সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

শিক্ষার উপর ভ্যাট আরোপ প্রত্যাহার প্রসঙ্গ


গত কয়েকদিন ধরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ছাত্রছাত্রীদের মূসক (মূল্য সংযোজন কর) বিরোধী আন্দোলনে রাজধানীতে বিরাট অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। তাদের মিছিল স্লোগান ও বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধের ফলে সারা মহানগরীর রাস্তাঘাট প্রায় যানবাহনশূন্য হয়ে পড়ে। গণপরিবহন ছিল না বললেই চলে। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, সিএনজির সংখ্যাও স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় এক-চতুর্থাংশে নেমে আসেও বলে মনে হয়। এই আন্দোলনকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আতঙ্ক যেমন কাজ করে তেমনি কেউ কেউ মনে করেছেন যে, এর ফলে প্রতিনিধিত্বহীন বর্তমান গণবিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে নতুন আন্দোলনের একটি প্লাটফরমও সৃষ্টি হচ্ছে। অতি উৎসাহীদের অনেকে বলছেন যে লোহা লাল হয়েছে এখন বাড়ি দেয়ার উপযুক্ত সময়। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস হচ্ছে একটি গণবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী তথা আমাদের ছেলেমেয়েরা মাঠে নেমেছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করে তাদের ক্লাস রুমে ফিরিয়ে নেয়া। সরকার অবশেষে গতকাল শিক্ষার উপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।
সম্প্রতি সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজসমূহের টিউশন ফি-এর উপর সাড়ে সাত শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। একটি জাতীয় দৈনিক হিসাব কষে দেখিয়েছেন যে, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হতো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজে যারা পড়েন তাদের সকলেই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া ধনীর দুলাল নয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসমূহের ব্যর্থতা ও অব্যাহত সেশন জটের প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা আর্থিক সঙ্কট থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে বাধ্য হন। এই অবস্থায় ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর বাবদ নতুন দায় তাদের অবস্থাকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। শিক্ষাবিদদের অনেকেই প্রশ্ন তুলে বলেছেন যে শিক্ষা আদৌ কোনোও পণ্য নয়; ভোগ্য বা শিল্পপণ্য প্রক্রিয়াজাত করার পর তার মানের যে অবস্থান্তরপ্রাপ্তির ঘটনা ঘটে তার অনেকেই মূল্য সংযোজন কর প্রযোজ্য হয়। শিক্ষা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার, পণ্য নয়। শিক্ষার Transition বা অবস্থান্তরপ্রাপ্তিও হয় না। এই অর্থে শিক্ষার উপর (যার সাথে নতুন কোনোও মূল্য সংযোজিত হয়নি) ভ্যাট আরোপ ছিল অযৌক্তিক এবং একটি জুলুম। এখানে টাকার অংকের চাইতে নীতির অংকটা বড়। যে ভ্যাট পণ্য ক্রেতার উপর চাপানো হয়, তা শিক্ষার উপর চাপানো ঠিক নয়। শিক্ষা পণ্য কোনোভাবেই নয়। এর অবসান ঘটায় শিক্ষার মান রক্ষা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিত একটি অদ্ভুত তথ্য দিয়েছিলেন। তার এই তথ্য অর্থনীতির কোনোও থিওরি প্রসূত নয়। তিনি বলেছিলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পকেট খরচ বাবদ দৈনিক এক হাজার টাকা তথা মাসিক ৩০ হাজার টাকা খরচ করে। তিনি তা থেকে মাত্র শতকরা সাড়ে সাত টাকা চেয়েছেন। অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের যুক্তি ও জ্ঞানের গভীরতা নিয়ে আমি কোনোও মন্তব্য করতে চাই না। তিনি একজন প্রবীণ, জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তবে তিনি যে কাজটি করেছেন তা ভালো হয়নি বলেই আমার বিশ্বাস। আমাদের দেশে একটি জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়।
জাতীয় সংসদ প্রতি বছর জুন মাসে তা অনুমোদন করে এবং জুলাই থেকে স্বাভাবিক নিয়মে তা কার্যকর করা হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স ঐ সময়েই নির্ধারিত হয়। এ বছর জুন মাসে অনুমোদিত বাজেটে শিক্ষার উপর ভ্যাট আরোপের কোনো প্রস্তাব ছিল না। তা হলে বাজেট অনুমোদনের তিন মাস পর SRO’র মাধ্যমে শিক্ষার উপর কর আরোপের এই নতুন সিদ্ধান্তটি সরকার কেন নিতে গেলেন? কিছুদিন আগে সরকার সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কোনো কোনো অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এর ফলে সরকারের ২৪,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচের আভাস দিয়েছেন। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে? সম্ভবত সরকার এই অর্থ যোগানের জন্যই বিভিন্ন খাতে করারোপের নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের জাতীয় স্কেল ঘোষণার পর এবং তা বাস্তবায়নের আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এরপর কি হবে তা গভীর বিবেচনার দাবি রাখে। বর্ধিত মুদ্রা সরবরাহ মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে এবং এতে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সরকার এই বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করেন বলে মনে হয়নি। সম্ভবত তাদের বিবেচ্য বিষয় ছিল সরকারি কর্মচারীদের সন্তুষ্ট রাখার মাধ্যমে অনুগত রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করা। এটি একটি কঠিন কাজ বলে মনে হয়। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১৮/২০ লাখ বাদে আর সবাইকে অসন্তুষ্ট রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকা যে সম্ভব নয় ইতিহাসই তার সাক্ষী। আরেকটি কথা না বলে পারছি না। সরকারের দায়িত্বশীল অনেক মন্ত্রী অভিযোগ করছেন যে, ছাত্রদের এই আন্দোলনের জন্য বিএনপি-জামায়াত দায়ী। সরকারের একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। এখানে বিএনপি, জামায়াত অথবা শিবিরের ভূমিকা কোথায়? জামায়াত-শিবির অথবা বিএনপি কি শিক্ষার উপর ভ্যাট আরোপে সরকারকে বাধ্য করেছিল? নিজের অপকর্ম ঢাকার জন্য অন্যদের দোষ দেয়ায় কোনো কল্যাণ নেই। এতে তাদের ইমেজ আরো নষ্ট হয়। কয়েকদিন আগে পুলিশ জামায়াতের দু’জন সাবেক এমপিসহ দলটির ৪১ জন নেতা-কর্মীকে একটি অনুষ্ঠান থেকে নাশকতার অভিযোগে গ্রেফতার করে কাউকে রিমান্ডে দিয়েছেন আবার কাউকে জেলে পাঠিয়েছেন। রাজশাহী থেকে একই ধরনের অভিযোগে ৬ জন বিএনপি নেতা-কর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশবাসী একে একটি অত্যাচার বলে মনে করেন এবং সরকারি ভাষ্যকে মিথ্যাচার বলে অভিহিত করেন। আমার বিশ্বাস সরকার অনেক করেছেন তাদের নিজেদের স্বার্থে আর কিছু না করাই ভাল। শোনা যাচ্ছে, বৈদেশিক চাপ হোক বা অন্য কোনো কারণে কোনো কোনো মহল অগ্রিম নির্বাচনের চিন্তা-ভাবনা করছেন এবং তার আগে দেশকে বিরোধী দলমুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে। হামলা-মামলা জেল-জুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে। এই চেষ্টা যে সফল হয় না তার ভুরি ভুরি নজির আমাদের সামনে আছে। মানুষ যখন ক্ষেপে তখন বৈদেশিক শক্তি পালানোর দিশা পায় না।
পাকিস্তানের দোর্দ-প্রতাপ সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফকে অনেকেই ভুলেননি। তিনি ১৯৯৯ সালে সামরিক বিপ্লবের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে দিয়ে পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। রাজনীতিকদের সীমাহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক সংস্কার ও গুণগত পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার লক্ষ্যে পৌঁছবার কৌশল হিসেবে তিনি বহুল আলোচিত মাইনাস টু থিওরির প্রবর্তন করেন এবং পাকিস্তানের দুটি জনপ্রিয় দল যথাক্রমে নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ ও বেনজির ভুট্টোর পিপলস পার্টির সিনিয়র নেতাদের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে জেল জরিমানা দেন। তিনি বিরোধী রাজনীতিকদের জনগণের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং নওয়াজ শরীফ ও বেনজির ভুট্টোকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে নির্বাসিত জীবন যাপনে বাধ্য করেন। তাদের সাথে তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও নির্বাসনে যান।
দীর্ঘ আট বছর ধরে জনাব মোশাররফ পাকিস্তানে একচ্ছত্র রাজত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য তিনি ‘সন্ত্রাস বিরোধী’ যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বুশের সহযোগী হন। অদৃশ্য লাদেনের খোঁজে বেছে বেছে পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোর উপর বোমা বর্ষণ করে হাজার হাজার মাদরাসা ছাত্র ও শিক্ষক হত্যা করেন। বিচার ব্যবস্থাকে অনুগত রাখার জন্য তিনি বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন, তাদের ভয়-ভীতি ও সন্ত্রাসের মধ্যে নিক্ষেপ করেন। নিজের অনুকূলে বিচারের রায় না যাবার কারণে অথবা না যাবার আশঙ্কায় তিনি প্রধান বিচারপতিসহ বেশ কয়েকজন বিচারপতিকে বরখাস্ত করেন। এর বিরুদ্ধে সারা পাকিস্তান উত্তাল হয়ে ওঠে এবং একটি প্রাদেশিক রাজধানীতে প্রধান বিচারপতির সমর্থনে আয়োজিত একটি সভায় ৪৯ জন লোক নিহত হয়।
সামরিক পোশাক পরে সেনাবাহিনীর পদ ও পদবীকে ব্যবহার করে তিনি একাধিক প্রহসনের নির্বাচনে জয়ী হন, সেনা ছাউনিগুলো তার পক্ষে কাজ করে। যখন তখন তিনি জরুরি আইনের অস্ত্রকে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। দিল্লীর আশীর্বাদ পাবার জন্য তিনি তার দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে (এমনকি কাশ্মীরকে ভারতের হাতে ছেড়ে দিয়ে) ভারতের সাথে শান্তিচুক্তির চেষ্টা করেন, বাস ও ট্রেন সার্ভিস চালু করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন। পরাশক্তিগুলোকে সন্তুষ্ট করার জন্যও তিনি একের পর এক দেশ ও মিল্লাতের স্বার্থের পরিপন্থী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে থাকেন বলে অভিযোগ ওঠে। রাজনীতিকদের  গালি দিয়ে তিনি নিজেই একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই দলে অন্তর্ভুক্ত নেতা-নেত্রীদের সততা ও চারিত্রিক সংহতি সম্পর্কে যদিও তার দেশবাসী সন্ধিহান ছিলেন। জনাব মোশাররফের ক্ষমতা লিপ্সায় তারা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ২০০৭ সালের শেষের দিকে তা চরম আকার ধারণ করে। অবস্থা আঁচ করতে পেরে তিনি অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে বেনজির ভুট্টোর সাথে একটা সমঝোতা করে তাকে দেশে ফেরার সম্মতি দেন এবং পাশাপাশি নিজের ক্ষমতার মসনদও পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করেন। ইতোমধ্যে সউদি আরবে নির্বাসিত আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এবং ফিরেও আসেন। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকেই আরেকটি বিমানে তাকে জনাব মোশাররফ ফেরত পাঠিয়ে দেন। কিছুদিন পর বেনজির দেশে ফেরেন। পাকিস্তান উত্তাল হয়ে উঠে। নওয়াজও ফিরে আসেন। বেনজির সমঝোতা থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন এবং নির্বাচনের আগেই তাকে দুনিয়া থেকে সরে যেতে হয়। তার হত্যার সাথে মোশাররফ জড়িত ছিলেন কি-না একমাত্র আল্লাহতায়ালাই তা জানেন। কিন্তু এত কিছু করেও তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি। মোশাররফ ক্ষমতায় আসেন এবং তাকে বেইজ্জত হয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। আমাদের দেশেও কেউ যদি এই চেষ্টা করেন তার পরিণতিও ভিন্ন হবার কথা নয়। আসলে রাজনীতি একটি কঠিন ব্যাপার। আবার রাজনৈতিক নেতাদের কী কী গুণ থাকা দরকার এ নিয়ে সম্ভবত ঐক্যে পৌঁছা আরো কঠিন ব্যাপার। কেননা এক্ষেত্রে মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই। মহামানবদের জীবনের সফল সবল দিকগুলোই রাজনীতিকদের মধ্যে অনেকে কামনা করেন। অনেকের দৃষ্টিতে রাজনীতিকদের কাজকর্ম কতটুকু জনপ্রিয় হবে, তার চেয়ে কতটুকু স্বীকৃতি পাবে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নেতৃত্বই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা।
নেতার সংজ্ঞা খুবই ছোট, যেমন- One who leads is called a leader. এখানে Leading এর কাজটি অত্যন্ত কঠিন এবং সবাই তা পারেন না। জবরদস্তি কারোর ঘাড়ে নিজের নেতৃত্ব চাপিয়েও দেয়া যায় না। নেতার কাজ নিয়ে অনেক গল্প আছে। নেতৃত্বকে means of direction বলা হয়। ল্যাটিন আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটা গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্পটি আমি আগে একাধিকবার বলেছি। একটি বিশাল দ্বীপকে নিয়ে গল্পটি তৈরি। এই দ্বীপে প্রায় ৫ লাখ লোকের বাস। দ্বীপটির নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রকট। এশবার আকাশ থেকে এতে একজন ফেরেশতা নেমে আসলেন। দ্বীপবাসীরা দেখলো উজ্জ্বল এক আলোকবর্তিকা ধীরে ধীরে আকাশ থেকে নেমে আসছেন। তারা তাকে অনুসরণ করলো এবং একটি কলেজের মাঠে এসে তা থামলো। আলোকবর্তিকাটি একজন ফেরশতার রূপ নিলো। চারদিকে হাজার হাজার মানুষ জমা হয়ে গেল এবং তার সাথে কথা বলতে চাইলো। ফেরেশতা বললেন, তোমাদের এতো লোকের সাথে কথা বলাতো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বরং তোমরা তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে দাও, আমি তাদের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবো এবং তাদের সাথে কথা বলবো। যেমন বলা, তেমন করা। তারা তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচন করলেন। একজন বৃদ্ধ শতায়ু, আরেকজন অত্যাধুনিক ফিটফাট কেতাদুরস্ত এক ব্যক্তি এবং তৃতীয় জন সাদাসিধে এক লোক দেখতে বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেই মনে হয়। ফেরেশতা তাদের আলাদা আলাদাভাবে তার খাস কামরায় ডাকলেন। প্রথমে আসলো বৃদ্ধ ব্যক্তি। ফেরেশতা তার সাথে কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করলেন, এখন থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর তোমাদের এই দ্বীপে জলোচ্ছ্বাস হবে এবং বাড়িঘর, সহায়-সম্পদসহ তোমাদের সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তুমি এখন কি করবে? বৃদ্ধ ব্যক্তি বললেন, ‘আমি জীবনে অনেক পাপ করেছি, এখন বয়স হয়েছে, আর বেশি দিন বাঁচবো না। যে ৪৮ ঘণ্টা সময় পাবো তাকে আমি কাজে লাগাবো এবং খোদার দরবারে কান্নাকাটি করে মাফ চেয়ে নেবো যাতে পরকালে বেহেশতে যেতে পারি। ফেরেশতা তাকে বিদায় দিয়ে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে ডাকলেন এবং একই প্রশ্ন করলেন। তিনি উত্তর দিলেন এবং বললেন, জীবনকে আমি অনেক ভোগ করেছি। যা কিছু অবশিষ্ট আছে খাওয়া-দাওয়া, ফুর্তি করা, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমি তা সেরে নেবো। মৃত্যুর পরে কি পাবো না পাবো তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। ফেরেশতা তাকেও বিদায় করে তৃতীয় ব্যক্তিকে ডেকে একই প্রশ্ন করলেন, ৪৮ ঘণ্টা পর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তোমরা সবাই মরে যাবে, এখন তোমার করণীয় কী? দ্বীপবাসীর এই প্রতিনিধি কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। ৪৮ ঘণ্টাকে মিনিট এবং মিনিটকে সেকেন্ডে রূপান্তর করে বললেন যে, আমার হাতে এখন ১,৭২,৮০০ সেকেন্ড সময় আছে। আমি আমার দ্বীপের পাঁচ লাখ লোককে সংগঠিত করে তাদের দশ লাখ হাতকে কাজে লাগাবো এবং জলোচ্ছ্বাস আসার আগেই দ্বীপের চারদিকে এমন বাঁধ নির্মাণ করবো যাতে জলোচ্ছ্বাসের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে এবং একটি লোকেরও জানমালের কোনও ক্ষতি না হয়। ফেরেশতা তার কথা শুনে অত্যন্ত খুশি হলেন এবং তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমি তোমার সাথে আছি।
মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার মধ্যে রাজনীতিকের সাফল্য। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব-অনটন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা বিরোধী যে জলোচ্ছ্বাস তার মোকাবিলার জন্য বাঁধ তৈরিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা ও কাজে লাগানোও হচ্ছে রাজনীতিকের কাজ। এই দায়িত্ব পালনে কেউ বেশি সফল হন কেউ কম। তবে আমি নিশ্চিত যে কোনও ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কোনও কর্মচারীর এটা কাজ নয়, এটা তার দেশপ্রেমও নয়। তার দেশপ্রেম তার জন্য নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
লর্ড মন্টোগোমারীর নাম হয়তো অনেকেই শুনে থাকবেন। একজন সার্থক রাজনীতিবিদ, পার্লামেন্টারিয়ান এবং লেখক হিসেবে তার সুনাম ছিলো এবং আছে। তিনি তার Path to Leadership পুস্তকে একজন রাজনৈতিক নেতাকে এভাবে বর্ণনা করেন-
One who can be looked upto, whose personal judgement is trusted, who can inspire and warm the hearts of those he leads gaining their trust and confidence and explaining what is needed in language which can be understood.
জনাব মন্টোগোমারীর এই সংজ্ঞাটি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। আধুনিক বিশ্বে ব্যবসায়িক জগতেও টীমকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞায় বর্ণিত নেতার বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এবং জামায়াত নেতারা লাখ লাখ মানুষের অন্তর জয় করেছেন। তাদের বিচার-বিবেচনা, যোগ্যতার ওপর তাদের আস্থা আছে। তারা লাখ লাখ লোককে উজ্জীবিত করতে এবং অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের প্রাণ রক্ষার জন্য লাখ লাখ লোক প্রাণ দিতে প্রস্তুত হয়। এটা অবৈধ কোনও সুবিধা পাবার কারণে নয় বরং আত্মিক ও আদর্শিক সম্পর্কের কারণে। আমি, আপনি বা বেতনভুক্ত কোনও আমলার পক্ষে কি এটা সম্ভব? আমি মনে করি না। আমরা মারতে পারি কিন্তু আমাদের জন্য মরতে কাউকে উদ্বুদ্ধ করতে পারি না।
ভারতের একজন প্রধানমন্ত্রী নিজের পেশাব খেতেন। প্রতিদিন সকাল বেলা খালি পেটে এক গ্লাস করে। আমরাও তাই খাবো? খাওয়া উচিত? যদি না হয় তাহলে অন্যকে অনুকরণ না করে সংযমী হলে কি ভালো হয় না?
আমি রাজনীতিকদের দুর্দিনের কথা বলছিলাম। এই দুর্দিনের জন্যই কি বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছিল? অনেকেই শাসকদলের চরিত্র উদ্ধৃত করে বলছেন, সৃষ্টি করা হয়েছিল। আমি জানি না কোনটি ঠিক। তবে যে ঘটনাকে উপলক্ষ করে ওয়ান ইলেভেন এসেছে, রাস্তায় পিটিয়ে মানুষ হত্যা, তার বিচার প্রক্রিয়া কিন্তু থমকে আছে। যদি বিচার হতো, যেমন দ্রুত বিচারে অনেক মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে তাহলে মানুষের ধারণা অন্য রকম হতে পারতো। আমি ওদিকে যাচ্ছি না তবে রাজনীতিকদের এই দুর্দিন যে বেশি দিন থাকবে না সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত। তবে সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল। নতুন ইস্যু সৃষ্টি করে এডভেঞ্চারিস্ট হয়ে কোনও লাভ নেই।
একটি ফারসী রুবাইয়াত দিয়েই আমি আজকের আলোচনা শেষ করতে চাই, রুবাইয়াতটি হচ্ছে, “ইউসুম গুস গশতে বা’জ আরত কিনান
গম ম-খুর
কুল বয়ে ইহজান সওদ রোজী গুলিস্তা রোজী
গম ম-খুর
কবি নজরুল এর তরজমা করেছেন এভাবে
“দুঃখ করো না, হারানো ইউসুফ
কেনানে আবার আসিবে ফিরে
দলিত পুষ্প এ মরু পুনঃ
হয়ে গুলিস্তা হাসিবে ধীরে”
ড. মোঃ নূরুল আমিন

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গুম খুন আর গ্রেফতারের রাজ্যে বসবাস


 শিরোনাম দেখে পাঠকদের অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। অনেকের মনে জিজ্ঞাসাও উঁকি দিতে পারে। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে দেখুন। এই তো ক’দিন আগে, গত ৭ সেপ্টেম্বর আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১৩ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা মামলা ছাড়াই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, ওই নেতারা নাকি দেশের গার্মেন্ট সেক্টরে নাশকতা চালানোর ষড়যন্ত্র করছিলেন! নাশকতা নাকি আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহার প্রাক্কালে চালানো হতো! ভেবে দেখুন পুলিশের যোগ্যতা সম্পর্কে। পুলিশ কথিত ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও জানে! অথচ ষড়যন্ত্র সব সময় গোপনে করা হয়। তাছাড়া জামায়াতে ইসলামী যেমন একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনও তেমনি শ্রম আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত একটি ট্রেড ইউনিয়ন। সুতরাং দেশের যে কোনো স্থানে এর নেতাদের সভা ও বৈঠক করার আইনত অধিকার রয়েছে। সেদিনও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাই আয়োজিত হয়েছিল। বৈঠকটি নিতান্ত ঘরোয়া ছিল বলে এজন্য সরকারের অনুমতি নেয়ার বা পুলিশকে আগে থেকে অবহিত করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করা হয়নি। প্রয়োজন আসলে নেইও। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ বলে কথা!  গ্রেফতার তো করেছেই, তথাকথিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বও আবিষ্কার করে বসেছে পুলিশ। পুলিশের আচরণেও ক্ষুব্ধ হয়েছে মানুষ। ১৩ জন নেতাকেই হাতকড়া পরিয়ে মিডিয়ার সামনে হাজির করেছিল পুলিশ। আপত্তি উঠেছে বিশেষ করে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ব্যাপারে। কারণ, তারা সাবেক এমপি এবং দু’জনেই জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সুতরাং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের যে কোনো বিষয়ে তাদের বিশেষ মর্যাদা ও অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও মিয়া গোলাম পরওয়ারের ক্ষেত্রে পুলিশকে অত্যন্ত অভদ্রোচিত আচরণ করতে দেখা গেছে। সাবেক এ দু’জন এমপিকেও পুলিশ হাতে হাতকড়া লাগিয়ে মিডিয়ার সামনে এমনভাবে হাজির করেছে যা দেখে মনে হতে পারে যেন তারা কোনো জঙ্গি বা সন্ত্রাসী সংগঠনের পলাতক নেতা!
এভাবেই চলছে আওয়ামী রাজত্ব আর সে রাজত্বেই বসবাস করতে হচ্ছে আমাদের। কথা উঠেছে একটি বিশেষ কারণে। দেশের ভেতরে কর্তৃত্ব ফলাতে পারলেও একই সরকার কিন্তু ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক কোনো বিষয়েই সামান্য অর্জন করতে পারছে না। সরকারের এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সীমান্তে হত্যার পর হত্যা করা হচ্ছে কিন্তু সরকার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে রেখেছে। কুড়িগ্রামের কিশোরী ফেলানী হত্যাকাণ্ডের কথাই ধরা যাক। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি পয়েন্ট ব্ল্যাংক অর্থাৎ মাত্র সাত-আট হাত দূর থেকে গুলী করে হত্যা করার পর ফেলানীকে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রেখেছিল বিএসএফ। গুলী করেছিল অমিয় ঘোষ নামে এক হাবিলদার। ঝুলন্ত ফেলানীর ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিশে^র দেশে দেশে ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার উঠেছিল। নিন্দায় ও বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল বিশ্ববাসী। মূলত সে দাবির মুখেই ভারত হাবিলদার অমিয় ঘোষকে গ্রেফতার করে বিভাগীয় আইনে তার বিচারের পদক্ষেপ নিয়েছিল। কোচবিহারে বিএসএফ-এর বিশেষ আদালতে এই বিচার চলছে ২০১২ সালের আগস্ট থেকে। কিন্তু পুরো বিষয়টিই যে ভারতের সাজানো নাটক ছিল তারই প্রমাণ পাওয়া গেছে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে। ঘোষিত রায়ে বিএসএফ-এর বিশেষ আদালত খুনি হাবিলদার অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দিয়েছিল। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ফেলানীর বাবা ও মামাসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং তথ্য-প্রমাণের কোনো কিছুকেই বিবেচনায় নেননি বিচারকরা। তারা বরং সচেষ্ট থেকেছেন অভিযুক্ত হাবিলদারকে রেহাই দেয়ার জন্য। অথচ দেশী-বিদেশী সকল অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে, ফেলানীকে রীতিমতো টার্গেট করে পয়েন্ট ব্ল্যাংক দূরত্ব থেকে হত্যা করেছিল অমিয় ঘোষ। বিএসএফ-এর আইনেও এ অপরাধের ন্যূনতম শাস্তি সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তাছাড়া নারী ও শিশুদের ব্যাপারে খোদ বিএসএফ-এরই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিরস্ত্র কোনো নারী-শিশুকে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বা চোরাচালানীদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। অন্যদিকে ফেলানীকে সরাসরি হত্যা করেছিল হাবিলদার অমিয় ঘোষ। কিন্তু এত নিষ্ঠুর একটি হত্যাকাণ্ডের পরও খুনি অমিয় ঘোষকে কোনো দণ্ডই দেয়া হয়নি।
এ পর্যন্ত এসে শেষ হলেও হয়তো কথা বাড়াতে হতো না। কিন্তু যাকে বলে ‘বন্ধুরাষ্ট্র’! কিশোরী ফেলানীকে নিয়ে নতুন পর্যায়ে কুটিল রাজনীতি শুরু করেছে ভারত সরকার। গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ফেলানীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপারে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে এতদিন পর এসে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ফেলানী হত্যার দায় নাকি তার পিতা নূরুল ইসলামের। কারণ, ফেলানী ও তার পরিবার নাকি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছিল। ঘটনার দিন দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঢোকার সময় বাবার চাপাচাপিতে ফেলানী মই বেয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করে এবং বিএসএফ-এর গুলীতে নিহত হয়। বিএসএফ তার ‘দায়িত্ব’ পালন করেছে বলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বলেছে, ফেলানীর হত্যাকারী অমিয় ঘোষ বিএসএফ সদর দফতরের জারি করা নির্দেশনা লংঘন করেছে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেউ প্ররোচিত করলেও সীমান্ত এলাকায় নারী ও শিশুদের হত্যা করা চলবে না। কিন্তু হাবিলদার অমিয় ঘোষ সদর দফতরের নির্দেশনা অমান্য ও লংঘন করেছে।
বলা দরকার, এতদিন পর ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্টো ফেলানীর বাবাকে দায়ী করতে চাইলেও স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হলো, ফেলানীদের বাড়ি কুড়িগ্রামে এবং তাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অসহায় শিকার বানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, কোচবিহারের বিশেষ আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেও কোনো লাভ হয়নি। অভিযুক্ত অমিয় ঘোষ নিজে গুলী করার কথা স্বীকার করলেও তাকে এই যুক্তিতে খালাস দেয়া হয়েছে যে, সে নাকি তার ‘দায়িত্ব পালন’ করেছে! স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে দেশপ্রেমিকদের মধ্যে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। স্মরণ করা দরকার, প্রথম দফা বিচারের পরও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিলেন দেশের বিশিষ্টজনরা। রায়কে বিচারের নামে প্রহসন হিসেবে আখ্যায়িত করে তারা বলেছিলেন, এর মাধ্যমে ফেলানীকে দ্বিতীয়বার খুন করেছে বিএসএফ। আওয়ামী লীগ সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির সুযোগেই যে ভারতীয়রা প্রহসনের সাহস পেয়েছে সে কথাও বলেছিলেন তারা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। তারা ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানানোর, আপিলের পাশাপাশি নতুন করে বিচারের আয়োজন করার এবং বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছিলেন।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন ব্যাখ্যাসহ সর্বশেষ খবরের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিচারের নামে বিএসএফ তথা ভারতের পক্ষ থেকে সত্যিকার অর্থেই নাটক সাজানো হয়েছে। তথ্যনির্ভর যে কোনো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, বিএসএফ-এর খুনি ও সন্ত্রাসী সৈনিকরা স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করে আসছে। অন্যদিকে সব জেনে-শুনেও ভারতের কাছে বলিষ্ঠভাবে প্রতিবাদ পর্যন্ত জানাচ্ছে না আওয়ামী লীগ সরকার। এ অবস্থারই সুযোগ নিচ্ছে বিএসএফ। এর খুনি ও সন্ত্রাসী সৈনিকরা শুধু নিরীহ মানুষই হত্যা করছে না, কুড়িগ্রামের কিশোরী ফেলানীর মতো কাউকে কাউকে হত্যার পর কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখারও দুঃসাহস দেখাচ্ছে। এদিকে বিএসএফকে প্রতিহত করার পরিবর্তে আওয়ামী লীগ সরকার বরং বিডিআরের বিলুপ্তি ঘটানোর মধ্য দিয়ে বিএসএফ-এর হত্যাকাণ্ডকে আরো বাধাহীন করেছে। অমিয় ঘোষদের দিয়েছে প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়। স্মরণ করা দরকার, বিডিআর থাকাকালে বিএসএফ কিন্তু এত বেশি দুঃসাহস দেখাতো না। পাদুয়াসহ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় মাঝে-মধ্যেই সমুচিত জবাব দেয়ায় বিডিআরকে বিএসএফ বরং বাঘের মতো ভয় করতো। একই বিএসএফ বর্তমান বিজিবিকে গণনায়ই আনছে না, সামান্য পাত্তা পর্যন্ত দিচ্ছে না। এদিকে ফেলানীর আগে-পরে অসংখ্য নিরীহ বাংলাদেশীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলেও আওয়ামী লীগ সরকার কিছুই বলছে না। মনে হচ্ছে সরকার যেন ‘সন্ন্যাসব্রত’ পালন করছে! সন্ন্যাসব্রতের আড়ালে এই ‘উদারতা’র কারণ নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানোর দরকার পড়ে না। সরকার দেশের নাগরিক জীবনকে গুরুত্ব দিলে অবশ্যই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হতো। বিষয়টিকে সরকার জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উপস্থাপন করতো। কিন্তু অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকার সবকিছু নীরবে হজম করে চলেছে। যেন বাংলাদেশীদের জীবনের কোনো দাম নেই!
উদাহরণ দেয়ার জন্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। ২০১৩ সালে প্রথম বিচারের রায় প্রকাশিত হওয়ার পরপর ১২ সেপ্টেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের বিচারে খুনি বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ বেকসুর খালাস পেয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, বিচারের ওই রায়ে মন্ত্রী ও তাদের সরকার সন্তুষ্ট কি না এবং সন্তুষ্ট না হয়ে থাকলে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কথা তারা ভাবছেন কি না? এর জবাবেই দীপু মনি ‘বন্ধু’ হিসেবে ভারতকে না হারানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তারা নাকি ভারতের আইন সম্পর্কে ‘জানার চেষ্টা’ করছেন এবং জানার পর তারা সিদ্ধান্ত নেবেন, এ ব্যাপারে কোন ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায়! 
বলা দরকার, তেমন কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি। আর এ অবস্থারই পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করে চলেছে ভারত সরকার। ফেলানী হত্যাকাণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া দূরে থাকুক সরকার আসলে কোনো চিন্তা পর্যন্ত করেনি। বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকার যে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ও আইন সম্পর্কে কিছুই জানে না এবং না জেনেই যে বাংলাদেশের গলায় একের পর এক ফাঁস পরিয়ে চলেছে সে কথা জানা গেছে তিস্তা চুক্তি থেকে সীমান্ত প্রটোকল পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে। তিস্তা চুক্তির কথাই ধরা যাক। এটা আটকে গেছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার কারণে। এই বিরোধিতা মমতা ব্যানিার্জি কিন্তু আইনসম্মতভাবেই করেছেন। তিস্তার মতো যে কোনো বিষয়ে চুক্তি করতে হলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের অনুমতি নিতে হয়- যে অনুমতি এখন দরকার পশ্চিমবঙ্গের। সে জন্যই রাজধানী দিল্লী¬তে বসে কিংবা ঢাকায় বেড়াতে এসে ড. মনমোহন সিং এবং নরেন্দ্রনাথ মোদিরা যত আশ্বাসের কথাই শোনান না কেন, তারা চাইলেই বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে বা তা বাস্তবায়ন করতে পারেন না। এজন্য আবার ভারতের সংবিধানও সংশোধন করতে হবে। আসলে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে প্রতারণা করার জন্য এটা ভারতীয়দের চমৎকার একটি কৌশলও বটে। এখানে শুধু এটুকু বলে রাখাই যথেষ্ট হওয়া উচিত যে, আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের যে বন্ধুত্বের জন্য ট্রানজিট-করিডোরসহ সবকিছুই ভারতকে দিয়ে ফেলেছেন এবং এখনো শুধু দিতেই ব্যস্ত রয়েছেন সে বন্ধুত্বের নাগাল তারা কোনোদিনই পাবেন না। কারণ, সেবাদাসদের ভারত শুধু সেবাদাস হিসেবেই ব্যবহার করে, কাজে লাগায়।
প্রসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে ‘ফার্স্ট পোস্ট’ নামে ভারতীয় অনলাইন পত্রিকার একটি রিপোর্টের উল্লেখ করা যায়। ‘সাকসেস স্টোরি’ শিরোনামে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর রচিত ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার ভারত সরকারের জন্য ‘সাফল্যের বিরাট সিঁড়ি নির্মাণ করেছে’। এই সিঁড়ি বেয়েই ঝুড়ি বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে ভারত। পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সম্পর্কে পত্রিকাটি লিখেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর করা ছাড়া পরাষ্ট্রনীতিতে কোনো সফলতাই অর্জন করতে পারেননি তিনি। তার সরকারের একমাত্র সাফল্য বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ওই সরকারের কাছ থেকে একের পর এক ভারতের বিভিন্ন স্বার্থ আদায় করা। নিজেরা আদায় করলেও ভারত সরকার যে বাংলাদেশের কোনো একটি অনুরোধই রক্ষা করেনি সে কথাটাও জানিয়েছে ‘ফার্স্ট পোস্ট’। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিস্তা চুক্তির উল্লখ করে বলেছে, মনমোহন সিং ও নরেন্দ্রনাথ মোদির উভয় সরকারই মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতার অজুহাত দেখিয়ে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থেকেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ‘ফার্স্ট পোস্ট’-এর রিপোর্টটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয়দের প্রকৃত মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটেছে। বহুল আলোচিত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে বহুবার শোনা আশ্বাসের বাইরে ‘এক চুল’ পরিমাণও আদায় করতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার। অর্থাৎ নানা কথার মারপ্যাঁচে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য বিরাট একটি ‘না’ পাঠিয়েছে ভারত। সব মিলিয়েই ভারতের কাছ থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে সরকারকে। এই ‘না’-এর মধ্য দিয়ে আসলে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার জন্য ভারতীয়রা নিজেদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ত্যাগ করতে রাজি নন। ভারতীয়দের জন্য এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ব্যাপারে তারা স্বাধীনতার পর থেকেই এ মনোভাব দেখিয়ে চলেছে।
বর্তমান পর্যায়ে ফেলানীকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের মধ্য দিয়েও বাংলাদেশের প্রতি একই মোনোভাব ও কৌশলের প্রকাশ ঘটেছে। একই কারণে সরকারের দায়িত্বও অনেক বেড়ে গেছে। দেশপ্রেমিকরা মনে করেন, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সরকারের উচিত সীমান্তে বিএসএফ-এর হত্যা বন্ধ ও প্রতিহত করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া। এ উদ্দেশ্যে বিজিবির লোকবল ও মনোবল বাড়াতে হবে, বিজিবির জওয়ানদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিতে হবে। সীমান্তে সেনাবাহিনীকেও মোতায়েন করা ও তৎপর রাখা দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার সরকারি পর্যায়ে গুলী ও হত্যা বিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়া। পাশাপাশি সরকারের উচিত কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। অবস্থান পাল্টাতে ভারত সম্মত না হলে ফেলানীর বিষয়টিকে অবশ্যই অন্তর্জাতিক পর্যায়ে উত্থাপন করতে হবে। আমরা চাই, কেবলই বিএনপি-জামায়াতকে নির্মূল করার ভয়ংকর অভিযান চালানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত ভারতের সঙ্গে সমানে সমান হিসেবে অবস্থান নেয়ার এবং বাংলাদেশের সকল পাওনা আদায়ের চেষ্টা করা।
আহমদ আশিকুল হামিদ

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

৫৭ ধারাই নয় সকল কালাকানুনের রদ প্রয়োজন


আমাদের সাংবাদিকতার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। একটা সময় সংবাদমাধ্যমের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। একটা সময় ছিল যখন ঢাকা শহরে কোনো দৈনিক সংবাদপত্রই ছিল না। সেই অবস্থার সঙ্গে তুলনা করতে গেলে বলতে হবে, আমরা অনেক অনেক দূর এগিয়েছি। সংবাদমাধ্যমেও সেটা আছে। পৃথিবীর কোন কোন দেশে সবচেয়ে ভালো সাংবাদিকতা হচ্ছে, এটার কোনো মাপকাঠি নেই, বিভিন্ন উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের সাংবাদিকতার সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়েছে। এই উন্নতি বা অগ্রসরতা এককথায় বিস্ময়কর, গুণগত মান এবং বিস্তৃতি-উভয় দিক থেকেই।
রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করা যায়। দেশে ও বিশ্বের অন্যত্র কোথায় উল্লেখযোগ্য কী ঘটছে তা সচিত্র প্রকাশ ও প্রচার করা গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান কাজ। এ দ্বারা জনগণের জানার আগ্রহ নিবৃত্ত হচ্ছে। দেশাভ্যন্তরে উন্নয়ন-অনুন্নয়নের চিত্র ও সমস্যাদি তুলে ধরে এ ব্যাপারে তাদেরকে সজাগ করে তুলছে। গণমাধ্যমের সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদন চর্চাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে জনমত গঠনে এর ভূমিকা সমাজ জীবনে গণমাধ্যমের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান এ শেষোক্ত ও অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান তখনই সার্থক হয় যখন মিডিয়া একাধারে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে একাত্ম তৎপর থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মিডিয়ার স্বাধীনতা সর্বাংশে সরকারি প্রভাবমুক্ত গণমাধ্যমকে বোঝায়।
তবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সংবাদ কর্মীরা কতখানি স্বাধীনতা ভোগ করে আর কতখানি মালিক ও সম্পাদকের প্রভাবে কাজ করে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। মালিক-সম্পাদকদের নিজস্ব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চিন্তা-চেতনা থাকা স্বাভাবিক- আবার বিত্তশালী গোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত হওয়াও অসম্ভব নয়। এসব কারণে মিডিয়া কর্মীদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে পারে। আর বহুদলীয় গণতন্ত্রে ও বহুজাতিক সমাজে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা অপরিহার্য হলেও অনেক ক্ষেত্রেই এ নিরপেক্ষতা একটা অবাস্তব কল্পনায় পর্যবসিত হয়।
একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক মনে করছি। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কনসেপ্ট বা ধারণাটি কার স্বার্থে? সংবাদ কর্মীর নিজ স্বার্থে নাকি যে পাঠকবর্গ বা জনগণের উদ্দেশ্যে তারা লেখালেখি করে থাকে তাদের অবগতির স্বার্থে? সাংবাদিকের নিজের স্বার্থে হলে, পাঠক-শ্রোতার কোনো বক্তব্য থাকে না। সাংবাদিকরা যে সংবাদ পরিবেশন করবে তা পাঠ করেই পাঠকবর্গকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
পক্ষান্তরে, লেখার উদ্দেশ্য যদি হয় অগণিত পাঠক-পাঠিকার বরাবরে সত্য, বস্তুনিষ্ট ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন তাহলে সে রকম সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্ব সাংবাদিক ও সম্পাদক উভয়ের ওপরই বর্তায়। মিডিয়ার কাজ সংবাদ পরিবেশন করা। অবশ্য সুষ্ঠু, বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশন করাতেই মিডিয়ার সার্থকতা। মিডিয়া সোচ্চার মিডিয়া কর্মীদের স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনের অধিকার নিয়ে, অপরদিকে পাঠক বা জনগণের অধিকার বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রাপ্তির। মিডিয়া কর্মীরা সংবাদ পরিবেশনে যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে, পাঠকরা সত্য, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এর এক-দশমাংশ অধিকারও ভোগ করে কী? না করার মূল কারণ গণমাধ্যমের পাঠক-দর্শকরা এক অসংগঠিত জনগোষ্ঠী।
সংবাদমাধ্যম কি শুধু পর্যবেক্ষক হিসেবে যা দেখবে তা-ই লিখবে? নাকি সংকট নিরসনেও ভূমিকা রাখবে? সংবাদমাধ্যমের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব পর্যবেক্ষক ও সংবাদ পরিবেশকের। এটা তাদের পেশাগত দায়িত্ব, এ বিষয় তাদের একটা নীতি আছে। তবে সাংবাদিকরা একই সঙ্গে দেশের নাগরিকও বটে। নাগরিকের দায়িত্বও তাদের পালন করা উচিত। সংবাদমাধ্যম যদি চলমান সংকট থেকে দেশকে মুক্ত করায় ভূমিকা রাখতে চায়, তাহলে আগে সাংবাদিকদের সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কী পন্থায় কী ভূমিকা নিতে চান। শান্তির সময়ে সংবাদমাধ্যমের প্রধান ভূমিকা পর্যবেক্ষক ও সংবাদ পরিবেশকের। আর বিশেষ সংকটময় সময় দেশের প্রতি, জাতির প্রতি, এমনকি পৃথিবী ও সভ্যতার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেও সাংবাদিকরা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে পারেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেও ঘোষণা করা হয়েছে: ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ (সূত্র : ৭(২) ধারা)
বাংলাদেশের সংবিধান জনগণকে ‘সকল ক্ষমতার মালিক’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তবে মালিকানাটি জনগণের কাছে আছে কি না, সে প্রশ্ন করার অধিকার জনগণের কতটা আছে, তা তারা জানে না। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় হেভিয়াস কর্পাস মামলায় প্রশ্ন উঠেছে। আমাদের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞদের এ সম্পর্কে মতামতও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সংবিধান হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য সব আইনগুলো সংবিধানের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে হয়। সংবিধান সর্বোচ্চ আইন কারণ সে বিদ্যমান, সে বিদ্যমান কারণ তাতে জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত।’ (সূত্র : ২৫ ঢাকা ল রিপোর্টস, পৃ. ৩৩৫)
চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা আমাদের সংবিধান খুব স্পষ্টভাবেই প্রত্যেক নাগরিককে দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে ‘... জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ- সাপেক্ষে’র কথাও লেখা আছে। (সূত্র : ৩৯ (২) ধারা)
চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার কথা যে বলা হয়েছে তা দুটি আলাদা শব্দ হলেও তার মর্মার্থ এক। অবাধ অর্থাৎ যা খুশি তা-ই চিন্তা করে তা প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, বিবেকসম্মত চিন্তার স্বাধীনতার কথাই বলা হয়েছে। বিবেকসম্মত চিন্তা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। বিবেকসম্মত চিন্তার সংজ্ঞা হচ্ছে সর্বসম্মতভাবে মানুষ যে কাজটি ‘ভালো’ এবং যে কাজটি ‘মন্দ’ বলে মনে করে।
স্বাধীনতাবিহীন সংবাদমাধ্যম হলো স্রেফ অপপ্রচারযন্ত্র। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের গণমাধ্যম রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে কমই স্বাধীন। যে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কষাঘাতে বিদ্ধ হয়ে নিজেকে খুঁজে পায়, সেটি চূড়ান্ত বিচারে মানুষের আস্থা অর্জন ও জনমত প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। মানুষ এখন কেবল একটি নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল নয়। মুখের কথা থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণকারী ব্লগ-রাঘব বোয়ালদের অপরাধ খুঁজে বের করতে সবসময় কিছু মানুষ থাকবেই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হয়তো কিছু বিষয়কে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলে। এছাড়া কিছু মানুষ থাকেই, যারা গণমাধ্যমকে উটকো আপদ ভাবে। তবে গণমাধ্যমকে ঠেকানো তখনই উচিত, কেবল যখন এটি নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে। অথবা যখন এর কর্মকাণ্ডের ফলে জনমানুষের ক্ষতি হতে পারে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এ সমস্ত সীমা নির্ধারণ করে দেবে কে? তবে এ ধরনের বিতর্ক খুব বেশি দূর এগোয় না।
সংবাদপত্র ও সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবসমই ক্ষমতাবান মহল থেকে প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে। এসব ক্ষমতাবান মহলের মধ্যে রয়েছে সরকার, কর্পোরেশন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন গোষ্ঠী। এটি সারা বিশ্বেই কমবেশি ঘটে থাকে। বাংলাদেশে ক্রটিপূর্ণ একটি নির্বাচনের পর সরকারের বৈধতাই প্রশ্নের সম্মুখীন। সেখানে চিন্তার স্বাধীনতা দমন করাটাই ভিন্নমত দমন ও অন্যায্য দলীয় কর্মকাণ্ডের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলাদেশী গণমাধ্যমে সবসময়ই কিছু নিষিদ্ধ বিষয় (ট্যাবু) ছিল, এখনও আছে। যেমন : সামরিক বাহিনীকে ছোঁয়া যায় না। টেলিযোগাযোগ কর্পোরেশনগুলোর বিরুদ্ধেও কিছু বলা যায় না, কেননা তারাই দেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনদাতা। এমনকি দাতা সম্প্রদায় ও গণমাধ্যম নিজেরা বেশ সতর্কতার সঙ্গে চলে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সরকারি মিডিয়া চ্যানেলগুলো ঢাকায় সরকারের জন্য স্রেফ প্রচারযন্ত্র (প্রোপাগান্ডা আউটলেট) হয়ে উঠেছে। সরকারের সমালোচকদের টক-শোতে আমন্ত্রণ জানানো হয় না। সরকারের একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরতে উপস্থাপকদের পক্ষপাতিত্বমূলক প্রশ্ন তোলাটাই সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। (সূত্র : দৈনিক মানব জমিন ১ মে ২০১৫)
এসব নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক ইস্যু। তবে গণমাধ্যমের প্রতি সরাসরি হুমকি, ‘সমস্যা সৃষ্টিকারী সম্পাদক’দের গ্রেফতার, সাংবাদিক ও ব্লগারদের ওপর হামলা এর চেয়েও অনেক বড় উদ্বেগের কারণ। কর্তৃপক্ষ অস্বাভাবিক মাত্রায় ‘আদালত অবমাননা’র অভিযোগ তুলছে। এ বিষয়টিও ভয়ের সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। অসহনশীল সংস্কৃতির ফলাফলস্বরূপ, বহু মুক্তমনা সহিংসতার শেষ দেখেছেন। এর আগে কখনই আজকের মতো সমালোচনামূলক ভাবনার প্রয়োজন দেখা দেয়নি। আর এখনকার মতো আর কখনই সমালোচক হওয়াটা এত বিপজ্জনকও ছিল না।
বস্তুত মতামত, ভিন্নমত ও স্বাধীনমত পোষণ করা মানুষের স্বভাব। প্রাণ দিয়েও মানুষ নিজের মতকে রক্ষা করে। মতামত ছাড়া জন্তুদের পক্ষেই বাঁচা সম্ভব, মানুষের পক্ষে নয়। কারণ, মানুষ বুদ্ধিমান ও রাজনৈতিক জীব। বেঁচে থাকার জন্য সে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো করে চিন্তাও করে।
 দৈনিক আমার দেশ’, ‘দিগন্ত টিভি’ ‘ইসলামিক টিভি’, ‘চ্যানেল ওয়ান’ বন্ধ। বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া বন্ধের জন্যে বিটিআরসির নির্বাহী আদেশই যথেষ্ট। ‘আমার দেশ’ এবং ‘দৈনিক ইনকিলাব’র প্রেসে তালা ঝুলানো হয়েছে তথ্য প্রযুক্তি আইনের অজুহাতে। এখন দারোগাই প্রেসে তালা দিতে এবং সাংবাদিকদের অজামিনযোগ্য ধারায় গ্রেফতার করতে পারেন এবং এ আমলে করে দেখিয়েছেও। তারপর পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী সংবিধানের সমালোচনা করা যাবে না অথবা মূলনীতি থেকে বিসমিল্লাহ বাদ গেল কেন জিজ্ঞেস করলেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা। মাহমুদুর রহমানকে জেলে পচানো হচ্ছে এবং এর আগে আদালত অবমাননার মামলায় আইন-বর্ণিত মেয়াদেরও বেশি ছয় মাস কারাবাস তাকে দেয়া হয়েছিল।
তাকে রিমান্ডে বিবস্ত্র করে শেখ হাসিনা সরকার অত্যাচারও করেছে। অন্যদিকে উচ্চ আদালত কর্তৃক ঘন ঘন আদালত অবমাননার রুল তো আছেই। যে আইনের সম্ভাব্য সংশোধনী নিয়ে আমরা এখন উচ্চকণ্ঠ, ডিসিরা এখন পত্রিকা বন্ধ করতে না পারলেও গত কয়েক বছর নানা অজুহাতে যেমন অনিয়মিত প্রকাশনা, সরকার বিরোধী প্রচারণা, অশ্লীলতার দোহাইয়ে বহু পত্রিকার প্রকাশনা লাইসেন্স রদ করা হয়েছে। এসব নিয়ে মামলাও আছে জেলা আদালতগুলোতে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেস ক্লাবে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়েছে। সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রত্যক্ষ নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন ছাড়াও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা হয়েছে আইনি হাতিয়ার প্রয়োগের মাধ্যমেও। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানির ঘটনাও বিস্তর।
সরকারের পক্ষ থেকে যা-ই দাবি করা হোক না কেন, বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম যে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না, তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে জাতীয় সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের এক সাম্প্রতিক বিবৃতিতে। ওই বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ জাতীয়  দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর জেলা সংবাদদাতাদের ওপর পুলিশ, প্রভাবশালী রাজনীতিক ও স্থানীয় অপরাধীদের নির্যাতন-হয়রানির ক্রমবর্ধমান ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
স্বাধীনভাবে চিন্তা করার, স্বাধীনমত পোষণ করার, স্বাধীনভাবে বিশ্বাস করার, স্বাধীনভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করার অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। ধর্মীয় বিশ্বাস বললে অবশ্য খ্রিস্ট ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, ইহুদি ধর্ম ইত্যাদি ধর্মের মতো আনুষ্ঠানিক ও বহুজন সমর্থিত ধর্মকেই বোঝায় না। তা ব্যক্তিগত ধর্মও হতে পারে। কেউ ইচ্ছা করলে এক ধর্ম ত্যাগ করে আরেক ধর্ম পালন করতে পারে। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকারও তার জন্মগত, যদিও প্রকাশ্যে মতপ্রকাশ করে অন্যের অনুভূতিকে আঘাত করার অধিকার তার আছে কি না, তা বিতর্কের বিষয়। অন্তত অন্যের আবেগকে আহত করার উদ্দেশ্যে মতপ্রকাশের অধিকার তার নেই।
একনায়ক অথবা স্বৈরাচারীকে মানুষ পছন্দ করে না। কারণ, একনায়ক অন্যদের মতামতকে গ্রাহ্য করে না। সে চায় নিজের মতঅনুসারে অন্যদের চালাতে। মানুষ কেবল খেয়ে সুখী হলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাবার সংগ্রহ করতো না। বরং বিনা পরিশ্রমে খাওয়াদাওয়া করে কারাগারে বাস করতো। অথবা একনায়কের মতো অনুসারে চলে বৈষয়িক উন্নতি করতো। কিন্তু মানুষ তা করে না। (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো ২৭ মার্চ ২০১৫)
দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ, পুলিশী হয়রানি, মিথ্যা মামলাসহ নানা ধরনের অত্যাচার-নির্যাতনের অজস্র ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর কোনো আইনী প্রতিকার হয়নি। ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মচারীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্য সাংবাদিকরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন।
সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ হয় রাজনৈতিক দলের লোকজন, পুলিশ, অপরাধী চক্র এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজনের তরফ থেকেও। রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে সংবাদ, আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন রাজনৈতিক কর্মীদের দ্বারা।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গিয়ে সরকারি দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। ভোটের দিন সকাল থেকে ভোট কেন্দ্রে অবৈধভাবে সীল মারাসহ নানা অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহ করার সময় তারা সরকারদলীয় ক্যাডারদের হামলার শিকার হন। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার ওবায়েদ অংশুমান, একই পত্রিকার সিনিয়র ফটো সাংবাদিক শামীম নূর, যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরাপার্সন আখলাক সাফা, একাত্তর টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার আজাদ তালুকদার, ক্যামেরাপার্সন জহিরুল ইসলাম, আরটিভির ক্যামেরাপার্সন পারভেজুর রহমান এবং  দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্টার সুজয় মহাজন। সরকারদলীয় ক্যাডারদের গুলীতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল রাইজিংবিডির রিপোর্টার ইয়াসিন রাব্বী আহত হন। এছাড়া লাঞ্ছিত হয়েছেন দৈনিক প্রথম আলোর সিনিয়র প্রতিবেদক আশীষ-উর রহমান শুভ ও মোশতাক আহমেদ, দৈনিক সকালের খবরের ফটোসাংবাদিক বুলবুল আহমেদ, বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম মহসীন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি কবি আবদুল হাই সিকদার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী, দৈনিক সংগ্রামের স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ জাফর ইকবাল ও দৈনিক মানব জমিনের স্টাফ রিপোর্টার কাফি কামাল।
দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার ওবায়েদ অংশুমান জানিয়েছেন, রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আশরাফুজ্জামান ফরিদের (রেডিও প্রতীক) লোকেরা আহমেদাবাদ হাইস্কুলের সামনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আজাদ মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলামের (করাত প্রতীক) লোকদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে ফরিদের লোকেরা সাদেকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তার কর্মীদেরকে কোপাতে থাকে। এরপর আওয়ামী সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আশরাফুজ্জামান ফরিদের লোকেরা কমলাপুর হাইস্কুল কেন্দ্রে প্রবেশ করে প্রায় ৩শ’ ব্যালটে পুলিশের সামনেই সীল মারে। এতে পুলিশ সহযোগিতাও করে।
ওবায়েদ অংশুমান আরো জানান, কাউন্সিলর প্রার্থী ফরিদের লোকদের করা এসব অনিয়মের স্টিল ও ভিডিও চিত্র ধারণ করেছিলেন তিনি। এতে ক্যাডাররা তার ওপর হামলা চালায় এবং ক্যামেরা ও তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনগুলো ছিনিয়ে নেয়। তিনি জানান, আহমেদাবাদ স্কুল রোডে অবস্থান করার সময় আশরাফুজ্জামান ফরিদের নেতৃত্বে ক্যাডাররা ‘ধর ধর’ করে তার ওপর হামলা হালায়। এ সময় ক্যাডারদের হামলায় সাংবাদিক ওবায়েদ অংশুমান মারাত্মকভাবে আহত হন। এ সময় ক্যাডাররা তার পরিধানের পোশাক ছিঁড়ে ফেলে।
অন্যদিকে সকালে ডিএসসিসির মেয়র প্রার্থী বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের সামনে যমুনা টিভির ক্যামেরাপার্সন আখলাক সাফার ওপর হামলা চালায় আওয়ামী গুন্ডারা। এতে তিনি আহত হন। সকাল সাড়ে আটটায় সেগুনবাগিচা স্কুল কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলার শিকার হন দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র ফটো সাংবাদিক শামীম নূর। হামলার পর ক্যাডাররা তাকে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে সংবাদ পেয়ে অন্যান্য ফটো সাংবাদিকরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
রাজধানীর শাহজাহানপুরের মাহবুব আলী ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে দুপুর দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে প্রকাশ্যে ভোটচুরির ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার সুজয় মহাজন। এ সময় হামলাকারীরা তার দুটি মোবাইল ফোন, প্রথম আলোর পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) ও নির্বাচন কমিশন থেকে দেয়া পরিচয়পত্রও কেড়ে নেয়। ওই কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনরত নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং পুলিশ ও আনসার সদস্যরাও এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। পরে পুলিশের সহায়তায় হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পান সুজয়। ঘটনার খবর পেয়ে শাহজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) পুলিশের একটি দল উপস্থিত হয়। এ সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হামলাকারীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা মোবাইল ফোন ফেরত দেবে বলে পুলিশকে জানায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলেই নিগ্রহের শিকার সাংবাদিককে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করে। তবে শেষ পর্যন্ত ফোন দুটি উদ্ধার হয়নি। 
জিবলু রহমান 

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

এক অধ্যাপকের ‘বাচ্চা ছেলে’ তত্ত্ব


সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনীয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল দারুণ এক খেল দেখিয়ে তার সুশীলীয় জারিজুরি ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি যে কত বড় মতলববাজ, তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। এই ভদ্রলোক ভাল এক ব্রত গ্রহণ করেছেন। আর তা হলো : গাছেরও খাবো, তলেরও কুড়াবো। অথবা বলা যায়, তার নীতি হলো : ‘আমি জলে নামবো, জল ছিটাবো, জল তো ছোঁবো না/ আমার যেমন বেণী তেমনি রবে, চুল ভেজাবো না।’ এই হলো আমাদের সুশীল সমাজ আর সেক্যুলারদের একেবারে জলজ্যান্ত উদাহরণ।
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এর ভাইস-চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন অনেক দিন ধরেই। শিক্ষকদের ঐ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ছুটিতে যান ভিসি অধ্যাপক ড. আমিনুল হক ভূইয়া। কিন্তু শিক্ষকদের আন্দোলন অব্যাহতই থাকে। এতে ভিসি ছুটি শেষ হওয়ার আগেই আবারও কাজে যোগ দেন। এতে পরিস্থিতি ফের আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে ইঠতে থাকে। নিয়োগ-ভর্তিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ভিসি আমিনুলের সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করে আসছেন শিক্ষকরা। কিন্তু এরকম দুর্নীতিবাজ-বান্ধব লোকই তো চাই সরকারের। এসব লোক যেমন চূড়ান্ত বেহায়া হয়, তেমনই দরকার সরকারের। ভিসি আমিনুলের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি অবিরাম মিথ্যা কথা বলেন। সরকারের শীর্ষস্থানীয় লোকেরা যেখানে অবিরাম মিথ্যা কথা বলে, সেখানে মিথ্যাবাদীরাই তো হবে তাদের প্রিয় স্যাঙ্গাৎ- এটাই তো স্বাভাবিক। ফলে আমার বিবেচনায়, সরকারের দৃষ্টিতে শাহজালালের ভিসি হবার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি আমিনুলই। শাহজালালে তিনি আওয়ামী লীগের একেবারে যোগ্য প্রতিনিধি।
আর তাই তাকে স্বপদে বহাল রাখার জন্য সরকার মরিয়া। আর শত বিরোধিতার মুখে নিজের পদ আঁকড়ে থাকতে মরিয়া আমিনুল। আর এই ভিসির বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করছেন, তারা হলেন ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদ’। এরাও বিশ্বাসের দিক থেকে কড়া আওয়ামী লীগার। একেবারে খাঁটি ‘সেক্যুলার’ বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী। তবে সবাই নাস্তিক কিনা, বলতে পারি না। এরা আবার ভিসিকে অসহযোগিতা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭টি প্রশাসনিক পদের ৩৫টি থেকেই পদত্যাগ করেছেন। ড. জাফর ইকবালও সেই পদত্যাগকারীদের একজন। তার এসব কা- যে রম্য নাটক সেটা পরিষ্কার হতে খুব বেশি দেরি হয়নি।
গত ২৯ আগস্ট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ঘটনা একটা নতুন মোড় নেয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিকক্ষকরা ঐ দিন সকাল ৯টা থেকে ভিসির কার্যালয় অবরোধ করার ঘোষণা দেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভিসিকে রক্ষার জন্য জানবাজি রাখতে প্রস্তুত। ভিসিকে শিক্ষকরা নিয়োগ দেননি। তিনি নিয়োগ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আনুকূল্যে। ছাত্রলীগের কাছে তাই শিক্ষকরা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন। বরং শেখ হাসিনার প্রতিনিধি তাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতএব ভিসিকে রক্ষায় শিক্ষকদের কপালে লাথি মারতে তাদের বাধবার কোনো কারণ নেই। আবার ভিসি তাদের টেন্ডার দিতে পারেন। খুন করলে ছাড়িয়েও আনতে পারেন। বহিষ্কৃত হলেও পরীক্ষা দেওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। ফলে এই ভিসিকেই তো তাদের চাই। আর সে কারণেই ২৯ আগস্ট সকাল ৬টা থেকেই ছাত্রলীগ ভিসি অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। শিক্ষকরা সমবেত হতে থাকেন সকাল ৮টা থেকে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা প্রথমে শিক্ষকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের গালিগালাজ শুরু করে। এ সময় ভিসি আমিনুল সেখানে এসে উপস্থিত হন। শিক্ষকরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগাররা তাকে আগলে তার অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে তারা কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে বাইরে এসে ‘জয় বাংলা’ ও ‘শাবিপ্রবির মাটি ছাত্রলীগের ঘাঁটি’ স্লোগান দিয়ে শিক্ষকদের ওপর চড়াও হয়। ছাত্রলীগাররা শিক্ষকদের ব্যানার কেড়ে নিয়ে কিল-ঘুষি চড়থাপ্পড় ও লাথি মারতে শুরু করে এবং মহিলা শিক্ষকদেরও গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এ হামলার শিকার হন ড. জাফর ইকবালের স্ত্রী পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকও। ছাত্রলীগাররা কমপক্ষে ১০ জন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে।
মজার ব্যাপার হলো শিক্ষকদের এই আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দেননি ড. জাফর ইকবাল। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ছাত্রলীগাররা তাকে নাকি আগে থেকেই বলেছিল যে, আওয়ামী লীগ বিএনপি জামায়াত হেফাজত হুজি কেউই তাকে দেখতে পারে না। সুতরাং তার এসব ঝামেলায় না যাওয়াই উচিত। ফলে তিনি শিক্ষকদের আন্দোলনে সরাসরি যোগ দেননি। তিনি একাকী দূরে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলেন। তবে তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষকরা যে কারণে আন্দোলন করছেন, আমি তা শতভাগ সমর্থন করি। এ উপাচার্য যোগদানের দু’ মাস পর আমি তার সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ আমি দেখেছি, তিনি মিথ্যা কথা বলেন। যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলেন, তার সঙ্গে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘কীভাবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতে পারল? আর সেটা আমাকে এখানে বসে বসে দেখতে হলো। উপাচার্যই ছাত্রলীগকে শিক্ষকদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছেন।’
জাফর ইকবালের আরও একটি বড় দুঃখ এই যে, ‘যে জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই স্লোগানের এত বড় অপমান আমি আমার জীবনে দেখিনি।’ তিনি বলেন, ‘আজ আমার জীবনে একটি নতুন অভিজ্ঞতা হলো। আজ যা দেখলাম, আমার জীবনে কল্পনাও করতে পারিনি। কীভাবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আমার শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতে পারল, আর সেটা আমাকে এখানে বসে বসে দেখতে হলো। এরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়, তবে আমার গলায় দড়ি দিয়ে মরা উচিত। তবে এখনও গলায় দড়ি দিয়ে না মরলেও তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় আমাকে ভুগতে হচ্ছে।’ এসময় ঘটনাস্থলের পাশেই বিশ্ববিদ্যালয় গোলচক্করে একাকী প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে সিঁড়ির ওপর বসে ছিলেন ড. জাফর ইকবাল। সুবিধাবাদী আর কাকে বলে!
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু কারও সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে এত আলোচনা হয়নি। কেউ তেমন মাথাও ঘামায়নি। আমরা খবরের কাগজে হামলার ছবি ও খবর ছেপেছি। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়ও এর প্রচার হয়েছে। কিন্তু ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে শুধু জাফর ইকবালের খবর এসেছে আলাদাভাবে। কারণ কিশোরদের লেখক হিসেবে তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। সেসব লেখার বিষয়বস্তু কিশোরদের মধ্যে নীতিনৈতিকতার বিকাশ ঘটাচ্ছে না বিনাশ সাধন করছে, সে প্রশ্নও উপেক্ষণীয় নয়। সে কারণেই তিনি আলাদা হয়েছেন। আর এমনই আলাদা হয়েছেন যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শিক্ষকরা যখন ছাত্রলীগারদের কিল-ঘুষি লাথি খাচ্ছিলেন, তখনও তিনি তাদের পাশে এগিয়ে যাননি। একা বৃষ্টিতে ভিজে নাটক করেছেন।
এর পরের কাহিনী আরও নাটুকে। আরও সুবিধাবাদী আর গাছেরটা ও তলেরটা খাওয়ার অদ্ভুত ফন্দি। তিনি জলে নামবেন, জল ছিটাবেন, জল তো ছোঁবেন না। তার যেমন বেণী তেমনি রবে, চুল ভেজাবেন না। কারণ দেখা গেল, গত ২রা সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগ শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় ৩ নেতাকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দিয়েছে আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রলীগের ৪ কর্মীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে। এর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তৎক্ষণাৎ জাফর ইকবালের বাইরের ভদ্রতার মুখোশ খসে পড়ে তার ভেতরের কুৎসিৎ চেহারাটা বেরিয়ে পড়ল।
ঐ ৭ জন ছাত্রলীগারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় একেবারে মুষড়ে পড়েছেন জাফর ইকবাল। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘শিক্ষকদের ওপর কে হামলা করেছে? ছাত্রলীগের ছেলেরা? না। এরা তো ছাত্র। আমাদের ছাত্র। এত কম বয়সী ছেলে। এরা কী বোঝে? ওদের আপনি যা বোঝাবেন, তাই বুঝবে। কাজেই আমি যখন দেখলাম, তিনজন ও চারজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তখন আমার ওদের জন্য মায়া লাগছে। এদের যারা বিপথগামী করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। এই বাচ্চা ছেলেগুলোকে মিসগাইডেড করে পাঠিয়ে দিয়েছে, এখন তারাই বিপদে পড়েছে। ছাত্রত্ব বাতিল হবে। শাস্তি হবে। ওরা কী দোষ করেছে? কাজেই এখন আমার খুব খারাপ লাগছে। ছাত্রলীগের ছেলেদের শাস্তি দেওয়াটা এক ধরনের অন্যায়। যে পাঠিয়েছে, তাদের শাস্তি দিন।’
‘ছাত্রলীগ থেকে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে’- প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জাফর ইকবাল বলেন, ‘এরা আমাদের ছাত্র।  এদের আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। আমরা ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে ওদের সঙ্গে কথা বললে ওদের ঠিক জায়গায় নিয়ে আসতে পারব। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগাছা দূর করে দিতে। আমি বলি,না। আগাছা আমরা ফুলগাছে পরিণত করব। সম্ভব। আমাদের ছাত্র। আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। আমরা ওদের ঠিক করে দেব।’ শুনলে মনে হবে, জাফর ইকবাল বোধকরি এইমাত্র কপোট্রনিক কোনো যন্ত্রে নেপচুন গ্রহ থেকে বাংলাদেশে অবতরণ করলেন।
জাফর ইকবালের বক্তব্যগুলো বড় অদ্ভুত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেটালো ছাত্রলীগের সদস্যরা। খুব স্বাভাবিকভাবেই সকল মানুষের দাবি হবে, দায়ী ছাত্রলীগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু ছাত্রলীগ নিজে যখন এমন কাণ্ডকে দোষ মনে করে তার সদস্যদের বহিষ্কার করল, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন ব্যবস্থা নিল, তখন মায়াকান্না জুড়ে দিলেন ড. জাফর। বলে বসলেন, এটা অন্যায়। অথচ, এদের কর্মকাণ্ডের জন্য মাত্র দুদিন আগেই তিনি গলায় দড়ি দিতে চাইছিলেন। ওরা নির্দোষ। তা হলে গলায় দড়ি দিতে চেয়েছিলেন কেন?
আবার বললেন, না, ছাত্রলীগ থেকে আগাছা পরিষ্কার করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী যেন ঐ ছাত্রদের তার কাছে পাঠিয়ে দেন। তিনি ছাত্রদের একেবারে মানুষ করে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী কেন, অভিভাবকরাও তো জাফর ইকবালদের কাছেই তাদের সন্তানদের পাঠিয়েছিলেন। এতদিন তাদের মানুষ না করে খুনী, গুণ্ডা-মাস্তান-টেন্ডারবাজ জিম্মিবাজ কেন করলেন? এই ছাত্রলীগাররা তো জাফর ইকবালদের কাছেই আছে।
আর তিনি একবারে কিল খেয়ে কিল হজম করে গদগদ হয়ে বললেন, ওরা নাকি বাচ্চা ছেলে। যে ‘বাচ্চা ছেলেরা অবাধে কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে, নিজেদের সহপাঠীকে খুন করতে পারে মায়ের পেটের শিশুকে গুলী করে আহত করতে পারে, টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজিতে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে, যারা নারী ধর্ষণে বেপরোয়া, তাদের ‘বাচ্চা ছেলে’ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে ড. জাফর তাহলে কী হাসিল করতে চাইছেন?
আসলে বিষয়টি খুব স্পষ্ট। ড. জাফর ইকবাল চাইছেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে। শিক্ষকদের এই আন্দোলনের ফলে সরকার যদি ভিসি ড. মোতালেবকে সরিয়ে দেয়, তাহলে সে জায়গায় ভিসি হওয়ার খায়েশ আছে ড. জাফরের। তিনি আন্দোলনরত শিক্ষকদের বলবেন, আপনাদের আন্দোলনে যোগ না দিলেও আমি শতভাগ আপনাদের সঙ্গে আছি। আন্দোলনে যারা নেই, তাদের বলবেন, আমি তো আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিলাম না, আপনাদের সঙ্গে আছি। অতএব আমাকে সমর্থন দিন। আর ছাত্রলীগারদের বলবেন, আমি তোমাদের শাস্তির বিরোধিতা করেছি। অতএব আমাকে সমর্থন করো। ভ্যালারে জাফর, বেঁচে থাক চিরকাল।
দেখা যাক, এ খেলা শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়ায়।
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

শিক্ষাঙ্গনের বিষফোঁড়া ছাত্রলীগকে সামলান!


আর কতকাল সংবাদ শিরোনামে ছাত্রলীগের জায়গা নির্দিষ্ট করা থাকবে? শিরোনাম যদি ইতিবাচক হতো খুশি হতাম। কিন্তু ছাত্রলীগ ইতিবাচক শিরোনামে থেকেছে এমন উদাহরণ নেই বললেই চলে। তাদের খবর মানে খুনাখোনির খবর, শিক্ষককে লঞ্ছিত করার খবর। আমরা বড্ড কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে এক একটি দিন অতিবাহিত করছি। মন খুলে সব কথা বলা ও লেখা মুশকিল। ইচ্ছে করলেই সব কিছু লেখা যায় না। স্বাধীন দেশের জনগণ হিসেবে এরকম পরিস্থিতি আর কত দিন থাকবে আল্লাহ মালুম। সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপর যে বর্বর নারকীয় হামলা করা হয়েছে তার নিন্দা করার ভাষা অভিধানেও নেই। খবর বেরিয়েছে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা এ হামলা চালিয়েছে। এর মাধ্যমে ছাত্রলীগ তার বেপরোয়াপনার আরেক কলংকিত নজির দেশে স্থাপন করল। টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে হল দখল, হল জ্বালিয়ে দেয়া, শিক্ষককে পেটানো ছাত্রলীগের এসব কাজের সঙ্গে দেশের মানুষ আগে থেকেই পরিচিত। তাদের সহিংসতা এমনই দুর্বিনীত হয়ে উঠেছে যে, তারা নিজেদের মধ্যেও খুনাখোনির মতো নির্মম ঘটনায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। কতটা নীচ, কতটা নির্লজ্জ হলে পরে কোনো ছাত্র তার পিতৃতুল্য শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতে পারে? আজও ভুলিনি শাহ মুহাম্মদ সগীরের বন্দনা কবিতার কথা। তিনি শিক্ষকদের শুধু বাবা-মার পরেই স্থান দেননি, বলেছেন তারা আমাদের দ্বিতীয় জন্ম দেন। সেই অর্থে শিক্ষক বাবা-মার  সমতুল্য। স্কুল জীবন থেকে শুরু করে মার্স্টাস পর্যন্ত পড়াশুনা করা সময়ে স্যারদের নিকট থেকে কত যে সহায়তা পেয়েছি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বাবা-মা জন্মদাতা। তাদের অবদান কোনো কিছু দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। তেমনিভাবে একজন শিক্ষককেও জীবন গঠনের জন্মদাতা বলা যায়। পৃথিবীর কোনো দেশে আমাদের দেশের মতো ক্যাম্পাস ও হল দখলের রাজনীতি নেই। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালেও এরকম ন্যাক্কারজনক দৃশ্য দেখা যায় না।
জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং সামাজিক গণমাধ্যমে শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হামলার সচিত্র রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত ড.জাফর ইকবালের ছবিটি সত্যিই আমাকে মর্মাহত করেছে। বৃষ্টির দিনে যেখানে আমরা সবাই বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে ছাতাকে উঁচু করে মাথার উপর ধরে রাখি সেখানে তিনি হতভম্ব, ক্ষুব্ধ ও অপমানের জ্বালায় ছাতা গুটিয়ে বসেছিলেন। শাবিপ্রবিতে যে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে তার নিন্দা বা প্রতিবাদের ভাষা আমার জানা নেই। জাফর ইকবাল গণমাধ্যমে বলেছেন আমার খুব কষ্ট লেগেছে, যখন ছাত্রলীগের ছেলেরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হামলা করেছে। যে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই স্লোগানের এতো বড় অপমান আমার জীবনে দেখিনি। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমার তো গলায় দড়ি দিয়ে মরা উচিত।’ প্রকাশিত সংবাদ থেকে জেনেছি- গত রোববার সকাল ৯টা থেকে ভিসির অপসারণের দাবিতে ভিসি ভবনের সামনে পূর্বনিধারিত অবস্থান কর্মসূচি ছিল শিক্ষক পরিষদের। সকাল ৭টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষরা ভিসি ভবনের সামনে উপস্থিত হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শিক্ষকদের সঙ্গে শুরুতে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা আন্দোলনকারী শিক্ষকদের ওপর হামলা চালান। ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে শিক্ষকদের মারধর করেন। মারধরের শিকার হন ড.ইয়াসমিন হক, অধ্যাপক মো.ইউনুছ, দীপেন দেবনাথ, সৈয়দ সামসুল আলম, মো. ফারুক উদ্দিন, মোস্তফা কামাল মাসুদ, মোহাম্মদ ওমর ফারুকসহ কয়েকজন শিক্ষক। সাধারণ ছাত্ররা কখনো শিক্ষকদের উপর হামলা করার সাহস পেত না। সরকারের সোনার ছেলেরা কেন শিক্ষকদের উপর নারকীয় হামলা চালিয়েছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। এই হামলা তো শুধু শাবিপ্রবির শিক্ষকদের উপর করা হয়নি। এ হামলা করা হয়েছে গোটা জাতির উপর। সেজন্যে রাষ্ট্র এ দায় এড়াতে পারে না। শাবিপ্রবিতে গেল কয়েক মাস থেকে যা ঘটেছে, তা শিক্ষামন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী কারোই অজানা থাকার কথা নয়। ছাত্রলীগ, যুবলীগের বেপোরোয়া কর্মকা- দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ফলাও করে প্রচার হওয়ার পরও তাদের টুঁটি চেপে ধরতে পারছে না। মায়ের পেটের শিশু ও ছাত্রলীগ যুবলীগের নিকট নিরাপদ নয়। শুধু কি তাই! চাঁদার জন্য স্কুলের বাচ্চাদের মেরে হাসপাতালে পাঠাতে ও কুন্ঠাবোধ করছে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব কতটুকু রয়েছে তা সহজে অনুমেয়।
গত ৩০ আগস্ট শাহজালালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা যে তুলকালাম কা- ঘটিয়েছে, তা নজিরবিহীন। এ নারকীয় হামলার পরদিন দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর শিরোনাম হচ্ছে : যুগান্তের শিরোনাম হলো, শাবিতে শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, আহত দশ, ভিসি লাঞ্ছিত। প্রথম আলোর শিরোনাম হলো, ছাত্রলীগের হাতে শিক্ষক এবং শিক্ষকের হাতে উপাচার্য লাঞ্ছিত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ প্রতিদিনের শিরোনাম হলো, শাহজালালে শিক্ষকদের পেটালো ছাত্রলীগ। দৈনিক নয়া দিগন্তের শিরোনাম হলো, শাবি শিক্ষকদের পেটালো ছাত্রলীগ, আহত দশ। দৈনিক সংগ্রামের শিরোনাম  হলো, শাবিতে ড. জাফর ইকবালের স্ত্রীসহ ১০ শিক্ষককে পেটালো ছাত্রলীগ। এ ঘটনাটির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিই মূলত দায়ী।
আমি যখন লেখাটি লিখতে বসেছি তখন দেশের সবোর্চ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতে ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলে রক্ত ঝরছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ আঙ্গিনা। আর লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে তখনও হয়তবা খুনাখোনির শিরোনামে ছাত্রলীগের নাম ওঠে আসবে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের একটি গৌরবোজ্জল সোনালি অতীত ছিল। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা ও ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রামেও ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল সংগঠনটি। সত্যিকার অর্থে ছাত্রলীগের অধঃপতন শেখ মুজিবুর রহমানের আমল থেকেই যাত্রা শুরু করেছে। তাদের অপর্কমে বিরক্ত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন ছাত্রলীগ পচে গেছে গলে গেছে তাদের দিয়ে কিছু হবার নয়। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান সন্তুষ্ট হতে পারেননি সেখানে ছাত্রলীগকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগ নেতাদের সংগঠন থেকে আগাছা উপড়ে ফেলতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এর দুই দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার এক ছাত্রীকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় বরিশালে সরকারি বিএম কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে গাছে বেঁধে পিটিয়েছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য প্রশংসার দাবি রাখে। তবে ছাত্রলীগের চরিত্র বদলানো আগাছা বদলানোর চেয়ে জরুরী হয়ে পড়েছে।
দেশের সব প্রতিষ্ঠানেই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির ভাগাভাগি নিয়ে অস্থিরতা বেড়েই চলছে। সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবকেরাও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কোথাও যেন এতটুকু শিক্ষার পরিবেশ নেই যেখানে নিবিঘ্নে  দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষার্থী বলতে পারে আমরা ভালো আছি। আওয়ামী সরকারের সোনার ছেলেরা এমন কোনো অপর্কম নেই যা তারা করে নাই। তাই তো সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছে ছাত্র লীগ মানেই ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, ছাত্র লীগ মানেই হত্যার রাজনীতি। সরকারের ছত্রছায়ায় ছাত্রলীগ আজ ভয়ানক দানবে পরিণত হয়েছে। ছাত্র-লীগের টুঁটি চেপে এখনই যদি ধরা না যায় তাহলে সামনের দিনগুলোতে অস্থিরতা বাড়বে বৈ কমবে না। ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় অধ্যায়ে কলংকের তিলক এই দেশে প্রথম ছাত্রলীগই লেপন করেছে। আওয়ামী-লীগ সরকারের আগের পাঁচ বছর আর এই দেড় বছরের শাসনামলে ছাত্রলীগের ইতিবাচক সংবাদ এজাতি দেখেছে বলে মনে হয় না। মুজিবের স্বপ্নের ছাত্রলীগ যখন দুঃস্বপ্নে চলে তখন তাদের কাছ থেকে হত্যা, খুন, টেন্ডারবাজি ব্যতীত আর কি আশা করা যেতে পারে?
সিলেটের শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৪ সালের ২২ নবেম্বর ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে খুন হয়েছিলেন ছাত্রলীগ কর্মী সুমন চন্দ্র দাস। শাবিপ্রবিতে শুধু যে রক্তের দাগ তা কিন্তু নয়। দেশের সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের কাছে জিম্মি। ড.জাফর ইকবাল নিজে আক্ষেপ করে বলেছেন- শিক্ষক হিসেবে আমার গলায় দড়ি দিয়ে মরে যাওয়া উচিত। এরাই আমাদের ছাত্র, এদের আমরা পড়াই। ড.জাফর ইকবাল স্বনামধন্য শিক্ষক। তাকে ছোট করা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়। তারপরেও বিবেকের তাড়নায় কিছু সত্য বিষয়  জাতির সামনে উন্মোচন করা প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো আমাদের শিক্ষাঙ্গনে কেন এমন নিষ্ঠুরতার তা-বলীলা চলছে? প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার শিক্ষক বলে যারা দাবি করেন, তাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন- পিতৃতুল্য শিক্ষকদের গায়ে ছাত্ররা কি  হাত তুলতে পারে?  কেমন শিক্ষা দিচ্ছেন? ছোটবেলা প্রবাদে পড়েছি- বৃক্ষ তোমার নাম কি, ফলে পরিচয়। বৃক্ষের পরিচয় তার ফলের মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে। আম গাছ লাগিয়ে কোনো পাগলও কাঁঠাল প্রত্যাশা করে না। অথচ  একশ্রেণীর শিক্ষাবিদরা ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক শিক্ষা দেয়া তো দূরের কথা ইসলামের কথা শুনলেই তাদের গায়ে আগুন ধরে যায়। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা না শিখিয়ে তাদের কাছে সভ্যতা প্রত্যাশা করেন কেমন করে?
মেঘ বেশিক্ষণ সূর্যকে আড়াল করে রাখতে পারে না। সূর্য তার আপন মহিমায় ঠিক সময়েই ফিরে আসে। শত চেষ্টা করেও শাক দিয়ে মাছকে ঢেকে রাখা যায় না। সত্য একদিন অবশ্যই প্রকাশিত হবে। হয়তো সে সত্য কারো কাছে তিক্ত মনে হবে। কিন্তু সত্য যে প্রকাশিত হবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। অধ্যাপক জাফর ইকবাল মনে কষ্ট পেয়েছেন জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হামলা করার কারণে। তাহলে তিনি কি চেয়েছিলেন অন্য কোন ব্যানারে স্লোগান হোক। যাতে করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা যায়। গত বছর সিলেটের এমসি কলেজের হোস্টেলে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে আগুন দেয়া হয়নি? কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়ার সময়  জয় বাংলা স্লোগান দেয়া হয়নি? একই স্লোগান দিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভিসিকে পিটিয়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়া হয়নি? তখন কোথায় ছিলেন ড.জাফর ইকবাল? তখন কোথায় ছিল মানবতাবোধ? এদেশের একজন জননন্দিত মাওলানাকে একজন ভিসি কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দিয়েছিলেন। দিন কয়েক এর ব্যবধানে সেই ভিসিকে তারই একজন শিক্ষক কুত্তার বাচ্চা বলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আজ আমার কাল তোমার। সুতরাং প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকবান মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি।
আওয়ামী-লীগ ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন তামাশার নির্বাচন করে ক্ষমতার মসনদ চর দখলের মতো  দখল করে নিয়েছে। এদেশের জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে বলেই ছাত্রলীগের রশি টেনে ধরতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন আমরা সবাই। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানের হত্যা, খুন, অপহরণের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। তার সাথে নতুন মাত্রায় যোগ হয়েছে ছাত্রলীগের সারা দেশের শিক্ষাঙ্গনের নৈরাজ্যতা। এদের মধ্যে যে এখন আদর্শের ছিটেফোঁটাও নেই তা বুঝার জন্য শেখ মুজিব হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের শিক্ষক পেটানোর ঘটনাই যথেষ্ট। তাদের নারকীয় হামলায় এটা স্পষ্ট যে, ছাত্রলীগের কর্মীরা মুখে যতই জয় বাংলা বা জয় বঙ্গবন্ধু বলুক না কেন, বাস্তবে তারা কোনো আদশর্ই ধারণ করে না। এ ধরনের অঙ্গসংগঠন টিকিয়ে রাখবেন কি-না তা আওয়ামী সরকারের ভেবে দেখা উচিত।
মোঃ তোফাজ্জল বিন আমীন

রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম গণহত্যা খুনিদের বিচার হবে কি?


‘জীব হত্যা মহাপাপ, অহিংসা পরম ধর্ম’, যারা এই কথা বলে, তাদেরই একাংশের হাতে বর্বর হানাদার পশুর মত জীবন দিয়েছে বাঘাইছড়ির শতাধিক বাঙালি কাঠুরিয়া। অথচ আজ পর্যন্ত পাহাড়ের কোন ধর্মগুরু কিংবা বনভান্তে বাবুরা এই বাঙালি হত্যার বিরুদ্ধে ন্যূনতম প্রতিবাদ করেন নাই। তারা শান্তি বাহিনীকে লালন পালন করছেন এবং মদদ দিয়ে যাচ্ছেন। আজও পাহাড়ে চলছে বাঙালি বিরোধী হিংসা ও নির্যাতনের নিষ্ঠুর চর্চা। ত্রিশ হাজার বাঙালি জীবন দিয়েও পাহাড়ে তাদের স্বকীয় ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নাই। এর দায়দায়িত্ব কি শুধুই পার্বত্যবাসী বাঙালিদের? দেশের ষোল কোটি মানুষের  এজন্য কি কোন দায়-দায়িত্ব নেই?
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম উপজেলা লংগদু, তারচেয়েও আরো দুর্গম বাঘাইছড়ি উপজেলা। এখানে বসবাসরত অধিকাংশ বাঙালিই শ্রমিক পেশা গাছ-বাঁশ কাটা। হতভাগা এসব কাঠুরিয়াদের বড় অংশ থাকে লংগদুর মাইনীমুখ, গুলশাখালী তেমাথা, কালাপাকুজ্জাসহ বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে। ১৯৯৬ সালের প্রথম দিক থেকেই স্থানীয় গাছ ব্যবসায়ীদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের সাথে। দীর্ঘদিন তারা দালালের মাধ্যমে নির্ধারিত হারে চাঁদা নিত। কিন্তু, হঠাৎ করে তৎকালীন শান্তিবাহিনী (জেএসএস) চাঁদার পরিমাণ ৩/৪ গুন বাড়িয়ে দেয়। নতুবা গাছ-বাঁশ-কাঠের ব্যবসা বন্ধ বলেও হুমকি দেয়। ফলে, নিরীহ দরিদ্র বাঙালি কাঠুরিয়াদের পেটে লাথিপড়ে, অনাহারে অর্ধাহারে জর্জরিত জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের ঘনছায়া। তদুপরি, জীবন বাজি রেখে মাঝেমধ্যে গহীন জঙ্গলে গিয়ে তারা কাঠ কাটতো, দুর্গম পাহাড় বেয়ে অনেক সময় হাতীর সাহায্যেও বড় বড় গাছের গুঁড়ি টেনে এনে লেকের পানিতে ভাসিয়ে নৌকার সাহায্যে শহরের বড় বড় কাঠগুদামে আহরণ করা হতো। সেই হতভাগা কাঠুরিয়াদের উপরই ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নেমে আসে ভয়াবহ দুর্যোগ। উপজাতীয় শান্তিবাহিনী কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা বৃদ্ধির আবদার মেটাতে ব্যর্থ হয়ে নিরীহ গরীব কাঠুরিয়াদের উপর চরম প্রতিশোধের জাল আটে। বাঙালি কাঠুরিয়াদেরকে আলোচনার ফাঁদে ফেলে দালালের মাধ্যমে জড়ো করা হয় বাঘাইছড়ি থানার পাকুয়াখালীর গহীন অরন্যে।
 সেদিন সরল বিশ্বাসেও পেটের তাগিদে জীবিকার অন্বেষণে নানারূপ সন্দেহ ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে শতাধিক কাঠুরিয়া জড়িত হয় পাকুয়াখালীতে। বাড়িতে স্ত্রী, পুত্র-কন্যা ও ছোট শিশুটিও হা করে আছে, অন্নের আশায়। বাবা কাঠ কেটে আসবে, রোজগারের টাকা পেলে তবেই বাজার থেকে চাহিদা মতো কিছু কিনাকাটা হবে। কিন্তু ২, ৩, ৪, ৫, ৬,  ৭, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাঠুরিয়াদেরকে চাঁদা নির্ধারণের অজুহাতে নেয়া হলেও কেউই ফেরত আসছেনা। অজানা আশঙ্কায় কাঠুরিয়াদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেল। স্বজনরা কেন জানি আপনহারা ব্যথায় কেঁদে উঠলো। বাঘাইছড়ির লোমহর্ষক ও হৃদয় বিদারক এই হত্যাকাণ্ড প্রথমে ধামাচাপা দেয়া হয়েছিল। স্থানীয় সাবেক এমপি দীপংকর তালুকদার ও তার দলীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এই হত্যাকাণ্ড কে গুজব এবং সরকার বিরোধীদের ষড়যন্ত্র বলেও প্রচার করেছিল। এমনকি, এমপি সাহেব, রাঙামাটির ডিসি, এসপি, সেনাবাহিনীসহ সবাইকে গুজবে কান না দিয়ে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। কিন্তু মানবতার ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারেনি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী। তাদেরই একটি অংশ এগিয়ে আসে স্বজনহারা বাঙালিদের ডাকে। দুই/তিনদিন ধরে নিখোঁজ আপনজনের জন্য কোন সন্ধান না পেয়ে থানার ওসি এবং সেনাজোনের কাছে ছুটে যায় তারা। এদিকে খুনী শান্তিবাহিনীর মৃত্যুকূপ থেকে পালিয়ে আসা একজনকে সন্দেহজনকভাবে আটক করা হয়। কিন্তু ৯ সেপ্টেম্বর সকাল বেলা যখনি দেশপ্রেমিক লংগদু জোনের সেনাবাহিনী গভীর জঙ্গল এবং পাহাড়ের খাদ থেকে ২/৪ টা করে লাশ আনতে শুরু করলো, তখনি বাঘাইছড়ি হত্যাকান্ডের রহস্য বেরিয়ে গেল। কাটা, ছেঁড়া গলিত লাশগুলো ২/৩ দিনে পচে দুর্গন্ধে ভরে গেছে, তাদের চেহারাও চেনা মুশকিল। দা, কুড়াল, বেয়নেট, ছুড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এবং তিল তিল করে অমানুষিক অত্যাচার করে তাদেরকে হত্যা করেছিল হানাদার উপজাতীয় শান্তি বাহিনী। বর্বর হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীও ১৯৭১ সালে এভাবে পশুর মতো নির্যাতনের মাধ্যমে বাঙালী হত্যা করে নাই। অথচ, সন্তু লারমা বাহিনী তার চেয়েও জঘন্য পাশবিক জানোয়ারের আচরণে বাঙালি হত্যা করেছে। তারপরও রাঙামাটির ডিসি সাহেবকে এমপি দীপংকর তালুকদার বলেছিলেন- “আমি চাই না, এই ঘটনার জন্য পাহাড়ে কোন উপজাতির একটি পশম ও কেউ যাতে ছিঁড়তে পারে”। প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়, যাতে উত্তেজিত বাঙালিদেরকে কঠোরভাবে দমন করা হয়। অন্যদিকে, প্রতিদিনই ঢাকা থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা লংগদু আসতে থাকেন। আমু- তোফায়েল-রাজ্জাক-হাসনাত-মহিউদ্দিনসহ ডজনখানেক মন্ত্রীরা পাহাড়ে ছুটে আসেন। স্তম্ভিত হতবিহবল হয়ে যান এই বীভৎস হত্যাকাণ্ড দেখে। মানুষ এত বড় নিষ্ঠুর হতে পারে, এত জঘন্য হতে পারে, তা সেদিনের সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করে লীগের মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিশদ বিবরণও তুলে ধরেছিলেন। চীন যাত্রার প্রাক্কালে অশ্রুসজল কন্ঠে সেদিন সাংবাদিকদের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে খুনীদের বিচার করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাছাড়া ৪/৫টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল যাদের তদন্ত রিপোর্ট আজ পর্যন্ত জাতিকে জানানো হয় নাই।
কিন্তু দীর্ঘ ১৯ বছরেও বাঘাইছড়ি কাঠুরিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর তথাকথিত শান্তিচুক্তির মাধ্যমে খুনী শান্তিবাহিনীকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদেরকে কঠোরভাবে দমন না করে বিদেশী চাপের মুখে সন্ত্রাসপূজার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত করেছিল লীগ সরকার। দীর্ঘ ৪০ বছর পর যদি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হতে পারে, তবে ১৯ বছর পরও কেন বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না? খুনী শান্তিবাহিনীর এটা হল গুরুতর ফৌজদারী অপরাধ, যার বিচার যে কোন সময় করা যেতে পারে। এই বিচারে কোন বাধা নাই। হিটলার- মুসোলিনীর বিচার যদি হতে পারে, তবে ঘাতক শান্তিবাহিনীর নেতা সন্তু লারমার বিচার হবে না কেন? আজ তাকে আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান পদে রেখে জনগণের খাজনা- ট্যাক্সের টাকায় প্রতিমন্ত্রীর মতো বেতন-ভাতা সুবিধাদি দেয়া হচ্ছে। জনগণ কেন এই বেতন দেবে, কেন খুনীকে লালন করা হবে? এর পরও সন্তুলারমারা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অযুহাতে পাহাড়ে বাজারহাট বন্ধ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের সাথে অসহযোগ আন্দোলন করার হুমকি দিচ্ছে। আদিবাসী চক্রান্তের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের মত স্বাধীন জুমল্যান্ড করার জন্য জাতিসংঘ, বিটিশ নেতা লড এরিক এভিবুরি, সুলতানা কামালের পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশন, রাশেদ খানের কাপেং ফাউন্ডেশন, গারো উপজাতি নেতা এবং তথাকথিত আদিবাসী অধিকার ফোরামকে ব্যবহার করে চলছেন। এজন্য দেশবাসীকে সদা সজাগ থাকা একান্ত প্রয়োজন।
বাঘাইছড়ি হত্যাকান্ড আমাদের জাতীয় জীবনে এক বিষফোড়া হয়ে আছে। জাতি এই কলঙ্কের বোঝা কতকাল বহন করবে? নিরীহ মানুষ হত্যাকাণ্ড এই জাতি কিভাবে সহ্য করছে? দেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ে, জঙ্গলে অরন্যে, খালে-বিলে, নদী-নালায়, হাট-বাজারে বহু বাঙালিকে জীবন দিতে হয়েছে। এটা কোন স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড নয়, এটা হল রাষ্ট্রদ্রোহী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ঠাণ্ডামাথায় বাঙালি হত্যাকাণ্ড। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা-এর ন্যূনতম শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। আজও পর্যন্ত পাহাড়ে বাঙালিরা উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হাতে নির্যাতিত নিপীড়িত হচ্ছে। অথচ মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে দারুণ নীরবতা পালন করছে। কিন্তু কেন?
দেশের প্রচলিত আইনেই বাঘাইছড়ির খুনীদের বিচার করতে হবে। নিরীহ সেসব কাঠুরিয়াদের অশরীরী আত্মা কখনো এই জাতিকে ক্ষমা করবে না। সভ্য সমাজ, সুধী সমাজ, আধুনিক বিশ্বের দাবিদার বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ যেদিন এই খুনীদের বিচারে জেগে উঠবে, সেদিনই শহীদের আত্মা শান্তি পাবে। জাতি কলঙ্কমুক্ত হবে, পরিশুদ্ধ হবে দেশের জনগোষ্ঠী। নতুবা সভ্য সমাজ হিসেবে আমরা বিশ্ববাসীর কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। সন্তুবাবুরাও পাহাড়ে ত্রিশ হাজার বাঙালির অশরীরি আত্মার আর্তনাদ থেকে মুক্তি পাবেন না। ক্ষুধামুক্ত সবুজ শ্যামল উপজাতি বাঙালিদের বাসস্থান হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। এ জন্যই চাই খুনিদের বিচার। 

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

উন্নয়নের চাপে খাল যখন নালা


ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল। অতীতের এমন চিত্র এখনও লক্ষ্য করা যায়। যেমন ‘উন্নয়নের চাপে খাল সব নালা’ শিরোনামের খবরটি। ৫ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় মুদ্রিত খবরটিতে বলা হয়: ‘উন্নয়নের’ নামে রাজধানীর খালগুলোকে সরু নালায় পরিণত করেছে ঢাকা ওয়াসা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের আওতায় ১২টি খাল পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন করছে সংস্থাটি। চার বছরে এ কাজে ৭০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও খাল উদ্ধার ও উন্নয়ন হয়নি। উল্টো খালে অবৈধ স্থাপনা বেড়েছে। প্রকল্পটির আওতায় খালের দুই পাড় কংক্রিট দিয়ে বেঁধে দেয়ার কাজ প্রায় শেষ। এর ফলে জলাবদ্ধতা বেড়েছে। রাজধানীর চারটি খাল ঘুরে দেখা গেছে, খালগুলো মূল আয়তনের চেয়ে আরও সরু করে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, বেশির ভাগ এলাকায় খালগুলোর দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা রয়ে গেছে। কিছু স্থানে উচ্ছেদ অভিযান হলেও সপ্তাহ ঘুরতেই অবস্থা আগের মতোই হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টি হলে খাল  উপচে পানি আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়ছে। আবার কংক্রিটের দেয়াল দেয়ায় বৃষ্টির পানি খালে গড়িয়ে পড়তেও পারছে না। ফলে খালপাড়ের বাসিন্দারা জলাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন।
আসলেই ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিতেছেন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, ৭০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খাল উদ্ধারও হয়নি, উন্নয়নও হয়নি। উল্টো খালের পাড়ে অবৈধ স্থাপনা বেড়েছে, বেড়েছে জলাবদ্ধতাও।
উল্লেখ্য যে, ২০-২৫ বছর আগেও রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৫০টি খাল ছিল। এখন ঢাকা ওয়াসার কাগজে আছে ২৬টি। আর কথিত উন্নয়নের তালিকায় আছে ১২টি। রাজধানীর খালগুলো নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণাতেও এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বুয়েটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে করা ওই গবেষণায় ঢাকার ওয়াসা খালের প্রস্থ সংকুচিত করে পাড় বাঁধাই করার সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, খালগুলোর প্রস্থ অনেক কমিয়ে পাড় বাঁধাই করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, প্রকল্পের আওতায় জিরানি ও বাসাবো খালের প্রস্থ ৬ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। এগুলোর প্রস্থ অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিটার হওয়ার কথা। ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে ওয়াসা খাল পুনরুদ্ধারের নামে যা করছে তা বন্ধ করা উচিত। প্রসঙ্গত তিনি আরো বলেন, একটি খালের আয়তন বর্ষাকালে কত থাকে, অতিবৃষ্টির সময় খালের প্রস্থ কত থাকে- এসব কিছু বিবেচনা করে এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণ করতে হয়। তারপর কী উন্নয়ন করা হবে তা ঠিক করে কাজ শুরু করতে হবে।
রাজধানীর খালগুলোর পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন কাজে সাফল্য অর্জিত হয়নি। অথচ সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে, এক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকলে জলাবদ্ধতা দূর করা যাবে না এবং রাজধানীকেও দূষণমুক্ত করা যাবে না। রাজধানীর খালগুলো কারা দখল করছে এবং খালের দুই পাশে কারা অবৈধ স্থাপনা তৈরি করছে তাতো সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। তারপরও অপরাধীদের দমন করা যাচ্ছে না কেন? আমরা একথা জানি যে, দুর্বল মানুষরা বা সাধারণ নাগরিকরা খাল দখল করে না, অবৈধ স্থাপনাও নির্মাণ করে না। এসব কাজ যারা করেন তারা বেশ শক্তিশালী। তবে তারা কি এতটা শক্তিশালী যে, সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না? এমন প্রশ্নের জবাব সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে। আর ওয়াসা তাদের কাজে কেন সফল হচ্ছে না সেই বিষয়টিও পরখ করে দেখা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ভারতের দু’জন রাষ্ট্রপতির কথা শুনুন


আজকের নিবন্ধে ভারতের দু’জন রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে বলবো। একজন ‘মুসলমান’ এপিজে আবদুল কালাম, অন্যজন ‘বাঙালী’ প্রণব মুখার্জি। এই দু’জনকে বেছে নেয়ার কারণ সম্পর্কে পাঠকরা নিজেরাই বুঝতে পারবেন বলে আশা করি। প্রথমজন সম্প্রতি নিজে মারা গেছেন, অন্যদিকে দ্বিতীয়জনের স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। তিনি, শ্রীমতি শুভ্রা মুখার্জি আবার বাংলাদেশের নড়াইলের কন্যা ছিলেন। ফলে তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটু বেশিই হৈচৈ হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার ছোট বোন ও মেয়েকে নিয়ে দিল্লী ছুটে গেছেন। শুভ্রা মুখার্জির শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছেন। আরো অনেকের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। বলা যায়, শোকের বন্যা না হলেও বৃষ্টি বইয়ে দিয়েছেন তারা। সেদিকে যাওয়ার পরিবর্তে ‘মিসাইলম্যান’ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠা এপিজে আবদুল কালাম প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। বাংলাদেশে ভারতের এই সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়েও মাঝখানে ক’দিন বেশ আলোচনা হয়েছে। কারণ ছিল তার মৃত্যু। দিল্লী থেকে এসে মেঘালয়ের শিলং শহরের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করার সময় মারা গেছেন তিনি। তার জীবন ও কীর্তি তথা অবদানকে নিয়ে আলোচনাও যথেষ্টই হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ, ভারতকে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী বানিয়ে গেছেন। মিসাইল নির্মাণের কারণে তার পরিচিতি ছিল ‘মিসাইলম্যান’ হিসেবে।
আমার নিজের অবশ্য এপিজে আবদুল কালামের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ নেই। কারণ, সম্মান এমন কাউকেই করা যায়, যার কাছ থেকে মানুষ সভ্যতার বিকাশ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের জন্য বিশেষ কিছু শিখতে এবং অনুপ্রাণিত হতে পারে। সেদিক থেকে এপিজে আবদুল কালামের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এর কারণ, তার ‘সাফল্য’ বা ‘কৃতিত্ব’ বলতে সাধারণত পারমাণবিক বোমা ও মিসাইল বানানোর কথাই উল্লেখ করা হয়। এটা এমন এক বোমা ও মিসাইল, যা দিয়ে একই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকে হত্যা করা যায়। ধ্বংস করা যায় সভ্যতাকেও। কখন কোন দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সত্য হলো, ভারত কোনো না কোনো সময় এই বোমা ও মিসাইলের ব্যবহার করবে- এমন চিন্তা থেকেই এ দুটি মারণাস্ত্র বানিয়ে গেছেন এপিজে আবদুল কালাম। ভারতীয় হিসেবে এই ধ্বংসাত্মক ‘সাফল্য’ দেখানোর বাইরে তিনি মানবতার জন্য এবং সাধারণভাবে ভারতীয়দের জন্য সৃষ্টিশীল বা কল্যাণধর্মী তেমন অবদান রেখেছেন বলে জানা যায় না। তার মৃত্যুর পর ভারতীয় মুসলমানদের কথাও উঠে এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। ভারতে বছরের পর বছর ধরে দাঙ্গায় মুসলমানদের অসহায় মৃত্যু ঘটছে। মুসলমানদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে এপিজে আবদুল কালামকে কখনো সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ও গুজরাট ও মহারাষ্ট্রসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মিথ্যা অভিযোগে দাঙ্গা বাধিয়ে শয়ে শয়ে মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু মুসলমানদের রক্ষার জন্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে এপিজে আবদুল কালাম কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে শোনা যায়নি।
মুসলমান নাম নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদটিতে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি বরং ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের জন্য ‘যুক্তি’ দেখানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন। হিন্দুত্ববাদীরা বিশ্বকে জোর গলায় বলতে পেরেছে, ভারত এতটাই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ রাষ্ট্র যে, এপিজে আবদুল কালামের মতো একজন মুসলমানও সেখানে রাষ্ট্রপতি হতে পারেন! এর ফলে কোনো দেশকেই একথা বিশ্বাস করানো সহজ হয়নি যে, যে দেশে একজন মুসলমান রাষ্ট্রপতি হতে পারেন সে দেশে মুসলমানদের হত্যা ও উচ্ছেদ করা সম্ভব। হত্যা ও উচ্ছেদ করা হয়েও থাকে। নামে মুসলমান হয়েও এভাবেই ভারতীয় মুসলমানদের হত্যা ও নির্যাতনের ‘ওপেন লাইসেন্স’ দিয়েছিলেন এপিজে আবদুল কালাম। হিন্দুত্ববাদীরাও সে লাইসেন্সের সদ্ব্যবহার করেছে যথেচ্ছভাবেই। এখনো মুসলমানরা সর্বাত্মকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন ভারতে। এজন্যই যতো বড় ‘বিজ্ঞানী’ হোন না কেন, লাখ লাখ মানুষ ও প্রাণীকে হত্যা এবং সম্পদ ও সভ্যতা ধ্বংসের জন্য পারমাণবিক বোমা ও মিসাইল বানিয়ে যিনি ভারতের মতো সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছেন, তেমন একজন ব্যক্তির কাছে বাংলাদেশীদের শিক্ষণীয় কিছু থাকতে পারে কি নাÑ সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। উঠেছেও। বলা হয়েছে, নীতি-নৈতিকতা, ধর্ম, মানবিকতা বা সভ্যতার উন্নয়নের মতো কোনো বিষয়ে তিনি বাংলাদেশীদের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হতে পারেন না।
এবার ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি প্রসঙ্গ। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতৃত্বে তখনকার ক্ষমতাসীন ইউপিএ জোটের মনোনয়ন পেয়ে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। প্রথম ‘বাঙালী’ রাষ্ট্রপতি হওয়ায় বাংলাদেশে ভারতের ‘ছাতা ধরনেওয়ালারা’ আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিলেন। অনেকে এমনকি একথা পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ ভারতের রাজ্য হয়ে যায়নি। পত্রিকার কলামে ও টেলিভিশনের টক শোতে তারা প্রণব-বন্দনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। থৈ-থৈ অবস্থায় দেখা গেছে তাদের। তারা বলেছিলেন, প্রণব মুখার্জির এই ‘কৃতিত্বের’ জন্য বিশ্বের যেখানে যতো ‘বাঙালী’ আছে তাদের প্রত্যেকেরই গর্বিত ও আনন্দিত হওয়া উচিত! আসলেও কি তাই? অন্যদের কথা না হয় বাদই দেয়া গেলো, প্রণব মুখার্জির নিজের রাজ্য পশ্চিম বঙ্গের সব ‘বাঙালী’কেও কিন্তু থৈ-থৈ করে উঠতে দেখা যায়নি। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং এদেশের কারো কারো ‘দিদিমনি’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও প্রণব মুখার্জিকে রশি দিয়ে বেঁধে নামিয়ে আনারই চেষ্টা চালিয়েছিলেন। মূলত তার ইন্ধনেই প্রণবের বিরুদ্ধে সাবেক স্পীকার পি এ সাংমাকে রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড় করানো হয়েছিল।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রণব মুখার্জিকে দীর্ঘ ৬৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। কথা শুধু এটুকুই নয়। বাস্তবে রাষ্ট্রপতি বানানোর নামে প্রণব মুখার্জিকে প্রধানমন্ত্রিত্বের রেস বা দৌড় থেকে সুকৌশলে সরিয়ে দিয়েছিল কংগ্রেস। ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকে গান্ধী পরিবারের অতি বিশ্বস্ত হিসেবে ভূমিকা পালন করে এলেও প্রণব মুখার্জি কংগ্রেসের জন্য ‘বার্ডেন’ তথা বোঝা হয়ে উঠেছিলেন। সোনিয়া গান্ধী না তাকে গিলতে পারছিলেন, না পারছিলেন উগলে ফেলতে। সুযোগ পেলেই প্রণব মুখার্জি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আবদার জানিয়ে বসছিলেন। ওই সময়ে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আরো একবার তৎপর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু যতো বিশ্বস্ত হোন না কেন, একদিকে তিনি ‘বাঙালী’ অন্যদিকে আবার চেষ্টা চলছিল রাজিব ও সোনিয়া গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য। সে কারণেই কংগ্রেসের ঘাড় থেকে প্রণব নামের ‘বোঝা’টিকে ঝেড়ে ফেলে দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেটাই করেছে কংগ্রেস। প্রণব মুখার্জি যাতে এদিক-সেদিক করতে না পারেন সেজন্য স্বয়ং সোনিয়া গান্ধী তার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি বানানোর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ভারতের রাজনীতি থেকেই প্রণব মুখার্জিকে বিদায় করেছেন সোনিয়া গান্ধী। সুতরাং আনন্দে ধেই ধেই করে নেচে ওঠার এবং বিশ্বের সব ‘বাঙালী’র প্রতি নৃত্য করার আহবান জানানোর আগে সংশ্লিষ্টদের উচিত ছিল একটু সংযম দেখানো এবং পুরো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা।
প্রসঙ্গ যখন এসেছেই তখন বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রণব মুখার্জির ভূমিকার কথা স্মরণ করা যাক। দেখা যাক, ভারতের এই ‘বাঙালী’ রাজনীতিক বাংলাদেশের কোনো উপকার করেছেন কি না। মাঝখানে কিছুদিনের বিরতিসহ ১৯৭৭ সাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পদে রয়েছেন তিনি। এ সময়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য থেকে সীমান্তে হত্যা ও পানি সমস্যাসহ কোনো একটি বিষয়েই বাংলাদেশ লাভবান হতে পারেনি। এর সহজ অর্থ, যাকে ‘বাঙালী’ হিসেবে ‘পূজনীয়’ করার চেষ্টা করা হয়েছে সেই প্রণব মুখার্জিও অন্য ভারতীয়দের মতোই ক্ষতি ছাড়া বাংলাদেশের কোনো উপকার করেননি। বিভিন্ন উপলক্ষে তাকে বরং বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী ভূমিকা পালনেই বেশি তৎপর দেখা গেছে। উদাহরণ দেয়ার জন্য ২০০৭ সালের নভেম্বরে সিডরের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সঙ্গে প্রণব মুখার্জির ভূমিকার কথা উল্লেখ করতেই হবে। তিনি তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সিডরের পর পর ঝটিকার বেগে উড়ে এসেছিলেন প্রণব মুখার্জি। মনে হয়েছিল যেন ‘উদার হস্তে’ সাহায্য দেয়াই তার উদ্দেশ্য! কিন্তু পরে দেখা গেলো, তিনি আসলে শুধু দেখতেই এসেছিলেন। কারণ, পাঁচ লাখ টন চাল রফতানির অঙ্গীকার ঘোষণা করলেও তারা এমনভাবেই নতুন নতুন শর্তের বেড়াজালে বেঁধে ফেলার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের তখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা হয়েছিল। প্রণব মুখার্জির আশ্বাসে মইন-ফখরুদ্দিনদের অসাংবিধানিক সরকার সে সময় অন্য কোনো দেশ থেকে চাল আমদানির চেষ্টা করেনি। ফলে বাংলাদেশকে প্রচণ্ড খাদ্য ঘাটতিতে, প্রকৃতপক্ষে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে হয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘চাউল দাদা’ নামে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন প্রণব মুখার্জি। প্রমাণিত হয়েছিল, নামে ‘বাঙালী’ হলেও বাংলাদেশের প্রতি সামান্য মমতাও নেই প্রণব মুখার্জির।
ভারতের এই রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে তথ্যের দ্বিতীয় কিস্তি জানা যাবে পিলখানা হত্যাকা- এবং তার আগের ও পরের কিছু কথা স্মরণ করলে। এ ব্যাপারে ২০১১ সালের ২৭ মার্চ ‘উইকিলিকস’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু খবর প্রকাশ করেছে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’ এবং ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’। উইকিলিকস এবং ভারতের উক্ত দু’টি দৈনিকের রিপোর্ট পাঠকদের অনেকেরই পড়া আছে নিশ্চয়। এই সাথে প্রণব মুখার্জির ২০০৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এবং ২০১০ সালের ৭ আগস্টের সফরের কথাও সকলের মনে থাকার কথা।
এভাবে যে কোনো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, প্রণব মুখার্জির ভূমিকা কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশের পক্ষে আসেনি। এ সম্পর্কে জানার জন্য বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার পড়ে না। ড. মনমোহন সিং-এর সরকারের আমলেও প্রণব মুখার্জিই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ধারকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। বাংলাদেশ কি পেয়েছে বা আদৌ কিছু পেয়েছে কি না পাঠকরা তা ভেবে দেখতে পারেন। এজন্যই এমন আশাবাদ মোটেও ঠিক নয় যে, ‘বাঙালী’ রাষ্ট্রপতি হলেও প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের জন্য ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ নির্মাণ করে দেবেন।
সবশেষে বলা দরকার, ‘মুসলমান’ এপিজে আবদুল কালাম যেমন মুসলমানদের জন্য এবং ‘বাঙালী’ প্রণব মুখার্জিও তেমনি ‘বাঙালী’ ও বাংলাদেশের কল্যাণের জন্য কোনো ভূমিকাই পালন করেননি। করবেন বলে আশা করাটাও বোকামীই হবে!
আহমদ আশিকুল হামিদ 

বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

আগস্ট মাসে রাজনৈতিক সন্ত্রাস


গত মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নেই, উত্তপ্ততা নেই। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও সরকারি দলের সন্ত্রাস কমতির কোনো লক্ষণ নেই। প্রকারন্তরে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং তাদের ছাত্র-যুব-কৃষক-শ্রমিক অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সন্ত্রাস কোনো বাধাই মানছে না। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে কেবলমাত্র আওয়ামী লীগ কিম্বা তাদের অঙ্গ অথবা সহযোগী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতায় ৬২টি প্রাণ হারায়। আগস্ট মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই লেখা। সরকারি দল, তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সন্ত্রাসের কারণে দল ও সরকারের উপর মহলের ইশারায় এ মাসে দলের মধ্যে তিনটি ক্রস ফায়ার ও দু’টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় প্রাপ্ত তথ্যে নিহত ১২। এই ১২ জনের ১২ জনই আওয়ামী লীগ বা তাদের লোকদের সংশ্লিষ্টতায় খুন হয়। আহত ২৩২, গ্রেফতার ৩৬৯ এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ১৪ জন। দণ্ডপ্রাপ্ত এই ১৪ জনের ১৩ জনই আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং একজন ছাত্রদল নেতা। বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা প্রায় সকলেই হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলার শিকার। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে আগস্ট মাসে নিহত হয়- (১) পাবনা শহরের শালগাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের হাতে নিহত তুলশী কুমার দাস (পরিচ্ছন্ন কর্মী), (২) ফেনীতে মাদক ব্যবসার সাথে ছাত্রলীগ নেতাদের মাদক সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে নিহত হায়দার আলী (ছাত্রলীগ), (৩) ঢাকার কাফরুলে আওয়ামী লীগের হাতে নিহত রুবেল মিয়া (সৈনিক লীগ), (৪) সিলেটে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে নিহত আব্দুল আলীম (ছাত্রলীগ), (৫) ঢাকার বাড্ডায় আওয়ামী লীগের দলীয় গ্রুপিংয়ে নিহত সামসুর রহমান মোল্লা (আওয়ামী লীগ), (৬) ফিরোজ আহমেদ মানিক (আওয়ামী লীগ), (৭) মাহাবুবুর রহমান সোহেল ওরফে গামা (স্বেচ্ছাসেবক লীগ) ও (৮) আব্দুস সালাম (যুবলীগ), (৯) কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের হাতে নিহত বিদ্যুৎ হোসেন (যুবলীগ), (১০) ঢাকার হাজারীবাগে ছাত্রলীগের হাতে নিহত রাজা মিয়া (সাধারণ কিশোর), (১১) ঢাকার ওয়ারিতে দলীয় কোন্দলে নিহত আব্দুল মান্নান (যুবলীগ) এবং (১২) গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দলীয় কোন্দলে যুবলীগের হাতে রফিকুল ইসলাম (যুবলীগ)।
আওয়ামী শিবির : ১ আগস্ট পাবনা শহরের শালগাড়িয়ায় হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্য তুলশী কুমার দাসকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করেছে সাবেক ছাত্রলীগ জেলা সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রুমন, তার বাবা কে.এম হাসান হীরা, চাচা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক আব্দুল হান্নান ও ছাত্রলীগ কর্মী সোহেলসহ এগার জন। পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত সাবেক ছাত্রলীগ জেলা সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রুমন ও তার বাবা কে.এম হাসান হীরাকে গ্রেফতার করেছে। একটি সাইকেল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতার ভাই ও নিয়ম ফুড কোম্পানীর মালিক ফরহাদ হোসেনের দোকানের পরিচ্ছন্নকর্মী তুলশীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরে বিক্ষুদ্ধ পরিচ্ছন্ন কর্মীরা ঐ আওয়ামী লীগ নেতা ও তার ভাইয়ের বাড়ি ভাংচুর করেছে। ফেনী সদরে সুলতানপুরে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বে আহত ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি ছাত্রলীগ নেতা হায়দার আলী মারা গেছে। মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সংঘর্ষে ও গোলাগুলীতে হায়দার আলী, ওমর ফারুক, শামচুন্নাহার আহত হয় এবং হামলা-পাল্টা হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগ মাদক সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করলেও পুলিশ ছাত্রলীগের মাদক ব্যবসার দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করেছে। হায়দার আলী ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২ আগস্ট রাতে মারা যায়। ২ আগস্ট মাগুরার মমিন উল্লাহ ভূঁইয়া হত্যা মামলার হুকুমের আসামী ছাত্রলীগ মাগুরা জেলা সহ-সভাপতি সুমন সেনকে বিকালে ঢাকার কল্যাণপুর থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। আর পুলিশ নজরুল নামে একজন এজাহার নামীয় আসামীকে গ্রেফতার করেছে। পাবনা শহরের চাঁদাখার বাঁশতলা অবস্থিত দুদক কার্যালয়ে হাজিরা দিতে গেলে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হক টুকুর ক্যাডার পাবনার কুখ্যাত প্রতারক ড. মোল্লা মো. কফিল উদ্দিনকে দুর্নীতির মামলায় আটক করেছে দুদক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হলে সিট দখলকে কেন্দ্র করে হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে হল ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সৈকত হোসেন, হাসিবুর রহমান হাসিব, মাসুদ ও আশরাফুল আহত হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে পুলিশের উপর হামলা ও লাঞ্চিত করা মামলার আসামী যুবলীগ নেতা শফিকুল ইসলামের স্বীকারোক্তি অনুসারে তার অফিস রুম হতে সহযোগী জিল্লুর রহমানকে ১টি শটারগান ও ৫ রাউন্ড গুলীসহ গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
৩ আগস্ট কুষ্টিয়ার মিরপুরে পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে যুবলীগ মিরপুর উপজেলা সভাপতি কাশেম জোয়র্দ্দারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ৩০ জুলাই রাত আটটায় কুষ্টিয়া মিরপুরের ঈগল চত্বরে বকুল ফল ভাণ্ডারের মালিকের সাথে বাকবিতণ্ডা এবং তাকে মারধরের অভিযোগে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলে যুবলীগ নেতা পুলিশের উপর হামলা করে ও একজন পুলিশ আহত হয়। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে মোর্শেদুজ্জামান খান বাবু ও সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, হামলা, ভাংচুর ও ছাত্র হত্যার অভিযোগ এনে ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৭ এবং হলের ১২ নেতা টিএসসিতে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে তাদের অবাঞ্চিত ঘোষণা করে একযোগে পদত্যাগ করে। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ঘটনাটি তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। রাজবাড়ীতে ঈদের আগে পাংশা বাজারে কুন্ডর দু’টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর দায়ে করা মামলায় উপজেলা যুবলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজ ম-লকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ৪ আগস্ট রাতে ঠাকুরগাঁওয়ে নরেশ চৌহান সড়কে জেলা পরিষদ মার্কেটে ছাত্রলীগের জেলা কমিটি গঠন নিয়ে সংঘর্ষে মারাত্মক আহত অবস্থায় অনুপ ও অনিক নামে দু’জনকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্দেশে জেলা কমিটি ঘোষণা করার পর অপর গ্রুপ তা প্রত্যাখ্যান করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। জামালপুরের সরিষাবাড়ীর আরামনগর বাজারে প্রিপারেটরি স্কুল ও কোচিং সেন্টারের শিক্ষক লেবু মিয়াকে তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রশীদের বাসভবনে ধরে নিয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডার হাসমত, মহির উদ্দিন ও জব্বারসহ ১০-১২ জন এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মারে এবং গলা চিপে হত্যা করার চেষ্টা করে। উল্লেখিত শিক্ষক এক ছাত্রী অংক করতে না পারায় দাড় করিয়ে রাখায় আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা এ ঘটনা ঘটায়। এর আগে ক্যাডাররা স্কুল ভবনে হামলা করে শিক্ষক লেবু মিয়াকে না পেয়ে অন্যান্য শিক্ষকদের হুমকি দিয়ে আসে। এ খবর সংগ্রহ করতে গেলে ভিপি খোরশেদের নেতৃত্বে সাংবাদিকদের উপর হামলা করে এবং এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হলে দেখে নেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছানোয়ার হোসেন বাদশা ও সাধারণ সম্পাদক উপাধ্যক্ষ হারুন-অর-রশীদ ঘটনার দায় স্বীকার করেন। নীলফামারীর জলঢাকায় চোরাই মালামালসহ ছাত্রলীগ জলঢাকা পৌর সভাপতি আহসান হাবিব সাহেদ, ছাত্রলীগ কর্মী জাহিদুল ইসলাম, মাসুদ রানা, আতিকুল ইসলাম, ফজলুল হক ও মোশরেফুল হাবিবকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ৫ আগস্ট দুপুরে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দৈনিক মানবকন্ঠের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও ইংরেজী বিভাগের ছাত্র সোহাইল মিয়াকে মারধর করেছে ইসলামের ইতিহাস ৮ম সেমিস্টারের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী আতাউর রহমান ডেভিড। পরে সাংবাদিকরা লিখিতভাবে প্রক্টরকে জানালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আতাউর রহমান ডেভিডকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে। ঘটনাটি ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে একাডেমিক ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছে। দোষী প্রমাণ হলে তারাও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিবে বলে জানিয়েছে। নোয়াখালীর সেনবাগে সন্ধ্যায় অবৈধ মটরসাইকেল জব্দ করায় পুলিশের উপর হামলা করেছে যুবলীগ উপজেলা আহবায়ক জাকারিয়া আল-মামুন, আল-আমিন, পৌর যুবলীগ আহবায়ক রিপন, যুবলীগ কর্মী তারেক, তুহিন, আলাউদ্দিন, দেলোয়ার ও সুজনের নেতৃত্বে পুলিশের এস.আই আমিনুল ইসলাম সিকদার, এস.আই মাহবুবুর রহমান, এস.আই নূরুল আমীন, পুলিশ সদস্য খালেদ, দিলীপ, তমিজ ও পুলিশের গাড়ী চালক মামুনুর রশীদকে বেধড়ক মারপিট করে। গুরুতর আহত এস.আই মাহবুবুর রহমানকে সেনবাগ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। উল্লেখ্য যুবলীগ নেতা জাকারিয়া আল-মামুনের ভাগিনা আল-আমিনের অবৈধ মোটরসাইকেল আটক করলে সন্ত্রাসীরা এ হামলা করে এবং থানা থেকে আটককৃত মোটরসাইকেলটি ছিনিয়ে নেয়। ময়মনসিংহের ভালুকায় মল্লিকবাড়ী গ্রামের শহীদ মিনারে দুপুরে মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি মোস্তফা ভূঁইয়া ও তার লোকজন শামীম আহমেদ নামে একজন তরুণকে ছাগল চুরির অভিযোগে বেদম মারপিট করে। এ বিষয় মোস্তফাসহ ১১ জনের নামে থানায় মামলা হয়েছে।
৬ আগস্ট বগুড়ায় ভোর রাত আড়াইটায় মহিষ বাথান গ্রামে গরুর খামারে এক অভিযান চালিয়ে ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হত্যা মামলার আসামী বগুড়া পৌর সভার ৩নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওমর খৈয়াম রোপনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় খামার তল্লাশী চালিয়ে ৭.৬৫ বোরের একটি বিদেশী পিস্তল, দু’টি ম্যাগজিন ও ৮ রাউন্ড তাজা গুলী উদ্ধার করে। গোয়েন্দা পুলিশ পৃথক ঘটনায় ১টি রাম দা, ২টি চাপাতি ও ২টি চাকুসহ মেহেদী, নাজির, রেজাউল ও রাকিবকে গ্রেফতার করে। ঢাকায় শোক দিবসের প্রাক্কালে ব্যাপক চাঁদাবাজির প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের যৌথ সভায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন- “আগস্ট আমাদের শোকের মাস, তাই বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে এই মাসে শোক দিবসের অনুষ্ঠানের নামে কেউ যদি কোনো ধরনের চাঁদাবাজীর সাথে যুক্ত হয় তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে”। তিনি সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিষয়টি তদারক করতে নির্দেশ দেন। কুড়িগ্রামে আদালতে হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে শিবিরের নেতারা ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়। তাদের হামলায় আহত হয় জামায়াতের জেলা আমীর অধ্যাপক আজিজুর রহমান সরকার, জামায়াত নেতা ও সদর উপজেলা পরিষদ ভাইস-চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, জেলা শিবিরের সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রোমান, শিবির নেতা মোমিনুল ইসলাম, শাহ আলম ও জাকির হোসেনসহ ৭/৮ জন। হামলাকারীদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টা গুরুতর আহত জেলা শিবিরের সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রোমান, শিবির নেতা মোমিনুল ইসলাম, শাহ আলম ও জাকির হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। খুলনার দৌলতপুর সরকারি বিএল কলেজে পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ায় ছাত্রলীগ নেতারা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হারুন-অর-রশীদকে মারপিট করেছে এবং বিভাগ ভাংচুর করেছে উজ্জল কুমার দাস ও দীপঙ্কর কুমারসহ আরো কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী। দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও নশরতপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূর-এ-আলম সিদ্দিকী নয়নকে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের পাঁচ-ছয় নেতা-কর্মী হাতুড়ী দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে। বিকালে ইউএনও অফিস থেকে বের হয়ে আসার পথে সমাজ সেবা অফিসের কাছে পৌঁছালে সন্ত্রাসীরা তার উপর হামলা করে এবং তার নিকট থাকা ৪৬ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আলোকডিহি ইউপি চেয়ারম্যান এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। ৭ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির কর্মী সন্দেহে বিজয় একাত্তর হলের আবু হেনা মোস্তফা কামাল নামে এক ছাত্রকে পিটিয়ে পুলিশে দিয়েছে হল ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ হাসান শাহাদাত। পরে জানা যায় মোস্তফা কামাল হলের জিমনেসিয়াম কমিটির প্রধান, প্রতিপক্ষরা কৌশলে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে তাকে পুলিশে দেয়। ফেনী সদর উপজেলায় বন্যা দুর্গতদের মাঝে বিতরণকৃত ১৫০টি কার্ড ও এমপি নিজাম হাজারীর পাঠানো ২১ বস্তা ত্রাণ সামগ্রী দক্ষিণ আবুপুর বড়বাড়ী জামে মসজিদ থেকে ছিনতাই করে নিয়েছে যুবলীগ শর্শদী ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক ফারুক মজুমদার ও শ্রমিক লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুলসহ তাদের লোকজন। ফরিদপুরের সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের মাতব্বরের ডাঙ্গি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার জন্য নি¤œমানের সামগ্রী কেনায় এলাকার লোকেরা মালামাল সরবরাহকারী আওয়ামী লীগ নেতা জালাল শেখের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানবন্ধন এবং তার শাস্তি দাবি করে।
৮ আগস্ট কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগের পদবঞ্চিত ও ত্যাগী নেতারা এক মঞ্চে উঠেছেন। শেখ মুজিবের ৪০তম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে কুষ্টিয়া পৌর ম. আ. রহিম মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফের বিরুদ্ধে সকলে এক মঞ্চে একত্রিত হয়েছেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগ একাংশের সভাপতি প্রবীণ নেতা আনোয়ার আলী। নেতারা মাহাবুবুল আলম হানিফ ও তার চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতার বিভিন্ন কর্মকা-ের তীব্র সমালোচনা করেন। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে পশ্চিম ওয়াপদা বাঁধ এলাকা থেকে সাবেক পুলিশ সদস্য আনোয়ার হোসেন পারভেজ, আশীষ সিংহ, ফজলুর রহমান ফজলু, বাবু কসাই ও মজিবুর রহমান পিন্টুকে ৯৮ পিস ইয়াবা ও ধারালো অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। অন্যদিকে ঘোষপাড়া থেকে ২০০ পিস ইয়াবাসহ উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান মনোয়ারা খাতুন মিনির ছেলে আব্দুল্লাহ্্ আল-মামুন মিন্টুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বেলাল হোসেন হত্যা মামলার আসামী ও ছাত্রলীগ ক্যাডার আবু নোমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নোমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে তার অন্য ক্যাডাররা এলাকায় ব্যাপক বোমাবাজী করে। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নওপাড়া দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বহাল থাকতেই পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও অন্যান্য সদস্যদের নিকট থেকে রাত দশটার দিকে জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাতে তাদের পদত্যাগের ঘোষণা লিখে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঐ স্কুলের জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. শাহ আলমকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি পরের দিন থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি। প্রধান শিক্ষক অসুস্থতার জন্য ছুটি নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় আছেন। ৯ আগস্ট হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে আইয়ুব আলী হত্যা মামলায় শায়েস্তাগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি ছালেক মিয়াকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ছালেককে আদালতে পাঠালে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠায়। ১০ আগস্ট ঢাকার কাফরুলে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ কাফরুল থানা সাধারণ সম্পাদক রুবেল মিয়াকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে কাফরুল থানা কৃষক লীগ সভাপতি কামাল, যুবলীগ সদস্য শহীদুল ইসলাম ও সন্ত্রাসী কালা ফারুকসহ পাঁচ-ছয় জন। প্রথমে তাকে কাজীপাড়া এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত অনুমান এগারটার সময় রুবেল মারা যায়। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে মুরসালিন, আব্দুল খালেক ও হানিফ নামে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। খুলনার রূপসা ডিগ্রী কলেজে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হয় বিশজন। বহিরাগত এক মেয়েকে নিয়ে কলেজে প্রবেশ করে ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী। এর প্রতিবাদে আরাফাত ও সাকিব গ্রুপের সাথে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে ঊভয় পক্ষের দীপঙ্কর, পারভেজ, আল-আমিন, রাজন, সৌরভ, ইসলাম, শাওন, রিয়াদ, ইকবাল, তানভীর, মোনায়েম, শুভ ও সাইফুলসহ বিশজন আহত হয়। এ সময় পুলিশ দীপঙ্কর, ইকবাল, তানভীর ও সাইফুলকে গ্রেফতার করে। সিলেট সরকারি কলেজে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয় দশজন। ছাত্রলীগের জাকারিয়া গ্রুপ ও রায়হান গ্রুপের মধ্যে প্রথমে কথা কাটাকাটি ও পরে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে সায়েম আহমেদ, মোস্তাক আহমেদ, আতিক ও সায়েদুর রহমানসহ দশজন আহত হয়। শরীয়তপুর পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রব মুন্সির বিরুদ্ধে দুদকে মামলা দায়ের করায় তাকে সাময়িকভাবে বরখস্ত করা হয়েছে। রাজশাহীর রাগমারায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর ডিজিএম ফসিউল আলম জাহাঙ্গীরের উপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ। ভবানীগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগ সভাপতি নাহিদ ইসলাম একটি বিদ্যুৎ সংযোগকে কেন্দ্র করে তার সহযোগীদের নিয়ে ডিজিএম এর উপর হামলা করে।
 মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান 

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা


হঠাৎ করেই যেন আমরা ডুবে গেলাম। না, এটা কোনো নৌকাডুবির ঘটনা নয়। কাক্সিক্ষত বৃষ্টি নামলো, এতেই ডুবে গেল রাজধানী ঢাকা। মাত্র দেড় ঘণ্টার ৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক। ফলে থমকে যায় রাজধানীর জনজীবন। সেপ্টেম্বরের প্রথমদিনেই জলজটের সঙ্গে যোগ হয় অসহনীয় যানজট। কোনো কোনো সড়কে কোমর সমান পানি জমায় যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে থাকে রাস্তায়। ছাত্র-ছাত্রী, অফিসগামী লোকজন তথা নাগরিকরা পতিত হয় এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, চট্টগ্রাম এবং সিলেটসহ অন্যান্য নগরীতেও ভারী বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা দেখা যায়। বৃষ্টি তো আমাদের কাক্সিক্ষত বিষয়, কিন্তু এই বৃষ্টির কারণে আমরা ডুবে যাব, দুর্ভোগে পতিত হব- এমন বাস্তবতা তো মেনে নেয়া যায় না। প্রকৃতির কাক্সিক্ষত বর্ষণকে আমরা যদি উপভোগ করতে না পারি, উপকৃত হতে না পারি, তাহলে আমাদের সরকার, প্রশাসন কিংবা সিটি করপোরেশন রয়েছে কী জন্য?
নগর-পরিকল্পনাবিদরা, স্থপতিরা জলজটের এই দুর্ভোগকে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তারা বলছেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও জলজটের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। বিভিন্ন মহলের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির কারণে দিনে দিনে এই সংকটের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এখন কাক্সিক্ষত বৃষ্টিপাতে আমরা ডুবে যাচ্ছি, অচল হয়ে পড়ছি। এজন্য তারা রাজধানীর চারপাশের নদী-নালা ও খালগুলোর যতœ নিতে বলেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে কো-অর্ডিনেশন সেল করার কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এজন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নৈতিক মেরুদ- প্রয়োজন, তা আমাদের আছে কি? বিপরীত চিত্রইতো আমরা সর্বত্র লক্ষ্য করছি।
শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার খবরটি দেশের পত্র-পত্রিকায় গুরুত্বের সাথে মুদ্রিত হয়েছে। মানবজমিন-এর ৩১ আগস্ট সংখ্যায় মুদ্রিত খবরটিতে বলা হয়: ভিসির পক্ষ নিয়ে শাবিতে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছত্রলীগ। একই সঙ্গে দফায় দফায় লাঞ্ছিত করা হয়েছে সাংবাদিকদের। ছাত্রলীগের হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষক আহত হয়েছেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিকে হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষকরা। দুপুরে তারা বৈঠক করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। উল্লেখ্য যে, গত কয়েক মাস ধরে সরকার সমর্থক শিক্ষকদের একাংশ ভিসি’র পদত্যাগ দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসছেন। শিক্ষকদের এই আন্দোলনের মুখে সিন্ডিকেট সভা, একাডেমিক কাউন্সিলের সভাসহ কোনো ধরনের নীতি-নির্ধারণী সভা করতে পারেননি ভিসি। এমন অবস্থায় ৩০ আগস্ট সভা ডাকেন ভিসি অধ্যাপক আমিনুল হক ভূঁইয়া। আর এই সভা প্রতিহত করার ঘোষণা দেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। আর এমন মুখোমুখি পরিস্থিতিতে ভিসি’র পক্ষ নিয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
শাবিতে শিক্ষকদের ওপর ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি বলেছেন, “যে জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই স্লোগানের এত বড় অপমান আমি আমার জীবনে দেখিনি।” ক্ষুব্ধ জাফর ইকবাল আরো বলেন, “এখানে যে ছাত্ররা শিক্ষকদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তারা আমার ছাত্র হয়ে থাকলে আমার গলায় দড়ি দিয়ে মরে যাওয়া উচিত।” জনপ্রিয় এ লেখক আরো জানান, ‘তিনি সরাসরি শিক্ষকদের আন্দোলনে অংশ না নিলেও, আন্দোলনকারীদের প্রতি তার মায়া, ভালবাসা আছে। তারা যে আন্দোলন করছেন আমি তা ১০০ ভাগ সমর্থন করি। এ ভিসি যোগদানের দু’মাসের পর আমি তার সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ আমি দেখেছি উনি মিথ্যা কথা বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলেন, তার সঙ্গে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যে পরিবেশ বিরাজ করছে তাতে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আন্দোলনরত শিক্ষকরা ভিসি’র সাথে কাজ করতে রাজি নন, তার পদত্যাগই এখন তাদের কাম্য। এদিকে ভিসি মহোদয় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ করে শিক্ষকদের পেটালেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মত উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি এক সময় অকল্পনীয় ছিল। আসলে ভ্রষ্ট রাজনীতি ধীরে ধীরে সব কিছুই গ্রাস করতে চাইছে। আদর্শ ও নীতিবর্জিত রাজনীতি এবং অন্ধ দলীয়করণ ও কোটারি স্বার্থ আমাদের সব প্রতিষ্ঠানকে এখন অকেজো করে ফেলছে। এক্ষেত্রে সরকার ও সশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনেক কিছু করার আছে। কিন্তু সঙ্গত পদক্ষেপ গ্রহণের উদাহরণ তেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এরই পরিণতিতে জাতি শাবিতে লক্ষ্য করলো এক কলঙ্কজনক ঘটনা। আমাদের সরকার এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই কলঙ্ক মোচনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে এগিয়ে আসে কিনা- সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে কলঙ্ক মোচনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা সরকারের কাক্সিক্ষত ভূমিকা তেমন লক্ষ্য করা যায় না। বরং এক্ষেত্রে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ রক্ষা এবং ব্লেমগেমের প্রবণতাই প্রকট হয়ে ওঠে। এ কারণেই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটে যাচ্ছে। বিধিবিধান ও আইনের প্রয়োগ তথা সুশাসনের অভাবে অপরাধীরা উপলব্ধি করেছে যে, দলীয় সমর্থন ও অর্থবল থাকলে অপরাধ করেও সহজে পার পাওয়া যায়। অবাক ব্যাপার  হলো, এ জাতীয় নি¤œকৃষ্টির লোকজন রাজনৈতিক দলের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান পায় কেমন করে? আসলে রাজনীতি এখন রাজনীতির কাক্সিক্ষত জায়গায় নেই। ক্ষমতালিপ্সার কারণে রাজনীতি এখন দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়ে গেছে। ফলে গুম-খুনও এখন রাজনীতির বিষয় হয়ে উঠেছে।
গুম হওয়া ব্যক্তিদের অবিলম্বে খুঁজে বের করার জন্য বৈশ্বিক নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। সময় নষ্ট না করে এখনই তা করার তাগিদ দিয়েছেন তারা। এক্ষেত্রে গুম হওয়া ব্যক্তির স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শী, আইন সহায়তাকারী ও অনুসন্ধানে জড়িতদের নিরাপত্তা দিতে সব দেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ডে অব দ্য ভিকটিমস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপেয়ারেন্স (আন্তর্জাতিক গুম দিবস) উপলক্ষে ৩০ আগস্ট এমন আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দু’টি গ্রুপ। উল্লেখ্য যে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গুমের ঘনা ঘটে, এশিয়ায়। এ বিষয়ে জাতিসংঘে রিপোর্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে।
যে পরিবারের সদস্যকে গুম করা হয়, তারা জানেন নিষ্ঠুর ও অমানবিক এই কাজের বেদনা কত গভীর ও মর্মান্তিক। একজনের গুমের ঘটনায় একটি পরিবার অচল হয়ে পড়ে এবং তাদের জীবন থেকে শান্তি বিদায় নিয়ে আতঙ্ক ভর করে থাকে। বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি রাজনৈতিক কারণে এবং সম্পত্তির লোভ ও ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে গুমের বহু নিষ্ঠুর ঘটনা। এদিকে গুম হওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে খসড়া চুক্তি করাসহ পদ্ধতিগতভাবে সব রকম ব্যবস্থা নিতে সরকারসমূহের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিটি অন এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সেস ও দ্য ওয়ার্কিং গ্রুপ অব এনফোর্সড অব ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপারেন্সেস। জেনেভা থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, গত দু’বছরে সারা বিশ্বে মোট ২৪৬টি গুমের ঘটনা নিয়ে তারা কাজ করেছেন। পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে, এই বর্বরোচিত কর্মকা-ের চর্চা অনেকগুলো দেশেই চলছে। হাজার হাজার এ রকম ঘটনার মধ্যে এ সংখ্যা সামান্যই। বাকি ঘটনাগুলোর কথা প্রতিশোধ ও নিরাপত্তাভীতির কারণে রিপোর্ট করা হয়নি। গুমের এ রকম অনেক ঘটনা জাতিসংঘের কাছেও রিপোর্ট করা হয়নি।
আমরা জানি যে, কোনো সভ্য দেশে গুমের ঘটনা চলতে পারে না। তারপরও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশে গুমের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ তো গুম হওয়া ব্যক্তিদের অবিলম্বে খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছে, সরকারসমূহকে সহযোগিতা করারও আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জাতিসংঘের আহ্বানের বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত পূর্ব নির্ধারিত একটি অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাব কর্তৃৃপক্ষ। মানবজমিন-এ প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়, ৩০ আগস্ট প্রেস ক্লাব অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, আফাদ, এএলআরসি, এফআইডিএইচ ও অধিকার যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিল। অধিকার টিম ও ভিকটিম পরিবারগুলো জানিয়েছে, পূর্ব-নির্ধারিত ওই অনুষ্ঠানে গুমের শিকার পরিবারগুলোর সাক্ষ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কথা ছিল। এ অনুষ্ঠান করার জন্য গত ১১ জুলাই প্রেস ক্লাব অডিটোরিয়াম বুকিং দেয়া হয়েছিল এবং হল ভাড়াও পরিশোধ করা হয়েছিল। ২৯ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে অধিকারে ফোন করে প্রেস ক্লাবের এক কর্মচারী জানান যে, ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলামের নির্দেশে অডিটোরিয়ামের বুকিং বাতিল করা হয়েছে। এর আগে দুপুরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের কয়েকটি পরিবারকে বিভিন্ন অজ্ঞাত স্থান থেকে ফোন করে উল্লেখিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হয়। এছাড়া শনিবার বিকালে সাদা পোশাকধারী লোক অধিকার অফিসের মূল গেটে এসে সংগঠনের সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খানের অবস্থান জানতে চায়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, গুমের শিকার পরিবারগুলো তাদের মর্মবেদনার কথা দেশের মানুষ কিংবা সরকারকে জানাতে পারলো না। বাংলাদেশের মত একটি গণতান্ত্রিক দেশে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবসটি পালন করতে পারলো না দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এর চাইতে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে? বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি কেমন করে সৃষ্টি হলো? আমরা তো এ কথা জানি যে, সাংবাদিকদের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রেস ক্লাব সবসময় সাধারণ মানুষের পক্ষে এবং স্বাধীন মত প্রকাশের পক্ষে সাহসী ভূমিকা পালন করে এসেছে। কিন্তু এবার এমন কি হয়েছে যে, গুমের শিকার পরিবারগুলোর অনুষ্ঠান বাতিল করে দিল প্রেস ক্লাব? এমন ঘটনায় জাতির সামনে মাথা হেট হয়ে গেছে সাংবাদিক সমাজের। অনেকে বলছেন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান কর্তৃপক্ষ তো প্রেস ক্লাবের সদস্যদের ভোটে বৈধভাবে নির্বাচিত কোনো কর্তৃপক্ষ নয়। তাই এমন কর্তৃৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্তের দায় সাংবাদিক সমাজ নিতে পারে না। যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ দায় শুধু তাদের ওপরই বর্তাবে। দেশের নাগরিকরাও হয়তো বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। আমাদের রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠনসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের আজ যে দুর্দশা, তা একদিনে হয়নি। দিনের পর দিন আমরা আদর্শহীনতার পথে চলেছি, অনৈতিক কর্মকা-কে প্রশ্রয় দিয়েছি। প্রতিষ্ঠানের কাছে, বিবেকের কাছে, স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার চেতনা হারিয়ে ফেলেছি। এমন এক অমানবিক ও অনৈতিক বাতাবরণে মানুষের জীবন ও সমাজ যে অধঃপতনে যাওয়ার কথা, এখন আমরা তাই প্রত্যক্ষ করছি। দিনে দিনে আমাদের দেনা অনেক বেড়ে গেছে। সেই দেনা পরিশোধের পথ দেখাবার মত কেউ আছেন কি?

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

খালেদা জিয়ার আশংকা


বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাকেও মেরে ফেলা হবে কি না তা তিনি বলতে পারেন না। তিনি নিজে এবং বিরোধী দলের অন্য নেতা-কর্মীরা কতদিন বেঁচে থাকতে পারবেন সে ব্যাপারেও সংশয় রয়েছে তার। দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হচ্ছে। সে কারণে সরকারের কাছে গুম-খুনের তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়ে লাভ নেই বলে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি চান দেশে ঘটে যাওয়া সকল গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হোক। কথাগুলো খালেদা জিয়া বলেছেন গত ৩০ আগস্ট। সেদিন ছিল আন্তর্জাতিক গুম দিবস। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দুটি সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের সকল দেশে দিনটি ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স ডে’ বা গুম দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশে যাদের জোর করে সরিয়ে ফেলা বা গুম করা হয়েছে তাদের ফিরিয়ে আনাই দিবসটির লক্ষ্য। অন্যদিকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি হলো, বাংলাদেশের জনগণকে সরকার এবার আন্তর্জাতিক গুম দিবস সম্পর্কে জানতে পর্যন্ত দেয়নি। এজন্যই বেগম জিয়া জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত দাবি করেছেন। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেদিনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে গুম হয়ে যাওয়াদের স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
আমরা মনে করি, বেগম খালেদা জিয়ার অভিযোগ, আশংকা ও দাবিকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া দরকার। গণতান্ত্রিক সব রাষ্ট্রেই গুম, গুপ্তহত্যা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী ভয়ংকর অপরাধ হিসেবে অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে দেখা হয়। গণতান্ত্রিক কোনো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের গুম করা হবে এবং পরে এখানে-সেখানে তাদের লাশ পাওয়া যাবে এমনটা কল্পনা করা যায় না। বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী গুম হয়েছেন ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে। সঙ্গে তার ড্রাইভারও ছিল। কিন্তু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও এখনো ইলিয়াস আলীর কোনো খোঁজ মেলেনি। গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমসহ অসংখ্য রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা-কর্মী গুম হয়েছেন। আমিনুল ইসলামের লাশ টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইলে পাওয়া গিয়েছিল। আরো অনেকের লাশও দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী বা খালের পাশে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের মতো বেশিরভাগেরই এখনো কোনো হদিস নেই। মূলত এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ডেসমন্ড সোয়েইন সম্প্রতি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলে গেছেন, বাংলাদেশে চলমান বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বিচারবহির্ভূত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এবং শাস্তি দেয়ারও তাগিদ দিয়েছেন তিনি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ধরনের সব অপরাধের তদন্ত ও বিচার করার দায়িত্ব যে সরকারের সে কথাটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী।
আমরা মনে করি, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সরকারের উচিত অবিলম্বে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা এবং অন্তরালে সক্রিয় দোষীদের কঠোর শাস্তি দেয়া। সরকারকে বুঝতে হবে, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। ঋণ ও সাহায্যেরও বিরাট একটি অংশ আসে এই দেশগুলো থেকে। সুতরাং তাদের কথা নিয়ে হেলাফেলা করা যায় না। এসব দেশ সত্যি সহযোগিতা বন্ধ করলে দেশকে সর্বব্যাপী বিপদে পড়তে হবে। তাছাড়া দেশগুলো কোনো প্রসঙ্গেই সামান্য বাড়িয়ে বলেনি। দুর্নীতির পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের খেসারত দিতে হয়েছে সমগ্র জাতিকে। যেমন প্রধানত শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে গুম ও হত্যা করার কারণে গার্মেন্ট শিল্পের নানা দিক দিয়ে ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ সিদ্ধান্তেও বাংলাদেশকে জিএসপির সুবিধা দেয়নি। অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে জনশক্তি রফতানিও কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন চাকরি হারাচ্ছে হাজার হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনেও রয়েছে একই কারণ। সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই বেগম খালেদা জিয়ার ভীতি ও আশংকাকে আমরা তাৎপর্যপূর্ণ মনে করি। আমরাও জাতিসংঘের অধীনে সকল গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারের দাবি জানাই।

Ads