বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৬

দখল-বেদখল ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা


আমাদের সমাজে এখন দখল-বেদখলের নানারূপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘বারো রকমের দখল’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায়। ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয় : দখল-বেদখল, পাল্টা দখলের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে দেশজুড়ে। ক্ষমতার প্রভাব, দলীয় পরিচয়, অস্ত্রের বল আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে চলছে দখলবাজির দাপুটে কারবার। বিচারপতির বাড়ি, সরকারি সম্পত্তি, টেন্ডার থেকে শুরু করে পেশাজীবীদের ক্লাব-সংগঠনও দখলবাজির ধকল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সারা দেশে প্রভাবশালীরা সর্বত্রই গড়ে তুলেছে দখলবাজির সিন্ডিকেট। এ মুহূর্তে চলছে সারা দেশে ভোটকেন্দ্র দখলের দাপুটে কারবার। নির্বাচন কমিশন আছে, তাদের নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কোমরে গামছা বেঁধে চষে বেড়াচ্ছেন মাঠ-ময়দান। কিন্তু তাদের সামনে মুখ চেনা মানুষেরা কেন্দ্রে কেন্দ্রে হানা দিয়ে জবর দখল করে নিচ্ছে ব্যালট-বাক্স। মুন্সিগঞ্জের একটি ভোট কেন্দ্রে পুলিশ সিল মারছে এমন ছবিও ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। শুধু জায়গা-জমি, ভোট কেন্দ্র দখল করেই জবর দখলকারীরা ক্ষান্ত থাকছেন না; তারা পদ পদবী দখল করতেও সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি জবর দখল করে রেখেছেন অছাত্ররা। উক্ত পত্রিকায় খাল-বিল, নদী-নালা, ফুটপাত এমনকি খেলার মাঠ ও শিশু পার্ক দখলের চিত্রও উঠে এসেছে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে এমন অবস্থা কী করে বিরাজ করে তা ভাবতে গেলে বিস্মিত হতে হয়।
পত্রিকার প্রতিবেদনে দখলের যে দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা গেল, তাতে স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করা যায় যে, দেশের শাসন-প্রশাসন ঠিকভাবে চলছে না। আমরা নিজেদের গণতান্ত্রিক ভাবতে ভালবাসি, সরকারও সুশাসনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে গর্ব অনুভব করেন কিন্তু গণতন্ত্র ও সুশাসনের এ কেমন চিত্র? আমরা তো এ কথা বেশ ভালভাবেই উপলব্ধি করি যে, দখলের দৌরাত্ম্য চালাতে শক্তির প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় প্রশাসনের সহযোগিতাও। এসব সুবিধা তো সব সময় সরকারি ঘরানার লোকদের হাতেই থাকে। এখনও সরকারি দলের লোকজনই দখলবাজির দাপুটে কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কাজ তো দেশের সংবিধান এবং সরকার ও সরকারি দলের অঙ্গীকারের বিপরীত কাজ। কোনো যুক্তিতেই দেশে দখলের দৌরাত্ম্য চলতে দেয়া যায় না। কারণ এমন দৌরাত্ম্যে শুধু যে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের প্রকৃত উন্নয়নও। সুশাসনের অভাবে দখলের এমন দৌরাত্ম্য চলতে থাকলে, আখেরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়। এমন অবস্থায় জনমনে আতঙ্কের পাশাপাশি বাড়তে থাকে ক্ষোভের মাত্রাও, যা কোনোভাবেই সরকারের জন্য কল্যাণকর বলে বিবেচিত হতে পারে না। কোনো সমাজে ন্যায়ের চর্চা না হলে, সুশাসন না থাকলে তার ফল ভোগ করতে হয় সবাইকেই। সরকারি দলের লোকজনও এখন তা উপলব্ধি করছেন। জুলুম-নিপীড়ন ও অবদমনের মাধ্যমে বিরোধী জোটকে দুর্বল করার পর এখন সরকারি দলের লোকজন কি ভাল আছেন? এখন তো প্রায় প্রতিদিন তাদের নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও হতাহতের ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের সন্ত্রাসে জনপদ কেঁপে উঠছে। আসলে ন্যায়-নীতি ও সুশাসন না থাকলে দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্যই বাড়ে। বিশেষ দলের নাম কিংবা তেজস্বী বক্তৃতার কারণে কখনও পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসতে পারে না। এমন চিত্রই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আমাদের নেতারা তো বক্তৃতা-বিবৃতিতে প্রায়ই বলে থাকেন, ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের চাইতে দেশ বড়। কিন্তু বাস্তবে তো এমন বক্তব্যের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় না। বরং যখন দেশের চাইতে দল বড় হয়ে ওঠে এবং দলের চাইতে বড় হয়ে ওঠেন ব্যক্তি, তখন নেতা-নেত্রীদের বক্তব্যের অন্তঃসারশূন্যতাই প্রতীয়মান হয়। কথা ও কাজের গরমিলের কারণে দেশে এখন দুর্বৃত্তায়নের দৌরাত্ম্য ও দখল-বেদখলের কারবার চলতে পারছে। এমন অবস্থা আখেরে কারো জন্যই মঙ্গলজনক হতে পারে না। বিষয়টি যাদের বোঝা উচিত তারা যে বোঝেন না তা কিন্তু নয়। কিন্তু সঠিক কোনো কাজ করতে হলে বোঝার সাথে প্রয়োজন হয় আরো কিছু বিষয়। সেই বিষয়গুলো হলো জবাবদিহির চেতনা ও নৈতিক মেরুদণ্ড এ দু’টি বিষয় আমাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রয়োজন আদর্শের রাজনীতি। এমন রাজনীতির এখন দুর্ভিক্ষ চলছে। আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা এই দুর্ভিক্ষ দূর করতে পারলে অন্যসব দুর্ভিক্ষ থেকে জাতি মুুক্তি পেতে পারে। আমাদের রাজনীতিবিদরা আদর্শিক রাজনীতির ঝাণ্ডাকে সমুন্নত করতে পারেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। যারা আদর্শের রাজনীতি করবেন তাদের অবশ্যই দখল-বেদখলের দৌরাত্ম্য দূর করার পাশাপাশি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়ও মনোযোগী হতে হবে।
বর্তমান সভ্যতায় মানবাধিকারের বিষয়টি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। দেশে-বিদেশে নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আর আমরা তো একথা জানি যে, উন্নত ও সম্মানজনক জীবন-যাপনের জন্য মানবাধিকার আবশ্যিক বিষয়। মানবাধিকার যতটা লঙ্ঘিত হবে মানুষের জীবন ততটাই মানবেতর হয়ে উঠবে। প্রসঙ্গত এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ কিন্তু মানুষের অধিকার তেমন ক্ষুণ্ন করতে পারে না। কারও অধিকার ক্ষুণ্ন করতে হলে ক্ষমতা প্রয়োজন, কালাকানুন প্রয়োজন। অর্থাৎ মানবাধিকার  ক্ষুণ্ন করতে পারেন শক্তিমানরাই। এই কথা সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বলয়ে খুবই প্রাসঙ্গিক বর্তমান সময়ে।
মানবাধিকার নিয়ে বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন সংস্থা এবং রাষ্ট্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, গবেষণাও করে থাকে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুসারে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পেশ করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এবার দেশটির ৪০তম বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে ১৯৯টি দেশের মানবাধিকার প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়: বিচারবহির্ভূত হত্যা, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন, গণগ্রেফতার, কারাবন্দিত্ব, বিচার বিভাগের সামর্থ্যহীনতা, নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন, গুম, ব্লগার-অনলাইন ও গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ, নিম্নমানের কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের অধিকারহীনতা বাংলাদেশের প্রধান মানবাধিকার সংকট। এছাড়াও প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুর্নীতি এবং সরকারের কাজকর্মের অস্বচ্ছতাকে মানবাধিকারের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বিতর্কিত এবং আন্তর্জাতিক মানদ-ের ঘাটতি ছিল বলে মত দিয়েছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা মোটেও সম্মানজনক নয়। দেশের এমন চিত্র দেশের কোনো নাগরিকের ভালো লাগার কথা নয়। এমন রিপোর্ট সরকারের জন্যও অস্বস্তিকর। তবে মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে যদি কোনো ত্রুটি থাকে কিংবা ভুল তথ্য পরিবেশিত হয়ে থাকে, তাহলে তার সংশোধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতিবাদও জানাতে পারে। তবে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি যে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেই তা দেশটির নাগরিকদের চাইতে আর কারো ভালো জানার কথা নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখা ভাল যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উন্নত বিশ্ব যে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে তা আরও অর্থবহ হতো, যদি ওইসব দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হতো। পরাক্রমশালী কোনো কোনো দেশ তো নিজের সীমানা পেরিয়ে ভিন্ন দেশেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় বড় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এইসব উদাহরণ বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে তো বড় বড় দেশকে আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিতে দেখেছি। এক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন, প্রয়োজন সংশোধন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads