বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

রক্তের এই হোলি খেলার শেষ কোথায়!


দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে হাজারো মানুষের মতো আমিও বিস্মিত। অন্যায়কারীরা অন্যায় করে যদিও পার পেয়ে যায়। সে কারণে ইতিহাস পিছনে থাকে না। ইতিহাস তার আপন মহিমায় সত্যের উন্মোচন সর্বদা জাতির সামনে প্রকাশ করে দেয়। হরতাল আর অবরোধের ৪৮ দিনে সারা দেশে যে অমানবিক রক্তপাত ঘটেছে তা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। রক্তের এই হোলি খেলার রাজনীতিতে দগ্ধ হচ্ছে নিরীহ মানুষ। পেট্রলবোমার নিষ্ঠুর আঘাতে পুড়ে ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে মানুষের দেহ। বার্ন ইউনিটের বিভৎস মানুষের ছবি মিডিয়ায় প্রচারিত হলেও পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে যারা পঙ্গু হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তাদের সংবাদ মিডিয়ায় সেভাবে প্রচারিত হয়নি। কোন সুস্থ বিবেকবান মানুষ যেমন পেট্রলবোমার মতো জঘন্য অপরাধকে সমর্থন করতে পারে না। তেমনিভাবে গুম, খুন, অপহরণ, ক্রসফায়ায়ের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডেরও সমর্থন করা যায় না।
রক্তপাতের হোলি খেলার রাজনীতি আমরা কেউ চাই না। তার পরেও সারা দেশে আগুনের লেলিহান দাউ দাউ করে জ্বলছে দেশ। দেশের কোথাও আজ শান্তির লেশমাত্র নেই। সর্বত্র চলছে গুম, খুন, পেট্রলবোমা আর ক্রসফায়ারের মহাউৎসব। এই লেখাটি শুরু করছি ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথের স্মরণীয় একটি উক্তি দিয়ে - তিনি বলেছিলেন আমার প্রজাদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা ভিন্ন আমার কাছে এই পৃথিবীর কোনো কিছুই মূল্যবান নয়। রাণী এলিজাবেথ আজ দুনিয়াতে নেই। কিন্তু তার এই সহানুভূতির আবেগ ভালোবাসাকে শ্রদ্ধার চোখে স্মরণ করতেই হয়। অত্যাচারী জালেম নিষ্ঠুর শাসক হতে পড়াশোনা করা লাগে না একটু হিংসার পথ গ্রহণ করলেই হওয়া যায়। ইতিহাস সাক্ষী, রাজা বাদশারা যখনই ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জনগণের উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাতে ন্যায় অন্যায়ের ধার ধারেন নাই ঠিক তখনই প্রকৃতির তার আপন মহিমায় প্রতিশোধ নিয়ে জনগণকে মুক্তির পথের দিশা দিয়ে দেন। আর তখন জনগণও উপলব্ধি করে, দুঃসময় কারও জন্য চিরস্থায়ী হয় না।
চলমান হরতাল অবরোধের সহিংসতার হাত থেকে কারও মুক্তি নেই। জীবনের প্রয়োজনে চিন্তাহীনভাবে ঘর থেকে বের হয়ে আবার ঘরে ফিরে আসার গ্যারান্টি নেই বলেই চলে। উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার ভেতরে পার করতে হচ্ছে এক একটি দিন। পেট্রলবোমা বা ককটেলের আঘাতে পুড়ে যাওয়া মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ আর আহজারিতে বাংলার আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে ওঠেছে। মানুষ পুড়ছে,বার্ন ইউনিটে আসছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষের যন্ত্রণাকে ছোট করে দেখার সুযোগ যেমন নেই, তেমনিভাবে যারা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন তাদের স্বজনদের সান্তনা দেবার ভাষা আমার জানা নেই। কত দেখা যায়? কত মেনে নেওয়া যায়? আর কতই বা লেখা যায়? নারকীয় এই পরিস্থিতির দায় যখন কেউ নিতে চায় না তখনই মনের মধ্যে একটি প্রশ্নই আসে- নিরপরাধ এই মানুষগুলোকে পুড়িয়ে কি গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়? সরকার প্রধান প্রায়ই বলেন আমি তো নির্বাচনের আগে তাদেরকে সংলাপের আহ্বান করেছি। নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য আহ্বান করেছি। এমনকি বেগম জিয়ার ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর সমবেদনা জানাতেও গিয়েছি। সবই সত্য কথা। তবে একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, প্রধানমন্ত্রী যা করেছেন তা সবই তার র্কতৃত্ববাদের খায়েশ পূরণ করার প্রয়াসে। সংলাপ হবে, তবে প্রধানমন্ত্রীর বেধে দেয়া সময়ে। নির্বাচন হবে,তবে প্রধানমন্ত্রীরই অধীনে।শোক জানাতে গিয়েছেন সত্যি তবে খালেদা জিয়ার দেয়া সময়ে নয় প্রধানমন্ত্রীর সময়ে। এর নাম যদি গণতন্ত্র হয় তাহলে স্বৈরতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য কি হতে পারে? সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, বিচার মানি তালগাছ আমার। খবরের কাগজের শিরোনামে দেখার কথা ছিলো সুখী সমৃদ্ধ দেশের উন্নয়নের কথা তার পরির্বতে শিরোনামে দেখতে হয়েছে গুম,খুন,ক্রসফায়ারে মতো নাটকীয় বন্ধুক যুদ্ধের কথা।
নদীমাতৃক এই দেশের নদীর পানিতে ভাসছে অজ্ঞাত মানুষের পঁচা বিভৎস লাশ। এই লাশের বেঁচে থাকা স্বজনেরা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে দিনপাত করলেও কেউ বিচারের সান্ত¡নাটুকু দিতে পারছেন না। খুন করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া আজ মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবাক হওয়ার কিছুই নেই, আমরা যারা ছিচকে চোর, পকেটমার বা ছিনতাইকারীকে হাতে না হাতে ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলে উচিত শিক্ষা দিই,তাঁদের অনেকে ক্রসফায়ায়ের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন করছেন। দেশব্যাপী ফের গুম আতংকের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে গণগ্রেফতার। আন্দোলন দমাতে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আবার কোথাও কোথাও চলছে যৌথবাহিনীর অভিযান। নেতাদের না পেয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে তাদের স্বজনদের। সারা দেশের কারগারগুলো বন্দীদের ভিড়ে ঠাসা ঠাসি হয়ে গেলেও কমতি নেই গ্রেফতারের। এই অবরোধ হরতালকে ঘিরে ১৪ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিপর্যস্ত আজ দেশ। বিপন্ন হচ্ছে মানবাধিকার। মারা যাচ্ছে মানুষ। কেউ পেট্রলবোমায়,কেউ গুলিতে,কেউ বন্দুকযুদ্ধে। দেশের রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন সারা দুনিয়া। সংলাপের তাগিদ দিচ্ছেন সবাই। কিন্তু আওয়ামী সরকার সে পথে হাঁটছেন না। চলমান পরিস্থিতিকে কোনো ভাবে তারা রাজনৈতিক সংকট মনে করছেন না। সরকারের মন্ত্রী এমপিদের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে একই সুরে কথা বলছেন প্রজাতন্ত্রের নিয়োজিত কর্মকর্তারা। রাজনীতিবিদেরা যে ভাষায় কথা বলেন ঠিক একই ভাষায় তারা কথা বলতে শিখেছেন। তাদের এই অতিকথনের ভাষাকে জনগণ স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি।
টিভি পর্দায় শুধু একপক্ষের মুখই দেখা যাচ্ছে। তারাও নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তিদের মতো করে একপেশে সব কিছু দেখছেন। দেশের হাজারো মানুষ আজ ভয়ে বাহিরে যেতে  পারছেন না। সেখানে সরকার এটাকে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা জনিত সমস্যা হিসেবে। দেশের কোথায়ও তারা কোন আন্দোলন দেখছেন না। কিন্তু ক্ষমতার সিড়িঁকে আজীবন আকড়ে ধরার প্রয়াসে বিরোধী শক্তিকে নির্মূল করার সকল আয়োজনের এজেন্ডা হাতে নিয়েছেন। বাংলাদেশে নির্মূলের রাজনীতি এমন প্রকাশ্যে অতীতে এ জাতি দেখেনি। সরকারের একাধিক মন্ত্রী প্রকাশ্যেই যুদ্ধ আর অস্ত্র প্রয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর দেখামাত্র গুলি সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কেউ কেউ বলেছেন,সমাজের কল্যাণ চিন্তাই যার লক্ষ্য হওয়া উচিত তিনি একি বললেন! বেফাঁস মন্তব্যের জন্য তিনি আগেই দেশবাসীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আরো একধাপ এগিয়ে এবার বললেন বেগম খালেদা জিয়াকে পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া উচিত। সকলের মনে থাকার কথা জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা মঈন উদ্দিন খান বাদলের উক্তিটি। তিনিই প্রথম গুলি করার প্রসঙ্গটি সামনে আনেন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বুকে গুলি চালানোর জন্য পুলিশের প্রতি আহ্বান জানান। এর পর বিভিন্ন মহল থেকে চরম ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি-হুশিয়ারি একের পর এক আসতে থাকে।একদিকে হুংকার অন্যদিকে হরতাল অবরোধ। চারদিকে দাউ দাউ করে জলছে বাস ট্রাক সহ নানাবিধ যানবাহন। বাতাসে প্রবাহিত হচ্ছে পোড়া মানুষের গন্ধ। নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যম। চলছে দমন পীড়নের অভিযান। ঘর থেকে বের হলে পেট্রোল বোমায় বা আগুনে দগ্ধ হওয়ার আতংক। ঘরে থাকলে গুম,গ্রেফতার ও ক্রসফায়ারের আতংক। একটু স্বস্তি নিরাপত্তার প্রত্যাশায় ঠিকানা খুঁজছে সবাই। কিন্তু কোথাও যেন তাদের নেই ঠাঁই। আছে শুধূ ভয় ভীতি আর গুলির ঝনঝনানির বিকট শব্দ। রাজনীতির এই শাখের করাতে জিম্মি অসহায় সাধারণ মানুষ। এই ভয়াবহ আতংক ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে সবাই পরিত্রাণ চায়।
মিডিয়ার সংবাদে বিভংসতার ছবি দেখে কারও পক্ষে স্থির থাকা সম্ভব না। তারপরেও মিডিয়ার সংবাদের বেশির ভাগ সময়ই বার্ন ইউনিটের দগ্ধ মানুষের সংবাদ দেশের মানুষকে দেখতে হয়েছে। এই হরতাল অবরোধ কেউ পছন্দ করে না। তারপরেও রাজনীতির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে হরতাল অবরোধকে। বার্ন ইউনিটের বিভৎসতার ছবি আমার মনকে যেমন কষ্ট দেয়,তেমনিভাবে বন্ধুকযুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা আমাকে আসত করে। দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা একবারের জন্য একটু ভেবে দেখেনি ওই বার্ন ইউনিটের পেছনে কি কারণ রয়েছে? পেট্রলবোমার আঘাতে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া এই মানুষগুলো কি কারণে মৃত্যুর মুখোমুখি?
সব ক্রিয়ারই একটা প্রতিক্রিয়া থাকে। রাষ্ট্রযন্ত্র ও দলীয় শক্তির বলে বিরোধী দল-মত দমনের চেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। জনগণের মধ্যে বিভেদ-সংঘাত সৃষ্টি করা পরিণতি দেশ ও জনগণের জন্য কখনোই কল্যাণকর হয় না। গত প্রায় এক মাসে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় ২৭-৩০ জনের বেশী। প্রথম আলোর ১৭ তারিখের পত্রিকায় শিরোনামে ওঠে এসেছে গুলিবিদ্ধ ১৫ জনের মধ্যে ৯ জনই অরাজনৈতিক ব্যক্তি। তাঁরা কেউ দিনমজুর,কেউ দোকানি,কেউ ভ্রাম্যমাণ খেলনা বিক্রেতা। একজন প্রবাসী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও রয়েছেন। হাসপাতালের ভর্তির পর এঁদের তিনজনের পা কেটে ফেলা হয়েছে। আহত ব্যক্তি ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ,কোনো অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ তাঁদের পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেছে। এই অপরাধ গুলো রাষ্ট্রের কেউ দেখেন না। আইনের পোষাকের জোরে যারা এই কাজগুলো করছেন তাদের বিবেকের কাছে একটি প্রশ্ন করতে খুবই ইচ্ছে করছে- বিনা কারণে যাদেরকে গুলি করছেন তারা তো আপনার আমার মতই মানুষ। আপনি কি পারতেন শত অপরাধ করলেও আপনার প্রিয় ভাইটিকে গুলি করতে? আমরা মনে করি দেশের প্রচলিত আইনে প্রত্যেকটি অপরাধীর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সরকার তা না করে উল্টোপথে পরিচালিত করছে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীকে। যে আওয়ামী সরকার ২০০৮ এর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ার বন্ধের কথা বলেছিল,আজ তারাই হয়েছে বন্ধুকযুদ্ধের প্রবর্তক। হত্যা আরও হত্যা ডেকে আনে এই সত্য কথাটি হয়ত তারা ভুলে যেতে পারে। কিন্তু দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমরা ভুলে যেতে পারি না। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সত্যকে আমরা মিথ্যের চাঁদরে ঢেকে ফেলে দিয়েছি। সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলার সৎ সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছি। মিডিয়াকে বলা হয় জাতির আয়না। সে আয়নাতে যখন একপক্ষের ছবি ভেসে ওঠে আরেক পক্ষের ছবি লুকায়িত থাকে তখন আর সত্য উন্মোচিত হতে পারে না। সরকারপক্ষ শুধুমাত্র পেট্রলবোমার সহিংসতা দেখতে পান। কিন্তু যারা ক্রসফায়ার বা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন তাদের ব্যাপারে নির্বিকার। যারা পেট্রলবোমার আঘাতে নিহত হয়েছেন তাদের ক্ষতি কোন কিছু দিয়ে পূরণ হবার নয়। অনুরূপভাবে যারা তথাকথিত বন্ধুক যুদ্ধে পুলিশের গুলিতে মারা যাচ্ছে তাদের ক্ষতিও কোনো দিন পূরণ হবার নয়।
পৃথিবীর ইতিহাসে আলেকজান্ডার দি গ্রেটকে মানুষেরা ভুলে যেতে পারে কিন্তু তার সে সহানুভূতির ইতিহাস ভুলে যেতে পারে না। আলেকজান্ডার যখন ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারতবর্ষে প্রবেশ করলেন,সেই সময় ভারতবর্ষে ছিল অসংখ্য ছোট বড় রাষ্ট্র। কারোর সাথেই কারোর তেমন ভালো সম্পর্ক ছিল না। প্রত্যেকেই পরস্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হত। প্রতিবেশী সমস্ত রাজাই আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার করে নিল। শুধুমাত্র একজন রাজা আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকার করলেন। তিনি হলেন রাজা পুরু। আলেকজান্ডার সরাসরি শত্রু সৈন্যদের মুখোমুখি হতে চাইলেন না। তিনি গোপনে অন্য পথ পাড়ি দিয়ে নদী পার হয়ে পুরুকে আক্রমণ করলেন। পুরু ও তাঁর সৈন্যবাহিনী অসাধারণ বীরত্ব প্রর্দশন করলেও আলেকজান্ডারের দক্ষ বাহিনীর কাছে পরাজয় বরণ করতে হল। অবশেষে আহত হয়ে বন্দী হলেন রাজা পুরু। তাঁকে নিয়ে আসা হল আলেকজান্ডারের কাছে। তিনি শৃঙ্খলিত পুরুকে জিজ্ঞাসিত করলেন। আপনি আমার কাছে কি রকম ব্যবহার আশা করেন? রাজা পুরু জবাব দিলেন। একজন রাজা অন্য রাজার সঙ্গে যে ব্যবহার করেন,আমিও সেই ব্যবহার আশা করছি। রাজা পুরুর বীরত্ব,তাঁর নির্ভীক উত্তর শুনে এতখানি মুগ্ধ হলেন আলেকজান্ডার অবশেষে মুক্তি দিয়ে শুধু তাঁর রাজ্যই ফিরিয়ে দিলেন না,বন্ধুত্ব স্থাপন করে আরো কিছু অঞ্চল উপহার দিলেন। আলেকজান্ডার আজ নেই কিন্তু তাঁর সহানুভূতির সেই ইতিহাস আজোও মানুষেরা স্মরণ করে। যারাই ক্ষমতার মসনদে থাকেন তাদের কাছ থেকে জনগণ সুন্দর বন্ধুত্বসুলভ আচরণ আশা করেন। যারা ভালোবাসা দিতে পারেন তারাই হলো প্রকৃত মানুষ। আমরা সরকারের কাছে হিংসার পরিবর্তে আলেকজান্ডারে সহানুভূতির মতো উদারতা প্রত্যাশা করছি। পাশাপাশি রক্তের এই হোলি খেলার নোংরা রাজনীতির হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোর দাবি করছি।
মোঃ তোফাজ্জল বিন আমীন 

মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল


দেশে কোনো নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের দাবিতে ৫৫ দিনের মতো অবরোধ চলছে। পাটুরিয়ায় কার্গোর ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে যাওয়ায় ৭০ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আর প্রতিদিন ক্রসফায়ারে মানুষ মরছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি একদিনেই ঢাকা ও ঝিনাইদহে ছয়জন মানুষ কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন। পেট্রলবোমায় প্রাণহানির ঘটনা যখন কমে এসেছে, তখন বাড়ছে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রাণহানির সংখ্যা। সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, শিগগিরই ঢাকা-চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার কথোপকথনের ঘটনা ফাঁস হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
বাংলাদেশে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র কাহিনী যখন থেকে প্রচারিত হয়েছে, তখন থেকেই শুরু হয়েছে অবিশ্বাস। বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা বলছে তা বিশ্বাস করছে না কেউ। কখনও কখনও তাদের বক্তব্য আজগুবি ঠেকছে। এবং এটা চলছে ধারাবাহিকভাবেই। সর্বশেষ ঢাকা ও ঝিনাইদহে যে ছয়জন তরুণ খুন হলেন তার কোনো দায়-দায়িত্বই যেন কেউ নিতে চাইছে না। পুলিশ বলছে ঢাকায় যে চারজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে তাদের একজন মারা গেছেন ‘বন্দুকযুদ্ধে’। বাকি তিনজন ‘গণপিটুনি’তে নিহত হয়েছেন। যে তিনজন ‘গণপিটুনি’তে মারা গিয়েছে বলে পুলিশ দাবি করছে, তাদের দেহে পাওয়া গেছে ৫৪টি গুলির চিহ্ন। পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টে গুলির চিহ্নের কথা উল্লেখ রয়েছে। এলাকায় গিয়ে সাংবাদিকরা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন যে, সেখানে গণপিটুনির কোনো ঘটনাই ঘটেনি। রাত ১১টা-সাড়ে ১১টার দিকে আশপাশের বাসিন্দারা কেবল গুলির শব্দই শুনেছে। চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি, হল্লার কোনো শব্দ তারা শোনেনি। ঘটনাস্থল এলাকায় পড়ে ছিলো গুলির খোসা, রক্তমাখা দড়ি আর ছোপ ছোপ রক্ত। এদিকে ঝিনাইদহে যে দুই তরুণের লাশ পাওয়া গেছে তাদের পরিবারের অভিযোগ, কয়েকদিন আগে পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এই দুইজনই বিএনপি’র কর্মী ছিলেন। এভাবেই নির্বিচার হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলো ঘটছে।
‘বন্দুকযুদ্ধে’র ঘটনাগুলো পুলিশের ভাষ্যমতে একই রকম। যাকে আটক করা হলো, তাকে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল নির্দিষ্ট গন্তব্যে। পথিমধ্যে তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে সবসময় পুলিশের হাতে আটক ব্যক্তি নিহত হয়। পুলিশের গায়েও গুলি লাগে না। সহযোগীদের গুলির আঘাতে পুলিশের গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। আবার যারা এই হামলা চালায় তাদের কেউও কখনও পুলিশের গুলিতে হতাহত হয় না। শুধু পুলিশের হাতে আটক ব্যক্তি নিহত হন। এর নামই ‘বন্দুকযুদ্ধ’। ফলে সাধারণভাবে কেউই এই কাহিনী বিশ্বাস করে না। কিন্তু কাহিনীর এই ধারাবিবরণী বহুদিন ধরে চলে আসছে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কিংবা যারা কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ন্যূনতম অপরাধের কোনো আলামত নেই। থানায় কেউ কোনোদিন তাদের নামে একটি জিডিও করেননি। নিরীহ মানুষ, দোকানদার, পথচারী, বাস হেলপার, কন্ডাক্টর এই শ্রেণীর লোকেরাও বন্দুকযুদ্ধের শিকার হচ্ছেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুরে যারা বন্দুকযুদ্ধের শিকার হন তাদের দুইজনের একজন বাসের হেলপার। অপরজন লেগুনার হেলপার। হাঁটুর উপরে গুলি খেয়ে যারা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, পুলিশের এই গুলির কারণে যাদের পা কেটে ফেলতে হয়েছে, এবং চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদেরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। কেউ দোকানদার, কেউ স্কুলছাত্র, কেউ বা ঝুট ব্যবসায়ী। পরিবারের তরফ থেকে দাবি করা হয় আটক করার পর পুলিশ তাদের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেছিলো। দিতে পারেনি বলে গুলি করা হয়েছে। তাতে কারো লাভ হয়নি। বরং পথে বসে গেছে এক একটি পরিবার।
এক্ষেত্রে পুলিশের আরও একটি প্রচলিত কথা আছে। আর তা হলো, নিহত ব্যক্তির নামে একাধিক মামলা ছিল। সেভাবে চিন্তা করলে মামলা থাকলেই যেন তাকে নির্বিচারে হত্যা করা জায়েজ। পুলিশের মামলারও কোনো আদি-অন্ত নেই। মামলার ধরন এ রকম যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখি কোনো একটি ঘটনায়, ধরা যাক, ককটেলবাজি, পুলিশের কাজে বাধাদান ইত্যাদি অভিযোগে দশজনের নামে মামলা করে আর ৫০০ অজ্ঞাত ব্যক্তির নাম তাতে অন্তর্ভুক্ত করে দেয় পুলিশ। ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ব্যক্তিদের নাম সেই হাজার হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তির তালিকায় লিখে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কারো নামে মামলা থাকলেই পুলিশ নিশ্চয়ই তাকে হত্যার অধিকার রাখে না। ‘ক্রসফায়ারে’র ক্ষেত্রে এমন অধিকার-অনধিকার বাছ-বিচার আমরা কমই দেখি।
অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে, পুলিশই যেন অভিযোগকারী, বিচারক এবং দন্ড কার্যকর করার অধিকারী। দেশের কোনো আইনে তাদের এমন অধিকার দেওয়া হয়নি। অথচ সে রকমই ঘটছে। পুলিশের তরফ থেকে আরও একটি কথা বলা হয়। আর তা হলো, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ব্যক্তি বিএনপি বা জামায়াতের সক্রিয় কর্মী ছিল। এটা কী ধরনের অভিযোগ, সেটা বোঝা বেশ মুশকিলের কথা। ভাবখানা যেন এমন যে, বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের কর্মী হলে তাদের নির্বিচারে হত্যা করা যায়। এমন কি নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সংগঠনের নেতা কর্মীকেও নির্বিচারে হত্যা করা যায়। তাছাড়া বিএনপি বা জামায়াত নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দল নয়। ফলে এসব হত্যাকান্ড স্রেফ হত্যাকান্ডই। অন্যসব হত্যাকান্ডের যেমন বিচার হয় বা হওয়া উচিত এ ধরনের হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। তা হলো আটকের পর অস্বীকার। বাংলাদেশের নাগরিকদের বিপদ হয়েছে এই যে, তাদের ধরতে আসার সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। যে কেউ যে কোনো সময় যে কোনো বেশে যে কাউকে আটক করতে আসতে পারে। আটক করতে আসে র‌্যাব। আটক করতে আসে ডিবি পুলিশ। আটক করতে আসে পোশাক পরা পুলিশ। এমনকি ইউনিফর্ম ছাড়া পুলিশও আসে আটক করতে। আর বিপদ হলো এই যে, আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা স্রেফ অস্বীকার করে বসে। আবার পরে কখনও তাদের আটকের কথা স্বীকার করে, কখনও করে না। যখন করে না, পরিবারে এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় তখন। কখনও কখনও আটককৃতরা একেবারেই গুম হয়ে যান। কখনও কোথায়ও খুঁজে পাওয়া যায় লাশ। কখনও পাওয়া যায় না। কখনও  শোনানো হয় ‘বন্দুকযুদ্ধে’র কাহিনী।
কার্যত বাংলাদেশ এভাবেই এখন একটি আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। এই লেখা যখন প্রকাশিত হবে তখন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার ভাগ্যে কী ঘটবে, তা আমাদের জানা নেই। সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে তার কথোপকথনের গোয়েন্দা রেকর্ড প্রকাশিত হবার পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে তিনটায় বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে ডিবি পুলিশ আটক করেছে বলে মান্নার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু ২৪ তারিখ বেলা দেড়টা পর্যন্ত পুলিশ সে কথা স্বীকার করেনি। এ সময় তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী বেগম সুলতানা মাহমুদুর রহমান মান্নার সন্ধান চেয়ে বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেছেন। এই পরিস্থিতিটাই বিপজ্জনক। কথোপকথনের ঐ রিপোর্টটি ২৩ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৩০টির বেশি মামলা দায়ের করা হয়। সংসদে এমপিরা তাকে গ্রেফতারের দাবি জানাতে থাকেন।
সাধারণত নিয়ম হলো, কাউকে আটক করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হবে। যখন পুলিশের তরফ থেকে অস্বীকার করা হয় যে, তাকে গ্রেফতারই করা হয়নি তখন স্বজনদের মধ্যে ভয় বাড়তে থাকে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি গুম হয়ে যায়, তবে কাউকে তার গুমের দায়িত্ব নিতে হয় না। পুলিশও হাত ঝেড়ে বলে দিতে পারে, আমরা তাকে আটকই করিনি। তার খবরও জানি না। যদিও কোনো মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেলে তাকে খুঁজে বের করাও পুলিশেরই দায়িত্ব। কিন্তু সে দায়িত্ব পালন না করার নানা অজুহাত পুলিশকে দিতে শুনেছি। পুলিশের কর্তা ব্যক্তিরা অনেক সময় এমনও বলেছেন যে, তার নামে মামলা রয়েছে। ফলে সে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপন করেছে। ব্যস, দায়িত্ব শেষ।
এর আগে বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ নেতা ইলিয়াস আলী এইভাবে গুম হয়ে যান। এখনও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। সে সময় অনুসন্ধানে যা তথ্য প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, তাতে দেখা যায়, একটি বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই তাকে তার বাসার সামনে থেকে তুলে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় বাধা দিতে গিয়েছিলেন  মোটরসাইকেল আরোহী এক টহল পুলিশ। তাকে ঐ বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে সরিয়ে দেন। কিন্তু কোনো বাহিনীই স্বীকার করেনি যে, ইলিয়াস আলীকে তারা আটক করেছে। আর আজ পর্যন্ত ইলিয়াস আলীর কোনো সন্ধানও পাওয়া যায়নি। এভাবে গুম হয়ে গেছে বহু মানুষ।
মাহমুদুর রহমান মান্নার তাহলে কী হলো? পরিবার বলছে, ডিবি পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। পুলিশ বলছে, তারা তাকে আটক করেনি। এ এক বিপজ্জনক অবস্থা। সেক্ষেত্রে কাউকে যদি ডিবি পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে আটক করতে যায়, তাহলে ঐ পরিবারের সদস্যদের করণীয় কী? তারা কি তাদের অফিসিয়াল প্যাডে লিখিত চাইবেন যে, আটক যে করে নিয়ে যাচ্ছেন, তার রিসিট দেন। তখন যে তারা পরিবারের সদস্যদেরও বেধড়ক পিটুনি দিতে থাকবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এবং এর কোনো বিচারও নেই। এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে না পেয়ে তার পরিবারের নারী সদস্যদের উপরও নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সেক্ষেত্রে অহরহ মিথ্যাচারও চলছে।
আমরা বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকা-ই মেনে নিতে রাজি নই। এসব হত্যাকা-েরও বিচার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে খানিকটা আতঙ্কিতও বোধ করছি, মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য। আমরা আশা করি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে সরকার অবিলম্বে আদালতে হাজির করবে। তার যদি কোনো দোষ হয়ে থাকে, তার বিচার আদালত করবে, পুলিশ নয়।
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 

সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সকল হত্যা-গুমের বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার


বাংলাদেশে নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা, জুলুম-নির্যাতন ও গ্রেফতার-হয়রানির বিরুদ্ধে সাংবিধানিক গ্যারান্টি প্রদান এবং জীবন-সম্মান, সম্পত্তি ও সন্তানের নিরাপত্তা বিধানের যে পবিত্র দায়িত্ব পালনের ভার আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর অর্পিত ছিল এবং এখনো আছে তা পালনে তারা ব্যর্থ হচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। পক্ষান্তরে অনেকে মনে করছেন যে, এই সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে তাদের আসল দায়িত্ব পালন করতে না দিয়ে দলীয় স্বার্থে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তারা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বাহনে পরিণত হচ্ছেন। তারা যে, নিরপেক্ষ, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতিভু এ কথাটি অনেকে ভুলে যাচ্ছেন। সরকার কর্তৃক অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূত কাজে তাদের ব্যবহার এবং অতিমাত্রায় দলীয়করণ অপরাধীদের উৎসাহিতকরণ প্রভৃতি এই বাহিনীর বেশ কিছু সদস্যকে বেপরোয়া করে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ অনুযায়ী এরা ভাড়ায় খেটে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের খুন করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। তারা সরাসরি গুলী করে মানুষ হত্যা করছে, গুমে অংশ নিচ্ছে এবং নাটক সাজিয়ে বন্দুকযুদ্ধ ও ক্রসফায়ারের নামে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও তাদের ছাত্রফ্রন্টের প্রতিশ্রুতিশীল ব্যক্তিদের খুন করছে। তাদের অনেকে দেশের নব্বই ভাগ নাগরিকের ধর্ম ইসলাম নির্মূলের প্রকাশ্য অভিযানে নেমেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
(দুই)
রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক বছরে প্রতিদ্বন্দ্বী নির্মূলে দলন-পীড়নের পাশাপাশি সব চেয়ে ভয়াবহ যে প্রবণতাটি দেখা গেছে তা হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিকদের পাশাপাশি তাদের সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনের উপর নির্যাতন। তাদের গ্রেফতার, রিমান্ড ও বিকলাঙ্গ করার নির্মম প্রবণতা। প্রতিটি সভ্য দেশে আইন-আদালত আছে। অপরাধীদের অপরাধ প্রমাণ হলে তাদের শাস্তি দেয়ার বিধান আছে। কিন্তু আদালতের বিচারের সুযোগ না দিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করে হত্যা অথবা হাত-পা, মেরুদন্ড গুঁড়িয়ে বিকলাঙ্গ করে দেয়া সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে কল্পনা করা যায় না। দুর্ভাগ্যবশত: আমাদের সমাজে এ বিষয়টি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
(তিন)
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক-এগারোর সরকারের আমলে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দু’ছেলে আরাফাত রহমান ও তারেক রহমানের উপর রিমান্ডে বর্বরোচিত নির্যাতন একটি কলঙ্কিত ঘটনা। এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তীকালে ক্ষমতাসীন সরকার, ব্যবস্থা তো নেয়া দূরের কথা বরং নিপীড়নের খড়গ আরো শাণিত করেছেন। এ জিঘাংসার দ্বিতীয় শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াত নেতৃবৃন্দের সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা যখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃবৃন্দকে (তাদের ভাষায় দুষ্কৃতিকারী) নির্বংশ করার ঘোষণা দেন তখন মনে হয় না যে, আমরা সভ্য জগতে বসবাস করছি। কে অপরাধী এবং কে অপরাধী নয়- তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক শাস্তি প্রদান আদালত ও আইনের শাসনকে উপেক্ষা করার সামিল।
গত সপ্তাহে ঢাকা মহানগরী জামায়াতের আমীর এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য জনাব রফিকুল ইসলাম খানের ছেলেকে পুলিশের গ্রেফতার নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। ছেলেটি এসএসসি পরীক্ষার্থী, পরীক্ষা দিয়ে হল থেকে বের হবার পর বিনা ওয়ারেন্টে তাকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি জবরদস্তি মাইক্রোবাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তার খোঁজ না পেয়ে তার মা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন পেরেশান হয়ে পড়েন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তার গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে। বহু খোঁজাখুঁজি করে শেষ পর্যন্ত ডিবি অফিসে তার সন্ধান মেলে। সম্ভবত: পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে তার অবস্থানের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাকে আদালতে চালান দেয়া হয় এবং পুলিশ তার বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা দিয়ে তাকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার্থী একটি ছেলে কার্যত: একটি শিশু। হাস্যকর হচ্ছে, ফেসবুকে সরকার বিরোধী স্ট্যাটাস দেয়ার জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একটি শিশুর ফেসবুক স্ট্যাটাস যে সরকার সহ্য করতে পারেন না তার আদৌ গণভিত্তি আছে কি না তা ভেবে দেখার বিষয়। সরকার এবং জাতি উভয়ের জন্য এ বিষয়টিকে আমি লজ্জাজনক বলে মনে করি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এই শিশুটিকে গ্রেফতারেরও আর সময় পেলেন না। পরীক্ষার মধ্যে গ্রেফতার করে তার ক্যারিয়ারটি ধ্বংস করার ব্যবস্থা করলেন। আদালতও পুলিশের চাহিদা অনুযায়ী একটি শিশুকে রিমান্ডে দিলেন। এই লজ্জা রাখার জায়গা আছে বলে আমি মনে করি না। সংগঠন হিসেবে জামায়াত এবং তার নেতাদের সাথে ক্ষমতাসীনদের গরমিল থাকাটা স্বাভাবিক। ব্যবধান আদর্শিক। সরকার আদর্শ দিয়ে আদর্শের মোকাবিলা না করে এবং তাদের বশে আনতে না পেরে ‘যুদ্ধাপরাধ’ ও অন্যান্য মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে নির্মূল করতে চাচ্ছেন। সরকার প্রণীত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় রফিকুল ইসলাম খানের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭১ সালে তার পিতা সিরাজগঞ্জের একজন স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান জামায়াত করার অপরাধে যুদ্ধাপরাধী হয়ে গেলেন। অথচ ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল মাত্র ৩/৪ বছর। মুক্তিযোদ্ধা পিতা স্বাধীনতার জন্য রণাঙ্গনে লড়াই করেছেন আর তার ৩/৪ বছর বয়সী শিশুপুত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর সেজে যুদ্ধাপরাধ করেছেন, কি মজা! এ ধরনের মজার তথ্য একমাত্র আওয়ামী লীগই দিতে পারে। ছিঃ ছিঃ করবো, না হাসবো- বুঝে উঠতে পারছি না। তার ছেলে শিশু আব্দুল্লাহকে আমি বাহবা দেই। কেননা তার ভয়ে প্রবল প্রতাপশালী সরকার থর থর করে কাঁপে।
(চার)
আমি বাংলাদেশে হত্যা-গুম এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড নিয়ে কথা বলছিলাম। গত ছয় বছরে মানবাধিকার সংস্থাগুলো পরিবেশিত তথ্যানুযায়ী ১১ সহস্রাধিক ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। গুমের শিকার হয়েছেন আরো সমসংখ্যক হতভাগ্য ব্যক্তি। তাদের স্বজনরা জানেন না তাদের অপরাধ কি এবং কোথায় আছে। হাল আমলে এমন কোনও দিন নেই যেদিন কেউ না কেউ হত্যা-গুমের শিকার হচ্ছে না। এর হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই স্তম্ভে ইতঃপূর্বে আমি বলেছিলাম যে, ভারতবর্ষসহ আমাদের এই অঞ্চলে এক সময় নরবলি প্রথা চালু ছিল। বিভিন্ন কাজ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে নরবলি দেয়া হতো। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখনও কিছু লোকের মধ্যে এই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, বড় বড় পুল ও বৃহৎ নির্মাণ কাজকে টেকসই করার জন্য নরবলি দেয়া অপরিহার্য। ঐ সময়ে ছেলেধরাদের উৎপাত ছিল লক্ষ্যণীয়। পল্লী এলাকায় ছেলেধরারা ছোট ছোট ছেলেদের ফুসলিয়ে কিংবা জবরদস্তি অপহরণ করে ঠিকাদাররা নির্মাণ স্থাপনা বা ব্রিজের ফাউন্ডেশনের তলায় তাদের বলি দিতো। এতে নাকি দেবতারা তুষ্ট হতেন এবং এর ফলে ঐ স্থাপনা টেকসই ও মজবুত হতো। এই নির্মম কাজে গ্রাম এলাকার বহু শিশু ঠিকাদারদের বলির শিকার হয়েছিল এবং অনেকের পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজন পাগলও হয়ে গিয়েছিলেন। কালপরিক্রমায় এই কুসংস্কারটি বাংলাদেশ থেকে দূরীভূত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখন ছেলেধরা ও অপহরণকারীদের একটি অংশ বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে ছেলে-মেয়েদের অপহরণ করে এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই অপহরণকারীদের খপ্পর থেকে আমাদের সরকার প্রধানের বাবুর্চির মেয়েও রক্ষা পায়নি। দু’বছর আগে তাকে মুম্বাইয়ের নিষিদ্ধ পল্লীতে পাওয়া গিয়েছে। তবে ছেলে ও মেয়ে শিশু অপহরণ ছাড়াও এখন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ও পদ ব্যবহার করে একশ্রেণীর অপহরণকারীর দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে মনে হয়। এরা রাজনীতিবিদদের অপহরণ করে গুম করে দিচ্ছে। অপহৃত এসব ব্যক্তিকে এখন ব্রিজ বা বড় ধরনের স্থাপনা নির্মাণের বেদিতে বলি দেয়া হচ্ছে না। তাদের বলি দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিক দলসমূহের ক্ষমতায় টিকে থাকার দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের বেদিমূলে। ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার, সিলেটের ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডজন খানেক শিবির নেতাসহ গত ছয় বছরে অপহৃত শত শত রাজনৈতিক নেতাকর্মী এই ক্ষমতা প্রকল্পের বলি হয়েছেন কিনা আমি জানি না। তবে ঘটনা পরম্পরায় মনে হচ্ছে যে, তাদের বলি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আরেকটি কথা, বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট হত্যা-গুমকে ইস্যু করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুক্তির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন শুরু করেছে তাকে ভ-ুল করার জন্য সরকার বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে যে মামলা দিয়েছিল তা তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে একই ধরনের ঘটনায় জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলসহ সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং দলটির কেন্দ্রীয় ও মহানগরী দফতর পুলিশ কর্তৃক অঘোষিতভাবে বন্ধ করে দেয়া এবং অন্য নেতা-কর্মীদের পাইকারীহারে গ্রেফতার করায় যারা উল্লসিত হয়েছিলেন কিংবা চুপ ছিলেন তাদের অনেকেই এখন সরকারের আসল উদ্দেশ্য উপলব্ধির চেষ্টা করছেন বলে মনে হয়। আমাদের সংবিধানের ৩৩ নং অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছে, গ্রেফতারকৃত কোনও ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরামর্শের এবং তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এতে আরো বলা হয়েছে, গ্রেফতারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্টেটের সম্মুখে হাজির করা হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাবে না। আমাদের সরকার তার পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি মানছেন না। একইভাবে তারা মানছেন না এ ব্যাপারে প্রদত্ত দেশের উচ্চ আদালতের দিক-নির্দেশনাও।
(পাঁচ)
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আদালতের বিকল্প হোক কিংবা তাদেরকে কেউ এ কাজে ব্যবহার করুক দেশবাসীর তা কাম্য নয়। হত্যা-গুম, গ্রেফতার, ডিটেনশান ও রিমান্ডের নামে রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনের উপর নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। আমাদের সংবিধানের ৩৩ নং অনুচ্ছেদ নাগরিকদের গ্রেফতার এবং ডিটেনশনের ব্যাপারে সুরক্ষা প্রদান করেছে। ৩৫ (৪) ও ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদ তাদের বিচার ও শাস্তির বৈধ প্রক্রিয়া ও ইনসাফের নিরাপত্তা প্রদান করেছে। একইভাবে সংবিধানের ৩৬ ও ৩৭ নং অনুচ্ছেদ মানুষকে চলাফেরা ও সমাবেশ করার অধিকার প্রদান করেছে। দেশে জরুরি অবস্থা নেই এবং সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারসমূহ পরিপূর্ণভাবে বহাল রয়েছে। জামায়াত, শিবির অথবা বিএনপি কিংবা ছাত্রদলসহ তাদের কোনও অঙ্গ সংগঠন নিষিদ্ধ কোনও সংগঠন নয়। এই অবস্থায় তারা সভা-সামবেশ করলে তা গোপন বৈঠক ও নাশকতার ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত হবে কেন তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দরকার। পাশাপাশি অবিলম্বে নাগরিক অধিকার পুনঃস্থাপন করাও জরুরি বলে আমি মনে করি। সকল বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড ও গুমের বিচার-বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তা যদি না করা হয়, তাহলে জাতিসংঘের কোনো সংস্থা এ তদন্ত করতে পারে। ইতোমধ্যেই ২০ দলের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করা হয়েছে।
ড. মোঃ নূরুল আমিন 

রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়া


অর্ধশত দিন অতিক্রমকারী বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া একটি স্পষ্ট রূপলাভ করেছে। শাসক দল ছাড়া সবাই সংলাপ-সমঝোতার কথা জানিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বি, চৌধুরী, বর্ষীয়ান নেতা ড. কামাল হোসেন, বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, বিকল্প রাজনীতির কান্ডারী মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ প্রায় সব দল ও নেতা ভাষণে, বক্তব্যে, বিবৃতিতে, অবস্থান কর্মসূচিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় সংলাপ ও সমঝোতার দাবি করেছেন। বিভিন্ন পেশাজীবী ও খাতভিত্তিক সংগঠন; যেমন- শিক্ষক, পোশাক মালিক ইত্যাদি সেক্টর থেকেও চলমান আন্দোলনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের অমনোযোগী ও নির্লিপ্ত থাকার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করে সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনঅংশগ্রহণমূলক ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান-সূত্র উপস্থাপন করেছেন। দেশের মতো বিদেশের বিভিন্ন দাতা সংস্থা, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সুস্পষ্ট মতামতও সংলাপ-সমঝোতার মাধ্যমে চলমান সঙ্কট নিরসনের পক্ষেই ব্যক্ত হয়েছে। মোট কথা, বিগত সময়ের একদলীয় ও ভোটবিহীন একতরফা নির্বাচনের গর্ভেই যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের বীজ রোপিত হয়েছিল, সেটাই সবাই স্বীকার করেছেন এবং গণতান্ত্রিক-সুস্থ ব্যবস্থায় উত্তরণের তাগিদ দিয়েছেন।
আন্দোলনরত বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী পক্ষ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্থর থেকে উত্থাপিত সংলাপ-সমঝোতার আহ্বানকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু আরেক পক্ষ তথা সরকার এখনো এ ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থানে আছে এবং সংলাপ বা সমঝোতা না করার ব্যাপারে অনঢ়। এমনকি আন্দোলনের নেত্রীর বেগম খালেদা জিয়াকে প্রায় বন্দিদশার মধ্যে ঘেরাও করে রাখা বা খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। জেলখানাগুলো উপচে পড়ছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- প্রতিনিয়ত চলছে।
এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চুপ নেই। মানবাধিকার নেত্রী আইরিন খান, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইত্যাদি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য-বক্তব্য প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে এবং তাদের বক্তব্য যে এখন খুব একটা নরম অবস্থায় নেই, সেটাও অনুধাবণ করা যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের ফোনালাপ এবং চিঠির বিষয়ও মিডিয়ায় এসেছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা যারা বোঝেন, তারা ঠিকই কথার মর্ম বুঝতে পারছেন। যদিও সরকারের পক্ষে কথা ও কাজে তাদের স্বভাবসিদ্ধ-উগ্রতা চলছেই। কিন্তু একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, পথ-ঘাট-মাঠ পর্যায়ের হুঙ্কার বা আক্রমণাত্মক বক্তব্য সরকার চালানো বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ম্যানেজ করার উপায় নয়। বশংবদ ও চাটুকারদের মধ্যে যারা গরম-গরম কথায় সরকারের নীতিনির্ধারকদের মাথা গরম করে দিচ্ছেন বা কঠিন বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করার নামে শূন্যগর্ভ বাক্য-বাণিজ্য করে নিজের আখের গোছাচ্ছেন এবং সরকারের বারোটা বাজাচ্ছেন, তারা আসলে বিপদই ডেকে আনছেন। ঘরে ও বাইরের এমন বিপদ-সঙ্কুল রাজনৈতিক পরিস্থিতি মাথা-মোটা বুদ্ধি আর উগ্রচন্ডী কথায় সামলানো যাবে না। সংলাপ, সমঝোতা, বিচক্ষণতা, সুবিবেচনা আর উদারতার মাধ্যমেই উত্তরণ ঘটাতে হবে। এটাই সঙ্কট বিমোচনের পরীক্ষিত পথ।
এই সুযোগে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও কিছু কথা পরিষ্কারভাবে আলোচনা করা দরকার। চলমান একবিংশ শতাব্দীতে যে বিশ্বায়ন ব্যবস্থা চলছে, তাতে পৃথিবীর প্রতিটি দেশই একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিটি দেশই পরস্পরের খবর রাখে। বিশেষত জঙ্গিবাদের উত্থান হলে, গণতন্ত্র ও সুশাসন ব্যহত হলে, মানবাধিকার ও আইনের শাসন লঙ্ঘিত হলে বিশ্ব শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নামে বিশ্ব সম্প্রদায় সরব হয়। তারা তখন নানা রকম ভূমিকাও পালন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রকাশ্যে বা গোপনে, সরাসরি বা পরোক্ষে কি ভূমিকা পালন করছে, সেটা সবাই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন। অতএব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করার পরিণাম সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। যারা সর্বাবস্থার একগুঁয়েমিকে হাতিয়ার করে দনিয়ার সবাইকে আন্ডারমাইন্ড করছেন, তারা শুধু নিজেদের বিপদ বাড়াচ্ছেন না, সবাইকেই বিপদে ফেলছেন। এমন অপরিণামদর্শিতার ফল ভালো হয় না।
প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ করা দরকার যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে খুশি রাখার জন্য সর্বত্রই এখন একটি কুপ্রবণতা চলছে। সেটা হলো জঙ্গিবাদের জুজুর ভয়। গণতান্ত্রিক আন্দোলন আর জঙ্গিবাদ যে এক নয়, সেটা পরখ করার মতো মেধা, বুদ্ধি, শিক্ষা, যোগ্যতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রয়েছে। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি বলে বলে চিৎকার করলেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুশিতে পেয়ার-মহব্বত করতে আরম্ভ করবে, বিষয়টি এমন নয়। কারণ গণতান্ত্রিক-মডারেট রাজনৈতিক শক্তিই বিশ্ববাসীর পছন্দ। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ যেমন নয়, অজনপ্রিয়-অগ্রহণযোগ্য-অনির্বাচিত একনায়করাও নয়। বাংলাদেশের চলমান আন্দোলনের গণতান্ত্রিক রূপ-চরিত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রকাশিত বিষয়। ফ্রি-ফেয়ার-ইনক্লুসিভ-পারটিসিপেটরি ইলেকশান, রুল অব ল’ এবং হিউম্যান রাইটসের কথাই গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলছে। যে বক্তব্য বিশ্বব্যাপী সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানবিক মানুষেরই বক্তব্য। এখানে জঙ্গিবাদ বা মৌলবাদ খুঁজে বেড়ানো মূর্খতা। এমন অপচেষ্টা বারংবার করা হলেও সেটা ভন্ডুল হয়েছে আটক নাশকতাকারীদের প্রকাশিত পরিচয়ে। অতএব দিনে দিনে দুধ আর পানি পৃথক হচ্ছে।
নিজের অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক, অগ্রহণযোগ্য আচরণ ও চেহারাকে আড়ালের জন্য যারা ভিন্ন বা অন্য কথা বলে কিংবা জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের ভীতি ছড়ায় অথবা নিজেরাই নিজেদের লোক দিয়ে এমন সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়, তাদের বোধোদয়ের জন্য গান্ধী আর পোপের কথাগুলো খুবই শিক্ষণীয় হবে। মহাত্মা গান্ধীকে তার জ্যেষ্ঠপুত্র হরিলাল একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ১৯০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যখন গান্ধীকে বীভৎসরকম প্রহার করা হয়, গান্ধী-পুত্র হিসেবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলে তার কী করণীয় ছিল? (১) শারীরিক বলপ্রয়োগ দ্বারা পিতাকে রক্ষা করা; নাকি (২) পিতাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়ে যাওয়া? অহিংসাবাদী গান্ধীর উত্তর ছিল, “অবশ্যই রক্ষা করা। বলপ্রয়োগ করে হলেও।” অতএব অহিংসা আর আত্মঅধিকার রক্ষার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। আর আত্মরক্ষা এবং জঙ্গিবাদ/মৌলবাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। এ প্রসঙ্গে বিশ্বখ্রিস্ট সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতা পোপ ফ্রান্সিস এর উক্তিও স্মরণ করায় গান্ধীর কথা। পোপ বলেছেন, “কেউ যদি তার মাকে/বাবাকে কটূকথা বলে/আঘাত করে, তিনি তাকে ছাড়বেন না, চপেটাঘাত করবেন।” মনে হতে পারে, পোপ কি তবে হিংসাত্মক পন্থার পক্ষে কথা বলছেন? চরম সঙ্কটে গান্ধীও কি হিংসার পথ বেছে নিতে বলেছিলেন পুত্রকে? না, তা কিন্তু নয়। গণতান্ত্রিক জনশক্তিকে এগুতে হবে পরিস্থিতি বুঝে, প্রয়োজনীয় সংযম অবলম্বন করেই। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে, কেউ এমনি এমনি হিংসাত্মক হয় না। হিংসাত্মক পথ যে বেছে নিচ্ছে, বুঝতে হবে, তাকে কতটা অসহায় করে তোলা হয়েছিল। কতটা অনন্যোপায় সে ছিল, সেটাও তখন সামনে চলে আসে। বিবেক তখন একটি প্রশ্নে জর্জরিত হয়, ‘আঘাতের পর প্রত্যাঘাত হলে, সে দায় কার?’ বিজ্ঞান ও যুক্তি বলছে, আঘাত-প্রত্যাঘাত খুব সরল কয়েকটি নিয়মে চলে। উভয়ের মধ্যে রয়েছে ক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়ার নিবিড় সম্পর্ক। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী নিউটনের তৃতীয় সূত্র আসলে আর কিছু নয়; আঘাত ও প্রত্যাঘাতের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা।
এই আঘাত আর প্রত্যাঘাতের বিষয়টিকে ভুলভাবে চিত্রিত করলে এবং বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হলে প্রকৃত সত্য লোপ পেয়ে যে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হবে, সেটা কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না। যেখানে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ নেই, সেখানে ভুলভাবে জঙ্গিবাদ বা মৌলবাদ যারা দেখাতে চান, তারা শান্তির পক্ষের লোক নয়। তাদের মতলবও ভালো নয়। কেউ যদি নিজের অপকর্ম ঢাকতে বা নিজেকে বাঁচাতে মিথ্যা, চাতুরী, প্রবঞ্চনা, শক্তি ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে, তবে সেটা বুমেরাং হয়ে তাদের ওপরই নেমে আসে। মিথ্যার আবেশ কেটে সত্য প্রকাশিত হলে গিলোটিনের সামনে পড়তে হয়। এটাই নিয়তি। ভুলর্বাতা বা ভুলচিত্র তুলে ধরার কুফল পৃথিবীর ইতিহাসে কম নেই। অতীতে ফরাসি রাজাদের ক্ষেত্রেও এমনই ঘটেছিল। সাম্প্রতিক-অতীতে আরব বিশ্বে জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ বাড়ছে, একদল লোক এমন মিথ্যা-তথ্য প্রচার করে করে মিথ্যাকেই সত্যে পরিণত করেছিল। আসল ঘটনা হলো, আরব কেন, ভারত বা ইসরাইলেও ক্ষুদ্র একটি মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী গ্রুপ আছে, যারা হিন্দু ধর্ম বা ইহুদি ধর্মকে সহিংসভাবে ব্যবহার করে। ইসলাম ধর্মকেও এমনভাবে অপব্যাখ্যা বা অপব্যবহারের লোকের অভাব নেই। কিন্তু এরা কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠ নয় এবং এরা গণতান্ত্রিক পন্থা মেনে প্রকাশ্য রাজনীতিও করে না। এখন প্রতিষ্ঠিত, নিয়মতান্ত্রিক, প্রকাশ্য রাজনৈতিক শক্তিকেও জঙ্গিবাদ বা মৌলবাদ বানিয়ে দিলে গুপ্ত সন্ত্রাসীরা আস্কারা পাবে। এবং আরবে যেমন হয়েছিল, জঙ্গিবাদ বা মৌলবাদ আছে, এমন প্রচারের সূত্র ধরে সম্মিলিত পশ্চিমা বাহিনী আক্রমণ চালালো। জঙ্গিদের বিশেষ কিছু না হলেও, যারা পশ্চিমের দয়া কুড়ানোর জন্য জঙ্গিবাদের জিগির তুলেছিল, তাদের মাথাকাটা গেল। জঙ্গিবাদের ভুল-তথ্য প্রচার করে স্বৈরাচারী-একনায়করা বাঁচতে পারেনি। আরব ও আফ্রিকার সাম্প্রতিক তথ্য সে কথাই বলছে। রূপকথা বা রাজনীতি, যেখানেই হোক, ‘বাঘ এলো, বাঘ এলো’ বলে চেঁচানো মিথ্যাবাদী রাখালদের শেষ পরিণতি ভালো হয় না।

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সংলাপ করার জন্য বান কি মুন এবং জন কেরি বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছেন


সরকারি মহল থেকে সুকৌশলে কিন্তু জোরদার প্রচারণা চালানো হচ্ছিল যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় বিরোধী জোটের ৪৬ দিনব্যাপী অবরোধ এবং হরতাল  ব্যর্থ হয়েছে। তাদের প্রচারণা এই যে এই আন্দোলনে দেশবাসী কর্ণপাত করেনি, আর বিদেশীরাও সেটি গায়ে মাখেনি। শীঘ্রই এই আন্দোলন ভেঙ্গে পড়বে এবং আন্দোলনের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে। দেশে এবং বিদেশে এই অবরোধ এবং হরতালের আন্দোলনকে ধিকৃত এবং নিন্দিত করার জন্য আওয়ামী ঘরানা একটি কৌশলী প্রচারণার আশ্রয় নিয়েছে। তারা প্রচার করছে যে এটি কোন রাজনৈতিক বিষয় নয়। এটি স্রেফ সন্ত্রাসী তৎপরতা। যেহেতু এখানে রাজনীতির কোন সম্পর্ক নাই তাই এটিকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্র শক্তি অর্থাৎ পুলিশ র‌্যাব এবং বিডিআর দিয়ে দমন করতে হবে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বলেন যে ইন্ডিয়া এবং আমেরিকা পুলিশ দিয়ে তাদের সন্ত্রাসী আন্দোলন যেমন  গুলী করে স্তব্ধ করেছে তেমনি আওয়ামী সরকারকেও সরাসরি গুলী করে ঐসব তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
আওয়ামী লীগ দেশে এবং বহির্বিশ্বে  শুধু মাত্র পেট্রোল বোমা হামলা প্রচার করেছে এবং  এই হামলার ফলে যেসব লোক নিহত হয়েছে শুধু মাত্র তাদের কথাই হাইলাইট করেছে। কিন্তু তারা বিদেশীদের কাছে এই বিষয়টি বেমালুম চেপে গেছে যে চিত্রের আরেকটি পিঠ আছে।ঐ পিঠ আওয়ামী ঘরানা বেমালুম চেপে যাচ্ছে। চিত্রের সেই পিঠটি নিম্নরূপ :
গত শুক্রবার ২০ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ‘প্রথম আলোতে’ সাম্প্রতিক আন্দোলন ও সহিংসতার একটি খতিয়ান দেওয়া হয়েছে। ঐ খতিয়ানে দেখা যায় যে অবরোধের ৪৬ দিনে মোট নিহতের সংখ্যা ১২১। এদের মধ্যে পেট্রোল বোমা এবং অগ্নিসংযোগে নিহত হয়েছে ৫৫জন। অবশিষ্ট ৬৬ জনের মধ্যে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ২৩ জন।প্রথম আলোর রিপোর্ট মোতাবেক সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ১৫ জন এবং অন্যান্য ২৮ জন। এই ‘সংঘর্ষ’ এবং ‘অন্যান্যের’ বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি। পুলিশের গুলীবর্ষণ, ট্রাক থেকে ফেলে দেওয়া, আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা ইত্যাদি  উল্লেখ করা হয়নি। যাই হোক, দেখা যাচ্ছে যে পেট্রোল বোমায় যত ব্যক্তি নিহত হয়েছেন (৫৫) তার চেয়ে ক্রস ফায়ার সহ অন্যান্য সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১১জন বেশী(৬৬)। এই ৬৬ টি প্রাণের কোন মূল্য নাই আওয়ামী ওয়ালাদের কাছে। তাই তারা এই ৬৬ জনকে ব্ল্যাক আউট করেছে।
॥দুই॥
কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঠিকই এই বিপুল সংখ্যক মানুষের অসহায় মৃত্যুকে বিবেচনায় নিয়েছে।তাই গত বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টের এক প্রতিনিধি দল এ সম্পর্কে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়,  
ঢাকা সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিরা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানোর পর যৌথ সংশোধনী বিবৃতি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গণমাধ্যমে এ বিবৃতি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সফররত সদস্যরা একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চায় যে, ১৮ ফেব্রুয়ারির ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল মানবাধিকার। বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকারসহ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং সাম্প্রতিক সহিংসতায় সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট দলের সদস্যরা।
গত বুধবারের বৈঠকের পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছেন, তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নয়।
কিন্তু বৃহস্পতিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক শেষে ইউ পার্লামেন্ট প্রধিনিধি দলের নেতা দান প্রেদা সাংবাদিকদের ‘ডেইলি স্টারের’ নাম উল্লেখ করে বলেন, আমি দেখেছি প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, ইইউ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। আমার বক্তব্য খুব সহজ। আমরা এখানে এসেছি, কারণ আমরা মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। এই বক্তব্যের পর রাতে মন্ত্রণালয় থেকে যৌথ সংশোধনী বিবৃতি পাঠানো হয়। তবে মূল বিতর্কের বিষয়টি এতে স্পষ্ট করা হয়নি।
ই ইউ পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দলের এই বক্তব্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জনগণের কাছে বিদেশীদেরকে নিয়েও মিথ্যাচার করছে। ই ইউ প্রতিনিধি দলের বিবৃতিতে সেটি স্পষ্ট হয়ে গেছে।
॥তিন॥
এখন দেখা যাচ্ছে যে বিরোধী দলের ৪৬ দিনের অবরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ একঘরে হয়ে পড়েছে । গত ১৯ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাহমুদ আলী ওয়াশিংটনে জাতি সংঘ মহাসচিব বানকি মুনের  সাথে বৈঠক করেন।
চলমান সংকটের সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ সরকারকে উদ্বুদ্ধ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বানকি মুন।
এছাড়া স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য বিরোধীদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ করতে বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে এক বৈঠকে বানকি মুন এ আহ্বান জানান।
ওয়াশিংটনে চলমান ‘সহিংস চরমপন্থা মোকাবেলায় হোয়াইট হাউজ সামিট’-এর ফাঁকে এক সাইড লাইনে বৈঠকে অংশ নেন তারা।
বৈঠকে বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রাণহানিতে জাতিসংঘের মহাসচিব উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
॥চার॥
বাংলাদেশে বিরোধী দলের ৪৬ দিন টানা অবরোধের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর । গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ মহাসচিব ছাড়াও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সাথে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে জন কেরি 
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনে সহিংসতামূলক কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষের প্রাণহানিতে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তিনি অবিলম্বে এ ধরনের সহিংসতা বন্ধের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে মত প্রকাশে বাধা দেয়াকে মেনে নেয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।  সহিংসতার অবসানে সরকারের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছেন কেরি।
গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে জন কেরি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর মধ্যে একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের লিখিত বক্তব্যে একথা বলা হয়।
জন কেরি বলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে নিরীহ মানুষকে টার্গেট করার কৌশল বা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে রাজনৈতিক মত প্রকাশে বাধা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না।’
সব রাজনৈতিক দলের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশা করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন জন কেরি।
গত ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি দিনকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে কর্মসূচি পালন করতে না দেয়ায় ওইদিন থেকেই সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। অবরোধের পাশাপাশি হরতালও আহ্বান করছে ২০ দলীয় জোট।
এসব কর্মসূচি চলাকালে প্রতিদিনই যাত্রীবাহী বাসসহ যানবাহনে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ ও হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটছে।
সরকারি হিসেবে, অবরোধ শুরুর পর এ পর্যন্ত পেট্রল বোমা ও হাতবোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৬ জন।
অপরদিকে এসময়ের মধ্যে কথিত বন্দুক যুদ্ধেও বিরোধী জোটের ২৩ জন নিহত হয়েছেন।
॥পাঁচ॥
বন্দুক যুদ্ধ ক্রস ফায়ার এবং পেট্রোল বোমা নিয়ে দেশে যখন প্রবল অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে তখন সমস্যার গোড়ায় হাত দিয়েছে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার একটি যৌথ জরিপ ।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে বিশ্বের সবচেয়ে ‘ব্যর্থ নির্বাচন’ ও ‘চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়। একইসঙ্গে সরকারকে ‘নির্বাচিত স্বৈরশাসক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে জরিপে। নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মানের ঘাটতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ওপর বৈশ্বিক জরিপ পরিচালনা করে তারা এ তথ্য প্রকাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এ জরিপ প্রকল্পটি পরিচালিত হয়। বৈশ্বিক এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয় ‘নির্বাচনী সততা প্রকল্প’ (ইলেক্টোরাল ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্ট-ইআইপি)।
এরমধ্যে ব্যর্থ নির্বাচনের তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন।
এ জরিপে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে ও সরকারের পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার দাবিতে ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল।
শুধু আ’লীগসহ গুটি কয়েক রাজনৈতিক দল সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক পর্যবেক্ষকই বলেছেন, সমকালীন নির্বাচনগুলোতে আন্তর্জাতিক মান পূরণের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। তাঁদের মতে, সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা গেছে নির্বাচিত স্বৈরশাসনগুলোতে (ইলেক্টেড অটোক্রেসি)।
দলীয় প্রতিদ্বনিন্দ্বতার খোলস থাকলেও ওই সব নির্বাচনে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যর্থ এসব নির্বাচনের ফলে নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসে ক্ষয় ধরে, ভোটার উপস্থিতি কমে যায় এবং সরকারের স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়, ফল হিসাবে ১৫৩টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, প্রধানত আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। ওই নির্বাচনে কমপক্ষে ২১ জনের মৃত্যু এবং শতাধিক ভোটকেন্দ্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রকল্পটি কাজ শুরু করে ২০১২ সালের ১ জুলাই থেকে।
॥ছয়॥
ওপরের এই  আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন  ২০ দলীয় জোট সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইস্যুতে ৪৬ দিন ধরে অবরোধ ও হরতাল চালিয়ে যাচ্ছে । এই রাজনৈতিক কর্মসূচির ফাঁক ফোকর গলিয়ে কিছু সন্ত্রাসী এখানে অনুপ্রবেশ করেছে। এরা জঘন্য সন্ত্রাসী কান্ড করেছে। আইনের আওতায় এনে এদেরকে দমন করলে কারো কিছু বলার থাকবে না। কিন্তু তাই বলে তাদের অপতৎপরতার সাথে বিএনপি এবং জামায়াতকে গলিয়ে  ফেললে ঐ সন্ত্রাসীরা সেই ফাঁক ফোকর দিয়ে জনতার কাতারে মিশে যাবে। তারপরেও যদি সরকার বিএনপি এবং জামায়াতের মত বিশাল গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক দলের বিরুদ্ধে জুলুমের স্টীম রোলার চালাতেই থাকে এবং তাদের কর্মীদেরকে হত্যা করতে থাকে  তাহলে এদেশের গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে সরকার জোর করে চরম পন্থার দিকে ঠেলে দেবেন।
আসিফ আরসালান 

শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

অসত্য ও সাজানো ইতিহাস


বিশেষ মহলের কেউ কেউ সুচিন্তিতভাবে কারণ সৃষ্টি করেন বলেই মাঝে-মধ্যে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিতে হয়। সঠিক ইতিহাস জানানোর জন্য শুধু নয়, অসত্য তথ্য সংশোধন করার এবং অনেকের স্বার্থচিন্তাপ্রসূত ভুল ব্যাখ্যা ধরিয়ে দেয়ার জন্যও এটা দরকার হয়ে পড়ে। তখন পেছনে ফিরে যেতে হয়। বর্তমান পর্যায়ে এর উপলক্ষ তৈরি করেছেন সুদূর লন্ডনে বসবাসরত বুদ্ধিজীবী নামধারী সেই আওয়ামী মোড়ল- ইতিহাস বর্ণনার নামে গল্প ফেঁদে বসার ব্যাপারে যার তুলনা নেই বললেই চলে। নিজের মতো করে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে ব্যাখ্যা হাজির করেন তিনি। ইতিহাসের ছাত্র এবং তার বর্ণিত অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে আমাকে উদ্বিগ্ন হতে হয়। কারণ, সঠিক ইতিহাস যাদের জানা নেই, তারা বিভ্রান্ত হতে পারেন এবং গালগল্পকেই সত্য বলে ধরে নিতে পারেন। এজন্যই ওই মোড়লের কথার পিঠে কিছু বলতে হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার একটি দৈনিকে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার ব্যাপারে রীতিমতো প্যাঁচাল পেরেছেন এবং ইতিহাস উল্লেখের নামে নিজের ইচ্ছামতো তথ্য ও ব্যাখ্যা হাজির করেছেন।
আপত্তির প্রধান কারণ ঘটিয়েছেন তিনি ইতিহাস থেকে উদাহরণ দিতে গিয়ে। দুই নেত্রী প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে টেনে এনেছেন। আওয়ামী মোড়ল তার ব্যাখ্যায় বলেছেন, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব নাকি পরস্পরের ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ’ ছিলেন, খালেদা-হাসিনার মতো ‘রাজনৈতিক শত্রু’ ছিলেন না! এ পর্যন্ত এসে থেমে গেলেও হয়তো আপত্তি জানানোর জন্য বেশি কষ্ট করতে হতো না। কিন্তু আফটার অল, আওয়ামী মোড়ল তিনি- এত অল্প কথায় থেমে যাওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। তিনি তাই প্রথমে পিছিয়ে গেছেন এবং তারপর কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে বলে বসেছেন, তিনিই সে তিনি, যিনি তার সম্পাদিত সান্ধ্য দৈনিকে ‘ভাসানী-মুজিব ঐক্য চাই’ শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় একটি স্বাক্ষরিত সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। কেন লিখেছিলেন, তার কারণও জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘আইয়ুব-মোনেমের স্বৈরশাহীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সফল হতে হলে পূর্ব পাকিস্তানে ভাসানী-মুজিব ঐক্য চাই’। এই সম্পাদকীয় দেখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী হিসেবে বন্দী নেতা শেখ মুজিব নাকি তাকে বলেছিলেন, ‘...তোমাকে ভাসানী-মুজিব ঐক্যের জন্য স্লোগান দিতে হবে না। আমি সবার চেয়ে মওলানা সাহেবকে ভাল চিনি। আমার জন্য তার মনে গভীর দরদ। সময় হলে আমি ডাক দিলেই তিনি চলে আসবেন।...’ নিবন্ধের এই পর্যায়ে এসে আওয়ামী মোড়ল জানিয়েছেন, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শেষদিকে এসে বুঝলাম, ভাসানী-মুজিব ঐক্যের দাবিতে আর কিছু লেখার দরকার নেই। দুই নেতার মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা হয়ে গেছে।...’ এখানেও শেষ নয়, আওয়ামী মোড়ল তার ব্যাখ্যায় বলেছেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান নাকি ছিল ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী গণঅভ্যুত্থান’ এবং ভাসানী-মুজিবের ‘গোপন যোগাযোগ ও সমঝোতার ফল’! ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের প্রতি মওলানা ভাসানীর ‘সমর্থন’ও আবিষ্কার করেছেন তিনি। বলেছেন, আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে মওলানা ভাসানীর অনুসৃত নীতি-কৌশল নাকি ছিল ‘রীতিমতো মাস্টার স্ট্রোক’!
ওপরে অতিসংক্ষেপে উল্লেখিত তথ্যগুলো থেকে যে কারো ধারণা হবে যেন বন্দী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করা এবং আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করানোই ছিল ১৯৬৯ সালের গণঅভু্যুত্থানের একমাত্র উদ্দেশ্য! শুধু তা-ই নয়, আওয়ামী মোড়লের ভাষায় ‘প্রায় দা-কুমড়োর মতো’ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মওলানা ভাসানী তাঁর ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ’ শেখ মুজিবকে বাঁচানোর উদ্দেশ্য নিয়ে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেছিলেন, একে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। আপত্তি উঠেছে একাধিক কারণে। প্রথম কারণ হলো, নিজের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা দেয়ার পেছনেও মওলানা ভাসানীর বিপুল অবদান ছিল। পাকিস্তান আমলে তো বটেই, জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্তও দু’জনের সম্পর্ক ছিল ঠিক পিতা ও পুত্রের মতো। এই সম্পর্ক কোনো ‘চৌধুরী’ বা ‘মিয়া’-ই নষ্ট করতে পারেননি- বিভিন্ন সময়ে ষড়যন্ত্রের পথে প্রচেষ্টা চালিয়েও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। নীতি-কর্মসূচী, দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলের ব্যাপারে যথেষ্ট মতপার্থক্য থাকলেও তাই এমন মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় যে, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের সম্পর্ক ছিল ‘প্রায় দা-কুমড়োর মতো’ কিংবা দু’জন পরস্পরের ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ’ ছিলেন।
আপত্তির দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এসেছে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যূত্থান সংক্রান্ত মন্তব্য। এখানেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রসঙ্গ এসে যায়। আওয়ামী মোড়ল বলেই তিনি সবকিছুর মধ্যে শুধু নিজেদের নেতা শেখ মুজিবকে দেখেছেন, ছাত্র-জনতার আশা-আকাংক্ষার প্রতি সামান্য সম্মান দেখাননি। তিনি সেই সাথে বলতে চেয়েছেন, যেন ওই অভ্যুত্থানের পেছনে শেখ মুজিব শুধু নন, তার ঘোষিত ৬ দফাও প্রধান ভূমিকা রেখেছিল! যেন আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলই ছিল না সেখানে! অন্যদিকে তথ্যানিষ্ঠ ইতিহাস কিন্তু সেকথা বলে না। কারণ, ৬ দফার ভিত্তিতে আন্দোলন প্রচেষ্টার প্রাথমিক পর্যায়ে, ১৯৬৬ সালের ৯ মে শেখ মুজিবকে প্রতিরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে, ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী হিসেবে অভিযুক্ত করে এবং ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় পর্যন্ত তিনি কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বন্দী অবস্থায় ছিলেন। দল হিসেবে ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগও সে সময় অত্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। এর কারণ, একদিকে ৬ দফা প্রভাব সৃষ্টি করার মতো জনসমর্থন অর্জন করতে পরেনি, অন্যদিকে ৬ দফার প্রশ্নেই আওয়ামী লীগ দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের ২৩ ও ২৭ আগস্ট গঠিত হয়েছিল যথাক্রমে ‘পিডিএমপন্থী’ এবং ‘৬ দফাপন্থী’ নামে পরিচিতি পাওয়া পৃথক দু’টি আওয়ামী লীগ। বন্দী নেতা শেখ মুজিবকে ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগের সভাপতি বানানো হয়। দলটির তৎকালীন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে দুটি মাত্র তথ্যের উল্লেখ করলে। প্রথম তথ্যটি হলো, ১৯৬৬ সাল থেকে তো বটেই, দলের সভাপতি শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী বানানোর পরও ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগ কোনো প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়ার সাহস পায়নি। দলের ওয়ার্কিং কমিটির এক প্রস্তাবে অভিযুক্ত নেতাকে ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য’ সরকারের প্রতি ‘আবেদন’ জানানো হয়েছিল (২১ জানুয়ারি, ১৯৬৮)।
দ্বিতীয় তথ্যটি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ঘোষিত ১১ দফার সমর্থনে এগিয়ে আসার পরিবর্তে ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগ ৮ জানুয়ারি গঠিত আটদলীয় জোট ড্যাক বা ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটিতে যোগ দিয়েছিল। ড্যাক-এর ৮ দফা কর্মসূচিতে সেকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি স্বায়ত্তশাসন শব্দটিরই উল্লেখ ছিল না, অনুপস্থিত ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রসঙ্গও। শুধু তা-ই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের দুই নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং খান আবদুল ওয়ালী খানের সঙ্গে তৃতীয় নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের মুক্তি চাওয়া হয়েছিল পঞ্চম তথা ‘ঙ’ দফায়। অন্য একটি কারণেও শেখ মুজিব অসম্মানিত হয়েছিলেন। ড্যাক-এর আহ্বায়ক ছিলেন পিডিএমপন্থী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান। অর্থাৎ, ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগের অবস্থা সে সময় এতটাই শোচনীয় ছিল যে, দলটিকে শেখ মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানের নেতৃত্বাধীন এবং জামায়াতে ইসলামীসহ পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক সাতটি দলের সমন্বয়ে গঠিত জোট ড্যাক-এর শরিক হতে হয়েছিল। উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানীর দল ন্যাপ বা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি কিন্তু এই জোটে যোগ দেয়নি বরং স্বাধীন অবস্থানে থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
১৯৬৬ সালের মে থেকে কারাগারে থাকায় ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান নির্মাণে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ভূমিকা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী- যে কথা অওয়ামী মোড়লও স্বীকার না করে পারেননি। স্বায়ত্তশাসন, প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি ও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে ১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক ‘ঘেরাও’ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং পল্টন ময়দানের জনসভায় আগত হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে সেদিনই ঘেরাও করেন গভর্নর হাউস (বর্তমান বঙ্গভবন)। ঘেরাওকারী ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী পরদিন ঢাকায় হরতাল আহ্বান করেন। ১৯৬৮ সালের ৭ ডিসেম্বর হরতাল পালনকালে পুলিশের গুলিতে দু’জনের মৃত্যু ঘটলে মওলানা ভাসানী ৮ ডিসেম্বর সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালনের ডাক দেন। তিনি নিজে সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন এবং বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে শহীদদের গায়েবানা জানাযা নামাজে ইমামতি করেন। মওলানা ভাসানীর ঘেরাও আন্দোলন স্বল্প সময়ের মধ্যে সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে এবং মূলত এই আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় তিনটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি। ১১ দফা ঘোষিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি।
২০ জানুয়ারি মওলানা ভাসানী সমর্থক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আসাদুজ্জামানের মৃত্যু আন্দোলনকে প্রচন্ড করে তোলে এবং মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ভিত নাড়িয়ে দেয়। বিপন্ন আইয়ুব খান আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকের প্রস্তাব দেন (১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)। ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগসহ আটদলীয় জোট ড্যাক-এর পক্ষ থেকে প্রথম সুযোগেই বৈঠকে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে, মওলানা ভাসানী একে ‘আত্মহত্যার শামিল’ বলে বর্ণনা করে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। ১৬ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের বিশাল জনসভায় ‘চরমপত্র’ উচ্চারণ করতে গিয়ে মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন, ‘প্রয়োজনে ক্যান্টনমেন্ট ভেঙে শেখ মুজিবকে মুক্ত করা হবে।’ উল্লেখ্য, আন্দোলনে অগ্রগতির পাশাপাশি শেখ মুজিবসহ রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবি তখন প্রাধান্যে চলে এসেছিল এবং শেখ মুজিব বন্দী অবস্থায়ই প্যারোলে গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিতে সম্মতি  জানিয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্র-জনতার চাপ এবং মওলানা ভাসানীর বিরোধিতায় সে আয়োজন ভন্ডুল হয়ে যায়। ফলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে নতিস্বীকার করতে হয়। ’৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং শেখ মুজিবসহ মামলার অভিযুক্তরা ও অন্য রাজনৈতিক বন্দীরা মুক্তিলাভ করেন।
এই সাফল্যের পর থেকেই নিশ্চিত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে যাওয়া গণঅভ্যুত্থান বিভ্রান্ত ও স্তিমিত হতে শুরু করেছিল। মওলানা ভাসানীর আপত্তি সত্ত্বেও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উদ্দেশে ‘নিশ্চিন্ত থাকার’ উপদেশ দিয়ে শেখ মুজিব ২৬ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠকে তাকে বক্তৃতা করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল আরো পরে, ১০ মার্চ। ঘটনাক্রমে ১১ দফার কথা উচ্চারণ করলেও এই ভাষণেই শেখ মুজিব তার বিস্মৃত প্রায় ৬ দফাকে প্রাধান্যে নিয়ে আসেন এবং গোপন সমঝোতার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বৈঠক বর্জনকারী প্রধান নেতা মওলানা ভাসানীর প্রবল বিরোধিতায় সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় এবং অবনতিশীল পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন, পাকিস্তানে দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক শাসন প্রবর্তিত হয় (২৫ মার্চ, ১৯৬৯)।
আইয়ুব সরকারের পতন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল ও শেখ মুজিবসহ রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় সরকার পদ্ধতির নীতিগত স্বীকৃতি ছিল গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। কিন্তু যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনসহ ১১ দফার মূল দাবিগুলো আদায় করা সম্ভব হয়নি। পর্যালোচনায় দেখা যাবে, পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতাদের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগের আন্দোলনবিমুখ নীতি ও ভূমিকা ছিল অসফলতার প্রধান কারণ। গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করার কৌশল হিসেবেই যে গোলটেবিল বৈঠক পরিকল্পিত হয়েছিল, সেকথা ইতিহাস প্রমাণ করেছে। শেখ মুজিবের মুক্তি অর্জন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল করানোর মতো দাবি আদায়ের জন্য যেখানে কোনো বৈঠকের প্রয়োজন হয়নি, সেখানে অন্য দাবিগুলোও আন্দোলনের মাধ্যমেই আদায় করা সম্ভব হতো। কিন্তু ৬ দফাপন্থী অওয়ামী লীগ সে গণঅভ্যুত্থানকেই স্তিমিত ও বিভ্রান্ত করার কৌশল নিয়েছিল, যে গণঅভ্যুত্থানের প্রচন্ড চাপে শেখ মুজিব ফাঁসির মুখ থেকে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। এর ফলে এই অভিযোগ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, জনগণের মুক্তি অর্জনের মৌলিক প্রশ্নেই আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতি ছিল ক্ষতিকর ও প্রশ্নসাপেক্ষ। সেই সাথে ছিল দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এবং নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংকীর্ণ উদ্দেশ্য। না হলে আওয়ামী লীগ ছাত্র সমাজের ১১ দফাকে নিয়েই এগিয়ে যেতো। কারণ, ১১ দফার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা দু’টি মূলত ৬ দফার আলোকে প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ১১ দফাকে পাশ কাটিয়ে গেছে এবং কিছুদিন পর্যন্ত ‘৬ দফা ও ১১ দফা’ বলার পর এক পর্যায়ে ১১ দফাকে সম্পূর্ণরূপে বিদায় করেছে, প্রাধান্যে এনেছে কেবলই ৬ দফাকে। এই প্রক্রিয়ায় ১১ দফাভিত্তিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত শেখ মুজিবের প্রভাব ও জনপ্রিয়তাকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৬ দফাকে একমাত্র কর্মসূচি বানিয়েছে এবং সে নির্বাচনে জয়লাভের পর থেকে এমন প্রচারণাকে শক্তিশালী করেছে, যেন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানও ঘটেছিল ৬ দফার ভিত্তিতে, ১১ দফার ভিত্তিতে নয়! যেন শেখ মুজিব একাই ছিলেন গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নেতা! অথচ ইতিহাস প্রমাণ করেছে, গণঅভ্যুত্থানের আগে পর্যন্ত ছাত্র-জনতা ৬ দফার সমর্থনে সামান্যও ভূমিকা পালন করেনি। আর সে কারণেই ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়।
এখানে ইতিহাসের বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। এ নিবন্ধোর উদ্দেশ্য আসলে আওয়ামী মোড়লের মিথ্যাচার সম্পর্কে পাঠকদের অবহিত করা এবং তাকেও জানিয়ে দেয়া যে, গালগল্পকে ইতিহাস হিসেবে চালানোর অপচেষ্টায় সাফল্যলাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। তার উদ্দেশ্য অবশ্য ধরা পড়ে গেছে। তিনি কথার মারপ্যাঁচে চেষ্টা চালালেও মাওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের সম্পর্ক কোনো সময়ই ‘প্রায় দা-কুমড়োর মতো’ ছিল না। পরস্পরের ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ’ও ছিলেন না তারা। পাকিস্তান আমলে একযোগে তারা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করেছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধেও দু’জনের বিপুল অবদান ছিল মওলানা ভাসানী প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন, অন্যদিকে গ্রেফতার বরণ করলেও শেখ মুজিব থেকেছেন জাতীয় নেতার অবস্থানে। লক্ষ্যণীয় যে, শেখ মুজিবকে প্রাধান্যে রাখার উদ্দেশ্য থেকে একটু এদিক-সেদিক করতে চাইলেও আওয়ামী মোড়লের পক্ষে কিন্তু মওলানা ভাসানীর অবদান অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি। ‘রীতিমতো মাস্টার স্ট্রোক’ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে প্রকারান্তরে তিনি স্বীকার করেছেন, মাওলানা ভাসানীর সমর্থন পেয়েছিলেন বলেই শেখ মুজিব এতটা এগোতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশও স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। বলা দরকার, বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার কল্পিত সংলাপ ও সমঝোতা নিয়ে প্যাঁচালের মধ্য দিয়ে আওয়ামী মোড়ল যে শোরগোল তুলতে চেয়েছিলেন, সে চেষ্টাও এখনো সাফল্যের মুখ দেখেনি।
আহমদ আশিকুল হামিদ 

বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

মানবাধিকার ও বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা


মানবাধিকার কথাটি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের নিকট অতি সুপরিচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি শব্দ। মানবাধিকার শব্দের ইংরেজি প্রতি শব্দ হচ্ছে Human rights. বাংলা ভাষার দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের সমন্বয়ে মানবাধিকার শব্দটি গঠিত হয়েছে। একটি শব্দ ‘মানব’ অপরটি ‘অধিকার’। প্রথমটির অর্থ হচ্ছে-মানুষ আর দ্বিতীয়টির অর্থ হচ্ছে যারা মানুষ তাদের অধিকার। অর্থাৎ মানবাধিকার কথাটির পরিপূর্ণ অর্থ দাঁড়ায় মানুষের অধিকার। এ অধিকার মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকার। যা স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত। তাই এ অধিকার সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কাজ করা সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। অতএব মানবাধিকারের সংজ্ঞায় বলা যায়, মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার নিয়ামকের ওপর যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে মানবাধিকার বা Human rights।
আমাদের দেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী, পণ্ডিত ও বৈদগ্ধ্য ব্যক্তিবর্গ বলে থাকেন; অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এগুলোই শুধু মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণ করবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। আমি মনে করি, এগুলোর পাশাপাশি মানুষের সুষ্ঠু জীবনধারণের প্রয়োজনে আরও অনেক অধিকার রয়েছে। যেগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে পরিগণিত। যেমন: বাকস্বাধীনতার অধিকার, নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার, জীবনধারণের অধিকার, সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিবার পরিচালনার অধিকার, রাষ্ট্রে শান্তিতে বসবাস করার অধিকার, চুরি- ডাকাতি ও সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাঁচার অধিকার, জুলুম-অত্যাচার ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার অধিকার, মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা থেকে বাঁচার অধিকার, নিজের জমি-জমা, গাছ-পালা ও বাগান-বাড়ি সন্ত্রাসীদের লুট-পাট থেকে রক্ষার অধিকার, অন্যায়ভাবে কারো হামলা থেকে বাঁচার অধিকার, স্বাধীনভাবে চাকরি-বাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার, শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে বাঁচার অধিকার, আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর অনৈতিক হামলা থেকে নিজেকে আত্মরক্ষার অধিকার, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলার পরিবেশ পাবার অধিকার, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার, দেশ, জাতি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কল্যাণরূপে গড়ে তোলার অধিকার, মানব সেবার অধিকার, পেট্রোল বোমার আঘাত থেকে বেঁচে থাকার অধিকার, জনসভা ও সভা-সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সর্বোপরি জননিরাপত্তার অধিকারও মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। মোটকথা মানুষের মৌলিক জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার নিয়ামকের ওপর যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে মানবাধিকার।
মানবাধিকারের গুরুত্ব
মনুষ্যত্বের বা The quality of being human-এর পরিপূর্ণ বিকাশে মানবাধিকারের গুরুত্ব অপরিহার্য। মৌলিক চাহিদা পূরণসহ নিরাপত্তামূলক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা বিধান করা সরকার ও মানবাধিকার সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। এছাড়া মানবতার পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমেই মানবাধিকার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস। তাই শুধু অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নয়; বরং এগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য সকল অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল মানবাধিকার নিশ্চিত হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিতে জীবনযাপন করার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার সুরক্ষিত হতে পারে। নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। গোটা পৃথিবীর মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও রক্ষায় তিনি সংগ্রাম করেছেন। আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্যাতিত-নিপিড়ীত মানবাত্মার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন; ‘কি কারণে তোমরা সেসব নারী, পুরুষ ও শিশুদের খাতিরে আল্লাহর অনুসৃত পথে সংগ্রাম করছো না? অথচ যারা নির্যাতিত, নিপিড়ীত ও দুর্বল হবার কারণে আমার নিকট ফরিয়াদ করছে এবং বলছে; হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে এ জালিমদের অত্যাচার থেকে বের করে নাও, অথবা তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোন দরদী-বন্ধু ও সাহায্যকারী পাঠিয়ে দাও’ (সূরা নিসা-৭৫)। আমাদের দেশে অতীত নেতৃত্ব দানে যারা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন, তারাও আমরণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বাঙালি জাতির পিতা হিসেবে খ্যাত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশের পবিত্র সংবিধানেও গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা সন্নিবেশিত আছে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে- ”The Republic Shall be a democracy in which fundamental human rights and freedoms and respect for the dignity and worth of the human person shall be guaranteed, and in which effective participation by the people through their elected representatives in administration at all level shall be ensured-’’ অর্থাৎ ‘প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে, এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে’। আমাদের দেশের সরকারও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় অত্যন্ত যতœশীল বলে আমি মনে করি। কিন্তু সংবিধানের ধারায় বর্ণিত বিধান অনুযায়ী আমাদের দেশে বর্তমানে গণতন্ত্রের আবরণে চলছে একদলীয় স্বৈরতন্ত্র। কোথায় আজ ন্যায় বিচার, কোথায় আইনের শাসন, কোথায় প্রশাসনের সকল পর্যায়ে  জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ? মানবাধিকার আজ বস্তাবন্দী ও সিন্দুকে তালাবদ্ধ। তাই এ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা এবং মৌলিক মানবীয় গুণাবলী অর্জন। যা মানুষের বুদ্ধিদীপ্ত বিবেককে উজ্জীবিত করবে, বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে জাগ্রত করবে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশে মানবাধিকার আন্দোলন দিন দিন জোরদার হচ্ছে। তাছাড়া মানব সভ্যতাকে সুষ্ঠুভাবে গড়ে তোলার জন্য অন্যতম দিকনির্দেশক হচ্ছে-জাতিসংঘ কর্তৃক সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র। এ ঘোষণা অনুযায়ী বিশ্বের ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র প্রায় সকল দেশ এখন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণও চায় এদেশে সঠিকভাবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজ নিজ অধিকার ফিরে পাক। কারণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে সংবিধান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্র তার আসল রূপ ফিরে পাবে। প্রশাসন নির্বিঘেœ প্রশাসনিক কর্মকা- পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে তার বিচারিক কার্যাবলী সম্পন্ন  করতে পারবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও ক্ষমতাবলী নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবে।
মানবাধিকার সংস্থাসমূহের করণীয়
দেশের সামগ্রিক স্বার্থে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দলসমূহ এবং মানবাধিকার সংস্থাসমূহের উচিত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া। কোন সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার মেনে নিতে পারে না, নির্যাতনকে প্রশ্রয় দিতে পারে না, বিচারবহির্ভূত অথবা বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হত্যাকা-কে মেনে নিতে পারে না। সমাজের অসহায়, নির্যাতিত-নিপড়ীত মানুষের অধিকার সংরক্ষণে সহায়তা প্রদান এবং তাদেরকে অধিকার সচেতন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালনে কাজ করতে পারে সকলেই। আমাদের দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজের অসহায়, দরিদ্র, নির্যাতিত-নিপিড়ীত মানুষদেরকে তাদের মানবিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সচেতন করে গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা প্রদান করা। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্যাডসর্বস্ব এ সংস্থাগুলো মানবতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বরং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানবতার দুর্বলতার সুযোগে তাদেরকে আইনগত সহায়তা প্রদানের নামে তাদের নিকট থেকে অমানবিকভাবে লুটে নেয়া হচ্ছে অঢেল অর্থ। ফলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ তো দূরের কথা, তা আরো ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। আমার জানা মতে, এমন কিছু মানবাধিকার সংস্থা আছে, ‘যেগুলো নামে তাল পুকুর কিন্তু ঘোটি ডুবে না। বাইরে হাঁক-ডাক, কিন্তু ভিতরে অন্তসারশূন্য সদরঘাট’। আবার কোন কোন মানবাধিকার সংস্থার হেড অফিসে একজন তথাকথিত চেয়ারম্যান, একজন পিয়ন এবং কতিপয় চেয়ার-টেবিল ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের জন্য তারা বিজ্ঞাপন সাঁটেন পত্রিকায়। ইন্টারভিউ এর সময় মোটা বেতনের প্রলোভন ও উৎসাহ ভাতার অফার দেয়া হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের পর মাসের পর মাস অতিক্রান্ত হলেও বেতন-ভাতা প্রদান করা হয় না তাদের। অবশেষে নিজেদের মান-মর্যাদা বাঁচানোর তাগিদে তারা চাকরি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।
এখানেই শেষ নয়। মানবাধিকারের নামে মদ, জুয়া, নেশা আর অনৈতিক আড্ডাখানায় পরিণত করেছে তারা অফিসকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এ অফিস যেন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক অভয়ারণ্য। দেশব্যাপী জেলা-উপজেলা, থানা এবং পৌরসভায় শাখা কমিটি গঠনের নামে মানুষকে সদস্য করার অজুহাতে তাদের নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে! পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে নেয়া হচ্ছে প্রতারণার আশ্রয়। নারী নির্যাতনসহ বিভিন্নভাবে Victim এর শিকার অসহায় মানুষগুলো তাদের নিকট আইনী সহায়তার জন্য এলে চাঁদা নেয়া হয়। সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জোরপূর্বক চাপ প্রয়োগ করে অফিসে তালাবদ্ধ করে আটকিয়ে রেখে পুলিশে সোপর্দ করার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টকাও দাবি করা হয়! লোক দেখানোর জন্য তারা বছরে একটি বা দুটি সভা করে। মাঝে মাঝে একটি ব্যানার ও দু-পাঁচজন ধার করা লোক এনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে থাকে এবং রমযান মাসে বড় জোর একটি ইফতার পার্টি করে থাকে এ সংগঠনগুলোর কোন কোনটি। শুধু মিড়িয়ায় কাভারেজ পাওয়ার জন্যে তারা এগুলো করে থাকে। এছাড়া কার্যত তাদের কোন এজেন্ডা নেই। এ বিষয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে মগবাজার সংগ্রাম অফিসের কোল ঘেঁষে অবস্থিত একটি মানবাধিকার সংগঠনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদেরকে কোন বেতন-ভাতা দেয়া হয় না। অথচ নিয়োগের আগে উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। চেয়ারম্যান সাহেব বলেন ফান্ডে টাকা নেই তো বেতন দেব কিভাবে ইচ্ছা করলে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে পারেন। একই অফিসের অন্য একজন কর্মকর্তার নিকট জানতে চাইলে তিনি অভিযোগের ব্যাপারে সত্যতা স্বীকার করেন’। জানা যায় যে, ঐ মানবাধিকার সংস্থাটি নিজেদের অপকর্মের কারণে সাধারণ মানুষের রোষানলে পড়ার ভয়ে সম্প্রতি অফিস অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের বক্তব্য জাতিকে হতাশ করেছে। তিনি বলেছেন, ‘জনগণের জান-মাল ও অধিকার রক্ষার জন্য কখনো কখনো শক্তি প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে পড়ে’ (সূত্র: প্রথম আলো  ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। তার এ বক্তব্যে মানবাধিকার রক্ষার পরিবর্তে তা চরমভাবে লংঘিত হয়েছে। এ ধরনের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডেের কারণে প্রকৃত মানবসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা হতাশ হচ্ছেন। ফলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তবে টিআইবি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ কিছু কিছু মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার রক্ষায় গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে যা প্রশংসনীয়। এ অবস্থায় দুর্নীতিপরায়ণ মানবাধিকার সংস্থাগুলো চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থ্যা গ্রহণ করতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানবাধিকার
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। এক মেরুতে সরকার পক্ষ এবং আরেক মেরুতে ২০ দলীয় জোটের অবস্থান। ৫ জানুয়ারি বিএনপি জোটের সমাবেশ করতে না দেয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। অথচ সভা-সমাবেশ করা রাজনৈতিক দলসমূহের একটি সাংবিধানিক অধিকার। সরকার বা শাসকগোষ্ঠীর উচিত সভা-সমাবেশে বাধা না দেয়া। আমাদের সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে-‘‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার  এবং জনসভা ও শোভা যাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে’’। অথচ বিরোধী দলগুলো তাদের সাংবিধানিক এ অধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর সরকারি দল নির্বিঘ্ন সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছে। এটি কোন সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতি হতে পারে না। এরই সূত্র ধরে বিরোধী শক্তির পক্ষ থেকে অনির্ধারিতভাবে অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে সারা দেশে। এতে অর্থনৈতিকভাবে দেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীদের মতো করে জনগণের বিরুদ্ধে। যাদের মূলকাজ জনগণের নিরাপত্তা বিধান করা, তারা সরকারের নির্দেশে বিরোধী শক্তিকে নির্যাতন করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানগণ প্রকাশ্যে জনগণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নেতাদের আদলে বক্তব্য দিচ্ছেন। এটা দেশের জন্য অশনি সংকেত। সরকারের অতি উৎসাহী কয়েকজন মন্ত্রীও সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি জনগণের বিরুদ্ধে অশালীন বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সারা দেশে বোমা হামলা এবং আগুনে পুড়ে মরছে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশুরা। খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষগুলো হত্যার শিকার হচ্ছে বার বার। অথচ তাদের কথা কেউ ভেবেও দেখছেন না। ফেসবুকে দেখা যায় পুলিশের পোশাক পরিহিত অবস্থায় বুট-হেলমেটবিহীন যুবকরা রাস্তায় মানুষকে বেধড়ক পিটাচ্ছে অমানবিকভাবে। এরা কারা? এদেরকে নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে ব্যাপকভাবে। পুলিশের গাড়িতে পেট্রোল বোমা মারা হচ্ছে, অথচ তারা গ্রেফতার হচ্ছে না। এরাই বা কারা? এদের কর্মকা- দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে-দেশ এখন মারাত্মকভাবে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আর স্থিতিশীলতা আনয়নে মুখ্য ভূমিকা রাজনৈতিক দলসমূহের। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের। তাহলেই দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল হবে, মানবাধিকার সুরক্ষিত হবে। ফলে দেশের সর্বস্তরের মানুষ অত্যাচার-নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ পাবে। প্রকৃত গণতান্ত্রিক মর্যাদা রীতি-নীতি ও সংস্কৃতিতে দেশ উচ্চ শিখরে পদার্পণ করবে। তাই আসুন, আমরা সকলে মিলে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যায়।
অধ্যক্ষ শহীদুল ইসলাম 

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গণতন্ত্রে ভোটের কোনো বিকল্প নেই


দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা থেকে উত্তরণে দুই নেত্রীকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে লেখা পৃথক দুটি চিঠিতে বান কি মুন সংলাপের এ আহ্বান জানান। নিউইয়র্ক ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে দুই নেত্রীকে চিঠি দেয়ার বিষয়টি গত রোববার নিশ্চিত করেছেন। প্রথম আলোর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বান কি মুন গত ৩০ জানুয়ারি চিঠি লিখেন। এর কয়েকদিন পর চিঠিটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছান হয়। একই সময়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কাছেও চিঠি পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়ার বিষয়টিও ওই দুটি চিঠিতে বান কি মুন উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশের বর্তমান অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন সুদূর জাতিসংঘের মহাসচিব। বিষয়টি শুনতে খারাপ লাগছে না, কিন্তু ভাবতে গেলে লজ্জা পেতে হয়। আমাদের দেশের শীর্ষ নেতা-নেত্রীরা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারছেন না, তাই দূরদেশ থেকে তাদের সবক শুনতে হচ্ছে। এতে তাদের মর্যাদা কমছে এবং গ্লানির মাত্রা বাড়ছে। দেশে বর্তমানে হরতাল,অবরোধ, দাহ, গুলী ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের যে তান্ডব চলছে, তাতে জনদুর্ভোগ বাড়ার সাথে সাথে নাগরিকদের আত্মমর্যাদার চেতনাও ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়ছে। এর দায় অবশ্যই আমাদের রাজনীতিবিদদের বহন করতে হবে। তবে দেশ পরিচালনায় সরকারের দায়িত্বটাই প্রধান, এ কারণে দেশের বর্তমান দুর্বিষহ পরিস্থিতির জন্য সরকারকে একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় অবশ্যই দাঁড়াতে হবে।
শুধু জাতিসংঘই যে সংলাপে বসার কথা বলছে তা নয়, দেশ-বিদেশের আরো অনেকেই সংলাপে বসে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের কথা বলছেন। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সরকার সংলাপের ব্যাপারে শুধু অনীহা প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, অবজ্ঞা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাষাও ব্যবহার করছে। বিষয়টি একেবারেই ব্যতিক্রম। সারা দুনিয়ায় সংলাপের জন্য সরকারকেই আগ্রহী দেখা যায়, সংলাপে বিরোধীদলকে আনার জন্য তাদেরকেই দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যায়। কারণ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব যেহেতু সরকরের, তাই জনগণের জান-মাল রক্ষা ও দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বও সরকারের উপরই বর্তায়। কিন্তু বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। জ্বালাও-পোড়াওয়ের জন্য সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের মায়াকান্না করতে দেখা গেলেও বর্তমান অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ ও তা দূর করার ক্ষেত্রে যৌক্তিক ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়টি জনমনে বড় প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। সরকার সংকট দূরকরণে কেন সংলাপে বসছে না এই প্রশ্ন আজ ঘরে ঘরে। এ বিষয়ে কথা বলছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি বদরুদ্দিন উমর। তিনি বলেছেন, বাম দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তা ও আন্দোলনে জনবিচ্ছিন্নতার পূর্ণ সুবিধা নিচ্ছে সরকার। দেশের চলমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের চক্রান্ত বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হয়েছে। কাজেই শাসকদল হিসেবে সংকট সমাধানের ধারেকাছেও যাচ্ছে না তারা। আর যাবেই বা কেন? ওই পথে গেলেই তো ভোট দিতে হবে। আর ভোটে যাওয়া মানেই ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া। বদরুদ্দিন উমরের এমন বিশ্লেষণ থেকে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সরকারি দল আওয়ামী লীগ কী করবে? গণতন্ত্রে তো ভোটের কোনো বিকল্প নেই। জনগণের মতামত গ্রহণের একমাত্র পথই হলো ভোট। ভোটে না গেলে তো হরতাল,অবরোধ ও সহিংসতার পথকেই উস্কে দেয়া হবে। আর অস্থির ও সহিংস রাজনীতিতে বিরোধীদল ছাড়াও সুযোগ সন্ধানী নানা পক্ষ মাঠে নেমে আসে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ার সাথে দেশের ক্ষতির মাত্রাও বাড়ে। তাই বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যৌক্তিক পদক্ষেপের বদলে সরকার নানা কৌশলে কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা অব্যাহত রাখলে হেরে যেতে পারে বাংলাদেশ। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রবল বাসনায় দেশের উন্নতি-অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার সাথে সাথে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি কোনো গণতন্ত্রমনা সরকার কিংবা রাজনীতিবিদদের কাম্য হতে পারে না। আসলে সরকার ও বিরোধীদল নির্বিশেষে আমাদের রাজনীতিবিদরা জনগণের আদালতে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মানব জমিনে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন ছাড়া সংকটের সুরাহা হবে না’। খবরটিতে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি’র একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নির্বাচন ছাড়া সংকটের সুরাহা হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদল বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে রেষারেষি কয়েক দশকের। দু’পক্ষের মধ্যে সহিংসতার বিষয়টি নতুন কিছু না। এ অবস্থায় পর্যবেক্ষকরা আতঙ্কিত যে, সর্বশেষ রক্তপাত ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। সহিংসতার জন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করা হলেও তার জনপ্রিয়তা এখনও ব্যাপক। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, নতুন করে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে খালেদা জিয়া সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছেন। তারপর থেকে শত শত যানবাহন পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়েছে। সরকার বলছে এসব হামলা করছে বিরোধীদলের জঙ্গিরা। অন্যদিকে বিএনপি এর দায় চাপাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর। বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মীকেও গুলী করে হত্যা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত রিপোর্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের বক্তব্যও উদ্ধৃতি করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, দ্রুত সংকট সমাধানের কোনো ইঙ্গিত নেই। সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ সংঘাত চলতেই থাকবে।
সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় নির্বাচনে যে বর্তমান সংকটের সমাধান রয়েছে, তাতো সকলেই উপলব্ধি করেন। কিন্তু যারা সংকট মুক্তির পথে অগ্রসর হয়ে জাতিকে বর্তমান অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারেন তারা তো এগিয়ে আসছেন না। বরং কঠোর মনোভাব নিয়ে দমন-অবদমনের পথেই তারা অগ্রসর হচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে তারা রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে চাইছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সরকারের অনুমোদন ও প্রশ্রয় পেয়ে এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে কিনা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভুল পদক্ষেপে সাধারণ মানুষ নিগৃহীত হচ্ছে কিনা, সেই খবর রাখার মত ফুরসত বা মানসিকতা বোধহয় এখন আর সরকারের নেই। ফলে প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকার পাতায় সাধারণ মানুষের প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জুলুম-নিপীড়ন ও গ্রেফতার-বাণিজ্যের খবর মুদ্রিত হচ্ছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মানব জমিন পত্রিকায় ‘আমি হিন্দু, শিবির নই’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়। খবরটিতে বলা হয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্র নয়ন বাছার। ছিলেন হাসি-খুশি তরতাজা এক তরুণ। পুলিশের গুলীতে আহত নয়ন বাছারের এখনকার ঠিকানা পঙ্গু হাসপাতালের এবি ওয়ার্ডের ৬৯ নম্বর বেড। অর্থাভাবে তার চিকিৎসাও হচ্ছে না। ৪ ফেব্রুয়ারি টিউশনি শেষ করে একটি বাসে উঠেছিলেন তিনি। ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে এ সময় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বাস থেকে নামার পর পুলিশ জানতে চায় তিনি জামায়াত-শিবির করেন কিনা? জবাবে তিনি বলেন, আমার নাম নয়ন বাছার, আমি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। এরপরেই হাঁটুর ওপর অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলী করে সাদা পোশাকের পুলিশ। তারপর আর কিছু মনে নেই। এখন মা ও ছেলের প্রশ্ন, এমন হলো কেন? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এমন কর্মকান্ড তাদের দায়িত্বশীলতা ও মনোভঙ্গির ব্যাপারে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুক যুদ্ধ ও সংঘর্ষে গত প্রায় এক মাসে ১৫ জন গুলীবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই ১৫ জনের মধ্যে ৯ জনই কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন। তাদের কেউ দিনমজুর, কেউ দোকানি, কেউ ভ্রাম্যমাণ খেলনা বিক্রেতা। একজন প্রবাসী ও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও রয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তির পর এদের ৩ জনের পা কেটে ফেলা হয়েছে। আহত ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, কোনো অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ তাদের পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলী করেছে। গুলীবিদ্ধ হওয়ার পর পুলিশ মামলাও করেছে। সব ঘটনার ক্ষেত্রেই পুলিশ কথিত বন্দুক যুদ্ধ বা হামলার কথা বলেছে। আমরা জানি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সন্ত্রাস দমন পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে শুধু গুলী দিয়ে এ দায়িত্ব পালন করা যায় না। এই দায়িত্ব পালন করতে গেলে অনুরাগ ও বিরাগের মনোভাব পরিহার করে পেশাগত চেতনায় অনুপ্রাণিত হতে হয়। প্রয়োজন হয় যথাযথ তদন্ত ও আইনের প্রতি আনুগত্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের কাছ থেকে যথাযথ আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।  কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশকে রাষ্ট্রের বাহিনীর বদলে দলীয় কর্মীর মত আচরণ করতেও দেখা যায়। ফলে পুলিশের রিক্রুটমেন্ট ও প্রশিক্ষণ নিয়ে জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে যে ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘এই ব্যাটা গোলা বারুদ কই’ এই কথা বলেই ৩ পুলিশ মিলে জাপটে ধরলো বশিরকে। বশির হতভম্ব। গোলা বারুদ? এমন কিছুর সাথে তো বশিরের জানাশোনা নেই। কিন্তু পুলিশ নাছোড়বান্দা। বশিরের প্যান্ট পর্যন্ত খুলে চেক করেছে পুলিশ। আন্ডার ওয়্যারটিও খুলতে চেয়েছিল। কিন্তু এলাকার পরিচিত লোকজনের প্রতিবাদের মুখে সে পর্যন্ত যেতে পারেনি পুলিশ সদস্যরা। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বশির পেশায় একজন সাংবাদিক। অফিস রাজধানীর পল্টনে। বাসা বনশ্রী এলাকায়। গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বশির পুলিশের তল্লাশির শিকার হন বনশ্রী এলাকায়। তিনি গাড়িতে ওঠার উদ্দেশ্যে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরও পুলিশের অশোভন আচরণ থেকে তিনি রেহাই পাননি বরং সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে এসআই আরিফ ক্ষেপে যান। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিক হয়েছেন তো কী হয়েছে, আপনার জন্য আইন আলাদা নাকি? স্থানীয় জনগণ জানান, এই এলাকার প্রায়ই সাধারণ পথচারীরা পুলিশের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তল্লাশির নামে পথচারীদের হয়রানি করা হয়ে থাকে। কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করা যায় না। রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতার এ সময়ে সরকার ও রাজনীতিবিদদের কাছে জনগণের বড় চাওয়া সংলাপ ও শান্তি। আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাতে সঙ্গত আচরণে সতর্ক থাকে সেই দায়িত্বটি তো সরকারের পালন করার কথা। কিন্তু সরকার তা পালন করে কিনা সেটাই এখন জনগণের দেখার বিষয়।

মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

নরহত্যার উৎসব চলছেই


ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে মানুষের আহাজারির শেষ নেই। যানবাহনে পেট্রোল বোমা হামলার মতো নৃশংস ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। এই হামলায় যারা দগ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছেন, তারা কারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নন। অতি সাধারণ মানুষ। এরা কারও হামলার টার্গেটও নন। পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনাও কম রহস্যজনক নয়। গত মাসের ৬ তারিখ থেকে ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচি প্রথম দিক থেকেই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। তাতে যে দু’চারটা বাসে আগুন দেওয়া হয়নি, দু’চারটা নিরীহ ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি, এমন কথা বলা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা যে কোনো আন্দোলনেই ঘটে। এটা আমরা ষাটের দশক থেকেই দেখে আসছি। এ আন্দোলনের শুরুর দিকে তরুণরা এমনও করেছে যে, বাসের যাত্রীদের বলেছে, ভাই আপনারা নামেন, বাসে আগুন দেব। যাত্রীরা নেমে গেলে আগুন জ্বলেছে।
কিন্তু হঠাৎ করেই এই দৃশ্যপটে পরিবর্তন দেখা দিতে থাকলো। আমদানি হলো পেট্রোল বোমা কালচার। রাতের অন্ধকারে কে বা কারা বাস-ট্রাকে চালাতে শুরু করলো পেট্রোল বোমা হামলা। সে হামলায় জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যেতে থাকলো নিরীহ সাধারণ মানুষ। যারা প্রাণ হারালো তারা তো গেলোই, কিন্তু যারা দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতাল বেডে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় আছেন, তাদের দুর্দশার কোনো সীমা নেই। গোটা দেশবাসীই তাদের এই যন্ত্রণা আর শোকের ভাগীদার।
কিন্তু পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনা শুরু হবার পর থেকেই সরকার এ নিয়ে শুরু করলো রাজনীতি। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে নিম্ন পর্যায়ের নেতারা একযোগে বলতে শুরু করলেন যে, এই হামলা চালাচ্ছে আন্দোলনরত বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দল। বিশেষ করে বিনা প্রমাণে এর সকল দায় চাপানোর চেষ্টা চালানো হলো জামায়াত-শিবিরের ওপর। কিন্তু তথ্য-প্রমাণ যা পাওয়া গেলো, তাতে দেখা গেলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর সাথে জড়িত সরকার দলের লোকেরা। রাজশাহীতে ছাত্রলীগ তাদের অফিসিয়াল ফেসবুকে পোস্টিং দিয়ে জানান দিলো যে, সেখানে হামলা চালিয়েছে তারাই। রূপগঞ্জে পেট্রোল বোমা বানাতে গিয়ে আহত হলো ছাত্রলীগের চার সদস্য। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ অফিসে পাওয়া গেল ১২টা পেট্রোল বোমা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এমপি আবদুল ওয়াদুদের ভাড়া বাড়িতে স্থাপিত পেট্রোল বোমার কারখানায় বিস্ফোরণ ঘটলো। কিন্তু সেখানে কাউকে ঢুকতে দিলো না পুলিশ। কেউ গ্রেফতারও হলো না। এরপর দিনাজপুরে রাতে ট্রাকে পেট্রোল বোমা মারার সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ল ছাত্রলীগের দু’জন। তাদের কাছে পাওয়া গেলো আরও পেট্রোল বোমা। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা এসে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায় পুলিশের কাছ থেকে। আর সর্বশেষ চমক হলো, আমাদের দৃষ্টির আড়ালে পুলিশ আটক করেছিল পাঁচ শতাধিক আওয়ামী পেট্রোল বোমাবাজকে। কিন্তু তাদের ‘সৎ ও মেধাবী’ বলে সনদপত্র দিয়েছে আওয়ামী এমপি ও নেতারা, যাতে তারা আদালত বা পুলিশের কাছ থেকে সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়। গিয়েছেও তাই।
ফলে পেট্রোল বোমা, বার্ন ইউনিট এসব এখন এক হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ কথা কোনো পাগলেও বলবে না যে, পেট্রোল বোমা হামলার মাধ্যমে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা কিংবা চিরজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেওয়া কোনো যৌক্তিক ঘটনা না। এর নিন্দা করবে সবাই। নিন্দা করছে। আমারও ইচ্ছে করে একটি সামান্য প্ল্যাকার্ড হাতে প্রেসক্লাব বা অন্য কোনো প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলি বন্ধ করো এই পেট্রোল বোমা হামলা। তার কী ফল দেবে জানি না।
কিন্তু এই পেট্রোল বোমা হামলা নিয়ে দারুণ নাটক শুরু হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পেট্র্রোল বোমা হামলার শিকার যারা, তাদের নিয়ে নাটক তৈরীর শুটিং হচ্ছে। পেট্রোল বোমা হামলাকারীরা যদি পিশাচ হয়ে থাকে, তবে যারা এদের নিয়ে নাটক তৈরীর শুটিং করছেন, তারা পিশাচের চাইতেও অধম পিশাচ। আহ্, দু’ হাত, দু’ পা মুখ অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। তাদের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে দগ্ধ ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত তুলে শুটিং করেছে কিছু নরপিশাচ। সরকার বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেছে। তারা বলেছেন, ভবিষ্যতে নাটক-নোবেল করার জন্য এই শুটিং বিটিভির পক্ষ থেকে করা হয়েছে। বিটিভি চিরজীবী হউক।
এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে গিয়ে যে শিশুটির পাশে দাঁড়িয়ে ৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া ঐ শিশুর দুর্দশা দেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলেন, সেই শিশুটিও ছিল না কোনো পেট্রোল বোমা হামলার শিকার। মোমবাতির আগুনে সে দগ্ধ হয়েছিল। পেট্রোল বোমার শিকার বলে প্রতীয়মান করা গেলে অনেক টাকা অনুদান পাওয়া যাবে, এই জন্য নানান প্ররোচনায় শিশুটিকে তার পিতামাতা নিয়ে এসেছিল বার্ন ইউনিটে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে শোকর করি, এই শিশুটির পরিবারও ১০ লক্ষ টাকার সঞ্চয় সার্টিফিকেট পেয়েছে। পাক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর গোয়েন্দা সংস্থার খবর কী? তারা নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে পারেনি যে, এই শিশুটি মোমবাতির আগুনে পুড়ে বার্ন ইউনিটে এসেছে, বাসে পেট্রোল বোমার আঘাতে নয়। অর্থাৎ মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে কৌতুক চলছেই।
রহস্যজনক পেট্রোল বোমা হামলা যখন থেকে শুরু হলো তখন থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের চাপাবাজ নেতামন্ত্রীরা এই মর্মে চাপা চালিয়ে যেতে থাকলেন যে, বিএনপি-জামায়াত মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করছে। তাদের সঙ্গে আবার কীসের সংলাপ? যদিও সংলাপের দাবি দেশে সরকারের বাইরে সকল রাজনৈতিক দল, সুধী সমাজ ও আন্তর্জাতিক দুনিয়ার। কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেই যাচ্ছেন যে, খালেদা জিয়ার হাতে মানুষ পোড়ার গন্ধ। তার সঙ্গে আবার কীসের সংলাপ? এই গীত অবিরাম প্রচারিত হচ্ছে। ফলে পেট্রোল বোমা বিষয়টি নিয়ে সরকারের অভিযোগ এখন হাস্যকর ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এখন থেকেই আওয়ামী নরহত্যা উৎসবের শুরু। পেট্রোল বোমা হামলা যখন থেকে শুরু করা হলো তখন থেকেই সরকার তার নিয়ন্ত্রণাধীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেন বিনামূল্যে গণহত্যার অনুমতি দিয়ে বসলেন। বিজিবি প্রধান, র‌্যাব প্রধান, পুলিশ প্রধান- এই তিন বাহিনীকে এমন ক্ষমতা প্রদান করলেন যে, তারা যখন তখন যেখানে খুশি যে কোনো মানুষের বুক বরাবর বিনা বিচারে গুলি করতে পারবে এবং হত্যা করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী নিজে তাদের জানিয়ে দিলেন যে, বধ্ করো, দায়দায়িত্ব আমার। দারুণ মজার ঘটনা। তার এই বক্তব্যের পর বিজিবি প্রধান বললেন, তাদের কাছে যেসব অস্ত্র রয়েছে, তা খেলনা নয়, সেগুলো মরণাস্ত্র। ওসব অস্ত্র হা-ডু-ডু খেলার জন্য নয়। তারা বুক বরাবর গুলি করবে। একই কথা বললেন, র‌্যাব প্রধান ও পুলিশ প্রধান।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো প্রধান আওয়ামী লীগের নিকৃষ্ট নেতাদের অনুকরণে বললেন যে, ২০১৯ সালের আগে আর কোনো নির্বাচন হবে না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়ে গেল যে, মনে হলো, রাষ্ট্র পরিচালনা শেখ হাসিনা নন, বিজিবি-র‌্যাব প্রধানরা করছেন। না। এখন প্রধানগণই ফ্যাক্টর নন। ডিআইজিরা যা বলছেন, তাও চমকপ্রদ। তারা স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলছেন। হত্যা করার ন্যায্যতার কথা বলছেন। সন্ত্রাসীদের সমূলে উৎখাত করার কথা বলছেন। কেউ পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করতে পারে এমন সন্দেহ হলে তাকেও হত্যা করার অধিকারের কথা বলছেন। এটা চলছেই। সর্বশেষ রাজশাহীর ডিআইজি বলেছেন, জানমাল রক্ষার স্বার্থে কাউকে হত্যা করা অপরাধ নয়।
তিনি দারুণ বলেছেন। এখন আমাদের জীবনের নিরাপত্তার সবচাইতে বড় সমস্যা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা চায়ের দোকান থেকে যে কাউকে তুলে নেয়। আড্ডা থেকে যে কাউকে তুলে নেয়। দোকান থেকে যে কাউকে তুলে নেয়। নিয়ে বলে, তুমি সন্ত্রাসী, বোমাবাজ। পাঁচ লক্ষ টাকা দাও। নইলে শেষ। তার উপর প্রতি রাতে থানাগুলোতে শত শত লোককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে নিয়ে আসা হয়। তারপর চাঁদাবাজি। দশ লাখ। পাঁচ  লাখ। দুই লাখ। দশ হাজার। বিশ হাজার। পাঁচ হাজার। এগুলো দিয়ে বা না দিয়েও মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে অথবা পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে। অনেক সাধারণ মানুষ দেশের সংবাদপত্রগুলোতে তাদের করুণ কাহিনী বর্ণনা করে আসছেন। নিয়ন্ত্রিত ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সে সংবাদ না থাকলেও প্রিন্ট মিডিয়ায় তার কিছু উপস্থিতি এখনও লক্ষণীয়।
এখন সরকার দেশকে দাসানুদাস করার জন্য ভিন্নমত দলনে সকল বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ বাহিনীকে কার্যত গণহত্যার লাইসেন্স দিয়ে বসেছে। তারা ভুলেই গেছেন যে, তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। বরং মনে হচ্ছে যে, তারা সরকারি দলের কর্মী বাহিনী। কিন্তু তাদের হাতে সাধারণ মানুষকে হত্যা করার ওপেন জেনারেল লাইসেন্স (ওজিএল) রয়েছে। আর সে কারণেই এখন দেশব্যাপী চলছে সরকারের মদদেই নাগরিক হত্যার উৎসব।
যে বিজিবির দায়িত্ব সীমান্ত রক্ষা। সেদিকে এখন তাদের কোনো নজর নেই। সেখান দিয়ে প্রতিদিন আসছে লাখ লাখ ইয়াবা, ফেনসিডিল, অস্ত্র। সেখানে বিজিবি প্রধান নির্বিকার। সীমান্ত অরক্ষিত রেখে তিনি এদেশের জনগণের বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে বললেন, তাদের হাতে যে অস্ত্র সেটি খেলনা নয়, মরণাস্ত্র। কিন্তু এখনও সীমান্তে প্রতিদিন বিএসএফ কাউকে না কাউকে হত্যা করছে। কোনো না কোনো বাংলাদেশীকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বিজিবি প্রধানের দায়িত্ব সেদিকে নজর দেওয়া, জনগণকে হুমকি দেওয়া নয়।
কিন্তু এই সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশের জনগণকে হত্যা যেন লাইসেন্স পেয়ে গেছে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ। এবং সোৎসাহে সে হত্যাযজ্ঞ চলছেই। বার্ন ইউনিটের করুণ মৃত্যু বেদনাদায়ক সন্দেহ নেই। কিন্তু এর মধ্যে যে শতাধিক নিরীহ অতি সাধারণ মানুষকে সরকারের মদদে হত্যা করা হলো তার কি কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না? এর সকল হত্যাই সন্ত্রাস বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। এমনকি যদি সন্ত্রাসও হয়ে থাকে, হত্যা তার সমাধান নয়, বিচার তার সমাধান। তবে কি বাংলাদেশ থেকে বিচার আইন উৎখাত হয়ে গেলো? হয়তো গেলো। কিন্তু এর জন্য দায়ী কে? শুধুই সরকার? আমরা কি স্বাধীন বিচার বিভাগের উপর নির্ভর করতে পারবো না? আশা করি, নিশ্চয়ই পারবো।
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 

রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

শিষ্টের দমন কাম্য নয়


‘পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে প্রথম আলো পত্রিকায়। ১৪ ফেব্রুয়ারি মুদ্রিত খবরটিতে বলা হয়, রাজধানীর দারুস সালাম থানার দক্ষিণ বিশিলে রাস্তায় বন্ধুর সঙ্গে আলাপকালে গত ১১ জানুয়ারি সৌদী প্রবাসী বাদল খানকে আটক করেন ওই থানার এস আই মশিউর রহমান। বাদল প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, আটকের পর এসআই মশিউর তার কাছে টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ইয়াবা এবং মানি লন্ডারিং মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখান। পরে পকেট থেকে মানি ব্যাগ বের করে সেখানে থাকা আড়াই হাজার টাকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেন। এসআই মশিউর প্রথমে এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও শুক্রবার রাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তিনি এ বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রস্তুত আছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে আটক করে টাকা আদায় এবং হয়রানির অভিযোগ পুরানো। তবে ২০ দলীয় জোটের অবরোধ শুরুর পর থেকে আটক বাণিজ্যের পাশাপাশি হয়রানির অভিযোগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। রাজধানীর ৯টি থানা এলাকা থেকে পাওয়া অভিযোগ নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে এর সত্যতা মেলে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও এ ধরনের অভিযোগ আসছে।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গত কয়েকদিন বিভিন্ন থানায় গিয়ে ৩৫ জন ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিনা কারণে তাদের রাস্তা থেকে আটক করে থানায় নেয়া হয়েছে। তাদের কাউকে কাউকে বলা হচ্ছে বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের কর্মী। হরতাল-অবরোধে নাশকতার মামলায় গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে। যারা চাহিদা মত টাকা দিতে পারছে না তাদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। আদালতে জামিন না পেলে যেতে হচ্ছে কারাগারে। দাবীমত টাকা না পেয়ে আটক এক যুবককে হত্যার অভিযোগও উঠেছে পল্লবী থানার ৩ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী অনেকে হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি। উল্লেখ্য যে, গত ৬ জানুয়ারি অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে গ্রেফতার হয়েছেন এক হাজার ২০০ জন। সারাদেশে গ্রেফতারের সংখ্যা তের হাজার ৪২ জন। এদের একটি অংশ এই আটক বাণিজ্যের শিকার বলে জানা গেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে হরতাল-অবরোধ ও পুলিশী অভিযানে জনগণ এক আতঙ্কের পরিবেশে বসবাস করছে। এর সাথে আটক বাণিজ্যের হয়রানি যুক্ত হওয়ায় জনমনে হতাশার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা জানি, পুলিশের দায়িত্ব দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। এই দায়িত্ব পালন করতে গেলে অনুরাগ-বিরাগের মনোভাব পরিহার করে আইনের বিধি-বিধান মেনে কাজ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সততা ও নীতিবোধও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাক্সিক্ষত এই সব বিষয়ের বদলে পুলিশ যদি বর্তমান সংকটের সুুযোগে বাড়তি ক্ষমতা ও প্রশ্রয় পেয়ে অর্থের লালসায় সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তাহলে দেশে সংকটের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পাবে। পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্যের নিষ্ঠুরতা এখনই বন্ধ করা না গেলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থার মাত্রা আরো হ্রাস পাবে। ফলে এমন পুলিশ দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন তথা সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব হবে তা ভেবে দেখার মত একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজি এএসএম শাহজাহান জানান, যখন এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কর্মকর্তাদের উচিত পুলিশ প্রবিধান অনুসারে যেভাবে জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে, সেটা কড়াকড়ি করা এবং কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানো। তবে পুলিশের কর্মকর্তারা পেশাগত এই দায়িত্ব পালনে কতটা সমর্থ হবেন, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। কারণ পুলিশকে অনুরাগ-বিরাগের বাইরে রেখে পেশাগত দায়িত্ব পালনের যে পরিবেশ দেয়া প্রয়োজন ছিল, সরকার তা দিতে সমর্থ হয়নি। বরং রাষ্ট্রের এ বাহিনীকে অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় বিবেচনায় ব্যবহার করা হয়েছে। এবং অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকেও রাষ্ট্রের বাহিনীর বদলে দলীয় কর্মীর মত আচরণ করতে দেখা গেছে। এটা দেশ ও জাতির জন্য এক মন্দ চিত্র। এই চিত্র বদলানোর দায়িত্ব সরকারের। সরকার সংবিধান ও শপথের আলোকে কাজ করলে পুলিশের মধ্যেও গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। সরকারের সেই সুমতি হয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

আওয়ামী লীগের দুই রূপ : ক্ষমতায় গেলে এক রূপ বিরোধী দলে আরেক রূপ


আজ রোববার অবরোধের ৪১তম দিন। এই ১ মাস ১১ দিনে দৈনিক ‘প্রথম আলোর’ রিপোর্ট মোতাবেক ঝরে গেছে ২৭টি প্রাণ। এর মধ্যে পেট্রোল ও আগুনে বোমায় মারা গেছে ৫২ জন, সংঘর্ষে ২৭ জন, ক্রস ফায়ারে ১৯ জন। তারপরেও দেশে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে সরকার অস্থির হয়ে পড়ে, কেমন করে পরিস্থিতি শান্ত করা যায়। অথচ বাংলাদেশে আওয়ামী সরকার এ ব্যাপারে নির্বিকার। মানুষ মারা যাচ্ছে তাদের কোনো বিকার নাই। বরং এ মৃত্যুকেই তারা পুঁজি করেছে। এই লাশ দিয়েই তারা বিরোধী দলকে ঘায়েল করতে চায়। সাংবাদিকরা প্রধান মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি সংলাপে বসবেন কি না। প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়হীন সাফ জবাব, কার সাথে আলোচনায় বসব? ঐ খুনিদের সাথে?
কে খুনি? কারা খুনি? এসবই এখন জ্বলন্ত প্রশ্ন। এসব প্রশ্ন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা যায় না। সর্বত্র ভয় এবং আতংক। টেলিফোনে যদি আপনি কাউকে জিজ্ঞাসা করেন, ভাই দেশের অবস্থা কি? ওপার থেকে জবাব আসে, ভাই, টেলিফোনে বলা যাবে না । বাসায় আসুন, আর না হয় অফিসে আসুন, খোলামেলা আলোচনা করব। বোঝেন না ভাই, দেওয়ালেরও কান আছে। অফিস আদালতে এগুলো আর কেউ খোলা খুলি আলোচনা করেন না। তাদেরও একই কথা, দেওয়ালেরও কান আছে। কখন কোন ফাঁকে র‌্যাব বা পুলিশ শুনে ফেলে, আর উঠিয়ে নিয়ে যায়। একবার উঠাতে পারলেই হলো। আর আপনার খবর পাওয়া যাবে না। আপনি ভ্যানিশড  হয়ে যাবেন।
আওয়ামী সরকার পেট্রোল বোমা বিস্ফোরণকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করছে। আগেই বলেছি যে পেট্রোল বোমা বিষ্ফোরণে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫২ ব্যাক্তি নিহত হয়েছেন। কারা মেরেছে এসব পেট্রোল বোমা? আওয়ামী লীগ সমস্ত পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের দায় দায়িত্ব বিএনপি জামায়াতের ঘাড়ে চাপিয়েছে। শুধু চাপিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। এটি করে তারা বিএনপি জামায়াতকে প্রথমে বানিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী এবং তার পরে সন্ত্রাসী জঙ্গী সংগঠন। তাও আবার দেশের সন্ত্রাসী নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের আলকায়দা, তালেবান এবং আই এস বা ইসলামিক স্টেটের মতো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন। আওয়ামী লীগের এই অভিযোগ মারাত্মক। তাই এ সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখা  দরকার।
বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট মোতাবেক বিগত দিনগুলোতে যেসব স্থান থেকে এবং যাদের নিকট থেকে   পেট্রোল বোমা উদ্ধার করা হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান নিচে দেয়া হল। এই খতিয়ানটি বিভিন্ন অনলাইন এবং প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক  মিডিয়া থেকে নেয়া হয়েছে।
দুই
চলমান বিরোধী দলের অবরোধের মধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল বোমাসহ সরকারি দলের অসংখ্য নেতা কর্মীকে হাতে নাতে আটক করেছে পুলিশ। কিন্তু সরকারি দলের পরিচিতি প্রকাশ পাবার পরেই ওইসব নেতা কর্মীদেরকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা-
১) ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মহা নগরীর আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনী এলাকার যুবলীগ কার্যালয় থেকে ১০টি পেট্রোলবোমা উদ্ধার করে পুলিশ। (শীর্ষ নিউজ, ৮ ফেব্রুয়ারি)
২) ৪ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ছোনাব এলাকায় ভুলতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা লোকমান হোসেনের একটি ঝুটের গোডাউনে বোমা বানানোর সময় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের নেতা রহমত উল্লাহসহ চারজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতাল ও স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ দর্শীরা জানায়, বিস্ফোরণের পরপরই ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা ঘটনাস্থলে এসে বিস্ফোরণের আলামত সরিয়ে ফেলেন। (যুগান্তর, ৫ ফেব্রুয়ারি)
৩) ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের কেসকি মোড় এলাকা থেকে পেট্রোল বোমাসহ মানিক ও বাবুল নামে দুই যুবলীগের নেতাকে আটক করে পুলিশ, কিন্তু পরে ছেড়ে দেয়। (শীর্ষ নিউজ, ৪ ফেব্রুয়ারি)
৪) ৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার দুপুর ২টার দিকে কুষ্টিয়ার মিরপুরে পেট্রোল বোমাসহ ছাত্রলীগের এক নেতাকে পুলিশ আটক করে। পরে অজ্ঞাত কারণে তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। (আমার দেশ, ৭ ফেব্রুয়ারি)
৫) ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে র‌্যাবের অভিযানে চট্টগ্রামের টাইগার পাস রেলওয়ে কলোনী থেকে ৯টি পেট্রোল বোমা, ২টি ককটেল, ৭টি কিরিচ, ২টি রামদা, ৯টি লোহার পাইপসহ ছয় ব্যক্তি আটক হয়। ঘটনার মূল হোতা মুন্না স্বীকার করে, সে নিহত যুবলীগ নেতা হুমায়ুন কবির মুরাদের ছোট ভাই এবং সে নিজেও আওয়ামী লীগ করে। (ইত্তেফাক, ৪ ফেব্রুয়ারি)
৬) ২৫ জানুয়ারি ফেনী শহরের টেলিফোন ভবন থেকে ৭টি পেট্রোল বোমাসহ পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিমের ভাতিজা আজিম উদ্দিনকে আটক করেছে পুলিশ। (দিনকাল, ২৫ জানুয়ারি)
৭) ১০ জানুয়ারি বেলা সোয়া ২টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে ৩টি হাতবোমার বিস্ফোরণ হয়। এতে জড়িত থাকার অভিযোগে হাতে নাতে গ্রেফতার হয় সাদিক নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী, যদিও পরে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। (যুগান্তর, ১১ জানুয়ারি)
৮) গত ১ জানুয়ারি রাত পৌনে ৮টার দিকে মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালি কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে পেট্রোল দিয়ে বাসে আগুন দেয়ার সময়ে ৩ ছাত্রলীগ কর্মী আটক হয়, যার মধ্যে ছিল জেলা ছাত্রলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সাজ্জাদ মোল্লা, ছাত্রলীগ কর্মী লিমন ও রানা। এদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় পেট্রোল ভর্তি দুটি বোতল ও দিয়াশলাই। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২ জানুয়ারি)
৯) লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয় যে, পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা কামরুল হোসেনের নেতৃত্বে গত ১ জানুয়ারি রাতে লক্ষ্মীপুর মহিলা কলেজের সামনে যাত্রীবাহী সিএনজিতে পেট্রোলবোমা হামলা চালানো হয়, যাতে মারা যায় ২ জন। ওই পেট্রোলবোমা হামলায় স্থানীয় দর্জি দোকান কর্মচারী ও যুবলীগ কর্মী পিচ্চি রুবেল, শামীম, মাসুদ ও জেলা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক মুরাদ হোসেন জয়সহ ১০ থেকে ১২ জন অংশগ্রহণ করে। (শীর্ষ নিউজ, ৫ ফেব্রুয়ারি)
১০) ১০ ফেব্রুয়ারি দুপুর ৩টার দিকে বগুড়ায় ককটেল বানানোর সময় বিস্ফোরণে সোহাগ (২২) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মীর ডান হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। আহত সোহাগ বগুড়া সদর উপজেলার গোকুল ইউনিয়নের বড়ধাওয়া গ্রামের সফিকুল ইসলাম সফিকের ছেলে এবং স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি গণি’র ভাতিজা। (শীর্ষ নিউজ)
লক্ষণীয় যে, ৪ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, ও চট্টগ্রামে সরকারি দলের নেতাদের কাছে যে বিপুল পরিমাণে পেট্রোলবোমা পাওয়া গেছে, তা থেকে অনেকেই ধারণা করছেন, এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং কেন্দ্রীয় নির্দেশেই সরকারি দলের নেতাকর্মীরা সারা দেশে নাশকতায় লিপ্ত।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থী অধ্যাপক আব্দুল মান্নান স্বীকারোক্তি করেছেন, পেট্রোল বোমা সরবরাহ করেছে ছাত্রলীগ। দেশের বেসরকারি টেলিভিশন ‘সময়’ টিভির ‘সম্পাদকীয়’ টকশোতে শুক্রবার রাতে তিনি অকপটে বলেন, ‘ছাত্রলীগের যারা পেট্রোল বোমাসহ ধরা পড়েছে তারা সোজা বাংলায় ব্যবসায়ী। এরা পেট্রোল বোমা বানায় এবং বানিয়ে বিক্রি করে, ব্যবসা করে। মানুষ মারার কন্ট্রাক্ট নেয় যে এইখানে বাসে বোমা মারলে এত টাকা, মানুষ মারলে এত টাকা।’ অন্যদিকে, মহাজোট সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী ভোটবিহীন সংসদের বর্তমান এমপি মাইনুদ্দিন খান বাদল ৭১ টিভি সংযোগ অনুষ্ঠানে ৬ ফেব্রুয়ারি জানান, ‘২০-দলের আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকা- হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছে মহাজোট সরকার। এ ক্ষেত্রে যা যা করা দরকার সবই করতে সরকার সক্ষম হয়েছেন।’
চলমান অবরোধের মধ্যে পেট্রোলবোমায় নাশকতার কার্যকারণ নিয়ে এরপরে আর কোনো ব্যাখার প্রয়োজন আছে কি?
॥ তিন ॥
চলমান আন্দোলনে এস এস সি পরীক্ষাকে অবরোধ এবং হরতালের বাইরে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ বার বার দাবি তুলছে। এসএসসি পরীক্ষাকে চলমান আন্দোলনের বাইরে না রাখার কারণে বিএনপি ও জামায়াতকে তুলো ধুনা করছে আওয়ামী লীগ। হরতাল এবং অবরোধের কারণে এসএসসি পরীক্ষা বিঘিœত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী অনেক অসুবিধায় পড়ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষার্থীদের প্রতি জানাচ্ছি পূর্ণ সমবেদনা। যে ১৪ লাখ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা নিয়ে অসুবিধায় পড়েছে তাদের প্রতি পূর্ণ সমবেদনা জানিয়েও বলছি যে, এসএসসি পরীক্ষা পিছেয়ে দেয়ার কাজকে সমালোচনা করার অধিকার কি আওয়ামী লীগের রয়েছে? কেয়ার টেকার সরকার প্রতিষ্ঠা করার দাবিতে আওয়ামী লীগ মাসের পর মাস অবরোধ এবং হরতাল করেছে। এখন সেসব কাজ হচ্ছে যেগুলো আওয়ামী লীগ ১৯৯৪-৯৬ সাল পর্যন্ত কেয়ার টেকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে করেছে। লীগের  আন্দোলনে এসএসসি পরীক্ষা অন্তত ৬ বার পেছাতে হয়েছে। আমরা নিচে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফলে পরীক্ষা পিছানোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দিলাম
☛ ২০০২ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় পর পর দু’বার হরতাল দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ।
☛ ২০০৫ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় লাগাতার হরতাল দিয়েছিল আওয়ামী লীগ।
☛ ১৯৯৫ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়ও ৮ দিন হরতাল দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ।
☛ ১৯৯৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় আওয়ামী লীগের অবরোধের কারণে ৩ মাস পরীক্ষা পিছিয়েছিল।
☛ ১৯৯৬ তেই স্কুল-কলেজে তালা লাগিয়ে দিয়েছিলো হাসিনা বাহিনী। সরকারি অফিসারকে রাস্তায় উলঙ্গ করে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল তখন। মনে করে দেখুন ১৯৯৮ সালের ১৫ নবেম্বর, হাতে তসবিহ এবং মাথায় হিজাব পরে জাতির কাছে হরতাল না করার ওয়াদা করে হাসিনা বলেছিলেন, বিরোধী দলে গেলেও আমরা কখনও হরতাল করব না। কিন্তু ২০০১ সালেই তিনি ডিগবাজি মারেন। পরীক্ষার সময়ই দেন একাধিকবার হরতাল। ১৯৯১ থেকে ৯৬, এই ৫ বছরে ১৭৩ দিন এবং ২০০১ থেকে ২০০৭ এই ৬ বছরে ১৩০ দিন হরতাল-অবরোধ দিয়েছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।
ওপরের এসব ঘটলাবলী দেখে আওয়ামীওয়লাদের দ্বৈত নীতির পরিচয় পাওয়া যায়। তারা যখন ক্ষমতায় থাকে তখন ‘হরতাল-অবরোধ’ হারাম হয়ে যায়, ‘মিছিল-মিটিং’ রাষ্ট্র বিরোধী কাজ হয়ে যায়, রাজপথে ‘পোস্টার-ব্যানার’ টাঙ্গানো এবং ‘লিফলেট’ সার্কুলেট করা ধ্বংসাত্মক কাজ হয়ে যায়। আর ককটেল ও বোমা? ওগুলোতো আলকায়দা এবং তালেবানী কাজ হয়ে যায়। কিন্তু তারা যখন বিরোধী দলে থাকে তখন ওপরের সবগুলো কাজই বিপ্লবের মতো জায়েজ হয়ে যায়। এসব দেখে-শুনেই দেবতারা স্বর্গে বসে ভবিষ্যত আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে এই দুটি চরণ রচনা করেছিলেন :
দেবতার বেলা লীলা খেলা
পাপ হয়েছে মোদের বেলা
আসিফ আরসালান 

Ads