শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গণতন্ত্রের পথেই আসতে হবে


বিশদলীয় জোটনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার অফিসে ইট নিক্ষেপকারী ব্যক্তিকে পাগল উল্লেখ করে পুলিশ সম্প্রতি তাকে ছেড়ে দিয়েছে। এর কয়েকদিন আগে আরেক ব্যক্তি পিস্তল হাতে বেগম জিয়াকে হত্যা করতে গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী বেগম জিয়ার অফিসে ইট নিক্ষেপকারী যুবক ও পিস্তল উঁচিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুঁজে বেড়ানো ব্যক্তি উভয়েই ক্ষমতাসীন দলটির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই সঙ্গত কারণেই পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বা নিতে পারেনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনা বা আরও বড় কিছু ঘটানো  হতে পারে। গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে তাকে সরাতে না পেরে এবং আন্দোলন দমনে ব্যর্থ হয়ে হটকারী ধরনের যা কিছু করা হচ্ছে, এটা তারই অংশ। তার অফিসে ইট নিক্ষেপ ও পিস্তল নিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে খোঁজাখুঁজি এবং ক্ষমতাসীনদের বেসামাল কথাবার্তার মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান বলে আমরা আশঙ্কা প্রকাশ করছি। বিশদলীয় নেতৃবৃন্দও একইভাবে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন।
আমাদের রাজনীতি কতটা নীতিবিচ্যুত হতে পারে, বেগম জিয়ার অফিসে বিদ্যুৎ সংযোগ, টেলিযোগাযোগ, টিভি’র ডিশ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবার ঘটনা তার একটা প্রমাণ। এমনকি তার অফিসের স্টাফ ও সহযোগীদের খাবার সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেবার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছে সরকারের পুলিশ বাহিনীর একটি অংশ। ক্ষমতাসীনদের অজ্ঞাতসারে কিংবা নির্দেশ ছাড়া এসব হচ্ছে তা কারুর কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। এছাড়া হরতাল-অবরোধের সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যার দায়ভার বেগম জিয়াসহ বিশদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর চাপানো হচ্ছে। অথচ বিশদলীয় জোটের তরফ থেকে এমন ঘৃণ্য ও অমানবিক কর্মকা-ের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে বার বার করে বলা হচ্ছে। যথাযোগ্য তদন্ত ছাড়া এর দায় বিশদলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া রাজনৈতিক  উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বিবেচিত হতে পারে। অভিযুক্ত বোমাবাজদের আদালত থেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টাও নাকি ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকে চালানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন মিডিয়াতে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই কারা এবং কী উদ্দেশ্যে বোমাবাজি করে বিশদলীয় জোটের অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াতে চায় তা নিশ্চয়ই সচেতন সকল মানুষের কাছে পরিষ্কার বলে আমরা মনে করতে চাই। তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা ছাড়াই বিশদলীয় আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের সম্পর্কে মিথ্যে ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। দুঃখজনক হলো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এক শ্রেণির সদস্যরাও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীর ন্যায় আচরণ করতে শুরু করেছে। এমনকি বিশদলীয় জোটের নেতা-কর্র্মীদের ‘দানব’ আখ্যা দেয়ার মতো হাস্যকর কথাও শোনা যাচ্ছে।
এসব বেসামাল কথাবার্তা ও আচরণের ফলে দেশবাসীর মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সুশীল সমাজ সম্পর্কেও অশোভন কথা বলে হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে অহরহ। এভাবে নিশ্চয়ই কোনও গণতান্ত্রিক দেশ চলা উচিত নয়। দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সকল পক্ষকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে বলে আমরা আশা করছি।

বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

পেট্রোল বোমা ক্রসফায়ার সংলাপ


পেট্রোল বোমা, ক্রসফায়ার, সংলাপ। এই তিনটি শব্দ এখন দেশের সবচেয়ে আলোচিত, আলোড়িত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনীতিক, কূটনীতিক, সরকারি আমলা, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী এমনকি সাধারণ মানুষ- সবার মধ্যে এ নিয়েই যত মাথাব্যথা, এ নিয়েই যত আলোচনা।
বর্তমানে দেশ একটি চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে। নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা ও শংকা গোটা জাতিকে গ্রাস করছে। গত বছরের ৫ জানুয়ারির ভোটহীন, ভোটারহীন ও প্রার্থীহীন প্রহসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সংকটটি দিনে দিনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আর এই সংকট থেকেই এসেছে পেট্রোল বোমা, ক্রসফায়ার ও সংলাপ।
৫ জানুয়ারির তামাশার নির্বাচনটির আগে বিরোধীদলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট সমাধানে জাতিসংঘের সহায়তায় সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে সংলাপ হয়েছিল। সংলাপে মধ্যস্থতা করতে এসেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত মি. তারানকো। সেই সংলাপে তখন সংকটের মীমাংসা হয়নি। শেখ হাসিনার সরকার জবরদস্তির মাধ্যমেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে যায়। জাতিসংঘের আহ্বান ও আন্দোলনের মুখে সরকার ওই নির্বাচনকে একটি নিয়ম রক্ষা ও নিতান্ত সংবিধান রক্ষার নির্বাচন উল্লেখ করে। সবার আশা ছিল সরকার তাদের কথা অনুযায়ী অচিরেই সংলাপের মাধ্যমে সৃষ্ট সমস্যা সমাধান করে সব দলের অংশ গ্রহণে একটি ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম করবে। বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় ঐক্যজোটও একটি বছর অপেক্ষা করে। তারা আন্দোলনের কোন কর্মসূচিও দেয়নি। কিন্তু সরকার বলতে থাকে তারা ৫ বছরই ক্ষমতায় থাকবে এবং ২০১৯ সালের আগে কোন নির্বাচন হবে না।
এমন একটি পরিস্থিতিতে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠে। ৫ জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচনের  এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনটিকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দেয়। জোট নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে জাতির সামনে ৭দফা দাবি তুলে ধরেন। সরকার তার এ দাবিকে অগ্রাহ্য করে আবারও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ অবস্থায় দেশব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ডাক দেয় ২০ দলীয় জোট।  জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে দেশব্যাপী শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। অবরোধের মাঝে আবার বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় চলতে থাকে হরতাল। ১৩ ফেব্রুয়ারি অবরোধের ৩৯ দিন অতিবাহিত হচ্ছে। সরকার চলমান এই আন্দোলনকে প্রচণ্ড দমন পীড়ন চালিয়ে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে গোটা দেশে সৃষ্টি হয়েছে এক সহিংস পরিস্থিতি। একদিকে চলছে পেট্রোল বোমা হামলা, অন্যদিকে ক্রসফায়ারে হত্যা। এ অবস্থায় জনজীবনের শান্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত। সারা দেশের পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ স্থবিরতা। ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘দেশের পরিস্থিতি মোটেও ভাল নয়। ঢাকার বাইরে জেলাগুলোর অবস্থা মারাত্মক’। রাতে মহাসড়কে বাস চালানো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এ পর্যন্ত সহিংসতায় ৮৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ক্রসফায়ারে ১৯জনকে হত্যা করা হয়েছে।
চলমান এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ সর্বমহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে চরম বৈরী অবস্থান থেকে সরে এসে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে উভয়পক্ষকে সংকট নিরসনে সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হয়। এসব বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলা হয়, একমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। সরকার যদি মনে করে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে এবং বিরোধী দল হরতাল-অবরোধ করে এই সংকট থেকে বের হওয়া যাবে তাহলে তারা বিরাট ভুল করবে।
কিন্তু দেশের নিরীহ জনগণ গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে, উভয় পক্ষই অনড় অবস্থানে রয়েছে। বিরোধী দলের হরতাল অবরোধ চলছে। অন্যদিকে সরকারও বলপ্রয়োগ করে যাচ্ছে। দিন দিনই পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। সরকার ২০দলীয় জোটের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে  সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছে বিএনপি জামায়াত জঙ্গি সংগঠন। তাদের সঙ্গে কোন আলোচনা নয়।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে মদদ দেয়ার অভিযোগ এনে সরকারের মন্ত্রীরা তাকে গ্রেফতারের পর্যন্ত দাবি জানাচ্ছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়ার কপালে দুঃখ আছে। ইতোমধ্যে  দেখা গেছে খালেদা জিয়াকে নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার কৌশল নেয়া হয়েছে। তাঁর গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ লাইন ১৯ ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। ১০ দিন পর বিচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করলেও ডিশলাইন ও ইন্টারনেট এখনও বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে খাবার প্রবেশেও বাধা দেয়া হয়। অফিসের প্রধান ফটকের সামনে পুলিশ রেজিস্ট্রার খাতা খুলে নাম-ঠিকানা রেকর্ড করে রাখছে। একইভাবে শ্রমিক লীগ, প্রজন্ম লীগ ও সৈনিক লীগকে দিয়ে গুলশান অফিসের সামনে মিছিল ও অবস্থান করানো হচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের স্কুল থেকে জোর করে এনে মানববন্ধনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তার উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। নৌমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিক-জনতা নিয়ে তিনি গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়াকে ঘেরাও করবেন। এর আগে দেখা গেছে ডজনখানে ইট ও বালুর ট্রাক বসিয়ে এ কার্যালয়েই খালেদা জিয়াকে দু’সপ্তাহ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। প্রধান গেট পুলিশ তালা মেরে বন্ধ রাখে। তাকে লক্ষ্য করে পেপার স্প্রে বা মরিচের গুঁড়া নিক্ষেপ করা হয়। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেত্রী এবং তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী এভাবেই নানা আচরণের শিকার হচ্ছেন। 
কী নির্দয়ভাবে চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করা হচ্ছে তার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যাবে। গণমাধ্যমে গত কয়েকদিনে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রধান ও কর্মকর্তাদের হুশিয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে উদ্দেশ করে বলেছেন,‘আন্দোলন দমনে কঠিন ব্যবস্থা নিন, সব দায়িত্ব আমার’। এরপর থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিজিবি প্রধান সরাসরি গুলী চালানোর হুমকি দেন। র‌্যাব প্রধান বেনজীর আহমেদ ২৫ জানুয়ারি খুলনায় বলেন, “সরকার গুলী চালাতেই আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে অস্ত্র দিয়েছে, হা-ডু-ডু খেলার জন্যে নয়”। তিনি রংপুরে গিয়ে রাজনৈতিক নেতার মতো বক্তব্য দেন। বলেন, ‘২০১৯ সালেই নির্বাচন হবে’। একইভাবে গত ৮ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, ‘শুধু গুলী করা নয়, সহিংসতায় জড়িতদের বংশধর পর্যন্ত ধ্বংস করে দেয়া হবে। অস্ত্র দেয়া হয়েছে নিরাপত্তার জন্য। আমরা কি বসে বসে আঙ্গুল চুষব’। ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি  শফিকুল ইসলাম কুমিল্লায় বলেন, ‘একটি লাশ পড়লে দুটি লাশ ফেলে দেয়ার ক্ষমতা পুলিশের আছে’। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এম হাফিজ আক্তার ১৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামে বলেন, কেউ সহিংসতা ঘটালে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ গুলী করবে। একইভাবে সরকারের সহযোগী জাসদ নেতা মঈনউদ্দিন খান বাদল ১৩ জানুয়ারি ঢাকায় বলেন, “ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে পায়ে গুলী করবে, কাজ না করলে বুকে গুলী করবে”। এটর্নী জেনারেল মাহবুবুল আলম এই মিলনায়তনে দাঁড়িয়ে বলেন, যদি দেখা যায় গাড়িতে কেউ বোমা মারছে, সঙ্গে সঙ্গে গুলী করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা তোমাদের ধরবই। সেটি জ্যান্ত হোক বা যেভাবেই হোক’।
এ অবস্থায় ‘ক্রসফায়ার’ ও বন্দুকযুদ্ধের নামে নির্বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানোর লাইসেন্স পেয়ে যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ভিন্নমত পোষণ করার কারণে নাগরিকদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুম করে ফেলা হচ্ছে। পায়ে গুলী করে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। ক্রসফায়ারে হত্যা করে বলা হচ্ছে যে, তিনি বিপথগামী মানুষ। দৈনিক প্রথম আলো ৬ জানুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্রসফায়ারে ১৯ জনের হত্যার তথ্য প্রকাশ করেছে। দৈনিক মানবজমিন ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ৭ দিনে ১২ জনকে ক্রসফায়ারে হত্যা। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ১ ফেব্রুয়ারি রিপোর্ট প্রকাশ করে জানিয়েছে শুধু জানুয়ারি মাসেই দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১৭ জন। বিএনপির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসহ ও বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, গত ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশ,  র‌্যাব ও বিজিবি এবং সাদা পোশাকে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের হাতে ৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এরমধ্যে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সংখ্যা ৪৩ জন। ক্রসফায়ার ও বন্ধুকযুদ্ধের নামে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে রংপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নোয়াখালী, কুড়িগ্রাম, যশোর, সাতক্ষীরা, ঢাকার আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ি, বরিশালের উজিরপুর ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, শামসুজ্জামান দুদুসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করে কয়েক দফায় রিমাণ্ডে নেয়া হয়েছে। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন স্তরের ১৮ হাজার দলীয় নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার আসামীর সংখ্যা ৭ লাখ। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও ট্রাকের নিচে ফেলে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পায়ে গুলী করে অনেক নেতাকর্মীকে পঙ্গুও করা হয়েছে। মাসের পর মাস বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, মহানগর কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। কোন মিছিল, কোন সভাসমাবেশ কিংবা অফিসে বসার কোন সুযোগই দেয়া হচ্ছে না। এক কথায় কোনো রাজনৈতিক অধিকার চর্চাই করতে দেয়া হচ্ছে না।
চলমান পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেছে তার আরো একটি জঘন্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের বাসভবন লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তদের গুলিবর্ষণের ঘটনা। এর আগে প্রখ্যাত কূটনীতিক সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ ও তার গাড়ি বোমা মেরে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সরকার ভিন্নমতের গণমাধ্যমগুলো আগেই বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে যেসব গণমাধ্যম চালু আছে, সেখানে ছিটেফোঁটা সমালোচনাও সহ্য করা হচ্ছে না। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সরকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঞ্চালনায় বাংলাভিশনের জনপ্রিয় টকশো ফ্রন্টলাইন বন্ধ করে দিয়েছে। এরশাদ আমলের মত অলিখিত ‘প্রেস অ্যাডভাইস’ জারি করে খবর সেন্সর করা হচ্ছে।  টকশো নিয়ন্ত্রণ তো অনেক আগ থেকেই করা হচ্ছে। মেধাবী সাংবাদিক শওকত মাহমুদের নামে পেট্রোল  বোমা ও যানবাহনে আগুন দেয়ার ৬টি মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। মামলা দেয়া হয়েছে পেশাজীবী নেতা সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে। এনটিভির চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী, ইটিভি চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে গ্রেফতার করে দফায় দফায় রিমাণ্ডে নেয়া হচ্ছে।
দেশে আজ যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার মূলে ৫ জানুয়ারির ভূয়া নির্বাচন। ওই নির্বাচনটি ছিল দেশে বিদেশে একটি চরম প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। দেশের জনগণের ভোটের অধিকারকে এ নির্বাচনে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জনকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। বাকি ১৪৬টি আসনে গড়ে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি। ৫৯টি কেন্দ্রে একজন ভোটারও যায়নি। সেদিন নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে কুকুর বিড়াল ঘুমিয়ে থাকার ছবি প্রধান প্রধান দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়। নির্বাচনের দিনেই ১৯জন প্রাণ হারায়। আর নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত সহিংসতায় নিহত হয় ১২৩ জন। জনগণ কোনভাবেই সেই ভোটহীন, ভোটারহীন ও প্রার্থীহীন সহিংস নির্বাচন মেনে নেয়নি। দেশ-বিদেশে এ নির্বাচন কোন বৈধতা পায়নি। চরম বিতর্কিত এ নির্বাচনে সংসদে একটি কৃত্রিম ও গৃহপালিত বিরোধী দল সাজানো হয়েছে। আবার ওই বিরোধী দল থেকেই কয়েকজনকে মন্ত্রীও করা হয়েছে। রওশন এরশাদকে করা হয়েছে বিচিত্র এই বিরোধী দলের নেতা। জেনারেল এরশাদকে করা হয়েছে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দূত। এর কোনটাই গণতন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর কারণেই আজ জাতি সংকটে পড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক সংকট হলেও সরকার তা মানছে না। একে আইন-শৃঙ্খলাজনিত সংকট প্রচার করে বলপ্রয়োগ করে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক এ সংকটকে রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের জন্য দেশের নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সমাজ সভা, সমাবেশ বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান সংকট নিরসনে সরকার ও রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কয়েকদিন আগে সুপ্রিম কোর্ট বার মিলনায়তন থেকে অধ্যাপক এমাজ উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবীরা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি ঐকমত্যের সরকার গঠনে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম মতিঝিলে তার অফিসের সামনের ফুটপাতে আজ ১৫ দিন ধরে অবস্থান করে দুই নেত্রীর মধ্যে, দুই জোটের মধ্যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ করার দাবি জানাচ্ছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন এবং এ দাবিতে ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অবস্থান কর্মসূচিতে যাচ্ছেন।  ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, ড. বদিউল আলম মজুমদার ও ড. শাহদীন মালিক নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে বিশিষ্ট নাগরিকদের অংশগ্রহণে একটি গোলটেবিল আয়োজন করে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বরাবরে চিঠি পাঠিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংলাপ অনুষ্ঠান ও একটি জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের অনুরোধ জানিয়েছেন। এ সবই শুভ উদ্যোগ। দেশের সংকটকালে যারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সফল হলে উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন না। দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।  আর তাতে অংশ নেবেন রাজনৈতিক নেতারাই। উদ্যোক্তাদের সন্তুষ্টি এতটুকুই হবে যে, দেশ সংকট মুক্ত হবে এবং জনগণের মধ্যে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসবে।
তবে দেশ ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হলেও সরকার এখনও সংলাপের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ নাগরিক সমাজের চিঠির পরদিনই বলে দেন এ প্রস্তাব অবাস্তব এবং সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোন সংলাপ নয়। সংলাপের উদ্যোক্তাদের এক-এগারোর কুশীলব বলেও আখ্যায়িত করা হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের বার্ণ ইউনিট পরিদর্শনে গিয়ে নাগরিক সমাজের আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কার সঙ্গে আলোচনা করব, খুনির সঙ্গে? একইদিন সংসদে প্রশ্নোত্তরে তিনি  বিএনপিকে জঙ্গি সংগঠন উল্লেখ করে নিষিদ্ধ করাও হুমকি দেন। তারপরও নিরাশ হলে চলবে না। সবার অংশগ্রহণমূলক, বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনই জাতিকে বর্তমান মহাসংকট থেকে উত্তরণে সহায়তা করতে পারে। এ ধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে গঠনমূলক সংলাপই জাতির আকাঙ্খা। সবার আশা, সরকার বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে দেশের সম্ভাব্য আরো ভয়াবহ পরিণামের কথা অনুধাবন করে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করবে এবং দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা করবে। বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়েই সমাধান করতে হবে, বল প্রয়োগে নয়। একতরফা নির্বাচন থেকে উদ্ভূত সংকট কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সুরাহা সম্ভব। কথা না বলার সংস্কৃতি গণতন্ত্রে অচল। একই সঙ্গে এ ধরনের সংকট আর যাতে সৃষ্টি হতে না পারে এবং দেশে যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি চলছে তা চিরতরে বন্ধ করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কতগুলো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছে একটি জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করাও জরুরি। এমন উদ্যোগ যে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে তার উদাহরণ ’৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় তিন জোটের রূপরেখা স্বাক্ষর। এমন উদাহরণ দেখা গেছে পাকিস্তানেও।  কয়েক বছর আগে লন্ডনে বেনজীর ভুট্টো, নওয়াজ শরীফসহ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ‘চার্টার অব ডেমোক্রেসি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর ফলে পিপিপির পাঁচ বছরের শাসনামলে পাকিস্তানে বিরোধীদলের একজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীকেও জেলে যেতে হয়নি। বিরোধীদলও সরকারের কাজে বাধা দেয়নি। তেমনি বর্তমান নওয়াজ শরীফ সরকারও একইভাবে তা অনুসরণ করে যাচ্ছেন। ঐকমত্যের ভিত্তিতে যদি এ ধরনের একটি জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয় এবং এ জন্যে হরতাল-অবরোধ, সংসদ বর্জন, জ্বালাও-পোড়াও, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বন্ধ হয়, তাহলে সেটাই হবে দেশের জন্য মঙ্গল। এর ফলে দেশের রুগ্ন ও অসুস্থ রাজনীতিরও অবসান হবে।  দেশের মানুষ এমন একটি শুভদিনের প্রত্যাশা করছে।
সৈয়দ আবদাল আহমদ 

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু আইনগত দিক নয় নৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ


স্বদেশকে মানুষ ভালবাসে, স্বপ্নের জালও বোনে। স্বপ্ন সফল হলে মানুষ আনন্দিত হয়, হয় কর্মমুখর। তবে বাস্তবতা হলো সব মানুষের যেমন স্বপ্ন পূরণ হয় না, তেমনি সব দেশও হয় না স্বপ্ন-পূরণের দেশ। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নেতৃত্বের মান। নেতৃত্বের মান নির্ভরশীল ত্যাগ-তিতিক্ষা, আদর্শ-নিষ্ঠা, উদারতা ও সৃজনশীল নানা বৈশিষ্ট্যের ওপর। আসলে মানোত্তীর্ণ নেতৃত্বের গুণেই একটি দেশ সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। এমন দেশে সুশাসন, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের কারণে নাগরিকরা আত্মমর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের কারণে নাগরিকরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জীবন যাপনের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপ্নটাতো এমনই ছিল। নেতৃবৃন্দও এমন অঙ্গীকারেই দীপ্ত ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে এ কোন দেশে আমরা বসবাস করছি? দেশে দিনের পর দিন হরতাল-অবরোধ চলছে। চলছে দমন-পীড়ন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের তান্ডব। ককটেল ও পেট্রোলবোমায় ঝলসে যাচ্ছে মানুষের জীবন। মানুষের বসবাস অনুপযোগী এমন নৃশংস পরিবেশ থেকে নাগরিকদের উদ্ধারের নেই কাংখিত আয়োজন। সরকার এবং রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের দায়িত্ব পালনের এমন নমুনা দেখে জনগণ আশাবাদী হবে কেমন করে? মানুষ এখন সরকার এবং রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের কাছ থেকে যৌক্তিক ও স্বাভাবিক বিষয়গুলো চাইতেও কুণ্ঠাবোধ করছে। এই কুণ্ঠাবোধ কি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনীহা প্রকাশ নয়? বিষয়টি আমাদের রাজনৈতিকি অঙ্গনের চ্যাম্পিয়নরা উপলব্ধি করলেই মঙ্গল।
আমাদের পাঠকরা নিশ্চয়ই সাগর-রুনির কথা ভুলে যাননি। গতকাল ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের ৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এই ৩ বছরেও হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটিত হয়নি। মামলা তদন্তের কোনো অগ্রগতি হয়নি। থানা-পুলিশ, ডিবি ঘুরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত করছে এলিট ফোর্স র‌্যাব। কিন্তু মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। আশার বাণী শোনাতে পারেনি তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এদিকে অন্তহীন অপেক্ষায় পরিবারের সদস্যরা। জনমনে প্রশ্ন, ওই হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচিত হবে কি? খুনিরা কখনও ধরা পড়বে কি? ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন শঙ্কা সুশাসনের নজির হতে পারে না। এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এখন নেতা-নেত্রীরা কথা বলছেন না। পত্র-পত্রিকা তথা মিডিয়াও এ ব্যাপারে নীরব। সবাই ব্যস্ত হরতাল-অবরোধ এবং দমন-পীড়ন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের মত বিষয়গুলো নিয়ে। মানুষের মৌলিক অধিকার ও প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখ ও যন্ত্রণার বিষয়গুলো নিয়ে ভেবে দেখার সময় যেন কারো নেই। এমন এক সমাজে এখন আমাদের বসবাস। কী চমৎকার সমাজই না উপহার দিলেন আমাদের নেতা-নেত্রীরা!
গত ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একই দিনে ১০ শিশুসহ ৩২ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় হতবাক দেশের জনগণ। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এত রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্ন। সবচেয়ে বেশী  প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে ১০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা। ঘটনার তদন্তে ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমাদের দেশে কমিটি গঠনের ইতিহাস তেমন সুখপ্রদ নয়। ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য কমিটি গঠন করা হয়, এমন একটি ধারণা জনমনে বেশ প্রবল। আমাদের রাজনীতি তো এখন দমন-অবদমন এবং সরকার পতন আন্দোলনে ব্যস্ত। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও এখন কত সহজেই না চলে যায় পর্দার অন্তরালে।
দেশের বর্তমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে জনগণ মুক্তি চায়। জনগণের আকাংখার অনুকূলে দেশের প্রাজ্ঞজনরা কথা বলেছেন, কথা বলছেন বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গও। গত সোমবার ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির সঙ্গে সংলাপ শুরুর পরিবর্তে আওয়ামী লীগ যত বেশি বিরোধীদের দমনে শক্তি প্রয়োগ করবে, ততই বেশি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের লক্ষ্যকে খাটো করে দেখা হবে। দুর্বল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতার সমতা নষ্ট হওয়ার কারণে দুর্নীতি বাড়ে, যা প্রবৃদ্ধি অর্জনকে দুর্দশায় ফেলে ও নিরুৎসাহিত করে। এসব বিষয়কে আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা তেমন গুরুত্ব দিতে চান না। নইলে আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ১০ ফেব্রুয়ারি কী করে নাগরিক সমাজের সংলাপের প্রস্তাবকে অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য বলে উড়িয়ে দেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বলেন, শামসুল হুদা কেন অন্য কেউ এই উদ্যোগ নিলেও এটি বাস্তবসম্মত হবে না। যারা সংলাপের কথা বলছেন, তারা পরোক্ষভাবে নাশকতা, সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন। এই যদি হয় আমাদের মন্ত্রী বাহাদুর তথা সরকারের চিন্তা-ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি, তাহলে দেশের জনগণ কাদের কাছ থেকে সংকটের সমাধান চাইবে? ১১ ফেব্রুয়ারি তারিখে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের বিতর্কিত হিসেবে উপস্থাপনের কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সরকার বিরোধী জোটের সাথে আপাতত কোনো ধরনের সংলাপ বা সমঝোতায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত থাকায় এমন কৌশল নিয়ে দলটি এগুচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যেও সেই বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। এদিকে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না পাওয়া পর্যন্ত লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাবে ২০ দলীয় জোট। নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো ইস্যুতে তথাকথিত সংলাপের উদ্যোগেও সাড়া দেবে না এই জোট। এই যদি হয় আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের চিত্র, তাহলে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপনের আকাক্সক্ষা পূরণ হবে কবে?
সভা-সামবেশের মতো স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক তৎপরতা রুদ্ধ করার ফলে গত ৫ জানুয়ারি থেকে রাজনৈতিক সংকটের সূত্র ধরে হরতাল-অবরোধের যে ধারা শুরু হয়েছে তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। অথচ শুরুর দিকে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিরা বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, ৭ দিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। ৭ দিন তো বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। পরিস্থিতির উন্নতির বদলে আরো অবনতি ঘটছে। তাই জনমনে এখন প্রশ্ন, কতদিনে সাতদিন পূর্ণ হবে? প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সরকার বলি কিংবা বিরোধী জোট, অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক পথ কারো জন্যই কল্যাণকর বলে বিবেচিত হতে পারে না। অহংকার, দম্ভ ও জিদ আসলে মানুষের পতনকেই ত্বরান্বিত করে। এর আগে অবশ্য মানুষের, সমাজের ও দেশের ক্ষতির মাত্রা তারা বাড়িয়ে যান। এ জাতীয় নেতা-নেত্রীরা ক্ষমতা হারানোর পর তাদের ভুল বুঝতে পারেন। তবে অসময়ের এমন উপলব্ধি দেশ, জনগণ ও তাদের জন্য তেমন কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তাই সময় থাকতেই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাই।
১১ ফেব্রুয়ারি মানব জমিন পত্রিকায় মুদ্রিত প্রধান শিরোনামটি লক্ষ্য করার মতো। ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন বর্তমান সংবিধানেই সম্ভব’ শিরোনামে মুদ্রিত লেখাটিতে বলা হয়, স্বাধীনতার পর আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় তিন তিনবার মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর মধ্যবর্তী নির্বাচন মানেই জাতীয় সংসদের নতুন নির্বাচন। বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় মেয়াদপূর্ণ হওয়ার আগেই তৃতীয় সংসদ ভেঙ্গে ১৯৮৮ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চতুর্থ সংসদের মেয়াদ পূর্তির  আগেই সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে ১৯৯১ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর ষষ্ঠ সংসদের মেয়াদ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংসদ ভেঙ্গে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯১ সালে প্রথম শপথ নিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম শপথ নিয়েছেন শেখ হাসিনা। উক্ত লেখায় শহীদুল্লাহ ফরায়জী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ দুই কারণে বিলুপ্ত হতে পারে। প্রথমত, ৫ বছরের মেয়াদ অতিবাহিত হলে। দ্বিতীয়ত, মেয়াদ অবসানের পূর্বে ভেঙ্গে দিলে। সংসদের মেয়াদ অবসানের পূর্বে ভেঙ্গে দেয়ার পর যে নির্বাচন হয়, তারই নাম মধ্যবর্তী নির্বাচন। দেশের জনগণ জাতীয় সংসদের মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হতে দেখেছে, আবার মাত্র ৪ কার্যদিবসের সংসদও দেখেছে। বর্তমান সংবিধানের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্ভব নয়, এমন একটি উদ্ভট বিভ্রান্তিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য কেউ কেউ উপস্থাপন করছেন। অথচ বিশ্বের যত দেশে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদ গঠন বা সংসদীয় পদ্ধতি বহাল আছে, সেসব দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রসঙ্গত লেখার শেষ দিকে শহীদুল্লাহ ফরায়জী উল্লেখ করেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য জাতীয় রাজনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৫ সালে ২৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) বিচারপতিদের মর্যাদা বাড়িয়ে উচ্চ আদালতে দেয়া রায় নৈতিকতা বিরোধী। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, নিজেরাই নিজেদের মর্যাদা বাড়িয়ে রায় দিয়েছেন। এ রায় কোনোমতেই সমীচীন নয়। এ ধরনের রায় পক্ষপাতমূলক। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দেশ নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ কিভাবে চলে সেটা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর এই সাহসী উচ্চারণ জাতিকে উচ্চতম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনায় কেবল আইনগত দিক নয়, নৈতিক দিক থাকাও অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীর এই উপলব্ধি রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পৃক্ত সকলের এবং রাজনীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের নৈতিক জগতকে আরো বিস্তৃত, সুগভীর ও উচ্চতর করতে পারে। এমন উচ্চতর নৈতিকতার মাপকাঠিতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বর্তমান সংসদ আইনগত হলেও কোনোভাবেই নৈতিকতাপূর্ণ কিনা। আমরা মনে করি, জনাব শহীদ উল্লাহ ফরায়জী প্রধানমন্ত্রীর সামনে যে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ভেবে দেখার মতো। আমাদের সরকার এবং বিরোধী জোট দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নৈতিক চেতনায় এগিয়ে এলে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সহজেই হতে পারে বলে প্রাজ্ঞজনরা মনে করেন।

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

পেট্রল বোমাবাজ কারা?


এখন আলোচনার তুঙ্গে পেট্রল বোমাবাজ। সন্দেহ নেই, বাসে ট্রাকে নিরীহ মানুষের উপর যারা পেট্রল বোমা মারছে, তারা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করছে। এ অপরাধকে মানবতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে ততই নানা প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে। বিশদলীয় জোটের অবরোধ শুরু হয়েছে ৬ জানুয়ারি থেকে। তার আগে ৩ জানুয়ারি থেকে সারাদেশে অবরোধ ডেকেছিল সরকার। ৫ জানুয়ারি ঢাকায় বিশদলীয় জোট আহূত ঢাকার সমাবেশ ভন্ডুল করার জন্য সরকার সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। তার আগে ২৭ ডিসেম্বর (২০১৪) গাজীপুরে আহূত বিশদলীয় জোটের জনসভা পণ্ড করতে আওয়ামী লীগ সেখানে ছাত্রলীগকে দিয়ে এক জনসভা ডাকায়। যদিও ঐ সমাবেশ করার জন্য তারা বেশ আগেই জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ করেছিল। তারও আগে ২৩ ডিসেম্বর (২০১৪) বিশদলীয় জোটের সভা করার কথা ছিল গাজীপুরে। কিন্তু ঐ দিন প্রধানমন্ত্রী টঙ্গী শ্রমিক সমাবেশের ঘোষণা দেওয়ায় বিশদলীয় জোট জনসভার তারিখ পরিবর্তন করে।
ছাত্রলীগের ঐ জনসভা আহবানের পর সরকার জেলা প্রশাসককে দিয়ে ঐ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করায়। ফলে বিএনপি আহূত জনসভা পণ্ড হয়ে যায়। আবার ১৪৪ ধারা জারি করা হলেও, আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখলাম, দিনভর সেখানে পুলিশের সামনে মিছিল, সমাবেশ, বিক্ষোভ করলো ছাত্রলীগ। এবং কী আশ্চর্য, তাতে সরকারের জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হলো না।
আসল বিপদটা ছিল অন্য জায়গায়। ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ সোহরোওয়ার্দী উদ্যানে বেশ কয়েকটি জনসভার ডাক দেয়। তার সবগুলোই মর্মান্তিক রকম ফ্লপ হয়েছিল। এর কোনোটায় প্রধান অতিথি ছিলেন হাসিনা তনয় সজীব ওয়াজেদ জয়। কোনোটায় বা দলীয় শীর্ষ নেতারা ছিলেন বক্তা। একটায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনসভায় লোক সমাগম না হওয়ায় জয় সভায় উপস্থিত হননি। আর একটি জনসভায় মন্ত্রী নেতারা উপস্থিত ছিলেন বটে, কিন্তু তাদের বক্তব্য শোনার জন্য কোনো শ্রোতা ছিল না। ফলে তারা সভাস্থল ত্যাগ করেছিলেন। পরে বাংলাদেশ বেতারের শিল্পীদের দিয়ে গান গাইয়ে লোক সমাগমের চেষ্টা করেছিলেন তারা। কিন্তু সে চেষ্টাও হাস্যকর রকম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সর্বশেষ জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল যেখানে উপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনা নিজেই। কিন্তু তাতেও দুই-তিন হাজারের বেশি লোক সমাগম হয়নি। যা-ও-বা হয়েছিল তাদেরও বেশিরভাগ ছিলেন সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী। মিউনিসিপ্যালিটির গাড়িতে করে এদের জনসভাস্থলে নিয়ে আসা হয়েছিল।
কিন্তু তার আগের কয়েক মাস বেগম খালেদা জিয়া যেখানেই জনসভা করতে গেছেন, সেখানেই স্মরণাতীতকালের বৃহত্তম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনা শঙ্কিত ছিলেন ৫ জানুয়ারি সোহরোওয়ার্দীতে তিনি যে জনসভার ডাক দিয়েছিলেন, সেটিও একইভাবে ফ্লপ করে যাবে। আর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিশদলীয় জোট নয়াপল্টনের যে জনসভার ডাক দিয়েছিলেন, তাতে কমপক্ষে ১০ লক্ষ লোক সমাগম হবে। এবং অথর্ব গোয়েন্দা বিভাগ রিপোর্ট দিয়েছিলো যে, এই ১০ লক্ষ লোক রাজপথে বসে পড়বে আর সরকারের পতন ঘটিয়ে ছাড়বে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই বসে পড়বে আর সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পতন ঘটবে, তা কি আদৌ সম্ভব? এই দশ লাখ লোককে রাস্তায় বসে থাকতে হবে বেশ কিছুদিন। তারা খাবে কি? থাকবে কোথায়? প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিবে কীভাবে? তাদের জন্য তো আর শাহবাগীদের মতো সিটি করপোরেশন ভ্রাম্যমান টয়লেট-গোসলখানা ব্যবহার করবে না। প্রতিদিন হাজার হাজার প্যাকেট খাবারও বিতরণ করবে না। এমনকি আসবে না লক্ষ লক্ষ পানির বোতল। গোয়েন্দা বিভাগ সেসব খতিয়ে দেখেনি। এসব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত হলো, বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেওয়া যাবে না।
৩ তারিখ রাতেই বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীকে গ্রেফতার করে অনেকটা এরশাদ স্টাইলে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে বিএনপির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় পুলিশ। সে সময় বিশদলীয় জোট নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। রাত সাড়ে ১১টায় তিনি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সরকার তার কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সকল গেইটে তালা লাগিয়ে দেয়। তিনি তার কার্যালয়েই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরদিন থেকে শুরু হয় নানা নাটক। রাস্তা থেকে ডজনখানেক ইট-বালুর ট্রাক ধরে এনে বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ের পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। কার্যালয়ের সামনে নিয়ে আসা হয় প্রিজন ভ্যান, জলকামান, অ্যাম্বুলেন্স। এলাকাটি হয়ে ওঠে রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্র।
৫ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টায় নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ খালেদা জিয়া সমাবেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়িতে ওঠেন। কিন্তু সরকার তো তাকে বের হতে দেয়ইনি, বরং তার ও তার নেতাকর্মীদের উপর বিষাক্ত ও নিষিদ্ধ বিষ পেপার স্প্রে ছুঁড়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার পরের ঘটনাগুলো ঘটে দ্রুত। বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয় ঘিরে একের পর এক নাটক চলতে থাকে। কখনও নিরাপত্তা বেষ্টনী দুই স্তরে নেমে আসে। কখনও ছয় স্তরে উঠে যায়। কখনও তার গেইটের তালা খোলে। কখনও আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর মধ্যে গত ২৪ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মালয়েশিয়ার ইন্তেকাল করেন। শোকের ছায়া নেমে আসে সারাদেশে। ২৭ তারিখ তার লাশ নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। আদরের সন্তানের লাশ দেখে শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। ডাক্তার তাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে শোক জানাতে গেইট পর্যন্ত গিয়ে ফেরত আসেন। সেদিনই দুপুরে যাত্রাবাড়িতে বাস পোড়ানোর কেসে হুকুমের আসামী করে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে সরকার। আর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তাকে সমবেদনা জানাতে যান প্রধানমন্ত্রী। তা নিয়েও নাটক এবং প্রশ্নের শেষ নেই। তার তিনদিন পর গুলশানস্থ বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় সরকার। সঙ্গে টিএনটি টেলিফোন ও মোবাইল সংযোগ, ডিস লাইন, ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে সরকার।
তার পরের ঘটনাই সবচাইতে মারাত্মক। ৫ তারিখে বিশদলীয় জোট ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচী অব্যাহত আছে। কিন্তু বাড়তে থাকে পেট্রল বোমা হামলা। সরকার নামিয়ে দেয় বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনী। অপারেশনে নেমে তারা যে ভাষায় কথা বলতে শুরু করলো, তাতে মনে হয়, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ঐ তিনবাহিনীই গ্রহণ করেছে। তাদের ভাষা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর ভাষা নয়। সে ভাষা অধম তথা ‘হাইব্রিড’ আওয়ামী নেতাদের চেয়েও নিকৃষ্ট। সরকারই যদি প্রকৃত ক্ষমতাধর হতো, তাহলে ঐ তিন বাহিনী প্রধান এ ধরনের উক্তি করতে পারতেন না। এরপর রহস্যজনকভাবে বেড়ে গেছে পেট্রল বোমা হামলার ঘটনা।
সত্য যে এই পেট্রল বোমা হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আগুনে পুড়ে যারা হাসপাতালের বেড়ে কাতরাচ্ছেন, তারা নিরীহ মানুষ। কিন্তু কে চালাচ্ছে এই পেট্রল বোমা হামলা সে প্রশ্নে আওয়ামী ঘরানার লোকেরা এবং ক্ষীয়মান বামদলের নেতারা একযোগে বলার চেষ্টা করছেন যে, পেট্রল বোমা হামলার জন্য জামায়াত-শিবির দায়ী, বিএনপি তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে।
কিন্তু প্রকৃত ঘটনা বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। ইতিমধ্যে সরকার অবরোধ কর্মসূচী ভ-ুল করে দেওয়ার জন্য বাস-ট্রাক চালকদের এই বলে আশ্বাস দেয় যে, আপনারা গাড়ি চালান, সরকার র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবি দিয়ে পাহারা দিবে। পাহারা দেওয়া শুরু হয়। পেট্রল বোমা হামলাও বাড়তে থাকে। এ পর্যন্ত যে কয়েকটি বড় ধরনের পেট্রল বোমা হামলা হয়েছে, তার সব ক’টি বাস-ট্রাকের সামনে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার বাহিনী নিয়োজিত ছিল। তার মাঝখানেই পেট্রল বোমাবাজরা বাস-ট্রাকে হামলা চালায়। ডজন ডজন মানুষের পুড়িয়ে মারা ও অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ সরকার শত স্টান্টবাজি সত্ত্বেও মানুষের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। আরও আশ্চর্য ঘটনা এই যে, ঐসব বন্দুকধারী পাহারাদাররা ঘটনাস্থলে কোনো বোমাবাজকেই পাকড়াও করতে পারেনি বা গুলি করে হত্যা করেনি। পরে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করেছে।
সম্প্রতি সংঘটিত কয়েকটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। গত ৯ ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে দেখা যায় যে, ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ অফিস থেকে পুলিশ ১০টি পেট্রল বোমা উদ্ধার করেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদের ভাড়া বাড়িতে ৭ ফেব্রুয়ারি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এ বিস্ফোরণের পর পুলিশ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কাউকে ঢুকতে দেয়নি। বাড়িতে আগুন লাগলে দমকল বাহিনী সে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিস্ফোরণ নিয়ে কেউ কোনো কথাই বলতে চায়নি। আসলে সেটি ছিল সম্ভবত ঐ সংসদ সদস্যের নিয়ন্ত্রণাধীন পেট্রল বোমার কারখানা। গত ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের টাইগার পাস এলাকা থেকে বিপুল পেট্রল বোমাসহ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। সংবাদপত্রের খবরে দেখা যায়, ৫ ফেব্রুয়ারি রূপগঞ্জে বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণে চার ছাত্রলীগ নেতা আহত হয়েছে। একইদিন রাজশাহীতে রাজশাহী বিশ্বদ্যালয়ের ফেসবুকের অফিসিয়াল পেজ-এ ঘোষণা দিয়ে জানায় যে, বোমা আমরা মেরেছি। দোষ হচ্ছে ছাত্রদল-জামায়াত শিবিরের। এই হচ্ছে পলিটিক্স। ৫ ফেব্রুয়ারি চৌদ্দগ্রামে পেট্রল বোমাসহ দুই যুগলীগ নেতাকে আটক করা হয়।
৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর শীর্ষ সংবাদে বলা হয় ‘জামিনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রত্যায়নপত্র/ বোমাবাজরা সৎ ও মেধাবী’। তাতে বলা হয়, নাশকতার দায়ে কমপক্ষে ৫০০ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। তাদের মুক্তির জন্য সৎ ও মেধাবী সার্টিফিকেট দিয়েছেন আওয়ামী লীগের এমপিসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা। গ্রেফতারকৃতরা যদি আওয়ামী লীগের না-ই হবেন, তবে তাদের সচ্চরিত্রের সার্টিফিকেট দেওয়াও প্রয়োজন আওয়ামী নেতাদের কেনো হবে? এদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম মহাসচিব হানিফ বলেছেন, বিএনপি যদি হরতাল-অবরোধ তুলে নেয়, তাহলে ২৪ ঘণ্টা মধ্যে তারা পেট্রল বোমাবাজির অবসান ঘটাতে পারবে। তবে কি পেট্রল বোমাবাজরা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন? এদিকে আবার প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, পেট্রল বোমা হামলার ধরন দেখে মনে হয় ‘এটা যেন মিলিটারী অপারেশন। যারা করেছে তারা দক্ষতার সঙ্গে করেছে। তার মনে হয়েছে তারা আগে থেকেই এলাকা রেকি করেছে। আর পেট্রল বোমায় যে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো সাধারণ দাহ্য পদার্থ নয়। বিশেষ ধরনের পদার্থ যা বিশেষ ধরনের লোকদের কাছে থাকাই স্বাভাবিক।’
এই হলো পেট্রল বোমা কাহিনী। আমি এদেশের নাগরিক, সুশীল সমাজ, রাজনীতিক সকলের কাছে একটি চিত্র তুলে ধরলাম মাত্র। বিবেচনার ভার দেশবাসীর।
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 

সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বোমাবাজির রাজনীতি ক্ষমতার মসনদ নিষ্কণ্টক করতে পারে না


উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে সুবিধা নেয়ার স্বভাব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মজ্জাগত। এই দলটি তার জন্মলগ্ন থেকেই নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এসেছে। মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ গঠনের বিবর্তন প্রক্রিয়া এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার বিচরণ, সংঘাত, সংঘর্ষ, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, পরমত অসহিষ্ণুতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রতিদ্বন্দ্বী নিধন এবং বিদ্বিষ্ট আচরণে ভরপুর। ফ্যাসিবাদ দলটির প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রতারণা তার প্রধান কর্মকৌশল। বিরোধী দলের চলমান আন্দোলন মোকাবিলায় দলটির এই বৈশিষ্ট্যই ফুটে উঠেছে।
গত শুক্রবারের দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পাঁচ কলাম হেডিং-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ করেছে। সংবাদটির শিরোনাম হচ্ছে “জামিনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্র : বোমাবাজরা সৎ ও মেধাবী।” প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ঢাকাস্থ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ছাত্র মো: রেজাউল ইসলামকে মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ পেট্রোল বোমাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করেছিল। এই ঘটনার পর রেজাউলের আইনজীবী আদালতে আসামীর জামিনের পক্ষে একটি প্রত্যয়নপত্র জমা দেন। আওয়ামী লীগের পাবনা সদর উপজেলা সভাপতি আলহাজ্ব মো: মোশাররফ হোসেন স্বাক্ষরিত এই প্রত্যয়নপত্রে বলা হয়, “আসামী রেজাউল ইসলাম আওয়ামী লীগের সদস্য। সে সৎ ও মেধাবী। সে কোন রাষ্ট্র বিরোধী কাজে জড়িত নয়।”
শুধু মোহাম্মদপুর থানার এই একটি ঘটনাই নয়, সারা দেশে নাশকতার সাথে জড়িত এমন শত শত আসামীর পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রত্যয়নপত্র দিয়ে জামিনে ছাড়িয়ে নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন নাটোরের মশিন্দা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রদত্ত এ ধরনের একটি প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপিও প্রকাশ করেছে এবং তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেছে যে, সারা দেশে হরতাল-অবরোধ চলাকালে ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ-বোমাবাজি প্রভৃতি মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামীদের এভাবে প্রত্যয়নপত্র দিয়ে কোর্ট থেকে জামিন করিয়ে নিচ্ছে এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত এলাকার আইনজীবীরাই আসামীদের পক্ষে কাজ করেন। পত্রিকাটি আরো বলেছে যে, ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিভিন্ন নাশকতার মামলায় আসামী পক্ষ পাঁচশতাধিক প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেছে। প্রত্যয়ন পত্রসমূহের কোন কোনটিতে আওয়ামী লীগ নেতারা বোমাবাজদের সৎ ও মেধাবী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের জামিনের সুপারিশ করেন। আবার কোন কোনটিতে এই মর্মেও সার্টিফিকেট প্রদান করা হয় যে, আসামী ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের সদস্য। এইসব মামলায় অভিযুক্তদের পুলিশের পক্ষ থেকেও পক্ষপাতিত্ব করে বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। তারা মামলা নেয়ার বা দেয়ার সময় অভিযুক্তদের নাম ঠিকানার হেরফের করেন। পূর্ণাঙ্গ নামের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত নাম দেন। বাবার নাম ও বাড়ির ঠিকানায় ভুল থাকে এবং সাথে কোন জব্দ তালিকাও থাকে না। ফলে মামলা আদালতে টিকে না।
৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারের পত্রিকাসমূহে যানবাহনে বোমা হামলার সাথে ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতার আরও বেশ কিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত এসব রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা বোমা বানাতে গিয়ে কিংবা বোমা হামলা করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিপুল সংখ্যায় হতাহতও হচ্ছে এবং পুলিশ তাদের গ্রেফতারও করছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের কর্মী হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ উঠছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ছোনাব এলাকায় বোমা বানাতে গিয়ে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের চার কর্মী গুরুতর আহত হয়েছে। ছাত্রলীগ নেতা শাহীন মিয়ার ঝুটের গুদামে বোমা বানাতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ফেইস বুকের অফিসিয়াল পেইজে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ ও হামলার দায় স্বীকার করে পোস্ট দেয়া হয়েছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথ দিঘী ইউনিয়নের কেচকিমোড় এলাকা থেকে পেট্রোল বোমাসহ দুই যুবলীগ নেতাকে পুলিশ আটক করেছে। ফেব্রুয়ারির দুই তারিখে পেট্রোল বোমা, ককটেল ও দেশীয় অস্ত্রসহ বিজিবি ৬ জন আওয়ামী লীগ কর্মীকে আটক করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে বলে জানা যায়।
লক্ষ্মীপুরে গত ১ ফেব্রুয়ারি যাত্রীবাহী সিএনজি ও পিকআপ ভ্যানে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপের দায়ে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা কামরুল হোসেন, যুবলীগ কর্মী পিচ্চি রুবেল, শামীম, মাসুদ ও জেলা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক মুরাদ হোসেন জয়সহ ১০/১২ জন ধরা পড়ে। কিন্তু পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করলেও তা কোন কাজে আসেনি।
গতকালও দেশের জাতীয় দৈনিকসমূহে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে যুবলীগ কার্যালয় থেকে পুলিশ কর্তৃক ১০টি পেট্রোলবোমা উদ্ধারের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ অনুযায়ী পুলিশ বোমা প্রাপ্তির স্থানটিকে পুরাতন ভবনের বাথ রুম এবং ক্লাব ঘরের পিছনে টিনের ছাউনি দেয়া ঘর বললেও প্রকৃতপক্ষে সেটি হচ্ছে ২৭ নং দক্ষিণ আগ্রাবাদস্থ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ওয়ার্ড অফিস। এই অফিসে সার্বক্ষণিকভাবে এই তিন লীগের নেতাকর্মীদের মিটিং ও আড্ডা চলে। পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। সারা দেশ থেকেই এই ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। 
অপরাধীরা পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। যাদের আটক করা হচ্ছে তারা হয় জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী, নয়তো বিএনপি-ছাত্রদলের সাথে সম্পৃক্ত অথবা সাধারণ মানুষ, নিরীহ পথচারী। আবার এই ধরনের মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের কোথাও কোথাও গুম করে দেয়া হচ্ছে, আবার কোথাও ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে গুলী করে হত্যা করা হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসন রাজধানীর ২৯টি এলাকায় নাশকতার সাথে জড়িত বলে কথিত জামায়াত-বিএনপি’র ১০৪৬ জনের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে ১০০ জন বোমাবাজকে গ্রেফতার করার জন্য থানাগুলোকে আদেশ দেয়া হয়েছে। যতদূর জানা গেছে ক্ষমতাসীন দলের কোনও সন্ত্রাসী বোমাবাজের নাম এখনো তালিকাভুক্ত করা হয়নি। এখানে মাঠের বাস্তবতা এবং পুলিশ প্রশাসনের বাস্তবতার সাথে কোনও মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বোমাবাজ যারা ধরা পড়ছে এবং ধরার বাইরে থেকে অহরহ সন্ত্রাস- নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে তারা তালিকাভুক্ত হবে না কেন? পুলিশকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে সহযোগিতা করার জন্য? গত পরশু অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র জুবায়ের হত্যা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। এতে ছাত্রলীগের ৫ জন নেতাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে এবং ছয়জনকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদন্ড। এরা কি খুনি সন্ত্রাসী নয়? ঢাকাসহ সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তাদের সন্ত্রাসী তান্ডব, প্রতিপক্ষের ওপর হামলার সচিত্র রিপোর্ট কি প্রশাসন দেখছেন না? সম্ভবত গত বছর পত্রপত্রিকায় এই মর্মে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা এবং বিরোধী দল দমনের জন্য ক্ষমতাসীন দল তাদের ছাত্র সংগঠন এবং যুব সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মীকে গেরিলা কর্মকান্ডের উপর প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে সারা দেশে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। বিরোধী দলের অবরোধ-হরতালে আমরা কি এখন ঐ সব প্রশিক্ষিত ব্যক্তির তান্ডবের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি? সরকার বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হুকুমের আসামী বানাচ্ছেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া হয় যে, তারা হুকুম দিয়েছেন। তাহলেও দেখা যায় যে, এই হুকুম তামিল করছেন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীরা। এই এক আজব দেশ। দেশকে সরকার কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা ভেবে দেখা দরকার। দেশব্যাপী সন্ত্রাস ও বোমাবাজি করছে ক্ষমতাসীনদের লোকেরা আর দোষ চাপানো হচ্ছে জামায়াত-শিবির ও বিএনপি-ছাত্রদলের ওপর। এর বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলী চলতে পারে না।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে প্রদত্ত মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাষণের অংশ বিশেষ আমি এখানে উদ্ধৃত করছি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন: “আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য। আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী, নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে। তাদের বুকের উপর হচ্ছে গুলি।” পরিতাপের বিষয় হচ্ছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তার দল ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানী সৈন্যদের ট্রাডিশনই অনুশীলন করেছিলেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দলীয় বাহিনী ও রক্ষী বাহিনীর বর্বরতা মানুষ ভুলেনি। এখন প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহারের উন্মুক্ত লাইসেন্স প্রদান এই কথাগুলোকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সীমান্তে পাহারা থেকে বিজিবিকে উঠিয়ে এনে জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের রাজস্বের অর্থে কেনা অস্ত্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার অবশ্যই অমার্জনীয় একটি অপরাধ।
সরকার জামায়াত ও বিএনপিকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী সব সময় এই ঘোষণা দিচ্ছেন। জামায়াত-শিবিরকে নির্মূলের মাধ্যমে এদেশে ইসলামী আন্দোলনকে ধ্বংস করে দেয়া এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপিকে ধ্বংস করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন। তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগে তারা জামায়াতের প্রবীণ, অভিজ্ঞ, ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ দক্ষ জনশক্তিকে ফাঁসি দিয়ে নির্মূল করবেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের পরে যাদের জন্ম হয়েছে কিংবা ঐ সময়ে যারা শিশু ছিলেন তাদের কিভাবে নির্মূল করবেন? তাদের এবং উঠতি নেতৃত্বের উৎস ধ্বংস করার জন্য একটি অছিলা দরকার। নিজেরা সন্ত্রাস-বোমাবাজি করে তাদের ওপর দায় চাপিয়ে তারা ঐ অছিলাই সৃষ্টি করছেন বলে মনে হয়। এই অছিলাকে ব্যবহার করেই তারা বিচারবহির্ভূতভাবে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের হত্যা করছেন।
একই অবস্থা চলছে বিএনপির ক্ষেত্রেও। আদর্শিক এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে এদেশে নির্বিঘ্নে কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন এই আশা দুরাশা বলেই আমার বিশ্বাস। মিথ্যার আবরণে সত্যকে সন্দেহযুক্ত করে এবং সত্যের বিরোধিতা করে অতীতে কেউ টিকে থাকতে পারেননি, এখনো পারবেন না। দেশবাসীর উচিত ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে আল্লাহ্ সাহায্য কামনা করা এবং অভীষ্ট লক্ষ্যে আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া।
ড. মোঃ নূরুল আমিন 

রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সমঝোতার জন্য সংলাপ


বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘দীর্ঘ অবরোধ ও হরতালে দেশের জেলা শহরগুলোর অবস্থা বিপজ্জনক।’ সাদা চোখে আর গভীর বিশ্লেষণে সমসময়ে দেশের চরম পরিস্থিতি আরো নজর এড়ায় না। আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে আছে। জনজীবন বিপর্যস্ত। আর রাজনীতি? রাজনীতি চরম অচলাবস্থায় স্থবির। যে রাজনীতির কাজ নানা রাজনৈতিক সঙ্কট রাজনৈতিকভাবে সুরাহা করার, সেটা করা সম্ভব না হলে রাজনীতিকে মানুষ দোষারোপ করবেই। বলবে, রাজনীতি নিজের সমস্যার সমাধান তো করতে পারছেই না; বরং সেসব সমস্যার চাপ-বিপদ-আগুন মানুষের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। মানুষ এমন কথা বলতেই পারে। কারণ, বাংলাদেশ এখন আত্মক্ষয়ী পথে এগুচ্ছে। নেতৃত্ব সবার সামনে গ্রহণযোগ্য সমাধান তুলে ধরতে পারছে না। এমন কি, সঙ্কটের মীমাংসার পথকেও উন্মুক্ত করার বদলে রুদ্ধ করা হচ্ছে।
এখন বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা কি? মাসাধিককালের আন্দোলন-সংগ্রাম, অবরোধ, হরতাল চলছেই। দাবি আদায় না হলে বিরোধীরা থামবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তাদেরকে থামানোর জন্য কোনো রাজনৈতিক সমাধানমূলক ব্যবস্থা নেয়াও হচ্ছে না। বরং আগুনে ঘি ঢেলে বা শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত ও মারমুখী করা হচ্ছে। ফলে চারদিকে আগুন, মৃত্যু, হানাহানি, তান্ডব, হামলা আর পাল্টা-হামলা, অভিযোগ আর প্রতি-অভিযোগের বিরাট পাহাড় জমছে। একদল যেন আরেক দলের বিনাশের যজ্ঞে উন্মাদের মতো মেতে উঠেছে। মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিরীহ জনতা। সবার মধ্যে তীব্র আকুতি, ‘কবে শেষ হবে বিনাশের ধাবমান অগ্নিকু-?’ কিন্তু জনতার  আর্তনাদ কর্তাদের কানেও পৌঁছাচ্ছে না।
এটা ঠিক যে, রাজনৈতিক সঙ্কটের বলি হয়ে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থীরা পড়তে বা পরীক্ষা দিতে পারছে না। ক্ষুদ্র-বড়-মাঝারি শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীরা আটকে আছে অচলাবস্থায়। থমকে আছে রাজপথ, রেলপথ। মাঝে মাঝে জ্বলছে হিংসার আগুন। অকাতরে মরছে মানুষ। ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দী এখন দেশের জেলখানাগুলোতে। দগ্ধ হয়ে মরেছে অর্ধ-শতাধিক লোক। হানাহানিতে এ যাবত মারা গেছে শতাধিক মানুষ। আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক হাজার। গ্রেফতার শত শত। কোথাও কল্যাণ বা ইতিবাচকতার সামান্য আলোকরেখাও দেখা যাচ্ছে না। মানুষ বেঁচে থাকার স্বাভাবিক নিয়মের আকাক্সক্ষায় কাতর হয়ে আছে। কিন্তু রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সমাধান সূত্র দিতে বা সঙ্কট মোচনের পথ খুলতে পারছে না। দলীয় হিংস্রতা আর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার বৃত্তেই আবদ্ধ হয়ে আছে।
বিদ্যমান বিক্ষত পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের শত আহাজারি, প্রত্যাশা আর চাওয়া পদদলিত হচ্ছে। সবাই সংলাপ আর সমঝোতার পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বললেও বিবদমান পক্ষসমূহ অনড়। মনে হচ্ছে, আলোচনা বা সমঝোতা নয়, বিনাশেই যেন অবসান হবে সঙ্কট। সবার সর্বনাশেই  যেন কারো কারো প্রাপ্তি অপেক্ষা করছে! হায়! কা-জ্ঞান বা বিবেক নামে বিষয়টি কি সমাজ আর দায়িত্বশীল মানুষের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে? কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থের কথা বাদ দিয়ে সাধারণের কল্যাণ চিন্তা করতে পারছে না কেন? কেন দলীয় বলয় আর ক্ষমতার মোহের স্বর্গই একমাত্র কাম্য হয়ে আছে?
বাংলাদেশের রক্তলিপ্ত পরিস্থিতি দেখে-শুনে মনে হচ্ছে হিন্দু-পৌরাণিক মহাভারত-এর ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের মধ্যে লিপ্ত হয়েছি আমরা। নানা দলের ও এলাকার নিজেদের দেশ ও সমাজবাসীকেই আমরা মারছি নানা উগ্রতার নামে। একবারও ভাবছি না তার বিপন্ন পরিবার-পরিজন-স্বজনদের কথা। সংঘাত যেন সকল স্পর্শকাতরতা আর মানবিকতার অবসান ঘটিয়েছে। যেন চরম উগ্রতা আর নৃশংসতার মুখোশে আড়াল করেছে নিজেদের মানবিক-মুখ! শক্তির অন্ধ-দাপটের কাছে বার বার পরাজিত হচ্ছে মানবতা। দেশের প্রান্তে প্রান্তে এখন শুধু স্বজন হারানোর তীব্র বেদনার স্রোত বয়ে চলেছে। আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে উঠছে প্রতিরোধের সুতীব্র দুর্গ।
সবাই জানেন যে, চলমান সমস্যাটির সূত্রপাত ও বিস্তার রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিজ্ঞানের সূত্রানুযায়ী, যে কোনো সমস্যার সমাধান নিহিত থাকে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতেই। অর্থাৎ যে সমস্যার সৃষ্টি ও বিকাশ রাজনৈতিক কারণে, সেটার সমাধানও রাজনৈতিকভাবে হতে হবে। অর্থনৈতিক বা শক্তির মাধ্যমে সে সমস্যার সমাধান আশা করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে বিবদমানরা সমস্যায় আবর্তিত হচ্ছে এবং এর কারণে নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষকে আক্রান্ত করছে। কিন্তু সমস্যার সমাধানের সূত্র সন্ধান করছে না। পরস্পরের প্রতি দোষারোপ করছে কেবল। এতে সমস্যার বিস্তার ঘটছে। সমাধানের পথ বের হচ্ছে না। সরকার ভাবছে, বিরোধীদের আন্দোলন জনগণ গ্রহণ করছে না। বিরোধীরা ভাবছে, আন্দোলনে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে। সবাই অপর পক্ষের কি কি ক্ষতি হচ্ছে, সেটারই তালিকা করছে। নিজেদের কি ক্ষতি হচ্ছে, সেটা দেখারও প্রয়োজন বোধ করছে না। মানুষের কি দুর্ভোগ আর বিপদ হচ্ছে, সেটাও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। এমনই বিনাশকামিতায় নিমজ্জিত সংশ্লিষ্টরা। এর চেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি কি হতে পারে! তবুও পরিস্থিতির ভয়াবহতা যে কর্তৃপক্ষের অনুধাবন করার কথা, তারা সেটা করছেন কি? রাজনৈতিক সমস্যা কি রাজনৈতিকভাবে সুরাহা করা হচ্ছে?
অথচ ইতিহাস আর সভ্যতা বলে অন্য কথা। বিনাশকাল চিরস্থায়ী হয় না ইতিহাসের পাতায় কিংবা সভ্যতার শরীরে। তবে বাংলাদেশে এমনই বিনাশকালের কালো ছায়া প্রলম্বিত হচ্ছে কেন? কেন এখনো লাগাম টেনে ধরা হচ্ছে না বিনাশের  নানা আয়োজন আর বলদর্পী উন্মাদনার? কেন চলছেই ক্ষতিকর ধারা? কেন ধরা হচ্ছে না যে, আত্মধ্বংসী লড়াইয়ে নিজেদেরই ক্ষতিই হচ্ছে এবং হবে সবচেয়ে বেশি। আর এই বিনাশের পথ প্রশস্ত করছে বিপদের নানা পথ ও পন্থা।
রাজনৈতিকভাবে সচেতন বাংলাদেশের মানুষ এখনো আশায় চেয়ে আছে। প্রত্যাশা করছে, সকলের মধ্যে শুভবোধের উদ্বোধন হোক। মানবিক বিবেক আর ইতিবাচকতা জেগে উঠুক। মানুষ আর সমাজের জন্য হানিকর তৎপরতা সংশ্লিষ্টরা পরিত্যাগ করুক। নিজের আর অপরের ভালোর দিকটিকেই সামনে নিয়ে আসুক। ত্যাগ, ক্ষমা, সংযমের চিরায়ত আদর্শে ক্ষমতা, লোভ, লাভ আর শক্তির রণমূর্তিকে ভেঙে ফেলুক সবাই মিলে। তা না করা হলে বিনাশকাল থামানো যাবে না। বিনাশের মহাঅগ্নিকুন্ডে নিমজ্জিত হয়ে সবারই ক্ষতি বন্ধ করতে সবাইকেই উদ্যোগী হতে হবে। যত তাড়াতাড়ি এমন উদ্যোগ নেয়া হবে, ততই মানুষ আর সমাজের কল্যাণ ত্বরান্বিত হবে। আমরা বিনাশকাল নয়, মঙ্গল, সুস্থতা, শান্তি আর বিকাশের কাল দেখতে চাই আমাদের বর্তমান আর আগামীর দিনগুলোতে। আমরা রাজনৈতিক সংলাপ, আলোচনা ও সমঝোতার পথে সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ প্রত্যাশা করি। প্রতিটি মানবিক, বিবেকবান মানুষই সংঘাত ও হিংসার পথ নয়, কামনা করেন শান্তির পন্থা। যে শান্তিময় পন্থায় বিশ্বের নানা দেশে বহু সঙ্কট ও সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। নিরসন করা হয়েছে বহুবিধ অচলাবস্থা। বাংলাদেশেও এমনই একটি শান্তিবাদী ও সংলাপমূলক পন্থা অচিরেই গৃহীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে।
যারা শান্তি ও সমঝোতাকে বিশ্বাস করেন, ইতিহাসে তারাই বিজয়ী হয়েছেন। একগুঁয়েমি আর উগ্রতা পরাজিত হয়েছে। কোনো সংলাপ হবে না, কোনো আলাপ-আলোচনা হবে না, এমন কথা সঙ্কটকে আরো তীব্রভাবে বাড়িয়ে দেবে। সমাধানের পথকে সঙ্কুচিত করবে। কেউ কেউ এমন একপেশে কথা বলে বিপদ বাড়াচ্ছেনও বটে। এদের আরো সচেতন হতে হবে। বর্তমান বিপদ যেন ভবিষ্যতের আরো ভয়াবহ বিপদের কারণ না হয়, সেটাও মাথায় রাখতে হবে। সর্বোপরি জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা আর দাবিসমূহকে উপযুক্ত মূল্য দিতে হবে। জনগণের দাবি ও ইচ্ছাই যে রাজনৈতিকভাবে চূড়ান্ত, সেটা মেনে নেয়াই গণতন্ত্রের কথা। বিবেকের কথা। বুদ্ধি ও সচেতনার কথা। এই কথা মেনে নিলে লাভ বৈ ক্ষতি নেই।
একটি সুদীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ পাড়ি দিচ্ছে। যে কোনো আন্দোলনের নিয়মই হলো, সেটা তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছাতে চায়। আন্দোলন-সংগ্রাম জনগণের শক্তিতে সে চেষ্টাই করে। জনগণের শক্তির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়াগ বা হিংস্রতার অবলম্বন সুবিবেচনার কাজ নয়। সঙ্কট বাড়াতে হিংসার আশ্রয় নেয়া হলেও পরিশেষে আলাপ-আলোচনাই কাম্য এবং একমাত্র প্রতিষেধক। কারণ, সমঝোতার জন্য সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার বিকল্প নেই। এই বিকল্পহীন পথে তাড়াতাড়ি এসে মানুষ ও রাজনীতির সঙ্কট নিরসন করা হবে বলেই সকলে প্রত্যাশা করেন। এমন শান্তির পথেই সমাধান আসুক।

শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

একদিকে পেট্রোলবোমা অন্যদিকে ক্রসফায়ার চারদিকে লাশের মিছিল


চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আশার কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না। সংকট সৃৃষ্টির পর আজ ৩৪ দিন পার হয়ে গেল। কিন্তু সুড়ঙ্গের ওপাশে কোনো আলোক রশ্মি তো দূরের কথা, আশার কোনো বিন্দুও দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘ ৩১ দিন পর গত শুক্রবার ৬ ফেব্রুয়ারির টিভি এবং বার্তা সংস্থাসমূহে একটি খবর এলো। ৩১ দিন পর এই প্রথম মনে হলো যে খবরটিকে ইতিবাচক হিসেবে গণ্য করা যায়। খবরটি সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে খবরটি নিচে তুলে ধরা হলো, “আলোচনায় রাজি : ইইউ রাষ্ট্রদূতকে আ.লীগ”। ‘শীর্ষ নিউজ’ ডটকম পরিবেশিত খবরে বলা হয়, “চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আলোচনায় রাজি বলে ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত পিয়েরো মায়াদুরকে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তবে আলোচনার আগে বিএনপিকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবে বলেও জানিয়েছেন তারা। বৃহস্পতিবার রাতে ইইউ রাষ্ট্রদূতের আমন্ত্রণে তার ঢাকাস্থ বাসভবনে আয়োজিত বৈঠকে আলাপকালে আওয়ামী লীগ নেতারা এ কথা জানান। উল্লেখ্য, আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা এ বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠক শেষে নৈশভোজেরও আয়োজন করা হয়েছিল। সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, ইইউ রাষ্ট্রদূত আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাই আমরা গিয়েছিলাম। আমরা তাকে জানিয়েছি, আলোচনা করতে হলে বিএনপিকে আগে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সেই সঙ্গে ‘নাশকতা কেন করেছে’ তাও তাদের বলতে হবে। বৈঠকে যোগ দেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, আব্দুল মজিদ মৃধা এমপি প্রমুখ। এছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার, কানাডার রাষ্ট্রদূত এবং ইউএস এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর উপস্থিত ছিলেন। চলমান সহিংস পরিস্থিতি ছাড়া এসময় বৈদেশিক সাহায্য নীতিমালা নিয়ে তারা ইইউ রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এই খবরটিকে আমরা ইতিবাচক ভাবেই গ্রহণ করতাম। কিন্তু আলোচ্য খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর একই দিন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ বিদেশীদের অত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে না। তার এই মন্তব্যের ফলে বলা যেতে পারে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের দৌড়ঝাঁপের গুরুত্ব হারালো।
এছাড়া গত ৬ ই ফেব্রুয়ারি শুক্রবার আলোচনার প্রস্তাবকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রমুখ শীর্ষ আওয়ামী নেতৃবৃন্দ। এর ফলে আলাপ আলোচনার কোন রূপ সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল।
ঐ দিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন মন্ত্রী মেজর হাফিজ উদ্দিন বলেন, চলমান সংকটের অবসান করতে হলে সরকারকে পদত্যাগ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হবে। তাহলে একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বিষয়ে সংলাপ হতে পারে। দেশে শান্তিও ফিরে আসবে। তিনি আরও বলেন, ১৯৯৬ সালে শেরাটনের কাছে তারাই বাসে গান পাউডার দিয়ে মানুষ হত্যা করেছিল। দুই বছরে ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল। তাদের সহিংসতার কারণে ওই সময়ে এসএসসি পরীক্ষা তিন মাস পেছাতে হয়েছিল। রোজার দিনেও তারা হরতাল করছে। মেজর (অব.) হাফিজ অভিযোগ করেন, সরকার বার্ন ইউনিটে আহতদের দুর্দশা নিয়ে রাজনীতি করছে যা অশোভনীয় ও নিন্দনীয়। তিনি বলেন, বিএনপি বোমাবাজদের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। সরকারবিরোধী দলের ওপর দোষারোপ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতেই আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে। আজকের পত্রিকায় আছে, রূপগঞ্জে বোমা বানাতে গিয়ে সরকারি দলের লোকজন আহত হয়েছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করে সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন বলেন, পুলিশ হেফাজতে গত এক মাসে ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ৭শ’ মামলায় ১৭ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দুর্বৃত্তের সহিংসতায় ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসবের দায় সরকারকেই নিতে হবে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সরকার দেশকে মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
॥ দুই ॥
আজ আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করছি। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর গত শুক্রবার সর্বপ্রথম বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করল। আমরা আমেরিকার সেই মন্তব্য নিচে তুলে ধরছি, “বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে বাধা না দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি মুখপাত্র ম্যারি হার্ফ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে চলমান অস্থিরতা ও সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা বাস পোড়ানো, দাহ্য বস্তু ছটুড়ে মারা, ট্রেন লাইনচ্যুতিসহ নানা অবিবেচক হামলার মাধ্যমে সাধারণ লোকজনকে হতাহতের নিন্দা জানাচ্ছি।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতা চালানোর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এ ধরনের আচরণ সমর্থনযোগ্য নয়।’ চলমান সহিংসতা বন্ধে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সব বাংলাদেশীরই শান্তিপূর্ণভাবে তাদের মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করে।”
এসব ক্ষেত্রে আমেরিকার যে ভূমিকা হয়, এখানেও তাই হয়েছে। তারা এদিকেও বলেছে আবার সেদিকেও বলেছে। কিন্তু পরিষ্কার করে কোনো কথা বলেনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে সহিংসতার কথা বলা হয়েছে।
॥ তিন ॥
কিন্তু সহিংসতা তো শুধু মাত্র এক পক্ষেই হয়নি। এই কয়দিনে যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হয়েছে সেগুলো বলা না হলে অর্ধ সত্য কথা বলা হয়, পূর্ণ সত্য নয়। গত দুই সপ্তাহে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ১৭ জন শাহাদাত বরণ করেছেন। আমরা এখানে তাদের একটি তালিকা দিচ্ছি।
১. নূরুল ইসলাম শাহীন। রাজশাহীর বিনোদপুর ইসলামীয়া কলেজের অধ্যাপক। গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার তাকে ডি বি পুলিশ উঠিয়ে নেয় এবং ২৮ জানুয়ারি বুধবার তিনি বন্দুক যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন।
২. ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাতে ইসলামী ব্যাংকের ল্যাব সহকারি নাহিদ জামালকে রাস্তা থেকে পুলিশ উঠিয়ে নেয়। ২৮ জানুয়ারি বুধবার তিনি ক্রস ফায়ারে নিহত হন।
৩. ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা সাকিবুল ইসলাম ২৮ জানুয়ারি বুধবার রাত ৩টায় এ্যাপোলো হাসপাতালে মারা যান। ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার ককটেলের আঘাতে আহত হন তিনি। তার অভিভাবকের অভিযোগ, পুলিশ তার চিকিৎসায় অবহেলা করেছে।
৪. চাঁপাইনবাবগঞ্জে সিটি কলেজের ছাত্র ও ছাত্র দল নেতা আসাদ উল্লাহ তুহিনকে ২৫ জানুয়ারি রোববার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ১৩ ঘন্টা পর সোমবার রাত ৩ টার সময় ট্রাক চাপায় তিনি নিহত হন।
৫. ১৬ ই জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে ছাত্রদল নেতা মতিউর রহমানকে যৌথ বাহিনী হত্যা করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
৬. বৃহস্পতিবার ৫ ফেব্রুয়ারি গভীর রাত অর্থাৎ শুক্রবার সাতক্ষীরার কাশিমপুর গ্রামের শিবির নেতা শহীদুল ইসলাম ভোররাতে যশোরে ক্রস ফায়ারে নিহত হন।
৭. বৃহস্পতিবার ৫ ফেব্রুয়ারি গভীর রাত অর্থাৎ শুক্রবার রাজশাহী শিবির নেতা শাহাবুদ্দিন রাত ১ টার দিকে তিনি ক্রস ফায়ারে নিহত হন।
৮. ১৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার নোয়াখালী যুবলীগের অস্ত্রবাজদের গুলীতে ছাত্রদল নেতা পারভেজ নিহত হন।
৯. ৫ জানুয়ারি সোমবার গণতন্ত্র হত্যা দিবসে দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল হয়। এসব মিছিলে পুলিশ গুলীবর্ষণ করে। ফলে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুব দলের ৪ জন নেতা নিহত হন।
১০. ৭ জানুয়ারি বুধবার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে পুলিশের গুলীতে ছাত্রদল নেতা মহসিন উদ্দিন নিহত হন।
১১. ৭ জানুয়ারি বুধবার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে পুলিশের গুলীতে যুবদল নেতা মিজানুর রহমান রুবেল নিহত হন।
১২. এর আগে গত ১৮ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গা সদরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত ও গুলীতে নিহত হন শঙ্কর চন্দ্রপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি মেম্বার ও ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি সিরাজুল ইসলাম (৪৭)।
১৩. সোমবার ১৯ জানুয়ারি ভোরে মতিঝিলে গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত নড়াইল পৌরসভার কাউন্সিলর ও জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েসকে পুলিশ ধরে নিয়ে হত্যা করেছে বলে পরিবার অভিযোগ করেছে। একই অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামীও।
১৪. ১৯ জানুয়ারি সোমবার খিলগাঁর জোড় পুকুর মাঠে ছাত্রদল নেতা নূরুজ্জামান জনির লাশ পাওয়া যায়। ছোট ভাইকে দেখার জন্য জনি সেন্ট্রাল জেলে গিয়েছিলেন। তার সাথে ছিলেন বিএনপির দিপু সরকার এবং যুবদলের মইনুদ্দিন। ডিবি পুলিশ জনিকে তুলে নেয়। তার সহগামী দুই বন্ধু এখনও নিখোঁজ। জনির সুরতহাল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, শরীরে ১৭টি গুলীর চিহ্ন রয়েছে। এর মধ্যে বাম কোমরে একটি, বুকের মাঝ বরাবর তিনটি, বুকের বাম পাশে দুটি, বুকের ডান পাশে তিনটি, পিঠের বামপাশে তিনটি, পিঠের বাম পাশের উপরে দু’টি, পিঠের ডান পাশের উপরে একটি, পিঠের মাঝামাঝি একটি এবং ঘাড়ের বাম পাশে একটি গুলী লেগেছে। অর্থাৎ তার শরীরের চারদিকে গুলী লেগেছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ সাদিয়া তাজনীনের উপস্থিতিতে সুরতহাল রিপোর্টটি তৈরি করেন খিলখগাঁও থানার একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই)।
১৫. গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বাসা থেকে গ্রেফতারের পর সকালে হাসপাতালে গুলীবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম উপজেলা শিবির সভাপতি সাহাব পাটোয়ারীর। গ্রেফতারের পর পরই তার বোন আঞ্জুমান আরা তার জীবননাশের আশংকা করে বিবৃতি দিয়েছিলেন।
৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ‘সংগ্রামের’ রিপোর্ট মোতাবেক গত ৫ই জানুয়ারি থেকে ৬ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলীতে মৃত্যুবরণ করেছেন ২৫ জন রাজনৈতিক কর্মী। চলমান ঘটনাবলীতে উভয় পক্ষের সহিংসতায় প্রতিদিন যে লাশ পড়ছে সেই লাশ পড়ার শেষ কোথায়? আর কত রক্ত?
আসিফ আরসালান 

শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

স্তম্ভিত হবার মতো খবর!


স্তম্ভিত হবার মতো একটি খবর ছেপেছে গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ প্রতিদিন। ডাবল লাইনে ৪ কলামব্যাপী হেডিং। শিরোনাম ‘জামিনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্র : বোমাবাজরা সৎ ও মেধাবী’। প্রত্যয়নপত্রের একটি ফটোকপিও ছেপেছে পত্রিকাটি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ২০ দলীয় জোটের লাগাতার আন্দোলন সম্পর্কে দেশ-বিদেশের কোটি কোটি মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পেট্রলবোমা ও ককটেল হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যার দায় আন্দোলনরত বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ওপর চাপিয়ে তাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। এমনকি বাড়িঘরে, মেসে, ছাত্রাবাসে হামলা চালিয়ে ২০ দলীয় নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে গুম ও হত্যা করবার মতো ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মী শুধু নন, তাদের সাধারণ সমর্থকরাও রেহাই পাচ্ছেন না পুলিশী নির্যাতনের হাত থেকে। শুধু পুলিশ কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একশ্রেণির অতিউৎসাহী সদস্যই নয়, দলীয় ক্যাডাররাও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়িঘর, দোকান-পাট এবং মেস বা ছাত্রাবাসে হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাদের গোলার ধান, ক্ষেতের ফসল, পুকুরের মাছ ও গোয়ালের গরু-ছাগলও লুটে নেয়া হচ্ছে অথবা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেবার মতো ভয়ঙ্কর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, দেশের জনগণ যেন ক্ষমতাসীনদের প্রতিপক্ষ। একটি গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে যায় এমন ভিন্নমত পোষণকারী থাকতেই পারেন। কিন্তু সেটা যদি নির্মূল করে ফেলবার পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে দেশে গৃহযুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এমন অনাকাক্সিক্ষত পরিণতি দেশ ও জাতির জন্য কখনই কল্যাণকর হতে পারে না।
দেশে যাতে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, গণতান্ত্রিক পরিবেশ যেন ফিরে আসে, দেশের মানুষ যাতে সুষ্ঠুভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেন এমন প্রত্যাশা নিয়েই সুদিনের অপেক্ষা সবাই করছেন। বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ এমনকি বিদেশী পর্যবেক্ষকমহলও ক্ষমতাসীনদের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কিন্তু  কোন কিছুই এখনও ফলপ্রসূ হয়নি। এর ফলে সরকারের জনভিত্তি যে আরও দ্রুত নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে নজর দিতে চাচ্ছেন না। পক্ষান্তরে জনগণের ওপর পেট্রলবোমার মতো ভয়ঙ্কর ও ঘৃণ্য হামলার দায়ভার ২০ দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর চাপিয়ে তাদের রাজনীতির ময়দান থেকে সরিয়ে দেবার চক্রান্ত করা হচ্ছে। অথচ প্রকাশিত খবরে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। আলোচ্য চাঞ্চল্যকর ওই সংবাদটিতে থলের বেড়াল মুখ ব্যাদান করে বেরিয়ে পড়েছে। এতে বলা হয়েছে, পেট্রলবোমার মতো ভয়ঙ্কর হামলার মামলায় যাদের পুলিশ এ পর্যন্ত গ্রেফতার করেছে, তাদের জামিনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকেই সুপারিশ করা হয়েছে। আলোচ্য খবরটিতে এ পর্যন্ত এমন ৫০০টির মতো সুপারিশনামা দাখিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইতোমধ্যে বহু আসামী জামিনও পেয়েছে। ফলে অভিযুক্তদের আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে পুলিশের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।
২০ দলীয় জোটের তরফ থেকে বার বার বলা হচ্ছে ভয়ংকর সব সন্ত্রাসী হামলা বা পুড়িয়ে মানুষ হত্যার সঙ্গে তাদের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। তাদের আন্দোলন গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য। বোমা হামলাকারীদের চিহ্নিত করে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম জিয়াও। দেশের মানুষ এ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চায়। সকলেই স্বস্তি চায়। এর একমাত্র উপায় হচ্ছে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা। সকলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটালে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।

বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

‘হুকুমের আসামী’


বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আবারও ‘হুকুমের আসামী’ করা হয়েছে। কুমিল্লা জেলাধীন চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি উত্তম কুমার চক্রবর্তীর বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাতে চৌদ্দগ্রাম এলাকায় বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে সাতজন যাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার এবং বেশ কয়েকজনকে অগ্নিদগ্ধ করার অভিযোগে দায়ের করা দুটি পৃথক মামলায় হুকুমদানকারী হিসেবে বিএনপি নেত্রীর নাম উল্লেখ করেছে পুলিশ। মামলা দুটিতে উপজেলা জামায়াতের আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে প্রধান আসামী করে ৫৬ জনের নাম উল্লেখসহ আরো ১৫/২০ জন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এই খবরের পরিপ্রেক্ষিতে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘হুকুমের আসামী’ করার বিষয়টিই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। কারণ, এক মাসের বেশি সময় ধরে তিনি তার গুলশান অফিসে অবরুদ্ধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও একের পর এক মামলায় তাকে ‘হুকুমের আসামী’ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, চৌদ্দগ্রামেরও আগে ২৪ জানুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ি থানায় দুটি, ২৫ জানুয়ারি কুমিল্লার একই চৌদ্দগ্রাম থানায় অন্য একটি এবং ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার এক আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এসবের সঙ্গে চৌদ্দগ্রাম থানায় সর্বশেষ দায়ের করা দুটিসহ মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়টি। এগুলোর মধ্যে ঢাকার আদালতে জননেত্রী পরিষদের সভাপতির দায়ের করা মামলাটিকে আমলে নিয়ে পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাকি পাঁচটি মামলারও তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
আমরা মনে করি, পুলিশ এবং ব্যক্তি বিশেষের মাধ্যমে একের পর এক মামলা দায়েরের পেছনে সরকারের উদ্দেশ্যে কোনো রাখঢাক নেই বললেই চলে। এর প্রমাণ পাওয়া যাবে একটি মাত্র তথ্যের উল্লেখ করলে। সে তথ্যটি হলো, আদালতে দায়ের করা মামলায় ঢাকা ভার্সিটির সাবেক ভিসি ও দেশবরেণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমদকেও ‘হুকুমের আসামী’ করা হয়েছে! অথচ প্রফেসর এমাজউদ্দিন সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তার ‘অপরাধ’, অবরোধকেন্দ্রিক সংকটের মধ্যে তিনি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। কোন এক এ বি সিদ্দিক দিয়ে করানো মামলায় তাকেও আসামী করা হয়েছে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিভিন্ন মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার পাশাপাশি বেছে বেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ দল দুটির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদেরকেই সরাসরি বা হুকুমের আসামী করা হয়েছে। এসব আসামীর মধ্যে চৌদ্দগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মতো এমন অনেকেও রয়েছেন যারা আগামীতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের তথা ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হতে পারেন এবং যাদের বিজয়ী হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা রয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যার পর পর মামলাও করা হচ্ছে এমন সব এলাকাতেই, যেসব এলাকায় ২০ দলীয় জোটের ভোটার ও জনসমর্থন অনেক বেশি।  নির্বাচনের সময় অভিযুক্ত কারো পক্ষে প্রার্থী হওয়া সম্ভব হবে না। এর সঙ্গে রয়েছে দণ্ড হয়ে যাওয়ার আশংকা। কারণ, সব কাজ ফেলে সরকার অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে মামলাগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এর উদ্দেশ্য কেবল একটাই হতে পারে- সত্য-মিথ্যাকে প্রমাণ হিসেবে সাজিয়ে যে কোনোভাবে অভিযুক্তদের সাজা বা দণ্ড দেয়া। আর একথা তো সবাই জানেন, দণ্ডিতজনেরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তেমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও তার জোটের দলগুলো ফাঁকা ময়দান পেয়ে যাবে। বেগম খালেদা জিয়ার পেছনেও এজন্যই বিশেষভাবে লেগে রয়েছে মামলার মিছিল।
আমরা মনে করি, কৌশল ও পরিকল্পনা হিসেবে চমৎকার হলেও তার বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে। বড় কথা, এর মধ্যে গণতন্ত্রসম্মত চিন্তা-চেতনার লেশমাত্রেরও সন্ধান মিলবে না। একই কারণে সরকারকেই এক সময় নিন্দা-সমালোচনার শিকার হতে হবে। সাধারণ মানুষও ধিক্কার না জানিয়ে পারবে না। কারণ, বিরামহীন প্রচারণা চালিয়েও ক্ষমতাসীনরা এখনো প্রমাণ করতে পারেননি যে, পেট্রোল বোমার মাধ্যমে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার নৃশংস কর্মকাণ্ডে বিএনপি বা জামায়াতের তথা ২০ দলীয় জোটের কোনো ভূমিকা রয়েছে বা আদৌ থাকতে পারে। অনুসন্ধানে বিপরীত যেসব তথ্য বেরিয়ে আসছে সেগুলোও ক্ষমতাসীনদের জন্য উৎসাহজনক নয়। এজন্যই  উচিত মিথ্যার বাণিজ্যে ইতি টানা এবং বেগম খালেদা জিয়ার মতো প্রধান জাতীয় নেত্রীর পাশাপাশি জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের আসামী বানানোর হাস্যকর কিন্তু ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম থেকে নিবৃত হওয়া।

বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বিষফল এখন রাজনীতিতে এবং জীবনে


ঘরে-বাইরে এখন আতঙ্কের পরিবেশ। ঘরের আতঙ্কটা অবশ্য মানসিক স্তরের। মানুষ এখন ঘরের বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে। জীবন-যাপনের প্রয়োজনে কেউ বাইরে গেলে ঘরে স্বজনদের ভাবনা, মানুষটি অক্ষত শরীরে ফিরে আসতে পারবে তো? দেশের এমন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। রাজনৈতিক কারণে এখন দেশের যে পরিবেশ তাকে গণতান্ত্রিক সমাজের পরিবেশ হিসেবে ভাবা যায় না। এমন অবস্থায় মানুষের জীবন-যাপনের চিত্র নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। এমন একটি প্রতিবেদনে বলা হয় : বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ-হরতাল কর্মসূচিতে নগরবাসী নিজের প্রয়োজনে ও জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হচ্ছেন। তবে তাদের এ পথ চলায় স্বস্তি নেই, আছে আতঙ্ক। গত মঙ্গলবার প্রতিবেদক দেশের অবস্থা কেমন জানতে চাইলে আবদুল ওয়াহাব নামের এক রাজধানীবাসী বললেন, ‘সব কিছু স্বাভাবিক আবার অস্বাভাবিক। এই যে অফিস করছি, বের হচ্ছি, রাস্তায় গাড়ি চলছে, কিন্তু তার পরও সব সময় আতঙ্কে থাকি। যদি একটা বোমা এসে গায়ে লাগে।’ দুই নেত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা একটু শান্তিতে থাকতে চাই’।
আবদুল ওয়াহাবের বক্তব্যে জনমনের বার্তা পাওয়া যায়। কিন্তু সে বার্তা আমাদের শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের কর্ণকুহরে কতটা প্রবেশ করে কিংবা তাদের হৃদয়ে কতটা কম্পন সৃষ্টি হয়, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, শঠতাপূর্ণ অগণতান্ত্রিক রাজনীতির কারণে দেশে এখন অগ্নি, দাহ এবং দমন-অবদমনের মাত্রা বেড়েই চলেছে। আবারও দুর্বৃত্তদের ছোঁড়া পেট্রোলবোমা কেড়ে নিল সাতজন বাসযাত্রীর প্রাণ। বাসের মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন অনেকেই। এর মধ্যেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৭ জন। আহত হন আরও ২৮ বাসযাত্রী। গত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে আইকন পরিবহনের বাসটি কক্সবাজার থেকে ঢাকায় যাচ্ছিল। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জগমোহনপুর এলাকায় ওই সময় পেট্রোলবোমা ছোঁড়া হয় বাসটিতে। এমন নৃশংস ঘটনার বিরুদ্ধে সবাই কথা বলছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের দৃশ্যও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি দলের ইঙ্গিত বিরোধী দলের দিকে, আর বিরোধী দলের ইঙ্গিত সরকারি দলের দিকে। পেট্রোলবোমা ছোঁড়ার দায়িত্ব কেউই স্বীকার করতে চাইছে না। তাহলে এই বোমা কারা মারছে? নিশ্চয়ই জিন-ভূত এসে এমন কান্ড করছে না। অবশ্য যারা পেট্রোলবোমায় নিহত হচ্ছেন তাদের স্বজনদের বক্তব্যেও কিছু বার্তা পাওয়া যায়। চৌদ্দগ্রামে বাসে দুর্বৃত্তদের ছোঁড়া পেট্রোলবোমায় নিহত হয়েছেন যশোরের নুরুজ্জামান পপলুর। পপলুর খালাতো বোন আফরোজা পারভীন ভাই কামরুজ্জামান ডাবলুকে জড়িয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেছেন, ‘পেট্রোলবোমা জামায়াত মেরেছে, না আওয়ামী লীগ মেরেছে তা আমরা জানি না। আমরা কাউকে বিশ্বাস করি না। মানুষের জীবন নিয়ে ওরা নাটক করছে’।
ভুল রাজনীতির কারণে এখন দেশে যে সহিংস অবস্থা বিরাজ করছে তার দায় জনগণের নয়, বরং রাজনীতিবিদদের। আর সরকার কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারেন না। কারণ দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ সরকারের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আর এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকার অনুরাগ-বিরাগ কিংবা গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি বহির্ভূত কোনো কাজ করেছে কিনা, তাও ভেবে দেখার মতো বিষয়। আমরা জানি, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এবং আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রেও দায়িত্ববোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অথচ এ ক্ষেত্রে আমাদের দৈন্য বেশ প্রকট। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আইকন পরিবহনের বাসে পেট্রোলবোমা ছোঁড়া হয়েছিল। পত্রিকার রিপোর্টাররা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, পেট্রোলবোমার শিকার আইকন পরিবহনের বাসটির কক্সবাজার রুটে চলার অনুমোদন ছিল না। আইকন পরিবহনের বাসগুলো অনুমোদন ছাড়াই ওই রুটে চলাচল করছে। এ ছাড়া কক্সবাজারে পর্যটক পরিবহনে পুলিশ-বিজিবির নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরেই চলাচল করছিল আইকন পরিবহনের বাস। ওই পরিবহনের সাথে কক্সবাজারের প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং কক্সবাজার এলাকার পরিবহন সেক্টর, একেবারেই অপরিচিত। কক্সবাজারে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো কাউন্টার নেই। নেই কোনো সুনির্দিষ্ট বুকিং-ম্যানও। কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের পেট্রোলবোমা হামলার শিকার হওয়ার পর আইকন পরিবহন নিয়ে কক্সবাজারের জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার আগে কক্সবাজারের মানুষ এই পরিবহনের নাম শোনেনি। পর্যটক পরিবহনে প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে থেকে আইকন পরিবহনের বাস কেন ও কিভাবে চলছিল তা বড় প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে রহস্যজনক বলেও বিবেচনা করছেন। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কক্সবাজার অফিসের সহকারী পরিচালক এবং আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সদস্য সচিব পারকন চৌধুরী জানান, ‘দেশে আইকন পরিবহন নামে যে একটি বাস আছে ও তা কক্সবাজার রোডে চলাচল করছে আমি আজই (মঙ্গলবার) তা শুনলাম’। তিনি আরো জানান- লাইসেন্স ও পারমিটের শর্তমতে যে কোনো পরিবহনের স্টার্টিং পয়েন্ট এবং লাস্ট স্টপেজ তথা সর্বশেষ গন্তব্য এলাকায় রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি তথা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইকন পরিবহনের বাসগুলো আরটিসির অনুমোদন ছাড়াই কক্সবাজার রুটে চলাচল করছে। পত্রিকার রিপোর্টের আলোকে প্রশ্ন জাগে, অনুমোদন ছাড়া আইকন পরিবহনের বাসগুলো কক্সবাজার রুটে চলাচল করছে কিসের জোরে? আর আইকন পরিবহনের কোচ বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্দেশিত বিজিবি-পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ওই রুটে চলাচল করলো কেন? এসব প্রশ্নের আলোকে যথাযথ তদন্ত হলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে। এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো যে, দায়িত্ববোধের অভাব আমাদের সমাজে প্রকট।
আমরা সবাই জানি যে, বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। সুশাসনের সংকট ও গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির দৈন্যের মধ্যেও দেশ এগিয়ে চলেছে। তবে দেশ যতটা এগুতো পারতো, সেখানে পৌঁছা সম্ভব হচ্ছে না। আর অগ্রগতির পেছনে নিয়ামক হিসেবে তো কাজ করছে গার্মেন্টস কর্মী, বিদেশে কর্মরত শ্রমিক এবং ব্যক্তিগত উদ্যোক্তারা। সুশাসন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিরাজ করলে দেশ বহুদূর এগিয়ে যেতে পারতো এবং দেশের মানুষের মুখে ফুটে উঠতো কাক্সিক্ষত হাসি। কিন্তু আমাদের রাজনীতি তো কাক্সিক্ষত পথে চলছে না। একদিকে চলছে দমন-পীড়ন, অন্যদিকে জ্বালাও-পোড়াও। ২ ফেব্রুয়ারি মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রতি দুই দিনে ১ জন মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। জানুয়ারি মাসে সারাদেশে মোট ১৭ জনকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছেন ১২ জন, যার মধ্যে ৬ জন র‌্যাবের হাতে, ৫ জন পুলিশের হাতে ও ১ জন যৌথবাহিনীর হাতে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। নিহত অপর ৫ জনের মধ্যে ৪ জন পুলিশের গুলিতে ও ১ জনকে র‌্যাব পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিকারের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাজনৈতিক ধর-পাকড় ও গণ-গ্রেফতারের ফলে দেশের ৬৮টি কারাগারে ধারণক্ষমতার অধিক বন্দী রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত বন্দী সামলাতে কারাকর্তৃপক্ষকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা যেখানে ২৯ হাজার, সেখানে বন্দী রয়েছে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ। দেশে দমন-পীড়নের মাত্রা কতটা বেড়েছে তার একটি চিত্র পাওয়া যায় মানব জমিনে মুদ্রিত ৩ ফেব্রুয়ারির একটি রিপোর্টেও। উক্ত রিপোর্টে বলা হয়, চট্টগ্রামে পুলিশের দায়ের করা মামলার ফাঁদে পড়েছে বিরোধী জোটের প্রায় ৫০ হাজার নেতা-কর্মী। এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। চট্টগ্রামে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি হিসেবে নাম থাকছে ২০/২৫ জনের। কিন্তু অজ্ঞাত হিসেবে উল্লেখ করা হয় কয়েকশ’ থেকে কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর কথা। এভাবে বিরোধী জোটের নেতা-কর্মীদের হয়রানি করছে পুলিশ। এসব দমন-পীড়নের ঘটনা যে সুশাসনের লক্ষণ নয়, গণতন্ত্রসম্মতও নয়, তা আমরা জানি। এসব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সরকারি দলের কেউ কেউ বলেন, বিরোধী দলের সহিংসতার জন্য তারা গণতান্ত্রিক অধিকার পেতে পারেন না। কিন্তু বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচির সাথে সরকার এ কেমন আচরণ করলেন? কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের অবস্থান কর্মসূচির মঞ্চ, চেয়ার সবকিছু নিয়ে গেছে পুলিশ। রোববার দিবাগত রাতে এ ঘটনা ঘটে। দলটির পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। পুলিশ ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি। ভয়-ভীতি প্রদর্শন তো সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না। কোনো দেশের সরকার যদি দমন-পীড়ন ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশ শাসন করতে চায়, তবে তার ফলাফল কখনও শুভ হয় না। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বদলে যদি ছল-চাতুরি ও প্রহসনের নির্বাচন করা হয়, তার ফলাফলও হয় মন্দ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তার বড় প্রমাণ। ওই নির্বাচনের বিষফল এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাজনীতিতে এবং সমাজে। এ কথার অর্থ আবার এই নয় যে, দেশে অবরোধ-হরতাল, ভাংচুর ও পেট্রলবোমার তা-ব চলতে থাকবে। এমন পরিস্থিতি থেকে জাতি মুক্তি চায়। তবে মুক্তির সে পথ রচনায় বিরোধী জোটের চাইতেও দায়িত্ব বেশি সরকারের। দায়িত্ব পালনের সেই পথে সরকার অগ্রণী ভূমিকা পালন না করলে দিন-বদলের স্লোগান কি প্রহসনের মত মনে হবে না?

মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গুলী করে জনগণের আন্দোলন দমন করা যায় না


রাজনৈতিক অস্থিরতায় অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। মরছে মানুষ, পুড়ছে যানবাহন। প্রতিদিনই হতাহতের ঘটনা ঘটছে। গোটা দেশ অচল হয়ে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি ও যোগযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন ক্রমেই প্রচ- রূপ ধারণ করছে। সরকার সংলাপ-সমঝোতার পরিবর্তে কঠোরতম পন্থা অবলম্বন করেছে।  গুলী এখন আন্দোলন দমনের প্রধান হাতিয়ার। বিরোধী মত বলতে কিছুই নেই। সাধারণ মানুষ পার করছে অনিশ্চিত জীবন। সরকার বিরোধী আন্দোলন দমনে শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করছে। সরকার নিজেই হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও তান্ডব সৃষ্টি করার কাজে নিয়োজিত। দেশের বুদ্ধিজীবী, আইনবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী সম্প্রদায়, সুশীল সমাজ, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষ কারো অভিমতের কোন মূল্যায়ন করছে না সরকার। জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, কানাডা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়াসহ গণতান্ত্রিক বিশ্ব ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার চলমান সংকটে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ এবং তা নিরসনে সংলাপ-সমঝোতার আহ্বান আমলে নিচ্ছে না বর্তমান সরকার। দেশ, দেশের অর্থনীতি, জনগণের জীবন বিপন্ন প্রায়। আর সরকার ব্যস্ত দমনপীড়নের মাধ্যমে নিজেদের গদি রক্ষায়।
বাংলাদেশ সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের দেশ। এটা কোন দল বা ব্যক্তির একার দেশ নয়। অধিকাংশ মানুষের পছন্দের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। জনগণের প্রতিনিধিত্ব প্রকাশিত হয় রাজনৈতিক দলসমূহের মাধ্যমে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সাথে কম-বেশি জনসম্পৃক্ততা রয়েছে। সুতরাং কোন রাজনৈতিক দলকে অবজ্ঞা-উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রে বহুদলের অস্তিত্ব স্বীকৃত। ভিন্ন মত ও দল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না, গণতন্ত্র টিকে না। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে প্রত্যেক নাগরিকের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করার অধিকার রয়েছে। এটা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যখন এ অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করে বা তা হরণ করে তখন তা হয় সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন। কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধান লংঘন করে ক্ষমতায় থাকার নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি নেই।
বাংলাদেশে ভিন্ন মত উৎখাতের যে অভিযান চলছে তা উদ্বেগজনক। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ডিজিটাল কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী রাজনৈতিক দলের উপর চড়াও হতে থাকে। সভা-সমাবেশ ও মিছিলের উপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য শতকরা ৯০ ভাগ জনগণের সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা আদালতের দোহাই দিয়ে বাতিল করা হয়। অথচ আদালতের ঐ রায়েই পর পর দুটো নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে করার কথা বলা হয়েছিল। সংকটের সূত্রপাত ওখান থেকেই। জনগণের প্রচন্ড আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্যে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে আসলে সরকার একতরফা নির্বাচনের নানান বাহানা খুঁজতে থাকে। জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিমত অগ্রাহ্য করে শেখ হাসিনা একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায়। জনগণ সে নির্বাচন বয়কট করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভোটারবিহীন এ ধরনের নির্বাচন অতীতে কোন স্বৈরশাসকের আমলে আর দেখা যায়নি। ১৫৪টি আসনে বিনা নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা, অবশিষ্ট আসনগুলোতে শতকরা ৫ ভাগ ভোটারও ভোট কেন্দ্রে না যাওয়া বিশ্বের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। নির্বাচনের এ করুণ অবস্থা দেখে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেন এটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে শেখ হাসিনা এবং তার দলের নেতারা নিয়ম রক্ষার দশম সংসদ নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তারা আরো ঘোষণা করেছিলেন, ‘আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সমঝোতায় আসলে দশম সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে সংবিধান অনুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।’ তিনি আলোচনা চলতে থাকবে বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন। জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে একটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জোর করে ক্ষমতা দখল করার পর তাদের সে বক্তব্যের সুর পাল্টে যেতে লাগলো। শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতারা বলতে শুরু করলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত মহাজোট সরকার ক্ষমতায় থাকবে।
তামাশার নির্বাচনের ১ বছর পেরিয়ে গেলো। আওয়ামী নেতৃবৃন্দ জোর গলায় বলার চেষ্টা করছেন নির্বাচনের যেহেতু অনেক সময় বাকী সুতরাং এত আগেভাগে আলোচনার দরকার নেই, সমঝোতারও প্রয়োজন নেই। শুধু তাই নয় তারা বিরোধী ২০ দলীয় জোটকে কোন ধরনের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে দিতে রাজি নয়। ৫ জানুয়ারি ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে ঢাকায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ৫ জানুয়ারির সমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য সভা-সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অবরুদ্ধ করে রাখে ২০ দলীয় জোট নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে। সরকার নিজেই সারা দেশে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায় অনন্যোপায় হয়ে ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হন। অবরোধের পাশাপাশি চলতে থাকে হরতাল। হরতাল-অবরোধে গোটা দেশ আজ অচল হয়ে পড়েছে। অর্থনীতি স্থবির, জনজীবন বিপর্যস্ত। প্রতিদিনই ঘটছে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। সরকার পুলিশ প্রহরায় যানবাহন চালানোর ঘোষণা দেয়। যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথাও বলে। পুলিশ প্রহরায় চলন্ত যানবাহনে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যার ঘটনা এবং দুষ্কৃতকারীদের ধরা না পড়া খুবই রহস্যজনক। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সরকার দলীয় ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে এসব হামলা চালিয়ে বিরোধী দলকে দায়ী করছে। রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রহরায় কিভাবে মানুষ খুন হয় তার জবাবদিহি করার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের।
রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘর থেকে ধরে নিয়ে নির্দয়, নিষ্ঠুরভাবে মানুষ হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে ঘোষণা দিচ্ছেন ‘ক্রসফায়ারে নিহত’ বলে। ইতোমধ্যেই নড়াইলের নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার এডভোকেট ইমরুল কায়েসকে  গুলী করে হত্যা করার পর বলা হলো ‘ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে’। খিলগাঁওয়ের ছাত্রদলের ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদককে ধরে নিয়ে গুলী করে হত্যা করার পর তাকে ‘ক্রস ফায়ারে নিহত’ বলে প্রচার করা হলো। রংপুরের মিঠাপুকুরে জামায়াত নেতা আল আমিন ও তার স্ত্রী বিউটি বেগম এবং প্রতিবেশী মৌসুমীকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় নিয়ে আল আমিনের গায়ে  গুলী চালানো হয় এবং হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত তারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদের কোন সন্ধান নেই। দেশ যেন আজ এক সন্ত্রাসের চারণ ভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এভাবে চলতে পারে না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে হয়। কিন্তু আওয়ামী সরকার আলাপ-আলোচনার পরিবর্তে দমন-পীড়ন আর  গুলী করেই সংকটের সমাধান করতে চাচ্ছে। সরকারের এই মনোভাব কিছুতেই দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে না।
বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের গুলী করে দমন করা হবে বলে প্রথম ঘোষণা দেন জাসদের নেতা মইনউদ্দিন খান বাদল। তিনি বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের সরাসরি বুকে গুলী চালানোর কথা বলেছেন। ১৮ জানুয়ারি খাদ্যমন্ত্রী বিবিসি সংলাপে বলেন, ‘অস্ত্র দিয়েই বিএনপির সন্ত্রাস দমন করা হবে’। ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বললেন, ‘দৃষ্কৃতকারীদের দেখামাত্রই  গুলীর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার’। সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় নেতাদের এই যদি হয় অবস্থান, তাহলে দেশের পরিণতি কত বিভীষিকাময় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের  গুলী করার প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। ১৫ জানুয়ারি বিজিবি মহাপরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, ‘একজন ব্যক্তি যদি বোমা ফাটায়, তাহলে ৫ জন লোক নিহত হতে পারে। এ দৃশ্য কোন বিজিবি সদস্যের নজরে এলে ঐ বোমা বহনকারীকে ক্যাজুয়ালটি (হতাহত) করা তার দায়িত্ব।’ বিজিবি মহাপরিচালকের এ ঘোষণা অসাংবিধানিক, বেআইনী এবং আইনগত এখতিয়ার বহির্ভূত। যদি কেউ বোমা ফাটায় তাহলে প্রচলিত আইনে তার বিচার করার সুযোগ আছে। কিন্তু বিচারের আগে তাকে  গুলী করার অধিকার বিজিবি বা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়নি। এদেশের মানুষকে হত্যা করার কোন অধিকার বিজিবির নেই।
১৬ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুরে পুলিশের আইজি একেএম শহিদুল হক বলেন, ‘বিএনপির ভুলের খেসারত জনগণ দেবে না। ৫ জানুয়ারি সমাবেশ করতে দিলে যদি হত্যা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ হতো তখন টকশোওয়ালারা কি করতেন? এর দায় পড়তো সরকারের উপর।’ পুলিশের আইজি আরো বলেন, ‘একটা দলের প্রধান তিনি যদি বেআইনী কাজ করেন তার কাছ থেকে জনগণ কি চাইবে? আপনারা ভোট প্রতিরোধ করলেন। ভোট কেন্দ্রে লোক আসতে দিলেন না। ভোটের কেন্দ্রগুলো যেখানে- সেই স্কুল, কলেজ, মাদরাসাগুলো পুড়িয়ে দিলেন, মানুষ মারলেন, জনগণকে ভোটের অধিকার দিলেন না কেন? ভুল আপনারা করেছেন। জনগণ খেসারত দিবে কেন? এই দেশে আমরা তা করতে দেব না ইনশাআল্লাহ্। আমরা গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে। আমরা নির্বাচিত সরকারের পক্ষে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে কাজ করে যাবো। কোন অপশক্তি, কোন সন্ত্রাসী বাংলার মাটিতে কখনো তাদের অশুভ উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ সেটা আমরা নির্মূল করে ছাড়বো। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে আন্দোলনের নামে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষে থেকে শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও নাশকতা নির্মূলে কাজ করে যাবো। জনগণকে সাথে নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতিহত করা হবে।’ (মানবজমিন, ১৭ জানুয়ারি ২০১৫)
এই বক্তব্য পাঠ করলে সকলেরই ধারণা হবে এটা আওয়ামী লীগের কোন নেতার বক্তব্য। বাংলাদেশের পুলিশ প্রধান এ ধরনের বক্তব্য রাখতে পারেন তা ভাবতেও অবাক লাগে। তিনি বিরোধী রাজনীতি নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছেন। পুলিশের এই রাজনৈতিক বক্তব্য জনগণের শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তা বিঘ্নিত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘নির্ধারিত সময়ের পরই নির্বাচন হবে। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। এর বাইরে আমরা আর কোন কিছুই চাই না। ২০১৩ সালের মতো একটি গোষ্ঠী তাদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা দেশের গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করেছে। তারা উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। তারা সন্ত্রাসী। তারা গণতন্ত্রের নামে বোমাবাজি করে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এসব খুনিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। দেশবাসীকে সাথে নিয়ে এগুলোকে ২০১৩ সালে আমরা একবার রুখে দিয়েছি এবারও রুখে দেবো ইনশাআল্লাহ।’ (মানবজমিন, ১৭ জানুয়ারি ২০১৫)
র‌্যাবের ডিজির বক্তব্যে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি ইঙ্গিত করে যেসব কথা বলা হয়েছে তা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্যের ভাষার মতই। চাঁপাইনবাবগঞ্জে যৌথ বাহিনীর অভিযানে মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ৭১-এর শরণার্থীর মত লোকজন পালিয়ে যাওয়ার ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি সরকারের দলীয় বাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। একদিকে ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে চলছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। অপরদিকে সরকার, সরকার দলীয় ক্যাডার ও রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দলীয় ক্যাডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ক্রমেই সংঘাত, সংঘর্ষ বিস্তৃত হচ্ছে। ছাত্রদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস প্রায়। এসব কিছুর মূলে সরকারের একগুঁয়েমি, অপরিণামদর্শী রাজনৈতিক কর্মকান্ড এবং জোর করে ক্ষমতায় থাকার মানসিকতা। এটা কোন গণতান্ত্রিক দেশে কাম্য নয়। যারা জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তান্ডবতা সৃষ্টি করেন তাদের দ্বারা দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাহলে সমস্যার সমাধান কোথায়? এর উত্তর হলো যখন মানুষের বাঁচার সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায় তখনই গড়ে উঠে প্রতিরোধ আন্দোলন। আর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন মানুষের বাঁচার সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে জালেম সরকারের পতন ঘটায়।
বাংলাদেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ বাঁচার তাগিদে ঐক্যবদ্ধ গণপ্রতিরোধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জনগণের এই ইস্পাত কঠিন ঐক্য গুলী করে দমন করা যাবে না। সংলাপ-সমঝোতার মাধ্যমেই এ সংকটের অবসান হতে পারে। আর এ সংলাপ-সমঝোতার উদ্যোগ নেয়ার প্রধান দায়িত্ব সরকারের। সরকার যদি আলোচনার টেবিলে সমস্যার সমাধান না করে বন্দুকের গুলী দিয়ে সমাধান করতে চান তাহলে হয়তো মানুষ খুন করা যাবে কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না। একটি খুনের রক্ত থেকে লক্ষ প্রতিবাদী শক্তির উদ্ভব ঘটবে। এটাই আন্দোলনের ইতিহাস। এতদিন এ আন্দোলনের পথেই আওয়ামী লীগ হেঁটে এসেছে। তারাই আজ গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে স্বৈরাচারের লেবাস ধারণ করে জনগণের বুকে গুলী চালাচ্ছে। এর চূড়ান্ত পরিণতি একদিন আওয়ামী লীগকেই ভোগ করতে হবে।
মতিউর রহমান আকন্দ 

সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

মানুষকে অপমান করে কেউ সম্মান আশা করতে পারে না


সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সম্প্রতি তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হারিয়েছেন। কোকোর বিধবা স্ত্রী ও দুই মেয়ে এখন তার কাছে। পুত্রশোকে মুহ্যমান অবস্থায় তাকে বিধবা পুত্রবধূ এবং দুই নাতনীকে যখন সান্তনা দিতে হচ্ছে তখন যাত্রাবাড়ীতে বাসে দুর্বৃত্তদের পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের দায়ে হুকুমের আসামী হিসেবে সরকার তার বিরুদ্ধে দু’টি মামলা দায়ের করেছেন। অবশ্য এর আগে প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনায় বেগম জিয়াকে হুকুমের আসামী করার বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় আছে বলে জানিয়েছেন। সরকার তার কথা অনুযায়ী কাজ করেছেন বলে মনে হয়।
বলাবাহুল্য, বিএনপির নেতৃত্বে সরকারের বিরুদ্ধে এখন ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন চলছে। অবরোধ হরতালে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে এবং অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকার এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে এখনো স্বীকৃতি দেননি। সরকার প্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, নেতা-উপনেতা সবাই একে সন্ত্রাস ও জঙ্গিপনা আখ্যায়িত করে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং সশস্ত্র দলীয় ক্যাডার লেলিয়ে দিয়ে এই আন্দোলন দমন করতে চাচ্ছেন। তারা কয়েক হাজার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে গুলী করে হত্যা করেছেন, অসংখ্য আহত হয়েছেন, লাখ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগ গ্রেফতার হয়েছেন। গ্রেফতার বাণিজ্য ও মামলা খরচ বহন করতে গিয়ে আসামীরা ফতুর হচ্ছেন। যৌথ বাহিনী গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, বাড়িঘর তছনছ করে দিচ্ছে। বাড়ি থেকে নেতাকর্মী ধরে নিয়ে হত্যা করে বলা হচ্ছে ‘বন্দুক যুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আন্দোলন দমনের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের স্বাধীনতা দিয়ে দিয়েছেন এবং পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী এর দায় তিনি বহন করবেন। এর অর্থ ও তাৎপর্য বলার অপেক্ষা রাখে না।
বেগম জিয়াকে নিয়ে আমি কথা বলছিলাম। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর বেগম জিয়ার ব্যাপারে তারা প্রথম যে কাজটা করেছেন সেটা হচ্ছে তাকে ভিটে ছাড়া করেছেন। অত্যন্ত অপমানকরভাবে তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উৎখাত করেছেন। শুধু তাই নয় ঐ বাড়ির নাম নিশানাও মুছে ফেলেছেন। এর বিপরীতে ‘জাতির পিতা ও তার পরিবার সদস্যদের’ নিরাপত্তা আইন করে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবার সদস্যদের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করেছেন। বঙ্গভবনের মালিকানা হস্তান্তর করে প্রধানমন্ত্রী নিজে তা গ্রহণ করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বেগম জিয়া যে নিরাপত্তা পেতেন তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতাদের বিরুদ্ধে কেয়ারটেকার সরকার কর্তৃক রুজুকৃত সব মামলা প্রত্যাহার করলেও বেগম জিয়াসহ বিএনপি নেতাদের মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি বরং তাদের নতুন মামলায় জড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ যে কাজটি করা হয়েছে সেটি হচ্ছে বেগম জিয়ার বর্তমান দফতর-কাম আবাসিক ভবনের বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, ডিশ এন্টিনা, ওয়াইমেক্স সংযোগও সেখানে বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই কাজটি করা হয়। একজন মন্ত্রী তো তার খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার কথাও বলেছেন। অবশ্য এখানে আরেকটি ঘটনাও ঘটেছে। সেটা হচ্ছে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ২০ ঘণ্টার মধ্যে তারা এই সংযোগ পুনঃস্থাপনও করেছেন। এই ঘটনাটি কার নির্দেশে করা হলো তা বোধগম্য নয়। এই ২০টি ঘণ্টা বেগম জিয়া তার সদ্য বিধবা পুত্রবধূ ও এতিম দুই নাতনী নিয়ে অত্যন্ত দুর্বিষহ সময় কাটিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তার নাফরমান নিকৃষ্ট কোন বান্দার রেজেকও বন্ধ করেন না। আমাদের বর্তমান মন্ত্রিসভার কোনও সদস্যকে যদি সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীর রেজেক বন্ধ করার ঘোষণা দিতে দেখা যায় তাহলে অত্যন্ত নিষ্ঠুর শোনায়। আরো কিছু আছে। মন্ত্রী তোফায়েল বেগম জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেছেন, “আল্লাহর আরশ কেঁপেছে, নইলে আপনার ছেলে মরবে কেন?” মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক একইভাবে বলেছেন, “নেশাগ্রস্ত মানিলন্ডারিং এ অভিযুক্ত কোকোর জন্য খালেদা আর্তনাদ করছে।” কোকোর নেশাগ্রস্ততার কথা আমরা আগে শুনিনি। তবে আরেক জনের কথা শুনেছি যিনি গভীর রাতে নেশা করে ড্রাইভিং করতে গিয়ে রাস্তায় এক্সিডেন্ট করেছিলেন। এটা প্রাসঙ্গিক কথা নয়। আমাদের মন্ত্রীর পদগুলো অত্যন্ত সম্মানিত পদ। এই পদে যারা থাকেন তারা যা তা বলতে পারেন না। তাদের আচার আচরণ, আদব কায়দা থেকে অন্যরা শিখবেন। আগের দিনে যাত্রীবাহী যানবাহনে লিখা থাকতো “ব্যবহারে বংশের পরিচয়” অন্য কোন মন্তব্য না করে আমি তাদের এই কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। অন্যদের ছোট করে নিজে বড় হওয়া যায় না।
আওয়ামী লীগের গত ছয় বছরের শাসনামল দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, অত্যাচার, নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ, মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ, নৈতিক স্খলন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পদদলন, হত্যা, গুমসহ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর অমানবিক অত্যাচার, সংবিধান লঙ্ঘন এবং শুধু স্বৈরাচার নয় নিকৃষ্ট ব্যক্তিতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অবাঞ্ছিত ঘটনায় ভরপুর।
গ্রামাঞ্চলের খবর নিয়ে দেখুন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী  বিশেষ করে জামায়াত-বিএনপি ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছয় বছর ধরে শান্তিতে এলাকায় থাকতে পারছেন না, তাদের জীবন, বাড়িঘর, সম্পত্তি ও মান-ইজ্জতের কোনও নিরাপত্তা নেই। বহু মসজিদ থেকে ইমামদের বের করে দেয়া হয়েছে। বাগেরহাটের শরণখোলায় আমি একজন ইমামের কথা জানি যার বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা দেয়া হয়েছে। মাদরাসার শিক্ষকরা কার্যত জিম্মি। টুপিধারী ব্যক্তিরা আলেম হোক কিংবা নন-আলেম, তাদের মাথার ওপর এখন দু’টি খড়গ একটি রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীর, আরেকটির জেএমবি’র। কাদের বিরুদ্ধে তারা কখন কি অভিযোগ আনেন তারাই শুধু বলতে পারেন। পাড়ায় পাড়ায় আওয়ামী লীগ একশ্রেণীর টাউট-বাটপার তৈরি করে ছেড়ে দিয়েছে যারা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে বেড়ায়। নতুন বাড়ি করবেন? ব্যবসা শুরু করবেন? ছেলের মুসলমানী করাবেন? মেয়ে বিয়ে দিবেন? তাদের চাঁদা দিতে হবে। না দিলে তাদের কথা না শুনলে ঘরে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি রাখা যায় না। চুরি হয়ে যায়। সম্প্রতি অবরোধে হরতালে অপরাধীর তথ্য ও অবস্থান দিয়ে পুলিশ র‌্যাবকে সহায়তা করলে লক্ষ টাকার পুরস্কারের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তাতে তাদের অত্যাচার আরও বেড়ে গেছে। নিরপরাধ ব্যক্তিরা তাদের শিকার হচ্ছে। যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও বোমা নিক্ষেপের ঘটনা তারা নিজেরা ঘটিয়ে জামায়াত-শিবির ও বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ফাঁসিয়ে দিচ্ছে।
বিগত ছয় বছরের মধ্যে সম্ভবতঃ একটি মাসও এমন ছিল না, যে মাসে দলটি ও তার অংগ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েনি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই রাহাজানি, হল জবর দখল, প্রতিদ্বন্দ্বী দল উৎখাত, কাউন্সিল সভা সর্বত্র তারা ব্যাপকভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। দৈনিক প্রথম আলো, যুগান্তর ও কালের কণ্ঠে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী শুধু ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত তাদের নিজেদের কর্মীর সংখ্যা হচ্ছে শতাধিক। অস্ত্র হাতে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষরত অবস্থার সচিত্র রিপোর্ট উপরোক্ত পত্রিকাগুলো ছাড়াও জাতীয় দৈনিক এবং টিভি চ্যানেলসমূহে প্রায়শঃই প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। অবরোধ চলাকালে যানবাহন ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ এবং বোমা নিক্ষেপকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা হাতেনাতে ধরা পড়েছে। তারা গ্রেফতার হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, বোমা ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কোনো উদ্যোগও গত ৬ বছরে নেয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
অতি সম্প্রতি বকশী বাজারে আলীয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে গঠিত আদালতে বেগম জিয়ার হাজিরা উপলক্ষে বিএনপি-ছাত্রদলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী মিছিল করে সেখানে যাচ্ছিলেন। মিছিলটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। এই মিছিলের ওপর ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও বুয়েট ইউনিটের প্রায় ২০০ নেতাকর্মী লাঠিসোটা, লোহার বড়, কিরিছ এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করে। এতে বিএনপির অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়। ইংরেজি দৈনিক Daily Star এর ওপর একটি সচিত্র রিপোর্ট প্রকাশ করে এবং হামলায় অংশগ্রহণকারী ১২ জন ছাত্রলীগ নেতা যথাক্রমে ঢাকা কলেজের আব্দুল আজিজ ফয়েজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের মনির হোসেন চঞ্চল, রিফাত জামান, মঞ্জুরুল হক শুভ, নাহিয়ান খান জয়, কেন্দ্রীয় কমিটির জয়দেব নন্দী, কাজী এনায়েত, তিতুমীর হলের আবু সায়িদ কনক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচএম আল আমীন, নিজামুল হক দীদার ও ওমর ফারুকের অস্ত্র হাতে একশনরত ছবি প্রকাশ করে। পত্রিকাটি এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে “BCL violence deflorable, unwanted: Goat Mist clarify its Stance“ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধও প্রকাশ করে। সরকার এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, তাদের কাছ থেকে অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। সরকার নিজ দলে সন্ত্রাসী-জঙ্গি পোষণ করে মৌলিক মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাচ্ছেন এটা শুধু স্ববিরোধিতা নয় লজ্জাজনকও। একটি দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে অবরুদ্ধ রাখার লক্ষ্যে তার বাড়ি ও দফতরের সামনে রাস্তা থেকে ইট, বালু ও ময়লাবাহী ট্রাক ধরে এনে আগমন বহির্গমনের পথ রুদ্ধ করে রাখা এবং/অথবা দু’টি গেট তালাবদ্ধ করে দেয়া এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে অভূতপূর্ব একটি ঘটনা। স্বাধীন একটি জাতি সভ্যতা-ভব্যতার দিকে এগিয়ে যায়, আমরা বর্বরতা ও অসভ্যতার পথে পিছু হাঁটছি। এর নাম কি স্বাধীনতার চেতনা?
আন্দোলন এখন তুঙ্গে উঠতে শুরু করেছে। অবরোধের এক মাস পার হচ্ছে। সরকার অনমনীয়ভাবে দলন পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলন নির্মূলের সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে। আমি সরকারকে অনুরোধ করবো রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সাথে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসুন। পরাজিত ও ধাবমান সেনাবাহিনীর মতো ধ্বংসাত্মক এমন কোনো কাজ করবেন না যাতে হিংসা বিদ্বেষ বাড়ে, মানুষ এটা মনে না করে যে এরা দেশে থাকার রাজনীতি না করে বিদেশ ও অস্ত্রনির্ভর এমন রাজনীতি করছে যার পরিণতি শুভ নয়। মানুষকে সম্মান করতে শিখুন মানুষও আপনাদের সম্মান করবে।
ড. মোঃ নূরুল আমিন 

রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সময়ের ডাকে সাড়া দিন


অবরোধের সঙ্গে শুরু হয়েছে ৭২ ঘণ্টার হরতাল। অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে ১৫ লাখ এস এস সি পরীক্ষার্থী। এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার  কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী শাজাহান খানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার হুমকির কয়েক ঘণ্টা পরেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে দেশে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা কারো কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে না। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ নেতারা যেমন বোঝেন, তেমনি বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদেরও না বোঝার কথা নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, অনাকাক্সিক্ষত এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ একজন সাধারণ নাগরিকও জানেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে না আসলে সবার জন্যই অপেক্ষা করছে ক্ষতি এবং ক্ষতি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকট-সমাধানের লক্ষ্যে দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদরা কথা বলছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি প্রফেসর ডা. এ কে এম বদরুদ্দোজা বলেছেন, সকল রাজনীতিক দলের অংশ গ্রহণে কার্যকর সংলাপই চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।
গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি পার্বত্য চট্টগ্রামকে শান্ত করতে সন্তু লারমার সঙ্গে বসতে পারেন, তবে দেশের এই চরম সংকটে এখন সংলাপে বসতে পারবেন না কেন? খালেদা জিয়ার অফিসের বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার ঘটনাকে তিনি জঘন্য ও নিকৃষ্ট বলে  মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এটা আমাদের রাজনৈতিক কলঙ্ক। এদিকে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, দেশে বর্তমানে সাংবিধানিক শাসন নেই। আমরা জনগণের ক্ষমতায়ন চাই। গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, বিএনপিকে পেট্রোল বোমা ছোঁড়া বন্ধ করতে হবে, আর সরকারকে ইয়াহিয়া-আয়ুবীয় শাসন বন্ধ করতে হবে। এটি গণতন্ত্র নয়, স্বৈরতন্ত্র।
দলকানা ব্যক্তিরা ছাড়া যে কোনো বিবেকবান নাগরিকই একথা বিশ্বাস করেন যে, উগ্রতা ও অহংকার দিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। সমাধানের জন্য সংকটের প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করতে হয় এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দিকে এগুতে হয়। এ বিষয়টি আমাদের সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রীদের না বোঝার কথা নয়। আমরা দেখছি যে, ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছে। এর আগে একই অবস্থার মধ্যে পড়েছে ‘ও লেভেল’ ও ‘এ লেভেলের’ পরীক্ষার্থীরা। সামনে আরো পরীক্ষা হবে। বিদেশী মেহমানরা আসবেন। দেশের কলকারখানা ও ব্যবসা বাণিজ্যও চলতে হবে। সমস্যা শুধু তো এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে নয়। আমরা এ কথা ভাল করেই জানি যে, বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক সমাধান না হলে আমাদের সংকটের মাত্রা বাড়তে থাকবে এবং অভাব-অনটনে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। বিশ্বে আমাদের ইমেজ নষ্ট হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক এই দুনিয়ায় আমরা আরো পিছিয়ে পড়বো। তাই বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে আন্দোলনরত বিরোধী দল ও শাসক সরকারের এখনই অর্থবহ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। দেশ-বিদেশের প্রাজ্ঞজনদের পরামর্শের ভিত্তিতে সরকার জাতীয় স্বার্থে উদারমনে কোনো পদক্ষেপ নিলে তাতে বরফ গলতে পারে। সরকার সময়ের ডাকে প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে সমর্থ হলে, তা জাতির জন্য এক বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে বিরোধী দলের জন্যও তা পথ নির্দেশনায় সাহায্য করবে। জাতিকে সংকটমুক্ত করতে সরকার এবং বিরোধী দল কী ভূমিকা গ্রহণ করে সেটাই এখন সবার দেখার বিষয়।

Ads