বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গণমাধ্যমের চোখে সিটি নির্বাচন


বিশেষ করে ২০১৪ সালের অনুষ্ঠিত ‘জানুয়ারি মার্কা’ দশম সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নির্বাচন সংস্কৃতির ইতিহাসে নয়ারূপ যুক্ত হলো গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করেছেন বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা। জালিয়াতির অভিযোগ এনেছে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপও।
বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ভোট জালিয়াতি ও সমর্থক কর্তৃক ভোটকেন্দ্র খলের খবর প্রকাশ পায়। এতে প্রমাণ মিলে সরকার সমর্থকরা ব্যাপক ভোট জালিয়াতির ঘটনার নয়া ইতিহাস সৃষ্টি করে। নির্বাচনের খবর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভোটকেন্দ্র সরেজমিন করে গণমাধ্যম কর্মীরা। ভোটগ্রহণ চলা সময়ে কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি, হামলা, সাংবাদিককে মারধর, কেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশ না করতে দেয়াসহ নানাবিধ খবরসহ উঠে আসে ‘অভিনব ভোট ডাকাতির’ নানাবিধ চিত্র।
নির্বাচনের পরদিন ২৯ এপ্রিল সিটি থেকে চিটিং নির্বাচন কায়েমের ওইসব অপ্রত্যাশিত খবর বাংলাদেশের শীর্ষ পত্রিকাগুলোতে ফলাও করে ছাপা হয়েছে। বলাবাহুল্য, নির্বাচনের ফল নিয়ে কোনো পত্রিকাই ইতিবাচক শিরোনাম করতে পারেনি; বরং শিরোনামে ‘জালিয়াতি’, ‘কারচুপি’, ‘বর্জন’, ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ কিংবা ‘কেন্দ্র দখলের কথাগুলো উঠে এসেছে। কথা হচ্ছে, পত্রিকাগুলো বিভিন্ন শিরোনামে খবর প্রকাশ করলেও সবক’টি শীর্ষ শিরোনামের প্রতিপাদ্যের বিষয় ছিল ‘ভোট জালিয়াতি’। তবে ভোট নিয়ে শীর্ষ খবর প্রকাশে শুধু ব্যতিক্রম ছিলো জনকণ্ঠ ও ইত্তেফাক পত্রিকা।
পাঠকদের উদ্দেশে শীর্ষ পত্রিকাগুলোর প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনের যৎসামন্য তুলে ধরা হলো-
সংবাদ : ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচন, অভিযোগ ও বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে ভোট সম্পন্ন, অনিয়ম দখল কারচুপি জাল ভোট : বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের অভিযোগ’ শিরোনামে শীর্ষ খবর ছাপে মুক্তিযুদ্ধের কালজয়ী সাক্ষী দেশের সবচেয়ে বয়বৃদ্ধ পত্রিকা দৈনিক সংবাদ। এতে বলা হয়, কেন্দ্র দখলের চেষ্টায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা, জাল ভোটসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এবং বিএনপির নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সিটি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ।
প্রথম আলো : প্রথমে তারা বিএনপির প্রার্থীদের তাড়ালেন, তারপর তাড়ালেন সাংবাদিকদের, তারপর তাড়ালেন ভোটাদের তারপর আর তাড়ানোর কিছু ছিলো না। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ততক্ষণে নিজেরাই পলাতক। এভাবে ভোটের বিস্তর বয়ান উঠে এসেছে দেশের বহুল প্রচারিত প্রভাবশালী দৈনিক প্রথম আলোতে। ‘জিতল আ’লীগ, হারল গণতন্ত্র’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রধান প্রতিবেদনটির সঙ্গে বেলা দেড়টায় সাংবাদিক আবদুস সালামের তুলা একটি ছবিতে দেখা যায়, ‘মির্জা আব্বাস মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি বুথে ভোটারের অপেক্ষা করছেন দুই নির্বাচনী কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন দল-সমর্থিত প্রার্থীর প্রতিনিধি। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা ছিল, শেষ পর্যন্ত তা-ই সত্যি হলো। প্রশ্নবিদ্ধ এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত তিন মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হলেও গণতন্ত্রের পরাজয় হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
জাতীয় রাজনীতিতে ঝড় তোলা এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের খেলায় গণতন্ত্র হেরেছে। সরকার-সমর্থকরা বিরোধীদের বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রের কাছেই যেতে দেননি। অনেকটা ফাঁকা মাঠে পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় উন্মুক্ত কারচুপি করেছেন তারা। আর বিরোধী দল বিএনপি-সমর্থক মেয়র প্রার্থীরা ভোট শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।
মানবজমিন : ‘ডিজিটাল জামানায় এনালগ কারচুপি’ শীর্ষ শিরোনামে বহুল প্রচারিত দেশের একমাত্র ট্যাবলয়েট দৈনিক মানবজমিন লিখেছে, এক নয়া মডেলের নির্বাচন। উৎসব তো বটেই। দখলের উৎসব। একেবারেই খোলামেলা। কোনো রাখডাক নেই। সকাল সকাল প্রায় প্রতিটি কেন্দ্র থেকেই ‘হাওয়া’ বিএনপি সমর্থক এজেন্টরা। কেউ ঢুকতে পেরেছেন, কেউ পারেননি। তবে থাকতে পারেননি কেউই। হুমকি, মারধর, হামলা আর গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন তারা। কাউকে কাউকে আটকে রাখা হয় আগেই। রক্তাক্ত এজেন্ট যেন একটি নির্বাচনেরই প্রতিচ্ছবি। আভাস পাওয়া গিয়েছিল আগের রাতেই। খবর আসছিলো, ব্যালট পেপারে সিল মারার। যদিও তার সংখ্যা ছিল কম। তবে দিনের শুরুতেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায়।
যুগান্তর : ‘ভোট জালিয়াতির মহোৎসব, সকালেই অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র দখল’ শিরোনামে সাত কলামে লিড খবর প্রকাশ করে বহুল প্রচারিত পাঠক নন্দিত দৈনিক যুগান্তর। এতে বলা হয়, সকালেই অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র দখল, প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিল, অংশ নেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তারাও, কেন্দ্রে কন্দ্রে সরকারদলীয় প্রতিদ্বন্দী কাউন্সিলর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ-গুলী। দল সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে দিনের প্রথম ভাগেই তিন সিটির অধিকাংশ ভোট কন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নেয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সামনেই তারা ছিনিয়ে নেয় ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স। অস্ত্রের মহড়ার পাশাপাশি জোর করে বের করে দেয় বিএনপিসহ প্রতিদ্বন্দ¦ী মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীদের এজেন্টদের। চলে প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিলমারাসহ জাল ভোটের মহোৎসব ও নজিরবিহীন কারচুপি।
সমকাল : ‘প্রশ্নবিদ্ধ ভোট, বিএনপির বর্জন’ শিরোনামে সমকালে শীর্ষ খবর বলা হয়, শেষ পর্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেই সম্পন্ন হলো তিন সিটি করপোরেশনের ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ নির্বাচন। ভোটকেন্দ্র দখল, কারচুপি, জাল ভোট, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া, হামলাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ভোট শুরুর সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর নির্বাচনকে ‘ভোট ডাকাতি’ ও ‘প্রহসনের নির্বাচন’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন দলসমর্থিত মেয়র প্রার্থীরাও। প্রতিবাদে ফের হরতালসহ কঠোর কর্মসূচি দিতে পারে বিএনপি।
নয়াদিগন্ত : ‘ভোট জালিয়াতির মহোৎসব : বিএনপির বর্জন’ শীর্ষ শিরোনামে আট কলামজুড়ে লাল রঙে ব্যানার খবর ছাপে পাঠক নন্দিত নয়াদিগন্ত পত্রিকা। এতে তুলেধরা হয়, কেন্দ্র দখল আর নজিরবিহীন কারচুপির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো সিটি নির্বাচন। রাজধানীতে সকাল ৮টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় সব ভোটকেন্দ্রের দখল নেয় সরকারদলীয় লোকজন। বেশিরভাগ কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের।
ইনকিলাব : ‘নজিরবিহীন ‘অভিনব’ ভোট’ শিরোনামে আট কলামে লাল রঙের ব্যানার খবর প্রকাশ করে সাহসী পত্রিকা ইনকিলাব। এতে বলা হয়, অভিনব কায়দায় অনুষ্ঠিত হলো তিন সিটি নির্বাচন। আলোচিত এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ নাটক-সিনেমার গল্প ও আলাদিনের দৈত্যকেও হার মানিয়েছে। সকাল ৯টার মধ্যেই ফল নিশ্চিত হওয়ায় ভোটের ইতিহাসে যোগ হলো নতুন অধ্যায়। অর্ধশত প্রার্থী প্রচারণায় নামতে না পারার ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। আর নির্বাচনও হলো নজিরবিহীন। আগের রাত থেকেই ইশারা-ইঙ্গিত পাওয়া যায় ব্যালট পেপারে সিলমারার খবর।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ‘সবকিছু ছিল আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে’ শীর্ষ শিরোনামে প্রচার সংখ্যায় শীর্ষে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকা তুলে ধরেছে, তিন সিটি নির্বাচনের মাঠ থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত সবকিছুতেই ছিল আ’লীগের উপস্থিতি। কেন্দ্রের আশপাশে প্রার্থীদের পক্ষে নীরব প্রচারণা, সাধারণ ভোটারদের সহায়তা ও কেন্দ্রের এজেন্ট সব ক্ষেত্রেই এটা চোখে পড়েছে। ক্ষমতাসীন আ’লীগের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে মহানগরীর সাধারণ কর্মী সবাই ছিলেন সরব। সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর এবং মেয়রÑ তিন পদেই ছিল আ’লীগ প্রার্থীদের সমর্থকদেরই প্রাধান্য।
সংগ্রাম : নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে নাতিদীর্ঘ শিরোনামে শীর্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংগ্রাম পত্রিকা। ৭৮ শব্দের ওই শিরোনামটি ছিল ‘নজিরবিহীন অনিয়ম জালিয়াতির নির্বাচন ॥ মহানগরীর অধিকাংশ কেন্দ্রে সাঈদ খোকন ও আনিসুল হকের এজেন্ট ব্যতীত আর কোনো এজেন্ট ছিল না ॥ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে ব্যালটে সিল দেয়া হয়েছে ॥ অনেক পুলিশরাই পলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে জাল ভোট দেয়ার সুযোগ দিয়েছে ॥ ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই অনেক কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারা হয়েছে সাংবাদিকরা গুলীবিদ্ধ ও হামলার শিকার হয়েছেন ॥ পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার মহিলা এজেন্টরাও গ্রেফতার থেকে রেহাই পায়নি’। প্রতিবেদনটির সঙ্গে তিনটি ছবিও লিড করা হয়। সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তোলা প্রথম ছবিতে দেখা যায়, নির্বাচন চলাকালে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে একই সাথে জাল ভোট দিচ্ছেন তিনজন। বেলা সোয়া ১২টায় তোলা দ্বিতীয় ছবিতে দেখা যায়, বাংলাবাজার সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে জালভোট দেয়ার পর ব্যালট পেপার ছড়িয়ে ছিড়িয়ে পড়ার দৃশ্য। ওইসব ব্যালটে ইলিশ মাছ মার্কায় ছাপ মারা ছিল। একটু দূরেই দেখা যায় ব্যালট ভর্তি বাক্স। বেলা সাড়ে ১১টায় তুলা তৃতীয় ছবিতে দেখা যায়, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুল কেন্দ্রের ৮টি বুথেই ব্যালট নেই। ভোটাররা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য। একই অবস্থা রাজধানীর সেগুনবাগিচা হাইস্কুল কেন্দ্রে।
বণিক বার্তা : ‘বর্জন ও দখলে ম্লান সিটি নির্বাচন’ শিরোনামে দৈনিক বণিক বার্তার শীর্ষ খবরে বলা হয়, ভোটগ্রহণ শুরুর পর পরই কেন্দ্র দখলের অভিযোগ। খবর আসে জাল ভোট প্রদানেরও। তিন সিটিতেই ভোটদানে বাধা দেয়া ও ব্যাপক হারে জাল ভোট প্রদানের ঘটনা ঘটে। দুপুর না গড়াতেই অনেক কেন্দ্র খল করে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা ঘটে।
জনতা : ‘সহিংসতা কারচুপি ও বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ভোটগ্রহণ, ৩ সিটিতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরব সহযোগিতায়, কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল আগুন’ শীর্ষ শিরোনামে পাঁচ কলামে লাল-কালো কালিতে খবর ছাপে জনতা পত্রিকা। খবরে বলা হয়, কেন্দ্র দখল, ব্যালটে আগুন, হামলা, অস্ত্রের প্রদর্শন, ককটেল বিস্ফোরণ, কারচুপি, সরকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, গুলীসহ বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ভোটগ্রহণ। এসময় অসহায়ের মতো নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ করে বিভিন্ন কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। এদিকে ভোট কেন্দ্র প্রিজাইডিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণের বাহিরের চলে যাওয়া তিনটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন।
ডেইলি স্টার : ÔPolls bubbles burst, BNP's early pullout makes AL win insignificant; irregularities widespread; AL rivals for councillor posts cause violence’ শিরোনামে লিড নিউজ প্রকাশ করে দেশের শীর্ষ ইংরেজি পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টার। ‘পোলস বাবল বার্স্টস অর্থাৎ ভোটের বেলুন ফাটল। এতে নির্বাচনের কারচুপির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়। খবরটির সঙ্গে একটি ছবিও লিড করা হয়। ছবিতে দেখা যায়, দুজন লোক সিল মারছে। ছবিটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ÔTwo men stamp the pink ballot papers for the councillor post reserved for women at Khilgaon Model College polling centre at 1:33pm yesterday.
নিউ নেশন : ইংরেজি পত্রিকা নিউ নেশন শীর্ষ শিরোনাম করেছে- ’BNP Withdraws from CC polls race. Pulls out party-backed mayoral candidates from Dhaka, Chittagong: Vote rigging, capture of centres, beating of agents by ruling party men with the help of law enforcers, EC claimed. খবরে উঠে আসে ভোট জালিযাতির অভিযোগে সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে বিএনপির প্রার্থী প্রত্যাহারের নানাবিধ তথ্য।
ডেইলি সান : ÔBNP pulls out of city polls, Brings charges of widespread rigging’ শীর্ষ শিরোনামে খবর ছাপে ডেইলি সান পত্রিকা।
ইনডিপেন্ডেন্ট : ’It’s mockery with democracy: BNP’ শিরোনামে ভোটের অনিয়ম-দুর্নীতির লিড নিউজ ছাপে ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা।
ফিন্যান্সশিয়াল এক্সপ্রেস : ফিন্যান্সশিয়াল এক্সপ্রেস শিরোনাম করেছে, ’Voting in city polls ends amid rigging, violence, BNP boycotts race halfway through’ অর্থাৎ সিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ, কারচুপি ও সহিংসতার মধ্যে শেষ।
ভোরের ডাক : ‘তিন সিটিতেই ভোট বর্জন’ শিরোনামে শীর্ষ খবরে দৈনিক ভোরের ডাক তুলেধরে, তিন সিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি বাদে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেছে। দুপুরে জালভোট, কেন্দ্র দখল, আগের রাত থেকেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন।
কালেরকণ্ঠ : ‘বিএনপির নির্বাচন বর্জন’ কালেরকণ্ঠের শীর্ষ খবরে বলা হয়, বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ার পর পরই কেন্দ্রগুলোয় ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে থাকে। তার আগে কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
মানবকণ্ঠ : ‘অনিয়ম দখল সিল আর বর্জনে শেষ হলো ভোট’ শিরোনামে লাল রঙে পাঁচ কলামে মানবকণ্ঠ পত্রিকার শীর্ষ খবরে তুলেধরা হয়, ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকা সিটি করপোরেশনকে উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত করার পরে এটি ছিল প্রথম নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবে এ নির্বাচন নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকলেও জালিয়াতি, কেন্দ্র দখলসহ নানা কারণে নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে নগরবাসীসহ দেশবাসীর কাছে।
সকালের খবর : ‘নির্বিঘ্নে ভোট ছিনতাই’ শিরোনামে সকালের খবর পত্রিকার শীর্ষ খবরে বলা হয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিরপুর উপশহর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা ১১টা ১২ মিনিটে মারমুখী ভঙ্গিতে দ্রুতগতিতে ভোটকেন্দ্রের তিনটি পৃথক বুথে প্রবেশ করল তিন যুবক। তাদের পেছনে লাঠিসোটা হাতে আরও অর্ধশতাধিক যুবক। রাজিব, মানিক ও সোয়েব নামের তিন যুবক বুথে ঢুকেই পোলিং অফিসারদের কাছ থেকে অব্যবহৃত তিনটি ব্যালট বই ছিনিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল মুহূর্তেই। নির্বাচন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তখন শুধু নীরব দর্শক।
ঘটনার ১৫ মিনিট পরে খবর পেয়ে ওয়ার্ড আ’লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী কাশেম মোল্লা কেন্দ্রে হাজির হন তার বাহিনী নিয়ে। তার আগমনে দ্রুত কেন্দ্র থেকে সরে পড়ে ব্যালট ছিনতাইকারীরা। কাশেম মোল্লা প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী কাজী টিপু সুলতানের কর্মীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করলে ভোট বন্ধ রাখা হয় কিছু সময়ের জন্য। দিনের প্রথম ভাগে সাংবাদিকদের দেখা সব ভোটকেন্দ্রেই ছিল প্রায় একই রকম ঘটনা। শুরুতেই সরকার সমর্থকরা অন্য প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে ভোটকেন্দ্রগুলোর দখল নিয়ে জাল ভোট দেয়া শুরু করে। সময়ের সঙ্গে জাল ভোট দেয়ার এ চিত্র বেপরোয়া রূপ ধারণ করে। পাশাপাশি চলে হামলাও। হামলা থেকে বাদ যাননি সাংবাদিকও। ভোট জালিয়াতির এমন মহোৎসবে সাক্ষী-গোপাল হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও নির্বাচনী কর্মকর্তারা। কখনও কখনও বাধা না দিয়ে উল্টো অনৈতিক এ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে তাদেরও। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনরত সকালের খবরের সাংবাদিকদের সরেজমিন পরিদর্শনে ভোটের এমন চিত্র ধরা পড়েছে।
যায়যায়দিন : ‘অবাধ দখল ও বর্জনে সিটি নির্বাচন’ শীর্ষ শিরোনামে কালো রঙে সাত কলামে খবর ছাপে যায়যায়দিন পত্রিকা। এতে বলা হয়, সহিংসতা, অনিয়ম, অবাধে ভোট ডাকাতি এবং নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ পর্ব।
আমাদের সময় : ‘৩ সিটি নির্বাচন : আনিসুল, খোকন ও নাছির এগিয়ে, দখলে বর্জনে প্রশ্নবিদ্ধ’ কালো-লাল রঙে শিরোনামে খবর ছাপে আমাদের সময় পত্রিকা। খবরে বলা হয়, দিনভর সংঘর্ষ ও অপ্রীতিকর ঘটনার অসংখ্য অভিযোগ এলেও ইসি মাঠে নামায়নি সেনাবাহিনীকে। রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালটের বান্ডেল নিয়ে আ’লীগ সমর্থিত এক কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রতীকে সিল মারা হচ্ছে। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা শেখ আরিফুল ইসলামও বিষয়টি স্বীকার করেন। দুপুরে ঢাকা উত্তরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ২৩১ নম্বর কেন্দ্র ঢাকা কমার্স কলেজে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী ও কাউন্সিলর প্রার্থী মোবাশ্বের হোসেনের কর্মী-সমর্থকরা জালভোট দিচ্ছেন। ঢাকা উত্তরের ৭ নম্বর ওয়ার্ড ২৫৬ নম্বর ভোটকেন্দ্র ঊষা শিক্ষানিকেতন কেন্দ্রও স্থানীয় আ’লীগ নেতাকর্মীরা দখলে নিয়ে জালভোট দেন। এ কেন্দ্রেই প্রিসাইডিং অফিসার ওবায়দুল ইসলামকেও জালভোট দিতে দেখা যায়। ঢাকা দক্ষিণের ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের ৬৪২ নম্বর কেন্দ্রের সামনে থেকে সকালে ভোটারদের ফিরিয়ে দেয় পুলিশ ও আনসার সদস্যরা।
আলোকিত বাংলাদেশ : ‘জাল ভোট অনিয়ম সংঘর্ষ’ শিরোনামে খবরে আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকা তুলে ধরে, ভোট জালিয়াতি, কারচুপিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ এবং বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ, হামলা, গুলী ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গোলযোগে রাজধানীর কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। হামলা ও গুলীর ঘটনায় প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকসহ আহত হয়েছে শতাধিক মানুষ। অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ও তাদের কোনো এজেন্টকে দেখা যায়নি। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী, এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের নানা কৌশলে ভোট কেন্দ্রে যেতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দিনকাল : লাল রঙে আট কলামে দৈনিক দিনকালের ব্যানার শিরোনাম ছিলো ‘তিন সিটি নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি’। এতে বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক নির্বাচন ও ভোট ডাকাতির চিত্র তুলে ধরা হয়। বলা হয়, উত্তর ছিল আ’লীগের নিয়ন্ত্রণে : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রায় সব কেন্দ্রই ছিল সরকারি দলের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে। এ সময় কেন্দ্র পর্যবেক্ষণে ও ছবি তুলতে গিয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা বাধার মুখে পড়েন।
সোনার বাংলা : ‘ভোট জালিয়াতির নির্বাচন, সব দলের বর্জন, কলঙ্কিত আ’লীগ, হুমকিতে গণতন্ত্র’ শিরোনামে ১ মে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার শীর্ষ খবরে বলা হয়, যা ঘটবার তাই ঘটেছে। বিএনপি তথা ২০ দল সমর্থিত তিন মেয়র প্রার্থী ইলেকশনের দিন দ্বিপ্রহর ১২টায় নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে কাউন্সিলর প্রার্থীরা বয়কট করছেন কিনা, সেটা স্পষ্ট নয়। বিএনপির এই বর্জনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশে গণতান্ত্রিক নিয়মতান্ত্রিকতার রাজনীতি ও আন্দোলনের পথ সাময়িকভাবে আবার রুদ্ধ হয়ে গেল। আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে ‘ভোট ডাকাতি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন শেখ হাসিনা। তখন ছিল বেগম জিয়ার আমল। তখন কিন্তু কোনো ভোট ডাকাতি হয়নি। শেষ হাসিনা সেদিন আরেকটি শব্দও ব্যবহার করেছিলেন। সেটি হলো ‘ভাতের অধিকার’। সেদিন কিন্তু ভাতের অধিকার থেকেও কেউ বঞ্চিত ছিলেন না। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং বিশেষ করে এইবার ২৮ এপ্রিলের সিটি নির্বাচনে রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে শেখ হাসিনা মানুষকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে, ভোট ডাকাতি কত প্রকার এবং কী কী। সেদিন শেখ হাসিনা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেমেছিলেন, যদিও সেদিন গণতন্ত্র হারিয়ে যায়নি যে তাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। কিন্তু এবার গণতন্ত্র এমনভাবে হাইজ্যাক হয়েছে, সব শ্রেণীর দল এবং মতকে রাজনীতি করতে হলে সর্বাগ্রে সেই হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে। সেই পুনরুদ্ধারের কাজটি করতে হবে কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে। সেই কঠিন সংগ্রামের দায়িত্ব এসেছে ২০ দলীয় জোটের ঘাড়ে। প্রতিবেদনটির সঙ্গে একটি ছবিতে দেখা যায়, রাজধানীর খিলগাঁও মডেল স্কুল এন্ড কলেজে প্রকাশ্যে সিল মারছেন যুবলীগের দুই নেতা। এছাড়া বিশ্বব্যাপী আরও কয়েকটি গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সিটি নির্বাচনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সব প্রতিবেদনেই বহুদিন পর বিএনপির নির্বাচনে ফিরে আসা এবং ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ভোট জালিয়াতির অভিযোগে ওই দিনই তা বর্জনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
আমরা এখন অনেকটাই নিশ্চিন্তেই বলতে পারি, সংবাদপত্রগুলোর প্রকাশিত ওইসব শিরোনাম, এগুলো আমাদের শুধু হতাশই করেনি; বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বুকে একটি ‘কালো তিলক’ এঁকে দিয়ে গেল। পত্রিকাগুলোর একযোগে ‘ভোট জালিয়াতি’ শীর্ষ খবরের পরেরও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে মর্মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার স্তবক এবং তারই আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের কর্তা বাহাদুরদের মুখের বয়ান কম করে হলেও অন্ধের দেশে বধির শাসনেরই নামান্তর।

বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ভূ-কম্পন হৃদকম্পন এবং রাজনীতির শূন্যতা


ভূ-কম্পন এবং রাজনীতির কম্পনে মানুষের হৃদকম্পনের মাত্রা বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বাঁচার আকুতি নিয়ে সাগরে ভাসছে অভিবাসীরা। বহু অভিবাসী ইতোমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন। এখন ৮ হাজার অভিবাসী অথৈ সাগরে ভাসছে। তাদের নৌকার জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে। নেই খাবার ও পানি। বর্তমানে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলতে থাকায় ভাসমান এই মানুষগুলোকে তীরে নিয়ে যাচ্ছে না পাচারকারীরা। ১৬ বছরের কিশোর মোহাম্মদ শরীফ, সে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে দেশে ফিরে নিপীড়িত-অসুস্থ রোহিঙ্গাদের সেবা করবে। এমন স্বপ্ন নিয়ে নৌকায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে সাগর পাড়ি দেয়ার অভিযাত্রায় নেমেছিল। উত্তাল সাগরের ভয়ঙ্কর এই যাত্রায় ক্ষুধা-তৃষ্ণা এবং পাচারকারীদের মারধর-নির্যাতনে কোনরকমে প্রাণটা বাঁচাতে পেরেছে, কিন্তু স্বপ্নটা ঝরে পড়েছে। দেখেছে সঙ্গীদের লাশ উচ্ছিষ্টের মত কিভাবে সাগরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। গত  রোব ও সোমবার  মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র উপকূল থেকে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের উদ্ধার করা হয়েছে, কিশোর মোহাম্মদ শরীফ তাদেরই একজন। নিষ্ঠুর মানব পাচারকারীদের নির্যাতন ও নৃশংসতা এখন বড় খবর হয়ে উঠেছে। কিন্তু মানব পাচারের এ কর্মকা- তো নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তা ক্ষমতাধরদের ছত্রছায়ায় চলে আসছে। দেশী-বিদেশী গডফাদাররা মিলেমিশেই এমন অমানববিক কর্মকা- চালিয়ে আসছে। সমুদ্র উপকূলে ৬০ পয়েন্টের মানব পাচারে জড়িত রয়েছে চার দেশের সিন্ডিকেট। কিন্তু অপকর্ম থেকে তাদেরকে হঠাতে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। এখন অবশ্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। গত ৫ দিনে ‘বন্দুক যুদ্ধে’ মারা গেছে কথিত ৫ মানব পাচারকারী। তবে পত্রিকায় শিরোনাম করা হয়েছে, ‘সিন্ডিকেটের, হোতাদের বাঁচাতে চুনোপুঁটিরা বন্দুক যুদ্ধের শিকার?’ এমন শিরোনাম থেকে সংশয় জাগে, মানব পাচারকারীদের আসলেই দমন করা যাবে তো?
লেখার শুরুতে ভূ-কম্পন ও রাজনৈতিক কম্পনের কথা উল্লেখ করেছিলাম। দীর্ঘ ৬৫ বছরের জীবন যাপনে এমন ঘন ঘন ভূমিকম্পের ঘটনা আগে লক্ষ্য করিনি। এক ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতচিহ্ন না মোছার আগেই আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে নেপালে। তার অভিঘাত এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। এত ভূমিকম্প কেন? ধরিত্রী কি আমাদের ভার বহন করতে পারছে না, নাকি বহন করতে চাইছে না? ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে, জলে-স্থলে ও অন্তরীক্ষে যে বিপর্যয় তা মানুষেরই অর্জন। বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের কারণগুলো বিশ্লেষণ করছেন। ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক কারণ তো আছেই, ভূমির প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের কথাও আমরা জানি। এসব বিষয় স্বীকার করে নিয়েও বলতে হয়, আসমানি ও জমিনি বালা-মুসিবাত যখন আবির্ভূত হয়, তখন স্রষ্টার অনুমোদনেরও প্রয়োজন হয়। এ কারণেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সব ধর্মের মানুষই স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করে থাকেন। মানব জাতির দীর্ঘ ইতিহাসে আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংসের কথা আমরা জানি। তাদের পাপ ও বাড়াবাড়ি এতটাই সীমা লঙ্ঘন করেছিল যে, পুরো জাতিকেই সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। নূহ নবীর আমলে মহা প্লাবনের কথাও আমরা জানি। সে তুলনায় নেপাল, ভারত বা বাংলাদেশে যে ভূমিকম্প ঘটে গেল তা ক্ষুদ্র বলেই বিবেচনা করতে হয়। স্রষ্টা কিংবা প্রকৃতি হয়তো মৃদুভাবে নিজের অসন্তুষ্টির কথা কিছুটা জানান দিয়ে গেল। প্রকৃতির প্রতি, মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন? জুলুম-নির্যাতন, প্রতারণা-প্রহসন, অশ্লীলতা-ব্যভিচার, অনাচার ও অমানবিকতার   মাত্রা সম্পর্কে আমরা কতটা সচেতন? মহাবিশ্বের ছোট্ট গ্রহ এই পৃথিবীতে কিংবা আমাদের সমাজে অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন, শোষণ এবং অশ্লীলতা অব্যাহত থাকবে, কিন্তু তার কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না কিংবা প্রকৃতি ও মহাপ্রভু নিশ্চুপ থাকবেন- এমনটা তো ভাবা যায় না। আমরা যদি প্রকৃতির প্রতি সদাচারী হই এবং অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন এবং অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করি, তাহলে আশা করা যায় প্রকৃতির মতো আমাদের সমাজও হয়ে উঠবে মানুষের বসবাস উপযোগী। সহজ ভাষায় বলা যায়, নৈতিক মেরুদ- সোজা করে আমরা যদি মানবিক আচরণে উদ্বুদ্ধ হই তাহলে প্রকৃতিও হয়ে উঠবে মানববান্ধব। এই সহজ সত্যটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। নইলে শুধু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও তথ্য উপাত্তের বোঝা দিয়ে সমস্যার সমাধান করা হয়তো সম্ভব হবে না।
শুধু ভূ-কম্পন নয়, রাজনৈতিক কম্পনেও মানুষের জীবন যাপনে দুর্ভোগের মাত্রা বাড়ছে। মানুষ তো সরকার গঠন করে শান্তি-শৃঙ্খলা তথা সুশাসনের জন্য। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংবিধানকে মান্য করার সাথে সাথে ন্যায়-নীতিকে সমুন্নত রাখতে হয়। অনুরাগ-বিরাগের বদলে নিরপেক্ষ থাকতে হয়। ভোগবিলাস ও অর্থলিপ্সার বদলে ত্যাগ-তিতিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হতে হয়। এসব গুণ ধারণ না করে শুধু কথামালা দিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বর্তমান সময়ে আমরা তো আদর্শ ও নীতির রাজনীতির বদলে চাতুর্য ও প্রহসনের রাজনীতি লক্ষ্য করছি। জনসেবা ও দেশসেবার কথা বলে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করাই এখন রাজনীতির মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এমন অবস্থায় রাজনীতিকদের আশেপাশে নীতিবান ও জ্ঞানীগুণী মানুষের অবস্থান তেমন লক্ষ্য করা যায় না। বরং ক্ষমতার ফলভোগী ব্যবসায়ী, মাস্তান ও দুর্বৃত্তদের সমাবেশই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নীতির রাজনীতিতে তো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বেছে নিতে হয়। ক্ষমতার রাজনীতিতে তেমন রুচি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দমন-পীড়ন, চাতুর্য এবং হরতাল-অবরোধের রাজনীতিতে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। অনাকাক্সিক্ষত এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
আমরা জানি যে, মানুষের মধ্যে অনুরাগ ও বিরাগের প্রবণতা আছে। কিন্তু সরকার কিংবা প্রশাসনের মধ্যে অনুরাগ কিংবা বিরাগের প্রবণতা থাকলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আর সুশাসন ছাড়া দেশ শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে না। বর্ষবরণের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেসব কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতে উপলব্ধি করা যায়, দেশ সুশাসনের পথে চলছে না। ২৬ দিন গত হওয়ার পরও নারী লাঞ্ছনাকারীদের চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো যারা নিপীড়কদের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি করছেন, পুলিশ তাদের ওপরই বর্বর হামলা চালানোর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ১০ মে রোববার নারী লাঞ্ছনার বিচার চাইতে এসে লাঞ্ছিত হয়েছেন ছাত্রীরা। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পুরুষ পুলিশের লাথি-ঘুষি খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে কয়েকজন ছাত্রীকে। ধাওয়া খেয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছাত্রীটিকেও চুলের মুঠি ধরে টেনে বের করেছে পুরুষ পুলিশ। অথচ সেখানে নারী পুলিশের অভাব ছিল না।
নিপীড়কদের গ্রেফতার ও শাস্তিসহ ৬ দফা দাবিতে ১০ মে দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কার্যালয় ঘেরাও করতে গিয়েছিল ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা। তাদের ডিএমপি কার্যালয়ের সীমানায় ঘেঁষতে দেয়নি পুলিশ। মেরে-ধরে রাস্তা থেকেই তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এতে ৩৪ জন আহত হয়েছেন বলে ছাত্র ইউনিয়ন জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ২১ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। ৪ জন ভর্তি আছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। নারী-লাঞ্ছনাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে যারা আন্দোলন করছে তাদের দমনে পুলিশ এমন মারমুখী হলো কেন-জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি ডিসি রমনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
নারী-লাঞ্ছনাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে যারা আন্দোলন করছেন, তাদের দমনে পুলিশ এমন মারমুখী হলো কেন-এমন প্রশ্নের জবাব দেয়া আসলেই কঠিন। দেশে সুশাসন থাকলে এমন দৃশ্য আমাদের দেখতে হতো না, নারী-লাঞ্ছনাকারীরাও হয়তো বহু আগেই গ্রেফতার হয়ে যেত। সুশাসনের অভাবে দেখা যায় পুলিশ কারো ওপর বেশ মারমুখী, কারো ব্যাপারে আবার প্রশ্রয়দাতা। অনুরাগ ও বিরাগের উদাহরণ দেশে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তো পুলিশ ও প্রশাসনের প্রশ্রয়ের কারণে নানা রকম অন্যায় কর্মকাণ্ডে এখন বেশ বেপরোয়া। এমনকি ছাত্রলীগে থেকেও তারা সরকারি চাকরি করার সুবিধা পাচ্ছেন। ১১ মে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে ছাত্রলীগের কমিটিতে পুরোনোরা পদ আঁকড়ে আছেন। জড়িয়ে পড়ছেন ব্যবসা-বাণিজ্যে, ঢুকছেন সরকারি চাকরিতেও। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সরকারি চাকরি করলেও কেউ ছাত্রলীগ করতে পারেন না। কিন্তু ৬ বছর প্রবাস কল্যাণমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এক যুগের বেশি সময় ধরে ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ মুখার্জী। অবশ্য গত ১৬ এপ্রিল তাকে ওই পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। চাঁদাবাজির একাধিক মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু কি এপিএস! সংগঠনটির ওয়েবসাইট, দফতর ও একাধিক নেতার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির ২ জন সহ-সভাপতি, ১ জন সাংগঠনিক সম্পাদক, ৫ জন সম্পাদক, ১০ জন উপ-সম্পাদক এবং ২ জন সহ-সম্পাদক প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা। এছাড়া বিভিন্ন পদের অন্তত ৬ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ২ জন পুলিশে উপ-পরিদর্শকও আছে এই তালিকায়। তালিকায় অন্তত ৫০ জন আছেন যারা পেশায় ব্যবসায়ী এমন তালিকায় অনুরাগের চিত্রটা বেশ ভালভাবেই উপলব্ধি করা যায়। আর নারী-লাঞ্ছনাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের নির্দয়ভাবে পেটানোর দৃশ্যে বিরাগের চিত্রটাও বেশ স্পষ্টভাবেই অঙ্কিত হয়েছে। এমন দৃশ্যে সরকার লজ্জা পায় কি না জানি না, তবে জনগণ লজ্জা পায়। কারণ ভেদাভেদের এমন সমাজের জন্য জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। এমন শাসনকে সুশাসন হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না। বর্তমান সরকার এবং প্রশাসন আসলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, এটা জাতির জন্য এক অশনি সংকেত। পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান সরকারের অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলও যোগ্য জবাব দিতে পারছে না। জনগণকে সম্পৃক্ত করে সময়ের দাবিগুলো তুলে ধরার জন্য যে সৃজনশীল চেতনা ও কর্মসূচি প্রয়োজন তাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এসব শূন্যতা পূরণ হলে জনমনে আবার আশার সঞ্চার হতে পারে।­

মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ করা এখন অপরাধ?


আমরা আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের কথা শুনেছি। সে সময় নারী সন্তানদের হত্যা বা জীবন্ত কবর দেয়া  হতো। সমাজে নারীর কোনো মর্যাদা ছিলো না। কথা বলার অধিকার ছিলো না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কোনো ভূমিকাও ছিল না। কন্যা সন্তানকে মনে করা হতো পরিবার বা সমাজের জন্য অভিশাপ। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের আগে নারীকে মানুষের কোনো মর্যাদা দেয়ার বিধান চালু ছিলো না। এসব বিধিবিধান তৈরিও করেছিলেন সমাজের পুরুষ সমাজপতিরাই, কোনো নারীর গর্ভ ছাড়া যাদের জন্মগ্রহণও সম্ভব ছিলো না বা সম্ভব হতো না।
সেই যুগকেই আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ বলে ইসলামে অভিহিত করা আছে। তখনকার পুরুষশাসিত সমাজের অকল্পনীয় বিধিবিধান স্মরণ করলে আতঙ্কে ঘৃণায় গা শিউরে ওঠে। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে নারী কল্পনা করা হতো নিতান্ত বস্তু হিসেবে বা দুম্বা বা ভেড়ার মতো নিজস্ব সম্পদ হিসেবে, তার বাইরে আর কিছুই ছিলো না নারীর মর্যাদা। সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো ক্ষেত্রেই নারীর মতামত গ্রহণের কথাও ছিলো নিতান্তই অকল্পনীয় ব্যাপার। নারী ছিলো পুরুষের ভোগের সামগ্রী মাত্র। পুরুষেরা স্ত্রী বা ক্রীতদাসী হিসেবে যুদ্ধশেষে নারীদের কিনে নিয়ে যেতো। এই ছিলো সামাজিক বিধান।
আরও ভয়ঙ্কর যেসব সামাজিক বিধান প্রচলিত ছিলো, ইসলামের আবির্ভাবের পর বর্তমান সময় পর্যন্ত তা আর কল্পনাও করা যায় না। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে কোনো নারীর স্বামীর মৃত্যু হলে, তার পূর্ববর্তী স্ত্রীর পুত্র বা সৎ পুত্র সে নারীর ওপর অধিকার পেতো। যদি তার পূর্ববর্তী স্ত্রীর কোনো পুত্রসন্তান না থাকতো, তাহলে তার  আপন গর্ভজাত সন্তানই হতো তার স্বামী। তবে নারী এ বিধান মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাতে চাইতো তবে তাকে পুরুষের চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণ দিতে হতো, যা ছিলো একেবারেই অসম্ভব। কারণ তার হাতে তেমন কোনো অর্থ থাকার কোনো সামাজিক ব্যবস্থাই ছিলো না। আবার কোনো সন্তান যদি তার মাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজী না হতো, তবে তাকে সমাজের বাইরে একটি অন্ধকার আলোবাতাসহীন কুটিরে একাকী থাকতে দেয়া হতো। এক বছর এ রকম দুর্ভোগ কাটিয়ে বের হবার পর সে সমাজে পরিত্যক্ত, ঘৃণীত নিন্দিতই থাকতো। স্বামী কিংবা পিতার সম্পদের ওপর নারীর কোনো অধিকার ছিলো না।
মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্মের ১৬ বছর পর ৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এই অবস্থার পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটে। এ সময়ই প্রথম নারীদের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। যদিও তাদের ওপর আগের মতোই পুরুষের কর্তৃত্ব বহাল থাকে। এই মানবিক স্বীকৃতির পথ ধরে নারীদের মানুষ হিসেবে যাত্রা শুরু। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থেকে তাদের অনেক দূরেই রাখা হয়। এখানেও একটি কথা উল্লেখের দাবি রাখে। তা হলো যেভাবেই কোনো নারী যদি বিত্তবান থাকতেন, তবে যতো পুরুষ শাসিতই হোক সমাজে তখন তিনি মর্যাদাবান থাকতেন। আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পাবার পর মানুষে মানুষে সকল ভেদাভেদ দূর করার ঘোষণা দেন মহানবী (সাঃ)। ইসলামে নারী-পুরুষের ভেদাভেদও দূর হয়ে যায়। সমমর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হন নারীরা।
আওয়ামী লীগের সীমাহীন দুঃশাসন ও অপশাসনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবারও ফিরে এসেছে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ। ২০০৯ সালের ‘আঁতাতের নির্বাচনে’র মধ্য বাংলাদেশে পুনরায় ক্ষমতাসীন হয় আওয়ামী লীগ। আর তারপর থেকেই লুণ্ঠন অত্যাচার নিপীড়ন, হত্যা, দখল নারী নির্যাতন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, সেখান থেকে বের হওয়ার স্বাভাবিক সকল পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আত্মীয়করণ, দলীয়করণ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছে। যে যত বড় গুণ্ডা, যত বড় বদমাশ, আওয়ামী নেতৃবৃন্দের কাছে সে ততবেশি প্রিয়ভাজন। খুন, রাহাজানি, ডাকাতি, নারী নির্যাতন, যে কোনও অপরাধই করুক না কেন তার সাত খুন মাফ যদি সে হয় আওয়ামী লীগ। গোপালীকরণের ফলে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে।
গোপালী কনস্টেবল সমস্ত আদবকায়দা ও শৃঙ্খলা ভেঙে কান চুলকাতে চুলকাতে ওসির রুমে হাজির হয়। ওসির নির্দেশও সে থোড়াই পরোয়া করে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোনো ব্যবস্থা নিতে অপরাগ। তারা প্রকাশ্যেই জানিয়ে দেয় যে, তাদের বাড়ি হ্যাপারে (ওপারে)। ফলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কিল খেয়ে কিল হজম করতে হয়। পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে একেবারে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তারা ছাত্রলীগের নাম শুনলে সম্ভবত থরথরিয়ে কাঁপতে থাকেন। সে যত বড় অপরাধই করুন না কেন, তাকে গ্রেফতারের কোনো বিধান নাই। এমনকি অপরাধের সময় পুলিশ আটক করলেও ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা ছাড়া পেয়ে আবারও নানা ধরনের অপকর্ম ও কুকীর্তিতে জড়িয়ে পড়ে।
এ অবস্থা প্রায় সর্বত্রই চলছিল। টেন্ডার, ডাকাতি, ছিনতাই, নরহত্যাÑ হেন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে ছাত্রলীগ জড়িত নেই। এখন এসব অপরাধের একচ্ছত্র মালিক মোক্তার তারাই। কখনও কখনও এসব অপরাধে তাদের থানা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হলেও স্থানীয় এমপি বা প্রভাবশালী আওয়ামী লীগারদের নেতৃত্বে থানা ঘেরাও করা হয়, কিংবা আলোচনায় বসে অপরাধী ছাত্রলীগারদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসে।
এসব ঘটনার সূত্র ধরে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে পুলিশ বাহিনীও। ছাত্রলীগ অপরাধ করলে যদি তাদের ধরাও না যায়, শাস্তি না দেয় তাহলে পুলিশের নিজেরই বা অপরাধ করতে বাধা কোথায়। সে কারণে পুলিশ এখন সব ধরনের অপরাধ কর্মে নেমে পড়েছে। তারা খুন, মুক্তিপণ আদায়, ক্রস ফায়ার, হাঁটুর উপর গুলি চালিয়ে পঙ্গু করে দেয়া Ñ এধরনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় যখন শোরগোল শুরু হয়, তখন পুলিশ প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জনগণকে এই বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে যে, দোষী পুলিশদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশ কর্তৃপক্ষ শাস্তি বলতে প্রধানত যা বোঝায়, তা হলো, কয়েকদিনের জন্য রাজারবাগ পুলিশ লাইনে তাকে ক্লোজড করে রাখা কিংবা মিরপুর থানা থেকে সূত্রাপুর থানায় বদলি করে দেয়া। অর্থাৎ এ থানায় যা করেছিস, করেছিস বাবা, এখন বাকি কাজ অন্য থানায় গিয়ে র্ক। পুলিশকে বড় ধরনের শাস্তি দেয়ার কথা কখনওই খুব একটা শোনা যায় না। তা তার অপরাধ যত গুরুতরই হোক না কেন। ফলে পুলিশ আরও বিপুল প্রতাপে আরও বড় ধরনের অপরাধে নিঃশঙ্ক চিত্তে জড়িয়ে পড়ে।
ছাত্রলীগের স্থান এরও ঊর্ধ্বে। তাদের কোনো অপরাধ আইনের মধ্যে ধর্তব্য নেই। সেসব আইনের সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে। তাদের সকল অপরাধকে যেন আগে থেকেই দায় মুক্তি দেয়া হয়েছে। খুন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কোনো বড় অপরাধেই ছাত্রলীগের কারো শাস্তি হয়েছে, এমনটা শোনা যায় না।
গত ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে এবং একই সঙ্গে সারা   দেশে ছাত্রলীগ বাংলাদেশে আবার আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ ফেরত এনেছে। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার লোকের সামনে স্বামীর পাশ থেকে স্ত্রীকে, মায়ের পাশ থেকে কন্যাকে, কন্যার পাশ থেকে মাকে, বন্ধুর কাছ থেকে বান্ধবীকে, ভাইয়ের কাছ থেকে বোনকে ছিনিয়ে নিয়ে তাদের বিবস্ত্র করে এক নারকীয় তা-ব চালায়। সেই বীভৎস ভয়াবহ দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। টিএসসি এলাকায় বৈশাখী উৎসবে শরীক হতে আসা নারীরা এভাবেই লাঞ্ছনার শিকার হন। আর এই সকল অপকর্মের হোতা ছিল ছাত্রলীগ।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি ও সন্নিহিত এলাকাই নয়, একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। দক্ষিণাঞ্চলের এক ভাই তার বোনের ইজ্জত রক্ষা করতে গিয়েছিল। ছাত্রলীগারলা ছুরি মেরে পিটিয়ে তাকে হত্যাও করেছে। কেউ ধরা পড়েছে বলে শুনিনি। ধরা পড়লেও হয়তো এতদিনে ছাড়া পেয়ে আবারও কুকর্মে লিপ্ত হয়েছে।
ছাত্রলীগের এই পৈশাচিক তা-বের বিরুদ্ধে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবাদ করতে দাঁড়িয়েছিল ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কয়েকজন নেতাকর্মী। ছাত্রলীগের এই নারী নির্যাতনে বাধা দেয়া ছাত্র ইউনিয়নের ঐ কর্মীকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দিয়েছে তারা। অদূরেই দাঁড়িয়েছিল গোপালী পুলিশের দল। উদ্ধারকারী ছেলেরা মাত্র পাঁচ গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের সহায়তা যখন চাইছিল, তখন পুলিশ বলছিল, এখানে ডিউটি এরিয়া ভাগ করে দেয়া আছে। ওটা আমাদের ডিউটি এরিয়ার ভেতরে পড়ে না। ফলে তারা অস্ত্র হাতে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে ছাত্রলীগারদের নারী নির্যাতনের এই দৃশ্য যেন উপভোগই করেছে। দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে, বিপন্ন নারীর ইজ্জত রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। কেননা, কাজটা করছিল ছাত্রলীগ।
টেলিভিশন টকশোতে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পণ্ডিতকে আলোচনা করতে শুনলাম, এ কাজ করেছে তারাই যারা পহেলা বৈশাখের মতো ‘বাঙালি’ সার্বজনীন উৎসবকে বাঁকা চোখে দেখে ও ভ-ুল করে দিতে চায়। এরাও নিশ্চয়ই শিক্ষক হয়েছেন আওয়ামী দলীয় বিবেচনায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার ন্যূনতম যোগ্যতাও এসব লোকের আছে কিনা সন্দেহ।
ওরা যদি ছাত্রলীগই না হবে তাহলে যে পাঁচ নারী নির্যাতনকারীকে সাধারণ মানুষ ধরে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করল, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাদের ছেড়ে দেয়া হলো কেন? ওরা যদি ছাত্রলীগই না হবে, তাহলে পুলিশ ও রকম সাফাই কেন গাইবে যে, আসলে শাহবাগে নারী নির্যাতনের মতো ও ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি? ওরা যদি ছাত্রলীগারই না হবে, তাহলে ঐ এলাকায় স্থাপিত ১৩টি সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পুলিশ লুকিয়ে ফেলবে কেন? ওরা যদি ছাত্রলীগারই না হয়,তাহলে পুলিশ কেমন করে বলল যে, ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না?  তারপরেও যখন সংবাদপত্রগুলো এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজ ও স্থির চিত্র দেখালো, ছাপালো ও প্রচার করলো, তাতে নির্যাতনকারী প্রতিটি লোককেই শনাক্ত করা গেল, এরা যদি ছাত্রলীগারই না হয়ে থাকে, তাহলে পুলিশ কেন বলল যে, এদের শনাক্ত করা যায়নি? এবং আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এতে আজ পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি।
এভাবে আশকারা পাওয়ার পর আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের মতো ছাত্রলীগাররা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের এক নেতা কলেজেই তার মাতৃতুল্য শিক্ষকের বস্ত্রহরণ করে এবং তার গায়ে হাত দেয়ার মতো ঘটনা পর্যন্ত ঘটায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলে ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই পুলিশ ঐ নরপিশাচকে থানা থেকে চা খাইয়ে বিদায় করে দেয়। এ নিয়েও কোনো মামলা হয়নি। বিচারের চেষ্টা হয়নি।
পহেলা বৈশাখের নারী নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে একটি ছাত্র সংগঠন ডিএমপি কার্যালয় ঘেরাও করা কর্মসূচি দিয়েছিল গত রোববার। ডিএমপি কার্যালয় অভিমুখে রওনা হয়েছিল তাদের ছোটখাট মিছিলটি। প্রতিবাদকারীদের মধ্যে ছাত্রীরাও ছিলেন। পুলিশ তাদের বিশেষভাবে মেয়েদের নিতম্বে লাথি মেরেছে। চুলের মুঠি ধরে পিটাতে পিটাতে সামনের দিকে নিয়ে গেছে। একজন শিক্ষার্থী উপুড় হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। আগে জানতাম সরকারের হাত অনেক লম্বা। এবার দেখলাম পুলিশদের পাগুলোও বেশ লম্বা। বুট পরা বেশ কয়েকটি পা এক সঙ্গে ঐ শিক্ষার্থীকে লাথি মারছে।
পুরুষ নির্যাতনের পাশাপাশি যেখানে সেখানে যত্রতত্র নারীদের উপর অকথ্য অবর্ণীয় নির্যাতন চালানো হচ্ছে এ সরকারের আমলে। নির্যাতন চালাচ্ছে ছাত্রলীগ, পুলিশ, পেশাদার মাস্তান, এবং অন্যরা। কিন্তু আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের মতো এখানেও নারীর অধিকার এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছে গেছে।

সোমবার, ১১ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সিটি নির্বাচনে উল্টো পথে ছিলো নির্বাচন কমিশন


নমুনা! নমুনা বুঝেন? অর্থাৎ স্যাম্পল!! যদি ২০ দলীয় জোট ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতো ফলাফল কেমন হতো তার একটা নমুনা ছিল সিটি নির্বাচন। সিটি নির্বাচনে আওয়ামী সরকারের আমলে ভোট ডাকাতি, জাল ভোট প্রদান এক ধরনের স্যাম্পল ছিলো। আগামী দিনে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হবে তারও একটা নমুনা ছিলো সিটি নির্বাচন। ভোট চুরি থেকে ভোট ডাকাতি, ভোটারদের ভোট দেয়ার পূর্বে ভোট দিয়ে দেয়ার সুসংবাদ দেয়া আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বাহির করে দিয়ে, বাসায় নিয়ে ভোট দেয়া এগুলো সবই আওয়ামী সরকারের ডিজিটাল নির্বাচনী ভোট গ্রহণের নমুনা বা স্যাম্পল।
তামাশার নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশন : আওয়ামী লীগ বলতেই পারে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, দুই একটা কেন্দ্রে এগুলো হতেই পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনার কিভাবে শান্তিপূর্ণ বলতে পারে? মানুষের চোখের সামনে কেন্দ্র দখল, আওয়ামী সরকারবিরোধী এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া। জাল ভোট দেয়া। ১৩ বছরের একটি বালককে দিয়ে ৩৩টি ভোট দেয়ানো। পুরাতন ঢাকার কবি নজরুল কলেজের ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় সুইডিশ রাষ্ট্রদূতকে তাড়া করা। এ রকম শত শত ঘটনা পানির মত পরিষ্কার হওয়ার পরেও কিভাবে নির্বাচন কমিশনার সিটি নির্বাচনকে অবাধ শান্তি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে দাবি করতে পারে? তিনি এইসব কথা কি নিজে থেকে বলছেন? না কি ওনাকে দিয়ে বলানো হচ্ছে? তিনি কিসের ভয়ে কার জন্য দেখে শুনে সত্যকে আড়াল করছেন? না কি নির্বাচন কমিশনার সত্য বলতে সাহস পাচ্ছে না?
নির্বাচন কমিশনারের কাছে বহুবার আবেদন করা হয়েছিল সেনাবাহিনী নিয়োগ করার জন্য কিন্তু নির্বাচন কমিশনার বরাবর আগের মতই সেনাবাহিনী থাকবে কিন্তু সেনা ছাউনিতে থাকবে। আর ভাই ছাউনিতেই যদি থাকবে ফাঁকা বুলি ছাড়ার কি আছে? জনগণ কি বোকা নাকি? তারা কি জানে না সেনাবাহিনী ছাউনিতে থেকে কি করবে আর বাইরে থেকে কি করবে? তবে তিনি যাই করুন না কেন তিনি যদি মানুষের মৌলিক অধিকার ভোট নিয়ে তামাশা করেন, চালাক চাতুরামি করেন অবশ্যই একদিন না একদিন জনতার আদালতে তিনাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। জনতা কখনই অন্যায়কে মাফ করেনি। সময়ের ব্যবধানে বিচার হয়েছে।
পুলিশের ভূমিকা: অতি উৎসাহিত কিছু পুলিশ কর্মকর্তা নিজ দায়িত্বে কথা ভুলে গিয়ে আওয়ামী সরকারের হুকুমের গোলামি করেছে। তা না হলে পুলিশ কিভাবে জাল ভোট প্রদানকারীদের গ্রেফতার না করে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে? পুলিশের কাজ হলো চোরকে গ্রেফতার করা এখন পুলিশ চোরের নিরাপত্তা দিচ্ছে। অর্থাৎ পুলিশ চোরদের কাতারে শামিল হয়েছে। যাদেরকে দেশের সেবার জন্য রাখা হয়েছে তারা আজ গোলামি করছে।
দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন আমাদের জন্য শিক্ষা : গত কয়েক মাস পূর্বে দিল্লীতে হয়ে গেল দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন। দিল্লীর আম আদমী পার্টি ৭০টি আসনের মধ্যে ৬৭ আসন পেয়েছে। মাত্র ৩টি আসন পেয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে কোথাও ভোট চুরি বা জাল ভোটের কথা শোনা যায়নি। নরেন্দ্র মোদি যদি চাইতেন তিনি ভোট কেন্দ্র দখল করে, পুলিশের সহযোগিতায় জাল ভোটের ব্যবস্থা করতে পারতেন। নির্বাচন কমিশনারকে দিয়ে যেনো তেনো একটি নির্বাচন করে বিজেপি প্রার্থীকে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটি করেননি, তিনি জনগণের রায়কে সম্মান দেখিয়েছেন। গণতন্ত্রকে বিজয়ী করেছেন। আমাদের সরকারগুলো কথায় কথায় তাদের উদাহরণ দিয়ে থাকে। আমাদের সরকার তাদের থেকে এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে পারবেন না? কেন আমাদের সরকার শান্তিপূর্ণ অবাধ, ভোট ডাকাতিবিহীন একটি নির্বাচন উপহার দিতে পারবে না? দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশ সরকার জনগণের রায়কে অসম্মান করেছে। ভোট চুরি করেছে। কেন্দ্র দখল করেছে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সরকারগুলোকে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যে যে কোন মূল্যে জেতা আসলে কোন বিজয় নয়।
মূলত বিএনপির কথায় বলি বা ২০ দলীয় জোটের কথায় বলি, তারা না আওয়ামী লীগকে বুঝতে পেরেছে, না আওয়ামী লীগের তরিকাকে বুঝতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ যতনা জনগণের উপর ভরসা করেছিল তার চাইতে আওয়ামী লীগ ভরসা করেছিল প্রশাসনের উপর। প্রশাসনের শতভাগ সহায়তায় শতভাগ সফলতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে কোন পরাজয়ই অপূরণীয় ক্ষতির বাহক নয়। যে কোন খারাপ থেকে ভালো করা যায়। যে কোন পরাজয়কে ভিত্তি করে জয়ের সৌধ গড়ে তোলা যায়। যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করেও অনেক জাতি পরবর্তী যুদ্ধে জয়লাভ করেছে। অনেক দুঃসহ অত্যাচারের ভেতর থেকে এমন এক অদম্য শক্তি জন্মলাভ করে যা একদিন সমস্ত অধঃপতিত জাতিকে মুক্তি এনে দেয়।

রবিবার, ১০ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও হিংসার রাজনীতি


১.
ষাটের দশকের গোড়ার দিকে  আততায়ীর গুলীতে নিহত হলেন মার্কিন  প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। তখন গোটা বিশ্ব মুহ্যমান হয়ে গিয়েছিল। সেই হত্যাকান্ড নিয়ে বই লিখলেন উইলিয়াম ম্যাঞ্চেস্টার। বইটির শিরোনাম ছিল ‘ডেথ অফ অ্যা প্রেসিডেন্ট’ আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বইটির অনুবাদ প্রকাশ পেতে থাকল বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সংবাদপত্র এবং সাময়িকীসমূহে।
যখন মার্টিন লুথার, ম্যালকম এবং বাদশাহ ফয়সাল আততায়ীর হাতে মারা যান, নড়ে ওঠেছিল সারা দুনিয়া। বিগত বিংশ শতাব্দীতে চাঞ্চল্যকর বহু রাজনৈতিক হত্যাকান্ড হয়েছে এবং হিংসার রাজনীতিও বিকাশ লাভ করেছে। যার রক্তাক্ত ধারাবাহিকতা এখনো চলছেই।  গবেষণায় প্রকাশিত হত্যাকান্ডের তালিকাটি দিলেই অনুধাবন করা যায়, কতো রক্তপাত হয়েছে রাজনীতির নামে ক্ষমতার শীর্ষ মহলে। আব্রাহাম লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট ১৫ এপ্রিল ১৮৬৫, জেমস এ গারফিল্ড যুক্তরাষ্ট্রের ২০তম প্রেসিডেন্ট ২৯ সেপ্টেম্বর ১৮৮১, ম্যাককিনলি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ০৬ সেপ্টেম্বর ১৯০১, ফ্রান্সিস ফার্ডিন্যান্ড অষ্ট্রিয়ার যুবরাজ ২৮ জুন ১৯১৪, নিকোলাস দ্বিতীয় রাশিয়ার জার সম্রাট ১৬ জুলাই ১৯১৮, লিওন ট্রটস্কি রুশ বিপ্লবের নায়ক ও যুদ্ধমন্ত্রী ২০ আগস্ট ১৯৪০, মহাত্মা গান্ধী ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮, ফক বার্নাডেট জেরুজালেমে জাতিসংঘের সুইডিস সমন্বয়কারী ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮, হোসনী জাইম সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আগস্ট, ১৯৪৯, আব্দুল ইবনে হুসেন জর্ডানের বাদশা ২০ জুলাই ১৯৫১, লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ১৬ অক্টোবর ১৯৫১, বাদশা ফয়সাল ইরাকের বাদশা ১৪ জুলাই, ১৯৫৮, সলোমান বন্দরনায়েক শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯, প্যাট্রিক লুবুম্বা কঙ্গোর প্রধানমন্ত্রী ১৭ নবেম্বর ১৯৬১, রাফায়েল ট্রুজিলো ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের নায়ক ৩০ মে ১৯৬১, আব্দুল করিম কাসেম ইরাকের প্রধানমন্ত্রী ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩, নগো দিন দায়েম ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ১২ নবেম্বর ১৯৬৩, জন এফ কেনেডী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ২২ নবেম্বর, ১৯৬৩, জিগমে দোরজী ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ৫ এপ্রিল ১৯৬৪, হাসান আলী মনসুর ইরানের প্রধানমন্ত্রী ২১ জানুয়ারি ১৯৬৫, আবুবকর তাফাওয়া নাইজেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, আবদুল্লাহ জর্ডানের সুলতান ২০ জুলাই ১৯৬৬, এইচ এফ ভারওয়ার্ড দঃ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৬, মার্টিন লুথার কিং মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনের নেতা ০৪ এপ্রিল ১৯৬৮, রবার্ট এফ কেনেডী মার্কিন সিনেটর ও এটর্নি জেনারেল ০৫ জুন, ১৯৬৮, শের মার্ক সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট ১৫ অক্টোবর, ১৯৬৯, টম মুবয়া নাইরোরির মন্ত্রী ০৬ জুলাই ১৯৬৯, ওয়াশকিতাল জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী ২৮ নবেম্বর, ১৯৭১, লুইস কারেরাব্যালানকো স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী ২০ ডিসেম্বর, ১৯৭৩,বাদশা ফয়সাল সৌদি আরবের বাদশা ২৫ মার্চ ১৯৭৫, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, জেনারেল মুর্তালা মুহম্মদ নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬,ওরল্যান্ড লেটেরিয়ার চিলির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬, ইব্রাহিম আল হামদী ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট অক্টোবর, ১৯৭৭, কামাল জুমলাত মধ্য লেবাননের দ্রুজ নেতা ১৬ মার্চ, ১৯৭৭, মুহম্মদ দাউদ আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট ২৭ এপ্রিল, ১৯৭৮, লর্ড মাউন্টব্যাটেন বৃটিশ ভারতের শেষ বড় লাট ও স্বাধীন ভারতের ১ম গবর্নর জেনারেল ২৭ আগস্ট, ১৯৭৯, পার্ক চুংহি দঃ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ২৭ অক্টোবর, ১৯৭৯, আনাসচমমিও সামেজা নিকারাগুয়ার সাবেক একনায়ক ১৯৮০, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ৩০ মে ১৯৮১, মোহাম্মদ আলী রাজাই ইরানের প্রেসিডেন্ট ৩০ আগস্ট, ১৯৮১, মোহাম্মদ জাভেদ বাহোনার ইরানের প্রধানমন্ত্রী ৩০ আগস্ট, ১৯৮১, আনোয়ার সাদাত মিসরের প্রেসিডেন্ট ৬ অক্টোবর, ১৯৮১, বশির জাময়েল লেবাননের প্রেসিডেন্ট ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১, বেনগুইনো একুইনো ফিলিপাইনের বিরোধী দলের নেতা ১৯৮৩, ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪, ওলফ পালমে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬, রশীদ কারামী লেবাননের প্রধানমন্ত্রী ১ জুন, ১৯৮৭, আবু জিহাদ প্যালেস্টাইনি কমান্ডো প্রধান ১৯৮৮, জিয়াউল হক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ১৯৮৮, লুইস কার্লোস কলাম্বিায়ার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ১৯৮৯, রেনে মুয়াদ লেবাননের প্রেসিডেন্ট ১৯৮৯, আহম্মেদ আব্দুল্লাহ কমোরভোর প্রেসিডেন্ট ১৯৮৯, রিফাত মাহজিন মিসরের স্পিকার ১৯৯০, ভ্যানিচামন লেবাননের খ্রিষ্টান রাজনৈতিক নেতা ১৯৯০, রাজিব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২১ মে, ১৯৯১, আবু ইয়াদ ফিলিন্তিনী নেতা ১৯৯১, মোহাম্দ বোদিয়াফ আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ২৯ জুন ১৯৯২, ললিত আতুলাথ মুদালী শ্রীলঙ্কার বিরোধী দলের নেতা ১ মে, ১৯৯৩, রানাসিঙ্গে প্রেমাদাসা শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতি ১ মে, ১৯৯৩, হ্যাবাইয়া বিমানা রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট ৭ এপ্রিল, ১৯৯৪, এন্টারাইয়াসিয়া বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট ৭ এপ্রিল, ১৯৯৪, যামিনী দেশানায়েক শ্রীলঙ্কার বিরোধী দলের নেতা অক্টোবর, ১৯৯৪, আইজ্যাক রবিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ৫ নবেম্বর ১৯৯৫, নজিবুল্লাহ আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬, ইব্রাহিম বারি নাইজারের প্রেসিডেন্ট ৯ এপ্রিল, ১৯৯৮, লই মারিয়া আগ্রাসিয়া প্যারাগুয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ২ মার্চ ১৯৯৯, ভাজাগেন সার্কিসিয়ান আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ২৭ অক্টোবর ১৯৯৯, সিভি গুনরত শ্রীলঙ্কার শিল্পমন্ত্রী ৭ জুন ২০০০, বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহদেব নেপালের রাজা ১ জুন ২০০১, বেহাভান জিভি ইসরায়েলের পর্যটনমন্ত্রী ১৭ অক্টোবর ২০০১, হাজি আব্দুল কাদির আফগান ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পূর্তমন্ত্রী ২৬ জুলাই ২০০২, শেখ ইয়াসিন আহমেদ হামাসের প্রতিষ্ঠাতা ও আধ্যাতিক নেতা ২২ মার্চ, ২০০৪, আবদেল আজিজ রানতিসি হামাসের প্রধান ১৭ এপ্রিল, ২০০৪, রফিক হারিরি লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০০৫, বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭ প্রমুখ।
২.
রাজনীতির পরিসমাপ্তিহীন সংঘাত যখন যুদ্ধ ডেকে আনে, তখনো হয়েছে ভয়াবহ রক্তপাত। শতবর্ষ আগের ১ম বিশ্বযুদ্ধের তথ্য দিয়ে বলা যায়, রক্তের ধারা কেবল রক্তই বাড়িয়েছে। ১৯১৪-১৯১৮ সালের মধ্যে মানুষের ওপর মানুষের নজিরহীন নিষ্ঠুরতা আর সৃষ্টিবিনাশী ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ অকল্পনীয় বিষয়। সঠিক হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধটি চলেছিল চার বছর তিন মাস। যুদ্ধ-প্রয়াসে লিপ্ত ছিল তিরিশটি দেশের শত শত রাজনীতিবিদ ও জেনারেল। পরিসমাপ্তি ঘটেছিল চারটি বহুজাতিক সা¤্রাজ্যের। অভ্যুদয় হয়েছিল সাতটি নতুন রাষ্ট্রের। ৮.৫ মিলিয়ন সামরিক এবং ১০ মিলিয়ন বেসামরিক মানুষের প্রাণের বিনাশ হয়েছিল। প্রত্যয় ব্যয় ছিল ১৮০.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং পরোক্ষ ব্যয় হয়েছিল ১৫১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
হিরোশিমা আর নাগাসাকির আণবিক বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছিল আরো ভয়াবহরূপে। ক্ষয়-ক্ষতির পরিণামও প্রথমটির চেয়ে দ্বিগুণ। আর এখন বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে, ইরাকে, আফগানিস্তানে, ফিলিস্তিনে, ভিয়েতনামে, আফ্রিকায় থেমে থেমে যে যুদ্ধ চলছে, তার ক্ষতি কয়েকটি বিশ্বযুদ্ধের সমান।
৩.
এতো কিছুর পরেও কি রাজনৈতিক হত্যাকান্ড আর হিংসা কমেছে ? না। বরং বেড়েছে। নতুন নতুন নামে বাড়ছেই হত্যার পরিধি। যেমন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। এটি হলো কপ্রকার বেআইনী হত্যাকা- যা সাধারণত রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক ব্যক্তিত্ব বা অপরাধীকে রাষ্ট্রপ্রদত্ত আইনত বিচারের পূর্বেই হত্যা করা হয়। এটি সাধারণত সরকার, প্রাদেশিক সরকারের মাধ্যমে, যেমন: পুলিশ বা সশস্ত্র বাহিনী, অথবা বিভিন্ন অপরাধী সংগঠন, যেমন: ইতালীয় মাফিয়ার মাধ্যমে হয়। উইকিপিডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং ডেথ স্কোয়াড (death squads) সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্যে, মধ্য আমেরিকা, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত (জম্মু ও কাশ্মীরসহ অন্যান্য রাজ্য), আফ্রিকায়, জ্যামাইকায়, কসোভোয়, দক্ষিণ আমেরিকার বেশকিছু অংশ, চেচনিয়ায়, রাশিয়ায়, উজবেকিস্তান, উত্তর ওশেনিয়ায়, থাইল্যান্ডের কিছু অংশে এবং ফিলিপাইনে। লক্ষণীয়, তালিকায় বাংলাদেশের নামটিও রয়েছে।
৪.
বাংলাদেশে প্রায়-সকল ঘটনার মতোই মৃত্যুতেও রাজনীতির গন্ধ পাওয়া যায়। সেটা প্রেসিডেন্ট, নাসিরউদ্দিন পিন্টু বা সাধারণ নাগরিক, যে কেউই হতে পারেন। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও হিংসার অভিযোগ ওঠে প্রায়শই। বিভিন্ন ধরনের বিচারের পেছনে রাজনৈতিক অভিযোগের বহর লক্ষ্য করা যায় পত্রিকার পাতা খুললেই। বলা হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও হিংসাই হত্যা বা বিচারের প্রধান কারণ। ন্যায় ও আইনের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থচিন্তাই যদি প্রধান বিষয় হয়, তাহলে স্বচ্ছতা থাকে না। হিংসাই যদি মূল উদ্দেশ্য হয় তবে ন্যায়বিচারের বারোটা বাজতে বাধ্য। পুরো ঘটনাপ্রবাহই তাহলে রাজনৈতিক হিংসার স্রোতে আবর্তিত ও পঙ্কিল হতে থাকবে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন আবিল হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শতবর্ষের অভিজ্ঞতায় ইউরোপ যথেষ্ট সতর্ক হয়ে নিজের ভূখন্ডে রাজনৈতিক হত্যা ও হিংসা কমিয়ে দিয়েছে এবং এগুলোকে চাপিয়ে দিচ্ছে এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যে। আমরা যদি বিশ্বের ভয়াবহ যুদ্ধ আর হিংসার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাবধান না হই, তাহলে হিংসার চক্করে জর্জরিত হবোই। হিংসা থেকে বাড়বে প্রতিহিংসা এবং আসবে বিনাশ। শান্তিকামী একটি দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে এমন হিংসা, প্রতিহিংসা ও বিনাশের চ-নীতি এবং ক্ষতিকর ধারা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

শনিবার, ৯ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বিএনপি-জামায়াত বিভক্তি মিশন, জনাব খানের চিন্তার সুস্থতা ও ‘বোকো হারাম’ প্রসঙ্গ!!


সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকমিটির শুনানিতে বাংলাদেশের বর্তমান আলোচিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, হত্যা, গুম, খুন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম, ভোট ডাকাতি, বিরোধীদলীয় নেত্রীর ওপর হামলা, যুদ্ধাপরাধ বিচারের মানদন্ড, মিডিয়ার স্বাধীনতা হরণ, বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ, শ্রমিক নির্যাতন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বিস্তারিত শুনানি হয়েছে। শুনানিতে অনেকেই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে আমেরিকাকে বাংলাদেশের ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, য্ক্তুরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে টানাপোড়েন চলছে। এক কথায় বলা যায়, আন্তর্জাতিক মিডিয়া শেখ হাসিনার সরকারকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এ নিয়ে সরকারের উপর নানা ধরনের আন্তর্জাতিক চাপও অব্যাহত রয়েছে। বিরোধী দলের আপাতত কোন আন্দোলনের কর্মসূচি না থাকলেও সরকার প্রচন্ড অস্থিরতার মধ্যে সময় অতিক্রম করছে।
‘২৮ এপ্রিল, ২০১৫ অনুষ্ঠিত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ওপর কড়া নজরদারি করেছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তারা গণতন্ত্রের স্বার্থে এ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সরকারের প্রতি বার বার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া ব্যাপক কারচুপি, অনিয়ম, কেন্দ্র দখল এবং বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচন বর্জনের খবরে হতাশ হয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক মহল। নির্বাচনে অনিয়মের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে জাতিসংঘ। শুধু তাই নয়, বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোনও করেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। এর আগে নির্বাচনের দিন কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, যে কোনো মূল্যে জেতা আসলে কোনো বিজয় নয়। পরে নির্বাচনে জালিয়াতি ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেছে বলেও জানায় দেশটি। ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনও সব অনিয়মের তদন্ত দাবি করেন। একইভাবে জালিয়াতি ও সহিংসতায় সিটি নির্বাচন কলঙ্কিত হয়েছে বলে বিবৃতি দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সিটি নির্বাচনকে ভুয়া আখ্যা দিয়ে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন বলেছে, আরেকটি ভুয়া নির্বাচন প্রত্যক্ষ করল বাংলাদেশ। সিটি নির্বাচনে অনিয়ম আর সহিংসতায় সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানান ঢাকা সফররত মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারম্যানসহ প্রতিনিধিরা। (উৎস : নয়াদিগন্ত)
এমনি এক প্রেক্ষাপটে গত ৪ মে ২০১৫ জনাব মিজানুর রহমান খান দৈনিক প্রথম আলোর পত্রিকায় ‘যুক্তরাষ্ট্রের চোখে জামায়াত হবে ‘বোকো হারাম’?’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটির হেডলাইন দেখে কৌতূহলী হয়ে অনেকে পড়ার চেষ্টা করছে হয়ত। অনেকের মধ্যে আমিও একজন। জনাব খানের লেখায় স্থান পেয়েছে, জামায়াত-বিএনপির বিভক্তি এবং আমেরিকাকে জামায়াতের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার তথাকথিত বিতর্কিত বয়ান। লেখাটির সারমর্ম হচ্ছে, বিএনপি যদি জামায়াত থেকে আলাদা নাই হয় তাহলে বিগত দিনে বিরোধীদলের আন্দোলন দমন করতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২০ দলীয় জোটকে আইএস এর সাথে তুলনা করে জঙ্গি হিসেবে যেভাবে আখ্যায়িত করেছে, জনাব খান সাহেব তার থেকে আরেক ধাপ এগিয়ে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক জামায়াতকে বোকো হারামের সাথে তুলনা করে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দমনের জন্যে অনেকটাই উস্কিয়ে দেয়ার কাজটিই করেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার সাথে। তাছাড়া বিএনপির কোন ভবিষ্যৎ নেই, নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ! এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, ইত্যাদির ব্যর্থতার দিক তুলে ধরে জনাব খান আমেরিকাকে ২০ দলীয় জোট থেকে মুখ ফিরিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের সাথে থাকার নসিহত করেছেন ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে।
দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় জনাব খান মার্কিন সিনেটে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সংক্রান্ত উপকমিটির যে মিটিং নিয়ে এমন মিথ্যাচার করলেন, ঠিক সরকারের অনুগত আরেকটি পত্রিকা দৈনিক যুগান্তরের রিপোর্টটি পাঠকদের সামনে তুলে ধরলাম শুধু প্রথম আলোর জনাব মিজানের মনগড়া আজগুবি আষাঢ়ে গল্পে ভরা লেখাটির তুলনা করে বুঝবার জন্য।
দৈনিক যুগান্তর হেড লাইন করেছে ‘বাংলাদেশ এক চরম বিশৃঙ্খল রাষ্ট্র’ মার্কিন সিনেটে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সংক্রান্ত উপকমিটির চেয়ারম্যান ম্যাট সালমন বাংলাদেশকে একটি চরম বিশৃংখল রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, রাজনীতিতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিভক্ত। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচন ঘিরে সহিংস প্রতিবাদ হয়েছে। ফলে রাজনীতির উভয় পক্ষের অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। শুনানিকালে উপস্থিত ছিলেন ডেভিস ইন্সটিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন পলিসির অধীন এশিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো লিজা কার্টিস, ইলিনোয়েস স্টেট ইউনিভার্সিটির চেয়ার অধ্যাপক ড.আলী রিয়াজ, গভর্নমেন্ট রিলেশনন্স হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের পরিচালক জয় কানসারা।
আলী রিয়াজ বলেন, ২০১৪ সাল তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকলেও ক্ষমতাসীন দল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ সময়টায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার সুযোগ বিনষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০১৫ সালের শুরুর দিকের রাজনৈতিক হানাহানির দায় এড়াতে পারে না। অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আচরণবিধি, ভীতিমুক্ত জীবনযাপনে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক কোনো ব্যক্তি কিংবা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যস্থতায় রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সমন্বয়ে জাতীয় সংলাপ প্রয়োজন। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর)
অথচ দৈনিক প্রথম আলোতে জনাব খান লিখেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের কি অবসান ঘটতে যাচ্ছে? মনে হচ্ছে, বিএনপিকে তার ‘কৌশল-মিত্র’ জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। ১৯৯৬ সালের আগ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যে বিতর্কিত কৌশলগত সম্পর্ক ছিল, তার দোহাই দিয়ে বিএনপি এতকাল যতটা সহজে দলটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে চলছিল, এখন তাদের তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। জামায়াতকে বাদ দিয়ে জোট পুনর্গঠন করা উচিত, কিন্তু তা করতে গেলে তারেক রহমানকেও মাইনাস করার ঝুঁকি নিতে হবে।’ মিজান সাহেব তার লেখায় আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো বাদ দিয়ে বিএনপি-জামায়াতকে নিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখাটি সাজিয়েছেন।
জনাব খান ও জাফর ইকবাল গংদের মনে রাখা দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার বয়ানে অনেক কিছু ঘটে যাবে তা আজকের যুগে মনে করার কোন কারণ নেই। আজকের গ্লোবাল পৃথিবীতে কোথায় কি হচ্ছে, কে কি বলছে স্যোশাল মিডিয়ার সুবাদে সবাই তা জানে। আমাদের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের লেখায় অসততার দিকটি একজন রিকশাওয়ালা শ্রমিক, কৃষক ও এখন ফেইসবুক ব্যবহারের সুবাদে আপনাদের লেখার অসততা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের দিকটি বুঝে ফেলে। জনাব খান বুদ্ধিজীবীর লেবাসে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝে।
সময়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এডওয়্যার্ড সাঈদ তার ঐতিহাসিক গ্রন্থ Representation of the intellectual (১৯৯৩) গ্রন্থে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকদের স্বভাব-প্রকৃতি, দায়-দায়িত্ব ও কর্মধারা চিহ্নিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, সরকারগুলো এখনো ব্যক্তিকে দমন করে চলেছে, ন্যায়-বিচারের ভয়াবহ ব্যত্যয় হচ্ছে, ক্ষমতা কর্তৃক বুদ্ধিজীবীদের করায়ত্ত করার প্রক্রিয়া তাদের কণ্ঠকে থামিয়ে দিচ্ছে। এবং প্রায়শই পথভ্রষ্ট হচ্ছেন বুদ্ধিজীবীরা।
আমরা এখন বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব আর অসততার যুগে বাস করছি। বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধত্ব গোটা সমাজব্যবস্থাকে বিপদগ্রস্ত করে। কখনও কখনও যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়। কারণ আমাদের সমাজের কলামিস্ট আর বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই বিভিন্ন সামাজিক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী। কেউ সরকারি দমন-নিপীড়ন, হামলা-মামলা থেকে বাঁচতে চায়। কেউবা আবার সরকারি বিজ্ঞাপন কিংবা গোপন সুবিধা ভাগিয়ে নিতেও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার পথে পা বাড়ায়। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখকদের এই তথ্য সন্ত্রাস অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের আগ্নেয়াস্ত্র থেকেও অনেক বেশি মারাত্মক।
জনাব খান এই লেখায় প্রচন্ড একপেশে নীতি অবলম্বন করেছেন। আমার মনে হয়, ইতোমধ্যেই প্রথম আলোর অনলাইনে পাঠক মন্তব্য দেখে তিনি তা উপলব্ধিও করেছেন। তিনি নিজের অজান্তেই বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল ও জোটের ক্ষেত্রে সুবিচার করতে পারেন নাই। তিনি তার লেখার শুরুতেই প্রশ্ন রেখেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের কি অবসান ঘটতে যাচ্ছে?’ আমি  জানি না তিনি হঠাৎ করে কোন উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত চিন্তা থেকেই এমন প্রশ্নের অবতারণা করলেন।
জনাব খান জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্যেই এমনটি করেছেন, তা যে কোন পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না। বিএনপি-জামায়াতের ঐক্য আওয়ামী লীগের মতই জনাব খানের কাছেও বিরক্তির কারণ। এজন্য তিনি ইনিয়ে-বিনিয়ে লেখার মূল উদ্দেশ্যই বিএনপি-জামায়াতের জোটে বিভক্তি। এই সমস্ত কলামিস্টরা কখনো হয়ে যান বিএনপির উপদেষ্টা আর কখনো সাজেন আওয়ামী লীগের খয়ের খাঁ। অনলাইনে একজন পাঠক মন্তব্য করেছেন, ‘সরকারের মামলার চাপেই কি মিজান সাহেব এমন আবোল তাবোল বকছেন?’ কারণ জনাব খানের একটি লেখা নিয়ে কিছুদিন পূর্বে তিনি কোর্টে গিয়ে সশরীরে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এমন কিছু ফুঁসিয়ে দিয়ে এমন লেখা!!
জনাব মিজান সাহেব বিএনপিকে এমন উপদেশই দিলেন, যা কামরুল-হানিফদেরকে হার মানিয়েছে। তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানকেও মাইনাস করার ঝুঁকি নেয়ার পরামর্শ দিয়ে মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশি এই উক্তির প্রতিফলন ঘটালেন!
তিনি লিখেছেন, ‘একাত্তরে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অনুসরণ করা বিতর্কিত বাংলাদেশ নীতির একমাত্র বাংলাদেশী সমর্থক জামায়াতই এখনো রাজনীতিতে ফ্যাক্টর হিসেবে টিকে আছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বিচার প্রক্রিয়ার মান নিয়ে উচ্চকিত থাকলেও ধীরে ধীরে অবস্থান বদল করে।’ আমার মনে হয়, জনাব খান -যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলের যে কথা বললেন, তা একেবারেই অসত্য। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা, জনাব শহীদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকরের পূর্বে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুদ্ধাপরাধ বিচারের অস্বচ্ছতা ও মানদ-ের প্রশ্ন তুলে সরকারকে এই রায় কার্যকর করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। যা সারা দুনিয়ার মানুষ জানলেও জনাব খান সাহেব সেই সত্যটুকু অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাজ্যের হাউজ অব লর্ডস এটিকে শুধু কালো আইন হিসেবেই চিহ্নিত করেনি বরং আইনটি সংশোধনের জন্য ১৭ টা পয়েন্টে অবজারবেশন সরকারের নিকট তুলে ধরেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে প্রণীত আইন যথেষ্ট নয়।’ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এশিয়া বিভাগ, দ্যা ওয়ার ক্রাইমস কমিশন অব দ্যা ইন্টারন্যাশনাল বার এ্যাসোসিয়েশন, দ্যা ওয়ার ক্রাইমস প্রজেক্ট ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া এই আইনের মাধ্যমে বিচারকাজ চালিয়ে গেলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিতর্ক বাড়বে। ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যালেন ডানকান ব্রিটিশ এ মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা দেশগুলো জামায়াতকে একটি মডার্ন ইসলামিক দল হিসেবেই জানে। প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট- এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন - ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটা গোঁড়া ধর্মান্ধ মৌলবাদী ইসলামপন্থী দল নয়। জামায়াতে ইসলামী একটি চরমপন্থী দল নয়। মুসলিম মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি মধ্যপন্থী দল। সম্প্রতি ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে একটি মধ্যপন্থী ইসলামী দল হিসেবে বিবেচনা করেছেন। জামায়াতে ইসলামী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের কাছে পেতে শুরু করেছে বিশেষ বিবেচনা। আওয়ামী লীগ এখন প্রমাণ করতে চাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী হলো একটি গোঁড়া ধর্মান্ধ ইসলামপন্থী দল। তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে জামায়াত ক্ষমতায় আসবে। আর এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরো-মার্কিন জোট। কিন্তু ইউরো-মার্কিন জোটের অনেক নেতাই হতে পারছেন না আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জামায়াত সম্পর্কে এখন অনেক ভিন্নভাবেই ভাবছে বলেই মনে হয়।’ ( সূত্র: নয়া দিগন্ত )
মূলত জনাব খান সাহেবরাই বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের সাফল্য, জনপ্রিয়তা ও অগ্রগতিতে অস্থির হয়ে পড়েছেন। বিগত দিনের উপজেলা নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনের ঈর্ষণীয় ফলাফল অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। এবং অনেকের মধ্যে আফসোস ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। যারা জাতীয় পার্টিকে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসিয়ে আনন্দের ঢেকুর দিচ্ছিল, অথচ উপজেলা নির্বাচনের ডাবল শূন্য ফলাফল আর সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে তিন প্রার্থীর জামানত হারিয়ে হতাশা এবং বিষণœতায় জনাব মিজান সাহেবও কি আক্রান্ত? ২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত ৩৬ জন চেয়ারম্যান, ১২৯ জন ভাইস চেয়ারম্যান, ৩৬ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। যাদের  মোট প্রাপ্ত ভোট, ১৬,৪২,১৩৪। এত জুলুম-নির্যাতনের পরও এ অভূতপূর্ব ফলাফল সর্বত্র সাড়া ফেলে দিয়েছে। সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট ডাকাতি, কেন্দ্র দখল ও বর্জনের পরেও জামায়াতের ৫ জন কমিশনার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছে।
জনাব খান সাহেব লিখেছেন, ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া সেই শেখ হাসিনা আর আজকের হাসিনা এক নন।’ আমার মনে হয় তিনি সত্য কথাই লিখেছেন। আমি তার কথার সাথে পুরোপুরি একমত। কারণ এখনকার শেখ হাসিনা গণতন্ত্র হত্যাকারী, এদেশের অসংখ্য আলেম-ওলামা, সাংবাদিক, ছাত্র-শিক্ষক, রাজপথে মুক্তি জনতার আন্দোলনকে দমন করতে হত্যা, গুম, খুনের জন্য দায়ী সে সরকার পরিচালনা করেছেন, তাতে সত্যিই বলতে হয়, সেই শেখ হাসিনা আর আজকের হাসিনা এক নন।
জনাব মিজান সাহেব লিখেছেন, ‘বিএনপি নাচতে নাচতে জামায়াতকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল। এরপর জামায়াতী জোশে জেএমবি সারা দেশে বোমা ফাটালেও তাদের হুঁশ হলো না, ঘুম ভাঙতে খুব দেরি হলো কিংবা ভাঙলই না।’ একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে একথা সকলেরই জানা, জেএমবির উৎপত্তি হয়েছিল আওয়ামী লীগের শাসনামলেই। এবং জেএমবির প্রধান শায়েখ আব্দুর রহমান যুবলীগ নেতা মির্জা আজমের ভগ্নিপতি। সুতরাং চার দলীয় জোটের ভাব মর্যাদা ক্ষুণ্ন ও দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্যেই আওয়ামী লীগ এমন নাটক সাজিয়েছিল, একথা কেউই ভুলে যায়নি। বরং বেগম খালেদা জিয়ার সরকারই শায়েখ আব্দুর রহমান এবং বাংলা ভাইদের ফাঁসি দিয়েছিল। জনাব মিজান সাহেবরা অন্যকে কাসুন্দি ঘাটার কথা বলে নিজেই যেন কাসুন্দি ঘাটছেন?
মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন রিলেশন্স কমিটিতে হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের পরিচালক জে কানসারা ব্যতীত কোন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই জামায়াত-শিবিরকে নিয়ে কোন বক্তব্য রাখেননি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান ঐ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘জয় কানসারা যে সব ভিত্তিহীন, বানোয়াট, কাল্পনিক, অসত্য, অবাস্তব ও মনগড়া বক্তব্য রেখেছেন তা সম্পূর্ণ বাস্তবতা বিবর্জিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নির্যাতনের যে সব অভিযোগ তিনি জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এনেছেন তা তার মনগড়া বক্তব্য ছাড়া আর কিছু নয়।’ জনাব খান জামায়াত নিষিদ্ধ করা সম্পর্কে এবং জামায়াতের বিরুদ্ধে যে সব অপবাদ রচনা করেছেন তা এ দেশের জনগণের কাছে হাস্যকর। তিনি জামায়াতকে নাইজেরিয়ার জঙ্গি সংগঠন ‘বোকো হারাম’-এর সাথে তুলনা করে নিজের মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক ধারা সন্নিবেশিত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে তা এ দেশের জনগণের নিকট অত্যন্ত স্পষ্ট।

শুক্রবার, ৮ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড থামছে না


সরকারের বার বার প্রতিশ্রুতেও বিচারবহির্ভূত পন্থায় হত্যাকান্ড থামছে না। ফলে জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের পরিসংখ্যান। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জনবান্ধব দাবিদার মহাজোট সরকারের আমলনামায় একের পর এক যুক্ত হচ্ছে বিনা বিচারের হত্যাকান্ড। বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডে ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ।
গত সাড়ে তিন মাসে বিচারবহির্ভূতভাবে নিহত হয়েছেন ৭০ জন। নিহতদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুলীবিদ্ধ হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ জন। সাধারণত পায়ে গুলী লাগার ঘটনাই বেশি। অন্যদিকে, নিহতদের ৫৩ জনই প্রাণ হারিয়েছেন কথিত ক্রসফায়ারে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ৩২৯ জন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৯, ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৭, মার্চ মাসে ৫২, এপ্রিলে ৯, মে মাসে ৭৪, জুনে ১০, জুলাইয়ে ১৩, আগস্টে ১০, সেপ্টেম্বরে ৫, অক্টোবরে ১৫, নবেম্বরে ১২ এবং ডিসেম্বরে ৫৩ জন নিহত হয়।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ৩৯, ফেরুয়ারিতে ১৭, মার্চে ১৪, এপ্রিলে ১৮, মে মাসে ৯, জুনে ১০, জুলাইয়ে ১৫, আগস্টে ৭, সেপ্টেম্বরে ৭, অক্টোবরে ২০, নবেম্বরে ৬ এবং ডিসেম্বরে ১০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন।
চলতি বছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ৭০ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৮, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮, মার্চে ১২ এবং এপ্রিলের অর্ধমাসে দুইজন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। এর বাইরে গত সাড়ে তিন মাসে ৩০ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১২, ফেব্রুয়ারিতে ৭, মার্চে ৮ এবং এপ্রিলে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
চলতি বছরের সাড়ে তিন মাসে শুধু ক্রসফায়ারেই নিহত হয়েছে ৫৩ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩০, মার্চে ৯ জন এবং এপ্রিলে ২ জন ক্রসফায়ারের শিকার হন। এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা পায়ে গুলীবিদ্ধ হন কমপক্ষে ৩০ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৬ এবং মার্চে ৭ জন গুলীবিদ্ধ হয়েছেন।
গত ৭ জানুয়ারি নোয়াখালীর চৌমুহনীতে পুলিশের গুলীতে নিহত হন বেগমগঞ্জ উপজেলার ছাত্রদল কর্মী মহসীন উদ্দিন ও সেনবাগ উপজেলা যুবদল কর্মী মিজানুর রহমান রুবেল। ৮ জানুয়ারি যশোরে ক্রসফায়ারে নিহত হন রাজু নামে এক যুবক। ১৬ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট এলাকায় র‌্যাবের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ছাত্রদল নেতা মতিউর রহমান। ঘটনার পর র‌্যাব-৫ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর কামরুজ্জামান গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, বিশেষ অভিযানে মতিউরসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে নাশকতায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। পরে তাকে নিয়ে র‌্যাব অভিযানে বের হলে মতিউরের সহযোগীরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলী চালায়। এ সময় র‌্যাবও পাল্টা গুলী চালায়। একপর্যায়ে মতিউর গুলীবিদ্ধ হন। তবে মতিউরের পরিবারের দাবি তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
১৭ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পূর্ব টিমের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মতিঝিলের এজিবি কলোনি এলাকায় নিহত হয়েছেন ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি নড়াইল পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার ইমরুল কায়েস। ইমরুলের স্ত্রী জান্নাতুলের দাবি, তার নির্দোষ স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি কায়েসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ রয়েছে।
২০ জানুয়ারি রাজধানীর খিলগাঁও জোড়পুকুরপাড় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান জনির লাশ। নিহত জনির বাবা ইয়াকুব আলী গণমাধ্যমে জানান, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ২২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা জিসান দাউদকান্দিতে র‌্যাবের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।
ঝিনাইদহের শৈলকুপার কুসুমবাড়ি গ্রামের হাশেম আলী বিশ্বাসের ছেলে সুলতান বিশ্বাস ৩৫ দিন নিখোঁজ থাকার পর ২৬ জানুয়ারি র‌্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হন। ওই দিনই ক্রসফায়ারে আবুল কালাম নামে আরো একজন নিহত হন। ২৭ জানুয়ারি সাতক্ষীরার তালায় রফিকুল ইসলাম নামে একজনকে ডাকাত সন্দেহে পুলিশ গ্রেফতার করে। পরে ক্রসফায়ারে তার মৃত্যু হয়। একই দিন রাজশাহীর বিনোদপুরে জামায়াত নেতা অধ্যাপক নুরুল ইসলাম শাহীনকে আটকের পর ক্রসফায়ারে তার মৃত্যু হয়।
২৯ জানুয়ারি রাজশাহী মহানগর বিএনপি নেতা আইনুর রহমান মুক্তাকে পুলিশ আটক করে নির্যাতন করায় তার মৃত্যু হয় বলে দলীয় সূত্র জানায়। একই দিন সাতক্ষীরায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শিবিরকর্মী সাকিবুল ইসলামকে পুলিশ আটক করে। পরে পুলিশী নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৯ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়।
২৯ জানুয়ারি সদরঘাটের লঞ্চ থেকে সাদা পোশাকের লোকজন নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ছাত্রদল নেতা আরিফুল ইসলাম মুকুলকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন ৩০ জানুয়ারি তার লাশ পাওয়া যায় ঢাকার রূপনগর এলাকায়। আগের দিন অপহৃত হওয়া এদিন যশোরের চৌগাছা উপজেলা বিএনপি কর্মী সামাদ মোল্লার লাশ উদ্ধার করা হয়।
১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সাইদুল ইসলাম নামে এক জামায়াত নেতা পুলিশের গুলীতে আহত হয়ে পরের দিন তিনি মারা যান। এদিন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকার শাহ আলী থানা সভাপতি এমদাদ উল্লাহ পুলিশের ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হন। ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে র‌্যাবের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন সাখাওয়াত হোসেন রাহাত নামে এক যুবক। একই স্থানে নিহত হন মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদ নামে আরো একজন। এদিন ভাষানটেক থানা এলাকা থেকে আল আমিন নামে এক যুবকের এবং বিএনপির সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ভাগ্নে গাজি মোহাম্মদ নাহিদের গুলীবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুরে বন্দুকযুদ্ধে মনির হোসেন নামে এক যুবকসহ একইস্থানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অজ্ঞাত নামে এক যুবক নিহত হন।
৬ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কাটাখালী বাজারে শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তথ্য গবেষণা সম্পাদক শাহাবুদ্দিন, বিনোদপুর আবাসিক মেস শাখার সভাপতি মফিজুর রহমান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ হবিবুর রহমান হল সভাপতি হাবিবুর রহমান বন্ধুর বাড়িতে দাওয়াত খেতে যান। সেখান থেকে ফিরে মোটরসাইকেলে কাটাখালী পৌরসভার সামনে পৌঁছলে মতিহার থানা পুলিশ তাদেরকে আটক করে। এরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রাত আড়াইটার দিকে পুলিশ গুলীবিদ্ধ অবস্থায় তিনজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার শাহাবুদ্দিনকে মৃত ঘোষণা করেন। একইদিন যশোরে পুলিশের গুলীতে নিহত হন শহিদুল ইসলাম নামে এক জামায়াত কর্মী। তবে পুলিশ বলেছে, শহিদুলকে আটকের পর তিনি পুলিশের গাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন বন্দুকযুদ্ধে শহিদ নিহত হন। এছাড়া এদিন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা ছাত্রশিবির সভাপতি সাহাব পাটওয়ারী (২৪) পুলিশের গুলীতে নিহত হয়েছেন। নিহতের মা ছাকিনা বেগমের দাবি, তার ছেলেকে ৫ ফেব্রুয়ারি সাদা পোশাকধারী পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। সকালে হাসপাতালে তার লাশ পাওয়া যায়।
৭ ফেব্রুয়ারি বাচ্চু নামে এক জামায়াত কর্মী ক্রসফায়ারে নিহত হন বলে জানা যায়। ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানায় জসিম উদ্দিন নামে এক শিবির নেতা পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। একই দিন কুমিল্লায় নিহত হন স্বপন মিয়া নামে এক বিএনপি নেতা। ৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ির কাঠেরপুল এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় বিএনপি সমর্থক রাসেল সরদার। এদিন দাউদকান্দিতে ক্রসফায়ারে নিহত হন চৌদ্দগ্রামের বিএনপি নেতা সোহেল মিয়া।
১৩ ফেব্রুয়ারি মিরপুর থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নূরে আলমের গুলীবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয় গাজীপুর থেকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি বরগুনার আমতলীতে বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় মোজাম্মেল নামে এক বিএনপি সমর্থক। একইদিন সীতাকুন্ডে পুলিশের গুলীতে নিহত হন আরিফ নামে এক যুবদল নেতা। হাতকড়া পরানো অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার হয়।
১৫ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের রানীবন্দরে শিবিরনেতা মতিউর গুলীতে নিহত হন। একই দিন ময়মনসিংহে বিএনপি সমর্থক লিটন মিয়াকে গুলী করে হত্যা করে পুলিশ। এছাড়া মাগুরার শালিখা উপজেলার ছয়ঘরিয়ার মশিয়ার রহমান নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে গুলীর চিহ্ন রয়েছে।
১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর বুড়িরঘরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শিবিরকর্মী মোস্তফা মঞ্জিল নিহত হন। তিনি গাইবান্ধার তুলসীঘাটে বাসে পেট্রোল বোমা হামলার আসামী। একইদিন ঝিনাইদহে র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন রফিউল ইসলাম ওরফে রফি ওরফে তারেক নামে এক যুবক। ১৭ ফেব্রুয়ারি যশোরের মনিরামপুরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন বিএনপি নেতা আবু সাইদ ও বজলুর রহমান।
১৮ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে বিজিবির সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন হোসেন আহমদ নামে এক যুবক। একইদিন ১৮ ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন রফিকুল ইসলাম খোকন নামে এক ব্যক্তি।
১৯ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরের যুবদল নেতা মাঈন উদ্দিন ওরফে বাবলুর গুলীবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ডেকে নিয়ে যাওয়ার পরদিন তার গুলীবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে গ্রেফতার হওয়ার পর বরিশালের আগৈলঝাড়ায় পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন যুবদল নেতা কবির হোসেন মোল্লা ও তাঁতীদল নেতা টিপু হাওলাদার।
২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন শ্রমিকদল নেতা আব্দুল ওদুদ। ওই দিন ঝিনাইদহে গুলীতে নিহত হন এক বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ছেলে পলাশ এবং বিএনপি কর্মী দুলাল। পরিবার বলেছে দুই দিন আগে তাদেরকে আটক করা হয়েছিল।
২৪ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন শাহীন নামে এক যুবক। পুলিশ বলেছে, শাহীনের নেতৃত্বে পুলিশের ওপর হামলার পর সেখানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শাহীন নিহত হন। একই দিন মাগুরায় নিহত হয়েছেন টাইগার দাউদ নামে এক যুবক। ২৬ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনে বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছে। র‌্যাব জানিয়েছে, তারা বনদস্যু।
২৭ ফেব্রুয়ারি চিরিরবন্দরে পুলিশের গুলীতে নিহত হয়েছে যুবদল নেতা রেজওয়ানুল ইসলাম। জানা যায়, রেজওয়ানুলের বাবা স্থানীয় বিএনপি নেতা হাবিবকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এসময় হাবিবের স্ত্রী স্বামীকে রক্ষার জন্য গেলে পুলিশ তার ওপর নির্যাতন শুরু করে। তখন মায়ের ওপর নির্যাতনের ছেলে প্রতিবাদ করলে পুলিশ তার ওপর গুলী চালায়।
৮ মার্চ রাত ৩টায় মিঠাপুকুরের বলদী পুকুরে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি নাজমুল হুদা লাবলু নিহত হন। পুলিশের দাবি গাছকাটার সময় বাধা দিলে দুর্বৃত্তরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ও পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে। তখন পুলিশ পাল্টা গুলী চালালে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে পুকুর থেকে তাকে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে সে মারা যায়। তবে তার পিতা নুরুন্নবী শাহ গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, ‘ঘটনার দিন রাতে আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে পুলিশ নাটক সাজিয়েছে’।
১১ মার্চ যুবদল কর্মী আরিফ পঙ্গু হাসপাতালে নিহত হয়। লক্ষ্মীপুরের কমল নগরে ১ মার্চ রাতে বন্দুকযুদ্ধে সে আহত হয়। ১৬ মার্চ যশোর-মাগুরা সড়কে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ইউনুস আলী। সহকারী পুলিশ সুপার রেশমার দাবি সে ডাকাতি করছিল। পুলিশ গেলে গুলী ছোঁড়ে। পুলিশ তখন পাল্টা গুলী ছোঁড়ে। এতে ইউনুস মারা যায়।
১৯ মার্চ যশোর সদর উপজেলায় যুবদল নেতা ও ইউপি মেম্বার মেজবাহ উদ্দিন চন্টুর লাশ উদ্ধার করা হয়। তার পরিবারের অভিযোগ, পুলিশই তাকে হত্যা করে পরে রেললাইনে নিয়ে নাটক সাজায়। নিহত চন্টুর ভাই রুহুল কুদ্দুস মন্টু গণমাধ্যমে জানান, দুই দিন আগ থেকে তার ভাই পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। তবে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা চন্টু নামে কাউকে আটকের কথা অস্বীকার করেন। ২১ মার্চ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এক যুবক নিহত হয়। সে ডাকাত ছিলো বলে পুলিশের দাবি। ২২ মার্চ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রাজধানীর শাহজাহানপুরে মোবারক হোসেন ওরফে মন্টি নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অভিযোগ রয়েছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কথিত ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হচ্ছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড অব্যাহত থাকায় দেশে আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’ (তথ্য সূত্র : নয়াদিগন্ত- ১৯.০৪.২০১৫)
বলাবাহুল্য যে, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নতুন না হলেও গত কয়েক বছরে তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সেই সাথে সন্দেহবশত গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনাও মাঝে মধ্যে ঘটছে। উভয় ক্ষেত্রেই আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে মারাত্মকভাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ঘটছে বিচারবহির্ভূত হত্যা; আর উত্তেজিত বা উচ্ছৃঙ্খল জনতা দিচ্ছে গণপিটুনি। দেশে আইনের শাসন থাকলে কেউ পিটিয়ে কিংবা ক্রসফায়ারে কাউকে হত্যা করা সম্ভব হতো না বলে আমরা মনে করি। বিশেষ করে আইনের রক্ষকেরা যখন ‘ভক্ষক’ হয়ে দাঁড়ান, তখন জাতি উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। তদুপরি, কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে যাদের হতাহত ও পঙ্গু করা হচ্ছে, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠই সরকারবিরোধী রাজনীতি সংশ্লিষ্ট এবং চলমান আন্দোলনে সক্রিয়। এতে এ ধারণাই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে যে, ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে এবং সরকারি বাহিনীকে ব্যবহার করে তাদের পরিকল্পিতভাবে ক্রসফায়ারে দেয়া হচ্ছে। আটকের পর প্রধানত পায়ে গুলী করার ঘটনা জনমনে এ ধারণাকে আরো জোরালো করছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-আতঙ্ক বাড়ছে।
আমরা আশা করি, ক্ষমতা নয়, বরং আইনের শাসনকে দৃঢ় ভিত্তি প্রদানে বিচারবহির্ভূত হত্যার লাগাম টেনে ধরে সরকার বাহাদুর সদয় হবেন। সংবিধান ও আইনকে সর্বার্ধ্বে স্থান দিয়ে বিচারিক পন্থায় সব অপরাধ ও অভিযোগের সুরাহা করাই দেশবাসীর কাম্য। তাছাড়া বন্দুকের নলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেতও বটে। মনে রাখা দরকার, ‘ভীতির রাজত্ব’ কখনো গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকারকে প্রতিফলিত করে না। বরং রাষ্ট্রের ক্ষতিই সাধন করে।
এম. কে. দোলন বিশ্বাস

বুধবার, ৬ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গ্রহটি ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে


বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গত শুক্রবার টেলিফোনে কথা বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বানকি মুন। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানালো জাতিসংঘ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আহ্বান কতটা ফলপ্রসূ হবে? জাতিসংঘ তো নির্দিষ্ট করে কাউকে কিছু বলেনি। আর কোন সংকটে সবার দায় ও দায়িত্ব তো এক রকম নয়। আসলে এই ধরনের আহ্বানের একটি কাগুজে মূল্য থাকতে পারে, নৈতিক চাপও সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন হলো- বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নৈতিকতাকে আসলে কি কোনো গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে? নৈতিকতার মানন্ডে যেমন জাতিসংঘ ও বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার শাসকরা উত্তীর্ণ নন, তেমনি উত্তীর্ণ নন বাংলাদেশের শাসক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও। সংকটটা আসলে এখানেই। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নৈতিকতা গুরুত্ব পেলে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন মানুষের মৃত্যু-উপত্যকায় পরিণত হতো না। কাশ্মীরেও মানবতা এভাবে আর্তনাদ করতো না। মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গাদেরও উত্তাল সমুদ্রে যাযাবরের মতো ভেসে বেড়াতে হতো না। নৈতিকতাহীন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পৃথিবী নামক আমাদের প্রিয় এই গ্রহটি ক্রমেই মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। বর্তমান পৃথিবীর নেতা-নেত্রীরা সবাই মিলেমিশেই যেন পৃথিবীটাকে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী করার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
বিশ্ব-বাতাবরণের অভিঘাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে বাংলাদেশেও। চতুর রাজনীতিবিদরা জনগণের কথা বলে প্রশ্নবিদ্ধ-কৌশলে ক্ষমতায় এসে, ক্ষমতার ছড়ি ঘুরিয়ে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে। মুক্তির ডঙ্কা বাজিয়ে বাজিয়ে আপন অভিলাষে সবকিছু বন্দী করার মায়াজাল বিস্তৃত করা হচ্ছে দেশজুড়ে। চাতুর্যের জালে মানুষ বন্দী, গণতন্ত্র বন্দী, আর লাগাতার বন্দী হয়ে চলেছেন বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা। অনাকাক্সিক্ষত এমন পরিবেশের জন্য সরকারকে তো দায়ী করা চলেই, কিন্তু এমন পরিবেশ রচনায় বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক দর্শন ও কর্ম-কৌশলের ত্রুটি এবং নৈতিক মেরুদন্ডের দুর্বলতাও কম দায়ী নয়। আর ক্ষমতার দম্ভ ও প্রতাপ তো পৃথিবীতে নতুন কোনো বিষয় নয়। ইতিহাস এ কথার সাক্ষী দেয় যে, একদেশদর্শী দাম্ভিক নেতারা ক্ষমতা ও চাতুর্যের বদৌলতে বিরোধী পক্ষের লোকদের নাস্তানাবুদ করতে কোনো কসুর করেন না। তবে প্রাকৃতিক নিয়মেই অন্যায় ও অমানবিক কর্মকান্ডের পরিণতিতে তাদের ভাগ্যেও যথা সময়ে নেমে আসে পরাজয় ও সর্বনাশ। কিন্তু ক্ষমতার উত্তাপটা এমনই যে, সেই সময়টায় অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ও সুস্থ বিবেচনা গুরুত্ব পায় না। মানুষের ও সমাজের জন্য এটা একটা বড় ট্র্যাজেডি।
গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের নিয়ে একটি বিশেষ বিষয়ে প্রতিবেদন মুদ্রিত হচ্ছে। কোনো পত্রিকার শিরোনাম ‘বিরোধী নেতাদের টর্চার সেল কারাগার।’ কোনো পত্রিকার শিরোনাম ‘কারাগারে ভাল নেই তারা।’ কোনো পত্রিকার শিরোনাম ‘উৎকণ্ঠায় বিএনপির কারারুদ্ধ নেতাদের পরিবার।’ এইসব প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াতের প্রথম সারির নেতাদের দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। আটক নেতারা, নানা কায়দায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে পঙ্গুত্ব বরণকারী বিএনপি’র ভাইস-চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী দীর্ঘ ৪ মাস ধরে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে অমানবিক কষ্ট ভোগ করছেন। বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধার গুলিবিদ্ধ পা অবশ হয়ে গেছে ঘুম ও হাঁটাচলার অসুবিধার কারণে। খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মের কারণে তার ওজন কমে গেছে ৮ কেজি। ৬ মে মানবজমিনে প্রকাশিত রিপোর্টটিতে আরো বলা হয়, একই অবস্থা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, মোসাদ্দেক আলী ফালু, যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদসহ বিরোধী জোটের ১৫ সহস্রাধিক নেতা-কর্মী। কেউবা ডায়াবেটিস, হার্ট আবার কেউ বা উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন। সম্প্রতি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিএনপি’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নাসিরউদ্দিন আহাম্মেদ পিন্টুর মৃত্যু ঘটায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে কারারুদ্ধ নেতা-কর্মীদের পরিবারগুলোর মধ্যে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন গ্রীষ্মের প্রচ- গরমে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বয়সের ভারে ন্যুব্জ নেতাদের জীবনে। গত ৫ মে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি’র মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন এই মর্মে অভিযোগ করেন যে, কারারুদ্ধ নেতাদের চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
আমরা জানি, অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক সমাজে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের উপর জুলুম-নির্যাতন ও কারা-নিপীড়নের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে দুঃখের বিষয় হলো, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে করতে যে দেশটি স্বাধীন হলো, সেই দেশটিতে এখন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন ও কারা-নিপীড়নের মাত্রা যে কোনো সময়ের চাইতে বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত ৬ জানুয়ারি গ্রেফতার হন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জটিল নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত বিএনপি’র এই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে ৭৯টি রাজনৈতিক মামলা। বর্তমান সরকার আরো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে এই ৭৯টি মামলায় হাজিরা দিতে দিতেই হয়তো ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনের অবসান হয়ে যেতে পারে। মির্জা আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম জানান, মস্তিষ্কের ধমনী ও হার্টে ব্লক, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে এখন কারাগারে আছেন তিনি। রাহাত আরা বেগম আরো জানান, আমার স্বামীর মস্তিষ্কের ধমনীতে যে ২টি ব্লক ধরা পড়েছে তার ৮০ ভাগই অকেজো বলে চিকিৎকরা জানিয়েছেন। যে কোনো সময় তার ব্রেন স্ট্রোকের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মের কারণে তার ১৫ কেজি ওজন কমে গেছে। কিন্তু তার সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। কারাগারে অন্য নেতাদের অবস্থাও বেশ করুণ। গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের মাধ্যমে আমরা তা জানতে পারছি। পরিতাপের বিষয় হলো, সেই সাংবাদিকরাও এখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ও ক্ষমতাসীন দলের দ্বারা সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ‘আর্টিকেল ১৯’। উল্লেখ্য যে, বেসরকারি এই সংগঠনটি বাক-স্বাধীনতা ও তথ্যাধিকার নিয়ে কাজ করে থাকে। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ইন বাংলাদেশ’- শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। এছাড়া বিচারহীনতার কারণে রাষ্ট্রযন্ত্র, এমনকি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও সংবাদকর্মীদের উপর সহিংসতা ও আক্রমণের ঘটনা সংঘটিত করে। ৩ মে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আর্টিকেল ১৯ এর উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অযাচিত আক্রমণ, সহিংস ঘটনার বিচারিক তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য চরম বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে তা আপাত দৃষ্টিতে হয়রানিমূলক। তিনি আরো বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য একটি কার্যকর সুরক্ষা কৌশল ও নীতিমালা তৈরির জন্য, যা গণমাধ্যম কর্মীসহ সকলের মুক্ত চিন্তা প্রকাশে সহায়ক হবে, যেখানে একটি স্বাধীন সংস্থা উক্ত নীতিমালার তদারকি করবে।
আর্টিকেল ১৯ এর ২০১৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে ২১৩ জন সাংবাদিক ও ৮ জন ব্লগার বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ জন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, ৪০ জন গুরুতর জখম হয়েছেন, ৬২ জনকে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে, ৮ জন ব্লগার ও অনলাইন-এ্যাক্টিভিস্টসহ ’১৭ জন গ্রেফতার হয়েছেন; সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিক নেতৃত্বসহ ১৩ জন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আদালত অবমাননার শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যে, আরো জানা যায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিক নির্যাতনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, তথ্য-প্রযুক্তি আইনের আওতায় পরিষ্কারভাবে কিছুই বলা হয়নি। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এর সুযোগ গ্রহণ করে থাকে। এটি একটি বড় সমস্যা সঙ্কুল বিষয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আর্টিকেল ১৯ এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ও ক্ষমতাসীন দলের দ্বারা সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তো জনগণের ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়ে থাকে জনগণের সেবা ও জীবনমান উন্নত করার জন্য। আর এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে সরকারের কার্যক্রমের স্বচ্ছতাবিধান ও তার প্রকাশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। কারণ জনগণের স্বার্থরক্ষা ও সরকারের ভুল-ত্রুটির চিত্র তুলে ধরা কেবল স্বাধীন গণমাধ্যমের পক্ষেই সম্ভব। তবে পরিতাপের বিষয় হলো এই যে, সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকাকে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবেই বিবেচনা করে থাকেন। গণমাধ্যমকর্মী তথা সাংবাদিকরা আসলে সরকার কিংবা সরকারি দলের প্রতিপক্ষ কিংবা শত্রু নয়। সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে সাংবাদিকরা আসলে সরকারকে তার অঙ্গীকার পালনে সহযোগিতা করে থাকেন। তাই বিদগ্ধজনরা গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ এমন তৎপরতাকে সরকারের জন্য বন্ধুসুলভ বলেই বিবেচনা করে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সরকার ও সরকারি দলের অনেকেই স্থূল বিবেচনার কারণে প্রকৃত সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেন না। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে তারা সাংবাদিক নির্যাতনে ব্যবহার করে থাকেন। এমন আচরণ সরকার, রাষ্ট্র এবং জনগণ- কারো জন্যই কল্যাণকর বলে বিবেচিত হতে পারে না। বিষয়টি আমাদের সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা উপলদ্ধি করলেই মঙ্গল।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে মেনে নেয়া যায় না। সরকার যখন এ পথে হাঁটে তখন ধরে নেয়া যায় যে, সরকার ভুলপথে হাঁটছে। ভুল পথের পথিক কখনও দেশকে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা উপলব্ধি করেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সোমবার, ৪ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সিটি নির্বাচন : নাকের বদলে নরুন প্রাপ্তি


তিন সিটি নির্বাচনকে নিয়ে দেশ-বিদেশের বিশ্লেষণ এবং গণতান্ত্রিক দুনিয়ার ধিক্কার এখনো অব্যাহত রয়েছে। নজিরবিহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির এই নির্বাচন সারা দুনিয়াকে স্তম্ভিত করেছে। গণতান্ত্রিক দুনিয়া নির্বাচনের এই জালিয়াতির মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ঝড়ুঝঞ্ঝার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন।
বলাবাহুল্য, গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনে সরকার বিরোধী ২০ দলীয় জোট অংশগ্রহণ করেছিল এবং সরকারি দলের নজিরবিহীন জালিয়াতির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের দিন বেলা ১২টার দিকে তারা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।
বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সরকারি দল আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং ভোট জালিয়াতি তীব্র গতি ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত তিন সিটিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থকরা মেয়র নির্বাচিত হন। কাউন্সিলার নির্বাচনেও তারা রেকর্ড সৃষ্টি করেন। সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট সমর্থিত তিনজন মেয়র প্রার্থী সর্বমোট ভোট পেয়েছেন ৯ লাখ ২৪ হাজার, যা শতকরা হিসেবে মোট প্রদত্ত ভোটের ৩৫ শতাংশ দাঁড়ায়। এই ভোট পেয়েছেন তারা নির্বাচন বয়কট করার পরও। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলের প্রার্থীরা পেয়েছেন ১৪ লাখ ৭০ হাজার ভোট। যা মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৫৫ শতাংশ।
আমরা যদি পিছনে ফিরে তাকাই তাহলে একটা বিস্ময়কর অবস্থা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। পাঠকরা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, ইতঃপূর্বে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এই কর্পোরেশনগুলোতে শাসক দলের কোন প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেনি। তারা যে এসব নির্বাচনে সন্ত্রাস কারচুপির আশ্রয় নেয়নি তা নয়। কিন্তু তাদের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে সাধারণ ভোটাররা বিরোধী দলের পক্ষে তাদের রায় প্রদান করেছিলেন। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে ২০ দলের প্রার্থী পেয়েছিলেন মোট প্রদত্ত ভোটের ৬০ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী পেয়েছিলেন ৩৮ শতাংশ। খুলনা সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫৯ শতাংশ আর আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ৩৯ শতাংশ। একইভাবে বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে তাদের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫৪ শতাংশ ও ৪৩ শতাংশ, ৫০ শতাংশ ও ৩৩ শতাংশ এবং ৫৫ শতাংশ ও ৩৯ শতাংশ। সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল গাজীপুরে ২০১৩ সালে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ২০ দলীয় প্রার্থীর কাছে ১ লাখ ৬ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। গাজীপুরে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ২৬ হাজার এবং সেখানে ৬৩ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ৪৪ হাজার এবং এদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। যদিও এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। অনেকে মনে করেন আওয়ামী লীগ তাদের প্রাপ্ত ভোটের যে সংখ্যা প্রদর্শন করছে তার শতকরা ৮০ ভাগই ভুয়া ও জাল ভোট। আমি এখন ওদিকে যেতে চাচ্ছি না।
নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত এক তথ্যানুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি কর্পোরেশনের ভোটার টার্ন আউট ছিল ৪৪ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা ২০ দলীয় প্রার্থীদের তুলনায় ভোট বেশি পেয়েছেন ২০ শতাংশ। (আওয়ামী লীগ ৫৫.৪৩%, বিএনপি ৩৪.৮৩%)। এই ফলাফল অতীতের নির্বাচনের ঠিক উল্টো, বাস্তবতা বিবর্জিত বলে অনেকের বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। যেমন, উল্লেখিত নির্বাচনগুলোর পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দেশে দুঃশাসন নির্যাতন ছাড়া এমন কোনও জনবান্ধব অথবা গণতন্ত্রবান্ধব কাজ করেনি যে মানুষ তাদের ৭ বছরের অত্যাচার, নিপীড়ন, স্বৈরাচার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও দুর্নীতির কথা ভুলে গিয়ে দ্বিগুণ ভোট দিয়ে তাদের বাক্স ভর্তি করে ফেলবেন। এটি অবিশ্বাস্য। তা হলে প্রশ্ন ওঠে, কিভাবে তারা এত বেশি ভোট পেলেন? এর উত্তর সহজ ও সুস্পষ্ট। ক্ষমতাসীনদের দলীয় ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ভোট জালিয়াতি, ভুয়া ভোট এবং নির্বাচন কমিশনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সিংহভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাসক দলের অবৈধ কাজে অংশগ্রহণ এবং ভোট জালিয়াতিতে সহায়তা প্রদান এর জন্য প্রধানত দায়ী।
বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তিনটি সিটি কর্পোরেশনে সম্প্রতি যে সীমাহীন জালিয়াতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রভাবশালী সংস্থা ও দেশসমূহ বাংলাদেশ সরকারের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন তার বিবৃতিতে বলেছেন, সিটি নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্তে তিনি উৎফুল্ল হয়েছিলেন কিন্তু অনিয়মের অভিযোগে তাদের নির্বাচন বয়কট তাকে হতাশ করেছে। তিনি বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য এই জালিয়াতি এবং অনিয়মে হতাশা ব্যক্ত করে অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। বিদেশীরা শুধু নয় আমরাও যা প্রত্যক্ষ করেছি তাতে লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা আমরা পাচ্ছি না। আর যাদের লজ্জা নেই তারা বলে বেড়াচ্ছেন যে, আসলে কিছু হয়নি। এতো সুন্দর, খুন-খারাবিমুক্ত নির্বাচন এ দেশে এটাই হচ্ছে প্রথম। কি চমৎকার ! বৃহত্তর নোয়াখালীতে আমার জন্ম। ঐ অঞ্চলে একটি কথা আছে, “বেহায়াকে মারে পিছা, বেহায়া কয়, হুদা মিছা।” ঝাড়ুকে নোয়াখালী অঞ্চলে পিছা বলে। আর কাউকে ঝাড়ু মারা বা ঝাড়ু দিয়ে পিটানো অত্যন্ত অপমানকর ব্যাপার। মনে হচ্ছে আমরা আমাদের মান অপমানের অনুভূতিও হারিয়ে ফেলেছি।
আমি উতোপূর্বে বিরোধী ২০ দলের সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের উপর মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেছিলাম যে তারা সম্ভবত নরুন পাবার আশায় তাদের নাক বিসর্জন দিচ্ছেন। মন্তব্যটি বাস্তবের সাথে এত হুবহু মিলে যাবে তা আমি চিন্তা করিনি। আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি দেখেছি। সরকার পরিচালনায় তাদের স্টাইল দেখেছি। তাদের অধীনে নির্বাচন দেখেছি। যেনতেন প্রকারে নির্বাচনের ফলাফল আমি তাদের ছিনিয়ে নিতেও দেখেছি। দেশবাসী বিশেষ করে ২০ দল তা দেখেননি তা আমি বিশ্বাস করি না। তাদের ক্ষমতালিপ্সা ও দুঃশাসন থেকে মুক্তি পাবার জন্যই কেয়ারটেকার সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনের দাবি উঠেছিল। ২০ দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন বর্জন করেছিল মুখ্যত দু’টি কারণে। এক, দলীয় অসহিষ্ণু ও স্বৈরাচারী সরকার তখন ক্ষমতায় ছিল। দুই, নির্বাচন কমিশন ছিল তাদের বশংবদ, গৃহপালিত প্রাণীর ন্যায়। এই একই অবস্থা বহাল থাকা সত্ত্বেও তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় আমি বিস্মিত ও স্তম্ভিত হয়েছিলাম। সম্ভবত তারা দুনিয়াকে বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, সাধারণ নির্বাচন বর্জন তাদের জন্য যৌক্তিক ছিল। হাঁ, এ দৃষ্টিকোণ থেকে তারা জিতেছেন। কিন্তু তাতে লাভ কি হয়েছে?
আমি নরুন প্রাপ্তির কথা বলছিলাম। সহযোগী একটি ইংরেজি দৈনিক আমরা সিটি নির্বাচনে কি হারিয়েছি তার একটা তালিকা দিয়েছে। তালিকাটি তাৎপর্যপূর্ণ।
তারা বলেছেন, সিটি কর্পোরেশনের যে নির্বাচন হয়েছে এবং যে নির্বাচন হতে পারতো তার মধ্যে তারা সাগর মহাসাগরের দূরত্ব দেখতে পেয়েছেন। তারা মনে করেছিলেন দেশে এমন একটি নির্বাচন হবে যেখানে মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাবে এবং তাদের ইচ্ছামতো মেয়র নির্বাচন করবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যে সরকার গঠন করেছেন, দুনিয়াব্যাপী দুর্ণাম কুড়িয়েছেন এবং যার বিরুদ্ধে প্রায় তিন মাসব্যাপী হরতাল-অবরোধ চলেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এটা ছিল সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু সম্ভবত অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসা সরকারের কাছে তাদের এই প্রত্যাশা সঠিক ছিল না। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। আমরা গণতন্ত্রে ফেরৎ আসতে পারিনি। বিজয়ী এবং বিজিতের কোলাকুলি দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। পরিবর্তে আমরা এমন একটি নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছি যা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ও নিন্দিত নির্বাচন।
আমরা জনগণের আস্থা এবং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের ভরসা দু’টিই হারিয়েছি। আমাদের হারানোর তালিকায় দ্বিতীয় জিনিসটি হচ্ছে রাজনৈতিক সমঝোতার একটি সুবর্ণ সুযোগ। সরকারকে দেশ বিদেশের বহু সংস্থা ও এজেন্সি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এই সমঝোতার জন্য সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। নির্বাচনের প্রহসন করে এবং সন্ত্রাস, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ভোট জালিয়াতি করে সরকার প্রমাণ করলেন যে, তারা ২০ দলীয় জোট তথা বিএনপি ও বিরোধী দলকে থোড়াই কেয়ার করেন। আমাদের তৃতীয় প্রাপ্তি হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব এবং তার সহকর্মীরা প্রমাণ করেছেন যে, তারা সরকারের Most obedient Servant, অত্যন্ত অনুগত ভৃত্য, গণতন্ত্রের অতন্দ্রপ্রহরী নন।
আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এই নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে নির্বাচন কমিশনের ন্যায় দলীয় বাহিনীর ভূমিকা পালন করে একটি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তারা বিরোধীদলীয় ভোটার ও নির্বাচন এবং পোলিং এজেন্টদের তাড়িয়ে, কারচুপিতে সরকারি দলকে সাহায্য করে, ব্যালট পেপার সীল মেরে প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার অথবা মানবাধিকারের ব্যাপারে তাদের কিছুই করার নেই; শাসক দলকে সন্তুষ্ট করতে পারলে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্য দু’টিই নিশ্চিত। এটি আমাদের চতুর্থ প্রাপ্তি।
আমাদের পঞ্চম প্রাপ্তি হচ্ছে গণমাধ্যম কর্মীদের গলাধাক্কা ও মার খাওয়া। এই নির্বাচনে সাংবাদিকরা চরমভাবে অপমানিত হয়েছেন এবং শাসক দল তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তারা যা চান তা করতে সক্ষম। আমাদের সর্বশেষ প্রাপ্তি হচ্ছে গণতন্ত্রের পরাজয় এবং আওয়ামী লীগের বিজয়। অনেকে আওয়ামী লীগের এই বিজয়কে গণতন্ত্রের হত্যা বলে চিহ্নিত করেন। তাদের দৃষ্টিতে গণতন্ত্রকে হত্যা না করে এই দলটির পক্ষে কখনো নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভবপর নয়। কাজেই আসুন, আমরা গণতন্ত্রের জানাযায় অংশ নেই। তা করতে না পারলে গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করাই আমাদের দায়িত্ব।
ড. মোঃ নূরুল আমিন 

রবিবার, ৩ মে, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

নির্বাচন, খন্দকার মোশতাক, লাঠি ও গাজর


সদ্য-সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ‘বিজয়’ না ‘বিদায়’ হয়েছে, সে প্রসঙ্গে দেশে-বিদেশে তুমুল বিতর্ক চলছে। প্রবল সন্ত্রাসের মুখে নির্বাচনের দিনটিতে কয়েক ঘণ্টাও টিকে থাকতে পারেনি বিরোধী পক্ষের প্রার্থী ও এজেন্টরা। সাধারণ জনগণকেও কেন্দ্রে আসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। দেশীয় মিডিয়া আর বিদেশী পর্যবেক্ষণে ব্যাপক কারচুপি ও জালিয়াতি স্পষ্ট। ভোট নিয়ে একটি পত্রিকার শিরোনাম: ‘ডিজিটাল যুগে এনালগ কারচুপি’। বন্ধু রাষ্ট্রের দূতগণও সরেজমিন পর্যবেক্ষণের পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ভোট বাতিল ও তদন্তের দাবি করেছেন প্রায়-সকলেই; কেবল সরকার ও তার বশংবদগণ নির্বাচনী-সন্ত্রাস-পরবর্তী উল্লাসে লিপ্ত।
আওয়ামী নির্বাচনের ব্যাপারে যারা অভিজ্ঞ, তারা জানেন, এ দলের অধীনে নির্বাচনের রূপ-চরিত্র এমনই কুৎসিত। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে যে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়েছিল, তাতে স্মরণাতীতকালের ভয়াবহ নির্বাচনী সন্ত্রাস করা হয়েছিল। বহু প্রার্থীকে কিডন্যাপ করা হয়; অনেককে প্রার্থীতা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়; ভোটকেন্দ্রগুলো দখল করে আওয়ামী প্রার্থীদের বিজয়ী করা হয়। ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে মাত্র ৭ জন বিরোধী দলের প্রার্থী বিজয়ী হতে সক্ষম হন। সন্ত্রাস ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে স্বচ্ছ, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক আওয়ামী নির্বাচনের ফলে দেশ, জনগণ এবং খোদ আওয়ামী লীগই ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশ ও জনগণ গণতন্ত্রের পতনের শিকার হয়ে একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসনের নিগড়ে আবদ্ধ হয়। আর আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্বাচনে সন্ত্রাস ও বলপ্রয়োগের  মাধ্যমে শেখ মুজিবের হত্যাকারীর উত্থান ঘটিয়ে। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে খন্দকার মোশতাক কখনোই বিজয়ী হতেন না। সেখানে বিজয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন জাসদের ইঞ্জিনিয়ার আদুর রশীদ। প্রচ-ভাবে সন্ত্রাস, সহিংসতা করে এবং প্রশাসন ও ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ কি রকম নিলর্জ্জভাবে খন্দকার মোশতাককে বিজয়ী করেছিল, সে ইতিহাস অতি ন্যাক্কারজনক ও নিন্দিত। অতএব, জবরদস্তিমূলক নির্বাচনে গণরায়কে লুট করে বিজয়ানন্দ করার আগের অতীতের কথাও কথিত বিজয়ীদের ভাবা দরকার।
২.
আওয়ামী আমলের নির্বাচনী বিপর্যয়ের হাত ধরে পরবর্তী সামরিকতন্ত্রীরা বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার পবিত্রতা পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেয়। হোন্ডা আর গু-া দিয়ে ভোটকেন্দ্র দখলের উৎসব শুরু হয়। গণরায় একেবারেই ভূলুণ্ঠিত হয়। কতিপয় পদলেহীকে ক্ষমতা দখলকারীরা সংসদে আসার সুযোগ দেয়। প্রকৃত জনপ্রতিনিধি ও জনসমর্থিত ব্যক্তিগণের পক্ষে নির্বাচনের সঠিক রায় পাওয়ার কোনোই সুযোগ রাখা হয়নি। এমনই অবনতিশীল পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে সঠিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির রূপরেখার প্রস্তাব করে জামায়াতে ইসলামী। কারণ, অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলাদেশে করা সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে একদা আওয়ামী লীগ ও জামায়াত পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করেছে। বর্তমানে জামায়াত ও বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের এই আন্দোলন যে কতোটা যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়, সদ্য-সমাপ্ত সিটি নির্বাচনের ঘটনাবলি সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল। আজ বাংলাদেশ ও বিশ্বের সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন, দলীয় সরকার ও দল-অনুগত নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রহসনের নির্বাচনই সম্ভব। নির্বাচনে জনরায়ের প্রকৃত প্রতিফলনের জন্য দরকার তত্ত্বাধায়ক সরকার ব্যবস্থা।
৩.
যদিও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত বিএনপি নির্বাচনে যোগ দেয় এবং ভোটের দিন দুপুরের আগেই নির্বাচন বয়কট করে । সারাদিন বিএনপি’র পক্ষে আর কোনো বক্তব্য আসে নি। মূলত যে সত্যটি বিএনপি উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে, তা হলো আওয়ামী লীগের অধীনে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোট সম্ভব নয়। জামায়াতে ইসলামী আগাগোড়াই এ সরকারের অধীনে প্রকৃত নির্বাচন অসম্ভব বলে মত দিয়েছে এবং এ নির্বাচনের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। এতে অবশ্য সরকারের কোনো মাথা ব্যথা হয়নি। তারা অতীতের মতোই বিকারহীনভাবে বিতর্কিত নির্বাচনের কথিত বিজয়ীদের নিয়ে আনন্দ-উল্লাস করছে এবং ক্ষমতাকে আরো পাকাপোক্ত করার নানা প্রকাশ্য ও গোপন পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়েছে। নির্বাচনের আগে ও পরে আওয়ামী কার্যক্রমের দ্বারা এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে, “দেখি, কে আমাদের ক্ষমতা থেকে হটায়!” ভোটার বিহীন বিগত সংসদ নির্বাচনের মতোই তারা এবারের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে নিয়েও উৎফুল্ল। এটাই তাদের ভাষায় ‘গণতন্ত্রের বিজয়’।
৪.
প্রত্যুত্তরে বিরোধী দলের পক্ষে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের নির্বাসন’ হয়েছে। গণতন্ত্রের নির্বাসন বা বিদায়, যা-ই হোক না কেন, বিরোধী দল একটি চরম শিক্ষা লাভ করেছে। তা হলো, আন্দোলন ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কোনো পথ খোলা নেই। সমঝোতা বা এক সাথে কাজ করার কোনো সুযোগ বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রাখা হয়নি। দিন যতই যাবে, কোণঠাসা পরিস্থিতি আরো জোরালো হবে এবং শেষ পর্যন্ত দমবন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, তারা সেটা আঁচ করতে পারছেন। হামলা, মামলা অক্টোপাশের মতো ঘিরে আসছে। টার্গেট করে নেতৃবৃন্দকে ফাঁসিতে ঝুলানো হচ্ছে। যারা আন্দোলনে সাচ্চা, আদর্শে অটল এবং আপোস বা দালালিতে নারাজী, তাদেরকে রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। বাস্তব সত্য ও দালিলিক প্রমাণ বলছে, আঘাত এসেছে সবচেয়ে বেশি জামায়াত ও শিবিরের বিরুদ্ধে। আর চলছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তর থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে চরম ষড়যন্ত্রমূলক আক্রমণ। ইসলামী আদর্শ, সংগঠন, নেতৃত্ব চরম আঘাত ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। প্রতিপক্ষের ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দেওয়ার জন্য জান-মাল বাজি রেখে ইসলামপ্রিয় জনতাও আন্দোলন-মুখর।
৫.
আন্দোলনের চলমান ধারায় সিটি নির্বাচন তাহলে কেন এসেছিল? এসেছিল ইংরেজি ‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারেট’ থিওরি অনুসারে। বাংলায় এটাকে বলা হয় ‘লাঠি ও গাজর তত্ত্ব’। একদিকে লাঠি দিয়ে ভয় দেখাবে আর আরেক দিকে গাজরের লোভ দেখিয়ে আয় আয় বলে ডাকবে। কাছে এলে গাজর সরিয়ে লুকানো লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করবে। বশ মানানোর জন্য বা শায়েস্তা করার জন্য ইংরেজরা ‘লাঠি ও গাজর তত্ত্ব’/ ‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারেট’ থিওরি প্রয়োগ করে থাকে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে (সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে) সম্ভবত এ তত্ত্বটিই সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে দ্বিবিধ লাভ পাওয়া গেলো। বিরোধীদের আন্দোলন থেকে সরিয়ে আনা হল এবং তাদেরকে গাজর দেখিয়ে ডেকে এনে আচ্ছামতো আঘাতও করা সম্ভব হলো। প্রতিক্রিয়ায় আঘাতপ্রাপ্ত এবং রাজনৈতিক কৌশলের কাছে বিপর্যস্ত বিরোধীরা কি প্রতিকৌশল প্রয়োগ করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
৬.
একচ্ছত্র ক্ষমতাসীন সরকারি দল এবং তাদের একতরফা উল্লাস ও দলীয়করণ গণতন্ত্রের বহুদলীয় শাসনের পরিপন্থী। বিরোধী দলহীন গণতন্ত্র দুর্বল এবং একদলেরই নামান্তর। গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে বলে যারা সুখের ঢেকুর তুলছেন, তারা এই গুপ্তক্ষতটি দেখছেন না। দুর্বল ও একদল-মার্কা গণতন্ত্র নানাবিধ বিপদ ডেকে আনবে। শাসনের ক্ষেত্রে দেশে ও বাইরে আস্থার সঙ্কট ঘটাবে এবং নানারূপ ঝুঁকির সৃষ্টি করবে। সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকি হলো, ভোটের নামে গায়ের জোরের একতরফা ক্ষমতাপ্রাপ্তদের মধ্যেকার আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও লড়াই। বিরোধী দলের পক্ষে এই মুহূর্তে বিপদের কারণ নেই, সেটা টের পেয়ে এখন তারা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত হবেই। পঁচাত্তর-পূর্ব আওয়ামী লীগে সেটাই হয়েছিল। যুবলীগ, ছাত্রলীগেও সেটাই দেখা গিয়েছিল এবং এখন আবার সেটাই দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত-সংঘর্ষের যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো আভ্যন্তরীন। যেমন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে ছাত্রলীগের হাতে মারা যাচ্ছে ছাত্রলীগ। প্রতিদিন এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে আক্রমণ করছে। এদের সামলাতে খোদ নেতারাই নাকাল। যারা জোর খাটিয়ে নেতা বানায় বা যাদের জোরে নেতা তৈরি হয়, তারাই বা কতদিন বানানো নেতাকে মানবে? অবস্থা এখন সেই দিকেই যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, চেপে রাখলেও শীর্ষ পর্যায়ের নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাত-মনোমালিন্যের কথা মিডিয়ায় মাঝে মাঝেই চলে আসছে। মেয়র বা কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন চেয়েও পায়নি, এমন অসংখ্য নেতা-কর্মীর অসন্তোষ কেমনে মেটানো হবে? সব মিলিয়ে শুধু বিরোধী দলের দিক থেকেই নয়; নিজের ভেতর থেকে সুপ্ত চাপের মুখে ক্ষমতাসীনরা। জোরপূর্বক সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আপাত বিজয় হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বস্তি প্রতিষ্ঠা করা  তাই এখনো অনেক দূরের বিষয়।

Ads