শনিবার, ৫ মার্চ, ২০১৬

কেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই নির্বাচন


আমরা জানি, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রকে ভালবাসে। গণতন্ত্রের চেতনায় এই জনপদের মানুষ ভাষা আন্দোলন করেছে, স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে এখনও গণতন্ত্রই সবচাইতে সমাদৃত বিষয়। শুধু জনগণই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাও গণতন্ত্রের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ। সরকার ও গণতন্ত্রের ঝাণ্ডাকে উড্ডীন রাখার পক্ষেই কথা বলে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এত ইতিবাচক উচ্চারণের পরেও দেশে গণতন্ত্রের এমন হাল হলো কেমন করে? সাম্প্রতিককালে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচনেও ভোটার ছাড়া নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে! এমন চিত্রকে কোনোভাবেই সুলক্ষণ বলে বিবেচনা করা যায় না। এ যেন গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত।
এমন বাতাবরণে ৫ মার্চ তারিখে মুদ্রিত প্রথম আলোর একটি খবরের শিরোনাম করা হয়েছে “ফেনীর পরশুরামে নির্বাচন মানেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা!” খবরটিতে বলা হয়, ফেনীর পরশুরাম পৌরসভা নির্বাচনে ভোটের প্রয়োজন হয়নি। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে মেয়র ও ১২টি কাউন্সিলরের প্রতিটিতেই একক প্রার্থী ছিলেন। ফলে তারা সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এবার পরশুরামের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনেও একই ঘটনা ঘটতে চলেছে। তিনটি ইউপিতেই চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী থাকায় তারাও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে চলেছেন। দুই মাস আগে পরশুরাম, দাগনভূঞা ও ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে তিন মেয়র ও ৪৮ সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলরের মধ্যে ২জন মেয়র ও ৪৩ জন কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য যে, পরশুরামের ৩ ইউপি বিএনপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন- হুমকি, ভয়ভীতি ও এলাকা ছাড়ার কারণে তারা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এমন নির্বাচন এবং ভয়-ভীতিও হুমকি-ধমকির এমন পরিবেশ যে, গণতন্ত্রের বার্তাবহন করে না তা স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করা যায়।
আমরা তো এ কথা জানি যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলেই ছিল অধিকার সচেতন মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনা। এখন সেই দেশেই যদি গণতন্ত্রের এমন করুণ হাল হয়, তাহলে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, দেশের রাজনীতি সঠিক পথে এগুচ্ছে না। আমাদের রাজনীতিবিদরা তো প্রায়শই বলে থাকেন যে, ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের চাইতে দেশ বড়। এমন বক্তব্যে আস্থা থাকলে আজ দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বদলে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির এমন দৌরাত্ম্য চলে কেমন করে? মানুষ যদি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে না পারে, নির্বাচনে নির্ভয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারে তাহলে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবে কেমন করে? প্রসঙ্গত এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গণতন্ত্রে নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও একমাত্র বিষয় নয়। আর যে কোনোভাবে কেউ নির্বাচিত হয়ে গেলেই তিনি জনগণের কিংবা গণতন্ত্রের প্রতিনিধি হয়ে যান না। যারা গণতন্ত্রের কিংবা জনগণের প্রতিনিধি হবেন তাদের অবশ্যই গণতন্ত্রের রীতি-নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তাঁরা হুমকি-ধমকি ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনের বদলে জনস্বার্থের অনুকূলে কাজ করে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটের প্রতি আস্থাশীল থাকবেন। বাংলাদেশের জনগণ এমন গণতন্ত্রই চান। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা অতীতে এমন গণতন্ত্রের চর্চাই করেছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতাগ্রাসের যে অপরাজনীতি চলছে তা জনগণের কাম্য নয়।
গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে জড়িয়ে বর্তমান সময়ে প্রতারণা, শঠতা ও জোর-জবরদস্তির যে রাজনীতি চলছে তার প্রতি জনগণের কোনো আগ্রহ নেই। ফলে অনাকাক্সিক্ষত এমন রাজনীতির প্রতি জনমনে অনীহার মাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিষয়টি একটি স্বাধীন জাতির জন্য খুবই দুঃখজনক। কারণ রাজনীতি ছাড়া কোনো জাতি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। প্রতিযোগিতামূলক বর্তমান বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের গণতন্ত্রের রোডম্যাপেই চলতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদরা তাদের দায়িত্ব পালন করলে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজেদের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করবে। তখন রাজনীতিতে দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্যও হ্রাস পাবে। আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা রাজনীতির সঠিক রোডম্যাপে চলেন কি না- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads