বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

পয়েন্ট অব নো রিটার্ন


নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরই বিরোধী শিবির থেকে তীব্র প্রতিবাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে। প্রতিবাদ কেবল মুখেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে গিয়েছে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে হরতালের অনেকগুলো কর্মসূচির পর বিগত সপ্তাহে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হলো দেশব্যাপী। আজ শুক্রবার সে কর্মসূচি আপাতত শেষ হলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদে উত্তাল মানুষ। রাজধানী ঢাকা দৃশ্যত সমগ্র দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। রেল ও সড়কসহ সকল যোগাযোগ বিপর্যস্ত। প্রতিবাদে-প্রতিরোধে প্রকম্পিত দেশ। দাবি আদায়ের মিছিলের ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিতে মুখরিত সহস্র কণ্ঠ। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার আর জুলুম-নির্যাতনের অবসানই জনতার দাবি। বিশেষত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিষ্ঠার আন্দোলনই এখন মুখ্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে বিরোধী দল ও জোটসমূহ। একদলীয়ভাবে নির্বাচন করা হলে, সেটাও দেশে বা বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা বা বৈধতা পাবে না বলেও বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে  প্রশ্ন উঠেছে, দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাপ্তি কোথায়? পথের শেষ কোথায়? কোথায় সমন্বয়, পরমত সহিষ্ণুতা? কোথায় গণতান্ত্রিক সমানাধিকারে সকলের সম্মিলিত প্রয়াস? মুক্তির দিশারী মানুষ আজ নানা প্রশ্নে উত্তর জানতে চাচ্ছে। এইসব জনদাবি ও প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ খবর হলো, রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে একদলীয় নির্বাচন স্থগিতকরণের দাবির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করেছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। পুরো পরিস্থিতি এখন সঙ্কট আর সমাধানের মাঝখানে চূড়ান্ত অবস্থায় ঝুলে আছে। পয়েন্ট অব নো রিটার্ন বলে ইংরেজিতে যে একটি কথা আছে, বাংলাদেশে এখন তেমনই অবস্থা। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বিরোধী দলের। তারা বলছেন, অস্তিত্ব রক্ষায় আন্দোলনকে বিজয়ী করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনও বিকল্প খোলা রাখা হয়নি।
ইতিহাস দৃষ্টে বলা যায়, যে কোনও আন্দোলন-সংগ্রামের একমাত্র পরিণতি ও সমাপ্তির নাম বিজয়। আজ কিংবা আগামীকাল সেই বিজয় আসবেই। ইতিহাসের এটাই শিক্ষা। বিজয়ের পথ সহজ নয়; কুসুমাস্তীর্ণও নয়। বিজয়ের পথ হলো সংগ্রামের পথ। বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস নতুন নয়। সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ভারতীয় উপমহাদেশে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখেছে বাংলাদেশ। সংগ্রামের মহাসড়ক পেরিয়েই স্বাধীন হয়েছে। অতএব সংগ্রাম হলো ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আন্দোলনরত জনতাকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তারা গণতন্ত্র ও আইনের শাসন এবং অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের ঐতিহাসিক দাবির কথাই উচ্চারণ করেন। তারা কোনওভাবেই একদলীয় এবং সকলের অংশগ্রহণযোগ্যতাহীন নির্বাচন মেনে নিবে না। আন্দোলনরত নেতা-কর্মীদের বক্তব্য ও মনোভাবে এ কথাই প্রতীয়মান হচ্ছে।
একগুঁয়েমীর মাধ্যমে একক নির্বাচন করার বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ও প্রেক্ষাপট কারও কাছে অজানা নয়। বিরোধী দলের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, একদলীয় স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সুশাসন ও সর্বদলীয় গণতন্ত্রের জন্য আজকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। দলনিরপেক্ষ বলে পরিচিত কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকও এ কথার প্রতিধ্বনি করেছেন। তারা বঙ্গভবনে গিয়ে একদলীয় নির্বাচন না করার জন্য বলে এসেছেন। বিশেষত, প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাড়া নির্বাচন যে সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, সে দিকটির প্রতিই তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
গণতন্ত্রের জন্য অতীতে ও বর্তমানে বিশ্বের নানা দেশের মতো বাংলাদেশেও সংগ্রাম করতে হচ্ছে হীন চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে। ধর্ম, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে। মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার ডাকেই মূলত অবরোধ-হরতালসহ নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। একদলীয় বা বিদ্বেষভরা কলুষিত মনে এই গণআন্দোলনকে দেখার মাধ্যমে কেউ কেউ এই সংগ্রামের বিরোধিতাও করছে। পক্ষ-বিপক্ষ যে কোনও রাজনৈতিক ঘটনায় থাকবেই। এটাই স্বাভাবিক। এটাই গণতান্ত্রিক। কিন্তু প্রতিপক্ষকে একতরফাভাবে নিধন করার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেয়ার তো কোনও কারণ নেই? এমন করা হলে জনক্ষোভ বাড়ে বৈ কমে না। বাংলাদেশে আন্দোলন-সংগ্রাম তীব্র হওয়ার পিছনে বিরোধী দলের তৎপরতার চেয়ে সরকারি জুলুম-নির্যাতন ও উস্কানি কম দায়ী নয়। সংলাপ ও আপোষ করার দিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহী না হয়ে বরং শক্তি ও বিষোদগারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সরকার যে পরিস্থিতিতে উত্তপ্ত করতে করতে বর্তমান অগ্নিগর্ভ পর্যায়ে টেনে এনেছে, সে কথা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। গণতন্ত্রে শাসন হয় সকলের সম্মতিতে। পুলিশ বা শক্তি দিয়ে যে শাসন, সেটা গণতন্ত্রের বিপরীত। গণতন্ত্রে মতপার্থক্যও দূর করা হয় আলাপ-আলোচনায়, সমঝোতায়। এই কথাগুলো যথাসময়ে সরকার যদি উপলব্ধি করতো, তবে পরিস্থিতির এতটা অবনতি হতো না।
নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মানুষ শাস্তি ও নিরাপত্তা চায়। রাজনৈতিক দল হিসাবে গণতন্ত্রে প্রতিটি দলই নিজ নিজ বক্তব্য দেয়ার অধিকার চায়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। এটাই গণতন্ত্রের রীতি। গণতন্ত্রে একজন মানুষও যদি ভিন্নমত প্রকাশ করে, সেটার প্রতিও সম্মান জানাতে হয়। বাংলাদেশে সেটা হচ্ছে কি? সমঝোতা হচ্ছে না; ভিন্নমত শোনা হচ্ছে না। তা হলে কী হচ্ছে?
বাংলাদেশে কোনও রাজনৈতিক দলই আকাশ থেকে পড়েনি। মুসলিম লীগের পেটের ভেতর থেকেই বেরিয়েছে খোদ শাসক দল আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন নির্বাচনে এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অংশও নিয়েছে। আজকে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, একদা তারাও বিরোধী দলে ছিল। বিরোধী দল বিএনপি কখনও প্রধান শক্তি হয়েছে; কখনও প্রধান বিরোধী দল হয়েছে। জামায়াত, জাতীয় পার্টি সময় সময় উল্লেখযোগ্য আসন পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে মজার ব্যাপার। যারা কোনও দিন সংসদে যেতে পারেনি; এমনকি জামানত পর্যন্ত রাখতে পারেনি; এরাই বড় বড় কথা বলছে। শুধু বলছে না, সরকারকেও সেটা মানতে বাধ্য করছে। জনগণ ভোট দেয় না, নিজেদের জনশক্তি ও জনপ্রিয়তা নেই, তারা কি করে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে? কে বা কোন দল রাজনীতি করতে পারবে; কার কি শাস্তি হবে; কাকে নির্মূল করা হবে; মধ্যযুগীয় রাজার মতো তারা সেটা আগে-ভাগেই ঠিক করে দিচ্ছেন? একদল ফতুর বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে তারা যেটা করছেন, সেটা হটকারিতা, উস্কানি ও বিশৃঙ্খলা। এদের কথা শুনলে যে দেশের বৃহত্তর অংশকে বঞ্চিত করা হয়, সে খেয়ালও নেই। সবাই জানতে চায়, এদের শক্তির উৎস কি? জনগণ ও জনইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এরা কার এজেন্ডা বাস্তবায়িত করতে চায়? এখন এরাই সরকারের মাথায় চেপে মন্ত্রিসভায় বসে আছে। এটা প্রতিনিধিত্বশীল, নাকি স্বৈরাচার ও ফতুর বামদের ক্ষমতায়ন, সে প্রশ্নও উঠছে।
কথায় বলে, বন্ধুবেশী স্তাবকের চেয়ে শত্রু ভালো। বাংলাদেশের ইতিহাসও এ কথা বলে। স্বাধীনতার পর কিভাবে দেবত্তারোপ করে গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রে আর গণতান্ত্রিক সিংহ পুরুষকে একদলের নেতা বানানো হয়েছিল, সেটা জ্বলজ্বল করছে। সেসব বন্ধুরা পরে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক শ্রমিক হিসেবে খাল কেটেছে। এরশাদের পাতানো নির্বাচনে লাল-ঝা-া নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সরকারের ক্ষমতার বৃত্তে এবং পদ-পদবীতে এরাই এখন এগিয়ে। পরীক্ষিত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাও এদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা। এরাই আদর্শিকভাবে আওয়ামী লীগকে বিচ্যুৎ করছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুরোধা ও বাংলাদেশের প্রধান দলের ঐতিহ্য থেকে অতীতের মতো বিচ্ছিন্ন করছে। আজকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দলের দূরত্ব ও ওয়ার্কিং রিলেশন্স খারাপ করার পেছনে এদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। এতে কার কি লাভ হয়েছে কে জানে; কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে আওয়ামী লীগের। প্রবল বিরোধিতার মধ্য দিয়ে দলটিকে কাজ করতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের শরীরে একদলীয় স্বৈরতন্ত্রের ছাপ লেগেছে এদেরই কারণে। অথচ আওয়ামী লীগ যে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তাতে সকলকে সঙ্গে রাখলেও কোনও ক্ষতি হতো না; সমালোচকরাও তেমন কিছুই বলতে পারতো না। আওয়ামী লীগের সুনাম ও ভাবমূর্তি তাতে উজ্জ্বল হতো। এখন হয়েছে উল্টো।
এখন অবস্থা কি সেটা তো দেখাই যাচ্ছে। বিদেশী বন্ধুরা পর্যন্ত সংলাপ ও সমঝোতার কথা বলতে বলতে ক্লান্ত ও লজ্জিত হয়ে গেছে। যেসব আওয়ামী বুদ্ধিজীবী বিবেকের কারণে কিছু সত্য কথা ও সদুপদেশ দিচ্ছেন, তারা পর্যন্ত আক্রান্ত হচ্ছে আওয়ামী লীগের নব্যশক্তিধর নেতাদের দ্বারা। যাকে-তাকে যখন-তখন স্বাধীনতাবিরোধী/মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। এই যে প্রতিহিংসার দুষ্টচক্র ঘাপটিমারা মতলববাজরা তৈরি করেছে, সেটা থেকে রাবণের চিতার মতো দাউ দাউ করে জ্বলছে হিংসার আগুন। সাধারণ মানুষ, শান্তিপ্রিয় নাগরিক এই অরাজকতা থেকে বাঁচতে চায়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের, আইনের ন্যায়ানুগ প্রয়োগের নিশ্চয়তা চায়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়, যাতে সকলেই অংশ নিতে এবং প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন দেখতে পারে। চলমান আন্দোলন-সংগ্রামের দাবিও তা-ই। এই দাবি দিনে দিনে জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়ে এখন চূড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করছে। দেশের সর্বত্র দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেছে গণআন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ। সর্বত্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। গণমাধ্যমের পাতায় বা টিভির পর্দায় চোখ রাখলে যে কেউই অতি সহজে উপলব্ধি করতে পারবেন যে, পরিস্থিতি কতটুকু নাজুক ও ভয়াবহ। এমন অবস্থার আশু উত্তরণ দরকার। একটি মীমাংসা, সমাধান বা পরিণতিতে পৌঁছা দরকার। অনিশ্চিয়তা কখনও কোনও স্থায়ী বিষয় হতে পারে না।
যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে, সে নির্বাচনকে সকলের অংশগ্রহণমূলক করা এবং দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্য-বৈধতাসম্পন্ন করা অতি জরুরি। পাশাপাশি আন্দোলনরত বিরোধী দল ও জোটসমূহের দাবি-দাওয়াগুলোকেও সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তা না হলে আন্দোলন যে হারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং যে ব্যাপকতা ও বিস্তৃতি লাভ করছে, তাতে আন্দোলনের সাফল্যের পথেই সমাধান বের হয়ে আসবে। কারণ, পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যাওয়া জনতাকে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। দাবি আদায় না হলে এই জনতাকে থামানোও যাবে না। আলোচনা বা আন্দোলন, যে কোনও পথেই জনতা তাদের দাবি আদায় করবেই। আলোচনা রুদ্ধ করে জনতাকে সর্বাত্মক আন্দোলনের পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এখন দাবি আদায় ভিন্ন এ আন্দোলনের পরিসমাপ্তির অন্য কোনও পথ খোলা আছে কি?
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সবার চোখ এখন বঙ্গভবনের দিকে


বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধে সবদিক থেকেই অচল হয়ে পড়েছে সারা দেশ। এর কারণ আসলে ক্ষমতাসীনরাই তৈরি করেছেন। তারা যদি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে নিতেন এবং বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার আগেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দিয়ে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না করাতেন তাহলে পরিস্থিতির এত দ্রুত অবনতি ঘটতো না। তফসিল ঘোষণার পাশাপাশি উস্কানি ও হামলাও এসেছে সরকারের পক্ষ থেকেই। সরকার একই সঙ্গে যথেচ্ছভাবে সংবিধানবিরোধী কর্মকা-ও চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি নেতা আ স ম হান্নান শাহকে গ্রেফতার এবং বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর এতদিনকার মতো এমনভাবে দমন-নির্যাতন চালানো হচ্ছে যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী সকল ক্ষমতা এখন সরকারের হাতে নয় বরং নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকার কথা। আপত্তির কারণ হলো, পদে পদে নিজেরা সংবিধান লংঘন করলেও ক্ষমতাসীনরা আবার একই সংবিধানের দোহাই দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সব মিলিয়েই পরিষ্কার হয়ে গেছে, ক্ষমতাসীনরা মানুষের প্রাণবিনাশী কর্মকা-েই তৎপর থাকবেন, তারা গণতন্ত্রসম্মত পথে পা বাড়ানোর নাম করবেন না। ওদিকে নির্বাচন কমিশন বশংবদের মতো তফসিল ঘোষণা করায় এবং মাঝখানে সময় খুবই কম থাকায় সমঝোতার পথও বন্ধ হয়ে গেছে বলা যায়। একই কারণে একদিকে আন্দোলন যেমন আরো প্রচ- হয়ে উঠছে অন্যদিকে দেশী-বিদেশী সব মহলে উদ্বেগ-আতংকও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিক্রিয়ার প্রকাশও ঘটাচ্ছেন অনেকে। এভাবে রাজনৈতিক সংকট বিপজ্জনক হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতেই সবার চোখ এখন বঙ্গভবনের দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান ‘অভিভাবক’ হিসেবে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এডভোকেট সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করবেন বলেও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে তার কাছে এরই মধ্যে অনুরোধও জানানো হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের নেতারা বঙ্গভবনে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সংঘাত ও হিংস্রতার পথ পরিহার করে সরকার যাতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে এবং সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশে সমঝোতার পথে অগ্রসর হয় সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহবান জানিয়েছেন জোটের নেতারা। তারা বলেছেন, জাতীয় জীবনের এই ক্রান্তিলগ্নে মহামান্য রাষ্ট্রপতিই কেবল সরকারকে নিবৃত্ত করতে পারেন। তিনি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার ব্যাপারেও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি তেমন ভূমিকাই পালন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন ১৮ দলীয় জোটের নেতারা। এর পরপরই সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিক রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তারাও রাষ্ট্রপতিকে বলেছেন, দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকা হত্যা ও সহিংসতাকে প্রতিহত না করা গেলে এবং প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা চালানো হলে গণতন্ত্র বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ভয়াবহ সে পরিণতির কবল থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষার উদ্দেশে সচেষ্ট হওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
অন্যদিকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাদের বক্তব্য শুনলেও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এডভোকেট নিজের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। বলেছেন, তার পক্ষে ১৮ দলীয় জোট এবং বিশিষ্টজনদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা পালন করা বা তাদের দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে তাদের বক্তব্য ও দাবিগুলোকে তিনি সরকারের কাছে পৌঁছে দেবেন। রাষ্ট্রপতির এই যুক্তি ও বক্তব্য কিন্তু জনগণকে নিরাশ করেছে। কারণ, সংবিধানেই বলা আছে , রাষ্ট্রপতি যে কোনো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে ‘পরামর্শ’ দিতে পারবেন। এর ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি যেহেতু ‘মহামান্য’ সেহেতু তার ‘পরামর্শ’ই নৈতিক দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের জন্য ‘নির্দেশ’ হয়ে উঠতে পারে। সেটাই হওয়া উচিতও। ব্যাখ্যার এই দৃষ্টিকোণ থেকে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে রাষ্ট্রপতি সরকারের ওপর এমনকি নৈতিক চাপও সৃষ্টি করতে পারেন। তাছাড়া মন্ত্রিসভার বা সংসদের যে কোনো সিদ্ধান্ত বা আইনে অনুমোদন দেয়ার আগে সেটা পুনর্বিবেচনার জন্য তিনবার পর্যন্ত ফেরৎ পাঠানোর ক্ষমতাও সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে রেখেছে। এর ব্যাখ্যায়ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার দিকটিই প্রাধান্যে আসে। সুতরাং একথা ঢালাওভাবে বলার অবকাশ থাকতে পারে না যে, রাষ্ট্রপতির হাত-পা বাঁধা এবং তার কোনো ক্ষমতা নেই। ব্যাখ্যার আলোকে বরং বলা যায়, তিনি ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ বলেই বেগম খালেদা জিয়া ও ড. কামাল হোসেনসহ বিশিষ্টজনেরা বুঝে-শুনেই তার কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। সদিচ্ছা থাকলে রাষ্ট্রপতি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের উদাহরণও অনুসরণ করতে পারেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রশ্নে ১৯৯৫-৯৬ সালে যখন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস তখন বিচারপতি, সিনিয়র আইনজীবী, অধ্যাপক ও সাংবাদিকসহ নাগরিক সমাজের অনেক বিশিষ্টজনের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তাদের অভিমতের ভিত্তিতেই তিনি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ‘পরামর্শ’ দিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রপতির সে ‘পরামর্শ’ অনুযায়ীই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান যুক্ত করে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করেছিলেন। এর পর ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন খালেদা জিয়া। বর্তমান পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এডভোকেট যদি সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের উদাহরণ অনুসরণ করেন তাহলে সংকট কাটিয়ে ওঠা সময়ের বিষয়ে পরিণত হতে পারে। গণতন্ত্র রক্ষাসহ বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই রাষ্ট্রপতির উচিত প্রধানমন্ত্রীকে এমনভাবে ‘পরামর্শ’ দেয়া, যাতে তিনিও বেগম খালেদা জিয়ার মতো প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং ১৮ দলীয় জোটের দাবি অনুযায়ী সংবিধানে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের বিধান যুক্ত করেন। সংসদ এখনও বহাল থাকায় রাষ্ট্রপতি যে কোনো সময় অধিবেশন আহ্বান করতে এবং সেই অধিবেশনে নতুন বিধানটি যুক্ত করানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। দেশ ও জাতির সংকটকালে সেটাই হবে অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতির যথার্থ ভূমিকা। তারও আগে ঘোষিত তফসিল অবশ্যই বাতিল করতে হবে।

বুধবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ক্ষমতা আকড়ে থাকার নেশা আওয়ামী লীগকে অস্থির করে তুলেছে


সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সংবিধানের ভিত্তিতে। সংবিধানকে সমুন্নত রাখার এবং সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশের সরকারের রূপরেখা ও সরকার নিয়োগ সম্পর্কে সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ ৫ বছর। বর্তমান মহাজোট সরকার কর্তৃক সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। একটি সংসদ বহাল রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচনের এ পদ্ধতি পৃথিবীর আর কোন দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী নির্বাচনের ময়দান সমতল করার যে আবশ্যকতা, মহাজোট সরকার কর্তৃক সংশোধিত এ সংবিধানের মাধ্যমে সেটা উপেক্ষিত হয়েছে। কেউ মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য থেকে নির্বাচনে অংশ নেবেন, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের সমস্ত ক্ষমতা ইস্তেমাল করবেন, সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন, আর কেউ তার কিছুই করতে পারবেন না এটা ন্যায় ও সমতার খেলাপ। সংবিধান ও নির্বাচনের বিধি-বিধানে এমন ব্যবস্থা এবং নিশ্চয়তা থাকতে হবে, যাতে প্রার্থীদের মধ্যে অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নে কোনরূপ বৈষম্য না থাকে। সমতল ময়দানে সবাই নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন, জনগণ যাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন তারাই সরকার গঠন করবেন, ক্ষমতায় যাবেন। গণতন্ত্রে ক্ষমতার পালাবদলের এটাই উপায় ও নিয়ম। বর্তমান সংবিধানে যে ব্যবস্থা রয়েছে তাতে নির্বাচনে সমতল ময়দানের নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে সংবিধান সংশোধনের বিকল্প নেই।
নবম জাতীয় সংসদের কথিত শেষ অধিবেশনের মাধ্যমে, সংবিধানে নির্বাচনকালীন নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা সংযোজনের কিংবা নির্বাচনের ময়দান সমতল করার সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০ নবেম্বর সংসদ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে বলেছেন, অধিবেশন শেষ। এখন নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন। বাংলার মাটিতে সেই নির্বাচন অবশ্যই হবে। সেই নির্বাচন বানচাল করার ক্ষমতা কারোরই নেই। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, রাষ্ট্রপতি তাকে নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির পরামর্শেই তিনি ছোট পরিসরের নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেছেন। এ সরকার শুধু রুটিন কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের যে কথা ঘোষণা করেছেন তাতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব তিনি সংবিধানের কোন ধারার আলোকে, কিভাবে রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে প্রাপ্ত হলেন? ‘নির্বাচনকালীন সরকার’, ‘সর্বদলীয় সরকার’, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ এর কোনটিরই অস্তিত্ব বর্তমান সংবিধানে নেই। এসব সরকারের কথা বলে আওয়ামী লীগ মূলত সংবিধান লংঘনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কোন দায়িত্ব যদি তাকে রাষ্ট্রপতি দিয়ে থাকেন তাহলে তা সংবিধানের ভিত্তিতেই হতে হবে। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান নিছক আলাপ-আলোচনার বিষয় নয়। এটি একটি সাংবিধানিক বিষয়। সংসদ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর ঐ ঘোষণার মাধ্যমেই দেশবাসী জানতে পারলো দেশে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হয়েছে যা পরবর্তী নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধানমন্ত্রী কোন বিধির আলোকে, কিভাবে রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে এ অনুমতি গ্রহণ করলেন, রাষ্ট্রপতিই বা কিভাবে তা প্রদান করলেন তা কেউ জানতে পারলো না। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী এ সরকার গঠন ও তা পরিচালনার অনুমতি প্রদানের বিষয়টি অবশ্যই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হতে হবে। এরূপ সরকার গঠনের আগে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সকল মন্ত্রীকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রীকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতির গেজেট নোটিফিকেশনও থাকতে হবে। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে কখন, কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এরকম অনুমতি দিলেন কিংবা প্রধানমন্ত্রীই বা কখন পদত্যাগ করলেন অদ্যাবধি কেউ তা জানতে পারলো না।
সংবিধানের ৫৭(৩) এবং ৫৮(৪) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীকে সরকার পরিচালনার অনুমতি দানের বিধান সংযুক্ত আছে। প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হওয়া ব্যতীত এ বিধানের সুবিধা নেয়া যাবে না। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন বলে যে সুবিধা দেয়া আছে তা পেতে হলে সর্বাগ্রে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। কিন্তু আমরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কোন ঘটনা সম্পর্কে কোন গণমাধ্যম বা অন্য কোন উপায়ে অদ্যাবধি জানতে পারিনি। সংবিধানের ৫৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সরকার পরিচালনার অনুমতি অবশ্যই প্রমাণিত হতে হবে। কারণ এ ধরনের কোন অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের অনুমতির বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের নিছক কোন বিষয় নয়। এটা সাংবিধানিক সরকার গঠনের আইনী বাধ্যবাধকতার বিধান। সে কারণেই রাষ্টপ্রতি নামে যেকোন আদেশকে অবশ্যই সংবিধানের ৫৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘সত্যায়িত বা প্রমাণিকৃত’ হতে হবে বলে সংবিধানে বাধ্যবাধকতা প্রদান করা হয়েছে।
সংসদের সমাপনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রদত্ত বক্তব্য নিয়ে এক ধূ¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সংসদে ঘোষণার পূর্বে কোথায় রাষ্ট্রপতি তাকে এ দায়িত্ব অর্পণ করলেন তা বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের কেউ অবহিত নয়। তিনি  ২০ নবেম্বর সংসদে বললেন, রাষ্ট্রপতি তাকে নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন। তার ২ দিন আগে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করেন। ধরে নেয়া যায় রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎকালে তিনি নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক নতুন সরকার গঠনের সাংবিধানিক ঘটনাটি সরকার কিংবা বঙ্গভবন থেকে জানানো হলো না কেন? পরদিন রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করেন নির্বাচন কমিশনের পুরো টীম। তারা রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করেন। সেদিনও নির্বাচন কমিশনকে এ কথাটি জানানো হয়নি। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, নির্বাচন কমিশনের সাক্ষাতের ২ ঘণ্টা পর বিরোধীদলীয় নেতাসহ ১৮ দলীয় জোটের ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা রাষ্ট্রপতির নিকট সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানিয়ে লিখিত বক্তব্য পেশ করেন। রাষ্ট্রপতি তাদেরকে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি ১৮ দলীয় জোটের দাবি বিবেচনার জন্য সরকারকে অনুরোধ করবেন। অথচ মহামান্য রাষ্ট্রপতি তখনো জানেন না তার একদিন আগেই তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব গণমাধ্যমে সরবরাহকৃত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান যে, রাষ্ট্রপতির নিকট উত্থাপিত দাবিটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের নির্দেশ দিয়ে থাকলে রাষ্ট্রপতি কি করে ১৮ দলীয় জোটের দাবি বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে পারেন?
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে এ সময়ে একাধিক প্রেস রিলিজ ও বক্তব্য দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোথাও নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার কোন প্রেস রিলিজ বা গেজেট নোটিফিকেশন অথবা প্রজ্ঞাপন জাতির দৃষ্টিগোচর হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার অনুমতি প্রাপ্তির বিষয়টি গোটা জাতির নিকট এক রহস্যজনক ঘটনা। সংবিধানের সুস্পষ্ট বিধানাবলী ও নির্দেশিকা উপেক্ষা করে নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব প্রাপ্তির বিষয়টি এক গোলক ধাঁধার সৃষ্টি করেছে। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে অন্ধকারে রেখে স্বঘোষিতভাবে রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে নির্দেশ পাওয়ার কথা বলে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া অবলম্বন আওয়ামী লীগের একটি নতুন চমক ছাড়া আর কিছু নয়। দেশবাসীর বুঝতে বাকি নেই, প্রধানমন্ত্রী নিজের রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য রাষ্ট্রপতির ঘাড়ে বন্দুক রেখে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের একটি অভিনব নাটক জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। যিনি সংবিধান নিয়ে এ ধরনের দুরভিসন্ধিমূলক ও রহস্যজনক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন তার অধীনে নির্বাচন কিছুতেই অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
নবম জাতীয় সংসদের অধিবেশন সমাপ্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুমতি প্রাপ্তির বায়বীয় ঘোষণা দিয়ে সরকার একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ও বন্ধু রাষ্ট্রবর্গও সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলে আসছেন।
সংঘাত, সহিংসতা, একগুঁয়েমিতা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও অশান্তি থেকে মুক্ত থাকার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন- সবাই বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের মতই সবদলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে একদলীয় নির্বাচনের পথে হাঁটছে। সংবিধান, গণতন্ত্র সবই গণআকাঙ্খার ফসল। কিন্তু সেদিকে আওয়ামী লীগ ভ্রুক্ষেপ করছে না। যে কোনভাবে ক্ষমতায় থাকার বা পুনরায় ক্ষমতায় আসার নেশা আওয়ামী লীগকে অস্থির করে তুলেছে। আওয়ামী লীগ সরকার চায় না ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। প্রধানমন্ত্রী ও তার পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভার সদস্যগণ ও দলীয় নেতৃবৃন্দ যে ভাষায় কথা বলছেন তা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। তারা সবদলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের পথ পরিহার করে একদলীয় নির্বাচনের কথাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যক্ত করছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজ একদলীয় নির্বাচনের ব্যাপারে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। তারা স্পষ্টতই বলেছেন, একদলীয় নির্বাচন বাংলাদেশকে সংঘাত ও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিবে।
নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। বহিঃবিশ্বেও অনুরূপ উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ বিরাজমান। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হয়।  নিউইয়র্ক টাইমস্, লন্ডনের প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকনোমিস্ট-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর একগুঁয়েমিতা ও হটকারিতার কারণে রাজনৈতিক সংকট ক্রমশই ঘনীভূত হচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় বর্তমান মহাজোট সরকার কর্তৃক সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভাকে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ অথবা যে নামেই আখ্যায়িত করা হোক না কেন এর কোন অস্তিত্ব সংবিধানে নেই, জনগণের নিকট এর কোন গ্রহণযোগ্যতাও নেই। এই অভিনব সরকার গঠনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলকে দমন করে একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার নীল নকশা প্রণয়ন করেছে মাত্র। এ ধরনের জবরদস্তিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে নিক্ষেপ করবে।
১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। জাতি যে আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় দীর্ঘ ৪২ বছর পরেও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, মানুষের জান-মাল এবং সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মূল কারণ হলো ক্ষমতার লোভ, লালসা ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভিপ্রায়। রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শিতা, অপরিণামদর্শী ও স্বার্থবাদী ভূমিকা দেশে সংঘাতমুখর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার যা ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছে। দেশের মানুষের ভাল-মন্দ বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। দলীয় স্বার্থবাদিতা আবহমান কাল থেকে চলে আসা আমাদের সামাজিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সম্মান, মর্যাদা নিয়ে বিশ্ব দরবারে কিভাবে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াবে সে চিন্তা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মহলে নেই।
বিশ্বায়নের এই যুগে তেল, গ্যাস, ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল তা রাজনৈতিক সংকটের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যেসব দেশ ও সংস্থা সরাসরি অবদান রাখেন তারা তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অবরোধের সম্মুখীন হতে পারে।
বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশ তার বিশাল জনশক্তির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম। বিস্তীর্ণ সমুদ্র অঞ্চল, সমুদ্র বন্দর ও পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারতো। কিন্তু আওয়ামী লীগের অপরিণামদর্শী রাজনৈতিক কর্মকা- দেশকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিরোধী দলকে সমূলে উৎপাটন করার অসৎ রাজনৈতিক মনোবৃত্তি দেশকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় টিকে থাকার মোহ দেশকে রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত করেছে। প্রতিনিয়তই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রাণ দিচ্ছে নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষ। পুলিশ বাহিনীকে পেশাদারিত্বের পরিবর্তে দলীয় উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সংবিধান স্বীকৃত মিছিল, মিটিং, সমাবেশের আয়োজন করলেই পুলিশ সেখানে গুলী চালাচ্ছে। পুলিশ ফৌজদারী অপরাধ দমনের চাইতে রাজনৈতিক দমন, পীড়নে ব্যস্ত। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, চোখ তুলে ফেলা, গায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলী করে পঙ্গু করে দেয়াসহ নির্যাতনের বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামকে ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। সরকারের নিবর্তনমূলক ভূমিকায় জনজীবন আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত। সর্বত্রই অস্থিরতা।
কোন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল বা নেতা জাতিকে অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করতে পারেন না। আওয়ামী লীগের নিকট দেশ, দেশের মানুষ ও জনগণের উন্নতি, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি বড় কথা নয়। ক্ষমতাই তাদের মুখ্য। ক্ষমতায় যাওয়ার নেশা তাদেরকে অস্থির করে তুলেছে।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

নির্বাচনী ট্রেন এখন কোন্ পথে


‘নির্বাচনী ট্রেন বাধাগ্রস্ত’ এটি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রধান শিরোনাম। এ শিরোনামের খবরে বলা হয় : তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে গত সোমবার থেকে যাত্রা শুরু করেছে সর্বদলীয় নির্বাচনী ট্রেন। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের তফসিল প্রত্যাখ্যানমূলক ৪৮ ঘণ্টার সড়ক, রেল ও নৌপথ অবরোধে অনেকটাই বাধাগ্রস্ত সেই ট্রেন। শুধু নির্বাচনী ট্রেনই নয়, বাধাগ্রস্ত বাস্তবের ট্রেনও। গত মঙ্গলবার এই অবরোধের প্রথমদিন ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নাটোরসহ বিভিন্ন স্থানে রেললাইন উপড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। অবরোধকালে সহিংস ঘটনায় বিজিবি জওয়ান, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীসহ নিহত হয়েছেন ৮ জন। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সহিংসতায় এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৯। তফসিল ঘোষণার পর পরই সোমবার রাতে শুরু হওয়া সহিংসতায় রাজধানীতে ১ ও কুমিল্লা নগরীতে ১ জন নিহত হন। গত মঙ্গলবার আহতের সংখ্যা ৬৩২ ছাড়িয়ে গেছে। আহতদের মধ্যে রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশনের দুই মেয়রও রয়েছেন। নাশকতার আশঙ্কায় পুলিশ আটক করেছে ১৮ দলের ১২৫ নেতা-কর্মীকে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের এমন চিত্র থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, দেশে নির্বাচনের পরিবেশ নেই। এই কারণেই হয়তো পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে, ‘নির্বাচনী ট্রেন বাধাগ্রস্ত’।
কিন্তু নির্বাচনী ট্রেন কেন বাধাগ্রস্ত হলো? এর কারণ দেশের জনগণের কাছে স্পষ্ট। সরকারও বিষয়টি জানেন। কিন্তু আবারও ক্ষমতা হস্তগত করার লোভে সমাধানের পথে যেতে চাইছে না সরকার। দেশের জনগণ চায় একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। কিন্তু সরকার নিত্যনতুন আইন, কৌশল ও চাতুর্যের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিপরীতে নানা কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশে সৃষ্টি হয়েছে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। এমন অবস্থায় গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন ড. কামাল হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, সুলতানা কামাল, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ও আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিশিষ্ট নাগরিকদের এই প্রতিনিধি দল প্রেসিডেন্টকে জানান, প্রধান বিরোধী দল ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে গণতান্ত্রিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়ে প্রেসিডেন্টকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করেন। বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আকবর আলি খান সাংবাদিকদের বলেন, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে দুই প্রধান দলের নেত্রীকে ডেকে একটি সমঝোতার মাধ্যমে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে উদ্যোগী হওয়ার জন্য রাষ্ট্রের অভিভাবককে অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে তারা জানান, নির্বাচনের আগেই নির্বাচনী তফসিল নিয়ে দেশে সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি চলছে। হরতাল-অবরোধের কারণে দেশের মানুষ আতঙ্কে জীবনযাপন করছে। সবার অংশগ্রহণেই কেবল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে স্বস্তি ফিরে আসতে পারে। তারা প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার কাছেও যাবেন কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ড. আকবর আলি খান বলেন, প্রতিপক্ষের কাছে গিয়ে কোনো সমাধান মিলবে না, তাই রাষ্ট্রের অভিভাবকের কাছে আমাদের প্রস্তাব রেখেছি। দেশে আবারও সামরিক শাসন আসবে কিনা, সরাসরি এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, দেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। তারা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। গণঐক্যের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা সে কথাই প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছি। উল্লেখ্য যে, প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ এই ছয় বিশিষ্ট নাগরিককে আশ্বস্ত করে বলেছেন, তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে এই পরিস্থিতিতে সমাধান খুঁজে পেতে তিনি চেষ্টা করছেন। সাংবিধানিক কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করতে পারবেন না, যা করার অনানুষ্ঠানিকভাবে করবেন।
বিপর্যয় রোধে এখন প্রেসিডেন্টের অভিভাবকত্ব কামনা করছেন দেশের নাগরিকরা। কিন্তু দেশ এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়লো কেন? আমরা তো একথা জানি যে, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের। সরকারের ব্যর্থতার কারণেই দেশ আজ বিপর্যয়ের মুখে। শুধু ব্যর্থতা নয়, এর সাথে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও চাতুর্যের নানা ছলাকলা। এমন অবস্থায় নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা ও যথার্থ আচরণের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনও জনমনে আশার সঞ্চার করতে পারেনি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার আশায় তারা তফসিল ঘোষণায় বিলম্ব করছেন। কিন্তু এমন বক্তব্যের পর ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে বসলো। তাও আবার জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। বিকল্প ধারা প্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এই তফসিল দেশকে এক গভীর সংকটের মধ্যে ঠেলে দিল। এর জন্য ইতিহাস কোনোদিনই তাদের ক্ষমা করবে না। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, এই তফসিল জাতিকে সংঘাত-বিভক্তি ও নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে গেল। জাসদ সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, এ ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন জাতিকে একতরফা নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এতে সব দলের অংশগ্রহণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে। গত সোমবার এক বিবৃতিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, আমরা বার বার সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক সমঝোতার আগে তফসিল ঘোষণা না করতে অনুরোধ ও দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তফসিল ঘোষণা করে দেশকে এক গভীর সংকটের মধ্যে ঠেলে দিল। এই সংকটের কারণে দেশে যত প্রাণহানি, অগ্নিসংযোগ এবং সম্পদহানি হবে তার জন্য সরকার ও নির্বোধ নির্বাচন কমিশনই দায়ী থাকবেন। এছাড়া এর ফলে দেশে যদি কোনো অসাংবিধানিক সরকার আসে তাহলে এর দায়দায়িত্বও এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বহন করতে হবে। তিনি আরো বলেন, নির্বাচন কমিশনের সরকারকে বলা উচিত ছিল, নির্বাচনে সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করুন। তাদের বলা উচিত ছিল, রাজনৈতিক সমস্যা শুধু রাজনীতির মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত, গায়ের জোরে নয়। তিনি একতরফা এই নির্বাচনী তফসিল প্রতিহত করার জন্য জনগণকে একযোগে সারা দেশে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রসঙ্গত এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও (সিপিবি) এই একতরফা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সংবাদপত্রে এখন নানা বিশ্লেষণও প্রকাশিত হচ্ছে। ‘আবার কালো সোমবার!’ শিরোনামের সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদের ভাষণে ‘সংবিধান রক্ষার’ অঙ্গীকার ২০০৬ সালের নবেম্বরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। সাধারণভাবে সমঝোতার কথা বললেও তার ভাষণে স্পষ্ট যে, বিএনপির অংশগ্রহণের আশা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সাহস দিয়েছেন। নিরাপত্তা জোরদারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আবার প্রকারান্তরে নির্বাচনী যুদ্ধে যাওয়ার আহ্বানের সুরও চাপা রাখেননি। কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, দেশের ঋণ শোধ করার ডাক এসেছে। ২০০৬ সালের ২৭ শে নবেম্বরের এক কৃষ্ণ সোমবারেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালেও আরেকটি কৃষ্ণ সোমবারে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলো।”
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিনকে এখন বলা হচ্ছে ‘কৃষ্ণ সোমবার’। কেন এই কথা বলা হচ্ছে তা আমাদের নির্বাচন কমিশন কিংবা সরকার ভেবে দেখবেন কিনা জানি না। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগকে জনগণ যে গ্রহণ করছে না তা তাদের উপলব্ধি করতে হবে। দেশের জনগণ জানে গত ৫ বছর সরকার সুশাসনের পথে চলেনি, নির্বাচনকালীন এই নাজুক সময়েও সরকার সঠিকপথে চলছে না। তারা নিজেরাই ঘোষণা দিয়ে জনগণকে জানিয়েছিল, দৈনন্দিন রুটিন কাজ ছাড়া তারা এ সময় নীতি নির্ধারণমূলক কিংবা বড় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। কিন্তু তারা কথা রাখেননি। নির্বাচনকালীন এই সময়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিতর্কিত টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর করলো। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্যদের ১৩টি টিভি ও ১৪টি রেডিও লাইসেন্স দিল। এছাড়া বড় বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তও গ্রহণ করছে সরকার। নির্বাচনকালীন সরকার কি এইসব কর্মকা- চালাতে পারে? এদিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরেও আচরণবিধি মানছে না সরকারি দল আওয়ামী লীগ। রাজধানী জুড়ে এখন নৌকায় ভোট চেয়ে বিলবোর্ডের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে সরকারের পক্ষে প্রচারণার ব্যানার ও পোস্টার। সোমবার সন্ধ্যায় তফসিল ঘোষণার পর মঙ্গলবার সারাদিন চলে গেলেও নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নির্বাচনী আচরণবিধি রক্ষা করছে না শাসক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তফসিল ঘোষণার পরপরই তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিজয় মিছিল ও নির্বাচনী মিছিল করেছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ট্রাক, বাস ও মোটরসাইকেল নিয়ে নির্বাচনী মিছিল করতে দেখা গেছে, যা নির্বাচনী আচরণবিধির ১২ ধারার সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
দিন যতই গড়াচ্ছে, ততই এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যেÑ নির্বাচনকালীন এই সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন দিয়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। ফলে বিরোধী জোটের রাজপথের আন্দোলনের যৌক্তিকতা এখন সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের সড়ক-রেল ও নৌপথ অবরোধের কর্মসূচির মুখে এখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলছেন, বিএনপি নির্বাচনে এলে তফসিলে পরিবর্তন করা যেতে পারে। এমন অবস্থায় আমরা মনে করি, সরকার ও নির্বাচন কমিশন বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন এবং ছয় বিশিষ্ট নাগরিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে যাবেন। কিন্তু এরপরেও যদি সরকার ক্ষমতা দখলের জন্য স্বৈরাচারের পথেই চলতে থাকে, তাহলে জনগণের কাছে রাজপথের আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না। আর বাংলাদেশের রাজনীতি সচেতন মানুষ মাত্রই একথা জানেন যে, রাজপথের লড়াইয়ে সবসময় জনগণই বিজয় লাভ করে।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

দেশের বাইরে বন্ধু আছে, প্রভু নয়


সুবীর ভৌমিক ও শেখর গুপ্ত ভারতীয় সাংবাদিক। এরা যতটা না সাংবাদিক, তার চেয়ে বেশি প্রোপাগান্ডিস্ট। এক দিকে বর্ণবাদী হিন্দু, আবার অন্য বর্ণবিদ্বেষীও। ভারতীয় স্বার্থ ও হিন্দুত্ববাদ সংরক্ষণে এরা নিষ্ঠাবান। তাদের এই বৈশিষ্ট্য নিন্দনীয় নয়। তবে এরা মনে করেন মুসলিমবিদ্বেষ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করার চৈতন্য লালন করা তাদের দেশপ্রেমের অংশ। এটা কোনো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকের পেশাদারিত্ব হতে পারে না। ঢাকায় ভারতীয় দূত পঙ্কজ শরণ একই জাতের মানুষ। এই কূটনীতিক প্রায় ভুলেই যানÑ তিনি একটি দেশের দূত, রাজনৈতিক কর্মী নন। এরা কেউ নিজের চরকায় তেল দেন না। কথায় আছে ৩৩ কোটি দেবতার দেশ ভারত। প্রায় ৩০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। হরিজন বা নমশূদ্র মিলে জাতপাতে পিষ্ট কোটি কোটি মানুষ শোষণ-বঞ্চনায় পদদলিত। দেশটির রাজপথেও ধর্ষিতা নারীর আর্তনাদ শোনা যায়। বিভিন্ন রাজ্যে নিরাপত্তাহীন জীবনের গ্লানি বহন করে চলে অসংখ্য মানুষ। 
ভারতের নেতারা একধরনের কসমেটিক উন্নতির ডুগডুগি বাজান। বিনোদন বাণিজ্যের মাধ্যমে মুম্বাইয়া সংস্কৃতির কেতাদুরস্ত অবস্থা যে সব বাস্তবতা নয় তা কারো অজানা নয়। ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পুরো গতর ঢেকে রাখার বস্ত্র পায় না। পরমাণু শক্তির ফুটানির তলে দারিদ্র্য মুখব্যাদান করে আছে। চিকিৎসার অভাব, স্যানিটেশন সুবিধার অপ্রতুলতা ও শিক্ষার অভাবে কোটি কোটি মানুষ অসহায় জীবন মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকের ধারণা আমাদের দেশের অনেক মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারত যায়। নিশ্চয় আহামরি কিছু। বাস্তবতা বিপরীত। বাংলাদেশের রোগী নিয়ে বাণিজ্যের জন্য ওসব হাসপাতাল, ভারতের গণমানুষের জন্য নয়। সভ্যতার সাধারণ আলোও পৌঁছেনি এমন জনপদ বেশুমার। আমাদের ঘরের কাছের সেভেন সিস্টার কেমন আছে তা তো আমাদের জানা। দেশটির মানচিত্রজুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা স্বাধীনতাকামীরা দিন দিন শক্তি সঞ্চয় করছে এমন গোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢেলে দাঙ্গা বাধানোর মতো পশুপ্রবৃত্তি তাদের কিছু উগ্রবাদীর অস্থিমজ্জায়। সে দিকে তাদের নজর পড়ে না। তাদের যত জ্বালা ও মনোকষ্ট মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টায় অবিরাম সংগ্রামী বাংলাদেশী মানুষের জন্য। তাই দাবিয়ে রাখতে সচেষ্ট। তাদের ধারণা, বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়ানোর মানে তাদের স্বাধীনতাকামীদের আশকারা পাওয়া। 
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রধানকে এরা অভিযুক্ত করে না। বরং বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিকূলে শেখ হাসিনার ভারতবান্ধব নীতি তারা বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের নিদর্শন মনে করে। এই কৃতজ্ঞতা দেখাতেই তাদের মিডিয়া সোচ্চার। জয় ও শেখ রেহানার সাথে পঙ্কজ শরণের একান্ত বৈঠকের কারণও অভিন্ন। ভারতীয় দূত ও মিডিয়া এ কারণেই অভিযুক্ত করে দেশের স্বাধীনচেতা মানুষগুলোকে। আবহমান কাল ধরে যে শান্তিপ্রিয় ও আজন্ম অসাম্প্রদায়িক আলেমসমাজ সাম্প্রদায়িকতা রুখে আসছে, জঙ্গিবাদ ঠেকিয়ে দিচ্ছে, তারাও তাদের বিদ্বেষের টার্গেট হচ্ছেন। এই আমলে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলেও তারা শেখ হাসিনা সরকারকে দায়ী করে না, অভিযুক্ত করে প্রতিবাদী মানুষকে, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের। প্রভাবশালী নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করা হয়, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল দৃশ্যত রাজনৈতিক বিরোধীদের শ্বাস রোধ করে হত্যার আরেকটি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় দূত ও এসব বর্ণবাদী সাংবাদিক এ দিকে যেতে নারাজ। তারা ভাবেন, এর মাধ্যমে ভারতবিদ্বেষের শেকড় উপড়ে ফেলা হচ্ছে। অথচ ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে, ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে জামাই আদরে পাকিস্তান পাঠিয়েছে ভারত। নৈতিকতার বিচারে কতটা ঠগবাজ হলে তারা এখন প্রহসনের বিচারে উসকানি দিতে পারে। 
নিউ ইয়র্ক টাইমসের ‘পলিটিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, চলতি বছরের শুরু থেকে হরতালে বাংলাদেশ অচল হয়ে পড়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংস সঙ্ঘাতে কয়েক শ’ লোক নিহত হয়েছেন। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা ও মানবাধিকারকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বিচারের মৌলিক মানদণ্ডের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শনকারী আদালতগুলো বিরোধী দলের অনেক সিনিয়র নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছে। একই সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করা হয়েছে, বর্তমান সঙ্কটের জন্য এককভাবে দায়ী প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা। দৃশ্যত, শেখ হাসিনা জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের আগে দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে এবং প্রয়োজনে যেকোনো পন্থায় বিরোধীদের অকার্যকর করতে বদ্ধপরিকর। ২০১১ সালে তিনি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক বিধানটি বাতিল করে দেন। এর বদলে তিনি তার নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠন করেছেন। 
বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার এ চিত্রটি ভারতীয় পত্রিকায় পাওয়া যাবে না। উল্টো ভারতীয় বর্ণবাদী সাংবাদিক গোষ্ঠী ও মিডিয়া জনগণ ও বিরোধী জোটকে অভিযুক্ত করতে তৎপর। শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এরা ভারতীয় সেনাদের অভিযানের সুপারিশ করছে। বলছে, ইন্দ্রিরা গান্ধী সেনা প্রত্যাহার করে ভুল করেছেন। সেই ভুল আর নাকি করা ঠিক হবে না। কারণও নাকি এই সরকার টিকে না থাকলে ভারতীয় স্বার্থ জলে পড়ে ডুবে যাবে। ভারতীয় থিংকট্যাংকও মনে করে, শেখ হাসিনা ভারতের যে আস্থা ও বন্ধুত্ব অর্জন করেছেন তার প্রতিদান দেয়া ভারতের কর্তব্য। এই কর্তব্য এরা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে উৎসর্গ করতে নারাজ। 
অরুন্ধতীরা যে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণিবৈষম্য, বর্ণবাদ, দারিদ্র্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন, আন্না হাজারেরা যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, মহাস্বেতা দেবীরা যে মানবতার জন্য লড়াই করেছেনÑ সেসব জায়গায় সুবীর ভৌমিক ও শেখর গুপ্তরা অনুপস্থিত। পঙ্কজ শরণরা সেসব আড়াল করতে আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী কূটনীতির আশ্রয় নিচ্ছেন। ভারতজুড়ে ক্ষতবিক্ষত ও লুণ্ঠিত হচ্ছে মানবধর্ম, প্রকৃত ধর্মাচার, নরেন্দ্র মোদিরা ছড়াচ্ছেন সাম্প্রদায়িকতা ও হিংসার বিষবাষ্প, অথচ এসব জ্ঞানপাপী এ দেশে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের ভূত তাড়ানোর ভড়ং করছে। জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের অভয়ারণ্য বলে বাংলাদেশের মানুষকে ও বাংলাদেশকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। দুর্ভাগ্য যে, আমাদের বামপন্থী ও সেকুলারদের একটি বিরাট অংশের এজেন্ডা ও ভারতীয় সরকারের এজেন্ডা এক হয়ে গেছে। পশ্চিমা দেশগুলো যখন বিশ্বজুড়ে দারোগাগিরি করে, তখন অসহ্য লাগে। তার পরও কথা থাকে, এটা তাদের বিদেশনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার নষ্ট ভাবনা। এরা নিজ দেশের মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে। নিজ জনগণের সামনে এরা কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা উপস্থাপন করেছে। সভ্যতা ও উন্নত জীবনের ছোঁয়া ও নিরাপত্তা দিয়েছে। ভারত এ ক্ষেত্রে কোন স্তরে রয়েছে তারা তা ভাবে না; ভারতের মানুষের জীবনযাপনের গ্লানি, সন্ত্রাস, হিংসা, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার অভয়ারণ্যের নজির, ুধা, দারিদ্র্য-শ্রেণিবৈষম্য ও বর্ণবাদের দগদগে ক্ষত কিভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। এক সাচার কমিটির রিপোর্ট ও বাবরি মসজিদ-সংক্রান্ত রায় বলে দেয় ভারতের সংখ্যালঘুরা কিভাবে আছেন। 
নিউ ইয়র্ক টাইমস মনে করে, মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অবরোধসহ নানাবিধ চাপের মুখে পড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, মানবাধিকারকর্মীদের হয়রানি বন্ধ করা এবং আগামী নির্বাচনের আগে গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উপায় খোঁজার জন্য বিরোধী দলগুলোকে সাথে নিয়ে কাজ করা। ব্যতিক্রম ছাড়া ভারতীয় কোনো মিডিয়ায় এ ধরনের দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 
লন্ডনের প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণে গত সপ্তাহে বাংলাদেশী পলিটিকস : ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অনেকটা পড়ে গেছে। অথচ ভারতীয় মিডিয়া বলছে, শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। 
ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে সরকার সাংবিধানিক। কিন্তু জনপ্রিয়তা খুবই কম। জনমত জরিপ বলে যে, এ দেশের পাঁচ ভাগের মধ্যে চার ভাগই নির্দলীয় নিরপে সরকারের প।ে 
অবশ্য ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকার ‘ক্রিপলিং ডেডলক’ শিরোনামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে স্বীকার করা হয়েছে, দেশটিতে চলমান সঙ্কটের সূচনা হয় ২০১১ সালে। ওই সময় শেখ হাসিনা সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ বাতিল করে দেয়। 
পত্রিকাটির দায়িত্বশীল মন্তব্য হচ্ছে, বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে প্রধান দুই জোটকেই এগিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের আর কোনো উপায় নেই। বিএনপির নির্বাচন বয়কটের হুমকি বা আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতি কোনোটাই সমস্যার সমাধান করবে না। অন্য দিকে হাসিনা সরকারের প্রতি নয়াদিল্লি সরকারের সহানুভূতি থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো দলের প্রতি সরাসরি সমর্থন দেয়া ভারতের উচিত হবে না। এটা সত্য যে, শেখ হাসিনা ভারতের একজন ভালো বন্ধু। কিন্তু নয়াদিল্লিকে এটা মনে রাখতে হবে, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ও সীমান্ত বিরোধসহ অনেক বিষয় এখনো দুই দেশের মধ্যে অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের মানুষ পানি সমস্যায় আজ দিশেহারা। সীমান্ত হত্যায় ুব্ধ। একতরফা সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার কারণে ভারত সরকারের ওপর রুষ্ট। ভারতের প্রভাবশালী টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের বাংলা দৈনিক এই সময়-এ গণতন্ত্রের ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা শিরোনামে সম্পাদকীয়টিও অংশত বস্তুনিষ্ঠ। অপর ভারতীয় সাংবাদিক সুনন্দ কে দত্তের লেখাটিও ভিন্ন মতসহ গ্রহণযোগ্য। 
পঙ্কজ শরণ, সুবীর ভৌমিক কিংবা শেখর গুপ্তকে এতটুকু দায়িত্ববান হিসেবেও আমরা দেখতে পাই না। এর প্রধান কারণ তাদের সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি। এরা নেহরু ও গুজরাল ডকট্রিন থেকে বের হয়ে প্রতিবেশী সার্বভৌম দেশগুলোর অস্তিত্ব স্বীকার করতে চান না, এরা ভাবেন প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সিকিম ধরনের আচরণ করাই ভারতের স্বার্থরক্ষার একমাত্র উপায়। অথচ এই আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী নীতি অনুসরণ করতে গিয়েই নেপালে মাওবাদীদের উত্থান ও ভারতবিদ্বেষ জন্ম নিয়েছে। শ্রীলঙ্কাকে তামিল ইস্যু দিয়ে অস্থির ও অস্থিতিশীল করে রাখার জবরদস্তির কারণেই শ্রীলঙ্কার জনগণ বিগড়ে আছে। মালদ্বীপে ভারতপন্থী নাশিদকে অপছন্দ করার কারণও ভারতীয় বাড়াবাড়ি। অপর প্রতিবেশী পাকিস্তান ভারতের আজন্ম প্রতিপক্ষ। অবশ্য এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। আরেক প্রতিবেশী গণচীনকে ভারত প্রতিপক্ষে রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে। হালে মিয়ানমারে ভারত সমতার ভিত্তিতে লেনদেনের প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে। বিলম্বিত এই বোধোদয় অবশ্যই ইতিবাচক। আমরা ভুলে যাইনি ভারত আমাদের পার্বত্য ইস্যু কিভাবে উসকে দিয়েছে। শান্তিবাহিনীকে দিয়ে আমাদের সার্বভৌমত্ব চ্যালেঞ্জ করিয়েছে। তার পরও ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম। একাত্তরে সাহায্য করে তারা লাভবান হলেও আমরা অকৃতজ্ঞ হতে পারি না। কিন্তু বড় দাদার আসনে বসে দায়হীন কুর্নিশ আশা করলে বাংলাদেশকে তারা কোনো দিন সাথে পাবে না। জনগণের মন জয় না করে একটি অনুগত ও দালাল সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা দিলে সাত বোনের সাথে বাংলাদেশের মতো জনপদের শান্তিপ্রিয় প্রতিবাদী মানুষের স্বাধীনতার অহম অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়াবে। 
পঙ্কজ শরণকে বলব, বাংলাদেশের মানুষের মন ও আত্মা বোঝার চেষ্টা করুন। বাংলাদেশকে পূর্বাঞ্চলের আরেক পাকিস্তান ভাবলে ভারত শুধু ভুলই করবে না, ১৬ কোটি মানুষের রুদ্ররোষ প্রত্যক্ষ করবে। এরশাদ ও শেখ হাসিনা অবশ্যই বাংলাদেশের মানুষ, তাদের পাশে ভারত যতটা শক্ত অবস্থান নেবে জনগণের সন্দেহপ্রবণ মনে ভারতবিদ্বেষের বীজ আরো গভীরে প্রোথিত করে দেবেÑ যা আমরা চাই না। আমরা ভারতবিদ্বেষের সস্তা রাজনীতি সমর্থন করি না, বিশ্বাসও করি না। আমরা বিশ্বাস করি নীতি ও বন্ধু পাল্টানো যায়, প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। বাংলাদেশের জনগণ কোনো আধিপত্যবাদী সরকারকে নয়, ভারতের জনগণকে বন্ধু ভাবে। তা ছাড়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই। তাই কৃতজ্ঞ বন্ধুর কোনো যুদ্ধবিলাস নেই। ভারতেরও থাকা উচিত নয়। 
একটি অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য তফসিল ঘোষণা করে সিইসি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। বিতর্কিত সরকার ভাবছে এ যুদ্ধে তারা জিতে যাবে। ইতিহাস তা বলে না। বাংলাদেশের জনগণকে চিনতে ভারত যেমন ভুল করছে; এই সরকার এবং তাদের সাজানো নির্বাচন কমিশনও ভুল করল। এই ভুলের মাশুল গুনতে হবে দীর্ঘ দিন। ভারতীয় পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে জয় বলেছেন, ক্ষমতার যেতে হবে তাদের লাশের ওপর দিয়ে। অংশত সত্য, লাশের ওপর দাঁড়িয়েও সরকার শেষ রক্ষা করতে পারবে না। ইতিহাস এ মন্তব্যের 
পক্ষে।


0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ভেলকি দেখালেই সঙ্কট কাটবে না

ছোটবেলায় গ্রামে দেখতাম, একদল লোক বানর দিয়ে হাসি কৌতুকের খেলা দেখিয়ে মানুষকে বেশ হাসাত এবং বিনিময় কিছু পয়সা কামাই করত জীবিকা নির্বাহের জন্য। তারা ডুগডুগি বাজিয়ে বানরকে দিয়ে নানা কসরত করত এবং মুখে গানের সুরে বলত ‘লাগ লাগ লাগ ভেলকি লাগ’ মানুষ সেসব তামাশা দেখে প্রচুর আনন্দ পেত এবং খুশি হয়ে বানরের হাতে টাকা-পয়সা তুলে দিত। সাময়িকভাবে নিরান্দ মানুষগুলো কিছু আনন্দ পেত, মন্দ কী? পেটে ভাত না থাকলে কী? তারা গ্রাম্য পরিবেশের উপযোগী হালকা ধরনের জাদুও দেখাত। হাতের কারসাজিতে এক টাকাকে ৫০, ১০০ টাকা বানিয়ে দেখাত। এতে গরিব মানুষগুলো প্রলুব্ধ হতো এই টাকা তারাও যদি বানাতে পারতেন! কিন্তু তা হওয়ার নয়।
এ ভেলকিবাজির খেলা অতি পুরনো। পাঠক জানেন, রোম শহর পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে, শত্রুরা আক্রমণ করে দেশ দখল করে নিচ্ছে আর তখন রোমের সম্রাট নিরো সমুদ্র তীরে বসে মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছেন। জনগণ ও প্রজারা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তাতে ভ্রƒক্ষেপ নেই। তার মন যা চায় তাই তিনি করবেন, তাতে প্রজাদের এত মাথাব্যথা কেন? তিনি প্রজাদের ভেলকিবাজি দেখাতেই পারেন। বাংলাদেশ চরম নৈরাজ্যের মধ্যে চলছে। মানুষ গুম, খুন, জ্বালাও-পোড়াও, গ্রেফতার, নির্যাতন, হামলা ইত্যাদিতে অতিষ্ঠ। জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। কারণ শুধু একটাইÑ ‘বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার।’ ক্ষমতা সাধারণ নিয়মে ভোটের মাধ্যমে অর্জন করা যাবে কি না, সে সন্দেহ থেকে চলমান রাজনৈতিক লড়াই।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে কিভাবে ক্ষমতায় আসে, তা সবার জানা। মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনরা যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন শেখ হাসিনা গর্বের সাথে বলেছিলেন, এই সরকার হলো আমাদের আন্দোলনের ফসল। আর তিনি ঘোষণা করলেন, ক্ষমতায় গেলে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের বৈধ-অবৈধ সব কর্ম সংসদে পাস করে নেবেন। সংসদে ব্রুট মেজরিটি সদস্যের বলে তা করিয়ে নেয়া হলো।
বিগত পাঁচ বছরে সরকার দেশের এমন কোনো যুগান্তকর ভালো কাজ করেনি যাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ভোট দিয়ে ক্ষমতাসীনদেরই বিজয়ী করবে। দলের কর্মীরা, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ দেশটাকে যেভাবে লুটপাটে করে খেয়েছে, তাতে ভোটের আশায় গুড়েবালি। তাই উপায়? ১৯৯৬ সালে খলেদা জিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে চরম আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করা হলো। পরিস্থিতি যে পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, তাতে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারই বাংলাদেশের জন্য উত্তম পদ্ধতি ছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১-এ দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। দেশে বিদেশে তার ভূয়সী প্রশংসাও করা হয়েছে। কিন্তু এই সরকারের কর্মকাণ্ডে দেশ যেমন সঙ্কট পড়েছে, তেমনি বিদেশী মুরব্বিদের আদেশ-নির্দেশ মোতাবেক দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে করিডোর, ট্রানজিট, শুল্কবিহীন মালামাল আমদানি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রভৃতি পাকাপোক্ত করা হয়েছে। মহাজোট বুঝতে পারছে তার পায়ের তলায় মাটি নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন হলে ভরাডুবি হবে। তাই ফন্দি এঁটে কাউকে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানের ওপর মামলা ঠুকে হাইকোর্ট থেকে বিতর্কিত রায় নিয়ে নেয়া হলো। ব্রুট মেজরিটি সদস্যের ভোটে সংসদে এক কথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সে বিতর্কিত রায়েও কিন্তু পরবর্তী দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়ার নির্দেশ ছিল। কিন্তু তা মানলে তো গদি থাকবে না। তারা নিজেদের সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে ১৯৭৩ সালের ইলেকশনের মতো ‘ম্যানেজ’ করে ক্ষমতা ধরে রাখতে চান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার প্রথম ভেলকিবাজি হলো আপনি ঘোষণা করেছেন আপনি প্রধানমন্ত্রীর পদ চান না। তবে আপনি চানটা কী? বিরোধী দলের দাবি তো একটাইÑ আপনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। কেন আপনি সেটা মানছেন না? আপনি পদত্যাগ করলে দেশ এক মুহূর্তে শান্ত হয়ে যাবে। কোনো হরতাল, আগুন, বোমাবাজি থাকবে না। কিন্তু আপনার মুখের কথামতো কাজ করছেন না বলেই তো দেশে এই নৈরাজ্য।
দ্বিতীয় ভেলকিবাজি হলো, মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগপত্র নিয়েছেন। অথচ তারা মন্ত্রীর পদে বহাল তবিয়তে। বিশ্বে এমন কোনো নজির আছে? সর্বদলীয় সরকারে বিরোধী দলের সামনে টোপ ফেলছেন? দেশের মানুষ অত বোকা নয়। ইচ্ছামতো সর্বদলীয় সরকার করতে চাইলে যেদিন যে সর্বদলীয় (!) সরকার করবেন সেদিনই মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে পারতেন।
আরেক ভেলকিবাজি হচ্ছে, জনসভায় প্রচুর মানুষ যায়। কেন যায় সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতি সভায় তাদের দুই হাত তুলে আপনার দলকে ভোট দিতে বলেন। এসব সভায় কিছু লোক যায় এনামের বিনিময়, কিছু যায় হুজুগে। হাত তোলাওয়ালারা সবাই আপনার দলকে ভোট দেবে? সরকার পক্ষের পত্রিকার জরিপেও মহাজোট সরকার ভোট পেতে পারে শতকরা ২৮ ভাগ আর ১৮ দল নাকি পেতে পারে শতকরা ৬৭ ভাগ। এসবি, এনএসআই, ডিবি তাদের প্রতিবেদনে কী বলে?
এ দেশের শতকরা ৯০ ভাগ ঈমানদার মুসলমান। তারা স্বাধীনতার সময় আল্লার নাম নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। তারা ঈমান আমলে মুসলমানই থাকতে চান। কিন্তু ১৯৭২ সালে যে শাসনতন্ত্র তৈরি করা হয়েছিল তা কি এ দেশের মানুষের মনোভাব ও ইচ্ছাকে সম্মান দেখিয়ে করা হয়েছিল? আপনার দল মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, শাসনতন্ত্রে ঢুকিয়েছেন; তার সাথে এ দেশের মানুষের ঈমান আকিদার কোনো সম্পর্ক আছে? আপনি আরেক ভেলকিবাজি দেখালেন পঞ্চম সংশোধনীর বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, এক আল্লায় বিশ্বাস এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এক ধাক্কায় ফেলে দিয়ে পুনরায় সমাজতন্ত্র তথা রাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সংবিধান ঢুকালেন। কাদের স্বার্থে তা করছেন, মানুষ বোঝে। প্রথম সংবিধান তৈরি করেছে আপনার দল ভারত ও রাশিয়ার নির্দেশে। তাতে জনগণের সমর্থন ছিল না। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, গণমানুষের মনোভাব বোঝার জন্য রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, ছাত্র-যুবক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সুশীলসমাজ ও গণমাধ্যমের মতামত নিয়েই সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এনেছিলেন। দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপন করে রেফারেন্ডাম দিন, দেখেন তারা কী মত দেন।
ভেলকিবাজির তো শেষ নেই। জনসভায় নেতানেত্রীরা বলে বেড়ান অমুক নেত্রী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, কুরআন শরিফ পড়েন। কিন্তু ইসলাম ধর্মের অবমাননামূলক নানা পদক্ষেপ কেন? শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে ইসলাম ধর্মকে অনেকটাই সরিয়ে দেয়ার মতো কাজ হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে চরিত্রবান করে। তারা দেশের সুনাগরিক হয়ে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতির সেবায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। শিক্ষার সাথে নৈতিকতার সংযোগ না হলে ভালো মানুষ হওয়া যায় না। আর ভালো মানুষ না হলে তারা ছাত্রলীগ, যুবলীগ মার্কা লোক হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে কিন্তু তাতে বেহায়াপনা ও উলঙ্গপনা থাকবে না। মাদরাসা শিক্ষার মধ্যে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ আবিষ্কার করে বেড়াচ্ছেন কোন উদ্দেশ্যে। সরকার সন্ত্রাসের অজুহাতে ঢোল পিটিয়ে যেভাবে সারাবিশ্বে নাড়া দিচ্ছে, তাতে কিছু উগ্র লোক সন্ত্রাসের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। সরকার দেশের প্রশাসন, আইন বিভাগ দলীয়করণ করে ফেলেছে ও মেধাহীন করছে, তাতে দেশের দফারফা হওয়ার জোগাড়। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীকে পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করছে। একদিন এদের দ্বারা নিজেদেরও হেনস্তা হতে হবে। সমস্যা হলো রাজনীতিবিদেরা এই মোক্ষম কথাটাই বুঝতে চান না।
অহঙ্কার ছেড়ে দিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নিন। ভেবে দেখেছেন, সংবিধানটির খোলনলচে কিভাবে পাল্টিয়েছেন? তখন কি মনে হয়নি সংবিধান যখন তখন পরিবর্তন করা ঠিক নয়। পশ্চিমা দেশের কথা প্রায়ই বলে থাকেন। সেখানে চলতি সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। অথচ সেসব দেশে গণতন্ত্র স্থায়ী হতে কারো ২০০ বছর পর্যন্ত পার হয়েছে। সেসব দেশে সরকার ও বিরোধী দলে এরকম চুল ছেঁড়াছিঁড়ি আছে কি?

মঙ্গলবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

জনগণ তো প্রস্তুতই ছিলো

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 
 গত রোববার এক মুদি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দোকান মালিক কারও সঙ্গে মোবাইলে কথা বলছিলেন। কর্মচারী আমার চাহিদার জিনিসপত্র বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। দোকান মালিককে সম্ভবত ফোনের ও প্রান্ত থেকে কেউ বলছিলেন যে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে তো বিএনপি হরতাল ডাকবে। তাহলে পাইকারি পণ্য পৌঁছাবেন কীভাবে? দোকান মালিক তাকে বিরক্ত হয়ে বলছিলেন, ‘আরে রাখ তোর বিএনপি, বিএনপি’র হরতালে কিছু হয় না। মাল তুই রেডি রাখ। আমি গিয়ে নিয়ে আসব। আর বিএনপি হরতাল করতেও পারবে না। বিএনপি করবে হরতাল!’
এ উক্তি শুনে আমি খানিকটা থতমতো খেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিলো, এ যেনো ১৮ দলের প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের অনাস্থা। তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে অবিশ্বাসও বটে। সংশয় যে আমার মনেও ছিলো না, এমন নয়। মনে হচ্ছিলো কোথায় যেনো কিছু একটার ঘাটতি আছে। আমি রাজনীতিবিদ নই। রাজনীতির নিপুণ কলাকৌশল আমার জানা নেই। এই তফসিল ঘোষণার আগেই দেশজুড়ে একটা থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিলো। এর মধ্যে সরকারের লোকেরা দু’টো নাটক করে বসলো। তার একটি হলো মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মধ্যে সংলাপের নাটক। মিডিয়ায় সরকার অত্যন্ত শক্তিশালী। তা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াই বলি, আর প্রিন্ট মিডিয়াই বলি। দেশের একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র এমন ভাষায় রিপোর্ট করল যে, তাদের দু’জন রিপোর্টারের একজন সৈয়দ আশরাফের ঘাড়ের উপর বসে ছিলেন। আর একজন ছিলেন মির্জা ফখরুলের ঘাড়ে। আর গ্রীনিচ মান অনুযায়ী নির্ধারিত সঠিক সময়ের ঘড়ি ছিলো তাদের হাতে। তাতে লেখা হয়েছে, মির্জা ফখরুল বারবার গাড়ী বদলিয়ে অলি-গলি ঘুরে বৈঠক স্থলে হাজির হন। সৈয়দ আশরাফও তাই। একেবারে সাতটা সাত মিনিট। আলোচনা শেষে তারা একইভাবে অলি-গলি পেরিয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু ঐ দুই রিপোর্টার তাদের কাউকেই ধরতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করতে পারলেন না, আপনাদের মধ্যে কী আলোচনা হলো।
আমার এই ৪২ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে সাংবাদিকতার নামে এমন ছোটগল্পের অবতারণা আমি খুব কমই দেখেছি। এর আগে এটা শুধু দেখেছি দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায়। সেখানকার এক রিপোর্টার রিপোর্টের নামে এরকম ছোটগল্প রচনায় অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত ছিলেন। আমি তাকে চিনতাম না। এখনও চিনি না। কিন্তু তাকে এক নজর দেখে জীবন ধন্য করতে চেয়েছিলোম। সেটি আর হয়ে ওঠেনি। তারপর এই রিপোর্টটি পড়লাম। সরকারপন্থী সকল সংবাদপত্র একেবারে ভোমা লীড করে বসলো। আশরাফ-ফখরুল বৈঠক। সরকারের স্তাবক টকশোওয়ালারা রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিলেন, বরফ গলছে। যদিও মির্জা ফখরুল ইসলাম রাতেই জানালেন যে, সৈয়দ আশরাফের সাথে তার এ ধরনের বৈঠক হয়নি। এটা গুজব এবং চলমান আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করাই এই গুজবের উদ্দেশ্য। সৈয়দ আশরাফও দাবি করলেন না যে, তার সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইলসামের কোনরূপ বৈঠক হয়েছে। তারপরও প্রিণ্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ধুমধাড়াক্কা চলতেই থাকলো।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটলো জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর অহমদকে নিয়ে। এরশাদ যখন সকাল-বিকাল ভোল পাল্টিয়ে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন, তখন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন কাজী জাফর আহমদ। কারণ তার আগে এরশাদ বারবার বলেছেন যে, বিএনপি নির্বাচনে না গেলে তারাও যাবেন না। এটাই তার শেষ কথা। কিন্তু এরশাদের জীবনের শেষ কথা বলে কেউ কোনদিন কিছু দেখেনি। তিনি সকালে যে কথা বলেন, দুই-এক ঘণ্টার ব্যবধানে তার একেবারে উল্টো কথা বলতে কখনও কসুর করেন না। তিনি বলেছিলেন, বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচনে গেলে লোকে তার মুখে থুতু দেবে। তার চেয়ে বরং জেলে পচে মরাও ভালো। কিন্তু মাত্র একদিনের ব্যবধানে তিনি বলে বসলেন, তিনি নির্বাচনে যাবেন। কারণ, তা নাহলে দেশের মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে।
এই খবরে কাজী জাফর আহমদ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবং তিনি ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। পরদিন সেখান থেকে এক বিবৃতিতে তিনি এরশাদের এই সিদ্ধান্তকে হঠকারি বলে ঘোষণা করেন এবং জাতীয় পার্টির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীকে এই নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ফেরার পর বাকী কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। এ খবরে বেশ বিচলিত হয়ে পড়ে সরকার। তারপর কোথা থেকে মিডিয়ায় এক বিবৃতি আসে যে, কাজী জাফর আহমদ ঐ বিবৃতি তো দেনইনি বরং এরকম বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ায় তিনি এরশাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এরশাদ বলেছেন, কাজী জাফর এরকম বিবৃতি দিতেই পারেন না। কারণ তিনি তার ফ্যামিলি মেম্বার। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালে কাজী জাফর আহমদ ও তার ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, তিনি আগের বিবৃতি প্রত্যাহারের কোন ঘোষণা দেননি। এবং তার পূর্ববর্তী মনোভাবই বহাল রয়েছে। এসব ধূ¤্রজাল সৃষ্টি করে সরকার জনগণের ভিতরে যে তাতানো ভাব বিরাজ করছে তা খানিকটা স্তিমিত করে দিতে চেয়েছিলো। জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিলো। তাদের সে চেষ্টা সফল হয়নি।
কিন্তু আমার বরাবর মনে হয়েছে যে, শুধু ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মী নয় এই সরকারের অপশাসন, দুঃশাসন, নিপীড়ন, লুণ্ঠনের প্রতিবাদে গোটা দেশের মানুষই এখন মুখর। গত এক বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন আন্দোলন, হরতাল, ধর্মঘট, প্রতিরোধের মাধ্যমে জনগণ তার প্রমাণ রেখেছে। এর আগে ১৮ দলীয় জোট যখন পরপর দু’বার ৬০ ঘণ্টা এবং তারপর ৮৪ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিলো, তখন দেখা গেলো সারাদেশের মানুষ যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে এই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রাস্তায় নেমে এসেছে। তখনই মনে হয়েছিলো, এখন গোটা দেশের জনগণ একদিকে আর সরকার তাদের প্রতিপক্ষে।
কিন্তু নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগের দুইদিন সারাদেশে একটি থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিলো। ১৮ দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, যেই মুহূর্তে একদলীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে, সেই মুহূর্ত থেকেই দেশ অচল করে দেয়া হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাথানত শেখ রকিবউদ্দীন আহমদ সোমবার দুপুরেই ঘোষণা করেছিলেন যে, রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার সময় তিনি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন। কার্যত তখনই তিনি মিডিয়াকে জানিয়ে দেন যে, কবে, কোন তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, মনোনয়ন পত্র জমা দেয়া হবে, বাছাই করা হবে ইত্যাদি। এরপর থেকেই টেলিভিশনগুলোর স্ক্রলে নির্বাচনী সিডিউল প্রচার করা শুরু হয়। তখনো থমথমেই ছিলো গোটা পরিস্থিতি। বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীরা কারাগারে। জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীরা কারাগারে। সর্বশেষ সোমবার আটক হয়েছেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ.স.ম হান্নান শাহ। বাইরে আছেন আর দুই-একজন মাত্র। একদিকে সরকার আলোচনার ডাক দেয়, অপরদিকে বিএনপি’র নেতাদের একের পর এক কারাবন্দী করতে থাকে।
ফলে এটি যে নিছকই সরকারের শঠতা সেটা বুঝতে আর কারও বাকী থাকে না। সরকার স্পষ্টতই বুঝে গিয়েছিলো যে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট যদি নির্বাচনে আসে, তবে তাদের ভরাডুবি সুনিশ্চিত। সেকারণে যেভাবেই হোক তাদের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। ১৮ দলীয় জোটের দাবি একটিই ছিলো। আর তা হলো নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত তারা বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করুক, তারপর আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হবে কোন নিরপেক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যায়। উল্লেখ্য, এর আগে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক ভাষণে বলেছিলেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না, জনগনের ভালো চান। তাহলে পদত্যাগ করে দেখাতেন, তিনি যা বলেন তা তিনি বাস্তবিকই করার জন্যই বলেন। একথা শুনে শেখ হাসিনা বরং প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতা তার নিজের হাতেই তুলে নিলেন। মন্ত্রীরা বলতে গেলে এখন এক একজন ঠুঁটো জগন্নাথ। নিজ মন্ত্রণালয়ের একজন পিয়নকেও বদলি করার বা শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। ফলে জো হুকুম, জো হুজুর বলা ছাড়া এদের আর কোন কাজ নেই। এ অবস্থায় বিরোধী দলের নির্বাচনে যাওয়া আত্মহননেরই শামিল। সুতরাং সঙ্গত কারণেই বিরোধী দল নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
যে কথা বলছিলাম। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে প্রায় দু’দিন সারাদেশে একটা থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। কী হবে? কী ঘটবে? বেগম খালেদা জিয়া কাকে নিয়ে রাজনীতি করবেন। প্রায় সব নেতা জেলে। কেউ কেউ আত্মগোপনে। তবে কি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন বাংলাদেশে চিরস্থায়ী হয়ে রইবে? কিন্তু পরিস্থিতি আদপেই সেরকম ছিলো না। জনগণ প্রস্তুতই ছিলো। যে শেখ রকিবউদ্দীন এতোদিন বড়াই করছিলেন যে, নির্বাচনে কিছুতেই সেনা মোতায়েন করা হবে না। সেখানে তিনি নির্বাচনী কর্মকর্তাদের এই বলে সাহস জোগালেন যে, ভিডিপি আনছার পুলিশ বিজিবি তো নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়োজিত থাকবেই, সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হবে। কাজী রকিব ভাবখানা এমন করলেন যে, আশরাফ-ফখরুল আলোচনা শুরু হয়ে গেছে একটা সমঝোতা হবেই। তখন তিনি বলেছিলেন, ২৪শে জানুয়ারির পরও নির্বাচন করা যাবে। তারপর তিনি হুট করেই বললেন, ঢের অপেক্ষা করেছেন আর বিলম্ব করা সম্ভব নয়। এখানেও অস্পষ্ট রইলো না যে, কোন এক অদৃশ্য শক্তির হাতে ক্রীড়নক মাত্র তিনি। অতএব তফসিল ঘোষণা করে দিলেন।
নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট পরে, ভাষণের দু’টি প্যারাগ্রাফ দু’বার করে পড়ে শিডিউল ঘোষণা করলেন তিনি। নির্বাচনী শিডিউল ঘোষণার পর ১৮ দলের তরফ থেকে ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা করতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গিয়েছিলো। কিন্তু সারাদেশে জনগণ সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করেনি। রকিবের ঘোষণা শোনা মাত্রই সারাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। এবং ঘণ্টাখানেকের ভেতরই সারাদেশ অচল করে দিলো। বিচ্ছিন্ন করে দেয় রাজধানী ঢাকা থেকে। এরপর আসে অবরোধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
আমরা জানি যে, শেখ হাসিনার সরকার জনগণের কোনো তোয়াক্কাই করে না। জনমতেরও কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই। শুধুমাত্র পেশী শক্তির জোরে তারা ক্ষমতায় আসীন হতে চায়। আমরা একথা বারবার বলেছি যে, শুধু পেশী শক্তি দিয়ে জনগণকে রুখে দেয়া যায় না। বরং জনগণই দেশে দেশে, যুগে যুগে সমস্ত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসকের পরাভূত করে ইতিহাসে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। বাংলাদেশেও সেরকম উদাহরণ বিরল নয়। শেখ মুজিব গেছেন, ৭ই নভেম্বর ১৯৭৫ জনগণ বিপ্লব সাধন করেছে। স্বৈরাচারী এরশাদকে হটিয়েছে। এ সরকারও জনগণের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, তাতে পরাভূত হতে বাধ্য। জনতার জয় হবেই, ইনশাআল্লাহ!
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

তফসিল সংকটকে আরো জটিল করেছে


নির্বাচন কমিশন দশম জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণা করবে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। তারিখ হিসেবে গত ২৪ ও ২৫ নবেম্বরের কথা শুনিয়েছিলেন একজন নির্বাচন কমিশনার। শোনার পর থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্তও হতে শুরু করেছিল। ১৮ দলীয় জোট আগেই জানিয়ে রেখেছিল, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তফসিল ঘোষণা করা হলে সেদিন থেকেই হরতাল অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশকে অচল করে ফেলা হবে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ৬০ ঘণ্টার দুটি এবং ৮৪ ঘণ্টার একটি সফল হরতালের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জনমনেও এ বিশ্বাস জন্মেছিল যে, সরকার যতো দমন-নির্যাতনই চালাক না কেন, বেগম খালেদা জিয়া আহবান জানালে এবার সাধারণ মানুষও দলে দলে রাজপথে নেমে আসবে। তেমন অবস্থায় সত্যিই অচল হয়ে পড়বে দেশ। অন্যদিকে গণতন্ত্রের জন্য তো বটেই, দেশ ও জাতির জন্যও যে এমন কোনো পরিস্থিতি কাম্য হতে পারে না, সে কথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। কথাটা নির্বাচন কমিশনও বুঝেছিল বলেই মনে করা হচ্ছিল। কারণ, দুদিন আগে রোববারই প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, কমিশনের দিক থেকে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হলেও তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা চান, সব দলের অংশগ্রহণের ফলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠুক। কোনো দলের নাম উলেখ না করলেও মূলকথায় সিইসি আসলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতিই ইঙ্গিত করেছিলেন। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে চেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং সে চেষ্টা সফল হওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সে সম্পর্কেও ইশারায় জানিয়েছিলেন সিইসি। ফলে জনমনে এমন আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল যে, কমিশন অন্তত সরকার ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এবং বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়ার আগে তফসিল ঘোষণা করবে না।
অন্যদিকে মাত্র একদিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পাল্টে ইউটার্ন নিয়েছেন সিইসি। সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া এক আকস্মিক ভাষণে তিনি ৫ জানুয়ারি ভোটগ্রহণসহ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন। বিএনপি ও জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার এবং সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আগেই হঠাৎ করে তফসিল ঘোষিত হওয়ায় ১৮ দলীয় জোট তো বটেই, নাগরিক সমাজসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুুযায়ী ১৮ দলীয় জোট মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত সারাদেশে সড়ক, নৌপথ ও রেলপথ অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ভাংচুর ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ শুরু হয়েছে সিইসির ভাষণ শেষ হতে না হতেই। দেশের বহুস্থানে রেললাইন পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়েছে। দেশকে অচল করে দেয়ার যে ঘোাষণা ১৮ দলীয় জোট দিয়েছিল বাস্তবে সেটাই সত্যে পরিণত হতে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠবে এবং তেমন পরিস্থিতিতে কমিশনের পক্ষে আদৌ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হবে কি না, এমন প্রশ্ন উঠেছে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। বলা হচ্ছে, সিইসির এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সে মন্তব্যই সত্য প্রমাণিত হয়েছেÑ যার মুলকথায় বিরোধী দলের নেত্রী বলেছিলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন ‘অথর্ব’ ও ‘মেরুদ-হীন’। এবার দেখা গেলো, ‘অথর্ব’ ও ‘মেরুদ-হীন’ তো বটেই, কমিশন সরকারের অতি যোগ্য বশংবদের ভূমিকাও পালন করতে উঠেঁপড়ে নেমেছেÑ যেন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনার সব কর্তব্য কমিশনের ওপরই চেপে বসেছে! যেন জনগণের অধিকার ও আকাংক্ষা, রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি এবং গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটানোর ব্যাপারে কোনো দায়িত্বই নেই কমিশনের! উল্লেখ্য, মূলত এ ধরনের নীতি ও কর্মকা-ের কারণে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজও অনেক আগে থেকে এই কমিশনের বিরুদ্ধে অনাস্থার প্রকাশ ঘটিয়ে এসেছে। বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের অধীনে এমনভাবে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন যাতে তিনি নিজে এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ তার দলীয় প্রার্থীরা পরিপূর্ণ সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন। এ উদ্দেশ্যে প্রশাসনকে ষোলো আনা দলীয়করণ করা হচ্ছে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী তো বেশ কিছুদিন ধরে রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়েই সরকারি খরচে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। কিন্তু ইসিকে কখনো প্রতিবাদ জানাতে বা আইনত কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। কথা শুধু এটুকুই নয়। কর্তব্য যেখানে ছিল নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী আইন লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, নির্বাচন কমিশনাররা সেখানে উল্টো ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছেন। পদ ও ক্ষমতা না ছেড়েই প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে ও প্রচারণাসহ তৎপরতা চালাতে পারেন তার বিধান রেখেও নির্বাচনী আচরণবিধিতে সংশোধনী এনেছে কমিশন। এর ফলে বহুল আলোচিত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডই শুধু নষ্ট হবে না, ক্ষমতাসীনদের জন্য কারচুপি এমনকি ভোট ডাকাতি পর্যন্ত করা আইনসিদ্ধ হয়ে উঠবে। এরই পাশাপাশি বিএনপির আদলে বিএনএফ নামের একটি ভূঁইফোড় দলকে নিবন্ধন দেয়ার ব্যাপারে মাতামাতির মাধ্যমেও কমিশন বর্তমান সরকারের পক্ষেই ভূমিকা পালন করেছে।
অর্থাৎ সব কর্মকা-ের মাধ্যমেই ইসি তার গ্রহণযোগ্যতা খুইয়ে ফেলেছে। এই ইসির অধীনে তাই কোনো সষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় বলেই সকল মহলের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলে আসা হচ্ছিল। অবশেষে তফসিল ঘোষণার মধ্যদিয়ে সে অভিযোগকেই সত্য প্রমাণ করেছেন সিইসি। একই কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জনগণও শুধু নিরাশ হয়নি, ক্ষুব্ধও হয়ে উঠেছে। অথচ সদিচ্ছা থাকলে খুব সহজেই এমন পরিস্থিতি এড়ানো যেতো। সেটাই কমিশনের দায়িত্বও ছিল। সিইসি নিজেও যে রাজনৈতিক সংকটের কথা বলেছেন, সে সংকট কাটিয়ে ওঠা গেলেই সবার আশা পুরণ করে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হতো। সন্দেহ নেই, এজন্য প্রধান দায়িত্ব সরকারের, কিন্তু কমিশনও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারতো। সরকারকে উপর্যুপরি অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি কমিশন বিএনপির সঙ্গেও বৈঠকে বসতে পারতো। অন্যদিকে মাত্র একদিনের ব্যবধানে সম্পূর্ণ ইউটার্ন নেয়ার মাধ্যমে সিইসি প্রমাণ করেছেন, তিনি তৎপরতা চালাচ্ছেন আসলে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা পুরণের জন্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, এভাবে তফসিল ঘোষণার কারণে পরিস্থিতিই কেবল সংঘাতমুখী হয়ে উঠবে না, নির্বাচন অনুষ্ঠানও অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। আর সবকিছুর জন্য দায়ী থাকবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন।
 বিষয়টি নিয়ে এখনো ভাবনার সময় রয়েছে এবং সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ এখনও নাগালের বাইরে চলে যায়নি বলেই আমরা মনে করি। ক্ষমতাসীনদের বশংবদের ভূমিকা পালনের পরিবর্তে কমিশনের উচিত সম্ভাব্য সব পন্থায় সমঝোতার জন্য সচেষ্ট হওয়া। সেজন্য অবশ্যই ঘোষিত তফসিল বাতিল করতে হবে এবং বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের সম্মতি ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা চালানো চলবে না।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বর্তমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের প্রত্যাশা


বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষের সমর্থিত নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের বিপরীতে একটি গ্রহণযোগ্য সব দল ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি আদায়ের আন্দোলনের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়েছে বিএনপির ওপর। এই আন্দোলনই বাংলাদেশের চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন; কিন্তু চলমান আন্দোলনের কৌশল নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ ও ভূমিকা নিয়ে পর্যবেক্ষক, সমালোচক, এমনকি জনগণের মধ্যেও বিশ্বাসের অভাব দেখা দিয়েছে যে, বিএনপি কি আসলেই একটি বৃহত্তর আন্দোলন ও দাবি আদায়ে সক্ষম? আর তার প্রধান কারণ হচ্ছে অনেক দায়িত্বশীল নেতার দায়িত্বহীন ভূমিকা। বিগত হরতাল ও অন্যান্য কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠি, গুলি ও রক্তচুর বিপরীতে তাদের কাপুরুষোচিত পলায়ন। এ কথা সত্য স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জ্যঘন্যতমভাবে গুলি করে আন্দোলনরত নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে এ আন্দোলনকে দমন করে দিতে চায় আওয়ামী লীগ ও তার পুলিশ; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর সমাধান কী ? সমাধান একটাই, তা হচ্ছেÑ ব্যাপক অংশগ্রহণ; আর এটিই হচ্ছে রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব কিভাবে এই আন্দোলনের সমর্থক বেশির ভাগ মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা যায়; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যারা মানুষকে সম্পৃক্ত করবেন তারা নিজেরাই যদি অসম্পৃক্ত হন তাহলে মানুষ সম্পৃক্ত হবে কিভাবে। সুতরাং, তার জন্য প্রয়োজন সাবার আগে দল ও জোটের প্রত্যেক নেতাকর্মীরা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণভিত্তিক সম্পৃক্ততা।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু জাতীয় নির্বাহী কমিটি, ঢাকা মহানগর বিএনপি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, মহিলা দল ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের ভূমিকা নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি প্রায় ৩৯০ সদস্যবিশিষ্ট। সংখ্যার দিক থেকে দেখলে একটি বিশাল মিছিলের মতো মনে হয়; কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ দেখলে সংখ্যা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয়। একই নেতা কেন্দ্রীয়, জেলা ও থানা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কোথাও আন্দোলনে অংশ না নিয়ে চুপচাপ ঘরে বসে আছেন। এদের অনেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের বলেন জেলা, থানায় আছি আর থানা ও জেলার নেতাকর্মীদের বলেন, ‘বুঝিস না কেন্দ্রে দায়িত্বপালন করতে হয়।’ এদের চিহ্নিত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিএনপির বিগত জাতীয় কাউন্সিলে একটি নিয়ম করার কথা ছিলÑ এক ব্যক্তি এক পদ বাস্তবায়ন হলে এসব সুযোগসন্ধানীদের হাত থেকে দল রক্ষা পেত।
জাতীয়তাবদী ছাত্রদলের হাজার হাজার নেতাকর্মী যারা এখনো আন্দোলনের প্রাণ হতে পারেন, কিন্তু বিএনপি ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কৌশলগত ভুলের কারণে যত ভূমিকাই থাকুক ছাত্রদলের ভূমিকা দৃশ্যমান ও প্রশংসনীয় হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তার প্রধান কারণÑ ছাত্র আন্দোলনের প্রাণক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নির্মম ওয়াকওভার দেয়া। যার ফলে তাদের কোনো আন্দোলনই মানুষের কাছে আন্দোলন বলে মনে হচ্ছে না। আর বিএনপির সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে তাদের ধারণা সব আন্দোলন ছাত্রদল করে দেবে আর ওনারা শুধু স্যুট-বুট পরে মন্ত্রিত্বের শপথ গ্রহণ করবেন। তাই যেসব দায়িত্ব ছাত্রদলের নয় সেসব দায়িত্বও ছাত্রদলকে পালন করতে হয়। ফলে ছাত্র আন্দোলন বলতে ছাত্রদলের মধ্যে আর কিছুই নেই।
যুবদল বিএনপির সেই অঙ্গসংগঠন, যা হাতির মতো। হাতির যেমন বিশাল শরীর তেমন তার শক্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো তার চোখ ছোট। হাতি সম্পর্কে একটি কথার কথা আছে, তা হচ্ছে হাতির চোখ ছোট, শরীর বড়; তাই সে তার শরীর দেখতে পায় না। যদি হাতি তার শরীর দেখতে পেত তাহলে হাতি পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীকে তার শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে পায়ের তলায় পিষ্ট করে মারত। হাতির যেমন দুর্ভাগ্য সে তার শরীর দেখতে পায় না আর যুবদলের দুর্ভাগ্য যে, সে তার সংগঠনের শক্তি, ব্যাপ্তি আর পরিধি দেখতে পায় না। যুবদলের উচিত তার চোখ ও মনকে বড় করা। মনের কথাটি এ জন্য বললাম যে, গত চার বছরে তাদের অনেক কাজ ছোট মনের পরিচয় বহন করেছে।
বিএনপির আরেক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল। যদিও একটি সুপ্ত সংগঠনকে জীবন্ত করেছেন বর্তমান নেতৃত্ব। তাদের সততা ও দতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত ইমেজ ও পরিশ্রম সংগঠনকে যে পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারত তা পারেনি। তাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বিশাল বড় কেন্দ্রীয় কমিটিÑ যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো দিন কোনো কর্মসূচিতেই আসেননি, আন্দোলন তো দূরের কথা। এখনো অনেক প্রতিশ্রুতিশীল নেতাকর্মী আছেন যাদের কোনো সাংগঠনিক পদবি ও দায়িত্ব কোনোটাই নেই। জেলায় জেলায় সাংগঠনিক সিদ্ধান্তহীনতায় সংগঠন বিকাশ লাভ করেনি।
আন্দোলন-সংগ্রামে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিক থাকার কথা ছিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের। কিন্তু শ্রমিক দল বলতে বিএনপির কিছুই নেই। একজাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শ্রমিক দলকে ধবংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দিয়েছেন। কোনো শ্রমিক আন্দোলন তো নয়ই, মে দিবস আর কোনো কোনো জাতীয় দিবস ছাড়া শ্রমিক দলের কোনো কর্মসূচি মানুষের চোখে পড়েনি বিগত পাঁচ বছরে। বাংলাদেশের সর্র্ববৃহৎ শ্রমিক সেক্টর গার্র্মেন্টশ্রমিকদের মধ্যে তাদের কোনো সংগঠনই নেই। কী আশ্চর্য আর ভায়াবহ ব্যাপার! যেই আন্দেলনের কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ আলোচিত সেখানে তাদের কোনো ভূমিকাই নেই, সংগঠনও নেই।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দল তার প্রত্যাশিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেনি। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের প্রধান ভূমিকা ছিল আওয়ামী মহিলা লীগ ও আওয়ামী যুবমহিলা লীগের। বর্তমান সময়ে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ভূমিকা ও বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী মহিলা ও যুবমহিলা লীগের ভূমিকা তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে বিএনপি ও মহিলা দলের নেত্রীদের চোখের ছানি দূর হবে এবং পরিষ্কার দেখতে পারবেন।
সারা দেশের নেতাকর্মীদের একটাই প্রশ্নÑ ঢাকা মহানগরীতে আন্দেলন হচ্ছে না কেন? যৌক্তিক কারণেই সেই প্রশ্ন ঢাকা মহানগর বিএনপির সফলতা ও ব্যর্থতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। পুরো সময় কেটেছে কিন্তু তাদের সাঠিক ভূমিকা কখন দেখা যাবে এই অপেক্ষা নিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আজো তা দেখা হয়নি। ঢাকা মহানগর বিএনপি, ৪০টি থানা কমিটি, প্রতিটি ওয়ার্ড কমিটি কার কী ভূমিকা কেউ জানেন না, কেউ প্রশ্নও করেননি। মহানগর বিএনপির কাছে কী জাদুর কাঠি আছে তা দেখার অপেক্ষায় আছে সবাই। কাউকে ছোট করার জন্য নয়, বরং নেতাদের সঠিক ভূমিকায় দেখার জন্যই কথাগুলো বলছি। এখন প্রশ্নÑ এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে সফর হওয়ার উপায় কী?
উপায় একটাইÑ সবার অংশগ্রহণ, কমিটিভুক্ত প্রতিটি নেতাকর্মীকে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে হবে। চেয়ারপারসন ও জাতীয় স্থায়ী কমিটি গুরুত্বপর্ণ সিদ্ধান্ত ও নেতাকর্মীদের ভূমিকা মূল্যায়ন করবে। জাতীয় নির্বাহী কমিটি, ঢাকা মহাগনর বিএনপি, সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতারা আন্দোলনে বাধ্যতামূলক অংশ নেবেন। যদি না করেন জাতীয় স্থায়ী কমিটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যারা আন্দোলনে অংশনেবে না তাদের পদ থেকে অব্যাহতি দেবেন। কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতাদের, অধীনস্থ ইউনিট, থানার কমিটিভুক্ত নেতাদের ভূমিকা মূল্যায়ন করবেন ও ব্যর্থতার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। যেকোনো ব্যবস্থাপনার মধ্যে সফলতা ও ব্যর্থতার জন্য পুরস্কার ও শাস্তিই হচ্ছে একমাত্র উপায়, তা সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য। এই সাধারণ মূল্যায়নটি বিএনপি করতে পারছে না বলেই আন্দোলন সফল হচ্ছে না আর সাধারণ সমর্থক ও জনগণ ইচ্ছা থাকলেও নেতৃত্বের অভাবে এই আন্দোলনে অংশ নিতে পারছেন না।
যদি বিএনপির নেতাকর্মীরা সবাই অংশগ্রহণ করেন তাহলে জনগণও অংশনেবে একটি কার্যকর গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং মানুষ একটি গণতান্ত্রিক সরকার পাবে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণ সম্ভব হবে। 

Ads