বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

বাংলা নববর্ষ ও জাতির প্রত্যাশা


বাংলা নববর্ষ তথা ১৪২৩ বঙ্গাব্দ আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। আমাদের জাতীয় জীবনে বিদায়ী বছরটি তেমন সুখকর হয়নি। বছর জুড়েই আমাদের মাঝে অস্থিরতা বিরাজমান ছিল। ফলশ্রুতিতে জাতীয় জীবনে শান্তির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভুত হয়েছে। তবে অস্থির ও অশান্তিময় বিদায়ী বছরের দিকে কোনদিন যাতে ফিরে তাকাতে না হয় সেজন্য আমরা আশায় বুক বাঁধতে চাই। চাই জাতীয় জীবনে কিছু প্রত্যাশার বাস্তবায়ন। সে সব প্রত্যাশারই কিছু কথা আমরা তুলে ধরছি আলোচ্য লেখাটিতে।
জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা : আমরা জানি গণতন্ত্রে জনগণনই সর্বেসর্বা। গণতন্ত্রের মৌল অর্থই হচ্ছে জনগণের শাসন। আমাদের সংবিধানেও জনগণকে প্রজাতন্ত্রের মালিক বলা হয়েছে। এছাড়া আমরা জানি ক্ষমতায় যাওয়ার উৎসও হচ্ছে জনগণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জনগণের কোন চাওয়া-পাওয়ার কোন মূল্যই যেন আজ বর্তমান শাসকবর্গের নিকট নেই। জনগণের কোন নিরাপত্তা নেই। গুম, খুন দেদারসে চলছে। বিচার ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। ভোটাধিকার বলতে আর কোন কিছু রইল না। জনগণের কোন দাবির প্রতি ভ্রুক্ষেপ নেই সরকারের। সর্বোপরি সংলাপের কোন উদ্যোগ আজ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এমতাবস্থা চলমান রাখা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার শামিল। সেই প্রেক্ষিতে আমরা আশা করব কারো পক্ষ থেকেই জনমতের প্রতি কোনরূপ অশ্রদ্ধা দেখানো হবে না। কেননা, জনমতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে কখনো সম্মানিত হওয়া যায় না।
জনসম্পৃক্ত আন্দোলন : বিরোধী দলের প্রতি আমাদের প্রত্যাশাও কম নয়। আমরা মনে করি ডামাডোল পিটিয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিলেই সব হয়ে যায় না। বরং বিরোধী দলকে তাদের আন্দোলনের প্রধান উপাদান জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টিতে অবশ্যই সক্ষম হতে হবে। জনসম্পৃক্ততা ব্যতীত কোন আন্দোলনে অগ্রসর হওয়া আদৌ প্রত্যাশিত নয়। আন্দোলনে কৌশল অবলম্বন করা নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ধৈর্য্য ও প্রজ্ঞা। যে কোন বিরোধী দলের পক্ষেই ধৈর্য্য ও প্রজ্ঞার সাথে আন্দোলন পরিচালিত না হলে সে আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে সাময়িক আবেগের বশবর্তী হয়ে যে কোন কাজ করে ফেলার অনুভূতি জাগ্রত হতে পারে। পক্ষান্তরে প্রতিপক্ষের অনুপ্রবেশঘটিত কোন অনাকাংখিত ঘটনারও জন্ম দিতে পারে। কাজেই এসব বিষয় মাথায় রেখেই বিরোধী দল তাদের আন্দোলন পরিচালনা করবে বলে আমরা আশা করি।
দুর্নীতির অবসান : বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে অন্যতম ছিল দুর্নীতি দূর করা। আমরাও আশা করেছিলাম সেই অঙ্গীকারের কিছু না কিছু বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু দেশে দুর্নীতির অবসান হওয়া তো দূরের কথা বরং কত হারে তা বৃদ্ধি পেয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। পদ্মা সেতু, হল মার্ক, শেয়ার বাজার, ডেসটিনি, বেসিক ব্যাংক কয়টি দুর্নীতির কথা বলব। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির কথা বলাই বাহুল্য। এতসব ঘটনা ঘটার পরেও সরকার যেন নির্বিকার। যা হোক, আমরা ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে থাকব এবং আশা করব একদিন দুর্নীতির অবসান হবে এবং সুজলা-সুফলা এই বাংলাদেশ হবে এক স্বনির্ভর নতুন বাংলাদেশ।
আদর্শিক ও নৈতিক শিক্ষা : দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য যেমন দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন হচ্ছে একটি সুশিক্ষিত জাতি তৈরি করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, একদিকে শিক্ষা ক্ষেত্রে মান বজায় রাখার কোন চিন্তা কারো মাথায় নেই অপর দিকে শিক্ষাঙ্গনে মানুষ হবার কোন পরিবেশ নেই। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বর্তমানে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা থেকে শুরু করে একেবারে বিসিএস পরীক্ষা পর্যন্ত প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায় অথচ সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সামান্যতম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না। এতদ্ব্যতীত প্রচলিত রাজনীতির বিষাক্ত ছোবল তো আছেই। এ প্রেক্ষিতে আমরা আশা করব এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি যুৎসই নৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সংশ্লিষ্ট সকলেই যথাযথ ভূমিকা রাখবেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন : মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে অনেকেই তাদের মুখে খই ফুটায়। কিন্তু এই চেতনার যথাযথ বাস্তবায়ন তথা এর ব্যবহারিক দিক নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল গণতন্ত্র, ন্যায় বিচার, জাতীয়তাবোধ ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের মতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ না করা। সেটা রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা অর্থনৈতিক ইস্যু যাই হোক না কেন। এসব ব্যাপারে জনগণকে যেমন সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে পক্ষান্তরে দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিগণকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
গুম, খুন ও বিচার বহির্ভূত হত্যা বন্ধকরণ: মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে আজও নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। কখনো শাপলা চত্বরে হেফাজতের লক্ষ জনতার শান্তিপূর্ণ সমাবেশে, কখনো জনগণের দাবিকেন্দ্রিক আন্দোলন দমনে এসব নির্মম হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সরকারের পেটুয়া বাহিনীর গুলিতে ৪ জন (মতান্তরে আরো অধিক) সাধারণ মানুষকে হত্যা করার ঘটনা তার সর্বশেষ সংযোজন। এসব ঘটনা নিয়ে দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হল দেশে বিচারের নামে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থকরণের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব অনাকাংখিত অবস্থার অবসান আজ জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে।
সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও হলুদ সাংবাদিকতার অবসান : সংবাদ মাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। এ ব্যাপারে আমি দুইটি দিক তুলে ধরব। প্রথমটি হলো সত্যনিষ্ঠ অনেক সংবাদ মাধ্যম আজ স্বৈরশাসনের রোষানলে পড়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দেশের এমন অবস্থা দেখে যে কোন বিবেকবান মানুষ আজ স্তম্ভিত ও লজ্জিত। অবশ্য সংবাদ মাধ্যমের কন্ঠরোধের ঘটনা আমরা স্বাধীনতা পরবর্তী শাসনামলেও দেখেছি। তবে এবার নতুন প্রজন্ম নতুন করে তা অবলোকন করল। দ্বিতীয়ত আমরা আশা করেছিলাম দেশে হলুদ সাংবাদিকতার অবসান হবে। কিন্তু আমাদের আশার গুড়ে বালি। সত্যনিষ্ঠ, দুর্নীতিমুক্ত, গণতন্ত্রকামী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গোয়েবলসীয় কায়দায় অপপ্রচার চলছে। এর সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব হলুদ সাংবাদিকতায় লিপ্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর। ভোটার বিহীন নির্বাচন, একদলীয় শাসন, বিচার বহির্ভূত হত্যা এসব বিষয় নিয়ে এরা নির্বিকার ও নির্লিপ্ত। এমন অবস্থা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত বহন করে যা দেশ ও জাতির জন্য আদৌ কাম্য নয়।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখে দেয়া : একথা আমরা জানি যে, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথমে তার সংস্কৃতির উপর আঘাত করতে হয়। আমাদের দেশে এখন যেন তাই চলছে। অপসংস্কৃতির সয়লাবে ডুবন্ত প্রায় তরুণ সমাজ। আকাশ সংস্কৃতি তাদেরকে কুরে কুরে খাচ্ছে। হাতের মোবাইল থেকে শুরু করে ডিস, ইন্টারনেট এসব থেকে তারা জীবন গঠনমূলক শিক্ষণীয় বিষয়গুলো গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। যেই শিশুটি সকলকে সালাম দেয়ার কথা সে শুধু হাই-হ্যালো বলছে। যে শিশুটি পরিবার থেকে নানান নীতিকথা শিক্ষা লাভ করার কথা সে শুধুই প্র্যাকটিস করছে সারেগামা পাদানিসা। সে বুঝতে পারছে না তার জীবনে কেমন করে নেমে আসছে ঘনঘোর অমানিশা। আমরা এমন অমানিশা চাই না। আমরা জাতীয় কবির লিখিত ছড়ার মতই ভোরের ডাকে আমাদের শিশুদেরকে জাগ্রত দেখতে চাই। তবে এই চাওয়ার মাঝে একটি কথা বলতেই হয়। তাহলো শাসকদের সুবিবেচনাপ্রসূত ভূমিকা ব্যতিরেকে আধিপত্যবাদী শক্তির সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখে দেয়া কোন ক্রমেই সম্ভব নয়।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান : আমরা সর্বদাই গণতন্ত্রের কথা বলে থাকি। গণতন্ত্রের নামে স্বৈর শাসকদের রুদ্র রূপ আমরা দেখতে পেয়েছি। সাম্প্রতিক সময়ে জনগণের এক বিরাট অংশ দেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত এমনকি মৃত সাব্যস্ত করছে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের অঙ্গীকার থেকে ক্ষমতাসীনদের সরে আসা সেই কথার যৌক্তিকতাই বহন করে। আমাদের এই দুর্বলতা অবশ্যই স্বীকার করে নেয়া উচিত যে, স্বাধীনতার ৪৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমাদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেমন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন- এগুলোকে শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হইনি। সেই প্রেক্ষিতে আমরা বিশ্বাস করি যে, যারা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে তারাই কেবল এই দেশ শাসনের সুযোগ লাভ করতে পারে।
এই জাতির প্রত্যাশার কিছু দিক আমরা তুলে ধরলাম। তবে সেসব দিকে জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস পরিচালিত না হলে সাফল্য ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। এজন্যে জাতীয় ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভক্তি দূর করা ব্যতীত কোন গত্যন্তর নেই। নির্বাচন কালীন সরকার কিংবা অপরাপর বিষয়ে জাতীয় আদর্শের নিরীখে জাতীয় বিভক্তি দুর করা আজ সময়ের শ্রেষ্ঠ দাবী। সময়ের প্রয়োজনে এদাবী পূরণে আমাদেরকে আবারো একটি যুদ্ধে অবর্তীণ হতে হবে। এজন্যে ভিনদেশী সেবাদাস মুক্ত, দেশপ্রেমিক, নৈতিক মান সম্পন্ন একটি জনগোষ্ঠী তাদের কার্যক্রম নিয়ে সঠিক সময়েই প্রতিভাত হবে- নতুন বছরে এই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads