মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

পুলিশ কি তবে শিক্ষকের সঙ্গে দুষ্টমি করছিল?


গত ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্বকিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ধারাবাহিকভাবে নারীদের শ্লীলতাহানি করেছে ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী। প্রতিবাদী ছাত্ররা এদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করেছিল। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাদের চা-নাস্তা খাইয়ে সসম্মানে বিদায় দিয়েছিল পুলিশ। এ নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। পত্রিকাগুলো সে ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। টিভি চ্যানেলগুলা প্রচার করেছিল ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ। তাতে হামলাকারীদের চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু পুলিশের তরফ থেকে এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নানান কোশেশ চালানো হয়। আর ঘটনাস্থলের আশেপাশে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য মোতায়েন ছিল ডজন ডজন পুলিশ। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টাই করেনি। আক্রান্ত নারীদের রক্ষা করতে যারা চেষ্টা করছিলেন, তারা পুলিশের সাহায্য চাইলে পুলিশ বলেছে, এখানে দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া আছে। সংশ্লিষ্ট এলাকা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
ঘটনা সম্পর্কে প্রথমে পুলিশ একেবারেই অস্বীকার করে বসে যে, ঐ দিন টিএসসি চত্বরে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তারপর বলল, পত্রিকায় যে ছবি ছাপা হয়েছে, তা অন্য কোনো এলাকার। তারা আরও বলল যে, যখন ঘটনা ঘটেছে, তখন অন্ধকার হয়ে আসছিল, তাই কিছু ঘটে থাকলেও পুলিশ দেখতে পায়নি। আবার বলা হলো, পুলিশ ভেবেছিল, ওখানে ছেলেপেলেরা সামান্য জটলা করছিল। তারপর এলো সেখানে স্থাপিত সিসি ক্যামেরা প্রসঙ্গ। পুলিশ বলল, সে ফুটেজ দেখে কারও চেহারা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। পুলিশ যখন এইসব আবোল তাবোল বলছিল, তখন পত্রিকাগুলো ভিডিও ফুটেজ থেকে হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে দিল। তাতে তাদের স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল। তারপরও পুলিশ বাহিনীর প্রধান শহীদুল হক যা বলে বসলেন, তা স্তম্ভিত হওয়ার মতো কথা। তিনি বললেন, টিএসসি চত্বরে নারীদের শ্লীলতাহানির মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। সেখানে কিছু ছেলে দুষ্টামি করছিল। যেখানে হাজার হাজার মানুষের সামনে নারীদের জামাকাপড় ছিঁড়ে বিবস্ত্র করে ফেলা হলো, একের পর এক মেয়েকে-মাকে-বান্ধবীদেরকে কামড়ে-খামচে পিষে দেয়া হলো, আর সেই ঘটনাকে পুলিশ প্রধান ‘দুষ্টামি’ বলে অভিহিত করে বসলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের, পুলিশ প্রধানের এসসব সাফাই কোনো কাজে আসেনি। পুলিশকে মেনে নিতেই হয়েছে যে, সেদিন ওখানে নারীরা লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। আর পুলিশই লাঞ্ছনাকারীদের শনাক্তও করতে পারল। তারাও স্পষ্ট ছবি বের করতে পারল এবং পত্রিকায় সেসব ছবি দিয়ে প্রচারও করতে পারল যে, এরা লাঞ্ছনাকারীদের কয়েকজন। তাদের ধরিয়ে দিতে পারলে মাথাপিছু এক লক্ষ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হবে। এখন আইজিপি সাহেবের দুষ্টুমি তত্ত্বের কী গতি হবে, কে জানে।
পুলিশের এমন আর এক দুষ্টামি দেখলাম মাদারিপুরে। গত ১৩ আগস্ট মাদারিপুরের মোস্তফাপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর দুই ছাত্রীকে নির্যাতনের পর হত্যা করে ছাত্রলীগের সন্তাসীরা। এ নিয়েও সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। যদিও প্রতিদিনই দেশে ঘটছে শিশু নির্যাতন-ধর্ষণের মতো লোমহর্ষক ঘটনা। প্রতিকার কোথায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার কিংবা পুলিশ বাহিনী সম্ভবত আশা করে যে, তাদের দায়িত্বহীনতা ও নিষ্ক্রিয়তায় দেশে এই যে বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, কোথায়ও যেন তার কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিকারের দাবি না ওঠে। কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এই অনাচারের সঙ্গে যুক্ত আছে সরকার দলের সমর্থনপুষ্টরা। তাদের রাখতে হবে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ এখন ধর্ষণের মামলাও নিতে চায় না। এ থানা বলে, ও থানায় যান, ও থানা বলে সে থানায় যান। মামলা-মোকদ্দমা ঝামেলার কাজ। তার চেয়ে অনেক সহজ থানায় বসে মুক্তিপণ আদায় করে রাতারাতি বিত্তবান হয়ে ওঠা। আর মামলা নিলে হাসপাতালে দৌড়াও, আদালতে যাও। সাক্ষী দাও। আর এসব ভারী ঝক্কি-ঝামেলার কাজ। আর সে কারণেই সম্প্রতি নিহত ব্লগার নিলয় তার জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে একাধিক থানায় দৌড়াদৌড়ি করেও একটি জিডি পর্যন্ত করতে পারেননি।
মাদারিপুরে ঐ দুই ছাত্রী ও সারা দেশে শিশু হত্যার প্রতিবাদে হত্যার বিচারের দাবিতে জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দেশে এখন রাজনীতি নেই। সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল নেই। জনসভা নেই। রাজনৈতিক বক্তব্য দেবার জন্য বিবৃতির রেওয়াজ চালু হয়ে গেছে। ফলে যে-কোনো বিষয়ে সরকারকে জানান দিতে বা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সকলেই মানববন্ধনের মতো নিরীহ কর্মসূচির আয়োজন করে। তাতে সংক্ষুব্ধরা একটি ব্যানার ও কিছু প্লাকার্ড হাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায়। এই মানববন্ধনের ওপর ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে সরকার। পিটিয়ে তেমন মানববন্ধনকে তুষ বানিয়ে দিচ্ছে।
গত ১৬ আগস্ট মাদারিপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন শহরের এএইচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক শিক্ষার্থী আর অভিভাবকেরা। সে মানববন্ধনে ছিল দেড় থেকে দুই শতাধিক কোমলমতি শিশুও। কিন্তু এরা মানববন্ধনে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর একবারে হামলে পড়ে। ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে নেয়ার চেষ্টা করে। যেন কম্যান্ডো স্টাইলে ধরছে কোনো ভয়ঙ্কর অপরাধীকে। দুটি স্কুলগামী মেয়ে শিশুকে নির্যাতন করে যারা হত্যা করল, তাদের ধরার যাদের মুরাদ নেই যে পুলিশের, সেই পুলিশের কী সাংঘাতিক মুরাদ দেখলাম মানববন্ধন পণ্ড করে দিতে। দৃশ্য দেখে বলিহারি যাই।
বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশদের শিক্ষক পেটানোর ঘটনা নতুন নয়। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা যখন তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে ঢাকার রাজপথে আন্দোলন করছিলেন, তখনকার অবস্থা স্মরণ করলে গা শিউরে ওঠে। প্রবীণ শিক্ষকদের ওপর দু’ হাতে লাঠি বাগিয়ে কিংবা রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে রাস্তার ওপর রক্তাক্ত করেছে পুলিশ। রাস্তার ওপর ফেলে তাদের বুট দিয়ে পিষে দিয়েছে। শিক্ষকদের আর্তনাদে ঢাকার বাতাস ভারী হয়েছে। সরকার নির্বিকার থেকেছে। সরকারের কোনো মন্ত্রী-এমপিকে এ ব্যাপারে মুখ খুলতে দেখিনি। আফসোস হয়েছে। এদের প্রায় সবাই প্রাইমারি, মাধ্যমিক স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। তাদের কারও কি একবারও তাদের নির্মাণের কারিগরদের কথা মনে হয়নি? কোনো প্রিয় শিক্ষকের মুখ কি চোখের সামনে ভেসে ওঠেনি? উঠলে দেখতাম, সংশ্লিষ্ট পুলিশদের এই বাহিনী থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারে কুটোটিও নড়েনি। তবে কি পুলিশ শিক্ষকদের সঙ্গে একটু দুষ্টামি করছিল মাত্র?
তেমনি দৃশ্যই মাদারিপুরে দেখলাম। ঐ নিরীহ নির্বাক মানববন্ধন থেকে পুলিশ আটক করছে একজন শিক্ষককে। সামনে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ঐ শিক্ষককে শক্ত করে ধরে সম্ভবত হ্যান্ডকাফ পরাচ্ছে। পেছনে একজন পুলিশ কনস্টেবল ঐ শিক্ষকের ঘাড় চেপে ধরে সামনের দিকে ঠেলছে। ফের বেদনায় বুক ভারী হয়ে এলো। এই শিক্ষকদের কাছে আমার বাপ-দাদারা লেখাপড়া করেছেন। আমি লেখাপড়া করেছি। আমার সন্তানেরা লেখাপড়া করেছে। তাদের সন্তানেরাও পড়বে। তারা সমাজে আমাদের কাছে এতটুকু মর্যাদাও কি আশা করতে পারেন না? শিক্ষকদের কেউ অপরাধ করতে পারেন না, তা আমি বলছি না। কিন্তু যে শিক্ষকদের ঢাকার রাস্তায় পিটিয়ে পুলিশ বুটের তলায় পিষে দিচ্ছিল, তারা কোনো অপরাধ করেননি। যে শিক্ষককে পুলিশ ঘাড় ধরে গ্রেফতার করার চেষ্টা করছিল, তিনিও কোনো অপরাধ করেননি। যেসব পুলিশ শিক্ষকদের ওপর এমন বর্বর আচরণ করল, তারাও নিশ্চয়ই কোনো শিক্ষকের কাছে কোনো বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছে। তা না হলে পুলিশের চাকরিও তার কপালে জুটত না। পুলিশ বলতে পারে, বিদ্যা দিয়ে চাকরি নেইনি, টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছি। শিক্ষকের ইজ্জত গেল কি রইল, তাতে আমার কি আসে যায়? তবু বলতে হবে, তাকেও স্কুলে যেতে হয়েছে।
মানববন্ধনটি হতে যাচ্ছিল ডিসি অফিসের পাশে। ডিসি সাহেব কি অফিসে ছিলেন? তিনি কি ঘর থেকে বরিয়ে দেখেছেন, শিক্ষকদের সঙ্গে, শিশুদের সঙ্গে কী আচরণ করছে পুলিশ? দেখলে বাধা দেননি কেন? তিনি তো আর ফাল দিয়ে এসে ডিসি হয়ে যাননি। স্কুল-কলেজে তাকেও পড়তে হয়েছে। তিনি তার স্কুল-পড়ুয়া সন্তানদের কাছে কী জবাব দেবেন? নাকি পুলিশ-প্রশাসন সবাই ঐ ঘাতকদের সহযোগী? ঘাতকদের বিরুদ্ধে কাউকে তারা কোনো উচ্চবাচ্যই করতে দেবেন না? কিন্তু এসপি-ডিসি-ওসি সাহেব, ঘাতকদের সহযোগী হওয়ার পরিণাম কখনও সম্মানজনক হয় না।
এর প্রমাণ মিলল কক্সবাজারে। উখিয়া টেকনাফের এমপি আবদুর রহমান বদি গত ১২ আগস্ট চড় মেরে মেরে গাল লাল করে দিয়েছিলেন উপজেলা প্রকৌশলী মোস্তফা মিনহাজকে। ধারণা করা হয়েছিল, এবার বোধকরি প্রধানমন্ত্রী বদিকে কঠোরভাবে শাসন করবেন। কিন্তু না, ফল হয়েছে একেবারেই বিপরীত। গত রোববার (১৬ আগস্ট) সরকার মিনহাজকে স্ট্যান্ডরিলিজ (তৎক্ষণাৎ বদলি) করে দিয়েছে। এতে প্রশাসনের সম্মান বাড়েনি। বরং তারা সরকারের বুটের তলায় পিষ্টই হয়েছেন।

সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

শোক দিবসের চাঁদাবাজি ও নেতৃত্ব মূল্যায়নের পন্থা


গত ১৫ আগস্ট দেশব্যাপী স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে জাতীয় শোক দিবস উদযাপন করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে তিনি একদল উচ্ছৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তার হাতে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। তার সাথে তার স্ত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মা, শিশুপুত্র রাসেল ও সস্ত্রীক অপর দুই পুত্র এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন মিলে মোট ১৮ ব্যক্তি নিহত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই বিয়োগান্ত ঘটনার স্মরণে এই দিবসটি পালন করে আসা হচ্ছে।
এই দিবস পালন উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্তমান সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে এবং দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ ও তার অংগ সংগঠনসমূহ এতে অংশগ্রহণ করেছে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরানুযায়ী এ বছর ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা শোক দিবস উপলক্ষে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে বেশকিছু অঘটনও ঘটিয়েছে। তারা চাঁদা ভাগাভাগি করতে গিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েও পড়েছিল এবং এই সংঘর্ষে মোট ৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছে। ফলে জাতীয় শোকের সাথে স্থানীয় শোক মিশে গিয়ে অবস্থার আরো অবনতি ঘটিয়েছে। ঘটনার এখানেই সমাপ্তি ঘটেনি। চাঁদপুরের কচুয়ায় ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে স্কুলের উপবৃত্তির তহবিল থেকে শোক দিবসের চাঁদা দাবি করেছিল। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তারা উক্ত শিক্ষককে মারধর করে। বিষয়টি জানাজানি হবার পর স্কুলের অর্ধশতাধিক ছাত্রছাত্রী পরদিন প্রতিবাদ মিছিল বের করে। ঐ মিছিলের উপর যুবলীগ নেতাকর্মীরা হামলা করে। এতে ৪০ জন ছাত্রছাত্রী আহত হয় এবং ২৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। আহতদের মধ্যে ১৩ জনই ছাত্রী। বিষয়টি সর্বত্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অনেকে চাঁদা তুলে টাকার ভাগাভাগির সাথে শোক দিবসের সম্পর্ক এবং জবরদস্তি চাঁদাবাজির যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছেন না।
শোক দিবস পালন নতুন কিছু নয়। এই দিবসে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাফল্য ব্যর্থতার মূল্যায়ন ও বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা আমাদের সংস্কৃতির অংগ। এর জন্য চাঁদার দরকার হয় না। আবার চাঁদাবাজি করে মানুষের মনও পাওয়া যায় না। চাঁদাবাজি ও শিক্ষক লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে যে মিছিলটি চাঁদপুরে বের করা হয়েছে তা থেকে ক্ষমতাসীন দলের অনেক কিছুই শিক্ষার আছে বলে আমার মনে হয়। আরেকটি খবর এর মধ্যে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পৌরসভার একজন সচিব শোক দিবসে কোনও কর্মসূচি পালন না করায় তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। বিষয়টি অনেকের কাছেই অদ্ভুত ঠেকেছে।
শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি নির্মম হত্যার শিকার হয়েছিলেন। হত্যাকারীরা তার স্ত্রী-পুত্রসহ পরিবার সদস্যদেরও রেহাই দেয়নি। একজন দলীয় নেতা, সংগঠক ও শাসক হিসেবে তার জীবনে সাফল্যের সাথে ব্যর্থতা থাকাও অস্বাভাবিক নয়। মানুষ হিসেবে তিনি ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নন। যারা তাকে দেবত্বের পর্যায়ে উন্নীত করেন অথবা তাকে অবমূল্যায়ন করেন আমি তাদের কারুরই দলে নই। আমি মনে করি একজন মানুষ বিশেষ করে একজন নেতার মূল্যায়ন কারুর ব্যক্তিগত অথবা দলীয় ইচ্ছা-অনিচ্ছা অথবা পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নয় বরং নৈর্ব্যক্তিক মানের ভিত্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ প্রেক্ষিতে আমার সীমিত অধ্যয়নে আমি তিনজন বিশ্লেষককে পছন্দ করি অথবা তাদের বিশ্লেষণের ক্রাইটেরিয়াগুলো আমার ভাল লাগে। এদের একজন হচ্ছেন উইলিয়াম মেকনীল। তিনি একজন ইতিহাসবিদ, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করেছেন ইমপ্যাক্ট বা ফলাফলের ভিত্তিতে। দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছেন জেমস গেবিন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল। তিনিও গুণাবলী ও প্রভাবের ভিত্তিতে নেতৃত্বের মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন অধ্যাপক এবং যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষক জুলেস ম্যাসারম্যান শ্রেষ্ঠ নেতা নির্বাচনে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন। এই তিনজন খ্যাতনামা বিশ্লেষকের যথাক্রমে “Who were History’s Great Leaders?” “What makes a great Leader?” Ges “Throughout History who qualifies?” পুস্তকসমূহ পাঠক-পাঠিকারা অধ্যয়ন করে দেখতে পারেন। জুলেস ম্যাসারম্যান-এর ভাষায়, "Leaders must fulfil three functions :
1. The leader must provide for the well-being of the led.
2. The leader must provide a social organisation in which people feel relatively secure.
3. The leader must provide his people with one set of beliefs.
বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল নেতার মূল্যায়নের জন্য ম্যাসারম্যানের উপরোক্ত তিনটি মানদ-কে আমি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এখানে একটি কথা বলা দরকার যে, শেখ মুজিবুর রহমান বলতে আমি একাত্তর-উত্তর শেখ মুজিবুর রহমানকেই বুঝি। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী, কিংবা দুর্নীতি দমন মন্ত্রী হিসেবে তার মূল্যায়ন এখানে অবান্তর অথবা তার দল আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করে কি করেছিল অথবা ১৯৫৮ সালে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পীকারকে হত্যা করে ঐ দলটির কিছু নেতা কিভাবে সামরিক শাসন জারিকে সহায়তা করেছিল এখানে তা প্রতিপাদ্য নয়।
ব্যক্তি জীবনে শেখ মুজিব বন্ধুবৎসল ও সদালাপি ছিলেন। অনেকে মনে করেন সামষ্টিক জীবনে তার মধ্যে আবেগের আধিক্য ছিল অনেক বেশি। তার শাসন আমল কেমন ছিল বাংলাদেশের মানুষ তা জানেন। সোসাইটি ফর ন্যাশনাল স্টাডিজ কর্তৃক প্রকাশিত এক খতিয়ান অনুযায়ী স্বাধীনতা-উত্তর আওয়ামী লীগ শাসনের সাড়ে তিন বছরে ১০ লাখ লোক দুর্ভিক্ষে, ২ লাখ লোক পুষ্টিহীনতায়, এক লাখ লোক বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছে। এছাড়াও ঐ সময়ে ৯ হাজার লোক জেলখানায় অমানুষিক অত্যাচারে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী বাকশালী সন্ত্রাসী ও রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনে ২৭ হাজার লোক এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ১৯ হাজার লোক অকাল মৃত্যুর শিকার হয়েছে। আওয়ামী গু-া এবং রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনে পঙ্গু হয়েছে ৩৩ হাজার লোক এবং গুম-খুন হয়েছে লক্ষাধিক লোক।
তৎকালীন সরকার মানুষের জীবন ও সম্মানের নিরাপত্তা যেমনি দিতে পারেনি, তেমনি ঐ আমলে অন্ন-বস্ত্রের নিশ্চয়তাও ছিল না। ১৯৭৫ সালের ৬ জানুয়ারি লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার সংবাদদাতা পিটার গিলি লিখেছেন, “আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম ১৯৭৪ সালের শেষার্ধে ২৯৩৪টি লাশ কুড়িয়েছে। সব লাশই বেওয়ারিশ। এগুলোর মধ্যে দেড় হাজারের বেশি রাস্তা থেকে কুড়ানো। ডিসেম্বরে মৃতের সংখ্যা জুলাইয়ের সাতগুণ এবং অক্টোবরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কুড়ানো সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। গ্রাম-বাংলার হতাশ মানুষরা আজ ঢাকার পেশাদার ভিখারীদের স্থান দখল করেছে। পিতা শিশুদের নিয়ে রাস্তার চত্বরে নির্জীবের মতো বসে আছে আর ফুঁফিয়ে কাঁদছে।” পত্রিকাটি আরও লিখেছে, “স্পষ্টতঃ বাংলাদেশে পরাজয়ের সংগ্রাম চলছে।” দিনে দিনে বাংলাদেশ আরও গরীব হচ্ছে। কল্পনা করা শক্ত কিন্তু বাস্তব এটাই যে, আজকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা স্বাধীনতার সময়কালের অবস্থা থেকে অনেক বেশি শোচনীয়!” ১৯৭৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকা লিখেছে, “বাংলাদেশের শাসক ও নব্য শাসকরা অধিকতর অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ ও লোভী- এরা রাতারাতি বড় হতে চায়। ধুরন্ধর ব্যক্তিরা উচ্চাশার টোপ ফেলেছিল যে স্বাধীন বাংলাদেশ অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে এবং সরল মানুষরা তা বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু ভারতীয় হস্তক্ষেপের ফলে যারা বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন হলো তাদের মতো স্বার্থপর নেতৃত্ব কোনও দেশে সত্যিকার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পর আর দেখা যায়নি। দেশটি যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে তা অবশ্যম্ভাবী।”
প্রখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা এমএ মোহাইমেন “বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ” শীর্ষক পুস্তকে তৎকালীন সময়ে দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের চাঁদাবাজি ও লুটপাট সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক। অবাঙালিদের পরিত্যক্ত বাড়ি-ঘর, শিল্পকারখানার তৈরি মালামাল ও যন্ত্রপাতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের কোটি কোটি টাকার মালামাল লুটের বিস্তারিত বর্ণনা তার পুস্তকে পাওয়া যায়। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এ দেশের মানুষ দেখেছে তার নজির কোথাও নেই। ডেইলি মেইল, ফারইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ  পত্রিকা, টাইম ম্যাগাজিন প্রভৃতি পত্রিকার ঐ সসময়কার রিপোর্ট তো বটেই, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থার ঐ সময়কার রিপোর্টসমূহও ছিল আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও লুটপাটের কাহিনীতে ভরপুর। মানুষের কল্যাণ চিন্তা শাসক দলের অভিধান থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। দলটি সাধারণ মানুষের জন্য আতংকে পরিণত হয়েছিল। কারুরই জীবন, সম্পত্তি ও সম্মানের নিরাপত্তা ছিল না। স্বয়ং শেখ মুজিব এই অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। তিনি তার চারদিকে দুর্নীতিবাজ ও চোরদের উপস্থিতি টের পেলেও তাদের শাস্তি প্রদান অথবা দলকে দুর্নীতিবাজ/সন্ত্রাসীমুক্ত করার ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেননি। দেশ এবং জাতিকে তিনি কোনও আদর্শ বা নীতি-বিশ্বাস উপহার দিতে পেরেছেন বলে জানা যায় না।
উপরোক্ত অবস্থার আলোকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ম্যাসারম্যানের তিনটি মানদণ্ডের কোনটিতেই উত্তীর্ণ হতে পারেন বলে মনে হয় না। তারা এমন কোনও সমাজ ব্যবস্থা বা সামাজিক সংগঠন জাতিকে উপহার দিতে পারেননি যার ছায়াতলে মানুষ নিজেদের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করতে পারে। বরং আওয়ামী লীগ, যুব লীগ, ছাত্র লীগ এবং তাদের গঠিত বিভিন্ন বাহিনী মানুষের কাছে ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, লুটপাট ও সন্ত্রাসের প্রতিভু হিসাবে পরিচিত হয়ে পড়েছে। আমাদের সমাজে বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করার রীতি পরিত্যক্ত হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। নকলপ্রবণতার বিস্তৃতি শিক্ষার মানকে চরমভাবে অবনমিত করেছে। শিক্ষা, সিভিল প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা সর্বত্র দলীয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ জাতির মেরুদণ্ডকে ভেঙ্গে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের চর্চা এবং মৌলিক মানবাধিকার থেকে মানুষ এখন বঞ্চিত।
নোভাক বাংলাদেশের উপর লিখিত তার সর্বশেষ পুস্তকে (Bangladesh: Reflection on water) বাংগালীদের সম্পর্কে লর্ড মেকলের একটি উদ্ধৃতি সংযোজন করেছেন, উদ্ধৃতিটি হচ্ছে “মহিষের যথা শৃঙ্গ, মৌমাছির যথা হুল, ব্যাঘ্রের যথা থাবা, নারীর যথা সৌন্দর্য বাংগালীর তদ্রƒপ প্রবঞ্চনা; বড় বড় প্রতিজ্ঞা তথা প্রতিশ্রুতি, মোলায়েম অজুহাত অবস্থাগত মিথ্যা প্রমাণাদির বিশদ উপস্থাপনা, ছলচাতুরী, মিথ্যা শপথ, মিথ্যা সাক্ষ্য দান, জালিয়াতি- এইগুলো হচ্ছে নি¤œ গাঙ্গেয় উপত্যকার বাসিন্দাদের আত্মরক্ষা এবং আক্রমণের চিরন্তন অস্ত্র।”
লর্ড মেকলের উপরোক্ত উপলব্ধির আলোকে পাঠকরা আমাদের চরিত্র যাচাই করে দেখতে পারেন। আমাদের কারুর না কারুর চরিত্রের সাথে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য অবশ্যই মিলে যাবে বলে আমি মনে করি।
ড. মোঃ নূরুল আমিন

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

নতুন নির্বাচন নিয়ে কথা


উজ্জ্বল প্রভাতের পূর্বে রাত যেমন গভীর ও অন্ধকার হয়, তেমনি আমাদের ওপর নেমে এসেছে জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকারের গুম, খুন, হামলা, মামলা ও নির্যাতনের স্টিমরোলার। একদলীয় বাকশালের পরিণতি সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। তা তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হওয়া এ দেশের জন্য, এ দেশের মানুষের জন্য, এমনকি আওয়ামী লীগের জন্যও ভালো ফল বয়ে আনেনি। আমাদের সবার রাজনীতি যেহেতু দেশের কল্যাণার্থেই হওয়া উচিত, তাই মানুষকে সঙ্গে নিয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনার দিকে যাত্রা না করে কেন আমরা আবার সেই অরাজক অতীতে ফিরে যাবো?
সম্প্রতি জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনাকালে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেছেন, নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারই থাকতে হবে এমন নয়, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকারের অধীনেও নির্বাচন হতে পারে। তার এই বক্তব্য নির্বাচন নিয়ে অনেকে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। কেউ ব্যাখ্যা করেছেন যে, আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে পিছু হটেছেন। কেউ বলেছেন, আসলে খালেদা জিয়া ভিন্ন নামে তত্ত্বাবধায়কই চাইছেন। কারও মতে, বিএনপি যখন বুঝতে পেরেছে, নির্বাচন হলে তারাই জিতবে, তখন শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতেও তাদের আপত্তি থাকার কথা নয়।
২০০৬ সালে সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতি কে. এম. হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগ মেনে নেয়নি। অভিযোগ করা হয়েছিল বিচারপতি কে.এম. হাসান বিএনপিপন্থী। অথচ ২০১৩ সালে শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হয়েছেন, তিনি কেবল অনিরপেক্ষই নন, খোদ আওয়ামী লীগের প্রধান। কোন ভরসায়, কিসের ভিত্তিতে বিএনপি বা অন্য যে কোনো দল শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার আবশ্যকতা ছিল?
আমার স্বদেশ এখন- ‘বাংলাদেশ নামের জেলখানা’। পুরো বাংলাদেশ এখন কার্যত একটা অন্তহীন কারাগার। ভিন্ন অর্থে জল্লাদখানা বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। আর এ অবস্থার জোরালো সূচনা করা হয়েছে ২০১৩ সালের ২৫ অক্টেবর থেকে। ১০ম সংসদের তফসিল ঘোষণার পর এ ক’দিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল একশ’, আহতের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজারের ঘর অতিক্রম করেছিল। মামলার সংখ্যা বেশুমার, গুমের তালিকা বাড়ছে। এভাবে পাখিরমতো গুলী করে মানুষ হত্যার নজির এই দেশে এর আগে কখনো দেখা যায়নি। বর্বর পাকিস্তানী ও তাদের দোসরদের যুদ্ধকালীন গণহত্যার ঘটনাগুলো যেন এখনও হার মানছে। আওয়ামী লীগ এবং গৃহপালিত বামপন্থীরা প্রথম মুক্তিযুদ্ধ অসমাপ্ত রেখেই দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা কেন তার কোনো সদুত্তর নেই।
‘দালাল’ খতম করার এই রক্ত উৎসব কোন ধরনের মুক্তিযুদ্ধ তারও ক্যামেস্ট্রি বুঝতে অক্ষম। মুক্ত মানুষকে রাষ্ট্রশক্তির জোরে, জনগণের খাজনা ট্যাক্সের টাকায় লালিত পালিত পুলিশ-র‌্যাব দিয়ে হত্যা করিয়ে সরকার কাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে! সীমান্ত অরক্ষিত রেখে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী বিডিআর যা কি না এখন বিজিবি তাদের দিয়ে বিরোধী দল দাবড়ানোর এই খেলাও জনগণকে দেখতে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন, দুদক ও অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থা অসহায়ের মতো আত্মসমর্পণ করে বসে আছে।
তারা শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন করছে-সরকার যেন দেশের প্রতিটি নাগরিকের দণ্ডে মুণ্ডের মালিক সেজে তাদের নিঃশর্ত আনুগত্য আদায় করতে চায়। অবস্থা এমন যে হয় পোষ মানতে হবে, নয়তো গুলীর মুখে ঝাঁঝরা হয়ে যেতে হবে-এ ধরনের বর্বরতার নজির পৃথিবীর অন্য কোনো স্বৈরতান্ত্রিক দেশে পাওয়া যাবে কি?
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, আমেরিকার জন কেরি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যেকোনো প্রতিনিধির অভিমত ও পরামর্শকে দেখা হচ্ছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের দৃষ্টিতে। বাংলাদেশের শাসকদের আচরণ মিসরের সাবেক ও বনেদি একনায়কদের দম্ভ-অহমিকাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের খ্যাতিমান ও নামী-দামি পত্রিকাগুলোর মন্তব্য নিয়ে আমাদের শাসনকর্তারা টিপ্পনি কাটেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরামর্শ নিয়ে বিদ্রুপ করেন।
আগে জানতাম খলের ছলের অভাব হয় না। এখন দেখছি শাসকের ছলনারও শেষ নেই। এখন ক্ষমতার কোনো ব্যাকরণ থাকতে হয় না। আইন মানতে হয় না। কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। জনগণকে এভাবে ছাগল ভেড়া ভেবে কোনো দেশের সরকারই এমন যুক্তিহীন আচরণ করে না। এখন আইন আদালতের কাছে তো বটেই জনগণের সামনে কোনো কৈফিয়ত দিতে হয় না। এরপরও ক্ষমতার লোকদের দেশপ্রেম নাকি উথলে উঠছে। সংবিধানের মায়াকান্না থামছে না। গণতন্ত্র প্রেমের বিলাসী তাজমহল গড়তে তাদের যেন জুড়ি নেই।
দেশের সব মানুষের মানবিক অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায়নি। বস্তুত সম্মানিত লোকেরা এই সরকারের আমলে অতীতে যেভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন- তারা অবশিষ্ট সম্মানটুকু নিয়ে বাঁচতে চান। এই দেশের ভিন্ন মতাবলম্বী সব বুদ্ধিজীবী, সুশীল, এনজিও ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী- বার বার ক্ষমতার সংযমহীন লকলকে জিহ্বা থেকে নিঃসরিত বিষাক্ত লালায় ভিজেছেন। তারা আর কোনো বিড়ম্বনাকে আমন্ত্রণ জানাতে চান না। কেউ বোবা হয়ে থাকাকে ভাবছেন নিরাপদ। কেউ দৃষ্টির আড়ালে পড়ে থাকাকে ভাবছেন সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষার একটা উপায়। এটাই গণতন্ত্রহীন অন্ধকার রাজনীতির বড় আলামত। এভাবে আত্মগোপন বা স্বেচ্ছা নির্বাসনের পথ ধরা কতটা সমীচীন এবং বিবেকের সাথে প্রতারণা কি না সেই প্রশ্ন এখন গৌণ।
দেশবাসী দেখছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে ফায়দা তুলতে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর-দোকানপাটে হামলার জন্য সরকারের পেটুয়া বাহিনী কি ভূমিকাই না পালন করছে? সাম্প্রদায়িক উস্কানির এই কুৎসিত খেলার দায় চাপানো হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর। ঠান্ডা মাথায় গুলী করে দোষ দেয়া হচ্ছে বিরোধী দলের মাঠকর্মীদের ঘাড়ে। সরকারের লোকজনের যেকোনো কর্মকা-ে  প্রতিপক্ষের সব প্রতিবাদ নাশকতা, সহিংসতা, পাশবিকতা, নৃশংসতা। বোমা ছুড়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে সরকারি দলের কর্মী, নাম হয় বিরোধী দলের। শহীদ মিনার ভাঙতে গিয়ে ধরা পড়ে সরকার অনুগত কর্মী, দোষ চাপে মৌলবাদের ওপর। বোমার কারখানার সন্ধান মিলে পুলিশকে দিয়ে তোতা পাখিরমতো বলানো হয়, বিরোধী দলের বিপক্ষে। বোমা বানাতে গিয়ে হাতের কব্জি উড়ে যায় সরকারি দলের লোকদের, দোষ চাপানো হয় বিরোধী পক্ষের ওপর। পুলিশের জ্যাকেট পরে, বন্দুক হাতে, পুলিশের কাতারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালনরত বিরোধী দলের কর্মীদের গুলী ছুড়ে সরকারদলীয় ক্যাডার, জাতীয় দৈনিকে ছবি ছাপা হয়, কারো কোনো টনক নড়ে না।
একসময় এ ধরনের বাড়াবাড়ির কারণে সর্বহারা চরমপন্থীরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নক্সালবাদের জন্ম নিয়েছে। চারু মজুমদাররা অস্ত্রহাতে লড়েছেন আমৃত্যু। ভারতে সেই খ- যুদ্ধের চিত্র কয়েক বছর আগেও ছত্রিশগড়ে প্রত্যক্ষ করা গেল। আমাদের উত্তর ও দক্ষিণ জনপদে সর্বহারাদের তৎপরতা সবার জানা। এখন জনমনে, পেশা নির্বিশেষ সর্বস্তরে, এমনকি প্রশাসনেও অজানা আতঙ্ক গ্রাস করেছে। দেশ যেভাবে কারাগার ও নিপীড়নের দোজখখানায় রূপান্তরিত হয়েছে, রাষ্ট্রের সন্তানতুল্য নাগরিক হত্যা করে যেভাবে পৈশাচিক উল্লাস ও ক্ষমতার দম্ভ জাহির করা হচ্ছে তাতে আমাদের জাতির ভাগ্য বিড়ম্বনা, জনগণের দুর্গতি ও শাসককুলের মন্দ বরাতের কোনো হেরফের হওয়ার কথা নয়। সব প্রহসন ও তামাশার একটা জের আছে, সব হিংস্রতারও একটা পরিণতি আছে। জোর জবরদস্তির ক্ষমতারও শেষ আছে। সব বাড়াবাড়ির একটা পরিসমাপ্তি আছে। সাধারণ মানুষ, দোকানী থেকে খেটে খাওয়া মুটে মজুর, সবার আহাজারি- হে মহাশক্তিমান ও শাশ্বত সত্যবাদীদের প্রভু, এই সরকারের অন্যায্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হিংসাত্মক রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত এই জনপদ থেকে উদ্ধার করো। ত্রাণকর্তা পাঠাও এবং জুলুম-অত্যাচার, নিপীড়ন ও দুঃশাসনের কারাগার থেকে মুক্ত করো। এই আহাজারির আওয়াজ আরশের প্রভুর দরবারে পৌঁছে গেলে রহমত কিংবা গজব দু’টোই অনিবার্য হয়ে যাবে।
বিশ্বসম্প্রদায় ‘না’ বলা শুরু করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কূটনীতিকরা ২০১৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্মৃতিসৌধে গরহাজির থেকে জানান দিলেন- তারা কী ভাবছেন। ২২ ডিসেম্বর ২০১৩ কমনওয়েলথ মহাসচিব এক চিঠিতে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছিলেন। কমনওয়েলথ মহাসচিবের চিঠিতে বলা হয়- নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ না থাকায় তারা ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন না। ২ ডিসেম্বর ২০১৩ নির্বাচন কমিশন থেকে কমনওয়েলথ মহাসচিবের কাছে পর্যবেক্ষক পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
একই কারণ দেখিয়ে ২০ ডিসেম্বর ২০১৩ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথা জানায়। ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক ও নিরাপত্তা নীতিমালা সংক্রান্ত জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি ক্যাথরিন অ্যাস্টনের মুখপাত্র ব্রাসেলসে থেকে এক বিবৃতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার কথা ছিল।  ২৩ ডিসেম্বর ২০১৩ মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জেন সাকি এক বিবৃতিতে জানান, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না যুক্তরাষ্ট্র। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা এবং অর্ধেকের বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।
জেন সাকি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে-এমন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের জন্য নিজেদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরার একটি সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় সংসদের অর্ধেকেরও বেশি আসন প্রতিদ্বন্দ্বীহীন হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, এমন একটি নির্বাচন আয়োজনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচনের জন্য পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। পরে অনুকূল পরিবেশে আমরা আমাদের নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠাতে তৈরি আছি।’
সাকি বলেন, সংলাপ অব্যাহত রাখা এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য যথোপযোগী সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা দ্বিগুণ ত্বরান্বিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রধান দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র বলেন, একটি সহিংসতামুক্ত ও ভীতিমুক্ত পরিবেশে নিজেদের জাতীয় প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ বাংলাদেশের মানুষের প্রাপ্য। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং যারা নেতৃত্ব প্রদানের আকাক্সক্ষা পোষণ করেন, তাদের আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। সহিংসতা, উস্কানিমূলক বক্তব্য ও ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকতে হবে। সব রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশী নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনুপ্রাণিত করে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, সব দলের ও বাংলাদেশী নাগরিকদের অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের  মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই মতামত প্রকাশের সুযোগ প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। একইভাবে এই সুযোগ শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা বিরোধী দলের দায়িত্ব।
১৪ ডিসেম্বর ২০১৩ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী জোটনেত্রী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘মানুষের জীবন নিয়ে খেলা বন্ধ করেন। জামায়াতকে নিয়ে তা-ব ঘটাচ্ছেন। ভাবছেন, অনেক কিছু করে ফেলবেন। বাংলার মানুষ তা মেনে নেবে না। অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি। মা-শিশুকে একসাথে হত্যা করবেন। তা বসে বসে দেখবো না। তা সহ্য করবো এটা হয় না। আমরা আরো কঠোর হবো।’
প্রধানমন্ত্রী আরো কঠোর হওয়ার ঘোষণার পর দিনই মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, দেশের যেসব জেলায় সহিংস ঘটনা ঘটেছে সেসব জেলায় যৌথবাহিনীর অভিযান চালানো হবে। সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখাতে বলা হয়। বনমন্ত্রী হাসান মাহমুদ তো দেখামাত্র গুলীর নির্দেশের কথাই বলেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হানিফ তার দলীয় কর্মীদের দেশের সর্বত্র সরকার বিরোধীদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।
জিবলু রহমান 

শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

এমনই সব এমপি-মন্ত্রী

জেনারেল মইনউদ্দিন আহমেদের ছদ্মবেশী সামরিক সরকারের পরিকল্পনা মোতাবেক ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। অভিযোগটি আমার নয়, এটি আমাদের জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। আরো ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, যখন এই আঁতাত হয়, তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুল জলিলই। অর্থাৎ ওই ক্ষেত্রে তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সে নির্বাচনে কাকে জয়ী করা হবে, কাকে হারিয়ে দেয়া হবে, সে ছকও নাকি আগে থেকেই নির্ধারণ করা ছিল। আর সে সময় জেনারেল মইনের সহযোগী ছিল মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন।
সে নির্বাচন কমিশনেরও কাজ ছিল শুধু একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। কিন্তু আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় এবং জেনারেল মইন মনোনীত ওই নির্বাচন কমিশন সে দিকে মনোযোগ দেয়ার অবকাশ কমই পেয়েছে। দেখা গেল, নির্বাচনের বদলে তাদের প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়ায় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো ভেঙে দিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করা, যাতে ওই প্লাটফরমের ওপর দাঁড়িয়ে মইন ক্ষমতা দখল করতে পারেন। শুরুতে শেখ হাসিনা জেনারেল মইনের শাসনের প্রতি এই আশায় দ্ব্যর্থহীন সমর্থন ঘোষণা করেছিলেন যে, মইন যেভাবে পারেন, যেন বিএনপিকে একেবারে নাস্তানাবুদ করে দেন। এতে যদি কোনো বাড়াবাড়ি হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে আইন প্রণয়ন করে ইনডেমনিটির মাধ্যমে তার দায়মুক্তির ব্যবস্থা করে দেবে। কী চমৎকার একটি গণতান্ত্রিক দল!
সে সময় সামরিক সরকারের কৃপায় নিয়োজিত এবং এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে ভিন্ন এজেন্ডা দেয় জে. মইনের সামরিক সরকার। সে এজেন্ডা বাস্তবায়নেই কাজ করেছেন তারা। এখন টেলিভিশনের টকশোগুলোতে, গোলটেবিল বৈঠকে তাদের আলোচনায় বড় বড় কথা শুনি, যা রীতিমতো হাস্যকর। কারণ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেয়েও তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে টুকরো টুকরো করে দেয়া। তেমনিভাবে, কোনো দলের সম্পাদক বা নির্বাহী সদস্য কে হবেন, না হবেন, কাকে রাখতে হবে, কাকে বাদ দিতে হবে, সেটাও নির্ধারণ করতে শুরু করে ওই নির্বাচন কমিশন। তবে শেষ পর্যন্ত মইনের অথর্ব সরকার রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হয়। তারা নিরাপদ প্রস্থানের পথ খুঁজতে শুরু করেন। আর সে পথের দিশাই তারা দেখে আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাতের মধ্যে। দুই বছরের দুঃশাসনে তারা বিএনপির ওপর যে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছিল, তাতে বিএনপির সাথে আঁতাতের কোনো সম্ভাবনাই তাদের ছিল না।
২০০৮ সালের নির্বাচনেও ব্যাপক দুর্নীতি-কারচুপি হয়েছে। আর তা হয়েছে তালিকা ধরে ধরে বিশেষ দল ও তার সহযোগীদের জেতাতে গিয়ে। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ১১০ শতাংশেরও বেশি। মনে হচ্ছিল যেন ভূতে ভোট দিয়ে গেছে। কিন্তু শামসুল হুদা ও তার সহকর্মীরা এ বিষয়ে ছিলেন একেবারে নীরব। বিএনপির প্রার্থীরা যখন ভোটকেন্দ্রের পাশ থেকে ফেলে দেয়া ব্যালট পেপারের মুড়ি উদ্ধার করে আনলেন, যখন বাচ্চাদের কাছেও পাওয়া যেতে থাকল সেসব মুড়ি, তখন ওই বশংবদ নির্বাচন কমিশন নিজেদের দুর্নীতি ঢাকতে আইন করে দিলো যে, মুড়ি যার কাছে পাওয়া যাবে, তাকেই গ্রেফতার করা হবে। বলিহারি নির্বাচন কমিশন। এখন তাদের বড় বড় কথা বলতে কোনো লজ্জা দেখা যায় না। যা হোক, সেভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও সামরিক শাসকদের মধ্যে আঁতাতের নির্বাচন, যে কথা ফাঁস করে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম আবদুল জলিল। ওই নির্বাচনের মাধ্যমেই তখন ক্ষমতাসীন হয়েছিল আওয়ামী লীগ। আর আঁতাতের কথা ফাঁস করে দিয়ে দলীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ হারান আবদুল জলিল। এ দিকে, সামরিক শাসকদের দেয়া কথা রেখেছেন শেখ হাসিনা। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর যে কর্মকর্তারা ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তাদের সব পাপের, সব অপরাধের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে।
সেই নির্বাচনে কারা জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হবেন, সেনাবাহিনীর নেতৃস্থানীয়দের তাতে কিছু ভূমিকা ছিল। কিন্তু সংবিধান সংশোধন করে গোটা ব্যবস্থাকে ২০১৪ সালে এমন তছনছ করে দেয়া হয় যে, এতে গোটা নির্বাচনব্যবস্থাই ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার তার আগের ১৫ বছর ধরে পরীক্ষিত, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ধারায় ছেদ টেনে দেয়। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিলো। সে ক্ষেত্রে যে যুক্তি দেয়া হয়, তা ছিল খুবই ঠুনকো আর অগ্রহণযোগ্য। কারণ তারা বললেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থাই ডেকে আনে। কিন্তু ২০০৭ সালের অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারণে আসেনি। অযৌক্তিক দাবি আর হীন উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগই মঈন-ফখর সরকার ডেকে এনেছিল বলে শেখ হাসিনাই দাবি করেছেন। অনর্থক সেই দাবির শরিক হয়েছিলেন একটি ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক। এখন তার জন্য তিনি প্রতিদিন কাফফারা দিচ্ছেন।
সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলে আওয়ামী লীগের সমর্থনের লক্ষ্য কারো কাছে অস্পষ্ট ছিল না। আর তা হলো, দেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলকে বাকশালী কায়দায় শেষ করে দিয়ে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে জনগণকে শাসন করা। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান যা সংবিধান সংশোধন করে করতে চেয়েছিলেন, তার কন্যার সরকার তা করতে চাইল বল প্রয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু এতে বিপদ সমানই থাকছে কিংবা তা আরো বেশি মারাত্মক হচ্ছে। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক তার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক আহমদ ছফাকে। তিনি বলেছিলেন, সেভেন্টি টুতে ইউনিভার্সিটির কাজে তাঁর লগে একবার দেখা করতে গেছিলাম। শেখ সাহেব জীবনে অনেক মানুষের লগে মিশছেন ত আদব লেহাজ আছিল খুব ভালা। অনেক খাতির করলেন। কথায় কথায় আমি জিগাইলাম, আপনার হাতে ত এখন দেশ চালাইবার ভার, আপনে অপজিশনের কী করবেন। অপজিশন ছাড়া দেশ চালাইবেন কেমনে? জহরলাল নেহরু ক্ষমতায় বইস্যাই জয়প্রকাশ নারায়ণরে কইলেন, তোমরা অপজিশন পার্টি গইড়্যা তোল। শেখ সাহেব বললেন, আগামী ইলেকশানে অপজিশন পার্টিগুলা ম্যাক্সিমাম পাঁচটার বেশি সিট পাইব না। আমি একটু আহত হইলাম, কইলাম, আপনে অপজিশনরে একশো সিট ছাইড়্যা দেবেন না? শেখ সাহেব হাসলেন। আমি চইল্যা আইলাম। ইতিহাস শেখ সাহেবরে স্টেটসম্যান হইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না। (উদ্ধৃত, যদ্যপি আমার গুরু)।
দুই.
খুব সঙ্গত কারণেই বলা যায়, আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল আসুক, তা চায়নি। ফলে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় একদল মেরুদণ্ডবিহীন ব্যক্তিত্বহীন আত্মমর্যাদাশূন্য লোককে। তাদের নেতা করা হয় একান্ত বশংবদকে। দলীয়করণ করা হয় প্রশাসন-পুলিশ-র‌্যাবকে। গ্রেফতার করা হয় বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের। হামলা-মামলা, হুলিয়া জারি করা হয় হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। সরকার এসব সুবিধা নিয়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যাতে বিরোধী দল নির্বাচনে আসতেই না পারে। আসেনি বিরোধী দল। এটাই সম্ভবত চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। নির্বাচন বর্জন করেছিল বিরোধী দল। ফলে শেখ হাসিনা এমন সব লোককে জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য মনোনয়ন দিলেন, যাদের বেশির ভাগেরই ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হওয়ারও যোগ্যতা নেই বলে দেশের মানুষের ধারণা। তার ফলে মাস্তান-চোরাচালানি-আদমপাচারকারী ধরনের কিছু লোকও সংসদ সদস্য হয়ে আসেন পার্লামেন্টে। ১৫৩ আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। নির্বাচনই হয়নি। তাদের নাম শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আবার এদের মধ্য থেকেই বিতর্কিত কয়েকজনকে নিয়োগ করা হয়েছে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী হিসেবে। যা হোক, আপাতত সবচেয়ে সফল কক্সবাজারের এমপি বদি। সরকারি প্রশাসনিক কর্মতর্কাদের কিল-ঘুষি-লাথি মেরে তিনি অনেক খ্যাতি অর্জন করেছেন। সরকারি কর্মকর্তারা যতই আওয়ামী লীগার হোন না কেন, তারা বদির মতো লোকের লাথি খেতে প্রস্তুত আছেন কি না, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মনে রাখা দরকার, শেখ মুজিবের খুনি মেজর ডালিম বেগম মুজিবকে মা ডাকতেন আর ডালিমের স্ত্রী শেখ রেহানার বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিতেন। কিন্তু স্ত্রীর গায়ে যখন হাত পড়ল, তখন ডালিম সেসব কথা মনে রাখতে পারেননি। সর্বশেষ, গত ১২ আগস্ট বদি পিটিয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলীকে। ১২ আগস্টই নাটোর-২ আসনের আওয়ামী এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুল র‌্যাবের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন হ্যান্ডকাফ পরানো অপরাধী রেদওয়ান সাব্বিরকে। পরে এমপির সাথে সবার সামনে এসে হ্যান্ডকাফহীন সাব্বির এসে হাজির হন।
এমপি বদি তার অপকর্মের জন্য যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে আওয়ামী শীর্ষস্থানীয়দের প্রিয়ভাজন হয়েছেন। ইয়াবা চোরাচালানেও তার নাম শীর্ষে। কক্সবাজারের সাম্প্রতিক সমুদ্রপথে আদমপাচারেরও তিনি মহানায়ক বলে অভিযোগ আছে। এখন অনেকেই তার পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। সর্বশেষ খেল দেখিয়েছেন ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। তার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ২৬-৩০ মে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অনুষ্ঠিত ফিফার ৬৫তম কংগ্রেসে অংশ নেয়। কংগ্রেসশেষে প্রতিনিধিদলের অন্যরা দেশে ফিরলেও ফেরেননি মোহাম্মদ সেলিম নামের এক ব্যক্তি। তাকে বিয়ানিবাজার স্পোর্টিং কাবের সদস্য পরিচয়ে সুইজারল্যান্ডে নিয়ে যান উপমন্ত্রী। তিনিই ছিলেন তার গ্যারান্টার। তিনি তার যাওয়া-আসা থাকা-খাওয়ার সব দায়িত্ব নিয়ে সুইস অ্যাম্বেসিতে চিঠি লেখেন তাকে ভিসা দেয়ার জন্য। ফিরে এসে সশরীরে সুইস অ্যাম্বেসিতে রিপোর্ট করার শর্তে সেলিমকে ভিসা দেয়া হয়েছিল। এখন সন্দেহ করা হচ্ছে, উপমন্ত্রী অর্থের বিনিময়ে ওই আদমকে সুইজারল্যান্ডে পাচার করেছেন। আর বিয়ানীবাজার স্পোর্টিং কাব নামে কোনো কাবের অস্তিত্বই নাকি নেই।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর কি কোনো জবাব আছে?
পাদটীকা
সত্তরের দশকের একেবারে শেষের দিকে আমার বছর দশেকের জুনিয়র একদল ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। তত দিনে আমার মাস্টার্স শেষ। ছিলাম পরবর্তী পড়াশোনায়। ওদের কেবল ফার্স্ট ইয়ার শুরু। দ্রুতই তারা আমার বন্ধু হয়ে যায়। এরা ক্রিয়েটিভ ধরনের দুষ্টু ছিল। মেয়েরা ছেলেদের এবং ছেলেরা মেয়েদের ভালোবাসতে বাসতে দাগা দিয়ে চলে যায়। এটা আদিকাল থেকেই হয়ে আসছে। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পড়য়া আমার তরুণ বন্ধুরা দল বেঁধে আড্ডা দিত। আর দাগা দেয়া মেয়ে দেখলে একযোগে আওয়াজ দিত, বইন তোরা পারস্ও। ওদের এমন রসিকতায় লাইব্রেরির সামনে বসে হাসতাম। বলতাম, এই, এসব কী করেন। ওরা আমাকে বুইড়্যা বলে টিটকারি দিত। 
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

২৭ মাস পর তিন বছরের সাজা


পাঠকরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, বহুদিন ধরে দেশের রাজনীতি থেকে অনেক দূরে রয়েছি। শখ বা ইচ্ছা করে নয়, আসলে ভয়ের কারণে। এই ভয় পাওয়ার পেছনে ‘অবদান’ রেখেছেন দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান যাকে ‘চান্স সম্পাদক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেউ কেউ আবার একথাও বলেছেন, তিনি নাকি ‘ঠিক’ সাংবাদিক নন! সেই মাহমুদুর রহমানকে গত ১৩ আগস্ট দুদকের একটি সাজানো মামলায় তিন বছরের কারাদ- দিয়েছে আদালত। এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। টাকাটা না দিলে তাকে আরো এক মাস কারাগারে কাটাতে হবে। যেহেতু আদালতের ব্যাপার সেহেতু এ প্রসঙ্গে কথা না বাড়ানোই ভালো, যদিও তার আইনজীবীরা বলেছেন, মাহমুদুর রহমান ন্যায় বিচার পাননি। দুদক নাকি ভুয়া সাক্ষী পর্যন্ত হাজির করেও নিজেদের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। একই কারণে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন মাহমুদুর রহমানের আইনজীবীরা। সুতরাং এই সময়ে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
তবে কিছু কথা  আবার না বলেও পারা যায় না। প্রাসঙ্গিক একটি বড় কথা হলো, বিগত কয়েক বছরে গ্রেফতার এবং রিমান্ড দুটিরই প্রধান উদাহরণ হয়ে উঠেছেন ‘বেচারা’ মাহমুদুর রহমান। একটি মামলায় সাজা এতদিনে দেয়া হলেও ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল সকালে কমান্ডো স্টাইলে অপারেশন চালিয়ে সরকার আমার দেশ অফিস থেকে গ্রেফতার করেছিল তাকে। মূলত গুম হওয়ার ভয়ে ১১৯ দিন ধরে অফিসে কাটাচ্ছিলেন তিনি। কি এমন ‘অপরাধ’ করেছিলেন, যার কারণে তাকে বাসা-বাড়ি ফেলে অফিসে কাটাতে হচ্ছিল? কারণটি ছিল ‘আন্তর্জাতিক’ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন সাবেক বিচারপতির কিছু স্কাইপ সংলাপ প্রকাশ করে দেয়া। এসব সংলাপে ওই সাবেক বিচারপতি বিদেশে বসবাসরত একজন কথিত আইনজ্ঞের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে সবিস্তারে মতবিনিময় করেছিলেন।
সবই হয়তো ঠিকঠাকই থাকতো কিন্তু এরই মধ্যে সে সংলাপের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী দি ইকনোমিস্ট। সাময়িকীটি স্কাইপ সংলাপ প্রকাশও করে দিয়েছিল। মাহমুদুর রহমানের ‘অপরাধ’, তিনি দি ইকনোমিস্ট-এর প্রকাশ করা সংলাপের কিছু বিশেষ অংশ দৈনিক আমার দেশ-এ ছাপিয়েছিলেন। ক্ষমতাসীনদের জন্য এটুকুই অবশ্য যথেষ্ট ছিল। তেজগাঁও থানায় মাহমুদুর রহমানের নামে মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন তারা। অভিযোগও যেমন-তেমন ছিল না, সোজা রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন মাহমুুদুর রহমান। অন্যদিকে সিনিয়র আইনজীবীসহ বিশেষজ্ঞরা কিন্তু আইনের ধারা-উপধারা উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন, স্কাইপ সংলাপ প্রকাশ করার মাধ্যমে মাহমুদুর রহমান কোনো অপরাধই করেননি। এর একটি কারণ, বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগানো ‘উইকিলিক্স’ থেকে ভারতের ‘তেহেলকা ডট কম’ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অসংখ্য সংস্থা বহু বছর ধরে এ ধরনের সংলাপ এবং রাষ্ট্রীয় গোপন নথিপত্র প্রকাশ করে চলেছে। দ্বিতীয় কারণ, আমার দেশ-এরও আগে স্কাইপ সংলাপ দি ইকনোমিস্টসহ বিদেশী গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সুতরাং এ নিয়ে কোনো মামলা চলতে পারে না। তৃতীয়ত, স্কাইপ কেলেংকারীর প্রধান নায়ক এবং ‘আন্তর্জাতিক’ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক ওই বিচারপতি সব দায়িত্ব স্বীকার করে পদত্যাগ করায় অভিযোগের সত্যতাই শুধু প্রমাণিত হয়নি, মামলার মেরিটও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চতুর্থত, মামলা করতে হলে ওই বিচারপতিকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো দরকার, যিনি সংবিধান ও চাকরির শপথ ভঙ্গ করে মামলার গোপন তথ্য ফাঁস করেছিলেন অভিযোগ এনে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে ছেড়েছে। মামলাও দিয়েছেন রাষ্ট্রদ্রোহের! অথচ স্কাইপ সংলাপ বা কোনো তথ্য প্রকাশ করার কারণে আর যা-ই হোক, রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অভিযোগে মামলা করা যায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীনরা এই সহজ কথাটুকু না বোঝার ভান করেছেন।
এজন্যই ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল গ্রেফতার করা হয়েছিল মাহমুদুর রহমানকে। কথা শুধু সে কারণে ওঠেনি। সেদিনই একদিকে আরো তিনটি মামলায় ১৩ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল তাকে, অন্যদিকে  রাতের বেলায় পুলিশকে দিয়ে আমার দেশ-এর ছাপাখানায় তল্লাশির নামে ‘গণতান্ত্রিক’ ডাকাতি করিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন আমার দেশ-এর ছাপাখানা। এরপর পত্রিকাটি ছাপানো হচ্ছিল আল ফালাহ প্রিন্টিং প্রেসে। কিন্তু আইনসম্মতভাবে হলেও সরকার শুধু ছাপানো বন্ধ ও পত্রিকা জব্দ করেনি, দৈনিক সংগ্রাম-এর সম্পাদক, প্রবীণ সাংবাদিক আবুল আসাদ এবং মাহমুদুর রহমানের মায়ের বিরুদ্ধে মামলাও ঠুকেছিল। পুলিশ একই সঙ্গে ১৯ জন গরীব বাইন্ডারকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এসব পদক্ষেপের ফলে সরাসরি আক্রান্ত আমার দেশ-এর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে। সংবিধানে নিষেধ থাকায় সরকার অবশ্য আমার দেশকে ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করেনি। পা বাড়িয়েছে বাঁকা পথে। তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে প্রেসে।
সরকারের এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে বন্দি অবস্থাতেই অনশন শুরু করেছিলেন মাহমুদুর রহমান। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে জানানো দরকার, রিমান্ডে নিয়ে সরকার মাহমুদুর রহমানকে কিন্তু ‘জামাই আদরে’ রাখেনি। ১৯ এপ্রিল জাতীয় নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট ফরহাদ মজহার হাসপাতালে মাহমুদুর রহমানকে দেখে আসার পর আমার দেশ পরিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, হাত ও পা থেকে শুরু করে শরীরের এমন কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই যেখানে ইলেক্ট্রিক শক দেয়া হয়নি। প্রতিটি স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ব্যাপারে ধারণা পাওয়া গিয়েছিল ১৭ এপ্রিলও। রিমান্ডের মেয়াদ বাকি থাকতেই পুলিশ সেদিন মাহমুদুর রহমানকে আদালতে হাজির করেছিল। পুলিশ কেন তাকে আগেভাগে আদালতে হাজির করেছে এবং কেন আবারও রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানায়নি তার কারণ জানা গিয়েছিল মাহমুদুর রহমানের চেহারা এবং শারীরিক অবস্থা দেখে। নির্যাতনের কারণে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে তখন রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তিনি এমনকি দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে তার জীবন নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছিল। মূলত সে কারণেই তাড়াহুড়ো করে আদালতে হাজির করা হয়েছিল তাকে। একই কারণে মাহমুদুর রহমানকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানায়নি পুলিশ। একজন সম্মানিত সম্পাদকের অবস্থা কেন এতটা শোচনীয় হয়েছে এবং মেয়াদ বাকি থাকতেই কেন তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। বিচারক সোজা তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষও মন্দ দেখায়নি। তারা পরদিন, ১৮ এপ্রিল মাহমুদুর রহমানকে বিএসএমএমইউ তথা সাবেক পিজি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়ে ‘দায়’ সেরেছিল।
অন্য একটি কারণও অবশ্য ছিল। সে কারণ মাহমুদুর রহমানের আমরণ অনশন। তিনটি দাবি আদায়ের জন্য ১৫ এপ্রিল থেকে তিনি অনশন শুরু করেছিলেন ১. তার মা এবং দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার; ২. দৈনিক আমার দেশ-এর ছাপাখানায় পুলিশের লাগানো তালা খুলে দিয়ে পত্রিকার প্রকাশনা বাধাহীন করা; এবং ৩. গ্রেফতারকৃত ১৯ জন বাইন্ডারকে মুক্তি দেয়া। রিমান্ডে নির্যাতনের পাশাপাশি নিজে অনশন করায় গুরুতররূপে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মাহমুদুর রহমান। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, মাহমুদুর রহমানের হৃদস্পন্দন মাত্র ৪৮-এ নেমে এসেছিল, ব্লাড প্রেসার ওঠানামা করছিল ৪৯ থেকে ৯০-এর মধ্যে, শরীরের পটাশিয়াম কমে গিয়েছিল, রক্তে ইউরিয়া ও সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল, একটি কিডনি যথাযথভাবে কাজ করছিল না, প্রস্রাব একেবারেই হচ্ছিল না। তার অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতাও অনেক কমে গিয়েছিল। অর্থাৎ মাহমুদুর রহমান মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের মতে সব মিলিয়ে এমন ছয়টি মারাত্মক রোগেই তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন, যেগুলোর যে কোনো একটির কারণে তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারতো। ওই যাত্রায় বেঁচে গেলেও তিনি আর কখনো সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন যাপন করতে পারবেন না। এজন্যই উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরা বলেছিলেন, অনতিবিলম্বে তার অনশন ভেঙে স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া শুরু করা দরকার। দ্রুত দরকার তাকে প্রতিটি বিষয়ে উন্নত চিকিৎসা দেয়াও।
মাহমুদুর রহমান অবশ্য পুলিশ এবং আদালত ও কারা কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ‘বাঁচিয়ে’ দিয়েছিলেন। হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফির পাশাপাশি সাংবাদিক ও পেশাজীবী নেতাদের অনুরোধে ২২ এপ্রিল সন্ধ্যায় তিনি তার মায়ের হাতে শরবত খেয়ে অনশন ভঙ্গ করেছিলেন। এখানে মাহমুদুর রহমানকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে আপত্তি ও প্রতিবাদের কিছু কারণ লক্ষ্য করা দরকার। তেজগাঁও থানায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি হয়েছিল ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর আর মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল। মাঝখানে দীর্ঘ চারটি মাস কেটে গিয়েছিল। অভিযোগ সত্য হলে অনুসন্ধান ও তথ্য সংগ্রহের জন্য এত বেশিদিন নিশ্চয়ই সময় লাগার কথা নয়। সব তথ্য-প্রমাণই তো পুলিশের কাছে থাকার কথা! বাস্তবে এ থেকেও বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, উদ্দেশ্য আসলে অন্যরকমই ছিল। মাহমুদুর রহমানকে যে মামলাগুলোতে ফাঁসানো হয়েছিল সেগুলোর প্রতিটিই ছিল মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজানো।
ঘটনাপ্রবাহে বিচার বিভাগ ও সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি সরকারের উপেক্ষা এসেছিল দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে। কারণ, বিশেষ করে রিমান্ডের ব্যাপারে সরকার সর্বোচ্চ আদালতের রায় অমান্য করেছিল। উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল দেয়া এক রায়ে হাই কোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সুনির্দিষ্ট দশটি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন। একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কোনো অভিযুক্তকে রিমান্ডে নেয়া যাবে না। রিমান্ডে নিতে হলেও সর্বোচ্চ তিনদিনের বেশি কাউকে রিমান্ডে রাখা যাবে না। তাছাড়া রিমান্ডে নেয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনজীবীর উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। রিমান্ডে নেয়ার আগে ও পরে অভিযুক্তকে ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে, প্রয়োজনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। আইনজীবী ও স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার ও আলোচনা করার সুযোগও দিতে হবে। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রে সরকার সবদিক থেকেই সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি উপেক্ষা দেখিয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসবই সম্ভব হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি ও মনোভাবের কারণে। মাহমুদুর রহমানের জীবন তো মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। দৈনিক আমার দেশ-এর প্রকাশনাও এখনো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আসলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিচার বিভাগ ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব এক প্রতিষ্ঠিত সত্য। রাষ্ট্রের এ দুটি স্তম্ভের স্বাধীন ভূমিকার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের ন্যক্কারজনক নীতি ও মনোভাবের প্রমাণ অতীতেও বহুবার পাওয়া গেছে। সে একই নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও বিচার বিভাগ ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণতন্ত্রসম্মত অবস্থান নেয়নি। বিস্তারিত উল্লেখের পরিবর্তে এখানে মাহমুদুর রহমানের উদাহরণ স্মরণ করলে দেখা যাবে, সরকারের চাপে বিচারকরাও কতটা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। যেমন ২০১০ সালে প্রথম দফা রিমান্ডে নির্যাতিত হওয়ার পর আদালতে দাঁড়িয়ে মাহমুদুর রহমান তাকে ‘বাঁচানোর’ জন্য বিচারকের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমাকে বাঁচান!’ কিন্তু যে সম্পাদকের নেতৃত্বে দৈনিক আমার দেশ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সব সময় কলম যুদ্ধ করেছে সে সম্পাদককেই সেবার রীতিমতো একজন ‘বেচারা’ বানিয়ে ফেলা হয়েছিল!
প্রসঙ্গক্রমে বিশেষ করে আলোচিত হয়েছিল রিমান্ডের বিষয়টি। কারণ, মাহমুদুর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি নন, সরকারের ইচ্ছায় নিম্ন আদালত প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্যজনের রিমান্ড মঞ্জুর করে চলেছে। অথচ রিমান্ডে নেয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তথ্য জানার জন্য। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় প্রত্যেককেই শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকার এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাও মানছে না যে কথাটা আগেই জানানো হয়েছে। দেখা গেছে, রিমান্ড মঞ্জুর করা বা না করা সম্পূর্ণরূপে বিচারকের এখতিয়ার হলেও এই সরকারের আমলে বিচারকরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। রাজনৈতিক মামলায় বিচারকদের ওপর নাকি ‘চাপ’ থাকে। এই ‘চাপ’ ক্ষমতাসীনরাই দিয়ে থাকেন। মাহমুদুর রহমানকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহেও পরিষ্কার হয়েছিল, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রতি আওয়ামী লীগ সরকার চরমভাবেই অবজ্ঞা দেখাচ্ছে। এর ফলে বেশি ক্ষতি হয়েছে স্বাধীন বিচার বিভাগের। মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায় বিচার পাওয়া থেকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের স্বার্থেই এ অবস্থার আশু অবসান দরকার। সরকারের উচিত অবিলম্বে মাহমুদুর রহমানকে মুক্তি দেয়া এবং প্রেসের তালা খুলে দিয়ে আমার দেশ-এর প্রকাশনার সব বাধা দূর করা। এতটা অবশ্য বর্তমান সরকারের কাছে আশা করা যায় না। কারণ, গণমাধ্যমের ব্যাপারে তো বটেই বিশেষ করে ব্যক্তি মাহমুদুর রহমান এবং দৈনিক আমার দেশ-এর প্রশ্নেও সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত রয়েছে। একই কারণে মাহমুদুর রহমানকে যেমন সহজে ছেড়ে দেয়া হবে না তেমনি বাজারে আসতে পারবে না দৈনিক আমার দেশও।
আহমদ আশিকুল হামিদ 

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৫

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

নীলাদ্রিরা অবিচারের সৃষ্টি, দুঃশাসনের শিকার

নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পরও আমরা গতানুগতিকতার নিন্দাবাদ ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে আটকে রয়েছি। ব্লগার হওয়া কোনো অপরাধ নয়, তবে ব্লগার হওয়া মানে সবাই মুক্তমনা মানুষ এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। বরং এই দেশে ব্লগার মানে ধর্মবিদ্বেষী ও সাম্প্রদায়িকভাবে অসহিষ্ণুতা লালনকারী কিছু বিকারগ্রস্ত তরুণ। যারা কেউ কোনো ধর্মের বিশ্বাস মাপার যোগ্য নয়। অসংখ্য ব্লগার সমাজে মূল্যবোধের চাষ করছে। তারুণ্যের শক্তিকে ইতিবাচক কাজে লাগাচ্ছে তাদের প্রতি শতকোটি সালাম। সারা পৃথিবীর মানুষ জানে ও মানে মুক্তমনের মানুষ নিজের মতের ব্যাপারে যেমন আন্তরিক, তেমনি অন্যের মতের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল। তারা কারো মতকে ও বিশ্বাসকে আক্রমণ করে না। নীলাদ্রি কেন ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গেল তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। নীলাদ্রির ধর্মবিদ্বেষ গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু তাকে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ইসলাম যারা মানে তারা বিনা বিচারে মানুষ হত্যার মতো মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ করতেই পারে না। কর্তৃপক্ষের উচিত হত্যার কারণ, হত্যাকারীকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা। যারা ধর্মবিদ্বেষ লালন করেন তারা নিরাপদ না হলেও সমাজের জন্য ক্ষতিকর নয়। যারা এই বিদ্বেষ প্রচার করেন এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে আঘাত দেন, তাদের বিশ্বাস নিয়ে যারা বিদ্রƒপ করেন তারা সবার জন্য ক্ষতিকর। এর মাধ্যমে চরমপন্থী ও হঠকারীরা শুধু উসকানি পায় না, সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। সভ্য সমাজেও অনাচার ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ুণœ হয়। পুলিশ প্রধানকে ধন্যবাদ, তিনি ব্লগারদের নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য মন্তব্য করলেন। এ ধরনের বক্তব্য মন্ত্রীরাও দিতে পারতেন। নীলাদ্রিরা জন্ম নেয় না, এদের সৃষ্টি করা হয়। মতলববাজরা এদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। শাসক শোষকেরা এদের ব্যবহার করে। নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য শেষ পর্যন্ত এদের বলি দেয়। দুর্ভাগ্য রাজনৈতিকশূন্যতা ও বিচারহীনতার যে অপসংস্কৃতি সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব আজ বিপন্ন হওয়ার পথে। বিচার না পেলে কিংবা অবিচারের সম্মুখীন হলে মানুষ সংযম হারায়। তার প্রকাশ ঘটে নানা উপায়ে। বিগত সাড়ে তিন বছরে ধর্মের ব্যাপারে অসহিষ্ণু কয়েকজন ব্লগার ছাড়াও ৯৬৮ টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ২০১২ সালের শুরু থেকে ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত শিশুহত্যার এই তথ্যটি দিয়েছে শিশু অধিকার ফোরাম। শিশুহত্যার এই সংখ্যা শুধু বাড়ছে না, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতিও স্ফীত হচ্ছে। নারী ও শিশুসংক্রান্ত প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন পড়ে আছে। কখন এসব মামলার বিচার সম্পন্ন হবে বা বিচার পাওয়া যাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শিশুহত্যা, নারী নির্যাতন, শিশু অপহরণ এবং ধর্ষণপ্রক্রিয়ায় এখন নিষ্ঠুরতা ও বীভৎসতার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তা ব্যক্তির মানবিক বৈকল্য পর্যায় নেই, আদিম সমাজের বর্বরতার নিষ্ঠুরতম স্তরে পৌঁছে গেছে। নীলাদ্রির শরীরে ১৪ ঘা হত্যাকারী কত নিষ্ঠুর তার নজির মেলে। নীলাদ্রির পারিবারিক সঙ্কট এ ধরনের হত্যার কারণ নয় তা আমরা কেউ নিশ্চিত নই। তার স্ত্রীর পরিচয়ে যে নারী মুখ খুলেছিল, সে বিবাহিত নয় বলে তার স্বজনদের বক্তব্য গুরুত্বহীন নয়। সব তথ্য ও সত্য সামনে আসুক। বিচার হোক এ দাবি সবার।
এর সাথে শুধু আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির প্রশ্ন উঠছে না। প্রশ্ন উঠছে আমরা এ ধরনের অমানুষ হয়ে যেতে পারছি কিভাবে! পুলিশের নথিতে সব তথ্য যোগ হয় না। মিডিয়ায় সব খবর আসে না। জরিপগুলোর ভেতরও শুভঙ্করের ফাঁকফোকর থাকে। পুলিশ সদর দফতরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে দুই হাজার ৮০ জন খুন হয়েছে। জানুয়ারিতে ৩২৯, ফেব্রুয়ারিতে ৩০৯ ও মার্চ মাসে ৩৩৭ জন। এপ্রিলে সেই সংখ্যা ৩২৭ জন। মে মাসে ৪২০ জনে পৌঁছে যায়। জুনে এসে সেটা দাঁড়ায় ৩৫৮। জুলাইতে চার শতাধিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ জন খুন হচ্ছে। এর সাথে রাজনৈতিক সহিংসতার সম্পর্ক নেই বলা যাবে না। তবে অধিকার বলছে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭৭ জন গণপিটুনিতে নিহতের খবর বা তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। গণপিটুনির অর্থ মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে।
খ. 
আগেই বলেছিÑ অপরাধের সব তথ্য নথিভুক্ত হয় না। অনেক ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার বাইরে থেকে যায়। এখন অনেক রাজনৈতিক অপরাধ মিডিয়ায় আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তোলে না। আমাদের দেশে ন্যায়বিচার সুবিচার নামে দুটি শব্দ রয়েছে। বাস্তবে বিচার বলতে ন্যায় ও সুবিচারকে বুঝাতে এ ধরনের শব্দ সৃষ্টি করা হলেও এর বাইরে রয়েছে অবিচার। বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষ এখন বাস্তবে এবং সামগ্রিক অর্থে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিচারের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে কি না, এ প্রশ্ন উঠছে। একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন হচ্ছেÑ তদবিরে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা এগিয়ে রয়েছেন। সংবাদ সম্মেলন করে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ অভিযোগ তুলেছেÑ সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করছেনÑ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্টরা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তো রয়েছেই। তাদের এই অভিযোগ পুরনো। তবে তারা কখনো বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলেনি। চট্টগ্রামে বৌদ্ধ পল্লীতে আগুনের ঘটনায় সরকারদলীয় লোকেরা জড়িত রয়েছে প্রমাণ হওয়ার পরও সরকার এটাকে বিরোধী দলকে হয়রানির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের হয়রানির সাথে ক্ষমতাসীনদের লাঠিয়ালরা জড়িত থাকলেও প্রচারণা ও অভিযোগ তোলা হয়েছে বিরোধী দল দমনের কৌশল হিসেবে। 
গ.
কার্যত দেশে গণতন্ত্র নেই। রাজনীতি নেই। ভিন্নমত বিরোধী দলও নেই। ইচ্ছেমতো দল করার অধিকারও কেড়ে নেয়া হচ্ছে। বিনা কারণে গ্রেফতার করে মুচলেকা দিয়ে বলতে বাধ্য করা হচ্ছে কোন দল করা যাবে কোন দল করা যাবে না। ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারার এই মগের মুল্লুক ও বর্গি যুগের নিষ্ঠুরতার ভেতরে যে অবিচার ও জুলুম জনগণকে ঘিরে ধরেছে এর শেষ কোথায়? 
পৈশাচিকতা ব্যক্তির মানসিক রোগ, এটি এক ধরনের মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। এর আসল কারণ ব্যক্তির চিন্তার বৈকল্য, রাষ্ট্রাচারের ভেতর নিষ্ঠুরতার প্রসার ও প্রতিহিংসার রাজনীতি মানুষকে বীভৎস হওয়ার প্রেরণা জোগায়। এটা সামাজিক অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে। বিচারহীনহতার অপসংস্কৃতি এর প্রসার ঘটিয়েছে, আইনের শাসন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণেই মানুষ আইন হাতে তুলে নিয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। যে দেশের মানুষ ভোট দিতে পারে না তারপরও সরকার গঠন হয়, সংসদ বসে, পুতুল খেলার মতো বিরোধী দল সাজানো হয়। সেই দেশে মন্ত্রীদের শপথের নৈতিক ভিত্তি কোথায়। ক্ষমতা যদি লুণ্ঠনের সম্পদ হয় সেই দেশে নাগরিকদের জীবনতো মশা-মাছির চেয়েও অবহেলার বস্তু হবারই কথা।
মানুষ আইন মানে দুকারণে। প্রথমত, বিবেকের তাড়নায় ও নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে। দ্বিতীয়ত, শাস্তি এবং খারাপ পরিণতির ভয়ে। রাষ্ট্রের ভেতর আইন প্রয়োগে যখন দুষ্টের দমন হয় না, শিষ্টের প্রতি সদাচরণ করা হয় না তখন সামর্থ্যবান ও ক্ষমতাধরেরা বেপরোয়া হয়ে যায়, সামর্থ্যহীন ও ক্ষমতাবঞ্চিতরা এক ধরনের মানসিক যাতনা লালন করে। এক সময় বঞ্চনা এসে ঘিরে ধরে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মজলুম মানুষ ভেবে নেয় জানটা ছাড়া তার হারাবার কিইবা থাকতে পারে। স্বাভাবিকভাবে সংুব্ধ ব্যক্তি সংযম হারায়, বাড়াবাড়ি করে বসে। এতে সামাজিক অপরাধের আরো বিস্তৃতি ঘটায়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বর্বরতা, পৈশাচিকতা ও নিষ্ঠুরতার যেসব অভাবনীয় ঘটনাগুলো ঘটছে তা যেন এ সময়েরই প্রতিফলন। এটা শাসক-শাসিতের পাপের ফসল। নির্বিকার মানুষগুলোর সৎ কাজে উৎসাহিত করা অসৎ কাজ বন্ধের উদ্যোগী না হওয়ার খেসারত। 
লাগেজের ভেতর শিশুর লাশ, বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করে ফেলা, মাতৃ জঠরে গুলিবিদ্ধ হওয়া, কম্প্রেসার দিয়ে হাওয়া ঢুকিয়ে মেরে ফেলা, গাছে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা, মাছের ঘের থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার, উপজাতীয় শিশু ও তরুণী ধর্ষণ, ভাইয়ের হাতে বোনের খুনের ঘটনা কোনোটি স্বস্তিদায়ক খবর নয়।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণধর্ষণের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়াও কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। এক দিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অন্য দিকে সমাজের বিকৃত চেহারার উন্মোচন যেকোনো মানুষকে না ভাবিয়ে পারে না। এটা মূল রোগ নয়, উপসর্গ। তাহলে রোগ নির্ণয় করা জরুরি। অবৈধ ও জোরজবরদস্তির শাসন-শোষণ যত দীর্ঘায়িত হবে এ রোগের আরো বিস্তার ঘটবে।
ব্লগার নীলাদ্রিকে যে নিষ্ঠুর পন্থায় বাড়িতে ঢুকে হত্যা করা হলো; তারপরও কি বলা হবে আমরা ঘরের ভেতরও নিরাপদ আছি। নীলাদ্রি হিন্দু, ইসলাম বিদ্বেষের এজেন্ডা কেন তার মগজে ডুকলি তা জানি না, কিন্তু এই অজুহাতে তাকে হত্যার এখতিয়ার ইসলাম ও প্রচলিত আইন কাউকে দেয়নি। অথচ হত্যার দায় নিরূপণের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। যে দেশে রাজনীতিবিদ গুম হয়ে যায়। অপহরণ করে দিনের পর দিন আটকে রেখে অবশেষে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে গল্প সাজিয়ে আড়াল করা হয়Ñ সে দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করবে কে?
ঘ. 
গ্যাটকো মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়ার আবেদন আদালতে খারিজ হয়েছে। আদালত কাচের ঘর নয়, ক্ষমতার বরও নয়। বিচার সৃষ্টিকর্তার বৈশিষ্ট্যের অংশ। আইনের সমতা, বিচারের সততা নাগরিকের কাছে নমস্য। প্রশ্ন হচ্ছে, একই ধরনের অভিযোগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অব্যাহতি পেয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দুটি আবেদনই খারিজ করে দেয়া হলো। দুটোই দুদকের করা মামলা, দুটি মামলাই করা হয়েছিল মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার আমলে। আইনের চোখে সবাই সমান না হলে বিচার প্রহসনে পরিণত হতে বাধ্য। এর প্রতিক্রিয়ায় মানুষ আদালতে যাবে না। হয় নিয়তিনির্ভর হয়ে আইনের আশ্রয়ের বাইরে থাকবে, নয়তো মনের ভেতর সহজাত দ্রোহের আগুন জ্বালাবে। যে আগুন সাধারণ চোখে দেখা যায় না, একসময় সবাইকে পুড়িয়ে মারে।
আমরা একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সেটা হচ্ছ এই সরকারের সাথে গণতন্ত্র যায় না। আইনের শাসন হাত ধরাধরি করে চলে না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। বিচার বিভাগ দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে না। মতের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকে না। মিডিয়া হাত পা ছড়িয়ে চলতে পারে না। ভিন্ন মতের সহাবস্থান চলে না। বিরোধী দল জায়গা পায় না। মানবাধিকার পালিয়ে বেড়ায়। প্রশাসন দলবাজ হয়ে যায়। বিরোধী দল না করার মুচলেকা দিয়ে কিংবা সরকারি দল করার অঙ্গীকার করে মামলার হয়রানি থেকে বাঁচতে হয়।
বর্তমান সরকার সমাজের রাষ্ট্রের ও সরকারের বিভিন্ন স্তরে একটি সুবিধাভোগী কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে। এরা ষোলোআনা দুর্নীতিনির্ভর। অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে চলা এদের স্বভাব। এর ফলে কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। দুদক কতটা আজ্ঞাবহ ও সেবায়েত তার নজির একই ধরনের মামলার দুরকম পরিণতি। নির্বাচন কমিশন কতটা নতজানু এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত তার প্রমাণ নির্বাচন কমিশন নিজেই তৈরি করেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের হরিলুট কায়কারবার কার চোখে না পড়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন যে এ কমিশনের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়, তার প্রমাণও জাতির সামনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, কমিশনাররা ও সচিব উপস্থাপন করেই রেখেছেন। এ জাতির আবেগ আছে। উপলব্ধিও আছে। সময় মতো প্রতিরোধ করার মতো হিম্মত যে আছে সেটাও প্রমাণিত।
এক-এগারোর সরকার জনগণের সাথে সাত-পাঁচ করে মাইনাস তত্ত্ব ভুলে সাপের দশ পা দেখে বিদায় নিয়ে নির্বাসনে আছে। সেই দুই বছরের সাথে যোগ হলো শেখ হাসিনার পাঁচ বছর। তার সাথে যোগ হলো প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের আরো দেড় বছর। গুণগত পরিবর্তনের কোনো আলামত নেই। মধ্যবর্তী বা নতুন নির্বাচনের আলোচনা মাঝে মধ্যে বিতর্কের ঢেউ তুলছে। আবার সেই বিতর্ক হাওয়ায় মিলিয়েও যাচ্ছে। দেশজুড়ে এক ধরনের নৈরাজ্য, বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতার তাণ্ডব চলছে। এভাবে দেশ চলে না। তাহলে এই অসহনীয় পরিস্থিতি কি একটি অনিবার্য পরিণতি নিশ্চিত করে তুলবে? জনগণ এই একটি মাত্র প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। 
মাসুদ মজুমদার

Ads