রবিবার, ২৫ মে, ২০১৪

রাজনীতিতে স্বস্তিকর বারিবর্ষণ কবে হবে


গত পরশু শনিবার ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ দেশের অনেক স্থানে স্বস্তির বৃষ্টিপাত হয়েছে। বরিশালে ঝড়-ঝাপটা হলেও দেশের অন্যান্য স্থানে তীব্র দাবদাহের পর বৃষ্টিটা ছিল আসলেই স্বস্তির ও সুখকর। গতকালও ঢাকায় বৃষ্টি হলো। প্রচ- গরমে মানুষের শরীরে প্রায় ফোসকা পড়বার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। জীবজন্তু ও পাখপাখালির মধ্যেও অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে বেশ। বৃষ্টি নামবার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দঘন হয়ে ওঠে পরিবেশ। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীসহ অনেকেই বৃষ্টিতে নেমে আসে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টিতে সিক্ত¯œাত হয়। দেখে মনে হয় যেন উৎসব। গ্রামে-গ্রামান্তরে ছেলেমেয়েরা যেমন মাঠে নেমে পড়ে বৃষ্টিতে ভিজবার জন্য, তেমনই শহুরে ছেলেমেয়েরা ভবনের ছাদে উঠে দীর্ঘক্ষণ ধরে তপ্ত শরীর শীতল করে নেয়।
কালপরিক্রমায় আমাদের এ অঞ্চলে এখন গ্রীষ্মকাল। অবশ্য গ্রীষ্ম বিদায় নিতে চলেছে প্রায়। আর কদিন পরেই বর্ষা শুরু হবে। এ সময় পাকা আমের মধুর রসে দেশ-গ্রাম টইটম্বুর হবার কথা। কিন্তু আলামত তেমন দেখা যাচ্ছে না। উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রাজশাহী থেকে মোবাইলে আমাকে জানানো হলো, জ্যৈষ্ঠ মাসের আমপাকা এখনও শুরু হয়নি। ভালোজাতের আম দেরিতে পাকলেও গুঁটিসহ গোপালভোগ এ সময়েই পাকবার কথা। কিন্তু তার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আম পুষ্ট হয়নি। এছাড়া এবার আম আকারে বড়ও হচ্ছে না। প্রচ- খরা ও দাবদাহে আমগাছ যেমন ¤্রয়িমান হয়ে গেছে, তেমনই ফলও বড়সড়ো হতে দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া মুকুল এসেছিল কিছুটা দেরিতে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, দিনাজপুর অঞ্চলের বাগানমালিকরা গাছে কেমিক্যাল স্প্রে করে আম যেমন তাড়াতাড়ি বড় করবার চেষ্টা করছেন, তেমনই আগাম পাকাবার জন্যও নানা রাসায়নিক স্প্রে করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন আরেকটি সুস্বাদু ও জনপ্রিয় ফল লিচু। রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলের লিচু বিখ্যাত। বেশ বড় বড় ডাঁসা ডাঁসা লিচু হয় উত্তরাঞ্চলে। এবার লিচুও কমে গেছে। মুকুল থাকতেই ঝরে গেছে অনেক বাগানের লিচু। উত্তরাঞ্চলের ভালো লিচু ঢাকাতে এখনও আসেনি। অবশ্য দিনাজপুরের ভালোজাতের লিচু বাগান থেকেই প্যাকেটজাত হয়ে বিদেশ পাড়ি দেয় বলে জানা গেছে। দু’একজন ভাগ্যবান ব্যতীত রাজশাহী-দিনাজপুরের লিচু এখন আর অনেকে চোখেই দেখতে পায় না। রসালো স্বাদগ্রহণ তো দূরের কথা। এছাড়া কয়েকদিন আগে ঢাকার পত্রিকায় সচিত্র খবর পড়লাম। খরা ও গরমের জন্য দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁওয়ে লিচু গাছেই চৌচির হয়ে ফেটে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে সুস্বাদু রসালো ফলটির আবাদ ও ফলন প্রতিবছরই কমে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় এখন যেসব লিচু পাওয়া যায়, সেগুলো দিনাজপুর-রাজশাহীর বলে বিক্রি করলেও আসলে সেগুলো অন্য জায়গার। একশ্রেণির ব্যবসায়ী নি¤œমানের লিচু বেশি দামে বেচবার জন্য গ্রাহকদের সঙ্গে মিথ্যে বলেন। প্রতারণা করেন। গ্রাহকদের ঠকান। আমের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমদানিকৃত বিষাক্ত আমও রাজশাহী-দিনাজপুরের বলে চালিয়ে দেন একশ্রেণির প্রতারক ব্যবসায়ী। এ প্রতারকদের নীতিনৈতিকতা বলে কোনও কিছু নেই। তাদের লক্ষ্য কেবল অর্থ উপার্জন। এর জন্য তারা জনগণকে বিষও মধু বলে খাওয়াতে দ্বিধাবোধ করেন না।
কয়েকদিন আগে ঢাকার দৈনিক পত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছে। খবরের সঙ্গে ছবিও ছাপা হয়েছে। ‘ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পদ্মানদীর ওপর দিয়ে গরু-মোষের গাড়ি চলছে। গাড়িভর্তি ধান অথবা অন্যকোনও শস্যের বস্তা। অথচ কয়েক দশক আগে এমন দৃশ্য কল্পনাও করতো না কেউ। পদ্মানদীর বুক দিয়ে কেবল গরু-মোষের গাড়িই চলাচল করছে না। নদীর কোথাও কোথাও বড় চড় চর পড়েছে। ইরি-বোরো ধানের আবাদ হচ্ছে পদ্মার বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতে। মানুষজন পায়ে হেঁটে পারাপার হচ্ছে এককালের প্রমত্তা পদ্মানদী। একাত্তর সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের দিনগুলোতে আমার এক বন্ধু হযরত ইসলামের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল পদ্মার ওপাড়ে তার আত্মীয়ের বাড়ি যাবো। কিন্তু পদ্মা পার হবার জন্য যেই নৌকার কাছে গেছি, নদীর উত্তাল ঢেউ ও এর বিশালতা দেখে নৌকায় ওঠবার সাহস আর আমার হয়নি। আমি বন্ধু ও তার স্ত্রীকে নৌকায় উঠিয়ে দিয়ে দিনাজপুর ফেরৎ চলে আসি। সেই পদ্মায় এখন মানুষ হেঁটে পারাপার হয়। গরু-মোষের গাড়ি চলে। সত্যি বিশ্বাস করবার মতো নয়।
পদ্মা ভারত ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য নদী। এ আন্তর্জাতিক নদীর পানি ভারত কর্তৃক একতরফা প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের বিরাট অংশ মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। বাংলাদেশের দাবির প্রতি কোনও গুরুত্ব দিচ্ছে না আমাদের প্রতিবেশী দেশটির সরকার। শুধু পদ্মা নয়, তিস্তাসহ আরও সব নদীতে বাঁধ ও গ্রোয়েন নির্মাণ করে ভারত পানি প্রত্যাহার করছে। ফলে এসব নদনদীর ভারতীয় অংশে পানি থৈ থৈ করলেও ভাটির দেশটি করছে পানির জন্য হাহাকার। এদেশের ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গাছগাছালি মরে যাচ্ছে। পানির স্তর যাচ্ছে নিচে নেমে। টিউবওয়েল ও ডিপ টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। বাংলাদেশের ইরিগেশন প্রকল্পগুলো ব্যর্থ হতে চলেছে। দু’এক বছর পরপরই চাপকল ও ডিপটিউবওয়েলের গভীরতা বাড়ানো হচ্ছে পানির জন্য। কলে আরসেনিক বিষের দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে সেচের পানিতেও। আমার প্রিয় নদী টাঙ্গনসহ ধরলা, আত্রাই, মহানন্দা, ঢেপা, কাঞ্চন, পুনর্ভবা, নাগর, তুলাই, সেনুয়া, তিরনাই সব নদী পানিশূন্য। বড় নদীগুলোর ভারতীয় অংশে বাঁধ, গ্রোয়েন ইত্যাদি দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেবার ফলে যেসব নদনদীর উৎস্যস্থল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সেগুলোতেও তার প্রভাব পড়েছে। সেগুলোর প্রায় সবটিই এখন পানিশূন্য। সেচের মাধ্যমে এসব নদীতে এখন কৃষিকাজ চলছে। বড় বড় বিল ও পুকুরগুলোও শুকিয়ে গেছে। বিল-ঝিলের সব প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্ত। চলনবিলও শুকিয়ে যাচ্ছে। এ বিল থেকেও দেশী প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
উত্তরাঞ্চলের কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। ফলন আগের মতো হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় সেচ, সার দিয়েও সুফল মিলছে না। ফসলে পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়ছে প্রতিবছর। প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শীতকালে বাড়ছে শীত। গরমকালে বাড়ছে গরম। কখনও কখনও এর উল্টোটাও দেখা যাচ্ছে। যেমন তীব্র শীতের মধ্যে হঠাৎ করে গরম পড়তে শুরু করে। আবার গ্রীষ্মকালে রাতের বেলা কখনও কখনও এমন শীত পড়ে যে কাঁথা-কম্বলের দরকার হয়। অর্থাৎ প্রকৃতিও হচ্ছে চরমভাবাপন্ন।
উত্তরাঞ্চলসহ দেশের নদনদী শুকিয়ে যাবার ফলে কেবল ভূগর্ভের পানিস্তরই নেমে যাচ্ছে না, এর প্রভাবে যেমন ফসল উৎপাদন কমছে, তেমনই বনভূমি কমছে। আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, জামরুল, আতা, বেল প্রভৃতি গাছের আকার হচ্ছে ছোট। শুধু গাছের আকারই ছোট হচ্ছে না। এসব ফলের আকার-আকৃতিও ছোট হচ্ছে। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার করেও সুফল মিলছে না। স্বাদেও ঘটছে পরিবর্তন। ফলবান গাছ ও ফলের আকার-আকৃতিই ছোট হচ্ছে এমন নয়, পশু-পাখি এমনকি মানুষের আকারও নাকি ছোট হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে বামন অর্থাৎ খর্বাকৃতির মানুষ বেশি চোখে পড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মানুষের রোগবালাইও বাড়ছে আগের তুলনায় বেশি। সাধারণ রোগের চিকিৎসা করতেও দামি দামি ওষুধ বেশি দিন ধরে প্রয়োগ করতে হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, এসব হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে। এ পরিবর্তনের মধ্যে মরুকরণ প্রক্রিয়া হচ্ছে অন্যতম। মরু অঞ্চলে যেসব প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটে, তেমনটিই নাকি ধীরে হলেও বাংলাদেশে ঘটছে। বিশেষত দেশের উত্তরাঞ্চলে এ লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমান্বয়ে।
দেশের প্রকৃতি ও এর পরিবেশ ভারসাম্যহীন এবং বিরূপভাবাপন্ন হচ্ছে ধীরলয়ে। এ জন্য দীর্ঘ ও সুদূরপ্রসারী কর্মসূচিগ্রহণ করা দরকার। সে বিষয়ে আমাদের নেতৃবৃন্দের তেমন আগ্রহ দেখা যায় যায় না দুর্ভাগ্যজনকভাবে। তারা কেবল কাদা ছোড়াছুড়ি নিয়ে মেতে আছেন। বিশেষ করে বিনাভোটে এবং বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাগ্রহণকারীরা কাদা ছোড়াছুড়ি ও প্রতিপক্ষ রাজনীতিকদের দমনে খুব তৎপর। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা তাদের মাথায় তেমনটা আসে না। ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শপথগ্রহণের পরপরই নাকি বাংলাদেশ সফরে এসে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে সই করবেন বলে একশ্রেণির মিডিয়া যেন অতি উৎসাহী হয়ে নিউজ ক্রিয়েট করেছেন। কিন্তু আমাদের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এমন তথ্য জানা নেই বলে খবর পাওয়া গেল।
গুম, খুন ও অপহরণের ঘটনায় দেশের মানুষ আতঙ্কিত। এ নিয়ে জনগণের ভোট ছাড়া গঠিত সরকারও বেশ বিব্রত বলে মনে হচ্ছে। গোটাদেশ এখন অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত। নারায়ণগঞ্জ, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের ঘটনা আরও আমাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। এমতাবস্থায় রাজনীতিতে স্বস্তিকর বারিবর্ষণ কখন হবে, কে জানে।
ইসমাঈল হোসেন দিনাজী 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads