মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১২

ফুটানির সফরে প্রধানমন্ত্রীর ফালতু কথাবার্তা



সি রা জু র র হ মা ন
রাত সোয়া একটা পর্যন্ত জেগে টেলিভিশনে দেখছিলাম সে অনুষ্ঠান। তৃতীয়বার অলিম্পিক অনুষ্ঠানের গৌরব ব্রিটেন ছাড়া আর কেউ পায়নি। সারা বিশ্বের এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) মানুষ আমার মতো টেলিভিশনে ৩০তম অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন দেখেছেন। প্রায় একবাক্যে সবাই বলেছেন, অপূর্ব হয়েছিল সে অনুষ্ঠান।
আমার বাড়ি থেকে আনুমানিক ১২ মাইল দূরে হবে অলিম্পিক পার্ক। শত ঝামেলা করে সশরীরে গিয়ে সে অনুষ্ঠান দেখার কথা মনেও হয়নি। অন্য একশ’ কোটির মতো আমিও বাড়িতে বসেই দেখেছি। ২০৪টি দেশ এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। অর্ধেকেরও রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। সবচাইতে বেশি সংখ্যক ক্রীড়াবিদ এসেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সে দেশের প্রেসিডেন্টও আসেননি। তবে তার স্ত্রী এসেছিলেন। যদ্দূর মনে হয়, তিনি খুবই উপভোগ করেছেন এ অনুষ্ঠান।
বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটে আছে। বাংলাদেশের নাক অবধি ঋণ বিশ্বব্যাংকের কাছে। বিশ্বব্যাংক গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সরকারকে বলেছে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে, কাজ বরাদ্দ করা বাবতই একটি কোম্পানির কাছে ১০ শতাংশ ঘুষ চাওয়া হয়েছিল। ব্যাংক বলেছে মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, যোগাযোগ সচিব ও প্রকল্প পরিচালক এবং একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ দুর্নীতির জন্য দায়ী। ব্যাংক তখনই এর প্রতিকারের দাবি জানিয়েছিল। তারপর থেকে তাদের অবস্থান ক্রমেই আরও কঠোর হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে লিখিত সর্বশেষ চিঠিতে বিশ্বব্যাংক চারটি শর্ত তুলে ধরেছে, বলেছে সে শর্তগুলো পূরণ না হলে তারা পদ্মা সেতুর জন্য প্রতিশ্রুত ১.২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) ডলার অর্থায়ন করবে না।
তখন থেকেই সে চিঠি প্রকাশের দাবি দেশজোড়া। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর এলেন গোল্ডস্টেইনও বলেছেন, সরকার যদি চিঠির বিবরণ প্রকাশ করে তাহলে ব্যাংকের দিক থেকে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সরকার সে চিঠি প্রকাশ করছে না এবং করবেও না, কেননা চিঠিতে যেসব বিস্তারিত বিবরণ ও প্রমাণ আছে, সেগুলো প্রকাশ করলে শুধু মন্ত্রী কিংবা সচিবই নয়, রুই-কাতলার হাতেও দড়ি পড়বে। বহু ধানাই-পানাই করে সচিব ও প্রকল্প পরিচালককে ছুটি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, মন্ত্রী আবুল হোসেনও পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন কিন্তু তার ক্ষেত্রেও মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অথবা উপমন্ত্রী সোহেল তাজের মতো জাতিকে প্রতারিত করা হবে কিনা কে জানে?
অন্যান্য বহু বিষয়ের মতো এ ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ওয়াজেদ গোড়া থেকেই জাতিকে প্রতারিত করার সব রকম চেষ্টা করছেন। একবার তিনি বলছেন দুর্নীতিবাজ হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, তার সরকার নয়। বিভিন্ন সময়ে তিনি ব্যাংককে প্রতারক বলেছেন, বলেছেন যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীন ব্যাংকের প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ায় ইউনূসের হুকুমে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বাতিল করেছে বিশ্বব্যাংক। সেদিন লন্ডনে এসে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বব্যাংক ‘পার্সেন্টেজ খায়’। হাসিনা ওয়াজেদ বিশ্বাস করতে পারেন না যে বাংলাদেশের শিশুরাও আর তার কথা বিশ্বাস করে না।
আসলে আজ তার লন্ডন সফরের কথাই বলতে চাইছি। হাসিনা ওয়াজেদের অনেকগুলো দুর্বলতার মধ্যে দুটো হচ্ছে ফুটানি-প্রীতি আর বিশ্বভ্রমণের বাসনা। এ দুটি দুর্বলতার একজন ভাগীদার জুটেছেন তার। তিনি হচ্ছেন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি। এরা যত বেশি বিদেশ সফর করছেন, বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম ততই বেশি মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে।
বিশ্ব ব্যাংককে ভীতি প্রদর্শন
প্রধানমন্ত্রী এবং তার সরকার বিশ্বব্যাংককে ভয় দেখাতে চান। তারা ঘন ঘন হুঙ্কার ছাড়ছেন, নিজেদের সম্পদ থেকেই পদ্মা সেতু তৈরি করা হবে। খুবই ভালো কথা বাপু। সম্পদ যদি থাকে তাহলে পরের দুয়ারে ভিক্ষা করতে যাওয়া কেন? আর ভিক্ষা না পেলে কান্নাকাটি আর গালাগালিরই বা দরকার কী? সম্পদ নেই বলেই প্রধানমন্ত্রী যখন ফুটানি করতে সদলবলে লন্ডনে সফর করছেন, তখন তার অর্থমন্ত্রী জাইকার (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি) প্রেসিডেন্টের কাছে টেলিফোন করছেন, বিশ্বব্যাংকের কাছে দেন-দরবার করতে তাকে অনুরোধ করছেন। জানা গেছে, সে দূতিয়ালিতে কোনো কাজ হয়নি। বিশ্বব্যাংকের মন গলেনি, তারা জেদ ধরে আছে তাদের সবগুলো শর্ত পূরণ না হলে তারা সেতুর জন্য টাকা দেবে না। বিশ্বব্যাংক না দিলে যে অন্য কোনো সূত্র থেকেও ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেকথাও বিশ্ববাসীর এবং বাংলাদেশের মানুষের জানা হয়ে গেছে।
হাসিনা ওয়াজেদ লন্ডনে সবচাইতে ব্যয়বহুল একটা হোটেলে উঠেছেন এবং সবাই জানেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিংবা সৌদি বাদশার মতো বিরাট দলবল নিয়ে সফর করতে ভালোবাসেন। বাংলাদেশের মিডিয়ায় (তার সফরসঙ্গী কর্মচারীদের পাঠানো) ‘খবর’ অবিরাম প্রচারিত হচ্ছে। ‘প্রবাসীদের’ জন্য প্রধানমন্ত্রীর অমর বাণীগুলো পাহাড়ি নদীর মতোই বেগময়ী স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের একটা প্রধান ‘রণক্ষেত্র’ ছিল যুক্তরাজ্য। এদেশে কেউ কেউ এখনও ভুল ধারণায় ভুগছেন যে, আজকের আওয়ামী লীগ আর একাত্তরের আওয়ামী লীগ একই প্রতিষ্ঠান। অর্থাত্ এখনও কিছু প্রবাসী বাংলাদেশী ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে অথবা সঠিক তথ্যাদির অভাবে আওয়ামী লীগ ও হাসিনা ওয়াজেদের সমর্থক। কিন্তু শুধু তারাই ‘প্রবাসী বাংলাদেশী’ নন। যুক্তরাজ্যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে বর্তমান সরকারের বিরোধী ও সমালোচকরা সংখ্যায় অনেক বেশি। এসব দেশে আজকাল তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে নির্বাচন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ইলিয়াস আলীকে গুম করা ইত্যাদি বহু ইস্যুতে প্রায়ই যেসব সভা-সমাবেশ ও মিছিল হচ্ছে, সেগুলো অবশ্যই সরকারের সমর্থনহীনতার প্রমাণ। বর্তমান সফরে লন্ডনেও হাসিনার বিরুদ্ধে জনরোষ উথলে উঠেছে। এমনকি প্রতিবাদকারীদের বিক্ষোভ এড়াতে পেছনের দরজা দিয়ে তাকে হোটেলে ঢুকতে হয়েছে।
দেখা যাক কী ‘অমর বাণী’ তিনি শোনাচ্ছেন তার ক্ষীয়মান সমর্থকদের! আগেই বলেছি, আবারও তিনি বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রচুর বিষোদ্গার করেছেন, বলেছেন বিশ্বব্যাংক ‘পার্সেন্টেজ খায়’। মাথায় যাদের এতটুকু ঘিলু আছে তাদের আর বুঝতে বাকি নেই যে ধরা পড়ে গেলে চোর যেমন অন্যদের দিকে আঙুল তুলে ‘চোর চোর’ বলে চিত্কার শুরু করে দেয়, বর্তমান সরকার আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরও হয়েছে সেই দশা। নইলে তারা কেন বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ও প্রমাণাদি সংবলিত চিঠিটি দেশের মানুষের অবগতির জন্য প্রকাশ করছেন না? বাংলাদেশের মানুষকে তিনি এবং তারা কি এতই বোকা ভাবেন যে, সবকিছু দিবালোকে প্রকাশ পেলে কে চোর আর কে দোষী বিচার করার ক্ষমতা তাদের নেই?
সেতু তৈরি কোন সম্পদ থেকে?
হাসিনা ওয়াজেদ লন্ডনেও অবশিষ্ট সমর্থকদের বলে যাচ্ছেন যে বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ থেকে তিনি পদ্মা সেতু তৈরি করবেন। বর্তমান সময়ে দেশের সম্পদ থেকে এ সেতু তৈরি যে কেন সম্ভব নয়, বিশেষজ্ঞ এবং চিন্তানায়করা সেটা বার বার বলে যাচ্ছেন। অনেকগুলো অবাস্তব প্রস্তাবের একটি হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রী-দফতরের বাজেটের টাকা নিয়ে সেতু তৈরি করা। এমনিতেই অর্থাভাবে সরকারের বিভিন্ন অঙ্গের অবস্থা ঝড়ের কাকের মতো। এমনকি সরকারের দৈনন্দিন কাজকর্ম চলছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত অর্থ ঋণ নিয়ে। তার ওপর দফতরগুলোর বাজেট ছিনতাই করা হলে তাদের কাজকর্ম অচল হয়ে যাবে না কি?
এটাও জানা কথা যে বহু দফতরের কাজকর্ম এবং প্রকল্পগুলো চলছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর ঋণের অর্থে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিরোধের সুসমাধান না হলে তারাও ঋণদান বন্ধ ও স্থগিত করবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। এমনকি সরকারের নৈমিত্তিক ব্যয় নির্বাহের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের স্বীকৃত ঋণের চলতি বছরের কিস্তি নিয়েও নাকি অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় নিজস্ব সম্পদ থেকে অত বড় প্রকল্প কার্যকর করার কথা শুধু উন্মাদেই ভাবতে পারে। একচক্ষু হরিণের মতো শুধু সেতু তৈরির দিকে সব সম্পদ ঠেলে দিলে অন্য বহু দিক যে তলিয়ে যেতে পারে, সেকথা সরকার একবারও ভেবে দেখছে না। প্রস্তাবিত সেতু তৈরির যন্ত্রপাতি, উপকরণ ইত্যাদি বাবত যে বিরাট অংকের বিদেশি মুদ্রার প্রয়াজন হবে, সেটা কী করে দেশীয় সম্পদ থেকে পাওয়া যাবে সেকথা সরকার বলছে না।
বিগত সাড়ে তিন বছরে দুর্নীতির ‘ওজিএল’ (ওপেন জেনারেল লাইসেন্স) দিয়ে দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। আওয়ামী লীগ গুণ্ডা-পাণ্ডাদের চাঁদাবাজিতে সব মানুষ অতিষ্ঠ, সর্বহারা হয়ে গেছে বহু মানুষ। এখন আবার পদ্মা সেতুর জন্য চাঁদা তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তে চাঁদাবাজিকে বৈধ করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হলো। চাঁদার টাকার কতটা সেতু তৈরির অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে, সে সম্পকূে সবারই সন্দেহ আছে।
আবারও প্রবাসী শোষণ?
প্রবাসীরা বিদেশ-বিভূঁইয়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে অর্জিত অর্থের একটা বড় অংশ দেশে পাঠান। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, তারা যদি আরও বেশি করে রেমিট্যান্স পাঠান তাহলে তিনি পদ্মার ওপর সেতু তৈরি করে দেবেন এবং সেজন্য চাঁদা তুলতে হবে না। আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে হলে প্রবাসীদের অনেককে না খেয়ে থাকতে হবে। তারা কি তখন জানতে চাইবেন না যে বিগত সাড়ে তিন বছরে যে রেমিট্যান্স তারা পাঠিয়েছেন সেটা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে? তারা কি জবাবদিহি চাইবেন না যে তাদের রেমিট্যান্সের কত অংশ প্রধানমন্ত্রী এবং তার আত্মীয়-স্বজন ও চেলাচামুণ্ডাদের বিলাসবহুল বিদেশ সফরে ব্যয় করা হয়েছে? পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির অনর্থক বিদেশ সফরেই বা কী পরিমাণ অর্থ ব্যয়িত হয়েছে? দেশের মানুষকে এবং প্রবাসী কর্মীদের যথাসর্বস্ব দান করার আগে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে বিলাস এবং বাহুল্য ব্যয় বর্জন করতে হবে।
অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবনে বসেও দেখতে পারতেন। সেজন্য তার এই ব্যয়বহুল সফরের এতটুকু প্রয়োজন ছিল না। এটা নিতান্তই অবান্তর ফুটানির সফর ছিল। বিগত সাড়ে তিন বছরে ফুটানি বাবত যে বিদেশি মুদ্রা ব্যয়িত হয়েছে, সেটা পদ্মা সেতু নির্মাণের বিদেশি মুদ্রা চাহিদার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মেটাতে পারত।
আমাদের ধর্ম কাহিনীতে আছে, এক ব্যক্তি ছেলেকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ্র (সা.) কাছে এসেছিলেন। ছেলেটি মিষ্টি খেতে ভালোবাসে, কিন্তু রোজ রোজ মিষ্টি কেনার সামর্থ্য পিতার ছিল না। রাসুলুল্লাহ্ (সা.) আবার ছেলেকে নিয়ে আসার জন্য একাদিক্রমে দুটি তারিখ দিয়েছিলেন লোকটাকে। তারপর ছেলেটিকে পিতার সামর্থ্যের অভাবের কথা বুঝিয়ে বলে মিষ্টির জন্য জেদ না করার পরামর্শ দেন। মহানবী তখন লোকটাকে বলেছিলেন, তিনি নিজেও মিষ্টি খুবই পছন্দ করতেন, নিজের বাসনাকে সংযত না করে ছেলেটিকে উপদেশ দিলে কোনো কাজ হবে না জেনেই তিনি লোকটাকে একাধিকবার আসতে বলেছিলেন। শেখ হাসিনা নিয়মিত নামাজ পড়েন বলে তার কোনো কোনো অনুসারী দাবি করে থাকেন। তারা তাদের নেত্রীকে মহানবীর দৃষ্টান্ত অনুকরণের পরামর্শ দিলে ভালো করবেন।
ব্রিটিশ রাজনীতিকরা পীরের মুরিদ নন
প্রধানমন্ত্রীর সহযাত্রী কর্মচারীদের পাঠানো খবরাদিতে শুধুই দেখা যায় হাসিনা ওয়াজেদ ব্রিটিশ রাজনীতিকদের কী কী বলেছিলেন। মনে হতে পারে যে পীরের দরগায় এসে মুরিদরা সদুপদেশ শুনে সন্তুষ্ট হৃদয়ে ঘরে ফিরে গেছেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সর্বদলীয় কয়েকজন সদস্যকে এবং বিরোধী লেবার পার্টির নেতা এড মিলিব্যান্ডকে তিনি নাকি হিসেব দিয়েছেন যে তার বর্তমান সরকারের সাড়ে তিন বছরে ৫২০০ বিভিন্ন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে নির্বাহ হয়েছে। অর্থাত্ তিনি তাদের বিশ্বাস করাতে চেয়েছেন যে তার সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন হলে সে নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে।
ব্রিটিশ রাজনীতিকরা কি পাল্টা কিছুই বলেননি হাসিনা ওয়াজেদকে? তারা কি একথা তাকে বলেননি যে, সেসব নির্বাচনে হাসিনার গদি চলে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা ছিল না? তারা কি বলেননি যে, হাসিনা যে তার পিতার মতো বাকশালী কায়দায় চিরস্থায়ীভাবে গদি আঁকড়ে থাকতে চান সেটা তারা জানেন? তারা কি হাসিনা ওয়াজেদকে স্মরণ করিয়ে দেননি যে, বাংলাদেশে এখন প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলারক্ষী বাহিনীগুলো, এমনকি বিচার ব্যবস্থাও এমন সম্পূর্ণভাবে দলীয়কৃত হয়েছে যে এ সরকারের আমলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই?
বর্তমান ইন্টারনেট প্রযুক্তির কল্যাণে বাকি বিশ্বের মতো বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কেও ব্রিটিশ রাজনীতিকরা খুবই অবগত আছেন। তাছাড়া বিরাট বাংলাদেশী সমাজের সঙ্গে ভোটের জন্য এবং জনসংযোগের জন্য তাদের যোগাযোগ নিয়মিত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ব্রিটিশ ও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সমীক্ষাগুলো তারা নিয়মিত পড়েন। বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূতভাবে কয়েকশ’ মানুষের হত্যা, শ’দুয়েক মানুষের গুম হয়ে যাওয়ার পেছনে র্যাব ও পুলিশের ভূমিকা ইত্যাদি মোটেই তাদের অজানা নয়। পার্লামেন্টের সর্বদলীয় গ্রুপ সম্মিলিত এবং পৃথকভাবে ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন। তারা যে সে প্রসঙ্গ প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করেননি, বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের পাঠানো খবরাদিতে তার কোনো উল্লেখ আছে কি?
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বিশেষজ্ঞ ও চিন্তানায়করা মিডিয়ায় বহু মন্তব্য করেছেন, বহু কলাম লিখেছেন। এমনকি শহীদ মিনারে সভাও করেছেন তারা। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী আবুল হোসেনকে এমন একটি দফতরে বদলি করেছিলেন যেখানে দুর্নীতির ক্ষেত্র ও সুযোগ নাকি আরও প্রশস্ত। আবুল হোসেন এখন পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, যদিও প্রধানমন্ত্রী এখনও সে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি। কিন্তু লন্ডনে তিনি বলেছেন, আবুল হোসেন দেশপ্রেমের কারণেই পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশের মানুষ এখন শাসক মহলে দেশপ্রেমের তীব্র অভাব বোধ করছে। এ সময়ে পদত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী তার দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে পারেন। (লন্ডন, ২৯.০৭.১২)
serajurrahman34@gmail.com

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads