে সিল মারা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাচন যে সঠিকভাবে হচ্ছে না, তা দেশের জনগণ উপলব্ধি করতে পারছে। সরকারি ঘরানার লোকজন হয়তো নিজেদের মুখরক্ষার কারণেই বলছেন, উপজেলা নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। তবে এ নিয়ে প্রথম আলোর ২৩ মার্চ সংখ্যায় এক চমকপ্রদ রিপোট মুদ্রিত হয়েছে। উক্ত রিপোর্টে বলা হয়, উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতা এবং প্রশাসনের সহায়তায় ভোট জালিয়াতির ঘটনায় আওয়ামী লীগের ভেতরেই অসন্তোষ আছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও এই নির্বাচনে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে দলের অনেকেই বিব্রত। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, উপজেলা নির্বাচনে শক্তি প্রয়োগ করায় দলের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। অতিউৎসাহী কিছু নেতা এবং সরকারের কেউ কেউ এসব ঘটনার নেপথ্যে থেকে দলের উচ্চ পর্যায়ের বাহবা নেয়ার চেষ্টা করলেও এতে নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের দাবিই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। তিন ধাপের উপজেলা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এই নির্বাচনে ক্রমান্বয়ে সহিংসতা বাড়ছে এবং সরকারের হস্তক্ষেপও বেড়েছে। তৃতীয় ধাপে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীরা বেশিসংখ্যক উপজেলায় পাস করেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার ও হতাহতের ঘটনাও তুলনামূলক বেড়েছে। আর চতুর্থ ধাপের উপজেলা নির্বাচনে এই প্রবণতা আরও বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
উপজেলা নির্বাচনের চতুর্থ পর্বে সরকারি দলের প্রার্থীরা বেশিসংখ্যক আসনে জয়লাভ করলেও তাতে দল কতটা লাভবান হবে সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ এই নির্বাচনে সরকারি দলের ক্যাডারদের সহিংসতা এবং প্রশাসনের সহায়তা জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। ফলে সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়কে তারা প্রকৃত বিজয় হিসেবে বিবেচনা করছে না। বরং পেশী ও প্রশাসনের সহায়তায় অর্জিত এ বিজয়কে তারা বরং পরাজয় বলেই মনে করে। উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের নেতাকর্মী ও প্রশাসনের আচরণে, জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বিরোধীদলের বক্তব্যই এখন সঠিক বলে প্রমাণিত হচ্ছে। সরকারি দলের নেতাকর্মী এবং মন্ত্রী বাহাদুররা বলে আসছেন যে, ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিরোধী দল ভুল করেছে। কিন্তু এখন তাদের বক্তব্যই জনগণের কাছে ভুল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাই পর্যবেক্ষক মহলে প্রশ্ন জেগেছে, উপজেলা নির্বাচনের মত স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার ও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা এমন দৃষ্টিকটু আচরণ না করলে কি পারতেন না? এতে যে তাদের কোনো লাভ হয়নি, তা হয়তো তারা অচিরেই উপলব্ধি করতে পারবেন।
ইনসেট
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির অর্থ হচ্ছে, কৃষি ও শিল্প সামগ্রীর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন খরচা বৃদ্ধি, গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ, হাসপাতালসহ সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহের সেবা মূল্যবৃদ্ধি যার সামগ্রিক যোগফল হচ্ছেÑ জনদুর্ভোগ। অর্থমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পেলেও সরকারের কিছু করার নেই, বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হলে বর্ধিত মূল্য দিতেই হবে। অভিযোগ উঠেছে, রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টসমূহের কারণেই বিদ্যুতের মূল্য বাড়ছে এবং ব্যয়বহুল রেন্টালের পেছনে সরকার যে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির নামে লোকসান দিচ্ছে তার পরিবর্তে ব্যয় সাশ্রয়ী বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলে জনদুর্ভোগ হ্রাস পেত। কিন্তু সরকার তা করতে আগ্রহী নন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ মার্চ পরিষ্কার বলেছেন, রেন্টাল বন্ধ করা যাবে না। যতক্ষণ চাহিদা ততক্ষণ রেন্টাল থাকবে। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় জনস্বার্থ এখন গৌণ ব্যাপার হয়ে পড়েছে। সরকার, সরকারি দল ও কিছু ব্যবসায়ীর দুর্নীতির খোরাক জোগাতে মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করতে ক্ষমতাসীনদের কোনো বাধা নেই। ... রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে শুরু থেকেই দেশে অভিযোগের পাহাড় গড়ে উঠেছে। তেল চুরি ও ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি তাদের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। সরকার এখানে নির্লিপ্ত। দুর্নীতি দমন কমিশন গত ছয় বছরে এদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটিও করেনি। রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের বেসরকারি উদ্যোক্তারা তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহের মেরামত ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কায়েমিস্বার্থ গড়ে তুলছেন। এগুলো তাদের কাছে সোনার ডিম দেয়া হাঁস। তারা বৃহৎ ও স্থায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পথে বিরাট বাধার সৃষ্টি করে চলেছেন। সরকারও তাদের পুষছেন এবং অভিযোগ অনুযায়ী সোনার ডিমের অংশ তাদের অনেকের পকেটেও যায়।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads