বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৪

ভোট ডাকাতি ও বিবেকের তাড়না


৫ জানুয়ারি ভোট ছাড়াই ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিজয়ী, পরে প্রহসনের একতরফা নির্বাচনে বিজয়ীএমপিরা এবং ফেব্রয়ারি-মার্চ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল করে অপরের বিজয় ছিনিয়ে জয়ী উপজেলা চেয়ারম্যানেরা। আপনারা জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নিয়েছেন। এ কাজ করতে গিয়ে নিরপরাধ প্রতিবাদী বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ভোটাধিকারবঞ্চিত লাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হলো। সরকার লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। বাড়িছাড়া করা হলো হাজার হাজার মানুষ, গুম করে চমক সৃষ্টি করা হচ্ছে, দুর্নীতির প্রতিবাদকারী ভোটাধিকারবঞ্চিত মানুষ  বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার। মানুষ যাতে সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে সে জন্য বিােভ করতে দেয়নি। প্রতিবাদী অনেক বেসরকারি গণমাধ্যম বন্ধ। 

আপনারা বিবেকের কাছে পরাজিত। আপনারা নিশ্চয় বিশ্বাস করেন আল্লাহ আছেন এবং আপনাদের সব কর্মের হিসাব আখেরাতে দিতে হবে। এখন হয়তো অনেকেই মতার দম্ভে নামাজ-রোজা করেন না, মৃত্যুপরবর্তী জীবনকে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।

বয়সের ভারে যখন আপনি ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন, তখন ভোট ডাকাতি করে বিজয়ী হওয়ার বিষয়ে বিবেক আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। তখন মোটেই শান্তি পাবেন না। আপনার বিবেক বলবে : তুমি ভোট ডাকাত, ভোট চোর !যেসব কেন্দ্র দখল করে আপনি বিজয়ী হয়ে অপরের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন, এমনই একটি কেন্দ্রের সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছেন, তখনি বিবেক বলে দেবে, ‘এই কেন্দ্র দখল করে তুমি এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলে।যখন এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান থাকবেন না, আপনার আর মতা নেই, আপনার দরবারে তোষামোদকারীরা আসবে না। কেউ আপনার কথা আর শুনবে না। তখন আপনি মৃত্যুর জন্য শুধু অপো করছেন, ভীত হয়ে পড়েন, কষ্ট পান; ভোট ডাকাতির কথা মনে করে। যদি বিজয়ী হওয়ার জন্য কাউকে হত্যা করে থাকেন, ওই প্রতিবাদী মানুষের চেহারা ভেসে উঠবে এবং আপনি মনে মনে বলবেন : এই নিরপরাধ মানুষকে আমার হুকুমে হত্যা করা হয়েছিল। বিবেক বলবে, ‘মানুষটার আত্মা তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছে।এই ভেবে কষ্ট পাবেন, ‘আজরাইল তো এখনি আমার জান নিয়ে পাড়ি দেবে, কেন তাহলে এত কিছু করে এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলাম?’

জুমার নামাজ আদায়ের জন্য আপনি মসজিদে গেছেন, ইমাম সাহেব মানুষের অধিকার হরণের পরিণাম সম্পর্কে আলোচনা করার সময় দুটি হাদিস শোনানÑ একটি হলো : হজরত আবু হুরাইরাহ রা: বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: সাহাবিগণকে জিজ্ঞাসা করলেন : তোমরা কি জানো নিঃস্ব কোন ব্যক্তি? তারা বললেন : আমাদের মধ্যে তো নিঃস্ব সেই ব্যক্তি যার অর্থকড়ি ও সহায় সামগ্রী নেই, তখন তিনি বললেন : আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব তারা, যারা কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম, জাকাত ইত্যাদি নিয়ে উপস্থিত হবে, সেই সাথে এগুলোও নিয়ে আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো অর্থসম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগদখল করেছে, কাউকে অন্যায়ভাবে মেরেছে বা খুন করেছে। ফলে কিয়ামতের দিন সেই লোকদের তার নেক আমল থেকে তিপূরণ দিয়ে দেয়া হবে; কিন্তু মানুষের তিপূরণ দিয়ে শেষ করার আগেই যদি তার নেক আমল ফুরিয়ে য়ায়, তখন তাদের পাপগুলো এনে তার ওপর চাপানো হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে (সহিহ মুসলিম)। অপরটি হলো: হজরত আবু হুরাইরাহ রা: বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : যে কেউ তার কোনো (মুসলিম) ভাইয়ের প্রতি ইজ্জত বা অন্য কোনো অধিকার হরণের মাধ্যমে জুলুম করেছে, সে যেন আজই তা মিটমাট করে নেয়। কারণ কিয়ামতের দিন তো কারো কাছে অর্থকড়ি থাকবে না, ভালো আমল যা থাকবে তা ওই জুলুমের বিনিময়ে দিয়ে দিতে হবে। আর যদি তার নেকি বা ভালো আমল পাওয়া না যায়, তাহলে মজলুমের পাপ এনে তার ঘাড়ে চাপানো হবে (সহিহ মুসলিম)।

এ হাদিস দুটি শোনার পর বিবেক আপনাকে পীড়া দিচ্ছে যে, আপনি হাজার হাজার মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছেন। সত্যিকার অর্থে যিনি বিজয়ী হতেন তার অধিকার হরণ করেছেন। তখন হয়তো কোনো মানুষকে খুন, কোনো মানুষকে আহত করা হয়েছে।

মানুষের অধিকার নষ্ট করলে ওই অধিকার বঞ্চিত ব্যক্তি যদি মাফ না করে তাহলে কেউ মাফ পাবে না। আপনার মন বলছে, ওই মানুষগুলোকে যদি পেতাম তাহলে মাফ চেয়ে নিতাম; কিন্তু তাদের অনেকেই মারা গেছে, অনেককেই চেনেন না। অনেকেই আপনার দলীয় কর্মীদের নির্যাতনে এলাকাছাড়া। কষ্ট পাচ্ছেন পরকালের কথা ভেবে। 

উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে অবৈধ টাকা প্রচুর আয় করেছেন। বড় অঙ্কের ভাতা তো ছিলই। এসব আয় দিয়ে নিশ্চয়ই একটি সুন্দর বাড়ি বানিয়েছেন। শেষ বয়সে মাথায় টুপি দিয়ে বাড়ির বারান্দায় বসে রাস্তায় কর্মব্যস্ত মানুষের যাওয়া-আসা দেখছেন। একদিন দেখতে পেলেন, রাস্তা দিয়ে লাশ নিয়ে যাচ্ছে দাফন করার জন্য। মৃত মানুষটিকে দেখে নিজের মৃত্যুর কথা মনে করে ভীত হয়ে পড়েন। আপনার ব্লাড প্রেসার বেড়ে গেছে, হাঁপানি বেড়ে গেছে। মাঝে মাঝে এমন হয় যেন এখনি আপনার জীবনটা চলে যাবে।

এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে অনেক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছিলেন। কোনো এক ইসলামি অনুষ্ঠানে আপনাকে অর্থসহ কুরআন শরীফ দিয়েছিল। তা বাড়িতে এনে রেখে দিয়েছিলেন। সে সময়ে হয়তো কুরআন পড়েননি। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় সকাল বিকাল সেই কুরআন শরীফ অর্থসহ পড়ার চেষ্টা করেন। হয়তো আজ কুরআন শরীফের সূরা ইব্রাহীমের ২১ নম্বর আয়াত অথবা সূরা সাবার ৩১-৩৩ নম্বর আয়াত অথবা সূরা মুমিনের ৪৭-৫০ নম্বর আয়াত পড়ছেন। অথবা সূরা সাফফাত ২৭--৩২ আয়াত আর সেই লোকেরা যখন একত্র হয়ে আল্লাহর সামনে উন্মুক্ত হবে, তখন এদের মধ্যে যারা পৃথিবীতে দুর্বল (অনুসারীরা) ছিল তারা, যারা বড়লোক (নেতৃস্থানীয়) ছিল, তাদেরকে বলবে : পৃথিবীতে আমরা তোমাদের অধীন ছিলাম। আজ আমাদেরকে তোমরা আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচাতে কিছু করতে পারো কি? তারা বলবে : আল্লাহ যদি আমাদেরকে মুক্তির কোনো পথ দেখাতেন তবে অবশ্যই আমরা তোমাদেরকে (মুক্তির) পথ দেখাতাম। এখন আহাজারি করি কিংবা ধৈর্য ধারণ করি উভয়ই আমাদের জন্য সমান, আমাদের রা ও মুক্তির কোনো উপায় নেই’ সূরা ইব্রাহীম : ২১। 

এবার সূরা সাফফাত পড়তে গিয়ে দেখেন ২৭-৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তারা একে অপরকে ল্য করে কথা কাটাকাটি করবে। সাগরেদরা নেতাদেরকে বলবে, আমাদের কাছে তোমাদের আগমন দাপট ও প্রভাবসহকারে হতো। নেতারা বলবে, বরং তোমরাই ঈমান আনো নাই। তোমাদের ওপর আমাদের কোনো প্রভাব ছিল না। বরং তোমরা নিজেরাই দুষ্কর্মকারী ছিলে, সুতরাং আমাদের সবারই ওপর আমাদের রবের এ কথা সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, আমরা শাস্তি ভোগ করব। আসলে আমরা তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছি। কেননা আমরা নিজেরাই পথভ্রষ্ট ছিলাম।

এই আয়াতগুলো পড়ার পর আতঙ্কিত হয়ে উঠবেন। আর বলবেন সর্বনাশ! আমি কাকে নেতা বানিয়ে রাজনীতি করেছি। আর আমাকে কারা নেতা মেনে অনুসরণ করেছে, আমার কথায় যারা ভোট ডাকাতি ও কারচুপি করেছে এরা সবাই আমার শত্রএবং আমিও তাদের শত্র“; জাহান্নামের সঙ্গী। আপনি যখন কুরআন শরীফের সূরা মায়ারিজের ১০-১৪ নম্বর আয়াতে সে দিন কোনো প্রাণের বন্ধু নিজের প্রাণের বন্ধুকেও জিজ্ঞাসা করবে না। অথচ তাদের পরস্পর দেখা হবে। অপরাধীগণ সে দিনের আজাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিজের সন্তান, স্ত্রী, ভাই, তাকে আশ্রয়দানকারী নিকটবর্তী পরিবার এবং পৃথিবীর সমস্ত লোককে বিনিময় দিয়ে হলেও মুক্তি পেতে চাইবে।পড়বেন আর শুধু ক্রন্দন করতে থাকবেন। আর বলবেন : ভোট ডাকাতি করে এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে অবৈধ বেতনভাতা নিয়েছি, বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ভাগ নিয়েছি, চাঁদাবাজি করেছি। তা দিয়ে সুন্দর বাড়ি করেছি, ছেলে মেয়ে, স্ত্রী ও আপনজনদের পেছনে সব ব্যয় করেছি, তা আজ আর আমার কোনো কাজে লাগছে না।যাদের পেছনে আপনি ব্যয় করেছেন, তারা আপনাকে নিয়ে ভাববে না। যেমন আপনি পরিণাম ভাবেননি। একদিন জুমার দিনে ইমাম সাহেব খুৎবায় বললেন : নেক সন্তান মৃত বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন। আপনি ভোট ডাকাতি করে অপরের অধিকার ছিনিয়ে আমলনামা শূন্য করে ফেলেছেন। ফলে তা পরকালে আপনার জান্নাতে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তখন কি সন্তানেরা আপনার জন্য আল্লাহর কাছে হাত তুলবে! কিন্তু হয়তো তারা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে।

ভাবতে ভাবতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বেন। সবাই আপনাকে আল্লাহর নাম স্মরণের জন্য পরামর্শ দেবে। এ সময় আপনার মনের আয়নায় ভেসে উঠবে কারচুপি, ভোট ডাকাতি, অপরের অধিকার হরণ, মানুষ খুন-গুম। দুনিয়ার বাহাদুরি আজ আর কোনো কাজে লাগছে না। 

এমন সময় মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাইল এসে যাবেন জান কবজের জন্য। কুরআন শরীফের সূরা আনফালের ৫০ নম্বর আয়াত : তোমরা যদি সেই অবস্থা দেখতে পেতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের জান কবজ করবে! জান কবজের সময় ফেরেশতারা তাদের মুখমণ্ডল এবং পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে থাকে আর বলতে থাকেন যাও, এবার আগুনে জ্বলবার শাস্তি ভোগ করগে!এভাবেই আপনার মৃত্যু হয়ে গেল। যদি আপনি সারা জীবন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে কাজ করতেন তাহলে আপনার মৃত্যু কেমন হতো? আল্লাহ বলেন, ‘সেসব লোক যাদেরকে পবিত্র জীবনের অধিকারী (মুত্তাকি) অবস্থায় ফেরেশতারা জান কবজ করতে আসে, তাদেরকে বলে : তোমাদের প্রতি সালাম, শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো, তোমাদের আমলের বিনিময়ে’ (সূরা নাহল-৩২)।

এবার আপনাকে দাফন-কাফনের জন্য সবাই ব্যস্ত। গোসল দিয়ে সাদা কাপড়ে মোড়ানো হলো। দলের নেতাকর্মীরা আপনাকে নিয়ে রাজনীতি করল, তারা দলীয় পতাকা আর ফুল দিয়ে সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশ ঢেকে দিলো। নামাজে জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো শহরের বড় মসজিদে। অন্ধকার কবরে দাফন করে যে যার মতো ফিরে গেল, একেকজন একেক মন্তব্য করতে করতে। আপনি দুনিয়াতে সমালোচিত হলেন এবং পরকালও আপনার শূন্য হয়ে গেল। 

মুহাম্মদ শাহাবুদ্দীন বিশ্বাস


 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads