শনিবার, ৪ মে, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

পরিস্থিতি উত্তরণে সহায়ক হবে না


অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের সাথে সংলাপের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তাতে আগের অবস্থান থেকে সরে আসেননি বরং তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, নীতিগত প্রশ্নে আপস করবেন না। বিরোধী দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সংলাপে বসতে রাজি বলে জানিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সব দল নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে তার আগের মতোই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিরোধী দলের সাথে এখনো ক্ষমতাসীন দলের নীতিগত অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে সংলাপের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে বড় ধরনের অগ্রগতি হবেÑ এমনটা আশা করা যায় না। ইতোমধ্যে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার বিরোধী আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের নামে ফাঁদ পাতা হয়েছে। এই ফাঁদে বিরোধী দল পা দেবে না। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠনে সরকারপক্ষ বিরোধী দল সংলাপে যাবে এটাই বিরোধী দলের মুখ্য দাবি।

অপর দিকে প্রধানমন্ত্রী হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, এই দাবির অনেক কিছুই বর্তমানে কার্যকর আছে। হেফাজতে ইসলামের প্রধান দাবি সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ থাকার পর এর আর প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না। একই সাথে মহানবী সা:-এর অবমাননাকারীদের শাস্তির আইনের ব্যাপারেও তিনি বলেছেন, বিদ্যমান আইনে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি দেয়া সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে হেফাজতে ইসলাম দাবি করেছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করতে প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। দাবি আদায়ে হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন গতানুগতিক রাজনৈতিক কোনো আন্দোলন নয়। তাদের দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর আরো সংবেদনশীলতার সাথে বিবেচনা করা উচিত ছিল। শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনকে ঘিরে হেফাজতের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। মহানবী সা:কে নিয়ে অবমাননাকর লেখালেখির সাথে শাহবাগের ব্লগারদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা দরকার।
বিরোধী দলের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাব ও হেফাজতে ইসলামের দাবির ব্যাপারে সরকারের অবস্থান কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। বরং উভয় পক্ষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এ অবস্থায় বিরোধী দলের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আরো সঙ্ঘাত ও সহিংসতার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
আমরা আশা করি, সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের সাথে সংলাপের ব্যাপারে আন্তরিক হওয়া উচিত। এজেন্ডা ঠিক করে দ্রুত আলোচনা শুরু করা দরকার; না হলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে। একই সাথে হেফাজতে ইসলামের দাবি নিয়েও সরকারকে ইতিবাচক ভূমিকা নেয়া উচিত। এসব দাবি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতের প্রতিফলন।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

খালেদা জিয়ার উদারতা অভিনন্দনযোগ্য


প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ২ মে ডাকা হরতাল স্থগিত করেছেন জোটপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া। এতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের প্রতি তিনি যে উদারতা দেখিয়েছেন তা অভিনন্দনযোগ্য। এটি আমাদের সবার জন্য আজ অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। শুধু তা-ই নয়, এর মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকে যথাযথ সম্মানও দেখিয়েছেন। তার এই মহানুভবতার জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিরোধী দলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন তার অনুরোধে সাড়া দেয়ায় এবং হরতাল প্রত্যাহার করায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ গত মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন। এতে আমরা সাধারণ জনগণ বেশ খুশি। জাতি আজ দেশের এই ক্রান্তিকালে তা-ই আশা করে উভয় দল থেকে।

রাজনৈতিক এত উত্তাপ ও অস্থিরতার মধ্যে উভয় দলের এই মনোভাব আমাদের আশার সঞ্চার করে। তবে এবার আমরাও প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাবো বিরোধী দলের আহ্বানে আন্তরিক সাড়া দিতে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াও সেটা চেয়েছেন উদার মনে। তিনি বলেছেন আমরা যেভাবে জাতীয় স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছি, আশা করি জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীও সেভাবে সাড়া দেবেন, সংলাপ ও আলোচনায় উদ্যোগী হবেন। কী সুন্দর আহ্বান বিরোধীদলীয় নেত্রীর! তাই তাকে জানাই আবারো সশ্রদ্ধ অভিবাদন ও সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ।
এখন যদি প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বানে সাড়া দেন তাহলে দেখা যাবে সংলাপে বসার একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। এখন আমাদের প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী এতে সাড়া দেবেন কি? সংলাপ তো সবাই চায়। আলোচনার মাধ্যমেই তো সব সঙ্কটের সমাধান হয়। সরকারদলীয় লোকেরাও বোঝেন, সংলাপ ও ঐকমত্য ছাড়া এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। সেটা আজ হোক কাল হোক, সংলাপ বা আলোচনার একটি পথ খুঁজে বের করতেই হবে। এটাই উত্তম সময় সংলাপে বসার উভয় দলের জন্য। উভয় প থেকে কিছুটা হলেও মৃদু সাড়া পাওয়া গেছে। দীর্ঘ দিনের উষ্ণতা, দীর্ঘ দিনের নীরবতা ও সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে এটি শুভলণ ও ইতিবাচক দিক বলে মনে হয়।
তবে উভয় দলকে বেশ কিছু ছাড় দিতে হবে; নইলে ল্েয পৌঁছানো কষ্টকর হবে। তবে সরকারি দলকে এ েেত্র অনেক উদার হতে হবে, অনেক নমনীয় হতে হবে। অনেক ছাড়ও দিতে হবে। কারণ এরা মতায় আছেন এবং তাদের কাছে সংলাপে বসার উপযুক্ততাও আছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে এটাই হয়। জেদ বা অনমনীয়তা কোনো দলের জন্য মঙ্গল আনবে না। জনগণ এতে তিগ্রস্ত হবে অনেক বেশি; এর মধ্যে অনেক হয়েছেও। আর তি নয়। এতে সঙ্ঘাত ও নৈরাজ্য আরো বেড়ে যাবে। এমনকি সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। তাই বলা দরকার শুধু উভয় দল নয়, জাতীয় পার্টিসহ ছোট-বড় অন্যান্য দলকেও সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে। এতে সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এটিই হচ্ছে গণতান্ত্রিক নিয়ম বা প্রক্রিয়া, যা আগামী দিনে নির্দলীয় নিরপে নির্বাচনের জন্য এটিই হবে উত্তম রোডম্যাপ। তাই তো বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ড মিল মহামতি বুদ্ধের মতো কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য অধিক জনগণের অংশগ্রহণ ও অধিক মানুষের সুখের কথা বলেছিলেন। তার ভাষায় তিনি বলেছিলেনÑ Greatest happiness for the greatest number of the people| আমাদের দেশের এই মুমূর্ষু অবস্থায় তার
বুঝি না, সংলাপে যেতে সরকারি দলের অসুবিধা কোথায়? অযথা কেন কালপেণ করা হচ্ছে? সংলাপ, সমঝোতা, ঐকমত্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা এই গুণগুলো তো গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। এগুলোকে বাদ দিয়ে কিছুই করা যাবে না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারও হবে না। শুধু মুখে মুখে আমরা গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালে চলবে না। এটাকে কার্যকর ও ক্রিয়াশীলও করতে হবে। যদি করতেই হয় তাহলে ওই গুণগুলোর প্রয়োজন রয়েছে অনিবার্যতায়। নেবে কে এ দায়িত্ব? নিতে হবে এ দায়িত্ব আমাকে, আপনাকে, সরকার ও বিরোধী দলকে।
অতীতের ঘটনা কি আমাদের মনে নেই? জোর করে কোনো কিছু করলে এর পরিণাম হয় ভয়াবহ। সরকারি দল শক্তি প্রয়োগে অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু এগুলো টেকে না বেশি দিন। অতীতের অভিজ্ঞতা তো আমাদের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে এর খেসারত দিতে হয় এ দেশের নিরীহ জনগণকে। এটা আমরা কখনো চাই না। দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোও বারবার সংলাপে বসার আহ্বান জানাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন এবং ইউরোপীয় কমিশন। জাতিসঙ্ঘের পাঠানো দূত এবং জাতিসঙ্ঘের দণি এশীয় প্রতিনিধি, এমনকি মহাসচিব বান কি মুন নিজেই এ প্রস্তাব দিয়েছেন। আমাদের বিরোধ আমাদেরই মেটাতে হবে। দেশকে সঙ্ঘাত ও সঙ্কটের দিকে ঠেলে না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি দাবি মেনে নিলেই শান্তিপূর্ণ একটি সহাবস্থান নিশ্চিত হয়। এ নিয়ে সরকারি দলের কোনো ধরনের অনীহা থাকা উচিত নয়। তাদের কাছে এত সংশয়ও বা থাকবে কেন? মনে হয়,  প্রধানমন্ত্রী একটু উদারতা দেখালে এবং মতাত্যাগের আর একটু সদিচ্ছা দেখাতে পারলে জাতি তার রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবে। নতুবা দেশের অবস্থা বড়ই ভয়াবহ হতে পারে বলে আমরা মনে করছি।
আমরা জানি মতায় থাকলে উদারতা দেখাতে হয়। ত্যাগী হতে হয়। এ কথাও চিন্তা করতে হবে, বিএনপি একটি প্রধান বিরোধী দল। এর শিকড় অনেক শক্ত এবং এ দেশের মাটিতে সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে। এর প্রতি সম্মান দেখানো সরকারি দলের অবশ্যই উচিত। বর্তমান বিরোধী দল একাধিকবার  মতায় ছিল। তাই বিরোধী দলকে কোনোমতেই খাটো করে দেখা যাবে না। এদের আহ্বানকে অবজ্ঞা করাও যাবে না। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ চাই, পারস্পরিক নৈকট্য চাই। চাই পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতিও।
দেশ আজ নীরবে কাঁদছে। মতার জন্য অন্ধ হয়ে গেছি বলেই জাতির এই ক্রন্দন আমরা আজ শুনতে পাচ্ছি না। বর্তমানে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বড়ই করুণ। দেশের প্রধান অর্থ জোগানের খাত তৈরী পোশাক কারখানা আজ বন্ধ হওয়ার পথে। দেশে সব জায়গায় যেন একটা অস্থিরতার মহাবাষ্প ছড়িয়ে আছে। সম্প্রতি সংঘটিত ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে আমরা কি ভয়াবহ করুণ অবস্থা দেখতে পাই না? দুর্নীতি, হত্যা, গুম, জনগণের অধিকারহরণ, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং তাদের ধর্মীয় মন্দির-উপাসনালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোনো সভ্য দেশের সুস্থ রাজনৈতিক ধারা বলে দাবি করা যায় না। দেশে সুশাসন থাকলে তাহলে এগুলো হবে কেন? কেনই বা মানবতা ও মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে? কেন নিরীহ শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধদের ওপর আঘাত এসেছিল? এগুলো কারা সংঘটিত করেছিল? কাদের নেতৃত্বে এগুলো হয়েছিল? প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব ছিল কেন? বুদ্ধ তো কারো প্রতিপ ছিলেন না। কোনো ধর্মও তো কারো প-প্রতিপ নয়। রামু, উখিয়া ও পটিয়ার ঘটনা কী প্রমাণ করে? এতগুলো বৌদ্ধস্থাপনা, ঐতিহ্য ও বসতবাড়ি ধ্বংস হলো, জ্বলে গেল, পুড়ে গেল কিন্তু কোনো বিচার হলো না। প্রশাসনকে কোনো আইন বা বিচারের আওতায় আনা গেল না। এটা কেমন কথা? এতে বৌদ্ধরা সাংঘাতিক ক্রুুদ্ধ। সেখানকার জনগণ এখনো ভীতসন্ত্রস্ত। সে রকম দেশের নানা জায়গায় এখনো সংখ্যালঘুদের ওপর অনেক অনাকাক্সিত ঘটনা নিত্য ঘটে যাচ্ছে। প্রশাসন নীরব থাকবে কেন? সরকার এগুলো বন্ধ করতে পারছে না কেন? দেশ তো বিরোধী দলের নেত্রী চালান না। প্রশাসন তো বিরোধী দলের নেত্রীর নয়। চালায় বর্তমান সরকার। প্রশাসন তো সরকারের আদেশ-নির্দেশ মানতে বাধ্য। এমনকি তাদের জবাবদিহিতাও আছে সরকারের কাছে। তার পরও প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করবে এটা বুঝতে আমাদের বেশ কষ্ট হয়।
পদ্মা সেতু দুর্নীতি, হলমার্ক দুর্নীতি, সোনালী ব্যাংক দুর্নীতি এগুলোকে কি দুর্নীতি বলা যাবে না? বিশ্বজিৎ হত্যা কত নৃশংস ও নির্মম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যদি প্রশ্ন করি এগুলোকে কি সুনীতি বা সুশাসন বলা যায়? এ রকম আরো অনেক জানা-অজানা কত ঘটনা দেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাচ্ছে এর হিসাব কে দেবে? এ ঘটনা দেশ ও জাতিকে কলঙ্কিত করেছে। তবে হ্যাঁ, এটাও বলতে চাই বিএনপি সরকারের সময়ও যে দুর্নীতি-সন্ত্রাস হয়নি তা বলা যাবে না। আমি অবশ্য স্বীকার করি; হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন বিএনপি সরকার করেছে বলে আওয়ামী লীগ সরকারও করবে এটা তো হয় না। অনেকে বলে আওয়ামী লীগ অনেক আদর্শসম্পন্ন, অনেক ভালো। তাদের কথাকে যদি আমি মেনেই নিই তাহলে আমি বলব, তারা ভালো আদর্শ অনুসরণ না করে খারাপ আদর্শ অনুসরণ করবে কেন? তাহলে তাদের নিজেদের নিজস্ব আদর্শ রইল কোথায়?
পরিশেষে বলতে চাই আমি একজন মানবতাবাদী, শান্তি ও অহিংসনীতি-বিশ্বাসী মানুষ। তাই বলি, চলুন আমরা আজ সংলাপের এক জায়গায় আসি। জোটপ্রধান বিরোধীদলীয় নেতার আহ্বানকে স্বাগত জানাই। সব দলকে নিয়ে একটি ফর্মুলা তৈরি করি আগামীতে যেন একটি নির্দলীয়-নিরপে সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারি। দেশ, জাতি ও সম্প্রদায় যেন একটি অনিবার্য সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি থেকে রা পায়। সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তুÑ জগতের সকল জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। আমাদের সব ধরনের বৈরিতা ও হিংসা-প্রতিহিংসা দূরীভূত হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সংলাপের ফাঁদ


বিগত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দুর্বৃত্তায়িত শাসনই আমরা কেবল দেখতে পেয়েছি। তার দুর্বৃত্তরা গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরেÑ দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের ওপর যে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে, তাকে জোরগলায় সমর্থন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সাংবাদিকদের নসিহত করেছেন, বিএনপি আমলে তাদের দলীয় নেতাদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, সে তুলনায় তার দলের লোকেরা যা করছে তা তেমন কিছুই নয়। আশকারা এমন যে, যে যেখানে যা করছ, চালিয়ে যাও। এতে সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। শেখ হাসিনা কথা রেখেছেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত আমরা দেখেছি, বিরোধী দল দমনে পুলিশের সহযোগীর অবস্থানে সশস্ত্র অবস্থায় হাজির থেকেছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। আবার প্রতিপক্ষের ওপর ছাত্রলীগের হামলার সময় পুলিশ থেকেছে তাদের সহযোগী বাহিনী হিসেবে।

ফলে বিগত সাড়ে চার বছরে দেশে এক অন্ধকার যুগের সূচনা হয়েছে। খুন, গুম, রাহাজানিÑ রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞে প্রাধান্য পেয়েছে। আর খুন, গুম করে তাকে নিয়ে পরিহাস করেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও। এই সরকার ক্ষমতায় এসেই দেশব্যাপী এক সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন ও পুলিশবাহিনীকে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। শত শত যোগ্য অফিসারকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ওএসডি করে রাখা হয়েছে। তার বদলে এমন সব লোককে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে, যাদের ভাষাজ্ঞান পর্যন্ত সীমিত। কিন্তু তাতে প্রধানমন্ত্রীর কিছুই আসে-যায়নি। তার দলীয় আনুগত্য কতটুকু, সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু এ রকম একদল লোক নিয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা যে করা সম্ভব নয়, সেটি বোঝার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নিজেরও আছে কি না এ ব্যাপারে অনেকেই গভীরভাবে সন্দিহান। ফলে সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ক্রমশ: বিপন্ন হয়ে পড়েছে। তিরোহিত হয়েছে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের প্রশ্ন। আর আমরা যা দেখেছি তা হলোÑ রাষ্ট্র গোল্লায় গেলে যাক, ভারতের স্বার্থ কিভাবে সমুন্নত রাখা যায় সেটাই একমাত্র বিবেচ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতীয় পত্রপত্রিকাগুলো বাংলাদেশের সরকারকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে। তারা লিখেছেÑ বাংলাদেশ ভারতকে সব কিছু একেবারে উজাড় করে দিয়েছে। এমনকি অনেক কিছু ভারত না চাইতেই সরকার তাদের দিয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যে একটি ভূরাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে, সেটি বর্তমান সরকার ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কোনোভাবেই আমলে নেয়নি। ফলে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে। সেসব দেশই বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজার। সরকারের ভুলনীতির কারণে সে বাজারগুলো এখন দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছে। তারা আর বাংলাদেশী শ্রমিক নিচ্ছে না। অর্থনীতির ওপরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সরকার নেহাতই উদাসীন। শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভাও এমনভাবে সাজিয়েছেন যে, সেখানেও কেউ যেন যুক্তির কথা তুলে ধরতে না পারে। কেবল ঘাড় নেড়ে বলতে পারেÑ ‘জোহুকুম মহারানী’।
২০০৮ সালে এক বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। সে নির্বাচনে তারই ডেকে আনা সেনাশাসকদের রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি মইন উদ্দিন আহমেদ শেখ হাসিনাকেও কারাবন্দী করেছিলেন তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য। তা নিয়ে আমরা কত যে গালগল্প শুনেছি! কিন্তু সেসব গালগল্প যে শুধু জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য, পরে সেগুলো ধর্মের ঢাকের মতো আপনাআপনি বেরিয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যখন জেনারেল মইনের সরকার ক্ষমতায় আসে, আর এসেই যখন বিএনপির সর্বপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ওপর হামলে পড়ে, তখন শেখ হাসিনা তাদের কথা দিয়েছিলেনÑ চালিয়ে যাও, বিএনপিকে ধ্বংস করে দাও। আর তা যদি অন্যায়ও হয়, তাহলে সংবিধান সংশোধন করে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ওই সব অপকর্মের জন্য সেনাশাসকদের দায়মুক্তি দেবে।
কিন্তু জেনারেল মইনের সরকার ক্ষমতা স্থায়ী করার নানা কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। রাজনীতি থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য তাদের বন্দী করে। শেখ হাসিনার গালগল্পের শুরু সেই বন্দী জীবনেই। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি এক অদ্ভুত গল্প ফাঁদেন। তাতে বলেন, সেনাশাসকেরা বন্দী অবস্থায় তার দেহে আর্সেনিক বিষ দিয়ে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পৃথিবীর কোনো পরীক্ষাগারেই সেটি প্রমাণিত হয়নি। আর তাকে যারা হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, তাদের প্রতি শেখ হাসিনার মমতা অপরিসীম। মইন উদ্দিন ও ফখরুদ্দীন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এখন সেখানেই বসবাস করছেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাপতি মীরজাফর শেষ পর্যন্ত অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী থেকে কুষ্ঠরোগে মারা গিয়েছিলেন। জেনারেল মইন যুক্তরাষ্ট্রে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের অপেক্ষায় হুইল চেয়ারে বসে দিনাতিপাত করছেন। অন্য নিপীড়ক সহযোগীরা দেশের ভেতরেই আছেন। আর এক-এগারো ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান নায়ক মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত পদে বহাল আছেন। কী প্রেম! অথচ এরাই নাকি শেখ হাসিনাকে আর্সেনিক বিষ প্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল।
২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে শেখ হাসিনাকে জিতিয়ে দেয়া হয়। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী দল নির্মূলে এবং ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকার সংবিধানের খোলনলচে একেবারে পাল্টে ফেলেছে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক ধারা সংবলিত সব ধারা বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বাতিল করে দিয়েছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। তার ভয়, যদি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল থাকে তবে যে কুকীর্তি ও নিপীড়ন তার সরকার করেছে, জনগণ তার সমুচিত জবাব দিয়ে দেবে।
গোল বেঁধেছে সেখান থেকেই। বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য আন্দোলন শুরু করে। সরকারের হিংস্র রূপ সেখান থেকেই আরো প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। ওই ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য বিরোধী দল সভা-সমাবেশ, মিছিলের ডাক দিলেই সরকারের দলীয়করণকৃত র‌্যাব-পুলিশবাহিনী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিরোধী দলের ওপর পাশবিক হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে।
বর্তমান সরকারের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী দল নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়ায় সারা বিশ্ব ছি ছি দিতে শুরু করে। এতে সরকারের খুব যে একটা কিছু আসে-যায়, তেমন মনে হয়নি। তার ওপর পর্বতপ্রমাণ সর্বগ্রাসী দুর্নীতিতে দেশকে ছেয়ে ফেলে শেখ হাসিনা সরকার। এই দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় রাঘব বোয়াল থেকে চুনোপুঁটি কেউই বাদ যায় না। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, খুন, গুম, নারী নির্যাতনÑ কী করেনি এই সরকারের চাঁইরা। এখানে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টাকার বস্তাসহ ধরা পড়া লোকও মন্ত্রিসভায় বহাল আছে। পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে এক মন্ত্রীসহ বেশ কিছু ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। সেই মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে বিশ্বব্যাংককে নানা ধরনের কটূক্তি করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। এ নিয়ে বাহাদুরিও কম দেখানো হয়নি। যেন বিশ্বব্যাংক শেখ হাসিনা সরকারের হাতের মুঠোর কোনো প্রতিষ্ঠান। এবং তাদের ঋণ ছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণ করা নিতান্ত তুড়ি মারার ব্যাপার।
বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য সরকার শাহবাগে কিছু ব্লগার দিয়ে এক নতুন সার্কাস শুরু করে। সে সার্কাসঅলাদের বক্তব্য হলোÑ যুদ্ধাপরাধের জন্য যাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, তাদের সবাইকে ফাঁসি দিতে হবে। তারা ন্যায়বিচার দাবি করেনি। তারা ফাঁসির দাবি করেছে। অপরাধ করুক বা না করুক, অপরাধ প্রমাণিত হোক বা না হোক, দশ বছর, বারো বছর নয়, যাবজ্জীবন নয়, তাদের ফাঁসিই দিতে হবে। এই জজবায় সরকারের মন্ত্রী-নেতারাও শরিক হলেন। এবং আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলেন ট্রাইব্যুনাল। সাঈদীর আইনজীবীরা যতই বললেন, দেলোয়ার হোসেন শিকদার বা দেলু রাজাকার আর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এক ব্যক্তি নন; সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিতও হলো না, তার পরও মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো। তার আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে বসলেনÑ বিচারকেরা রায় দেয়ার সময় যেন জনমতের দিকটি খেয়াল রাখেন।
কিন্তু দেখা গেল নাচ, গান, আমোদ, ফুর্তির মাধ্যমে শাহবাগের সরকারেরা যে সার্কাসের আয়োজন করল; তাদের অনেকেই ধর্মদ্রোহী নাস্তিক। তারা আল্লাহ, রাসূল ও কুরআন সম্পর্কে তাদের ব্লগে এমন সব কটূক্তি প্রচার করল যে এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে তার ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। সরকার সেখানে প্রচুর অর্থ ঢালল। শাহবাগে দিবারাত্র তরুণ-তরুণীদের লীলা চলল। জারিগান, সারিগান, মেয়েদের লাঠিখেলা, কুস্তিÑ এসব দেখতে মানুষ কিছু দিন ভিড়ও জমাল। কিন্তু যখন তারা দেখল এরা ইসলামবিরোধী, আল্লাহ-রাসূল সম্পর্কে কটূক্তিকারী; তখন আস্তে আস্তে শাহবাগের ফুলানো বেলুন নিস্তেজ হয়ে আসা শুরু করল। শাহবাগীদের দিয়ে উঠানো দাবির মুখে সরকার এমনকি আইন পর্যন্ত  সংশোধন করল। যেন তারা সরকারের ওপর সরকার।
কিন্তু এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। তাদের সবচেয়ে বড় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। এরা গ্রামের সাধারণ মানুষ। ধর্ম-কর্ম নিয়ে থাকেন। রাজনীতি কখনো তাদের মাথাব্যথা ছিল না। এ সংগঠন দীর্ঘ দিন ধরেই কাজ করে আসছিল। প্রধানত তারা আলেম-ওলামাদের ওয়াজ-নসিহত শোনার জন্য সমবেত হতেন। তারপর যে যার গ্রামে, কর্মক্ষেত্রে ফেরত যেতেন। কিন্তু আল্লাহ-রাসূল ও কুরআনের বিরুদ্ধে অশ্লীল ও কুৎসিত কটূক্তিকারীদের সাজার দাবিতে তারা ঢাকায় এক মহাসমাবেশের ঘোষণা দিলেন। সরকার বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ঠুনকো অজুহাতে কারাগারে পুরেছে। সে প্রক্রিয়া রাজনৈতিক। কিন্তু এই সরকার সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস মুছে ফেলেছে। পাঠ্যপুস্তকে মহান আল্লাহ তায়ালাকে দেবদেবীর সমতুল্য করা হয়েছে। এমনিভাবে ইসলামবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। মুসল্লিদের যেখানে পেয়েছে, সেখানে পিটিয়ে তুলোধুনো করেছে। তার পরও হেফাজতে ইসলাম গত মাসে ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয়। এই মহাসমাবেশের দুই দিন আগে থেকেই সরকার বাস-ট্রেন-লঞ্চসহ সব যানবাহন বন্ধ করে দিয়ে রাজধানী ঢাকাকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাতেও কোনো ফল হয়নি। হেফাজতের কর্মীরা শত মাইল হেঁটে এসে মহাসমাবেশে যোগ দিয়েছেন। আর পথে পথে তাদের জন্য খাবার, পানি, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন এ দেশের সাধারণ মানুষ। সরকারের এত বাধা সত্ত্বেও লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান সে দিন ঢাকায় সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন।
সেই মহাসমাবেশ থেকে হেফাজত ১৩ দফা দাবি পেশ করেন। সে দাবি মানা না হলে তারা আজকের অর্থাৎ ৫ মে ঢাকা অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বিপরীতে হেফাজতে ইসলাম কার্যত দ্বিতীয় শক্তিতে আবির্ভূত হয়েছেন। যদিও রাজনীতি তাদের উদ্দেশ্য নয়; এবং রাজনীতির কোনো অভিলাষের কথাও তাদের মুখে শোনা যায়নি। তারা যে এক বিশাল শক্তি, সেটি তাদেরকে অশিক্ষিত বলে গালি দিয়ে অস্বীকার করা যাবে না। এরা এ দেশের নাগরিক এবং সুনির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস লালন করেন। যে বিশ্বাসের জন্যই বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ মানচিত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
আর ঠিক সেই সময়ে গত সাড়ে চার বছরের মধ্যে এই প্রথম শেখ হাসিনার কণ্ঠে বিএনপির সাথে আলোচনার উদার সুললিত বাণী শোনা গেল। তিনি যেকোনো দিন, যেকোনো সময় খালেদা জিয়ার সাথে বসে মুক্তমনে আলোচনার আহ্বান জানান। এটিও যে কার্যত একটি লোক দেখানো আহ্বান, সেটি বোঝার জন্য বিশাল পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়ার প্রয়োজন নেই। সমগ্র পৃথিবী বলছে, আপনারা আলোচনায় বসে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলার ব্যবস্থা করুন। ২০০৭ সালের মতোই দেশের কূটনীতিকেরা আবারো দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তাদেরকে বোঝানো যে, আমি তো মুক্তমনে আলোচনা করতেই চাইলাম। বিরোধী দল রাজি না হলে আমার আর কী করার আছে। কিন্তু ঠুনকো মামলায় বিরোধী দলের সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকে কারাবন্দী করার সময় এমন সুললিত চিন্তা শেখ হাসিনার মাথায় আসেনি। বিরোধী দলের অফিসে ঢুকে এর মহাসচিবসহ দলের শীর্ষস্থানীয় ১৪৮ নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের সময় এমন মনে হয়নি। তাহলে এখন মনে হলো কেন? এর দু’টি কারণ। এক হলো বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেয়া। অপরটি হলো হেফাজতে ইসলামের মোকাবেলায় উভয় দলের মধ্যে আপাতত একটি সন্ধি স্থাপন করা, যাতে কায়েমি স্বার্থ বহাল রাখা যায়।
বিএনপি বরাবরই বলে এসেছে, আগে তত্ত্বাবধায়ক ফিরিয়ে আনুন; তারপর আলোচনা। তার আগে নয়। কেননা এ ধরনের আলোচনার ভবিষ্যৎ কী হয়, সেটা আমরা ২০০৭ সালে মান্নান ভূঁইয়া আর আবদুল জলিলের আলোচনার মধ্যেই দেখেছি। সরকারের মুখে শেখ ফরিদ, বগলে আসলে ইট। এ অবস্থায় এ ধরনের আলোচনার ফাঁদে বিএনপি পা দেবে বলে মনে হয় না।

শুক্রবার, ৩ মে, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সরকারের দ্বিতীয় গণহত্যা : সাভার ট্রাজেডি



সাভারের রানা প্লাজা এখন এক ধ্বংসস্তূপ। মানুষের লাশ এবং কংক্রিটের মিলিত এক ধ্বংসস্তূপের নাম রানা প্লাজা, জীবনের তাগিদে প্রতিদিন আর সেখানে শ্রমিকের পদচারণা নেই। প্রতিটি গার্মেন্টস মেশিনারিজের শব্দ, বিদ্যুতের পাখার ঘূর্ণন, সারি সারি কাপড়ের রোল, কাপড় কাটা, সেলাই করা, শিপমেন্টের জন্য প্রস্তুতকৃত মালামাল প্যাকেটজাত করা- সব ব্যস্ততা বন্ধ হয়ে গিয়ে এখন সেখানে চলছে প্রিয়জন হারানো মানুষের আর্তনাদ। একদিকে বিল্ডিংয়ের ধ্বংসস্তূ অন্য দিকে পচা, গলিত লাশের গন্ধ, শোকার্ত মানুষের আহাজারি আর কান্নার রোনাজারি। বিভীষিকাময় পরিবেশে এখনো চলছে স্বজনদের খুঁজে ফেরা। এখনো ছবি হাতে ভাইয়ের জন্য, পিতার জন্য, স্বামীর জন্য, স্ত্রীর জন্য, মায়ের জন্য, বোনের জন্য অসংখ্য মানুষের সকাল-সন্ধ্যা অপেক্ষা। এ অপেক্ষার পালাও এক সময় শেষ হবে। মানুষের কান্না এক সময় থেমে যাবে। নিহত পরিবারগুলোর পরিচয় আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। মাতা-পিতা হারানো সন্তানদের হৃদয়ে গুমরে মরা কান্নায় তার অন্তর ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকবে। স্বামী হারা নারী ‘বিধবা’ পরিচয় নিয়ে অন্তর্দহনে ক্ষত-বিক্ষত হবে। সন্তানহারা পিতা সন্তানের শোকে নিজের দুঃখগুলো নিজের কাছেই জমা করে হা-পিত্যেশ করবে। প্রিয়জনহারানোর বেদনা নিয়ে মানুষগুলো আবার ফিরে যাবে যার যার ব্যস্ততায়। স্ত্রীকে হারিয়ে অনেক স্বামী সন্তান নিয়ে জীবনের নতুন যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। দুঃখী মানুষগুলোকে নিয়ে পত্রিকায় এই লেখা এক সময় থেমে যাবে। টিভির টক শো বন্ধ হয়ে যাবে। আলোচনা-সমালোচনা, তদন্ত, দোষীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন সবই এক সময় থেমে যাবে। আমরা হয়তো এক সময় ভুলেই যাবো সাভারে রানা প্লাজা নামে একটি প্লাজা ছিল। নিহত মানুষগুলোর পরিবারে তাদের হারানো মানুষগুলো আর ফিরে আসবে না। আহত মানুষগুলো যাদের কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো চোখ নেই যারা দুর্ঘটনার এক ঘণ্টা আগেও সুস্থ ছিল পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে তারা দুঃখের জীবন পাড়ি দেবে। যারা কখনো কারো কাছে হাত পাতেনি, ভিক্ষা চায়নি এদের অনেকেই হয়তো জীবনের তাগিদে দু’মুঠো অন্নের জন্য রাস্তার পাশে কাতর কণ্ঠে মিনতি জানাবে। হয়তো তাদের ভাষা এমন হবে আমার হাত ছিলো, পা ছিলো, চোখ ছিলো, আজ আমি এক অসহায় ব্যক্তি আপনাদের সাহায্য চাচ্ছি। এভাবেই অসহায় জীবনগুলো দুনিয়ার মানুষের সামনে নিজেদের অসহায় জীবনের উপাখ্যানগুলো তুলে ধরবে। কিন্তু অবাক পৃথিবী তাদের জীবন কখনোই ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু কেন? এভাবে বার বার খেটে খাওয়া দুঃখী মানুষগুলোর জীবনের ওপর দিয়েই সব ঝড়-ঝঞ্ঝা বয়ে যাবে। কেন সকল বিপদ, দুর্ঘটনার নীরব শিকার হবে? এর কি কোন প্রতিকার নেই। অতি দরিদ্র পরিবারের অসহায় মানুষগুলো যারা দু’মুঠো অন্নের জন্য, একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার জন্য, সন্তানের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দেয়ার জন্য, কেউবা অসহায় পিতার ওষুধ কিনে দেয়ার জন্য নিজের সমস্ত শ্রমকে ঢেলে দিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে করছে মজবুত শুধু তারাই সকল দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে? যে মানুষগুলোর ঘামের বিনিময়ে শহরের উচ্চবিত্তদের সম্পদের পাহাড় রচিত হচ্ছে তারাই সব সময় দুর্ঘটনার নির্মম শিকার হচ্ছে। দেখে মনে হয় যেন ওদের জীবনের কোন মূল্য নেই। ওরা মানুষ নয়। ওদের প্রাণ নেই। ওরা কোন নির্জীব পদার্থ অথবা ধনীদের আরাম-আয়েশ এবং সম্পদের পাহাড় রচনার জন্য ওদের সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা অসহায় জীবনগুলোর ঘামের ওপর দিয়ে অট্টালিকার আর সম্পদের মালিক হন প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ঘটনা-দুর্ঘটনার নির্মম শিকার মানুষগুলোর এ বোবা কান্না আকাশ-বাতাস ভারী করলেও আমাদের সমাজপতিদের এবং সরকারের বোধোদয় ঘটছে না। সাভারের রানা প্লাজার দুর্ঘটনার সামান্য পর্যালোচনা করলেই আমাদের কাছে এ বিষয়গুলো ধরা পড়বে।
ভয়াবহ দুর্ঘটনার পূর্বেই সংকেত দেয়া হয়েছিল : ৯ তলা এই ভবনটিতে আগের দিনই ফাটল দেখা দেয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সংবাদ সংস্থা খবর প্রকাশ করে যে ঘটনার আগের দিন দেখা যায় ভবনটির পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ওই দিন ভবনের সব গার্মেন্ট ও ব্যাংক ছুটি দেয়া হয়। দোকানগুলোও বন্ধ ঘোষণা দেয়া হয়। স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন গিয়ে ভভনটি খালি করারও নির্দেশ দেয়। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে সবাইকে ফোনে জানানো হয় ভবনটিতে কোনো অসুবিধা নেই। সকালে সব গার্মেন্ট শ্রমিককে কাজে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এ কারণে সকালে গার্মেন্ট শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ ভবনটি কেঁপে ওঠে। এ সময় ভেতরে তারা তীব্র আর্তচিৎকার শুনতে পান। ভবনের সামনেই তখন যুবলীগের সভা চলছিল। ভবন মালিক সাভার থানা যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রানা ওই সভার নেতৃত্বে ছিলেন। আওয়ামী ও যুবলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী ভবনের আন্ডার গ্রাউন্ডে রানার অফিসে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে রানা নিজেও ভবনের নিচতলায় গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনিও আহত হন। ৩-৪ মিনিটের মধ্যেই ভবনটি গুঁড়ো হয়ে মাটিতে পড়তে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরাও এ সময় কিছু লোককে দৌড়ে ভবন থেকে বের হয়ে যেতে দেখেন। বেশির ভাগ লোকই ভবনের মধ্যে আটকা পড়েন বলে সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়। ভবনটি যখন মাটিতে পড়ে যায় তখন পাশের ভবনগুলোর ওপর খ-িত অংশ ছিটকে পড়ে। এতে ওই সব ভবনও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার আগের দিন ভবনে ফাটল দেখা দেয়ার পর যখন সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি শিল্প পুলিশ যেখানে ভবন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় এরপর কার নির্দেশে এবং কার অনুমতিতে ভবনে আবার শ্রমিকদের ডেকে এনে কাজ শুরু করা হলো? এটা কি এ জন্য যে ভবনের মালিক রানা প্রভাবশালী এবং সরকার দলীয় এমপি মুরাদ জংয়ের ক্যাডার হওয়ায় তার দাপটের কাছে প্রশাসনসহ সবাই অসহায়। এই প্রভাবশালীদের দাপটে এবং ক্ষমতার অপব্যহারে আর কত মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া হবে? এ প্রশ্নের জবাব দেবেন কে?
সংখ্যালঘুর দখল করা অবৈধ জমিতে অবৈধ ভবন : কলুর ছেলে সোহেল রানা সাভারের যুবলীগ নেতা। ক্ষমতার দাপটে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। তার দখলবাজির হাত থেকে রেহাই পাননি সংখ্যালঘুরাও। যে ভবনটি ধসে পড়ে, তার মধ্যেও এক সংখ্যালঘুর সম্পত্তি রয়েছে। এক সময়ে এই সোহেল রানা তার বাবার তেলের ঘানিতে কাজ করতেন। বোতলে ভরে সরিষার তেল বিক্রি করতেন হেঁটে হেঁটে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সোহেল রানার বাবার নাম আবদুল খালেক। সবাই তাকে খালেক কলু বলেই চিনতেন। বাড়ি সাভারের বাজার রোডে। বাড়িতে গরুর ঘানিতে তেল বানাতেন আবদুল খালেক। স্থানীয় অধরচন্দ্র হাইস্কুল থেকে নবম শ্রেণী পাস করেছেন রানা। এরপর অভাবের তাড়নায় তার আর লেখাপড়া হয়নি। তাদের বাড়িটিকে এখনো কলুর বাড়ি হিসেবেই জানেন স্থানীয়রা। এই সোহেল রানাই রাজনীতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। প্রথমে একটি তেল তৈরির মেশিন বসান। গরুর ঘানি থেকে উন্নতি হয় মেশিনে। নাম দেন রানা অয়েল মিল। গোলাপ ফুল মার্কা নামের সেই সরিষার তেল সরবরাহ করা হয় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায়। সেই রানা আজ পেঁৗঁছেছেন সমাজের উচ্চপর্যায়ে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় তিনি থোড়াই কেয়ার করতেন স্থানীয় প্রশাসনকে। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলীয় মাস্তান বাহিনী নিয়ে স্থানীয় রবীন্দ্রনাথ সাহার জমি দখল করে রানা। সেখানে ডোবার ওপরে রানা প্লাজা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ওই বছরই। রবীন্দ্রনাথ সাহা আদালতে মামলা করলেও সে মামলা বেশি দূর এগোয়নি। এক পর্যায়ে পাগল হয়ে যান রবীন্দ্রনাথ সাহা। ২০০৬ সালে পৌরসভা থেকে ছয় তলা ভবনের অনুমোদন নেয়া হয়। অনুমোদন নিলেও কোন নকশা অনুমোদন করানো হয়নি। আর সেই ছয়তলা ভবনের উপরেই গড়ে উঠেছে নয় তলা ভবন। সোহেল রানা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। সাভারের অসংখ্য মানুষের জমি তিনি দখল করেছেন বলে জানা যায়। স্থানীয় প্রশাসন ছিল তার কাছে জিম্মি। তার ইশারায় সাভারে অনেক কিছুই ঘটতো। রানার ক্ষমতা এবং অর্থের লোভের বলি হলো অসহায় মানুষগুলো।
ইউএনও বললেন সমস্যা নেই : দুর্ঘটনার পূর্বের দিন ফাটল দেখা দেয়ার পর যখন স্থানীয় শিল্প পুলিশ এবং সাভার পৌরসভার মেয়রের পক্ষ থেকে ভবন খালি করার নির্দেশ দেয়া হলো তখন ইউএনও বললেন, সমস্যা নেই। যেখানে স্থানীয় একজন প্রকৌশলী মোঃ মিজানুর রহমান ভবনটি দেখে বললেন বুয়েটের প্রকৌশলী এনে পরীক্ষা করে রিপোর্ট পাওয়ার পর বোঝা যাবে এ ভবন ব্যবহার করা যাবে কি না সেখানে তিনি কিভাবে বললেন যে কোন সমস্যা নেই? আজ বড় প্রশ্ন তিনি কেন এমন কথা বললেন? রানার অবৈধ ভবন এবং ব্যবসার সাথে তার ভাগ এবং কত পার্সেন্ট? সরকার এই- টিএনও কে এখনো গ্রেফতার করেনি। বরং প্রকাশিত খবর অনুযায়ী তিনি এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এতবড় দুর্ঘটনার পর এই ধরনের অযোগ্য, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকেন কিভাবে?
পিটিয়ে বাধ্য করা হয় কাজে যোগ দিতে : রানা প্লাজায় অবস্থিত গার্মেন্টগুলোতে ফাটল দেখা দেয়ার পর কাজে যোগ দিতে চাননি। শ্রমিকদের পিটিয়ে বাধ্য করা হয়েছে কাজে যোগ দিতে। এমনই অভিযোগ করেছেন বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা। আহতাবস্থায় হাসপাতালে তারা এ অভিযোগ করেন। মঙ্গলবার ওই ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিলে শ্রমিকরা ভবন থেকে নেমে পড়েন। তাদের আশঙ্কা ছিল ভবনটিতে যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ওই দিন তাদের গার্মেন্ট মালিকও গার্মেন্ট ছুটি দিয়ে দেন। কিন্তু রাতে শ্রমিকদের মোবাইলে ফোন করে জানানো হয় কাজে যোগ দিতে। সকালে তারা ওই ভবনের সামনে আসেন। কিন্তু অনেকেই কাজে যোগ দিতে নারাজ ছিলেন। তাদের পিটিয়ে বাধ্য করা হয়। শ্রমিকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ভবন মালিক রানা নিজেই তাদের বলেন কাজে যোগ না দিলে পিটিয়ে হাড় গুঁড়ো করে দেয়া হবে। রানা এ সময় শ্রমিকদের হুমকি দেন, ‘যারা কাজে যোগ না দেবে মনে করব তারা বিএনপি-জামায়াতের লোক।’ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও হুমকি দেয়া হয়। ভয়ে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে ওই ভবনে ঢোকেন। রানা এ কথাও বলেন, ‘হায়াত কমে আসলে কেউ কি বাঁচাতে পারবে’ এক নারী শ্রমিক জানান, তাদের ভয় দেখিয়ে ভবনে তোলা হয়েছে। ফাটল দেখে তাদের ইচ্ছে ছিল না কাজ করার। তিনি বলেন, শ্রমিকদের পিটিয়ে বাধ্য করা না হলে এ ভয়াবহ পরিস্থিতি হতো না। জীবন দিতে হতো না অসহায় শ্রমিকদের।
মাদক, নারী ব্যবসা এবং টর্চার সেল : রানা প্লাজার মালিক সাভার পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানার অপকর্মের আস্তানা ছিল ধসে পড়া ভবনটি। একাধিক হত্যা মামলার আসামী এই যুবলীগ ক্যাডার ছিল স্থানীয়দের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। এই ভবনের নিচতলায় সে গড়ে তুলেছিল টর্চার সেল। এখানে বিরোধী জোটের কর্মী এবং প্রতিপক্ষ লোকজনকে ধরে এনে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হতো। এছাড়াও এখানে গড়ে তোলা হয় মাদক ও নারী ব্যবসার আখড়া। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকায় রয়েছে যুবলীগ ক্যাডার রানার বিশাল বাহিনী। এই বাহিনী দিয়ে সে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। তার দাপটে ওই এলাকার সাধারণ মানুষ ও নিরীহ ব্যবসায়ীরা ছিলেন আতঙ্কে। প্রকাশ্যে অপকর্ম করলেও এর প্রতিবাদ করার সাহস পেত না কেউ। যুবলীগ নেতা সোহেল রানার প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন তার আপন বোনের স্বামীও। জমিজমা নিয়ে বিরোধের কারণে রানা বোনের স্বামী জাকির হোসেনকে ধামরাইয়ের ধুলিভিটা এলাকায় বাসস্ট্যান্ডের কাছে নিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। এছাড়াও ২০০৪ সালে এক বন্ধুকে গুলী করে হত্যা করে রানা। খুন, হত্যা, গুম, নির্যাতন মাদক ব্যবসার অভয়ারণ্য হওয়ার পরেও কোন এক অজানা কারণে এ ভবনের সাথে প্রশাসনের অনেক কর্তাব্যক্তির ছিল দহরম মহরম সম্পর্ক। আজ স্বাভাবিকভাবেই দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে : এই লেখাটি যখন লিখছি তখন একটি অনলাইন নিউজে দেখানো হচ্ছে এখন পর্যন্ত ৩১৮ লাশ উদ্ধার, জীবিত উদ্ধার হয়েছে ২৩৯৭ জন। নিখোঁজ কয়েক হাজার। সাভারের বাতাসে শুধুই লাশের গন্ধ। এত লাশ সাভারের বাতাসও সহ্য করতে পারছে না। রানা ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারকৃত ও ভেতরে এখনো পড়ে থাকা শত শত লাশের গন্ধে এবং স্বজনদের আহাজারিতে ক্রমশ ভারি হচ্ছে সাভারের বাতাস। স্মরণকালের ভয়াবহ ভবন ধসে দেয়াল ও ছাদের কংক্রিটের সাথে মিশে আছে চাপা পড়া মানুষের লাশ। উদ্ধার কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা ও সমন্বয় না থাকায় লাশের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকেপড়া মানুষগুলো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তারা জানে না তাদের জীবনের ভবিষ্যৎ কি। কিন্তু এই সংখ্যাও দীর্ঘ হচ্ছে। স্বজনদের খোঁজে ধ্বংসস্তূপ থেকে এনাম মেডিকেল। আবার এনাম মেডিকেল থেকে অধরচদ্র উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। কিন্তু কোথাও জীবনের খোঁজ পাচ্ছে না অনেক স্বজনেরা। স্বজনদের খুঁজতে তারা পাগলপ্রায়। তারা শুধুই তাদের স্বজনকে ফিরে পেতে চাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ উদ্ধার কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না। উদ্ধার কাজের ঢিলেমির কারণে অনেককেই লাশ হয়ে বের হতে হচ্ছে।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : এতবড় দুর্ঘটনার পর দোষীদের খুঁজে বের করার পরিবর্তে গণহত্যার নায়ক হিসেবে পরিচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাজির করলেন নাড়াচাড়া তত্ত্ব। তিনি বি.বি.সিতে এক সাক্ষাৎকারে বললেন মৌলবাদী এবং হরতালকারীদের নাড়াচাড়ার কারণে বিল্ডিংটি ধসে পড়তে পারে। এমনকি পরের দিন সাংবাদিকরা তাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এর ওপর আরও বেশি জোর দেন। তার এ কথার সমালোচনা হয় তার দলের মধ্য থেকেই। আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রণি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন ‘আওয়ামী লীগকে রক্ষা করতে হলে তাকে এখনই ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে.. উনি যদি মন্ত্রী হন তবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কে?’ মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, ‘উল্টাপাল্টা কথা বন্ধ করে দোষীদের গ্রেফতার করুন’ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম একই ভাষায় কথা বলেছেন, রাশেদ খান মেনন বলেছেন, দুর্ভাগ্যজনক ও কা-জ্ঞানহীন, ড. কামাল বলেছেন, কা-জ্ঞানহীন। দলের মধ্য থেকে সমালোচনার পর তিনি এখন বলেছেন, আমার কথা মিডিয়ায় ঠিকভাবে আসেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিল্ডিং ধসের মাধ্যমে এত মানুষের জীবনহানি এবং এত বেশি পরিমাণ মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা কখনো ঘটেনি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেন মানুষের জীবন নিয়ে উপহাস করতেই বেশি ভালোবাসেন। ইতঃপূর্বে গত ২৭ ও২৮ মার্চ সরকারি বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা চালানোর পর তিনি বলেছিলেন পুলিশ কি আঙ্গুল চুষবে? মানুষের জীবন নিয়ে যিনি এভাবে তামাশা করেন তিনি আর যাই হোক কোন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর পদে বেমানান।
মানুষ মানুষের জন্য : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা করলেও মানবিকতায় যাদের জীবন গড়া সেই মানুষগুলো ছুটে এসেছে প্রকৃত মানব সেবার ব্রত নিয়ে। যে যা পেরেছে তাই নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার সাথে সাথেই এনাম মেডিকেল কলেজ, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ এবং ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল আহতদের জন্য ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ছাত্রশিবির ফ্রি রক্তদান, মেডিকেল টিম গঠনসহ নানাবিধ কার্যক্রম হাতে নেয়। নাম না জানা অসংখ্য মানুষ রক্তদানসহ আহতদের চিকিৎসা এবং উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবটুকু সামর্থ্য  নিয়ে। কেউ লাশ সরাচ্ছেন, কেউ আহতদের কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ পানি পান করাচ্ছেন, কেউ টিস্যু পেপার বিতরণ করছেন, কেউ বাতাস দিচ্ছেন। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় ভুপেন হাজারিকার আবেদনময়ী সেই গান ‘মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি পেতে পারে না ও বন্ধু’...।
ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে শ্রমিকরা : সাভারের রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার ফাঁসি, সব কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কারখানা বন্ধের দাবিতে রাজধানী জুড়ে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক। তাদের বিক্ষোভে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাস্তা অবরোধ করে দুই শতাধিক যানবাহান ভাঙচুর করা হয়। প্রতিটি গার্মেন্টসে ইট নিক্ষেপ করে ভাংচুর চালায় শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশ মিছিলে গুলী ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করলে শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ। পুলিশের সাথে শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরাও শ্রমিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দু’জন পুলিশসহ কমপক্ষে অর্ধশত শ্রমিক ও পথচারী আহত হয়েছে। রামপুরা, বাড্ডা, মালিবাগ এলাকার সব গার্মেন্টস  থেকে শ্রমিকেরা মিছিল বের করে রাস্তায় নেমে পড়ে। শ্রমিকদের এ বিক্ষোভে এখন উত্তাল রাজপথ। শ্রমিক বিক্ষোভ দমাতে সরকার পুলিশ এবং সরকার দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে নামিয়েছে। যা আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়ার শামিল। তাদের দাবি শ্রমিকদের জীবন নিয়ে এমন মরণ খেলা বন্ধ করতে হবে। যাদের ঘামের বিনিময়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হয় তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। তাদের জীবনের যেন কোন মূল্য নেই। তারা এই নির্মমতার বিচার চায়। অসহায় শ্রমিকদের জীবন নিয়ে নির্মমতা এবং নিষ্ঠুরতা তারা আর দেখতে চায় না। কিন্তু সরকার সম্ভবত তাদের দাবি মানার পরিবর্তে বাঁকা পথ অনুসরণ শুরু করেছে। যা কারো জন্যই মঙ্গল হবে না।
মানবতার সাথে চরম উপহাস : যে দিন সাভারে দুর্ঘটনা ঘটলো সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, ফাটল দেখা দেয়ার পর সব লোক সরিয়ে নেয়া হয়েছে, এখন যারা আছে তারা হয় মালামাল সরাতে গেছে অথবা চুরি করতে গেছে। যে মানুষগুলো দুুু’মুঠো অন্যের জন্য প্রতিদিন হাড়ভাঙ্গা  খাটুনি খেটে দেশের অর্থনীতি সচল রাখে এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিল তাদেরকে প্রধানমন্ত্রী চোর আখ্যা দিয়ে জাতির কাছে কি ম্যাসেজ দিলেন? যদি সব লোক সরিয়ে নেয়া হয়ে থাকে তবে আহত-নিহত লোকগুলো আসলো কোত্থেকে? তিনি আর কি একটি কথা বলেছেন, দায় এড়ানোর জন্য রানা যুবলীগের কেউ নয়। জনগণের প্রশ্ন হচ্ছে... রানা যুবলীগের কেউ যদি না-ই হয়ে থাকে তবে তিনি পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক হিসেবে পোস্টার-ফেস্টুন লাগান কিভাবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য তাকে সেল্টার দেন কেন? ঘটনার দিন সংসদ সদস্য মুরাদ জং তাকে উদ্ধার করে কোথায় নিয়ে গেছেন? স্বাভাবিকভাবেই জনগণ এ প্রশ্নের জবাব চাইবে।
সরকারের চেয়ে সাধারণ জনগণের ভূমিকা বেশি : রড কাটা, মানুষ উদ্ধার করা, পানি পান করানো, আহতদের চিকিৎসা দেয়া, রক্ত দেয়া লাশ উদ্ধার করা সব কাজেই সাধারণ মানুষ সবটুকু সামর্থ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যে যার মতো উদ্ধার কাজ পরিচালনা করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষ ভবনের বড় বড় ভগ্নাংশ অপসারণের চেষ্টা করেছেন। সাধারণ রশি দিয়ে টেনে নামানোর চেষ্টা করেছেন বড় বড় অংশ। প্রয়োজনীয় মেশিন ও যন্ত্রের অভাবে উদ্ধার কাজে কোনো গতি নেই। হাতুড়ি বাঁটাল দিয়ে তারা নয় তলা ভবন ভাঙার চেষ্টা করছেন। উদ্ধারকারীদের অনেককে দেখা যায় হ্যাকসো ব্লেডের ওপর ভর করে কাজ চালিয়ে যেতে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে উদ্ধার কাজ পরিচালিত হলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষকে দেখা যায় সুড়ঙ্গ খুঁড়ে খুঁড়ে ভেঙে পড়া ভবনের একতলা থেকে অন্য তলায় যেতে এ কাজে সরকারের সমন্বয়হীনতা আহত-নিহত মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সরকার কাছে বিল্ডিং কাটার এবং আহতদের উদ্ধারের জন্য আধুনিক এবং উন্নত কোন যন্ত্রপাতি-ই ব্যবহার করেনি। বরং বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর উল্টো পুলিশী হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি সহায়তা অপ্রতুল : আহতদের চিকিৎসা, কাটার যন্ত্র, গ্যাস সিলিন্ডার, ওষুধ, স্যালাইন ইত্যাদির জন্য উদ্ধাকারীদের পক্ষ থেকে বার বার আকুতি জানালেও সরকারের তরফে তার সহায়তা ছিল নামমাত্র, অপরদিকে সাধারণ জনগণ এ বিষয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা রড কাটার যন্ত্র এবং গ্যাস সিলিন্ডারের অভাব। যা সাধারণ জনগণের অনেকেরই নাগালের বাইরে কিন্তু সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রচুর পরিমাণ থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী তা পাওয়া যায়নি।
শেষ মুহূর্তের বাঁচার আকুতি : শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অক্সিজেন নাই খাবার নাই, চোখে অন্ধকার এর মধ্যেও বার বার বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে আটকেপড়া মানুষগুলো। ফোনে ভাই, বাবা, মা আত্মীয়-স্বজনকে আকুতি জানিয়ে একসময়ে কণ্ঠটি নিথর হয়ে যাচ্ছে। এরপর আর ও প্রান্ত থেকে কথা আসছে না। এমন অসংখ্য মানুষের বোবা কান্নায় ভারি হয়ে আছে সাভারের আকাশ-বাতাস। শেষ মুহূর্তের বাঁচার আকুতি জানিয়ে পিলারের নিচে আটকেপড়া এক নারী আর্তনাদ করে বলেছেন ভাই আমার পা আটকে আছে আমার পা দরকার নেই। আমাকে উদ্ধার করেন। অন্য এক নারী আর্তনাদ এবং চিৎকার করে বলেছেন ভাই আমার দু’বছরের সন্তানটির জন্য আমাকে বাঁচান। এ ধরনের হাজারো আর্তনাদে সাভার আজ ভারাক্রান্ত। দুঃখের ভার বইতে পারছে না সাধারণ মানুষ।
হৃদয় গহীনের অব্যক্ত বেদনা : ফেসবুকে এক তরুণের স্ট্যাটাসে এক নিহত তরুণীর  শেষ মুহূর্তের না বলা বেদনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছে ‘সাভার ট্রাজেডির দ্বিতীয় দিন এক হতভাগ্য তরুণীর একটি লাশ বের করে আনা হলো লাশের মুঠোর মধ্যে একটি চিরকুট তাতে লেখা-মা, বাবা তোমরা আমাকে ক্ষমা করো, আমি আর তোমাদের ওষুধ কিনে দিতে পারবো না, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো, ভাইয়েরা আপনারা আমার লাশটা দয়া করে আমার বাড়িতে পৌঁছে দিবেন।’
সুস্পষ্ট গণহত্যা : ফাটল ধরা ভবনে শ্রমিকদের ডেকে এনে কাজে বাধ্য করে সুস্পষ্ট গণহত্যা চালিয়েছে। দেশের বিশিষ্ট জনেরাসহ প্রতিটি সাধারণ মানুষ এ প্রতিক্রিয়াটিই ব্যক্ত করেছেন। কারণ প্রথমে শ্রমিকরা কাজ করতে চায়নি। কিন্তু তাদের ডেকে এনে জোর করে কাজ করানো হয়েছে। চাকরি হারানোর ভয়ে অসহায় শ্রমিকরা ভবনে ঢোকার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। এতেই বোঝা যায় এটি সুস্পষ্ট গণহত্যা।
বিদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের বাজারে ধস : গার্মেন্টস ভবনে ফাটল, শ্রমিক গণহত্যা, শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা, হঠাৎ করে সব গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তৈরি পোশাক শিল্পের বাজারে ব্যাপক ধস নামবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
১০০ দিনের হরতালের চেয়ে বেশি ক্ষতি : বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং হরতালের কারণে অর্থনীতির ক্ষতি নিয়ে অনেক সেমিনার হয়। বিজেএমএ, বিকেএমইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রায় এ বিষয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানান যে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং হরতালের কারণে ব্যবসায় বাণিজ্য এবং শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু সাভার ট্রাজেডির কারণে যে ক্ষতি হলো তা একশ দিনের হরতালের ক্ষতির চেয়েও মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে। এ ঘটনায় দেশী-বিদেশী বায়াররা মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং তারা অন্য কোথাও তাদের পণ্যের বাজার খুঁজবে। বায়ারদের একটি অন্যতম শর্ত থাকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে গার্মেন্টস শিল্প স্থাপন করা নিয়ে বিজেএমইএ, বিকেএমইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কোনো নজরদারি নেই। তাদের যত ক্ষোভ রাজনীতিবিদদের ওপর কিন্তু তাদের উদাসীনতা, শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা না দেয়া ইত্যাদি নিয়ে বিজেএমইএ, বিকেএমইসহ ব্যবয়াসী সংগঠনগুলোর কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। আজ তাদের অতি লোভের কারণে ১০০ দিনের হরতালের চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে অভিজ্ঞজনেরা বলছেন।
অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে : আমাদের প্রধান রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে গার্মেন্টস পণ্য থেকে। সাভার ট্রাজেডির কারণে এ শিল্প এখন হুমকির মুখে। এ শিল্পে ধস মানে গোটা অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়া। দুর্ঘটনা ঘটার পরের দিনই কোরিয়ান এক কোম্পানি তাদের বাংলাদেশে অফিসের মাধ্যমে উৎপাদনকারীদের বলে দিয়েছেন, তারা আর বাংলাদেশে ব্যবসা করবেন না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থা হতে পারে শ্রীলংকার মতো। শ্রীলংকায় এক সময় প্রধান রফতানি আয় ছিল তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে তারা তাদের বাজার হারায়। আজ বাংলাদেশও সে পথে হাঁটছে।
প্রথম আলোর নর্তন কুর্দন : সাভারের ভয়াবহ নির্মম ট্রাজেডির ২ দিন পর গোটা জাতি যখন শোকে স্তব্ধ তখন প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় নতুন শিল্পীদের নর্তন কুর্দনের। এ অনুষ্ঠান আয়োজনের পূর্বে এর সম্পাদক সাহেব কমিউনিস্ট নেতা মতিউর রহমান যারা সব সময় শ্রমিক অধিকারের কথা বলেন সেই নেতাই জাতির শোকের দিনে, শ্রমিকদের দুঃখ-বেদনার দিনে তাদের আর্তনাদ-আর্তচিৎকারকে তুচ্ছ করে আয়োজন করলেন নট-নটীদের নর্তন কুর্দনের। যার স্লোগান বদলে যাও বদলে দাওÑ ধিক এই বদলে যাওয়াকে। তার আর একটি স্লোগান মাদককে না বলুন। কিন্তু সকালে দেখলাম এক তরুণ তার ফেইস বুক স্ট্যাটাসে লিখেছে প্রথম আলোকে না বলুন।
ধরণী তুমি দ্বিধা হও : পৃথিবীর মানুষের নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা দেখে কবি বলেছিলেন, ‘ধরণী তুমি দ্বিধা হও’ নারী অধিকার নিয়ে নিয়মিত আন্দোলন হয় এবং হচ্ছে। আজ যখন এই লেখাটি লিখছি আজো গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকদের জড়ো করে মতিঝিলে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে নারী সমাবেশ করার কথা ছিল। কিন্তু সাভার ট্রাজেডির পর সরকারের সে সাহস উবে গেছে, তারা জানেন এখন এই মুহূর্তে সরকারের পক্ষে গার্মেন্টস শ্রমিকদের রাস্তায় নামানো সম্ভব নয়। কিন্তু যেই নারীদের নারী অধিকারের জন্য ব্যবহার করা হয় তাদের অধিকার কতোটুকু? তাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। এমনকি কোনো কোনো সময় ইজ্জতের নিরাপত্তা নেই। ঠিকমত বেতন-ভাতা দেয়া হয় না। এরপরও অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়। যে আমানবিক বিষয়টি আজ সবার নজরে এসেছে তা হচ্ছে সাভারে ধসে যাওয়া ভবনের মধ্যে দুইজন মা সন্তান প্রসব করেছেন। যেখানে সরকারিভাবে ঘোষিত নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস, সেখানে সন্তান প্রসবের আগের দিনও একজন নারীকে গার্মেন্টস-এ কাজ করতে হয়েছে। এর চেয়ে নির্মমতা এর চেয়ে পৈশাচিকতা আর কি হতে পারে? আজ তাই বলতে হচ্ছে ‘ধরণী তুমি দ্বিধা হও’।
দরিদ্রের রক্তে ধনীদের কোমল পানীয় পান : অসহায় দরিদ্র মানুষগুলোর রক্ত আর ঘামের বিনিময়ে ধনীরা কোমল পাণীয় পান করেন আর তাদের শোষণ করেন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এ দেশের মানুষের দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে। এখানে খেটে খাওয়া মানুষেরা প্রতারিত হচ্ছেন। শুধু রক্ত আর ঘাম শুষে নিয়ে মালিকেরা টাকার পাহাড় গড়ছেন আর এখন তারা প্রাণটাও কেড়ে নিচ্ছেন। শিল্প মালিকদের লোভের অগ্নিশিখায় সব জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস মালিকদের সম্মিলিত ফোরাম থাকলেও দুর্ঘটনা ঘটলে সম্মিলিত উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা তাদের হাতে নেই। তারা সংগঠন গড়ে তুলেছে শুধু দরিদ্রের রক্ত শোষণ করে ধনী হওয়ার জন্য। নয় তলা ভবনটির বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বাঁচার আকুতি ভেসে আসছে; কিন্তু উদ্ধারকর্মীরা তাদের লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতে পারছে না। উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবের কথাও বারবার উচ্চারিত হয়েছে। পর্যাপ্ত সার্চলাইট পাওয়া যায়নি, যদিও অনেক সাধারণ মানুষ নিজেদের তরফ থেকে এ ধরনের লাইট সরবরাহ করেছেন। আটকে পড়া শ্রমিকেরা অক্সিজেন সঙ্কটে পড়েছেন। তাৎক্ষণিক উদ্ধার করতে না পারলেও অক্সিজেন সরবরাহ করার মাধ্যমে জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়।
দেখা গেল পর্যাপ্তসংখ্যক অক্সিজেন মাস্ক পাওয়া যায়নি। সরবরাহকৃত যন্ত্রগুলো ছিল ত্রুটিযুক্ত। একটি দক্ষ অভিজ্ঞ উদ্ধার বাহিনীর সাথে সাথে প্রয়োজনীয় পরিমাণ উদ্ধার-সরঞ্জাম সরবরাহ করা গেলে প্রাণহানি কমানো যেত, উদ্ধার তৎপরতাও আরো গতি পেত। পোশাক শিল্প মালিকরা নিজেদের স্বার্থের বেলায় কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের মানসিকতা সব সময় নেতিবাচক মনোভাব আমরা দেখেছি। এখন দেখা যাচ্ছে, এ খাতটিকে সম্ভাব্য দুর্যোগ থেকে বাঁচানোর জন্য তাদের কোনো প্রস্তুতিও নেই। অথচ এ খাতের ব্যবসায়ীরা সম্মিলিতভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য একটি ফোর্স গড়ে তুলতে পারতো। কিন্তু তারা তা করেননি।
সরকার দায় এড়াতে পারে না : সরকারের পক্ষ থেকে গার্মেন্টস সেক্টরের অন্যায়, দুর্নীতি, অসাধুতা প্রতিরোধে যে ধরনের তদারকি দরকার ছিল তার কিছুই ছিল না এখানে। উল্টো ভবন মালিক সরকারদলীয় ক্যাডার হওয়ায় তিনি প্রশাসনের লোকজনকে থোরাই কেয়ার করতেন। শিল্প পুলিশের নিষেধ উপেক্ষা করে গার্মেন্টস চালু করাই তারা প্রমাণ। সরকারের ছত্রছায়ায় এভাবেই প্রতিটি জায়গায় অন্যায় হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটার পরেও সরকারি উদ্ধার তৎপরতায় আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জোগান সবকিছুতে ছিল প্রচ- রকম অভাব। সব মিলিয়ে এ দুর্ঘটনায় সরকার কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না।
সরকারের পদত্যাগই সমাধান : অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সকল সেক্টরে সরকারের অন্যায় অগণতান্ত্রিক আচরণ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর দলীয় করণের কারণে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। ব্যর্থ দুর্নীতিবাজ সরকারের দেশ পরিচালনার চেয়ে দলবাজি এবং ক্ষমতাবাজিই এখন প্রধান লক্ষ্য। তাদের অবৈধ বাসনার বলি হচ্ছে অসহায় বনি আদম। আজ সর্বত্র দুঃখক্লিষ্ট, নির্যাতিত অসহায় মানবতার আহাজারি। তাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে আছে। সরকারের অন্যায় এবং দুর্নীতির বলি হচ্ছে অসহায় মানুষগুলো... দিনে দিনে বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইব ঋণ... এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের পদত্যাগই একমাত্র সমাধান। ঢাকা, ২৭ এপ্রিল, ২০১৩। মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, সারুলিয়া, ডেমরা, ঢাকা।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সাভারের রানা থেকে সংসদের স্পীকার



সর্বশেষ এক উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের প্রতি আলোচনায় বসার আহ্বান জানালেও নানা কারণে তার সে আহ্বান জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারেনি। ভবন ধসের আড়ালে সাভারের হত্যাকা- তো বটেই, প্রধান একটি কারণ হিসেবে এসেছে সংসদের নতুন স্পীকার নির্বাচনের বিষয়টিও। বিরোধীদলের মতামত নেয়া দূরে থাকুক, ক্ষমতাসীনরা এ ব্যাপারে আগে থেকে তাদের অবহিত পর্যন্ত করেননি। আরো কিছু কারণেও প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এসব অবশ্য পৃথকভাবে আলোচিত হওয়ার মতো বিষয়। আজকের নিবন্ধে আমরা বরং সাভারের ভবন ধস ও হত্যাকা-কেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি স্পীকার নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবো। 
প্রথম ক্ষেত্রে বেশি আলোড়ন উঠেছে সাভার হত্যাকা-ের প্রধান অপরাধী সোহেল রানার গ্রেফতার নিয়ে। এই রানা আওয়ামী যুবলীগের প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত নেতা বলেই তাকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে রীতিমতো নাটক সাজিয়েছে সরকার। গত ২৮ এপ্রিল বেনাপোল থেকে গ্রেফতারের পর তাকে রাজকীয় ঢঙে হেলিকপ্টারে চড়িয়ে ঢাকায় আনা হয়েছে। সে খবর আবার ঘড়ি দেখে এবং ঘণ্টা ও মিনিট ধরে ধরে ঘোষণার আকারে জনগণকে জানিয়েছেন স্থানীয সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। ‘বেচারা’ রানাকে যে গ্রেফতার করা হবে সে বিষয়ে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্দেশ জারি করার পর থেকেই ধারণা করা যাচ্ছিল। প্রথম দু’-তিন দিন পর্যন্ত রানা আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের ‘কেউ নয়’ বলে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা কম করা হয়নি। এমনকি এ খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে, রানাকে ভারতে পাচার করে দেয়ার জন্য নাকি ৭০ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। দায়িত্বও নাকি কোনো এক আলোচিত প্রতিমন্ত্রী এবং একজন সংসদ সদস্য নিয়েছিলেন। কিন্তু ‘সদিচ্ছা’ যথেষ্ট থাকলেও জনগণের দাবির মুখে সরকারকে নতি স্বীকার করতে হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেই ঘোষণা দিয়ে গ্রেফতারের নির্দেশ জারি করতে হয়েছে। ‘বেচারা’ রানা তাই সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েও রেহাই পায়নি।
গ্রেফতারের ঘটনাপ্রবাহে অনেক বিষয় নিয়েই জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদও উঠেছে। প্রধান জিজ্ঞাসা হলো, এত নিষ্ঠুর এক হত্যাকা-ের পরও ঘাতক রানা সাভার থেকে বেনাপোল পর্যন্ত বাধাহীনভাবে যেতে পেরেছিল কিভাবে? ভবন ধসের সূচনাকালে অওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপির সঙ্গে তাকে দেখা গিয়েছিল বলে সঙ্গত কারণেই ধরে নেয়া হয়েছিল, রানা আসলে ওই এমপির আশ্রয়েই রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ২৯ এপ্রিলের সংবাদপত্রেও খবরের শিরোনাম হয়েছে, ‘অভিযোগের তীর এক প্রতিমন্ত্রী ও এক এমপির দিকে উঠেছে’। এর পাশাপাশি ‘কেউ নয়’ বলে শোরগোল তোলার বিষয়টিকেও স্বাভাবিকভাবে নেয়া যায়নি। সব মিলিয়েই পরিষ্কার হয়েছে, ‘কেউ’ তো বটেই, রানাকে এমনকি শেষ পর্যন্তও বাঁচানোর ‘সদিচ্ছা’ ছিল ক্ষমতাসীনদের। কিন্তু বিধি বাম হয়েছে। রানার গ্রেফতারে জনগণ তাই বলে নৃত্য করে উঠতে পারেনি। এর কারণ, বিরোধীদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, ঘাতক রানা ‘জামাই আদর’ পেয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে মাত্র ক’দিন আগের তথ্য স্মরণ করিয়ে বলা হয়েছে, দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপির জাতীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে যেখানে বেআইনীভাবে ডা-াবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছিল সেখানে রানাকে শুধু হেলিকপ্টারে চড়িয়েই আনা হয়নি, তার গায়ে টোকাটি পর্যন্ত দেয়ার সাহস পাননি কোনো কর্মকর্তা। এর কারণ নিশ্চয়ই ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। ঘাতক হলেও রানা যে ক্ষমতাসীনদের খুবই কাছের এবং খাতিরের একজন!
নাটকীয়তার অভিযোগও অকারণে ওঠেনি। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রানার হদিস পাওয়ার পর র‌্যাবের টিম তৈরি করা ও হেলিকপ্টারে যাত্রার প্রস্তুতি নেয়া থেকে বেনাপোলে গিয়ে তাকে গ্রেফতার এবং হেলিকপ্টারে চড়িয়ে ঢাকায় আনা পর্যন্ত কার্যক্রমে যে সময় লেগেছে তার চাইতে অনেক কম সময়ে তাকে গ্রেফতার করে গাড়িতে ঢাকায় আনা সম্ভব ছিল। এজন্য খরচ, সময় এবং লোকবলও অনেক কমই লাগতো। কিন্তু সেটা করা হয়নি এজন্য যে, তাহলে আর নাটক সাজিয়ে জনগণকে মুগ্ধ ও চমৎকৃত করা এবং শোরগোল তোলা সম্ভব হতো না। সরকারের যোগ্যতা এবং পারঙ্গমতা সম্পর্কেও ধারণা দেয়া যেতো না জনগণকে। আসলেও জবরই দেখিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা! তা সত্ত্বেও বলা দরকার,  আরো কয়েক কদম এগিয়ে সেই প্রতিমন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া উচিত, যাদের বিরুদ্ধে ৭০ লাখ টাকার চুক্তি করার দায়ে ‘অভিযোগের তীর’ উঠেছে বলে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অমন আশার গুড়ে অবশ্য বালি পড়াটাই স্বাভাবিক।
এবার ™ি^তীয় প্রসঙ্গ। এটা আর নতুন খবর নয় যে, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর জাতীয় সংসদের স্পীকার হিসেবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া আবদুল হামিদ এডভোকেটকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করেছে। নতুন বা সর্বশেষ খবর হলো, স্পীকার পদে নির্বাচিত হয়েছেন ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। এ শুধু একটি খবর নয়, রীতিমতো চমকে দেয়ার মতো খবরও। কারণ, এতদিন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি, পূর্ণ মন্ত্রী হওয়ারও যোগ্যতা ছিল না তার। কথা ও আপত্তি উঠেছে অনেক কারণেই। একটি বড় কারণ হলো, সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি সংরক্ষিত মহিলা কোটা থেকে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসার গৌরব ও অর্জন ছিল না তার। তেমন জনসমর্থন বা জনপ্রিয়তা থাকলে তিনি নিশ্চয়ই নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। আর একথা তো বলাই বাহুল্য যে, ২০০৮ সালের ‘ডিজিটাল’ নির্বাচনে নৌকা মার্কার এমন জয়জয়কারই ছিল যখন এমনকি ‘কলাগাছ’কে দাঁড় করিয়ে দিলেও জিতিয়ে আনা যেতো। হাসানুল হক ইনু থেকে রাশেদ খান মেনন পর্যন্ত ‘কমরেড’ নামের অনেক ‘কলাগাছ’কেই তো জিতিয়ে এনেছিলেন শেখ হাসিনা। সেদিক থেকে ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর মতো একজন অতি যোগ্য ও উচ্চ শিক্ষিত ‘নারী’ প্রার্থীকে সহজেই জিতিয়ে আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি বলেই রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় বলা হচ্ছে, তার সম্ভবত ‘কলাগাছ’ হওয়ার মতো যোগ্যতাটুকুও ছিল না। নাহলে সংরক্ষিত মহিলা কোটা থেকেই তাকে সংসদ সদস্য বানাতে হবে কেন?
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এই বলে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে যে, আওয়ামী লীগে কি যোগ্য ব্যক্তির এতটাই ‘আকাল’ পড়েছে যখন একজন অনির্বাচিত প্রতিমন্ত্রীকে স্পীকার বানাতে হলো? এমন জিজ্ঞাসার কারণ সম্পর্কে নিশ্চয়ই কথা বাড়ানোর দরকার পড়ে না। তোফায়েল আহমদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত থেকে সাবেক আইনমন্ত্রী এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু পর্যন্ত এমন ডজন ডজন নেতা ও এমপি রয়েছেন, যাদের মধ্য থেকে কোনো একজনকে স্পীকার বানানো যেতো, সেটাই সঙ্গত হতো। তাদের যোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠতো না তেমনি তাদের গ্রহণযোগ্যতাও হতো প্রশ্নাতীত। প্রাসঙ্গিক তৃতীয় কারণ হিসেবে স্পীকারদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে। স্বাধীনতার পর গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের প্রথম স্পীকার শাহ আবদুল হামিদ থেকে জাতীয় সংসদের সর্বশেষ স্পীকার আবদুল হামিদ এডভোকেট পর্যন্ত প্রত্যেকেই জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। তাছাড়া স্পীকারের মৃত্যুর পর সব ক্ষেত্রে ডেপুটি স্পীকারকেই স্পীকার পদে নির্বাচিত করা হয়েছে। যেমন শাহ আবদুল হামিদ মারা যাওয়ার পর স্পীকার হয়েছিলেন ডেপুটি স্পীকার মুহম্মদ উল্লাহ। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম বিএনপি সরকারের সময় (১৯৯১-১৯৯৬) অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ সরে যাওয়ার পর স্পীকার আবদুর রহমান বিশ্বাস যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন স্পীকার হয়েছিলেন ডেপুটি স্পীকার শেখ রাজ্জাক আলী। একইভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী মারা যাওয়ার পর ডেপুটি স্পীকার আবদুল হামিদ এডভোকেটকে স্পীকার করা হয়েছিল।
আপত্তির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে এসেছে অভিজ্ঞতার বিষয়টি। ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওপরে উল্লেখিতদের আগে-পরে মির্জা গোলাম হাফিজ, শামসুল হুদা চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মতো যারা স্পীকার হয়েছেন তাদের প্রত্যেকেরই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অতীত ছিল। প্রত্যেকে কয়েকবার পর্যন্ত জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছিলেনÑ যেমন সর্বশেষ স্পীকার আবদুল হামিদ এডভোকেট নির্বাচিত হয়েছেন সাত-সাতবার। অন্যদিকে নবনির্বাচিত স্পীকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী কিভাবে সংসদে এসেছেন সে তথ্যের নিশ্চয়ই পুনরাবৃত্তি করার দরকার পড়ে না। অভিজ্ঞতার বিষয়টি অকারণে আলোচিত হচ্ছে না। স্পীকার শুধু একটি পদ নয়, একটি প্রতিষ্ঠানও। স্পীকারের সঙ্গে জাতীয় সংসদের তো বটেই, রাষ্ট্রেরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্ধারণী বিষয় জড়িত রয়েছে। যেমন মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতির বিদায়ের ক্ষেত্রে স্পীকারই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। সেদিক থেকে স্পীকারকে রাষ্ট্রপতির বিকল্প বা ছায়া রাষ্ট্রপতি হিসেবে ধরে নেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদের অভ্যন্তরে অন্য যে কারো চাইতে, এমনকি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর চাইতেও বেশি ক্ষমতা ও মর্যাদা স্পীকারের। প্রধানমন্ত্রীকেও স্পীকারকে ‘মাননীয় স্পীকার’ বলে সম্বোধন করতে হয়। স্পীকারের অনুমতি ছাড়া কোনো এমপি বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীই সংসদে কথা বলার সুযোগ পান না। স্পীকার যে কোনো সময় যে কোনো এমপিকে এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতাকেও থামিয়ে দিতে পারেন। পারেন তাদের মাইক বন্ধ করে দিতে। অর্থাৎ সংবিধানের সংশোধনী থেকে কোনো আইন পাস করা পর্যন্ত সংসদের সকল কার্যক্রমে স্পীকারই সর্বেসর্বাÑ সার্বভৌম ক্ষমতা ও মর্যাদার অধিকারী। স্পীকারের ওপর আর কেউ নেই সংসদীয় গণতন্ত্রে। সেজন্য স্পীকারকে শুধু প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হলেই চলে না, যথেষ্ট অভিজ্ঞতাসম্পন্নও হতে হয়। তাছাড়া রীতি ও রেওয়াজ তো  রয়েছেই, পাশাপাশি রয়েছে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিÑ সংসদ পরিচালনার নিয়ম ও আইন-কানুন। এই কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে শুধু জানা থাকাটা যথেষ্ট নয়, প্রতিটি বিধি স্পীকারের নখদর্পণেও থাকতে হবে। কোন এমপিকে কখন বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া যায়, কখন কোন এমপি কোন পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখার জন্য দাঁড়াতে পারেন, কখন কার অনুরোধ উপেক্ষা করা যায়, কার মাইক বন্ধ পর্যন্ত করা যায়Ñ এ ধরনের অনেক বিষয়ে স্পীকারকে জ্ঞান রাখতে ও সচেতন থাকতে হয়। অন্যদিকে ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী সম্পর্কে বলা হচ্ছে, সম্ভাব্য প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তাকে কার্যপ্রণালী বিধিসংবলিত বই ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জানা না থাকার কারণে তিনি এমনকি চলমান সংসদ অধিবেশনই মুলতবি করে দিতে পারেন। অর্থাৎ সব মিলিয়েই নতুন স্পীকার জাতীয় সংসদের জন্য ক্ষতিকর এবং বিপদজনক হয়ে উঠতে পারেন।
প্রশ্ন উঠেছে, ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর মতো অনির্বাচিত ও অনভিজ্ঞ একজনকেই কেন নির্বাচিত করার আড়ালে স্পীকার পদে বসিয়ে দেয়া হয়েছে? এর কিছুটা উত্তর জানান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারীর ক্ষমতায়নের মতো যুক্তির পাশাপাশি উদাহরণও তিনি যথেষ্টই টেনেছেন। বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের স্পীকার এখন নারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পীকারও একজন নারীই। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া তথ্যগুলো ভুল নয়। কিন্তু একটি তথ্য তিনি পাশ কাটিয়ে গেছেন। সে তথ্যটি হলো, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের স্পীকার দু’জন কিন্তু সংরক্ষিত মহিলা কোটা থেকে ‘নির্বাচিত’ হয়ে আসেননি। ভারতের লোকসভার স্পীকার মীরা কুমার পাঁচবার সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপি। স্পীকার হওয়ার আগে দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেনÑ আমাদের স্পীকারের মতো প্রতিমন্ত্রী নন। মীরা কুমারের পিতা এবং দলিত বা অচ্ছ্যুত জনগোষ্ঠীর নেতা জগজীবন রাম ভারতের প্রায় সব সরকারের আমলেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বড় কথা, মীরা কুমার স্পীকার হয়েছেন সর্বসম্মতিক্রমে। তার বিরুদ্ধে বিরোধী দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। ওদিকে পাকিস্তানের স্পীকার ডাক্তার ফাহমিদা মির্জা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন তিনবার। তাকে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে স্পীকার পদে নির্বাচিত হতে হয়েছে। ৩৪২ আসনের পার্লামেন্টে তিনি পেয়েছেন ২৪৯ ভোট। মাত্র ৯৩ জন তার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। এসব কারণে আর যাকেই হোক ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর মতো সংরক্ষিত মহিলা কোটা থেকে আগত একজনকে অন্তত ভারতের মীরা কুমার এবং পাকিস্তানের ফাহমিদা মির্জার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তাছাড়া অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতার সব দিক থেকেও ওই দু’জন আওয়ামী স্পীকারের চাইতে বহুদূর এগিয়ে রয়েছেন। কথাটা পাঠকরাও মনে রাখতে পারেন। কারণ, এ ব্যাপারে আমরা অদূর ভবিষ্যতেই প্রমাণ পেতে শুরু করবো বলেই আমার নিশ্চিত ধারণা। নারীর ক্ষমতায়নের মতো যুক্তিকেও সমর্থন করা যায় না। সেটাই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে থাকলে বর্তমান সংসদেই এমন বেশ ক’জন নারী এমপি রয়েছেন, যাদের মধ্য থেকে একজনকে স্পীকার বানানো যেতো। এককালের তুখোড় ‘কমরেড’ মতিয়া চৌধুরী বা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মতো কারো নাম না হয় উল্লেখ না-ই করলাম। তথ্যটি জানানোর কারণ হলো, প্রধানমন্ত্রী যা-ই বোঝাতে চান না কেন, নারীর ক্ষমতায়ন একটা অজুহাত মাত্র। তিনি আসলে নিজের বিশ্বস্ত একজন অনুসারীকেই স্পীকার বানিয়েছেন।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে অন্য একটি কথা জানিয়ে রাখা দরকার। ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর ব্যাপারে আপত্তি উঠলেও এমন ভাবনাও আবার সঠিক নয় যে, তার স্থলে অন্য কাউকে স্পীকার বানানো হলেই বিরাট কোনো ব্যতিক্রম ঘটতো। এই না ঘটার কারণ, যিনিই হতেন তিনিও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবেই হতেন। আর চলতেনও তিনি তার দলের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছানুসারেই। উদাহরণ দেয়ার জন্য স্পীকার পদ থেকে সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি হয়ে যাওয়া আবদুল হামিদ এডভোকেটের দু-একটি কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার সময় বিরোধী দলের জন্য আসন বণ্টন থেকেই আবদুল হামিদ বুঝিয়ে ছেড়েছিলেন, তিনি সর্বতোভাবেই আওয়ামী লীগের স্পীকার ছিলেন। আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অসহায় শিকার হওয়ায় প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন থেকেই বিরোধী দলকে অধিবেশন বর্জন করতে হয়েছিল। ক্ষমতাসীনরা তো বটেই, স্পীকার আবদুল হামিদও বিরোধী দলের এমপিদের অধিবেশনে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্বাসযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেননি। অর্থাৎ বিরোধীদলের দাবির ব্যাপারে স্পীকার আবদুল হামিদ আসলে আওয়ামী লীগের নেতার ভূমিকাই পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালেও বিভিন্ন বিষয়ে তাকে একই ধরনের দলবাজি করতে দেখা গেছে। বিরোধীদলকে বাইরে রেখে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করার মতো এমন অনেক তথ্যেরই উলে¬খ করা সম্ভবÑ যেগুলো প্রমাণ করে, স্পীকার হলেও আবদুল হামিদ এডভোকেট কখনো দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে এবং জাতীয় সংসদের দলনিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেননি। মাত্র সেদিনের এ ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায়, ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর স্থলে আওয়ামী লীগের অন্য কেউ স্পীকার হলেও কোনো এদিক-সেদিক হতে পারতো না। দলের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা ও নির্দেশের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে তথা সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী কারো পক্ষেই ভূমিকা পালন করা সম্ভব হতো না। তা সত্ত্বেও জনগণ কিছুটা ভরসা পেতে পারতো যদি অভিজ্ঞ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কোনো এমপি বা পার্লামেন্টারিয়ানকে স্পীকার পদে বসানো হতো। কিন্তু জনগণের সে আশা পূরণের ধারে-কাছেও যাননি ক্ষমতাসীনরা। তারা আসলে জাতীয় সংসদের ভাবমর্যাদা নিয়েই নতুন পর্যায়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছেন।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

স্বপ্ন পূরণের প্রশ্ন


লাখো শহীদের রক্তের বিনিময় গড়া বাংলাদেশ। জানি না আগামী কয়েক মাস এ দেশের ভাগ্যাকাশে কী লেখা আছে, একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাই বোধ হয় জানেন। তবে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। এ দেশ ছোট হতে পারে, তবে এখানে সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে উঠেছে যাদের সুনাম বিশ্বজোড়া। ছোট দেশের তুলনায় মানুষ বেশি, এদেশের মানুষ সহজ সরল, একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে ধর্মীয়ভাবে। কারণ এদের বাঁচার জন্য সামান্য চাহিদা থেকে যখন তারা বঞ্চিত হয়। সরকার যখন তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে অপারগ হয়, তখনই তারা পিঠ ঠেকে গিয়ে বিভিন্ন মত, পথের দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হয়। ‘সহজ সরল পুণ্য পন্থা মোদের দাওগো বলি, চালাও সেপথে যে পথে তোমার প্রিয়জন গেছে চলি।’ ছোটবেলায় এসব শেখানো হতো যা বর্তমানে শিখানো হয় না। দেশপ্রেম ও শান্তিময় বাংলাদেশ গড়তে এখন শিক্ষকেরা ছাত্রদের বিদ্যাপাঠ দেন না। ৪২ বছর পরে স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ নতুন করে বিতর্ক তৈরি করার কি খুব প্রয়োজন ছিল? বিরোধী দলের প্রতি সরকারের উদ্যোগী হয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কিভাবে নির্বাচন হবে তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা দরকার ছিল। অথচ আমরা কী দেখেছি, দুর্নীতির মাধ্যমে যারা কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে বলে পত্রিকায় উঠেছে তাদের সলাপরামর্শে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ বহির্বিশ্ব সম্পর্কে একপেশে অথচ আকাশ অনেক বড়। শুধু দলের জন্য নয়, দেশের জন্য দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বৈদেশিক শ্রমবাজার, মেধা এগুলো যাতে বাংলাদেশের খাপ খাওয়ানো ব্যাপারগুলোতে সফল কূটনীতিকদের কাজে লাগাতে হবে। তাহলে তারা দেশের জন্য কাজ করলে সরকার বদল হলেও তাদের কাজের ইতি না টেনে নতুন করে আবার ওই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়, যদি দেশের জন্য তাদের কাজ করা থাকে। তারা নিজেরাও বেঁচে যায়। গোয়েন্দা সংস্থার পেশাদারিত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে পারেনি। প্রতিরক্ষা বাহিনী বহির্বিশ্বে শান্তিরক্ষা মিশনে বিজয়ী। বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সর্বোচ্চ সম্মানিত পুরস্কারে ভূষিত করল আমেরিকা। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামাও বাংলাদেশের তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহের প্রথমসারির অবস্থানে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পার্বত্য জেলায় বিজিবির সদস্যদের দেখলাম কত কষ্ট করে আত্মীয় পরিজনবিহীন অবস্থায় তারা দুঃসাহসিকভাবে পাহাড়ে জঙ্গলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর উঁচু স্থানে দায়িত্ব পালন করছে। ঢাকার রাজধানীতে হাতিরঝিল প্রকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রেখেছেন। আজ বলতে ‘হয় আর নয় ক্ষয় হবে হবে জয়’। এই জয় তখনই সম্ভব হবে যখন রাজনৈতিক সমঝোতার বক্তব্য ফানুস না হয়ে অর্থবহ হবে। টোপ ফেলে রাজনীতি শিকার না হয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করা হবে।

বৃহস্পতিবার, ২ মে, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ইসলাম ও গণতন্ত্রের রাজনীতি



সাভার দুর্ঘটনার রেশে রাজনীতি থমকে ছিল কিছুদিন। পুরো জাতি, এমন কি, বিশ্বও স্তম্ভিত হয়েছিল। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাভারের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আর যুবলীগ নেতা রানাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে আম-জনতা পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন। কার মন্তব্য কেমন হয়েছে, সেটা স্বব্যাখ্যাত। নতুন করে বলার কিছু নেই। সকলেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে কথা বলেছেন। এটাই স্বাভাবিক। তবে কথা আর সত্যের মধ্যে বিপুল ফারাক হলেই সমস্যা। কথা বলার আগে এ ব্যাপারে মনোযোগী হওয়াই ভালো। প্রধান বিরোধী জোট বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১৮ দল সাভারের উদ্ধার কার্যের স্বার্থে হরতাল প্রত্যাহার করে ইতিবাচক ও মানবিক নজির স্থাপন করেছেন। যদিও তারা নিজেরাই সরকারের অমানবিক আচরণ, মামলা, হামলায় পর্যুদস্তু বলে অভিযোগ করে থাকেন। তথাপি নিজেদের উপর নির্যাতন মেনে এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের পথে সাভারের ঘটনাকে তারা মূল্য দিয়ে যথার্থ মানবিকতা ও জনদরদের প্রমাণ রেখেছেন। এখন সরকার উদ্ধার, ত্রাণ ও আহত-নিহতদের পুনর্বাসনের কাজে যথেষ্ট মানবিকতা আর দরদের ছাপ রাখতে পারলেই ভালো। নচেৎ বিরোধী দলের পক্ষে দেয়া সুবিধার রাজনৈতিক স্বার্থটুকুই গ্রহণ করা হবে; মানবিক দায়িত্ব পালন হবে না।
এদিকে মে মাস শ্রমিক শ্রেণীর অধিকারের ডাক দিয়ে অতীতের মতো পালিত হতে পারেনি। এবার সেটা পালিত হয়েছে শোক, হতাশা ও বেদনায়। মে মাসের প্রথম দিন শ্রম দিবস যা-ই বলুক না কেন, শ্রমজীবী, দুর্বল ও অবহেলিতদের বঞ্চিত ও নিগৃহীত হওয়াই এখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মূল ভূখ-ে বার বার মৃত্যু ও বিপদের মুখে পতিত হচ্ছে পোশাক শিল্পের নিরীহ শ্রমিকগণ। তারা মরছে এবং এখন তাদের কারখানাগুলোও ভাঙচুর করা হচ্ছে। শাঁখের করাতে এদিক-ওদিক-সবদিক দিয়ে কাটছে পোশাক শিল্প আর পোশাক শ্রমিকের রুটি-রুজি-ভাগ্য। গরিব ও বিপন্নদের প্রতি এত অবহেলা সহ্যের সকল মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ এই গরিবরাই দেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। তাদেরকে রক্ষা করার বদলে পোকা-মাকড়ের মতো মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সরকার ও মালিক পক্ষ যত কথা বলেছে, শ্রমিক স্বার্থে কাজ করেছে ততই কম। এজন্যই সাভারের রানা, তাজরিন, স্পেক্ট্রাসহ বহু দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনায় হাজার-হাজার নারী-পুরুষ শ্রমজীবী মানুষ নিহত-আহত-নিখোঁজ হয়েছেন। বেঁচে থাকার আশায় গ্রাম থেকে শহরে আসার মানুষরা এভাবেই অকাতরে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে।
শোকের মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গন আবার উত্তপ্ত হওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে। আগামী ৫মে হেফাজতে ইসলামের পূর্বঘোষিত ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচি। গত ৬ এপ্রিল ঢাকায় লংমার্চ শেষে মহাসমাবেশে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্য এক মাসের সময় নির্ধারণ করে দেয়। ১৩ দফা মানার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বরং এর বিরোধিতাকারীরা প্রবলবেগে বিঘœ সৃষ্টি করছে। হেফাজত দেশব্যাপী সভা-সমাবেশের মাধ্যমে তাদের ঘোষিত ১৩ দফার পক্ষে সুস্পষ্ট জনমত গঠন করলেও সরকার পক্ষে এসব নিয়ে কোনও আলাপ-আলোচনা বা সংলাপের আভাস দেয়া হচ্ছে না। ফলে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন তাদের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী এগিয়ে চলেছে।
সরকার হেফাজতে ইসলামের দাবির প্রতি কোনও সাড়া বা মনোযোগ না দিলেও সরকারকে সমর্থন করে, এমন কিছু কিছু গোষ্ঠী হেফাজতের দাবির বিরোধিতায় সদা ব্যস্ত। যেমন বেদায়াতপন্থী-জনবিচ্ছিন্ন-ধর্ম ও মাজার ব্যবসায়ী আলেম (?) সমাজ এবং বিদেশি টাকায় পুষ্ট এনজিও। একদল মুখে ইসলামের কথা বললেও অন্যদল নাস্তিক্যবাদ ও সেক্যুলারিজমের পূজারী। এমন বিপরীত মেরুর পক্ষগুলোও এখন একাট্টা। এমন মজার ও মধুর মিলন বাংলাদেশে আগে আর কখনও হয়েছে বলে জানা যায়নি। বিরোধিতাকারীদের মধ্যে নিজস্ব পার্থক্য থাকলেও হেফাজতের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। এদের মতলব পরিষ্কার। ইসলামের মূল আদর্শ ঠেকানোই এদের এজেন্ডা। দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিজেদের ধর্মের স্বাধীনতা ও বিকাশ লাভ করুক, এটা এই গোষ্ঠীগুলো চায় না। অতএব এরাও ঐতিহাসিকভাবে ইসলামের বিরোধিতাকারী অপশক্তির তালিকায় স্থান পাবে।
গত মাসে হেফাজতের লংমার্চ ও মহাসমাবেশের সময় যে নজিরবিহীন বাধা দেয়া হয়, ছুটির দিনে হরতাল ডাকা হয়, সকল যানবাহন বন্ধ করে ঢাকাকে অবরুদ্ধ করা হয় এবং তারপরেও ঢাকায় লাখ লাখ মানুষের স্রোত তৈরি হয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এবার হেফাজতকে আটকানোর জন্য কি করা হবে? কত বারই বা মানুষকে আটকানো যাবে? রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এসব কথাই বহুলভাবে আলোচিত হচ্ছে। পাশাপাশি সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকেই।
জনতার মূলধারাকে বাধা দেয়া কখনওই সম্ভব হয় নাÑএটাই ইতিহাসের শিক্ষা। সাম্প্রতিক সময়ে শাহবাগ নাটক সাজিয়ে তৌহিদী জনতাকে আটকানো তো যায়-ই নি; বরং শাহবাগের অস্তিত্বই ধুলায় মিশে গেছে। এটা যে গণজাগরণের নামে কত বড় ভ-ামি ও ষড়যন্ত্র ছিল, সেটা আজ আর কারওই জানতে বাকী নেই। সামনের দিনগুলোতেও হটকারী বা অবিমৃশ্যকারিতার মাধ্যমে জনজোয়ারকে থামানো যাবে না এবং সে রকমের কোনও চেষ্টা করা হলে সেটা ব্যর্থ হবে। বরং বুমেরাং হয়ে উদ্যোক্তাদের জন্যই বিপদ-আপদ ডেকে আনবে। যেমন শাহবাগ বিপদ (একে ফেতনা নাম দেয়াই ভালো)। যাকে ফেলাও যাচ্ছে না, গেলাও যাচ্ছে না। 
বস্তুতপক্ষে, বাংলাদেশের রাজনীতি সাম্প্রতিক সময়ে একটি স্পষ্ট সিগন্যাল জানিয়ে দিয়েছে। আর সেটা হচ্ছে, এদেশে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে একটি অন্যতম প্রধান শক্তি। ইউরোপের খ্রিস্টান দেশগুলোতে যেমন ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেট বা লিবারেলরা ক্ষমতার প্রধান কা-ারীÑবাংলাদেশেও ইসলামই রাজনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। গণতন্ত্রের পরীক্ষা বা ভোটের অঙ্কেও এ কথা প্রমাণিত সত্য। তবে অতীতে সামরিক স্বৈরাচারী বা অসৎ ক্ষমতাসীনরা ইসলামকে রাজনীতিতে ব্যবহার করেছে বটে; কিন্তু প্রয়োগ করেনি। এবার ইসলামী শক্তি নিজেই জাগ্রত হয়ে ইসলামকে সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতিসহ সর্বস্তরে প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। যথার্থ গণজাগরণ বলতে বাংলাদেশের এই ইসলামী গণজাগরণকেই বলতে হবে।
বাংলাদেশে ইসলামের রাজনৈতিক বিকাশের পিছনে কাজ করেছে ঐতিহাসিক বাস্তবতা। দিল্লির দাসত্ব ভাঙা আর পি-ির শোষণ মোচনের ঐতিহ্য থেকেই এমনটি হয়েছে। অতীতে সমাজতন্ত্র বা উগ্র জাতীয়তাবাদ দাসত্ব ও শোষণের প্রতিকার করতে পারেনি। মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি, বিশ্বাসকে রক্ষা করতে পারেনি। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দালালি করে উদাম সেক্যুলারিজমের মাধ্যমে নারী-পুরুষের বারোটা বাজিয়েছে। কিংবা ভারতীয় পৌত্তলিক শক্তির তাবেদারী করে বহুশ্বরবাদী আচার-আচরণ-প্রতীক-অনুষ্ঠান চাপিয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সংস্কৃতি শোষণ ও দাসত্বের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা এবং চলমান আন্দোলন বাংলাদেশের মানব মুক্তির এক মহান আওয়াজ। হেফাজতে ইসলাম ধর্ম, সমাজ, রাজনীতির মূলস্রোতকে বিশুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক করতে চাচ্ছে। ইসলামের জন্য ছাত্র-যুব-গণ আন্দোলন দিনের পর দিন যে লড়াই-সংগ্রাম-ত্যাগ-তিতীক্ষা-নির্যাতন সহ্য করেছে, তার সঙ্গে আলেম সমাজের সম্মিলন আন্তর্জাতিক মিডিয়াসহ সর্বস্তরে নতুন শক্তির উত্থানরূপেই চিহ্নিত হয়েছে। এই গণশক্তির পেছনে দেশের সিংহভাগ মানুষের শ্রদ্ধা, সমর্থন ও ভালোবাসা পরিপূর্ণভাবে বিরাজমান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্রিস্টবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চেষ্টা করে ইসলামকে ঠেকাতে। বিশ্বের দেশে দেশে ইসলামের বিরুদ্ধে চলছে নানা আঘাত, ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বাংলাদেশে যে ইসলামী গণশক্তি এতো প্রবলভাবে উত্থিত হবে, সেটা তাদের হিসাব-নিকাশ ও কল্পনার বাইরে ছিল। এ কারণেই তারা সাইনবোর্ডধারী আলেম(?) এবং নগ্নতাবাদী-এনজিওপন্থীদের লেলিয়ে দিয়েছে। প্রভুদের দালালি করতে গিয়ে এরা লক্ষ্য করছে না যে, তারা জনতার প্রধান অংশের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। এই পদস্খলনের জন্য এরা গণশত্রু ও দালালরূপে চিহ্নিত হবে। এদের কার্যক্রম মাঠ-ময়দান থেকে হটতে হটতে প্রভুদের আঁচলের নিচে চলে যাবে। বাংলাদেশে জনতার বিজয় মানে ইসলামের বিজয়; আর ইসলামের বিজয় মানে জনতার বিজয়Ñগণতান্ত্রিক সূত্রের এই অতি সরল কথাটি যারা বুঝতে পারবে না, তারা অচিরেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এটা ইতিহাসের বিধান। ইতিহাসের বিধান অনুযায়ী সামনের দিনগুলোতে কে কোথায় থাকে, সেটাই দেখার বিষয়।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

আইয়ামে জাহিলিয়ার যুগে পদার্পণ?


স্কুলজীবনে পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি এবং বিভিন্ন সময় মুরব্বিদের মুখে শুনেছি জাহিলিয়া যুগের ভয়াবহ ঘটনাবলি। ওই যুগে মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা বা মৌলিক অধিকার বলে কিছুই ছিল না। কেউ কাউকে খুন করলে কোনো বিচার হতো না। নারীদের কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না। তাদের ব্যবহার করা হতো পণ্যের মতো। মানুষ ছিল মদ আর জুয়া নিয়ে ব্যস্ত। বর্তমান এ সভ্য যুগে যেখানে দুনিয়ার বেশির ভাগ দেশ মানুষের জানমাল ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে যুগান্তকারী পদপে নিচ্ছে, সেখানে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে চলছে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ। শুধু মুষ্টিমেয় লোকদের হাতে দেশের ১৬ কোটি মানুষের অধিকার আজ বন্দী। মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন আজ দুনিয়া স্বীকৃত। এক দিকে দেশের সর্বত্রই নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্য দিকে দেশের নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা ও দেশ চালাতে চরম ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলেছে।

দেশের মানুষের মনে কোনো শান্তি নেই, নেই কোনো আশার আলো। এ আতঙ্ক এখন প্রবাসে অবস্থানরত দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদেরও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। ব্যক্তিগতভাবে চিনি এমন অনেক পরিবারই আছেন, যারা বছর শেষে দেশে যাওয়ার পুরো প্রস্তুতি নিয়েও গভীর শঙ্কার মধ্যে আছেন, আদৌ দেশে যাবেন কি না। আবার কিছু পরিবার যারা ব্যক্তিগত কারণে প্রতি বছর দেশে যেতে পারেন না; ফলে বহু বছর পর মনস্থির করেছিলেন এবার দেশে যাবেনই। দেশের এ করুণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং জীবনের নিরাপত্তার অভাবে দেশপ্রেমিক প্রবাসী বাংলাদেশীরা আজ নিজের দেশেও বৃদ্ধ বাবা-মা, ভাই-বোন এবং নিকটাত্মীয়-স্বজনদের সাথে কয়েকটা দিন কাটানো অনেকটাই আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়ার মতোই মনে করছেন। এমতাবস্থায় জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের কী মনে করতে পারি, সৌভাগ্যবান নাকি অভাগা?
একটি দেশের সরকার তখনই সফল, জনগণের আস্থাভাজন, জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী, যখন তারা দেশের বেশির ভাগ নাগরিকের মাইন্ড রিড (মন পড়া/বুঝা) করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের মন জয় করবেন এবং নিশ্চিত করবেন যাতে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। ১০০% সন্দিহান, বাংলাদেশের সরকার আদৌ ১০% নাগরিকের মাইন্ড রিড করতে পারছেন কি না। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের কোনো বিবৃতি বা মন্তব্যই কেউ শ্রদ্ধা বা আস্থার সাথে গ্রহণ করছেন না।
বর্তমান পরিপ্রেেিত বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বিবৃতি দিয়েছেন, ‘রাষ্ট্রীয় মতা পাগলদের হাতে চলে গেছে!’ সরকারদলীয় এমপি গোলাম মাওলা রনি বর্তমানে শিকাগোতে ইন্টার্নশিপ করছেন। আলজাজিরা ও সিএনএন চ্যানেলে সাভারের ঘটনাটি দেখার পর রনির মেন্টর (রনি যার অধীনে গবেষণায় রত) বললেন, তার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর) বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে তিনি ঠিক নেই। এই যদি হয় মন্ত্রীর বুদ্ধি, তাহলে আমরা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কাকে বলব! আমাদের দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা দেশের ভাবমর্যাদা আর কিভাবে ডুবাবেন! গত বছর অর্থমন্ত্রী হলমার্ক কেলেঙ্কারির ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঘুষ কোনো টাকাই নয়। এভাবে বিভিন্ন মন্ত্রী এমপির আরো অনেক হাস্যকর উক্তি আছে, যা লিখে শেষ করা যাবে না।
উক্তিগুলো দেড় বছর আগে দেশে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের পরপরই সৃষ্ট কিছু জোকের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। জোকে সরকারি দল বলছে, ‘এইডা বিরোধী দলের নেতার এক নতুন ষড়যন্ত্র! তিনি দেশে অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন।’ অন্য দিকে বিরোধী দলের মন্তব্য, ‘ভূমিকম্প হইল ইন্ডিয়ায় আর ঝাঁকুনি খাইলাম আমরা! এর থেকেই বোঝা যায় সরকার দেশ ইন্ডিয়াকে দিয়া দিছে।’
সাভারের ঘটনায় পুরো জাতি যখন শোকে মুহ্যমান, স্তম্ভিত, ঠিক তখনই কিশোরী মেয়েদের নিয়ে কেউ কেউ মেতে উঠেছিল তাদের চিরাচরিত বিনোদন অনুষ্ঠান নিয়ে। এ লজ্জা কিভাবে ঢাকি! তাদের উচিত ছিল যারা মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন আল্লাহর কাছে দোয়া প্রার্থনা করা, যাতে সেখানে আল্লাহর রহমত নাজিল হয় এবং যারা শাহাদাত বরণ করেছেন আল্লাহ যেন তাদের জান্নাতবাসী করেন। একই সাথে, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারদলীয় প্রথমসারির মন্ত্রী এমপিরা মশগুল ছিলেন এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ নিয়ে। এমন একটি শোক দিবসে দুনিয়ার যেকোনো দেশই অনুষ্ঠানটি এক দিনের জন্য হলেও পিছিয়ে দিত। এ অনুষ্ঠানটি পূর্বনির্ধারিত হলেও, সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
সরকার আট হাজার কোটি টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনতে পারে, অকারণে দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করতে পারে, অথচ উদ্ধার কাজে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জাম না থাকায় আজ শত শত লোক চোখের সামনে দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে অপমৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছেন। পঙ্গুত্ব বরণ করছেন হাজার হাজার লোক। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অসংখ্য সংবাদ ও ভিডিও কিপ দেখে নিজেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছি। আটকে পড়া মানুষ জীবন-মরণের সন্ধিণে মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে একটু বাঁচার জন্য কিভাবে আকুতি করেছে, নিজেদেরই প্রাণ ভিা চাচ্ছে! এগুলোর ভয়াবহ বর্ণনা আমার মতো একজন আবেগপ্রবণ মানুষের পে লেখায় বা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রতিবারই গার্মেন্টে আগুন লাগার পর উদ্ধারকাজের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উচ্চ প্রশিণপ্রাপ্ত উদ্ধারকর্মীর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উঠে এলেও, এ ব্যাপারে কোনো সরকারকেই পদপে নিতে দেখিনি।
ইতোমধ্যে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সরকারের তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগের বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে এসেছে। পোশাক শিল্পের অনেক বিদেশী উদ্যোক্তা বিভিন্ন যুক্তিতে বাংলাদেশে ভবিষ্যতে বিনিয়োগের ব্যাপারে ‘রেড সিগন্যাল’ দেখাচ্ছেন। যে দেশের অর্থনীতি অনেকাংশেই পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, সে দেশের শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের ব্যর্থতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বিদেশীরা বাণিজ্য করে ব্যবসায়িক অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে। একের পর এক এ শিল্পের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের সাথে উন্নত বিশ্বের ব্যবসায়িক সম্পর্ক অনেকবারই হোঁচট খেয়েছে। সাভারের ঘটনায় শ্রমিকেরা ইতোমধ্যে ধর্মঘট, আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। ফলে উৎপাদন হবে বন্ধ। যেসব দেশ প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করে বিভিন্ন মওসুমে তাদের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের কাছ থেকে তৈরী পোশাক পাওয়ার অপোয় আছে, তাদের কী হাল হবে? এ তি কিভাবে পূরণীয়?
আজ সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দেশের প্রায় সব পেশাজীবীর মানুষ তাদের মৌলিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। তন্মধ্যে বাবা-মা, স্ত্রী-কন্যা, ছাত্র, শিক, অভিভাবক, ডাক্তার, আইনজীবী, গার্মেন্টশ্রমিক, সাংবাদিক সমাজ অন্যতম। সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক রোষানলের শিকার হয়েছে সাংবাদিক গোষ্ঠী। গত ২ মার্চ দৈনিক আমার দেশের সম্পাদকীয়তে ‘আদর্শ সাংবাদিকতা বনাম পপাতদুষ্ট সাংবাদিকতা’ শিরোনামে আমার একটি বিশদ আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। লেখাটি প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যে অনলাইন এবং অফলাইনে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত পাঠকদের কাছ থেকে লেখাটির স্বপে যে পরিমাণ সাড়া বা মন্তব্য পেয়েছি, একেক করে গুনে শেষ করতে পারব না। পাঠকদের একটা বিশেষ অংশ ছিল সিডনিতে অবস্থানরত প্রবাসী পাঠকও, যাদের মধ্যে ছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন মতাদর্শের লোক। দলমত নির্বিশেষে আর্টিকেলটির গ্রহণযোগ্যতা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এক বিশাল অংশ আদর্শ সাংবাদিকতার পে এবং অসৎ সাংবাদিকতার বিপ।ে
কেউ কেউ মনে করেন, সাংবাদিক সমাজের অনৈক্যের ফলেই দুষ্টচক্র সুযোগ পায় এবং সাংবাদিকদের হুমকি, হয়রানি, মামলা, গ্রেফতার, অকারণে রিমান্ডের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করছে না। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা এবং দীর্ঘ এক বছরেরও অধিক সময়ে সরকারের দেয়া বিভিন্ন কঠোর ওয়াদা সত্ত্বেও সত্যিকার খুনিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় না আনা এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বশেষ আরেকটি কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে কলম সৈনিক এবং সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে আলোচিত, জনপ্রিয় এবং বিদ্রোহী সাংবাদিক ও লেখক মাহমুদুর রহমানকে শুধুই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গ্রেফতার করে জেলহাজত ও রিমান্ডের নামে নির্যাতন করে। ক্রমেই তার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। মাহমুদুর রহমানের একটাই দোষ, তিনি যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ওপর স্কাইপ সংলাপ প্রকাশ করেছিলেন। অত্যন্ত মজার বিষয় হচ্ছেÑ স্কাইপ সংলাপের প্রথম অংশ প্রকাশের পরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম কোনোরূপ মন্তব্য না করেই পদত্যাগ করেন। আমার দেশে স্কাইপের সংলাপগুলোর প্রকাশ যদি ভুলই হতো তাহলে তিনি পদত্যাগ না করে নিজ পদে এখনো বহাল থাকতেন। ফলে আমার মতো কোটি কোটি মানুষের মাথায় ঢুকছে না মাহমুদুর রহমানের আসল অপরাধ কী?
গতকাল অস্ট্রেলিয়ার বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় চ্যানেলে সাভারের ঘটনাটির শিরোনাম দেখে হতাশ হলাম। একই দিনে অন্য একটি জাতীয় চ্যানেলেও দেখলাম ইউনিসেফের একটি বিজ্ঞাপনচিত্র। সেখানে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের ছোট ছোট শিশুদের দিয়ে বিল্ডিংয়ের কাজে ব্যবহারের জন্য কিভাবে ইট, পাথর ভাঙানোসহ আরো কিছু অমানবিক কাজ করানো হচ্ছে। যে শিশুদের আজ স্কুলে থাকার কথা তারা সেখানে কেন? অস্ট্রেলিয়ার শিশুদের দিয়ে যদি এ বয়সে এ ধরনের কাজ করানো জঘন্য অপরাধ ও অমানবিক হয়ে থাকে, বাংলাদেশের শিশুরা কী দোষ করেছে?
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business


সাভারে গত ২৪ এপ্রিল বুধবার ধসে পড়া রানা প্লাজা থেকে এ পর্যন্ত উদ্ধার করা লাশের সংখ্যা চার শ’ ত্রিশ। মূলত স্বেচ্ছাসেবী মানুষের অকান্ত পরিশ্রমে কয়েক শ’ মানুষকে জীবন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি কিংবা সংগঠনের অভাব সত্ত্বেও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের অদম্য উৎসাহ ও দৃঢ়তার প্রশংসা সবাই করেছেন। উদ্ধারকাজের গোড়ার দিকে সেনাবাহিনীর তৎপরতা খুব বেশি চোখে পড়েনি। সেনাবাহিনী এখন ভারী যন্ত্রপাতি নিয়োগ করেছে। খুব সম্ভবত ‘রিকভারির’ (জীবিত উদ্ধার) চেয়ে ‘স্যালভেজই’ (লাশ ও সম্পত্তি উদ্ধার) হবে মূল লক্ষ্য। আর কত লাশ উদ্ধার হবে, তা নির্ভর করছে মাটির নিচে দেবে যাওয়া তলাগুলো উঠানো সম্ভব হবে কি না তার ওপর। তবে সংখ্যা নিশ্চয়ই অনেক বেশি হবে। নয় শতাধিক এখনো নিখোঁজ। তাদের মধ্যে খুব বেশিসংখ্যক জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা এখন ছেড়ে দিতেই হবে। বিশ্ব মিডিয়া উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প সম্বন্ধে অত্যন্ত করুণ একটা চিত্র তুলে ধরছে দিনের পর দিন। দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পরে রোববার পর্যন্তও ব্রিটিশ রেডিও এবং টেলিভিশনের খবরে এটাই ছিল প্রধান শিরোনাম। পত্রিকাগুলোও খুবই বিস্তারিত খবর ও প্রতিবেদন প্রচার করেছে দিনের পর দিন। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মিডিয়াও মোটামুটি একই রকম গুরুত্ব দিয়ে এ ঘটনাটা প্রচার করেছে। লন্ডনে অনেক অবাঙালিও ব্যক্তিগতভাবে শোক ও সহানুভূতি জানিয়েছেন বাংলাদেশীদের। একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও এরকম ট্র্যাজেডি ঘটতে দেয়া সম্ভব বলে তারা ভাবতে পারছিলেন না।

শেখ হাসিনা তার বর্তমান সরকারে এ যাবৎ দু’জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করেছেন। শুনেছি তাদের উভয়ের সম্পর্কে চায়ের দোকানে কিংবা বৈঠকখানায় মানুষ ‘স্টুপিড’ এবং ‘ইডিয়ট’Ñ এ দুটি ইংরেজি বিশেষণই ব্যবহার করে বেশি। এ দু’জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজকর্ম এবং কথাবার্তাদৃষ্টে অন্য কোনো বিশেষণ হয়তো খুঁজে পাওয়া সত্যি কঠিন। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ভবনধসের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় হীনমতি রাজনৈতিক ফায়দা আদায়েরই চেষ্টা করেছিলেন। বিরোধী দলগুলোকে অপবাদ দেয়ার আশায় তিনি বলেছিলেন, বিএনপি ও জামায়াতের লোকেরা রানা প্লাজার পিলার ধরে নাড়াচাড়া করছিলেন, সে কারণেও এই আটতলা ভবনটি ধসে পড়ে থাকতে পারে। শত শত মানুষের মৃত্যু নিয়ে এমন কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা অচিন্তনীয়।
মন্ত্রী নির্বাচনে শেখ হাসিনার সুখ্যাতি নেই, ছিল না কখনো। তার নিজের বিচারবুদ্ধি সম্বন্ধেও হতাশা প্রকাশ করা হয়। সাভারের এই মহা ট্র্যাজেডির ব্যাপারেও তিনি সেসবের ওপর উঠতে ব্যর্থ হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষের প্রাণরক্ষা এবং ত্রাণ প্রচেষ্টার চেয়েও নিজের সরকার, দল আর সে দলের প্রভাবশালীদের রক্ষা করাই যেন বড় হয়ে উঠেছিল। প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল অন্য সব অনুষ্ঠান-আয়োজন বাতিল করে উদ্ধার ও ত্রাণকাজের তদারকিতে মনোনিবেশ করা। সেটা তিনি করেননি। পাঁচ দিন বিলম্বে তিনি প্রথমে হাসপাতালে কয়েকজন আহতকে এবং তারও পরে সাভারের বিধ্বস্ত ভবনটির ধ্বংসস্তূপ দেখতে গিয়েছিলেন।
 জেনারেল ইয়াহিয়া ও শেখ হাসিনা
চরম মর্মবেদনার সাথে আমাকে ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের মহা সাইকোনের কথা স্মরণ করতে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার সে প্রলয়ের ক্ষয়ক্ষতিকে খাটো করে দেখাতে চেয়েছিল। ১৪ নভেম্বর ইয়াহিয়া খান মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের হয়ে দূতিয়ালি করতে পিকিং যাচ্ছিলেন। পথে সাত-আট ঘণ্টা ঢাকায় তিনি যাত্রাবিরতি করেন। কিন্তু ভোলা-মনপুরা-হাতিয়া অঞ্চলের সে প্রলয় সম্বন্ধে কিছুই বলেননি তিনি। এমনকি হেলিকপ্টার কিংবা বিমান থেকেও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখে আসার গরজ বোধ করেননি কিন্তু পাকিস্তানকে সে জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের বিুব্ধ মানুষ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছিল একধরনের প্রতিশোধ হিসেবেই। এর জের ধরেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে, পাকিস্তান ভেঙে যায়।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার পরে একটি ট্রেনের উদ্বোধন করতে যাওয়া কি দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল? প্রকৃত পরিস্থিতি সম্বন্ধে খোঁজখবর না নিয়েই সেখানে তিনি ঘোষণা করেন, আগের দিন ভবনটিতে ফাটল দেখা যাওয়া এবং পুলিশের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও গার্মেন্টশ্রমিকেরা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কর্মস্থলে ঢোকে এবং তার ফলেই সেখানে প্রাণহানি ঘটেছে।
অথচ আসল ব্যাপার সম্পূর্ণ বিপরীত। পাঁচটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির শ্রমিকেরা ফাটল ধরা ভবনে কারখানায় কাজে যেতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু তাদের কাজে যেতে বাধ্য করেন মালিকেরা। স্বল্পমজুরির এই শ্রমিকেরা চাকরি হারানোর ঝুঁকি নেবেন বলে কেউ আশা করতে পারেন না। মালিকদের নির্দেশ মেনে নিতে তারা বাধ্য হয়েছিলেন। মালিকেরা বলেছেন, রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা তাদের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে, ভবনটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। ফ্যাক্টরিগুলোর এবং ভবনের মালিকের বিশেষ স্বার্থ ছিল সে দিন কাজে যেতে বাধ্য করায়। সে দিন ছিল বিএনপি আহূত ৩৬ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় দিন। হাজার হাজার গার্মেন্টশ্রমিককে কাজে যেতে বাধ্য করে মালিকেরা দেখাতে চেয়েছিলেন যে, সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির হরতাল পুরোপুরি সফল হয়নি। জানা গেছে, এই শ্রমিকদের দিয়ে একটি হরতালবিরোধী মিছিল করানোর পরিকল্পনাও ছিল ভবনের মালিকের।
 ট্র্যাজেডি নিয়ে রাজনীতি
প্রধানমন্ত্রী হাসিনা দ্বিতীয়বার জাতিকে বিভ্রান্ত করেছেন সংসদে দেয়া ভাষণে। সেখানে তিনি বলেছেন, রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা যুবলীগের (অতএব আওয়ামী লীগেরও) কেউ নন। কিন্তু তার পরপরই ঝাঁকা ঝাঁকা প্রমাণ হাজির হয়। দেখা যায়, সোহেল রানা প্রকৃতই যুবলীগের নেতা এবং ওই এলাকা থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মুরাদ জংয়ের বিশেষ বন্ধু। দেখা যাচ্ছে, সরকার ও আওয়ামী লীগ এবং কিছু পরিমাণে সংশ্লিষ্ট গার্মেন্টমালিকদের গা বাঁচানোর চেষ্টাতেই প্রধানমন্ত্রী এমন উক্তি করেছেন।
গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সাথে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক গভীর। হাতিরঝিলে সমিতির সুরম্য বহুতল ভবনটি অবৈধভাবে নির্মিত হলেও সরকার এতকাল এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং জানা গেছে, এ ব্যাপারে সমিতির সাথে সরকারের একটা সমঝোতা হয়েছিল। সরকার হেফাজতে ইসলামের প্রভাব হ্রাসের আশায় ২৭ এপ্রিল মতিঝিলে নারী সমাবেশ ডেকেছিল এবং সমিতিকে বলেছিল, গার্মেন্ট কারখানাগুলোর হাজার হাজার নারী শ্রমিককে সে সমাবেশে হাজির করতে। ‘পুরস্কার’ হিসেবে সরকার আশ্বাস দিয়েছিল, সমিতির অবৈধ হাতিরঝিল ভবনটি ভেঙে ফেলা হবে না। এ সমাবেশটি স্থগিত করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং নেতাদের অনেকেই গার্মেন্ট শিল্পের মালিক। তাদের সমিতির কাছ থেকে সরকার ও শাসক দল আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য পায় বলেও শোনা যায়। আগামী নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার বিধান করার লক্ষ্যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বে ১৮টি দল বর্তমানে যে আন্দোলন করছে, তাতে ক্ষান্ত দিতে গার্মেন্ট শিল্প সমিতির কর্তাব্যক্তিরা পরোক্ষ চাপ দিচ্ছিলেন বলেও শোনা যায়। অথচ, নির্যাতন ও নিপীড়নের পথ পরিত্যাগ করতে তারা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়নি। বিচিত্র নয় যে, সাভারের বর্তমান ট্র্যাজেডি থেকেও তাদের যথাসাধ্য রক্ষার চেষ্টা করবে এই সরকার।
তা ছাড়া কিছুটা হলেও এই ট্র্যাজেডি দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থেও ব্যবহার করতে চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন প্রধানমন্ত্রী ‘এ সময় হরতাল ভাঙচুরে বিরত থাকারও’ আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দলগুলোকে। উল্লেখ্য, তিনি যখন ট্রেন উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া তখন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যের সুবিধার জন্য তাদের হরতালের অবশিষ্টাংশ প্রত্যাহার করেছিলেন। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর চার দিন আগেই তিনি উদ্ধারকাজ দেখতে সাভারে গিয়েছিলেন।
কিসের ভাবমূর্তি? কে ভাঙছে ভাবমূর্তি?
ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকা খবর দিয়েছে, ট্র্যাজেডির খবর পাওয়ার পরপরই ব্রিটিশ সরকার উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যে সহায়তাদানের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। টেলিগ্রাফের খবর অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি নাকি বলেছেন, ধ্বংসস্তূপে আটক শ্রমিকদের উদ্ধারেও বিদেশি সাহায্য নিলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ুণœ হবে। ভাবমূর্তির দোহাই পেড়েছেন তৈরী পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আতিকুল ইসলামও। তিনি বলেছেন, ভবনধসের চিত্র ও প্রতিবেদন প্রচার করে মিডিয়া নাকি দেশের ভাবমূর্তি ুণœ করছে।
বর্তমান সরকারের শত রকমের অপকাণ্ডে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সর্বাঙ্গে বহু পরত আলকাতরা লেপে গেছে। ভাবমূর্তির এমন কী অবশিষ্ট আছে যা প্রায় চার শ’ লাশ আর নয় শতাধিক নিখোঁজ ব্যক্তির অনন্যসাধারণ মানবিক কাহিনী প্রচারে ুণœ হতে পারে? এ কথা বলে দেয়া প্রয়োজন, ভাবমূর্তির বারোটা বাজিয়ে দেয়ার ব্যাপারে বিজিএমইএ’র ভূমিকা সরকারের চেয়ে কম নয়। মাত্র চার মাস আগে তাজরীন ফ্যাশনসের গার্মেন্ট কারখানায় ১১২ জন শ্রমিক পুড়ে মারা গেছেন। এর আগে স্পেকট্রাম ও অন্যান্য কারখানায়ও অনুরূপ ট্র্যাজেডি ঘটেছে। শ্রমিকেরা কিছু চুরি করে নিয়ে যাবেÑ এ ভয়ে আপদকালে আত্মরক্ষার জন্য বেরিয়ে যাওয়ার পথগুলো তালাবদ্ধ করে রাখা এই শত শত মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য দায়ী। সরকার এসব কারখানার মালিকদের উপযুক্ত কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়নি। বিজিএমইএ-ও সদস্যদের এসব হত্যাকাণ্ডের পথ থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেনি।
বাংলাদেশের গার্মেন্ট উৎপাদকেরা দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক। বিশ্বে চীনের পরেই বাংলাদেশের স্থান। কিন্তু বিগত দু-তিন বছরে বিদেশীরা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ট্র্যাজিক দুরবস্থার সমালোচনায় মুখর। মার্কিন সরকার কয়েক বছর ধরেই পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন ও কাজের অবস্থার উন্নতি এবং তাদের ইউনিয়ন গঠনের অধিকারদানের দাবি জানিয়ে এসেছে। শ্রমিকদের নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যারহস্য জানাতেও তারা বিজিএমইএ এবং শেখ হাসিনার সরকারের ওপর চাপ দিয়ে আসছে। মার্কিন সরকার কার্যত বলেই দিয়েছে, এসব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির বর্ধিত কিংবা সংরক্ষিত কোটা নিরাপদ নয়।
তাজরীন ফ্যাশনসের ট্র্যাজেডির পর যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ রিটেইলার চেইন শপ, ওয়ালমার্ট বাংলাদেশ থেকে তৈরী পোশাক আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। রানা প্লাজায় অবস্থিত কারখানাগুলো অন্যদের মধ্যে ব্রিটেনের প্রাইমার্ক ও ম্যাঙ্গো গ্রুপকে তৈরী পোশাক সরবরাহ করত। ব্রিটেনে এখন এদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠছে। খদ্দেররাও বলাবলি করছেন, এ দু’টি কোম্পানির উচিত বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ তৈরী পোশাক আমদানি বন্ধ করা। চ্যারিটি সংস্থা ওয়ার অন ওয়ান্ট এবং অ্যাকশন এইড নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণদানের দাবি জানিয়েছে।
বিভিন্ন মহল থেকে প্রস্তাব এসেছে, যারা প্রাইমার্ক থেকে সস্তায় বাংলাদেশে তৈরি টি-শার্ট কিনেছিলেন তাদের উচিত কিছু পরিমাণ অর্থ নিহত শ্রমিকদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বাবদ দান করা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য সদস্যদেশেও একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বলে শুনেছি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের মূল বাজার। সাভার ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তিদান, গার্মেন্টশ্রমিকদের কাজের শর্ত ও পরিবেশ উন্নত করা না হলে বাংলাদেশ শিগগিরই এই বাজার হারাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘ভাবমূর্তি’ সেটা ঠেকাতে পারবে না।
 গুরুপাপে লঘু দণ্ড?
কিন্তু সরকারের মতিগতিদৃষ্টে মনে হতে পারে যে, অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তিদানের কথা তারা ভাবছেন না। পলাতক সোহেল রানাকে বেনাপোল থেকে র‌্যাব হেলিকপ্টারে ধরে এনেছে বলে মিডিয়ায় প্রচুর নাটক সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা কী? ভেতরে ভেতরে জানা যাচ্ছে, সোহেল রানাকে বিধ্বস্ত ভবন থেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছিলেন সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার অফিসার ইনচার্জ। সেসব খবর অনুযায়ী, রানা প্রথমে আত্মগোপন করেছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মুরাদ জংয়ের বাড়িতেই। অবিলম্বে এসব শোনা খবরের সত্যতা যাচাই করা না হলে জনসাধারণের ক্রোধ বেড়ে যেতে বাধ্য।
তার পরেও শোনা গেছে, রানার বিরুদ্ধে শুধু অমনোযোগিতা এবং নির্মাণবিধি লঙ্ঘনেরই অভিযোগ আনা হয়েছে। এ দুটো আইনে শাস্তি খুবই হালকা। শুনেছি, সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু রানা ও কারখানা মালিকদের যারা অনিচ্ছুক শ্রমিকদের একটা ফাটল ধরা ভবনে কাজে যেতে বাধ্য করেছিলেন তাদের প্রকৃত অপরাধ আরও বহু বহু গুণ বেশি গুরুতর। তাদের বিরুদ্ধে সঙ্গত অভিযোগ হওয়া উচিত ‘ম্যানস্লটার’ বা অনবধানতাবশত হত্যার। ব্রিটিশ আমলের যে ফৌজদারি দণ্ডবিধি আইনের বেশির ভাগ অবিকৃতভাবে বাংলাদেশের আইনে গৃহীত হয়েছে, তাতে এই ম্যানস্লটারের বিধান আছে। এ অপরাধের শাস্তি পরিকল্পিত হত্যার সর্বোচ্চপর্যায়ের শাস্তির কিছুটা কম। সরকার যদি দলীয় বিবেচনায় শাস্তির ভণিতা করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সহজেই ছেড়ে দেয়, তাহলে এক দিকে তারা বিুব্ধ শ্রমিকদের এবং জাতিকে শান্ত করতে পারবে না, অন্য দিকে বিদেশে বাংলাদেশে তৈরী পোশাকের ক্রেতাদেরও আশ্বস্ত করতে পারবে না।

Ads