মঙ্গলবার, ১২ এপ্রিল, ২০১৬

পহেলা বৈশাখের বেলেল্লাপনা কারও কাম্য নয়


গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঋতুচক্রের আগম-নির্গমনের মধ্য দিয়ে দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন সাধিত হয়। বৈশাখের গান কেউ পরিবেশন করুক আর না করুক মহান আল্লাহর অমোঘ বিধানে প্রাকৃতিক নিয়মে ঋতুর পরিবর্তন হবেই। এর প্রভাব পড়বে ধর্ম-বর্ণ গোত্র ভাষা নির্বিশেষে সমগ্র জাতির ওপর। বৈশাখ মানেই নববর্ষ। বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস। কালের গর্ভে হারিয়ে গেল আমাদের জীবনের একটি বছর। নতুন বছর এলো আমাদের জীবনে। আমরা সবসময় নতুন বছরকে স্বাগত জানাই নতুন স্বপ্নের প্রত্যাশায়। কিন্তু নতুন বছরের স্বপ্নপূরণে প্রয়োজন বিগত বছরের মূল্যায়ন করা। আমরা যদি পেছনের বছরের মূল্যায়ন করি তাহলে দুঃখ-কষ্টের যন্ত্রণা ব্যতীত অন্য কোনো সুখের কথা মনে করতে পারিনি। যে সময়ে পহেলা বৈশাখের নিবন্ধন লিখছি সে সময়েও তনুর বীভৎস লাশের গন্ধ ইথারে ইথারে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পহেলা বৈশাখের আনন্দ উপভোগ করার মতো পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে বলে মনে হয় না। কারণ এই উপত্যকায় ঝড় বৃষ্টি তুফান বন্যার চেয়ে ভয়ংকর রূপে আবির্ভাব ঘটেছে হত্যা, খুন, ধর্ষণ আর গুমের। যে কোন হত্যাকা- নিন্দনীয়, হোক সে হিন্দু বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ইমাম মুয়াজ্জিন থেকে শুরু করে মুচি মেথরের জীবনও নিরাপদ নয়। যে কোন হত্যাকা-ের পরই তদন্ত ব্যতীত হুট করে বলা হচ্ছে এগুলো মৌলবাদীদের কাজ। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মৌলবাদীদের বিচার করতে বাধা কোথায়। অহেতুক জুজুর ভয় দেখিয়ে মূল খুনিদের রক্ষা করার জন্যে কি একটি বিশেষ গোষ্ঠীর উপর দোষ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে কি না সে বিষয়টিও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। পহেলা বৈশাখের আনন্দ সবার জীবনে আসে না। কিন্তু কেন আসে না সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা মেলা ভার। রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে তাহলে কেবল মুচি থেকে শুরু করে ধনাঢ্য শ্রেণীর মানুষেরা তার সুফল ভোগ করে। আশা আকাক্সক্ষা আর চাওয়া পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে পথ চলা শুরু হবে নতুন উদ্যমে। এটাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু থাকবে ভাঙা গড়ার খেলা। থাকবে আনন্দ হাসি আর সুখ-দুঃখের উপাখ্যান। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে এই মাসকে বরণ করে নেবে। কাজী নজরুল ইসলাম এ জন্যই বলেছিলেন, ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর। বৈশাখ এই নতুনের কেতন ওড়ার বারতা বয়ে নিয়ে আসে। এই জন্যই বৈশাখের এতো কদর। তার প্রতি সবার এতো আগ্রহ। অথচ তার যে অন্য একটি কঠিন ভয়াবহ রূপ আছে সেদিকে কেহ ভ্রুক্ষেপ করতে চায় না। যদিও সবাই জানে তার ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর কথা, কালবৈশাখী ঝড়ের কথা। তাপরও আমরা তার দিকে অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকি। দুঃখজনক হলেও সত্য বৈশাখের আবরণে নারীর ইজ্জত লুণ্ঠিত হচ্ছে অথচ আমরা নির্বিকার অসহায়। পহেলা বৈশাখের বিরুদ্ধে লেখা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়। ইতিহাসের পাঠে যতটুকু পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে জানতে পেরেছি তার আলোকে কিছু কথা বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বিবেকের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমার কাছে যা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে তা-ই পাঠকের উদ্দেশ্যে লিখছি। সংস্কৃতির কোনো অংশকে ছোট বা বড় করা উদ্দেশ্য নয় বরং সত্য ইতিহাসটা আলোচনা করা। যাতে করে পাঠকেরা সত্যকে গ্রহণ করতে পারে আর মিথ্যের বেড়াজাল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
ভারতবর্ষে মুঘল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স¤্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। খাজনা আদায়ে নতুন প্রথা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল স¤্রাট আকবর নতুন সনের প্রবর্তন করেন। স¤্রাটের আদেশ মতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং আরবী হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে নতুন সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর,১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল এলাহি সন বা ফসলি সন,পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। (সূত্র উইকিপিডিয়া) আকবরের শাসনামলে আকবর প্রাথমিক অবস্থায় একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন, কিন্তু কালক্রমে রাজদরবারের অভ্যন্তরের রাজপুত্র এবং হিন্দু রানীদের প্ররোচনা এবং তৎকালীন হিন্দুদের আবেদনে তিনি এক বিকল্প সন খুঁজছিলেন। হিন্দুদের অভিযোগ ছিল, যেহেতু হিজরী সন অনুসারে রাজ্য পরিচালনা করা হচ্ছে, সেহেতু তাদের পূজা অর্চনায় সমস্যা হচ্ছে। আনন্দনাথ রায়ও ঠিক এমনটাই লিখেছেন- “আকবর বাদশাহর রাজত্বকালে হিন্দু সম্প্রদায় বাদশাহর কাছে জ্ঞাপন করে, আমাদের ধর্মকর্ম সম্পর্কীয় অনুষ্ঠানে হিজরী সন ব্যবহার করতে ইচ্ছা করি না। আপনি আমাদের জন্য পৃথক সন নির্দিষ্ট করে দিন। আকবর হিন্দু প্রজার মনোরঞ্জনার্থে হিজরী সন থেকে দশ এগার বছর কমিয়ে এলাহী সন নামে একটি সনের প্রচলন করেন। যা আমাদের বঙ্গদেশের সন হিসেবে চলে আসছে।” (সূত্র বারভূঁইয়া লেখক-আনন্দরায়) সুতরাং এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট হিন্দুদের পূজা ও হিজরী সনের প্রতি বিদ্বেষের কারণেই আকবরের খাজনা আদায় তথা আর্থিক উপকারের স্বার্থেই এই এলাহী বা ফসলি সনের উৎপত্তি। দুঃখজনকভাবে একশ্রেণীর বোদ্ধারা পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে না জেনেই সাফাই গায় আর বলে পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বাঙালির হাজার বছরের উৎসব। অথচ এই নতুন সনের উৎপত্তি পাঁচশ বছরও অতিবাহিত হয়নি। সুতরাং এটা কিভাবে বাঙালির হাজার বছরের প্রাণের উৎসব হয়? বাংলা সনের ইতিহাস উৎপত্তি সম্পর্কে বেখবর নববর্ষ উৎসব পালনকারী ৯৯ ভাগ মানুষ। তাদের অজ্ঞতাই বিপথগামিতার মূল কারণ। তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় কিভাবে এলো এই নববর্ষ, কিভাবে এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব হলো, কিভাবে এটি হাজার বছরের ঐতিহ্য হলো? তার একটিরও জবাব  মেলা ভার। তাই বিভ্রান্ত না হয়ে বিধর্মীদের কর্পোরেট প্রচারণায় কান না দিয়ে সত্য ইতিহাস জানার অনুরোধ রইল।
পহেলা বৈশাখের ইতিহাস লিখতে গেলে আজও বস্ত্রহীন-বিপন্ন নারীর বাঁচাও বাঁচাও আর্তচিৎকার কান পাতলেই শুনা যায়। পহেলা বৈশাখের দিন নারীর প্রতি সহিংসতা ও চরম অবমাননার ঘটনাটি পাঠকেরা নিশ্চয় এখনো ভুলে যায়নি। নারীর প্রতি অমানুষের নির্যাতন আর সহিংসতার অনেক ঘটনা নজরের বাইরেই রয়ে যায়। সব খবর সবসময় প্রকাশ পায় না। কখনো আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্তরাও লোকলজ্জার ভয়ে অনেক কালো দাগ আর যন্ত্রণা চেপে রাখে। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরির কথা শুনেছি। কিন্তু যারা সেঞ্চুরি করতে পারেনি তাদের খবর কি শুনেছি? ১৯৯৯ সাল তখনও আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন, সে সময়েও এরকম এক উৎসব ‘থার্টি ফাস্ট’ রাত ১২.০১ মিনিটে বাঁধন নামের এক ছাত্রীকে বিবস্ত্র করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের সন্নিকটে হাজারো মানুষের সামনে নারীকে বিবস্ত্র ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ধারণও করেছে। প্রিন্ট ইলেকট্রনিক বা সামাজিক মিডিয়ায় সবিস্তারে ও সচিত্র বিবরণ প্রকাশিত হলেও অমানুষের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। চরম নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের এহেন অবক্ষয় পৃথিবীর অন্য কোন সভ্য দেশে দেখা না গেলেও ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশে ঠিকই দেখা গেছে। একশ্রেণীর বোদ্ধা রয়েছেন যারা মৌলবাদের জুজুর ভয় দেখিয়ে নারীর স্বাধীনতার নামে নারীকে রাস্তায় নামিয়ে ভিনদেশীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। অথচ নারী নির্যাতনের যে রুট রয়েছে তা বন্ধের ব্যাপারে তাদের মুখ থেকে কোন বাক্য উচ্চারিত হতে দেখিনি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস ও বাস্তবতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দেশে রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে নিউমার্কেট এলাকায় যাতায়াত করলে সহজে চোখে পড়বে তরুণ প্রজন্মের তরুণীদের বেহায়াপনা কত নিচে নেমেছে ভিনদেশীয় সংস্কৃতিকে লালন করে। একশ্রেণীর মেয়েরা স্মার্ট হওয়ার জন্যে আঁটসাঁট জামা, জিন্স প্যান্ট, হাফগেঞ্জি পড়ে উন্মুক্ত পরিবেশে অবাধে চলাফেরা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। অথচ গ্রাম-গঞ্জে এখনো ষাট বছর বয়সী মহিলারা পুরুষ মানুষ দেখলেই রাস্তার একপাশে চলে যায়। এক শ্রেণীর অভিভাবকেরা মনে করেন বোরখা পড়লে উগ্র মৌলবাদী হয়ে যাবে। মৌলবাদীর জজুর ভয়ে নিজের মেয়ের ইজ্জত যখন মাটিতে লুটিয়ে যায় তখন কিভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দেন আমার জানা নেই।
বাংলাদেশের ৯২ ভাগ মুসলমান নারী-পুরুষ যুবক-যুবতী আর শিশু কিশোর কিশোরীর মধ্যে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নামে যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে তাতে আগামী শতাব্দীতে হয়তো বা মুসলিম সংস্কৃতি কি তা আমাদের সন্তানদের যাদুঘরে সংরক্ষিত ইতিহাস থেকেই জানা লাগতে পারে। পৃথিবীর যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ অনেকটা উৎসব প্রিয়। কোন ধর্মে আনন্দ উৎসব পালনে বাধা নেই। তবে যে দেশে ৯২ ভাগ মানুষ মুসলমান ও ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী,তাদের উৎসব পার্বণ জীবন ও সংস্কৃতি সবই তো হওয়া উচিত কুরআন সুন্নাহর আলোকে। একজন হিন্দু বা খ্রিস্টান তার ধর্মের যাবতীয় উৎসব পালন করুক তাতে আমাদের কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী ধর্মের অনুসারীদের দেব দেবীর সাথে যুক্ত ও ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির কোনো অংশ নিদর্শন বা প্রতীক বাঘ, রাক্ষস, কুমির, সাপ, পেঁচা ও প্রজাপতি মুসলমানদের সংস্কৃতি হওয়া উচিত নয়। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের নামে মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমরা দেখেছি, বাঘ, রাক্ষস, কুমির, সাপ, পেঁচা ও প্রজাপতিসহ বিভিন্ন প্রকার প্রাণীর মূর্তি ও মুখোশ। সনাতন ধর্ম মতে এগুলো তাদের মঙ্গলের প্রতীক হতে পারে! কিন্তু ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের জন্য মূর্তি ও মুখোশ নিষিদ্ধ বা হারাম। বর্ষবরণ আর মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে নারীর ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হওয়ার সংবাদ যেন কাউকে দেখতে না হয় এটাই সবার প্রত্যাশা।
Reactions:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads