শনিবার, ১০ মে, ২০১৪

না’গঞ্জের ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি


নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও এডভোকেট চন্দন সরকারসহ সাত খুনের বীভৎস ঘটনায় সারা দেশে শুধু ভীতি-আতঙ্কই ছড়িয়ে পড়েনি, তীব্র প্রতিবাদও উঠেছে। দাবি উঠেছে ঘাতকদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার এবং কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে হত্যাকা-ের জন্য সরাসরি সরকারকে দায়ী করা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একজন মন্ত্রী এবং তার পুত্র ও জামাতার নাম প্রকাশিত হয়ে পড়ায় সরকারের পক্ষে দায় এড়ানোর আর কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানও ক্ষমতাসীনদের দিকেই আঙুল তুলেছেন। তিনি সেই সাথে ঘাতকদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। ওদিকে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের নেতারা বলেছেন, হত্যাকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগে শুধু চাকরিচ্যুত করলে কিংবা অবসরে পাঠালেই চলবে না, অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দিতে হবে। গত শুক্রবার নিহতদের পরিবার সদস্যদের সান্ত¦না দেয়ার উদ্দেশে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ নেতৃবৃন্দ সরকারের পাশাপাশি র‌্যাবের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছেন। বলেছেন, খুন ও অপরাধ প্রতিরোধের জন্য যে এলিট বাহিনী গঠিত হয়েছিল সে র‌্যাবের বিরুদ্ধেই যখন গুম ও হত্যার অভিযোগ উঠে তখন বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই বিস্তারিত তদন্ত করা এবং র‌্যাবের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের নেতাদের বক্তব্যে গত বছর নারায়ণগঞ্জে নিহত মেধাবী ছাত্র ত্বকীর হত্যাকা-ও উঠে এসেছে। নেতারা বলেছেন, ত্বকী হত্যাকা-ের যদি সঠিক তদন্ত করা হতো এবং ঘাতকদের যদি বিচার করা ও শাস্তি দেয়া হতো তাহলে সাত খুনের মতো বীভৎস ঘটনা ঘটতে পারতো না। কিন্তু ঘাতকরা চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও নিতান্তই রাজনৈতিক তথা দলবাজির স্বার্থে সরকার ত্বকী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দিয়েছে। সে কারণেই নারায়ণগঞ্জের ঘরে ঘরে সন্ত্রাস ও গডফাদারদের জন্ম হচ্ছে। তাদের অপরাধও কল্পনার সকল সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পেশাজীবী নেতারা অভিযোগ করেছেন,  একই দলবাজির স্বার্থে সাত খুনের অপরাধীদেরও আড়াল করার এবং পার করে দেয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু সরকারের এবারের চেষ্টা সফল হতে দেয়া হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ঘাতকদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আন্দোলন চলবে। এই আন্দোলনে সকল রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজকেও এমনভাবে সম্পৃক্ত করা হবে যাতে সরকারের কোনো অপকৌশলই সফল হতে না পারে।
আমরা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের দাবি ও মূল কথাগুলোর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করি। বস্তুত, যে কোনো পর্যালোচনায় একথা অনস্বীকার্য হয়ে উঠবে যে, কোনো একটি হত্যাকা-েরও তদন্ত ও বিচার না হওয়ার কারণেই দেশে গুম ও গুপ্তহত্যা বন্ধ হচ্ছে না বরং দিন দিন শুধু বেড়েই চলছে। এ ব্যাপারে সরকারের অংশগ্রহণের বিষয়টিও প্রথম থেকেই প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে সরকারের হত্যার অভিযান সম্পর্কে দেশের মানুষ তো বটেই, জেনে গেছেন এমনকি বিদেশীরাও। এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ্বং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা প্রায় নিয়মিতভাবেই আপত্তি ও প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে। মাত্র দু’দিন আগেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে অবিলম্বে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাতকা- বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হলো, দেশে-বিদেশে এত আলোড়ন উঠলেও এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থার পক্ষ থেকে হত্যা বন্ধের দাবি জানানো হলেও সরকার এখনো নির্বিকারই রয়েছে। কথা শুধু এটুকুই নয়। অবসর ও অকালীন অবসরের আড়ালে ঘাতক হিসেবে অভিযুক্তদের পার পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছেÑযেমনটি বলেছেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের নেতারা। প্রসঙ্গক্রমে র‌্যাবের বিরুদ্ধেও অভিযোগের পাহাড় তৈরি হয়েছে। গতকালকের দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, র‌্যাবের বিরুদ্ধে প্রায় ১৯৫১টি অভিযোগ রয়েছে। একই কারণে র‌্যাবের বিলুপ্তি ঘটানোর দাবিও দিন দিন জোরদার হচ্ছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুতর। কারণ, ভয়ঙ্কর ধরনের অপরাধ দমন ও প্রতিরোধ করার প্রধান উদ্দেশ নিয়েই চারদলীয় জোট সরকারের সময় এলিট ফোর্স হিসেবে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সন্ত্রাস দমন এবং আওয়ামী পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিদের গ্রেফতার করার ও বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর মতো সফল তৎপরতার মাধ্যমে র‌্যাব তার মূল উদ্দেশ অনেকাংশেই অর্জন করেছিল। সাফল্যের এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকতো যদি আওয়ামী লীগ সরকার র‌্যাবকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের কাজে ব্যবহার না করতো। অন্যদিকে বহুবার প্রমাণিত সত্য হলো, র‌্যাবকে সরকার সম্পূর্ণরূপেই রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূলে কাজে ব্যবহার করেছে। এখনো সরকারের নীতি ও কর্মকা-ে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। একই কারণে র‌্যাব সদস্যদের মধ্যেও লোভের বিস্তার ঘটেছে, যে সম্পর্কে অভিযোগ উঠেছে নরায়ণগঞ্জের ঘটনায়।
আমরা মনে করি, এমন অবস্থা চলতে পারে না। সরকারকে অবশ্যই র‌্যাবসহ প্রতিটি বাহিনীর লাগাম টেনে ধরতে হবে। বলা বাহুল্য, এটা তখনই সম্ভব যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সরকার নিজে অন্তত র‌্যাবকে ব্যবহার না করবে। আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে এটা আশা না করা গেলেও এরই মধ্যে পরিস্থিতির এত বেশি অবনতি ঘটে গেছে যে, সরকারের সামনেও পথ আদৌ খোলা নেই। আমরা আশা করতে চাই, পরিস্থিতি একেবারে নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই সরকার গুম ও গুপ্তহত্যা বন্ধের ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠবে। র‌্যাবকেও সংযত করবে। আমাদের মতে, সত্যিই নিজেদের নীতি ও কর্মকা-ে পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের হত্যকা-ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে একটি শুভ সূচনা করতে পারেন ক্ষমতাসীনরা।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads